20/03/2026
ঈদুল ফিত্র : মুমিনের পুরস্কার লাভ ও ক্ষমাপ্রাপ্তির দিন
-- মুহাম্মাদ আশিক বিল্লাহ তানভীর
রমযানুল মুবারকের পুরো এক মাস সিয়াম সাধনার পর পয়লা শাওয়াল। ঈদের দিন। আনন্দ-উৎসবের দিন। এ আনন্দ আল্লাহর নিআমত প্রাপ্তির। মাগফিরাত প্রত্যাশার। আল্লাহর প্রতি সমর্পিত হওয়ার। আল্লাহ তোমার হুকুম আদায় করার তাওফীক দিয়েছ, তোমার শোকর হে আল্লাহ! তুমি মাগফিরাতের ঘোষণা দিয়েছ, সে প্রত্যাশা রাখি হে আল্লাহ!
নিআমতের শুকরিয়া আদায়ের দিন ঈদ দিন। এই দিনের আনন্দ প্রকাশ পাবে আল্লাহর বড়ত্ব বর্ণনা করে, তাকবীরের মাধ্যমে। আল্লাহ তাআলা (এদিকে ইঙ্গিত করে) বলেন
وَ لِتُكْمِلُوا الْعِدَّةَ وَ لِتُكَبِّرُوا اللهَ عَلٰی مَا هَدٰىكُمْ وَ لَعَلَّكُمْ تَشْكُرُوْنَ.
এবং (তিনি চান) যাতে তোমরা (রোযার) সংখ্যা পূরণ করে নাও এবং আল্লাহ তোমাদেরকে যে পথ দেখিয়েছেন সেজন্য আল্লাহর তাকবীর পাঠ কর এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর। সূরা বাকারা (২) : ১৮৫
প্রত্যেক জাতিরই আনন্দ-পর্ব রয়েছে। আমাদের নবীজীও দিয়েছেন আমাদের আনন্দের দিন। এই ঈদের দিনই সেই দিন। নবীজী বলেন
إِنّ لِكُلِّ قَوْمٍ عِيدًا وَهَذَا عِيدُنَا.
প্রত্যেক জাতিরই নিজস্ব উৎসবের দিন রয়েছে; আর এই দিন হল আমাদের উৎসবের দিন। সহীহ বুখারী, হাদীস ৯৫২, ৩৯৩১; সহীহ মুসলিম, হাদীস ৮৯২
অতএব আমাদের ঈদ অন্যদের উৎসবের মতো নয়। এই ঈদ আল্লাহর দেওয়া তোহফা, তাই এর উদ্যাপনও হবে তাঁর সন্তুষ্টি মোতাবেক, শরীয়তের হুকুম অনুসারে।
মুমিনের ঈদ উদ্যাপন
একজন মুমিনের ঈদ উদ্যাপনে কিছু বিষয় লক্ষণীয়। সংক্ষেপে
ক. সদাকাতুল ফিত্র আদায় করা
রোযার মাধ্যমে রোযাদার কিছুটা হলেও উপলব্ধি করতে পেরেছে সারাবছর অনাহারে থাকা অন্ন-বস্ত্রহীন ভাইদের কষ্ট। আজ রমযান শেষে ঈদের দিন সেই ভাইদের মুখেও যেন ফুটে ওঠে আনন্দের রেখা। সাথে সাথে নিজেও যেন পুত-পবিত্র হতে পারে রোযা রাখতে গিয়ে যে ত্রæটি-বিচ্যুতি হয়েছে সেগুলো থেকে। সেজন্য বিত্তবানদের উপর ওয়াজিব করা হয়েছে সদাকাতুল ফিত্র। হযরত ইবনে আব্বাস রা. বলেন
فَرَضَ رَسُولُ اللهِ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ زَكَاةَ الْفِطْرِ طُهْرَةً لِلصّائِمِ مِنَ اللّغْوِ وَالرّفَثِ، وَطُعْمَةً لِلْمَسَاكِينِ، مَنْ أَدّاهَا قَبْلَ الصّلَاةِ، فَهِيَ زَكَاةٌ مَقْبُولَةٌ، وَمَنْ أَدّاهَا بَعْدَ الصّلَاةِ، فَهِيَ صَدَقَةٌ مِنَ الصّدَقَاتِ.
