22/12/2025
প্রসঙ্গঃ বিত্তবান ভিক্ষুকদের রীটে বন্ধ দরিদ্রদের "সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মেধা যাচাই পরীক্ষা--২০২৫"।
-শাকিলা নাছরিন পাপিয়া
এই যে পিশাচের উল্লাসে উন্মত্ত জনতা,এই যে ভাঙ্গনের খেলা,এই যে অমানুষের চরিত্র উন্মোচন
এটা একদিনে হয়নি।
দীর্ঘ পরিকল্পনার ফসল, দীর্ঘ চর্চার ফল।
এই যে প্রাথমিক শিক্ষার ধ্বংসেরআয়োজন,কিন্ডারগার্টেন, হাইস্কুলের প্রাথমিক শাখা,আর মাদ্রাসার উত্থান, এই যে প্রাথমিক শিক্ষকের ওপর ফালতু কাজ আর রেজিস্ট্রারের বোঝা, এই যে শিক্ষকদের সামাজিক অপমানের, অসম্মানের তিলক-এটাও এক দিনে তৈরি হযনি।
অপদার্থের হাতে ক্ষমতা, বিত্তবানদের ব্যবসায়ের পথ সৃষ্টি আর দরিদ্রদের শিক্ষাকে ডাকাতের হাতে তুলে দেবার সুপরিকল্পিত ছক এটা।
চিকিৎসা ব্যয় মিটাতে না পেরে পরিবারকে মুক্তি দিতে গিয়ে শিক্ষকের আত্মহত্যা, পেনশনের টাকা তুলতে গিয়ে পরিপূর্ণ ঘুষ দিতে না পেরে টাকার অভাবে বিনা চিকিৎসায় শিক্ষকের মৃত্যু,বছরের পর বছর অবসরের টাকার জন্য কেটে যাওয়া--
এসব খবর হয় না।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এসব খবর উঠে আসে না। উপহাসের যুগে বসবাস আমাদের।
আমাদের পাঙ্গাস, আর ফার্মের মুরগি ভিউ বানায়,
বিনোদন যোগায়।
মহান শিক্ষা উপদেষ্টার পরিপত্র বিভাগের
প্রসব বেদনা কবে প্রশমিত হলো?
আদালত একমাসের নিষেধাজ্ঞা দিযেছে
এখন শিশুদের এবং শিক্ষকদের করণীয় কী তা জানাবার জন্য প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের প্রজ্ঞাপন বিভাগ কি জেগে আছে?
দয়া করে কোমলমতি শিশু শব্দটি ব্যবহার করবেন না। আমার শিশুরা মোটেও কোমলমতি নয়।
একটা ঘটনা বলি শুনুনঃ
প্রায় একযুগ আগের ঘটনা।
বিদ্যালয়ের বিশেষ কাজে খুবই ব্যস্ত ছিলাম। তৃতীয় শ্রেণির এক ছাত্রী অফিস রুমের দরজায় এসে আমায় ডাকতে লাগলো। আমি কাগজ থেকে চোখ না তুলে ইশারায় কাছে ডাকলাম।
প্রশ্ন করলাম," কি হয়েছে?"
ফুসতে ফুসতে উত্তর দিল, দোকানে পেন্সিল কিনতে গিয়েছিলাম। আমার গাল ধরে একটা লোক বলল, মেয়েটা তো খুব সুন্দর।
আমি বললাম, তাতে কী হয়েছে? সুন্দর বলেছে।
সে উত্তর দিল, গাল ধরল কেন?
আমি বললাম, এটা অবশ্য ঠিক করেনি। তুমি কী বলেছো?
সে বলল, কিছু বলিনি। আপনার কাছে বিচার দিতে এলাম।
আমি কাজ করতে করতে বললাম, আমি তো ব্যস্ত। দোকানের সামনে ড্রেন ছিল না?
মেয়েটি বলল, ছিল।
তাহলে ওকে সেখানে ফেলে দিলেই পারতি। এখন তো বিচার করতে পারবো না। পরে দেখবো বিষয়টা।
মেয়েটি চলে গেল। আমি কাজে মন দিলাম।
পাঁচ, দশ মিনিট পরই ২০-২২ বছরের এক যুবক এসে দাঁড়ালো অফিস রুমের সামনে। সবাই হা করে তাকিয়ে আছে ছেলেটির দিকে। সারা গায়ে ড্রেনের ময়লা।
ছেলেটি কাঁদো কাঁদো স্বরে বলল, শাকিলা আপা কে?
