Bangladesh Public Health and Health Economics Research Center

Bangladesh Public Health and Health Economics Research Center

Share

Contact information, map and directions, contact form, opening hours, services, ratings, photos, videos and announcements from Bangladesh Public Health and Health Economics Research Center, Educational Research Center, Abdullapur.

22/11/2022

শিল্পের চাহিদার তুলনায় শিক্ষার সুযোগ কম
শফিকুল ইসলাম

নভেম্বর ২১, ২০২২

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব লেদার ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজির ল্যাবে শিক্ষার্থীরা ছবি: সালাহউদ্দিন আহমেদ
দেশে পোশাক খাতের পর সবচেয়ে সম্ভাবনাময় চামড়া শিল্প। দ্বিতীয় বৃহৎ বৈদেশিক মুদ্রার উৎসও চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য। এ খাতের একটি বিশেষ ইতিবাচক দিক হলো এর প্রায় শতভাগ কাঁচামালই দেশীয়। স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে জোগান দিতে দেশে ক্রমেই চামড়া খাতকেন্দ্রিক শিল্প-কারখানা বাড়ছে। সম্ভাবনাময় এ খাত ঘিরে সৃষ্টি হচ্ছে নতুন নতুন কর্মসংস্থানও। যদিও প্রসারমাণ খাতটির জন্য দক্ষ জনবল তৈরির লক্ষ্যে গড়ে তোলা হয়নি পর্যাপ্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।

দেশে মাত্র দুটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে লেদার ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সুযোগ রয়েছে—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব লেদার ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি এবং খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (কুয়েট)। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের বাইরে লেদার ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে কোনো ধরনের কলেজ কিংবা ইনস্টিটিউটও গড়ে তোলা হয়নি। খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) লেদার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের বিভাগীয় প্রধান (ভারপ্রাপ্ত) সহকারী অধ্যাপক ওধীর চন্দ্র পালের ভাষ্যে, দেশের অর্থনীতিতে একটি উদীয়মান খাত চামড়া শিল্প। নতুন নতুন কারখানা চালু হচ্ছে। বিনিয়োগ হচ্ছে। আমাদের ফুটওয়্যার ও লেদার প্রডাক্ট বিদেশে রফতানি হচ্ছে। দুটি প্রতিষ্ঠানে পড়ার সুযোগ থাকায় বাজারে চাহিদার তুলনায় এ বিষয়ে গ্র্যাজুয়েট খুবই কম। বিপরীতে কর্মসংস্থানের বিশাল একটি ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। আমাদের শিক্ষার্থীরা দেশের বাইরে টিম্বারল্যান্ড, ডিক্যাপলোন, টুপসুড, ইন্টারটেকে চাকরি করছেন। ভবিষ্যতে দেশীয় অর্থনীতির কাঠামো শক্তিশালী করতে এ খাত বড় ভূমিকা রাখবে।

চামড়া শিল্পে রয়েছে জাতীয় আয়ের প্রবৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন এবং কর্মসংস্থানের অপার সম্ভাবনা। দেশে প্রতি বছর গড়ে ২ লাখ ৪৫ হাজার মেট্রিক টন কাঁচা চামড়া প্রক্রিয়াজাত হয়। বৈশ্বিক চামড়াজাত পণ্যের ১০ শতাংশ চাহিদার জোগান দিচ্ছে বাংলাদেশ। বর্তমানে বিশ্বের অষ্টম বৃহত্তম ফুটওয়্যার উৎপাদনকারী দেশ বাংলাদেশ। খাতটিতে প্রায় নয় লাখ লোকের কর্মসংস্থান। দেশে বর্তমানে ট্যানারির সংখ্যা ২০০। এছাড়া রয়েছে ২ হাজার ৫০০টি ফুটওয়্যার তৈরির কারখানা, যার মধ্যে ৯০টি বড় আকারের প্রতিষ্ঠান। ইপিজেডসহ রফতানিমুখী লেদারগুডস ও ফুটওয়্যার শিল্প-কারখানা রয়েছে ২০০টি। এসব প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজন দক্ষ লেদার ইঞ্জিনিয়ার।

গ্র্যান্ড ভিউ রিসার্চের সমীক্ষা অনুসারে, ২০২০ সালে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের বৈশ্বিক বাজারের আকার ছিল ৩০৪ দশমিক ১২ বিলিয়ন ডলার, যা ২০২৮ সালের মধ্যে ৫ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়ে দাঁড়াবে প্রায় ৩২৩ বিলিয়ন ডলারে। বাংলাদেশ রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর ২০২১-২২ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুসারে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রফতানিতে দেশের আয় ১ দশমিক ২৪ বিলিয়ন ডলার। জার্মানি, পর্তুগাল, স্পেন, ইতালি, জাপান, তাইওয়ান, দক্ষিণ কোরিয়া, হংকং, চীন, রাশিয়া, ব্রাজিল, অস্ট্রেলিয়া, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে যাচ্ছে দেশীয় চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য। চামড়া শিল্পে শতভাগ কাঁচামাল দেশীয় হওয়া সত্ত্বেও সুন্দর ব্যবস্থাপনা, ট্যানারিগুলোর পরিবেশগত কমপ্লায়েন্স লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ (এলডব্লিউজি) সার্টিফিকেট অর্জনে ব্যর্থতা ও প্রয়োজনীয়সংখ্যক দক্ষ লেদার ইঞ্জিনিয়ারের অভাবে বিলিয়ন ডলারের বাজার ধরতে পারছে না বাংলাদেশ। ফলে এ খাতে দেশীয় কর্মক্ষেত্রেই বিদেশীদের নিয়োগ করতে বাধ্য হচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিদেশী ক্রেতারা বিশেষ করে বড় ব্র্যান্ডগুলো আন্তর্জাতিক বাজার থেকে চামড়া এবং চামড়াজাত পণ্য আমদানির সময় লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপের সার্টিফিকেশন দেখতে চায়। কারখানাগুলো পণ্য তৈরির সময় পরিবেশের ক্ষতি করছে না—এটা নিশ্চিত না করলে মেলে না এই সার্টিফিকেট। দেশে নিবন্ধিত ২০০ ট্যানারির মধ্যে এপেক্স ফুটওয়্যার লিমিটেড, এবিসি লেদার ও রিফ লেদার লিমিটেড—এ তিন কারখানা সার্টিফিকেট পেয়েছে। ফলে বৃহৎ এ খাতের পরিবেশগত কমপ্লায়েন্স অর্জনের নেপথ্যে বড় ভূমিকা রাখতে পারেন একজন লেদার ইঞ্জিনিয়ার।

চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য উৎপাদনকারী দেশীয় কোম্পানি বাটা, এপেক্স, বে, জেনিস, স্টেপ, লোটো, ওয়াকার, ফরচুন, আকিজ, এবিসি, এফবি, পিকার্ড বাংলাদেশসহ বিভিন্ন লেদার, ফুটওয়্যার ও লেদার প্রডাক্টস প্রতিষ্ঠানে লেদার ইঞ্জিনিয়ারের চাহিদা বাড়ছে প্রতিনিয়ত। একজন লেদার ইঞ্জিনিয়ার কোয়ালিটি কন্ট্রোল অফিসার (কিউসি), ম্যাটেরিয়াল প্রকিউরমেন্ট, প্রডাক্ট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অফিসার, প্রডাক্ট ডিজাইনিং, প্ল্যানিং, মার্চেন্ডাইজিং, প্রডাক্ট ম্যানেজার, ফ্যাক্টরি ম্যানেজার ইত্যাদি পদে চাকরি করার সুযোগ রয়েছে।

লেদারগুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সহসভাপতি, লেদারেক্স ফুটওয়্যার লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ নাজমুল হোসেন বলেন, দেশের গ্র্যাজুয়েটরা দক্ষতার সঙ্গে কাজ করছে। তাদের দেশে-বিদেশে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়, বেশ ভালো দক্ষতার প্রমাণ দিচ্ছেন তারা। পর্যাপ্ত লোক না পাওয়ায় একাডেমিক ছাড়াও আমরা নিজেদের মতো করে জনবল তৈরি করে নিয়েছি। বিদেশীদের সমন্বয়ে এখানে কাজ চলছে। দেশীয় গ্র্যাজুয়েটরা অধিকাংশই ইন্ডাস্ট্রির প্রতি আগ্রহ কম। এ বিষয়ে যে ধরনের চাহিদা সে অনুযায়ী আমরা গ্র্যাজুয়েট পাচ্ছি না। ডিপ্লোমা কোর্স চালু করা দরকার। তাহলে হয়তো চাহিদা অনুযায়ী জনশক্তি পাওয়া যাবে। এডিডাস, নাইকি, গুচি, পোমা, এবিসি মার্ট, অ্যালডো, ইস্প্রিট, হুগো বস, এইচঅ্যান্ডএম, কেইট স্পেড, কে-মার্ট, মাইকেল কোর, মার্কস অ্যান্ড স্পেন্সার, স্টিভ ম্যাডেন, টিম্বারল্যান্ডের মতো বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ডগুলোতেও লেদার টেকনোলজিস্ট হিসেবে কাজ করার সুযোগ রয়েছে।

লেদার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পড়ালেখা

একজন লেদার ইঞ্জিনিয়ার কাঁচা চামড়া থেকে লেদার তৈরির কলাকৌশল, ব্যবহারোপযোগী বিভিন্ন চামড়াজাত পণ্যের ডিজাইন ও নির্মাণশৈলী নিয়ে কাজ করেন। যেগুলো থেকে পরবর্তী সময়ে দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহার্য বিভিন্ন চামড়াজাত পণ্য, গৃহস্থালি পণ্য, ক্রীড়াসামগ্রী, প্রতিরক্ষা, পরিবহন, সংগীতসহ নানা অঙ্গনের চামড়াজাত পণ্য তৈরি করা হয়।

দেশে মাত্র দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ে লেদার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে উচ্চশিক্ষার সুযোগ রয়েছে। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকে বিজ্ঞান বিভাগে উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীরা পড়তে পারবেন এ বিষয়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব লেদার ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজিতে বিএসসি ইন লেদার ইঞ্জিনিয়ারিং, বিএসসি ইন ফুটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং এবং বিএসসি ইন লেদার প্রডাক্টস ইঞ্জিনিয়ারিং—এ তিনটি বিষয়ে ডিগ্রি প্রদান করা হয়। এখানে এমএসসি, এমফিল ও পিএইচডি ডিগ্রি গ্রহণের সুযোগও রয়েছে। তিন বিভাগে মোট আসন সংখ্যা ১৫০টি।

এছাড়া খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (কুয়েট) লেদার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে বিএসসি ও এমএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি দেয়া হয়। কুয়েটে ফুটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং ও লেদার প্রডাক্টস ইঞ্জিনিয়ারিং নামে স্বতন্ত্র বিভাগ না থাকলেও লেদার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে এ দুই বিষয়েও পড়ানো হয়। আসন সংখ্যা ৬০।

বিদেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগ

লেদার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে বিএসসি ডিগ্রি গ্রহণের পর দেশের বাইরে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, অস্ট্রেলিয়া, তাইওয়ান, তুরস্ক, চেক রিপাবলিক, ভারতসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগ রয়েছে। লেদার ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয় ছাড়াও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে ম্যাটেরিয়াল সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং, এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং, পলিমার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং, ম্যানেজমেন্ট অব টেকনোলজি, ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট, কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং, বায়োলজিক্যাল সায়েন্স, রসায়ন, ন্যানো টেকনোলজি এবং ফ্যাশন ডিজাইনিংয়ে উচ্চতর ডিগ্রি নেয়া যায়। গবেষণার সুযোগ রয়েছে অবারিত।

25/10/2022

গত এক দশকে বিদেশী ঋণের উৎসে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, এডিবির মতো বহুজাতিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পরিবর্তে মোট ঋণের পোর্টফলিওতে এখন দ্বিপক্ষীয় ঋণেরই প্রাধান্য দেখা যাচ্ছে বেশি। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফের মতো দাতা প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে নেয়া ঋণের সুদহার ছিল নির্দিষ্ট ও সুলভ। ঋণ পরিশোধের মেয়াদ ২০-২৫ বছর হলেও সুদহার নির্ধারিত ছিল সর্বোচ্চ ২ শতাংশ। সেখানে এখন বৈদেশিক ঋণের উল্লেখযোগ্য অংশ দখল করে নিয়েছে সাপ্লায়ার্স ক্রেডিট ও বাণিজ্যিক শর্তযুক্ত ঋণের মতো কঠিন শর্তের ঋণও।