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সদাকাতুল ফিত্র ওয়াজিব করেছেন রোযাদারকে অর্থহীন ও অশ্লীল কথা কাজ থেকে পবিত্র করার জন্য এবং মিসকীনদের খাবারের ব্যবস্থা হিসাবে। যে (ঈদের) নামাযের পূর্বে তা আদায় করবে তা গ্রহণযোগ্য হবে। আর যে নামাযের পর আদায় করবে তা সাধারণ সদাকা হিসাবে বিবেচিত হবে। Ñসুনানে আবু দাউদ, হাদীস ১৬০৯
তাই ঈদগাহে যাওয়ার পূর্বেই সদাকাতুল ফিত্র আদায় করা মুস্তাহাব।
খ. ঈদের দিন : এদিন পানাহারের দিন
পুরো মাস রোযা রাখার পর আজ বান্দার আনন্দের দিন। তাই আল্লাহ তাআলা হারাম করে দিয়েছেন এ দিনের রোযা।
হযরত আবু হুরায়রা রা. বলেন
أَنّ رَسُولَ اللهِ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ نَهَى عَنْ صِيَامِ يَوْمَيْنِ، يَوْمِ الْفِطْرِ، وَيَوْمِ النّحْرِ.
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুই দিন রোযা রাখতে নিষেধ করেছেন। ইয়াওমুল ফিত্র তথা ঈদুল ফিতরের দিন এবং ইয়াওমুন নহর তথা কুরবানীর ঈদের দিন। সহীহ মুসলিম, হাদীস ১১৩৮
গ. ঈদগাহে যাওয়ার পূর্বে খেজুর বা মিষ্টিমুখ করা
যেহেতু ঈদের দিন রোযা রাখা নিষেধ তাই এর প্রকাশ হিসাবে মুস্তাহাব হল ঈদগাহে যাওয়ার পূর্বে কয়েকটি খেজুর খেয়ে যাওয়া এবং এক্ষেত্রে বেজোড় সংখ্যার প্রতি লক্ষ রাখা। খেজুরের ব্যবস্থা না থাকলে অন্য কোনো মিষ্টান্ন গ্রহণ করা। হযরত আনাস রা. বলেন
كَانَ رَسُولُ اللهِ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ
لاَ يَغْدُو يَوْمَ الفِطْرِ حَتّى يَأْكُلَ تَمَرَاتٍ. وَقَالَ مُرَجّأُ بْنُ رَجَاءٍ، حَدّثَنِي عُبَيْدُ اللهِ، قَالَ: حَدّثَنِي أَنَسٌ، عَنِ النّبِيِّ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ، وَيَأْكُلُهُنّ وِتْرًا.
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈদুল ফিতরে খেজুর না খেয়ে বের হতেন না।
তিনি বেজোড় সংখ্যক খেজুর খেতেন। সহীহ বুখারী, হাদীস ৯৫৩
এটা হল ঈদুল ফিতরের ক্ষেত্রে। আর ঈদুল আযহার ক্ষেত্রে মুস্তাহাব হল না খেয়ে ঈদগাহে যাওয়া এবং কুরবানীর গোশত দিয়ে সর্বপ্রথম আহার গ্রহণ করা।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈদুল ফিতরে কিছু খেয়ে বের হতেন আর ঈদুল আযহায় নামায পড়ে খেতেন। জামে তিরমিযী, হাদীস ৫৪২
আরেক বর্ণনায় এসেছে
لَا يَغْدُو يَوْمَ الْفِطْرِ حَتّى يَأْكُلَ، وَلَا يَأْكُلُ يَوْمَ الْأَضْحَى حَتّى يَرْجِعَ فَيَأْكُلَ مِنْ أُضْحِيّتِهِ.
নবীজী ঈদুল ফিতরে না খেয়ে বের হতেন না আর ঈদুল আযহার দিন ঈদগাহ হতে ফেরার পূর্বে কিছু খেতেন না। ঈদগাহ থেকে ফিরে পশু জবাই করার পর নিজ কুরবানীর পশুর গোশত থেকে খেতেন। মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ২২৯৮৪; সুনানে দারাকুতনী, হাদীস ১৭১৫; সুনানে সুগরা, বাইহাকী, হাদীস ৬৮৯
ঘ. গোসল করে ঈদগাহে যাওয়া
ঈদের দিন গোসল করে ঈদগাহে যাওয়া মুস্তাহাব। সাহাবায়ে কেরাম গোসল করে ঈদগাহে গমন করতেন। হযরত নাফে রাহ. বলেন
أَنّ عَبْدَ اللهِ بْنَ عُمَرَ كَانَ يَغْتَسِلُ يَوْمَ الْفِطْرِ قَبْلَ أَنْ يَغْدُوَ إِلَى الْمُصَلّى.
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. ঈদুল ফিতরে ঈদগাহে যাওয়ার পূর্বে গোসল করে নিতেন। মুয়াত্তা মালেক, হাদীস ৪৮৮
ঙ. উত্তম পোশাক পরিধান করা
সামর্থ্য মোতাবেক ঈদের দিন উত্তম পোশাক পরিধান করা এবং বৈধ সাজগোজ গ্রহণ করা মুস্তাহাব। সাহাবায়ে কেরাম এমনটি করতেন। নাফে রাহ. বলেন
أَنّ ابْنَ عُمَرَ كَانَ يَلْبَسُ فِي الْعِيدَيْنِ أَحْسَنَ ثِيَابِهِ .
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. দুই ঈদে উত্তম পোশাক পরতেন। সুনানে কুবরা, বাইহাকী, হাদীস ৬১৪৩; ফাতহুল বারী ৬/৬৮, ৮/৪১৪
হযরত জাবের রা. বলেন
كَانَتْ لِلنّبِيِّ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ جُبّةٌ يَلْبَسُهَا فِي الْعِيدَيْنِ، وَيَوْمِ الْجُمُعَةِ.
নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের (উন্নত) একটি জুব্বা ছিল যা তিনি দুই ঈদে এবং জুমআর দিন পরতেন। সহীহ ইবনে খুযাইমা, হাদীস ১৭৬৬
ইবনুল কায়্যিম রাহ. বলেন, নবীজীর একটি উত্তম পোশাক ছিল, তিনি দুই ঈদে এবং জুমায় তা পরিধান করতেন। যাদুল মাআদ ১/৪২৫
অতএব ঈদের দিন সাধ্যানুযায়ী উত্তম পোশাক পরা মুস্তাহাব। তবে উত্তম পোশাক অর্থ নতুন পোশাক নয়। তাই ঈদের জন্য নতুন পোশাক কেনার বাহানায় রমযানের মূল্যবান সময় নষ্ট করা মোটেও সমীচীন নয়।
চ. ঈদের দিন তাকবীর বলা
ঈদের দিনের একটি বিশেষ আমল হল বেশি বেশি তাকবীর বলা। তাকবীর হল
اللهُ أَكْبَرُ اللهُ أَكْبَرُ، لَا إِلَهَ إِلّا اللهُ، وَاللهُ أَكْبَرُ اللهُ أَكْبَرُ وَلِلهِ الْحَمْدُ
ঈদগাহে যাওয়ার সময় বিশেষ গুরুত্বের সাথে তাকবীর বলবে। নাফে রাহ. বলেন
أَنّهُ كَانَ إِذَا غَدَا يَوْمَ الْأَضْحَى وَيَوْمَ الْفِطْرِ يَجْهَرُ بِالتّكْبِيرِ حَتّى يَأْتِيَ الْمُصَلّى ثُمّ يُكَبِّرُ حَتّى يَأْتِيَ الْإِمَامُ.
ইবনে উমর রা. ঈদুল আযহা ও ঈদুল ফিতরের সকালে সশব্দে তাকবীর বলতে বলতে ঈদগাহে যেতেন এবং ইমাম আসা পর্যন্ত তাকবীর বলতে থাকতেন। সুনানে দারাকুতনী, হাদীস ১৭১৬; সুনানে কুবরা, বাইহাকী, হাদীস ৬১২৯
ছ. এক পথে যাওয়া আরেক পথে ফেরা
সম্ভব হলে ঈদগাহে যাওয়ার সময় এক পথে যাওয়া আর ফেরার সময় ভিন্ন পথে আসা। নবীজী এমনটি করতেন। হযরত জাবের রা. বলেন
كَانَ النّبِيّ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ إِذَا كَانَ يَوْمُ عِيدٍ خَالَفَ الطّرِيقَ.
নবীজী ঈদের দিন এক পথ দিয়ে ঈদগাহে যেতেন আর ভিন্ন পথ দিয়ে ফিরতেন। সহীহ বুখারী, হাদীস ৯৮৬
জ. পায়ে হেঁটে ঈদগাহে যাওয়া
যতটুকু সম্ভব পাঁয়ে হেঁটে ঈদগাহে যাওয়া মুস্তাহাব। হযরত ইবনে উমর রা. বলেন
كَانَ رَسُولُ اللهِ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ يَخْرُجُ إِلَى الْعِيدِ مَاشِيًا، وَيَرْجِعُ مَاشِيًا.
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈদগাহে পায়ে হেঁটে যেতেন এবং পায়ে হেঁটে ফিরতেন। সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস ১২৯৫, ১২৯৪
ঝ. একে-অপরের জন্য দুআ করা
ঈদের দিন সাহাবায়ে কেরাম দুআসুলভ বাক্যে সৌজন্য বিনিময় করতেন। হাফেয ইবনে হাজার রাহ. উল্লেখ করেন, তাবেয়ী জুবাইর ইবনে নুফাইর বলেন
كَانَ أَصْحَابُ رَسُولِ اللهِ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ إِذَا الْتَقَوْا يَوْمَ الْعِيدِ يَقُولُ بَعْضُهُمْ لِبَعْضٍ تَقَبّلَ اللهُ مِنّا وَمِنْكَ.
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীগণ ঈদের দিন পরস্পর সাক্ষাতে বলতেন
تَقَبّلَ اللهُ مِنّا وَمِنْكَ.
(আল্লাহ আমাদের আমলগুলো কবুল করুন এবং তোমারও।) ফাতহুল বারী ২/৪৪৬
এরকম সৌজন্য বিনিময়ের মাধ্যমে উত্তম আচরণ প্রকাশিত হয় এবং মুসলিম ভ্রাতৃত্ব সুদৃঢ় হয়।
ঞ. ঈদের নামাযের কেরাত
ঈদের নামাযের জন্য বিশেষ কোনো সূরা নির্ধারিত নেই। তবে হাদীসে পাওয়া যায় নবীজী কোন্ কোন্ সূরা দিয়ে ঈদের নামায পড়িয়েছেন। হযরত আবু ওয়াকিদ লাইসী রা. বলেন, উমর ইবনে খাত্তাব রা. আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, নবীজী ঈদের নামাযে কী কেরাত পড়তেন? আমি বললাম
بِـ اقْتَرَبَتِ السّاعَةُ، وَق وَالْقُرْآنِ الْمَجِيدِ
সূরা ক্বামার ও সূরা ক্বফ। সহীহ মুসলিম, হাদীস ৮৯১
এছাড়া হযরত নুমান ইবনে বাশীর রা. বলেন
كَانَ رَسُولُ اللهِ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ يَقْرَأُ فِي الْعِيدَيْنِ، وَفِي الْجُمُعَةِ بِـ سَبِّحِ اسْمَ رَبِّكَ الْأَعْلَى، وَ هَلْ أَتَاكَ حَدِيثُ الْغَاشِيَةِ، قَالَ: وَإِذَا اجْتَمَعَ الْعِيدُ وَالْجُمُعَةُ، فِي يَوْمٍ وَاحِدٍ، يَقْرَأُ بِهِمَا أَيْضًا فِي الصّلَاتَيْنِ.
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুই ঈদের নামাযে এবং জুমার নামাযে সূরা আ‘লা ও সূরা গাশিয়া পড়তেন। আর জুমা ও ঈদ একই দিনে হলে তখনও তিনি উভয় নামাযে এই সূরাই পড়তেন। সহীহ মুসলিম, হাদীস ৮৭৮
ঈদের প্রেক্ষাপট ও তাৎপর্য
ঈদ মুসলিম মিল্লাতের শিআর এবং ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ একটি পরিচয়-চিহ্ন। আমাদের ঈদ আমাদেরই। শরীয়তের অন্যান্য বিধানের মতো আমাদের ঈদেরও রয়েছে অর্থ-মর্ম এবং স্বাতন্ত্র্য। বিজাতীয় কোনো উৎসব-উদ্যাপনের সাথে আমাদের ঈদের কোনো সম্পর্ক নেই। ঈদ নিছক কোনো বিনোদন বা পর্ব-উৎসব নয়; বরং ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ আমল। ঈদের প্রেক্ষাপট যদি লক্ষ্য করি তাহলে বিষয়টি আরো স্পষ্ট হবে। হযরত আনাস রা. বলেন
قَدِمَ رَسُولُ اللهِ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ الْمَدِينَةَ وَلَهُمْ يَوْمَانِ يَلْعَبُونَ فِيهِمَا، فَقَالَ: مَا هَذَانِ الْيَوْمَانِ؟ قَالُوا: كُنّا نَلْعَبُ فِيهِمَا فِي الْجَاهِلِيّةِ، فَقَالَ رَسُولُ اللهِ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ: إِنّ اللهَ قَدْ أَبْدَلَكُمْ بِهِمَا خَيْرًا مِنْهُمَا: يَوْمَ الْأَضْحَى، وَيَوْمَ الْفِطْرِ.
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মদীনায় আগমন করলেন দেখলেন, মদীনার অধিবাসীরা বছরে দুই বার খেলাধুলা ইত্যাদির মাধ্যমে আনন্দ-উৎসব করে। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, এ দুই দিন কীসের দিন? লোকেরা উত্তরে বলল, আমরা জাহেলী যুগ থেকে এ দুই দিন আনন্দ-উৎসব করে আসছি। তখন নবীজী বললেন, এ দুটি দিনের পরিবর্তে আল্লাহ তোমাদেরকে উত্তম দুটি দিন দান করেছেন। সে দুটি দিন হল, ইয়াওমুল আযহা ও ইয়াওমুল ফিত্র (অর্থাৎ ঈদুল ফিত্র ও ঈদুল আযহা)। সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ১১৩৪
অর্থাৎ বিজাতীয় পর্ব-উৎসব আমাদের নয়; আমাদের ঈদ আল্লাহ প্রদত্ত। আর তা হচ্ছে দুই ঈদের দিন। ইসলামে তৃতীয় কোনো ঈদ-উৎসব নেই।
অতএব আমাদের ঈদের আনন্দ হবে নির্মল, পাপ-পঙ্কিলতামুক্ত। বিজাতীয় উৎসব-উদ্যাপন থেকে ভিন্ন। আনন্দ উদ্যাপিত হবে শরীয়তের সীমার মাঝে থেকে। আমাদের ঈদ উদ্যাপনের মূল কর্মসূচী তো শরীয়ত কর্তৃক নির্ধারিত। নবীজীর সুন্নাহ্য় স্পষ্টরূপে বিবৃত। যার কিছু বিষয় আমরা উপরে আলোচনা করেছি। এর পাশাপাশি শরীয়তের সীমার ভেতর থেকে সামাজিকতা রক্ষা এবং আনন্দ-বিনোদনেও নিষেধাজ্ঞা নেই।
তবে ঈদের মূলপাঠ হচ্ছে, আল্লাহ তাআলার নিআমত প্রাপ্তির অনুভ‚তি এবং ক্ষমাপ্রাপ্তির প্রত্যাশা অন্তরে জাগরূক রেখে ঈদগাহে হাজির হওয়া। রোনাযারির মাধ্যমে আল্লাহর দরবারে সমর্পিত হওয়া। এরপর অন্যান্য বৈধ সামাজিকতার পর্ব।
আমাদের সালাফের হালত তো এমন ছিল যে, তারা ঈদের দিন তটস্থ থাকতেন। তাদের বক্তব্য ছিলÑ আমি গোলাম। আমার মনিব আমাকে কাজ করার (আমলের) হুকুম করেছেন। আমি করেছি বটে। কিন্তু তিনি কতটুকু পছন্দ করেছেন তা আমার জানা নেই। গোটা রমযান জুড়ে রহমত ও মাগফিরাতের বহু উপলক্ষ বিরাজ করছিল। আমি এ নিআমতের কতটুকু সদ্ব্যবহার করতে পারলাম ঈদের দিন আনন্দের পাশাপাশি এ অনুভ‚তিও তাদের ভাবিয়ে তুলত। (দ্রষ্টব্য : লাতায়েফুল মাআরেফ, পৃ. ২৯৬, ২৯৭)
অতএব এমন যেন না হয় যে, আনন্দের নামে বিনোদন করতে গিয়ে আমি ঈদের মূল হাকীকতই ভুলে থাকলাম।
আর ঈদের নামে আল্লাহর নাফরমানী এবং বিজাতীয় সংস্কৃতি চর্চার প্রবণতা অত্যন্ত জঘন্য বিষয়, যা ঈদকে (নিআমত লাভের আনন্দকে) ‘ওয়ীদে’ (অভিশাপে) পরিণত করে। ঈদকে উপলক্ষ করে শরীয়তবিরোধী বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়, বিনোদনের নামে বিভিন্ন অশ্লীলতার ‘শুভমুক্তি’ হয়। এহেন আচরণ ইসলামের শিআরের সাথে জঘন্য বেয়াদবী।
ঈদকে উপলক্ষ করে বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন কনসার্ট, নাটক ইত্যাদির আয়োজন হয়। পর্দাহীনতা ও অশ্লীলতার চর্চা হয়। এগুলো তো সর্বাবস্থাতেই পরিত্যাজ্য। তথাপি আল্লাহপ্রদত্ত ঈদকে তাঁর নাফরমানিতে ব্যয় করা আরো ভয়াবহ।
ঈদকে কেন্দ্র করে সমাজে যে প্রবণতার ব্যাপক প্রচলন শুরু হয়েছে তা হচ্ছে ঈদ শপিং। রমযানুল মুবারকের মূল উদ্দেশ্য তাকওয়া হাছিল করা এবং ঈমান আমলের উন্নতি করা। এগুলো বিসর্জন দিয়ে ঈদ শপিং এবং মেকআপ-ম্যাচিংয়ে বিভোর থেকে আখের আমি কীসের ঈদ করতে চাচ্ছি! তা কি একবার ভেবে দেখেছি! ঈদ কার জন্য? ঈদ তো তার জন্য, যে রমযানকে গনীমত মনে করে এর কদরে অগ্রগামী হয়েছে। ঈদ তো তার জন্য, যে ঈমান ও ইহতিসাবের সাথে আমলের মাঝে রমযান অতিবাহিত করেছে। ঈদ তো তার জন্যে যে আল্লাহর হুকুম পালন করেছে। এখন তাঁর রহমত ও মাগফিরাত প্রত্যাশা করছে।
তাই ভেবে দেখা দরকার, ঈদের দিনের আমার আনন্দ-উল্লাস আবার ঈদকে ‘ওয়ীদ’-এ পরিণত করছে না তো! আল্লাহ তাআলা নফস ও শয়তানের ধোঁকা ও প্রবঞ্চনা থেকে সবাইকে হেফাযত করুন।
পরিশেষে আল্লাহর দরবারে মিনতি রমযান ও ঈদ আমাদের জীবনে বয়ে আনুক আনন্দের বার্তা। ভ্রাতৃত্বের সওগাত। সকল অশান্তির অবসান ঘটুক। প্রতিষ্ঠিত হোক সাম্য, সততা, উদারতা ও পরার্থপরতার পরিবেশ। ঈমানী আবেশে গড়ে উঠুক মুসলিম সমাজ। আলোকিত হোক আমাদের ব্যক্তি, ঘর, পরিবার ও রাষ্ট্র।
রমযান ও ঈদে আমরা স্মরণ করি আমাদের ভাই-বোনদের, যাদের জীবন থেকে কেড়ে নেওয়া হয়েছে রমযান, কেড়ে নেওয়া হয়েছে ঈদ ‘আমানূ বিল্লাহ’-এর অপরাধে। মহান রাব্বুল আলামীন সকল মজলুম মুসলিম ভাইদের সহায় হোন। আমাদেরকে তাদের পাশে দাঁড়ানোর তাওফীক দিন। আমীন, ইয়া রাব্বাল আলামীন।
[ মাসিক আলকাউসার || শাবান-রমযান ১৪৪২ || মার্চ-এপ্রিল ২০২১ ]
াসিক_আলকাউসার