আমি হাতের কাজ রেখে দ্রুত তার কাছে গিয়ে অবস্থা দেখেই বিষয়টা আঁচ করতে পারলাম।
বললাম, আমার ছাত্রীর গাল ধরবে আর সে তোমায় ছেড়ে দিবে সেটা তো হবে না, বাবা?
ছেলেটি বলল, তা বলে আপনি আমায় ড্রেনে ফেলে দিতে বলবেন?
আমি উত্তর দিলাম, সেটা তো ছিল কথার কথা।
আমার ছাত্রী যে সাথে সাথে এটা পালন করবে তা বুঝিনি।
এবার বুঝতে পারলেন, আমার ছাত্রীরা মোটেও কোমলমতি নয়?
বিত্তবান ভিক্ষুকদের সম্মান আর মর্যাদার প্রতীক যে বৃত্তি এবং যে কোন মূল্যে সেটা পাবার প্রতিযোগিতায় শিক্ষক অভিভাবক এক হয়ে এই বৃত্তি পাবার জন্য যে কোন পথ অবলম্বন করতে দ্বিধা করে না, সে বৃত্তিকে থোড়াই কেয়ার করে আমার শিক্ষার্থীরা।
তাদের সম্মান এত ঠুনকো নয়। ভিক্ষুকদের সাথে প্রতিযোগিতায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা কখনোই অবতীর্ণ হতে চায়নি। আমাদের সিস্টেম তাদের বাধ্য করেছে।
বৃত্তি নামক আপনাদের তথাকথিত সম্মানের ঐ সনদ প্রত্যাখ্যানের
অসীম ক্ষমতা তাদের আছে।
ভিক্ষুকদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় আপনারাই তাদের নামিয়েছেন।
বেসরকারি প্রতিষ্ঠান তাদের মতো করে তাদের বৃত্তি পরীক্ষা নভেম্বরেই নিয়েছে। ডিসেম্বরে সবাই যার যার মতো করে বেড়াতে চলে গেছেন প্রতিটি বেসরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী। মেধা যাচাই পরীক্ষার নাম করে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের আটকে রাখা হযেছে।
ধুম করে কেউ এসে রীট করায় পরীক্ষা বাতিল হয়ে গেল। পত্রিকা এবং অন্যান্য মাধ্যম থেকে অনেক আগে থেকেই রীটের কারণে পরীক্ষা স্থগিত কথাটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঘুরছিল। কিন্তু প্রশাসন ছিল নীরব। তাদের কোন নির্দেশনা ছিল না।
একমাসের জন্য স্থগিত পরীক্ষার ভবিষ্যৎ কী সে ব্যাপারে এখনো তারা ভাবছেন। শিক্ষকদের সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য উপবৃত্তিসহ নানা ধরণের কার্যক্রম পরিচালনা করার পর এবার যুক্ত হলো এই মেধা যাচাই পরীক্ষার ব্যাপারে অনিশ্চযতা।
সরকারি প্রাথমিক শিক্ষাকে সমূলে ধ্বংস করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার এক সুপরিকল্পিত কার্যক্রম এটা।
দেশে এতো এতো নিত্য নতুন ঘটনার ভিড়ে লক্ষ লক্ষ শিশুর শীতকালীন অবকাশ, উৎসবমুখর পরিবেশে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ ভেসে গেল। কেউ খবর রাখেনি।
পত্রিকা নীরব, টক শো নীবর, সুশীল সমাজ যারা গেল গেল করে গলা সপ্তমে উঠায় তারা নীরব।
এই সেই রীট, যার কারণে ৩২ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রধান শিক্ষক শূন্য, হঠাৎ করে বন্ধ হয়ে যায় কোটি টাকা ব্যয়ের পরীক্ষা। সব আয়োজন মুহূর্তে ব্যর্থ।
মানুষ আইনের জন্য, না মানুষের জন্য আইন?
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সাধারণত দরিদ্র পরিবারের সন্তানেরা পড়ে। তাদের কথা ভাবার সময় এ রাষ্ট্রের হবে না এটাই স্বাভাবিক।
সুতরাং কোমলমতি বলে বলে কুম্ভিরাশ্রু বর্ষণ না করলেও চলবে।
বিত্তবান ভিক্ষুকদের সঙ্গে মেধা যাচাই পরীক্ষায় আমার শিক্ষার্থীরা অংশগ্রহণ করুক একজন আত্মমর্যাদাবোধসম্পন্ন শিক্ষক হিসাবে আমি তা চাই না।