দীর্ঘদিন এ ধরনের ঋণের সুদ বা ব্যয় নির্ধারণ হয়েছে শুধু লন্ডন ইন্টারব্যাংক অফারড রেটের (লাইবর) ভিত্তিতে। গত পাঁচ বছরে সে জায়গা দখল করে নিয়েছে সিকিউরড ওভারনাইট ফাইন্যান্সিং রেট (এসওএফআর)। এসওএফআর হলো ডলারভিত্তিক ঋণের সুদহার, যার ওঠানামা নির্ভর করে মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের সুদহারের ওপর। এসওএফআর নির্ধারণের ক্ষেত্রে কোলেটারাল (বা নিশ্চয়তা হিসেবে গৃহীত সম্পদ) হিসেবে ধরা হয় মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের বাজারকে। ট্রেজারি বন্ডের সুদহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এসওএফআরও বেড়ে যায়। এসব ঋণের ক্ষেত্রে লাইবর বা এসওএফআরের প্রচলিত হারের সঙ্গে ঋণ চুক্তিতে নির্ধারিত সুদহার যুক্ত করে মোট সুদ নির্ধারণ করা হয়। এসব কিস্তি পরিশোধের সময় বাজারে এসওএফআরের প্রচলিত হারের নির্ধারিত সুদহার ছাড়াও সার্ভিস চার্জসহ অন্যান্য ব্যয়ও যুক্ত করতে হয়।

শর্ত কঠিন হলেও এসওএফআরভিত্তিক ঋণ এতদিন মোটামুটি সুলভেই পেয়েছে বাংলাদেশ। ২০২০ সালে কভিড সংক্রমণ শুরুর পরই এসওএফআর নেমে আসে শূন্যের কাছাকাছি পর্যায়ে। প্রায় দুই বছর শূন্যের কাছাকাছি পর্যায়েই স্থিতিশীল ছিল এসওএফআর হার। এ সময়টিতেই দেশের সরকারি-বেসরকারি খাত বৈদেশিক ঋণ নিয়েছে সবচেয়ে বেশি। তুলনামূলক কম সুদহারের সঙ্গে প্রায় শূন্য এসওএফআর যুক্ত হওয়ায় এ সময় বেশ সুলভেই ঋণ নিয়েছে বাংলাদেশ। কিন্তু গত ছয় মাসে ক্রমেই বেড়ে এখন এসওএফআর দাঁড়িয়েছে ৩ শতাংশেরও বেশিতে। নির্ধারিত এ সুদহারের সঙ্গে বাড়তি এ এসওএফআর যুক্ত করে ঋণের সুদ পরিশোধ করতে হচ্ছে দেশের সরকারি-বেসরকারি খাতকে। সুলভে পাওয়া ঋণ এখন দিনে দিনে আরো ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে। এ ধারা সামনের দিনগুলোয় আরো অব্যাহত থাকবে বলে ফেডারেল রিজার্ভসহ (ফেড) দেশী-বিদেশী বিভিন্ন সংস্থা ও বিশেষজ্ঞের পূর্বাভাসে উঠে এসেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি বছরের জুন শেষে দেশের সরকারি-বেসরকারি বিদেশী ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯ হাজার ৫৮৬ কোটি বা প্রায় ৯৬ বিলিয়ন ডলার। এ ঋণের প্রায় ৭৩ শতাংশ নিয়েছে সরকার। বাকি ২৭ শতাংশ নিয়েছে দেশের বেসরকারি খাত। গত এক বছরে টাকার বিপরীতে ডলারের বিনিময় হার প্রায় ২৫ শতাংশ বেড়েছে। একই সঙ্গে বিশ্ববাজারে লাইবরের সুদহার শূন্য দশমিক ৫০ থেকে বেড়ে ৫ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছে। প্রায় শূন্যের কাছাকাছি থেকে বেড়ে এসওএফআর এখন ৩ শতাংশ ছাড়িয়েছে। টাকার রেকর্ড অবমূল্যায়নের পাশাপাশি লাইবর ও এসওএফআর সুদহার অস্বাভাবিক বাড়ায় বিদেশী ঋণ পরিশোধে বাংলাদেশের ব্যয়ও বেড়ে যাচ্ছে।

জুন শেষে সরকারের নেয়া বিদেশী ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬৯ দশমিক ৯০ বিলিয়ন ডলার। এ ঋণের মধ্যে ৬৭ বিলিয়ন ডলার এসেছে দীর্ঘমেয়াদি হিসেবে। দীর্ঘমেয়াদি ঋণের ৩৪ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলারের উৎস হলো বহুপক্ষীয়। ২৪ দশমিক ৫০ বিলিয়ন ডলার ঋণ নেয়া হয়েছে দ্বিপক্ষীয় উৎস থেকে। এছাড়া আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) থেকে ৩ বিলিয়ন, বাণিজ্যিক শর্তযুক্ত ঋণ হিসাবে ৩ দশমিক ৭১ বিলিয়ন ও অন্যান্য উৎস থেকে ১ দশমিক ৪৩ বিলিয়ন ডলার ঋণ নিয়েছে সরকার। জুন শেষে সরকারের নেয়া স্বল্পমেয়াদি ঋণের পরিমাণও ২ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন ডলারে গিয়ে ঠেকেছে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সরকারের বহুপক্ষীয় ঋণের শর্ত অনেক বেশি নমনীয়। সুদহারও অনেক বেশি সুলভ। এসব ঋণের বেশির ভাগেরই সুদহার নির্ধারিত। মেয়াদ অনেক দীর্ঘ হলেও এসব ঋণের সুদহার বাড়বে না। কিন্তু দ্বিপক্ষীয় ও অন্যান্য উৎস থেকে নেয়া বিদেশী ঋণের শর্ত অনেক কঠিন, সুদহারও চড়া। লাইবর বা এসওএফআরের সঙ্গে সংযুক্ত করে দ্বিপক্ষীয় ও অন্যান্য বেশির ভাগ ঋণের সুদহার নির্ধারণ করা হয়েছে। গত এক বছরে এসওএফআর ও লাইবরের পাশাপাশি ডলারের বিনিময় হার ব্যাপক মাত্রায় বেড়েছে। ফেড এখন আগ্রাসীভাবে সুদহার বাড়িয়ে তোলায় সামনের দিনগুলোয় এ ব্যয়বৃদ্ধির ধারা অব্যাহত থাকবে।

দ্বিপক্ষীয় বিভিন্ন ঋণের ভিত্তিতে দেশে এখন বেশ কয়েকটি মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। এর একটি হলো রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। ওয়ার্ল্ভ্র নিউক্লিয়ার নিউজের তথ্য অনুযায়ী রাশিয়ার দেয়া ১২ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলার ঋণের ভিত্তিতে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এ ঋণের সুদহার ধরা হয়েছে লাইবরের অতিরিক্ত ১ দশমিক ৭৫ শতাংশ। চুক্তিটি যখন সই হয় তখন লাইবর হার ছিল বেশ কম। কিন্তু এখন লাইবর হার বেড়ে যাওয়ায় বিদ্যুৎকেন্দ্রটির ঋণের সুদ বাবদ পরিশোধযোগ্য ব্যয়ের পরিমাণও অনেকটাই বেড়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদও মনে করেন, লাইবর বা এসওএফআর হার বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশের বিদেশী ঋণ ঝুঁকি স্ফীত হয়েছে। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, আগে বাংলাদেশের বিদেশী ঋণের ৮০ শতাংশ ছিল সুলভ সুদের। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, এডিবিসহ বহুপক্ষীয় বিভিন্ন সংস্থা থেকে বেশি ঋণ নেয়া হতো। সুলভ সুদ আর দীর্ঘমেয়াদের কারণে বহুপক্ষীয় ঋণের ঝুঁকি অনেক কম। কিন্তু গত কয়েক বছরে দ্বিপক্ষীয় (বাইলেটারাল) ঋণের পরিমাণ বেড়েছে। সাপ্লায়ারস ক্রেডিট ও বাণিজ্যিক শর্তযুক্ত ঋণের পরিমাণও বেড়েছে অস্বাভাবিক হারে। লাইবর বা এসওএফআর হার বেড়ে যাওয়ায় এসব ঋণের সুদহারও অনেক বেড়ে যাবে।

এ অর্থনীতিবিদের ভাষ্য হলো বেসরকারি খাতে বাছবিচার ছাড়া বিদেশী ঋণের অনুমোদন দেয়া বাংলাদেশ ব্যাংকের বড় ভুল। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর থাকা অবস্থায় আমি বিদেশী ঋণ অনুমোদনের আগে বহুদিক পর্যালোচনা করতাম। কিন্তু পরবর্তী সময়ে বেসরকারি খাতে বিদেশী ঋণ অনুমোদনে বাছবিচার করা হয়নি। টাকার অবমূল্যায়নের পাশাপাশি লাইবর ও এসওএফআর বেড়ে যাওয়ায় বিদেশী ঋণ নেয়া দেশী কোম্পানিগুলো খেলাপি হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এটি হলে দিন শেষে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের দীর্ঘ সুনাম ও ঐতিহ্য বিনষ্ট হবে।

যুক্তরাষ্ট্রে ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি ঠেকাতে গিয়ে আগ্রাসীভাবে সুদহার বাড়িয়ে চলেছে ফেডারেল রিজার্ভ (ফেড)। ২০২২ সালের এ পর্যন্ত পাঁচবার সুদহার বাড়িয়েছে ফেড। বছর শেষ হওয়ার আগে আরো বাড়ানো হবে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন ফেড চেয়ারম্যান জেরোমি পাওয়েল। ফেডের সুদহার বাড়ানোর পরিপ্রেক্ষিতে ট্রেজারি বন্ডের সুদহারও এখন বাড়তির দিকে। ট্রেজারি বন্ডের সঙ্গে সংযুক্ত হওয়ায় এসওএফআর হারও এখন বেড়ে চলেছে।

ফেডের সুদহার বৃদ্ধির প্রভাব রয়েছে মুদ্রাবাজারেও। যুক্তরাষ্ট্রে ফেড সুদহার বাড়ালে সাধারণত মার্কিন পুঁজি ও সুদযুক্ত বিনিয়োগের (ট্রেজারি বন্ড, সঞ্চয়পত্র) বাজার চাঙ্গা হয়ে ওঠার পাশাপাশি ডলারের বিনিময় হারও বেড়ে যায়। ডলারের বিনিময় হার বাড়ায় ঋণ পরিশোধের বোঝাও এখন ভারী হয়ে উঠেছে।

সামনের দিনগুলোয় এ বোঝা আরো ভারী হয়ে উঠবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, আর কিছুদিনের মধ্যেই স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বেরিয়ে আসবে বাংলাদেশ। এর সঙ্গে সঙ্গে হারাবে ছাড়ে ঋণ গ্রহণের সুবিধাও। এর পরিবর্তে বৈদেশিক ঋণে বাণিজ্যিক শর্তযুক্ত ঋণের প্রাধান্য বাড়বে। এসওএফআর বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে ঋণের সুদ বা কিস্তি পরিশোধ করতে গিয়ে সামনের দিনগুলোয় বাংলাদেশের ব্যয়ের বোঝা আরো বড় হবে।

যেসব অনুমিতির ভিত্তিতে বিদেশী ঋণ নেয়া হয়েছিল সেগুলো এখন ভ্রান্ত প্রমাণিত হয়েছে বলে মনে করেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, বাছবিচার না করে বিদেশী ঋণ নেয়ার সময় মনে করা হয়েছিল ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময় হার একই থাকবে। আবার আন্তর্জাতিক বাজারে লাইবরের সুদহার বাড়বে না বলেও ঋণ নেয়ার সময় ধারণা করা হয়েছিল। এখন দেখা যাচ্ছে, দেশের বাজারেই টাকার প্রায় ২৫ শতাংশ অবমূল্যায়ন হয়েছে। আবার বিশ্ববাজারে এসওএফআর ও লাইবর হার কয়েক গুণ বেড়ে গিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র যে হারে নীতি সুদহার বাড়াচ্ছে, তাতে এসব হার কমার কোনো সম্ভাবনা নেই। আমরা অনেক আগে থেকেই বিদেশী ঋণ নেয়ার বিষয়ে সরকারকে সতর্ক করে আসছিলাম। যে ভ্রান্ত চিন্তা থেকে বিদেশী ঋণ নেয়া হয়েছে, সেটিকে বিশুদ্ধ বাংলায় অবিমৃষ্যকারিতা বলা যায়।

স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বের হওয়ার অতিকথনের কারণে বাংলাদেশের বিপদ আরো বাড়বে বলে মনে করেন এ অর্থনীতিবিদ। দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, এলডিসি থেকে উত্তরণের কারণে বিশ্বব্যাংকসহ বহুজাতিক সংস্থাগুলো থেকে এখন আর সুলভ সুদের ঋণ পাবে না। দ্বিপক্ষীয় যেসব বিদেশী ঋণ সরকার নিয়েছে, সেগুলোর সুদহার পরিবর্তনশীল। লাইবরের সঙ্গে সুদহার জুড়ে দিয়ে এসব ঋণ নেয়া হয়েছে। সাপ্লায়ারস ক্রেডিট ও বাণিজ্যিক শর্তযুক্ত যেসব ঋণ নেয়া হয়েছে, সেগুলোও এসওএফআর ও লাইবরের সুদহারের সঙ্গে সম্পৃক্ত। ১০ টাকার পণ্যের দাম ১০০ টাকা দেখিয়েও গত কয়েক বছরে বিদেশী ঋণ আনা হয়েছে। সময় যত গড়াবে, সুদের অংক বেড়ে এসব ঋণ দেশের ঝুঁকিকে তত বেশি বাড়াবে।

চলতি বছরের জুন শেষে দেশের বেসরকারি খাতে বিদেশী ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৫ দশমিক ৯৫ বিলিয়ন ডলার। এ ঋণের ১৭ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন ডলারের ধরনই স্বল্পমেয়াদি। বেসরকারি খাতের পুরো ঋণই নেয়া হয়েছে লাইবর রেট বা এসওএফআরের সঙ্গে সম্পৃক্ত করে। বিদেশী এ ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের বাড়তি অর্থ ব্যয় করতে হবে।

বিশ্ববাজারে লাইবর ও এসওএফআর এবং দেশে ডলারের বিনিময় হার বেড়ে যাওয়ায় শর্তযুক্ত বিদেশী ঋণগুলোর ব্যয় ২০-২৫ শতাংশ বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানান মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান। তিনি বলেন, গত এক বছরে দেশে টাকার প্রায় ২৫ শতাংশ অবমূল্যায়ন হয়েছে। এ কারণে যে কোম্পানি ১০০ কোটি টাকার বিদেশী ঋণ নিয়েছিল, সেটি এরই মধ্যে ১২৫ কোটি টাকা হয়ে গিয়েছে। যেসব কোম্পানির রফতানি আয় আছে, তারা বিনিময় হারজনিত ক্ষতি থেকে মুক্ত থাকবে। তবে এসওএফআর ও লাইবরের সুদহার বেড়ে যাওয়ায় এ ধরনের কোম্পানিগুলোকে অতিরিক্ত দুই-তিন গুণ সুদ গুনতে হবে। কিন্তু যেসব কোম্পানির ডলারে আয় নেই, সেসব কোম্পানির পরিস্থিতি খুবই খারাপ। সরকারি কিংবা বেসরকারি বিদেশী ঋণ পরিশোধের ব্যয় ২০-২৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে।

17/04/2022

স্বাস্থ্যখাতে গবেষণা যেভাবে বছরের পর বছর ধরে উপেক্ষিত
মন্ত্রণালয় ৬০০টি গবেষণা প্রস্তাব থেকে বেছে নিতে পারছে না বলে, বিগত অর্থবছরের মতো এবারও ১০০ কোটি টাকা ফেরত দিতে চলেছে

ধীরে-সুস্থ চলার নীতি শেষপর্যন্ত হয়তো অনেক দৌড়ে আমাদের এগিয়ে নিয়ে যায়, কিন্তু মহামারি মোকাবিলার ক্ষেত্রে তা সব সেরা কৌশল নয়।

মহামারি যখন হানা দেয় তখন বিশ্বজুড়ে গবেষকরা নতুন করোনাভাইরাসের বৈশিষ্ট্য জানতে উঠেপড়ে লেগেছিলেন, বাংলাদেশের স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষও নিজস্ব গবেষণার উদ্যোগ নেয়।

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় ২০২০-২১ অর্থবছরে শুধুমাত্র দেশের স্বাস্থ্য খাতে গবেষণার জন্য ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছিল। এই বরাদ্দ ছিল বিস্ময়কর অঙ্কের, কারণ ২০১৯-২০ অর্থবছরে প্রথম যখন এ বরাদ্দের ঘোষণা দেওয়া হয়- তখন পরিমাণ ছিল মাত্র ৫ কোটি টাকা।

এত বিপুল বরাদ্দে দেশের গবেষকরা আশায় বুক বেঁধেছিলেন। ভেবেছিলেন, এবার হয়তো কোভিড-১৯ মোকাবিলার লড়াই জোরদার হলো!

দুর্ভাগ্যবশত, মন্ত্রণালয়ের প্রস্তুতির অভাব এবং আমলাতান্ত্রিক লাল ফিতার দৌরাত্মে- যা দেশের প্রায় সব খাতে এক ধ্রুব সত্য- শেষমেষ একটি টাকাও বরাদ্দ হয়নি।

২০২১-২২ অর্থবছরে, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় আবার গবেষণার জন্য ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে।

কিন্তু এই অর্থবছর শেষ হতে তিন মাস বাকি থাকলেও, মন্ত্রণালয় এখনও একটি গবেষণা প্রস্তাব অনুমোদন করতে, বাছাই প্রক্রিয়া চূড়ান্ত বা কোনো অর্থ বিতরণ করতে না পারায়- এবারও আগের ভুল থেকে কোনো শিক্ষা নেওয়া হয়নি বলে মনে হচ্ছে।

মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রথমবার কোনো অর্থ বিতরণ করতে ব্যর্থ হওয়ার অজুহাত ছিল গবেষণার অর্থ কীভাবে ব্যয় করা হবে- সে বিষয়ে কোনো নীতিমালা ছিল না। এরপর একটি খসড়া নীতিমালা তৈরি করতে অর্থ মন্ত্রণালয় পাঁচ মাস সময় নিয়েছে। নীতিমালা জারি করতে, আরও চার মাস সময় নেয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। এবং সবশেষে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় গবেষণা নির্বাচক (বাছাই) ও জাতীয় কমিটি গঠন করে।

এসব কিছু হতে হতেই শেষ হয়ে যায় অর্থবছর, কিন্তু গবেষণা প্রস্তাব চায়নি মন্ত্রণালয়।

এই অর্থবছরেও অনুরূপ দৃশ্যের দেখা মিলতে পারে।

তহবিল অনুমোদনের জন্য অনেকে যারা গবেষণা প্রস্তাব জমা দিয়েছেন, তাদের মধ্যে একজন হচ্ছেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. জাহিদুর রহমান।

তিনি দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, "করোনাভাইরাস ও কোভিড ভ্যাকসিন যেহেতু একটি নতুন বিষয়, তাই চিকিৎসা গবেষণায় এটি অনেক গুরুত্ব পায়। প্রাদুর্ভাবের সময় চারদিকে অনেক ডেটা ছিল, কিন্তু অর্থের অভাবে আমরা গবেষণা করতে পারিনি। কারণ সরকারি মেডিকেল কলেজের শিক্ষকদের গবেষণার জন্য এক টাকাও বরাদ্দ নেই। কিন্তু গবেষণায় যখন ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়, তখন আমরা আশাবাদী হই।"

"গবেষণার প্রস্তাব চেয়ে দেওয়া সার্কুলারে বলা হয়, স্বল্প সময়ের মধ্যে যাচাই-বাছাই শেষ করে অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হবে। কিন্তু প্রস্তাব জমা দেয়ার এতদিন পরও কর্তৃপক্ষের কোনো সাড়া মেলেনি। ফলে আমরা বুঝতে পারছি না, আদৌ গবেষণাটি করা যাবে কিনা"- যোগ করেন তিনি।

হেলায় হারানো সুযোগ

সমন্বিত স্বাস্থ্য বিজ্ঞান গবেষণা ও উন্নয়ন তহবিল কার্যক্রম পরিচালনা সম্পর্কিত নীতিমালা ২০২১ (সংশোধিত) এর আওতায় গত বছরের ২২ জুন প্রজ্ঞাপন জারি করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। ডেডলাইন নির্ধারণ করা হয় ২০২১ সালের ১ জুলাই। সে অনুযায়ী ৬০০টির বেশি গবেষণা প্রস্তাব জমা পড়েছে।

নীতিমালা অনুযায়ী, গবেষণার জন্য প্রাপ্ত আবেদন ৩০ দিনের মধ্যে বাছাই (কারিগরি) কমিটির নিকট পাঠাতে হবে। তারা যাচাই-বাছাই শেষে বাছাইকৃত গবেষণা প্রস্তাব এর তালিকা ১৫ দিনের মধ্যে অ্যাওয়ার্ড (জাতীয়) কমিটিতে অনুমোদনের জন্য পেশ করবে।

অ্যাওয়ার্ড কমিটি বাছাই কমিটির সুপারিশকৃত গবেষণা প্রস্তাবের পর্যালোচনা করে যোগ্য প্রটোকলের ওপর ৩০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত মতামত দেবে এবং এর ৭ দিনের মধ্যে নির্বাচিতদের জানিয়ে দেবে।

পুরো প্রক্রিয়াটি আড়াই মাসের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও, নয় মাস পেরিয়ে গেলেও এখনও তা করাই হয়নি।

ডা.জাহিদুর রহমান আরও বলেন, "আগে গবেষণার সুযোগ ছিল না। কিন্তু এখন বরাদ্দ আছে। আমরা চাই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এটি বিতরণ করা হোক, যাতে আমাদের মতো গবেষকরা কাজ শুরু করতে পারেন।"

গবেষকদের আশঙ্কা, বিলম্বের কারণে আগের গবেষণা প্রস্তাবগুলি পুরানো হয়ে গেছে এবং মহামারি-প্রস্তুতি এবং সম্ভাব্য টিকাগুলির জন্য তথ্য সংগ্রহের সুযোগ এখন হারিয়ে গেছে।

কারো কারো আশঙ্কা, তহবিল বিতরণে বিলম্বের ফলে গবেষণা পরিচালনা ও ফলাফল জমা দেওয়ার সময়ও কম পাওয়া যাবে, যাতে উৎসাহিত হবে অনুকরণ প্রবণতা বা 'কপি-পেস্ট গবেষণা'।

নীতিমালা অনুযায়ী, দুই বছরের মধ্যে গবেষণা শেষ করতে হবে এবং তিন কিস্তিতে অনুদান দেওয়া হবে।

ইউনিভার্সিটি মেডিকেল কলেজের গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান ও অ্যাওয়ার্ড (জাতীয়) কমিটির সদস্য অধ্যাপক ডা. রিজওয়ানুর রহমান টিবিএসকে বলেন, "৬০০টিরও বেশি প্রস্তাব জমা পড়েছে। সেগুলো যাচাই-বাছাই করা হয়েছে এবং শিগগিরই তহবিল বরাদ্দ করা হবে।"

সূত্রগুলি জানায়, ৬০টি প্রস্তাব বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের এবং ৫০টির বেশি প্রস্তাব আইসিডিডিআরবি-এর। বেশিরভাগ গবেষক ৪০ লাখ থেকে ১০ কোটি টাকা বরাদ্দ চেয়েছেন।

সময়ের বিরুদ্ধে দৌড়

দ্রুত সময় ফুরিয়ে আসলেও, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এখনও আগামী তিন মাসের মধ্যে তহবিল বিতরণের বিষয়ে আশাবাদী। তবে কিছু বিশেষজ্ঞ মনে করেন, তা বাস্তবায়নে অনেক কিছুর করার রয়েছে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক ডা. মো. শরফুদ্দিন আহমেদ বলেন, "চলতি অর্থবছর ৩০ জুন শেষ হবে, তাই বাছাই প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করতে হবে। এজন্য প্রয়োজনে বিশেষ ব্যবস্থা নিতে হবে।"

স্বাস্থ্য খাতে গবেষণা তহবিল সংক্রান্ত জাতীয় কমিটির একটি সূত্র টিবিএসকে জানিয়েছে, "৬০০টিরও বেশি প্রস্তাব জমা দেওয়া হয়েছিল এবং তাদের বেশিরভাগই ছিল খুব ভাল। প্রস্তাবগুলো যাচাই করতে সময় লেগেছে। বাছাই কমিটির অধিকাংশ সদস্যই চিকিৎসক। তাদের পেশাদার কাজের পাশাপাশি এই যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়াটি করতে হয়, এজন্য সময় লেগেছে।"

তিনি আরো জানান, "মন্ত্রণালয়ে বসার সমস্যা, কম্পিউটার এবং সহায়ক জনবলের অভাবসহ অনেক সমস্যা রয়েছে, যেগুলোও বিলম্বের কারণ।"

মো. আহসান কবির যুগ্মসচিব (চিকিৎসা শিক্ষা) এবং সমন্বিত স্বাস্থ্য বিজ্ঞান গবেষণা ও উন্নয়ন তহবিল ব্যবস্থাপনার জাতীয় বাচাই কমিটির সদস্য সচিব বলেন, যাচাই-বাছাই শেষ হয়েছে শিগগিরই অ্যাওয়ার্ড (বরাদ্দ) দেওয়া হবে। এ মাসে জাতীয় কমিটির সভা আছে, সেদিন অ্যাওয়ার্ড দেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। আমরা আশা করছি, চলতি অর্থবছরের মধ্যে গবেষণার অর্থবরাদ্দ দেওয়া যাবে। এবছর আর অর্থ ফেরত যাবে না।"

বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ডা. এহতেশামুল হক চৌধুরী বলেন, "গত বছর গবেষণার বরাদ্দের ১০০ কোটি টাকা কীভাবে ব্যয় হবে তার সুনির্দিষ্ট নীতিমালা না থাকায় ব্যয় করা যায়নি। তবে এ বছর একটি নীতিমালা রয়েছে। সুতরাং, কর্তৃপক্ষ যদি অর্থ ব্যয় করতে না পারে, তাহলে এটি একটি ব্যর্থতাই হবে।"

Photos from Bangladesh Public Health and Health Economics Research Center's post 04/12/2021

রাজধানীর যানজটে প্রত্যক্ষ ক্ষতি জিডিপির ২.৫%

নিজস্ব প্রতিবেদক
ডিসেম্বর ০৩, ২০২১

উন্নয়ন কার্যক্রম ও সড়ক অবকাঠামো অপর্যাপ্ততায় রাজধানীর যানজট ক্রমেই অসহনীয় হয়ে উঠেছে। দেশের সার্বিক অর্থনীতিতেও এর প্রভাব এখন ক্রমেই দৃশ্যমান হয়ে উঠছে। বিভিন্ন গবেষণা প্রতিবেদনেও উঠে আসছে, অর্থনীতিতে রক্তক্ষরণের কারণ হয়ে উঠছে অতিমাত্রায় যানজট। সর্বশেষ বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) চলমান সম্মেলনে উপস্থাপিত এক প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, শুধু রাজধানীর যানজটের কারণেই প্রতি বছর প্রত্যক্ষ ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় আড়াই শতাংশে। পরোক্ষ লোকসান যুক্ত হলে এ ক্ষতি পৌঁছায় ৬ শতাংশের কাছাকাছিতে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকার নগরায়ণ ঘটেছে পুরোপুরি অপরিকল্পিতভাবে। নগরের জনসংখ্যাও বেড়েছে দ্রুতগতিতে। কিন্তু নগরের পরিবহন ও যোগাযোগ অবকাঠামো ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন এর সঙ্গে সংগতিপূর্ণভাবে হয়নি। ফলে যানজট পরিস্থিতি দিনে দিনে আরো খারাপের দিকে গিয়েছে।

বিআইডিএসের বার্ষিক সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনে গতকাল পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই) উপস্থাপিত গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, ঢাকার যানজটের কারণে দেশের জিডিপিতে প্রতি বছর ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে ২ দশমিক ৫ শতাংশে। পরোক্ষ ক্ষতি যোগ করে এর পরিমাণ দাঁড়ায় ৫ দশমিক ৮ শতাংশে। অর্থনীতির এ ক্ষতকে আরো গভীর করে তুলেছে রাজধানীর অপরিকল্পিত নগরায়ণ। শুধু এ কারণেই ক্ষতি হয় জিডিপির প্রায় ৬ শতাংশ।

‘ঢাকাস ওভারগ্রোথ অ্যান্ড ইটস কস্টস’ শীর্ষক গবেষণাটি করেছেন বিশ্বব্যাংকের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট ও পিআরআইয়ের পরিচালক ড. আহমেদ আহসান। গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপনকালে তিনি বলেন, রাজধানীতে যানবাহনের চাপ তুলনামূলকভাবে বেশি গাবতলী, সায়েন্স ল্যাব, এয়ারপোর্ট রোড, কুড়িল বিশ্বরোড, গুলশান ২ নম্বর, মহাখালী, ফার্মগেট, কারওয়ান বাজার, কাকরাইল, জিরো পয়েন্ট, বুড়িগঙ্গা ব্রিজ ও পোস্তগোলা ব্রিজ এলাকায়। এর মধ্যে আবার যানবাহনের চাপ সবচেয়ে বেশি এয়ারপোর্ট রোড, মহাখালী ও ফার্মগেট এলাকায়। রাজধানীর রাস্তাগুলোয় সবচেয়ে বেশিসংখ্যক যান চলাচল করে সন্ধ্যা ৬টায়। এ সময় প্রায় ১২ হাজার যানের চাপ পড়ে রাস্তাগুলোয়। রাত ৩টায় সবচেয়ে কম, দেড় হাজার যান চলাচল করে। মূলত সকাল ৬টা থেকে যানবাহনের চাপ বাড়তে থাকে। এ সময় কর্মক্ষেত্রে যাওয়ার জন্য অপেক্ষমাণ রাজধানীবাসীর যাতায়াত শুরু হয়। সকাল সাড়ে ৮টা নাগাদ যানবাহনের চাপ বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ১০ হাজারে। এরপর তা কিছুটা কমলেও বেলা ২টার পর বাড়তে থাকে।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (্এআরআই) পরিচালক অধ্যাপক ড. মো. হাদীউজ্জামান এ প্রসঙ্গে বলেন, যানজটের পেছনে ঢাকার দুর্বল পরিবহন ব্যবস্থাপনা ও যোগাযোগ অবকাঠামো দায়ী। ঢাকা শহরের রাস্তাগুলোয় যে পরিমাণ গাড়ি চলাচলের ক্ষমতা, বাস্তবে গাড়ি চলাচল করে তার ৩০-৪০ শতাংশ বেশি। ঢাকায় যত যানজট হয়, তার ৩০ শতাংশের জন্য দায়ী পার্কিং ব্যবস্থাপনায় বিশৃঙ্খলা।

ঢাকার পরিবহন ব্যবস্থাপনাটি এখন ‘আইসিইউ’তে চলে গিয়েছে মন্তব্য করে তিনি আরো বলেন, ঢাকার পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নে নতুন নতুন অবকাঠামো গড়ে উঠছে। কিন্তু সেগুলোর ব্যবস্থাপনা ভালো নয়। ব্যবস্থাপনা ভালো না হলে যতই অবকাঠামো গড়ে তোলা হোক না কেন তার পূর্ণ সুফল পাওয়া যাবে না। ঢাকার পরিবহন ও পরিবহন সম্পর্কিত অবকাঠামোর ব্যবস্থাপনা এখনো প্রাথমিক পর্যায়েই রয়ে গেছে। এ অবস্থা থেকে বের হতে হলে আমাদের ঢাকার সঠিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও পরিবহন ব্যবস্থাপনা, পথচারীবান্ধব অবকাঠামো গড়ে তোলা, উন্নত গণপরিবহন প্রবর্তন, গণপরিবহনের জন্য আলাদা লেনের ব্যবস্থা, ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ন্ত্রণ, পার্কিং ব্যবস্থাপনা উন্নয়নের পাশাপাশি সড়ক ব্যবহারীদেরও মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন ঘটানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।

বিআইডিএসের মহাপরিচালক ড. বিনায়ক সেন এ প্রসঙ্গে বলেন, রাজধানীতে যানজটের কারণে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জিডিপির ৬-১০ শতাংশ ক্ষতি কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। রাজধানীর উন্নয়ন ব্যয় সামাজিকভাবে সর্বোচ্চ দক্ষতার সুফল দিচ্ছে না। ফলে ঢাকার ওভারগ্রোথ ও অর্থনৈতিক ক্ষতির বিষয়গুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। নীতিনির্ধারকদের উচিত এটিকে গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা। গবেষণার সুপারিশগুলো বাস্তবায়নের মাধ্যমে সমস্যা সমাধানে প্রয়োজনীয় কর্মপন্থা দ্রুত গ্রহণ করতে হবে।

কয়েক বছর আগে বিশ্বব্যাংকের এক গবেষণা প্রতিবেদনেও যানজটের কারণে অর্থনীতির ক্ষত বড় হওয়ার তথ্য উঠে এসেছিল। এতে বলা হয়, যানজটের কারণে ঢাকায় দৈনিক ৩২ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। যানজটে ঢাকার যোগাযোগ প্রক্রিয়া স্থবির হয়ে পড়ার বিষয়টি দিনে দিনে আরো জোরালো হয়ে উঠছে, যা বসবাসযোগ্যতার দিক থেকে রাজধানীকে নামিয়ে আনছে নিচের সারিতে।

পিআরআইয়ের গবেষণা প্রতিবেদনে নগরের জনসংখ্যা চাপের বিষয়টিও উঠে এসেছে। এতে বলা হয়েছে, দেশের শহুরে জনগোষ্ঠীর অধিকাংশই বাস করে ঢাকায়। দেশের মোট জনসংখ্যা এরই মধ্যে ১৬ কোটি ৩০ লাখ ছাড়িয়েছে। এর মধ্যে আবার ঢাকায় বসবাস করছে ১ কোটি ৮৯ লাখ মানুষ। সে হিসেবে দেশের মোট শহুরে জনসংখ্যার প্রায় ৩২ শতাংশ এখন বসবাস করছে রাজধানীতে।

বিপুল পরিমাণ এ জনসংখ্যা ঢাকাকেন্দ্রিক হওয়ার পেছনে অন্যান্য বড় শহর গড়ে না ওঠাকেই দায়ী করা হয়েছে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ১০ লাখের বেশি মানুষ বাস করে এমন শহর বাংলাদেশে মাত্র পাঁচটি। অন্যদিকে চীনে এমন শহরের সংখ্যা ১০২। এছাড়া ভারতে ৫৪, ইন্দোনেশিয়ায় ১৪, পাকিস্তানে ১০ ও ভিয়েতনামে সাতটি এমন শহর রয়েছে।

এ বিষয়ে গবেষক ড. আহমেদ আহসান বলেন, বাংলাদেশের উন্নয়ন কার্যক্রমের অধিকাংশ ঢাকাকেন্দ্রিক। ফলে অন্যান্য শহরে উন্নয়নের ঘাটতি থাকছে। দেশের বেশির ভাগ অর্থনৈতিক কার্যক্রম ঢাকাকেন্দ্রিক হওয়ায় সার্বিকভাবে দেশে নগর উন্নয়ন স্থবির হয়ে আছে। বিষয়টি সমাধানের জন্য শহর ও অন্যান্য অঞ্চলের উন্নয়নের দিকে মনোযোগ দেয়া উচিত। সরকারি সেবার মান ও বিনিয়োগের পরিবেশকে আরো ভালো করতে হবে।

প্রতিবেদনে উঠে আসে, ঢাকায় অতিরিক্ত কেন্দ্রীভবনের কারণে এখন বিদ্যুৎ ব্যবহারের দিক থেকে দেশের অন্যান্য শহর পিছিয়ে রয়েছে। যদিও বাংলাদেশে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার প্রায় ৫০ শতাংশই অব্যবহূত থাকছে। আবার দারিদ্র্য নিরসনের হার শহরাঞ্চলে কম আর গ্রামে বেশি। এ হার জাতীয় হারের চেয়ে গ্রামে বেশি। এছাড়া শহরে শ্রমিকদের মজুরি হারের প্রবৃদ্ধি কমছে। আগে যেখানে প্রবৃদ্ধির হার ১২ শতাংশ ছিল, এখন সেটি কমে ৮ শতাংশে নেমেছে।

এসব সমস্যা নিরসনে নীতিনির্ধারকদের উদ্দেশে অর্থনৈতিক কমিশন গঠনের মাধ্যমে বিকেন্দ্রীকরণ প্রক্রিয়া চালুর সুপারিশ করেছেন ড. আহমেদ আহসান। তার ভাষ্যমতে, নগর প্রশাসনের হাতে নীতিনির্ধারণী ক্ষমতা দেয়া প্রয়োজন। এছাড়া বিকেন্দ্রীকরণ-সংক্রান্ত আইন বাস্তবায়ন করতে হবে।

নগরের উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধির জায়গাগুলো এবং নীতিমালা নিয়ে গবেষণার মাত্রা বাড়ানোর সুপারিশ করে তিনি বলেন, এগুলো সহজেই সমাধানযোগ্য সমস্যা।

রাজধানীর লেকশোর হোটেলে আয়োজিত ‘অ্যানুয়াল বিআইডিএস কনফারেন্স অন ডেভেলপমেন্ট-২০২১ (এবিসিডি): সেলিব্রেটিং ৫০ ইয়ার্স অব বাংলাদেশ’ শীর্ষক সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনে গবেষণা প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করা হয়। এ নিয়ে বিশেষজ্ঞদের আলোচনায় আরো উঠে আসে, ঢাকার নগরায়ণ কেন্দ্র থেকে প্রথমে উত্তরে, তারপর পশ্চিমে সম্প্রসারণ হয়েছে। পূর্ব দিকের বেশির ভাগ এলাকা এখনো গ্রামীণ। এসব এলাকার দ্রুত উন্নয়ন ও বিকাশের সুযোগ রয়েছে। যথাযথ পরিকল্পনা ও তা বাস্তবায়নের মাধ্যমে পূর্ব ঢাকাকে প্রাণচঞ্চল কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব। কিন্তু সঠিক ব্যবস্থাপনা না হলে রাজধানী যানজট, বন্যা ও ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে বসবাসের অনুপযুক্ত হয়ে উঠবে।

04/12/2021

housing and health related

লাগামছাড়া নির্মাণসামগ্রীর দাম: স্বল্প সঞ্চয়ীদের বাড়ি বানানো এখন দুঃস্বপ্ন
রেজাউল রেজা

মহামারীর ধকল কাটিয়ে দেশের অর্থনীতির চাকা সচল হওয়ার পাশাপাশি চলতি মