11/05/2026
#বিবর্ণ_বর্ণনা
এ বি এম রহমান সিদ্দিক
রাত নেমেছে অনেক আগে। পাটকাঠির বেড়ার ফাঁকে খচমচ শব্দ হতেই তাকালাম। কেউ উঁকি দিচ্ছে,সন্দেহ হলো। নিজেকে আড়াল করলাম। চা করার জন্য গরম পানি ছিলো। ছুঁড়ে মারলাম। উহ্ শব্দ হলো। দুমদুম শব্দে কে যেন দৌড়ে পালালো।
অষ্টম শ্রেণিতে পড়ি। সুন্দর করে চলতে,সাজুগুজু করতে ভাল্লাগে। গুছিয়ে কথা বলতে চেষ্টা করি।
গরীবের মেয়ে বলে মাঝেমধ্যে হেনস্তার
স্বীকার হই।
অরক্ষিত পরিবেশ। আমতলা,জামতলা ঘুরে বেড়ানোর সাধ্য নেই। বখাটের চোখের ঈশারা তাড়া করে ফেরে।
ইদানিং বেহায়া নুরার আড্ডাটা খুব বেড়েছে। বাড়ির পাশে নিমতলায় চায়ের দোকানে পড়ে থাকে নুরা। নিমতলার রাস্তা দিয়েই স্কুলে যাই। খাতা-কলম লাগবে কিনা প্রতিদিন জিজ্ঞাসা করে,নুরা। মাথা নিচু করে হেঁটে যাই। বুলবুলি বলে ডাকেও,কিছু দিতেও চায়...
মাকে বিষয়টি বলেছি। বাবার কথা মনে করে মা কাঁদেন,খু-ব কাঁদেন। আমিও কাঁদি। বাবা নাকি একজন প্রতিবাদী মানুষ ছিলেন তবে তাঁর কথা এবং তাঁর কোন স্মৃতিই মনেপড়ে না আমার।
মা একদিন বললেন,বুলবুলি তুই আর স্কুলে যাসনে। ঢাকা চলে যা। মামার কাছে থাকবি,পড়বি। তোর মামা ভালো মানুষ। তোরে আদর করবে। তোর মামীও ভালো ঘরের মেয়ে। তুই ওইখানে ভালো থাকবি।
মায়ের কথা শুনে আমার ছুটি গল্পের ফটিকের পরিণতির কথা মনে হলো। আঁতকে উঠলাম। আমি সারারাত জেগেই কাটালাম। কাঁদলাম,বেঘোরে কাঁদলাম!
ফটিকের মা তো ফটিককে শেষ পর্যন্ত বাঁচাতে পারেননি।
অনন্ত জিজ্ঞাসা মনে....
তবে কী আমি মামার বাসার 'ঝি' হতে চলেছি নাকি 'বুলবুলি' হয়ে বাঁচতে পারবো,না ফটিকের মতো মরেই যাবো.. ?
বিস্তর অসাড় চিন্তা মনে। অযুত নিযুত ভাবনা ঘুরপাক খাচ্ছিলো মাথায়। অবচেতন মন কতোকিছু বলছে।
শুনছি,মামী যেনো বলছে," এই বুলি প্লেটগুলি ধুয়ে দে....।"
আমি চিৎকার করে উঠলাম....!
মা বললেন," কী হয়েছে রে বুলবুলি?"
বললাম," মামী প্লেট ধোয়ার জন্য ফরমায়েশ করেছে,মা। আমি মামার কাছে যাবো না। গেলে ফটিকের মতো মরে যাবো...!"
মা বললেন,"বোকা মেয়ে,তোর মামীরে কই পাইলি,হ্যাঁ? খারাপ চিন্তা বাদ দে। মায়ের ভাঙাঘরে বসে বকশি বাজারের খবর কেমনে পাইলি,মা?"
বললাম,"মা,যা ঘটবে তাই বলছি। মামী তো মামীই-, মা না ...! আর আমাকে দূরে দিয়ে তুমি থাকতে পারবা,মা?"
মা আঁচলে চোখ মুছলেন।
নিশ্চল বসে আছি খাটিয়ায়। অজানা আশংকা তাড়া করছে আমাকে।
মা মামার সাথে কথা বলে তারিখ ঠিক করে ফেলেছেন।
আমি গোঁ ধরলাম।
বললাম,"মা,আমি এইখানেই থাকবো। এইটা আমার জন্মভূমি। এইটা আমার স্কুল,এইখানেই আমি পড়বো- দেখি,কে আটকায়...!"
"মা,নিপীড়ক প্রতিবার জিতে না,নির্মূল হয়!"
কথাগুলো বুঝিয়ে বলতে পারছিলাম না,কাঁপছিলাম।
মামা ফোন করে বললো,আয় মা।
মায়ের স্বপক্ষে প্রতিবেশী চাচীরা,খালারাও জুটে গেলো।
আমার কচিপ্রাণ বলিদানের জন্য মা প্রস্তুত।
আমার কথা কানে তুলছে না কেউ।
কাঁদছি। আজকের রাতটাই হয়তো আছি....!
সমাজ পরিবর্তনে ও অধিকার রক্ষায় মা-বোনেরা হয়তো একদিন জেগে উঠবে। কিন্তু আমি শুরু করে যেতে পারলাম না......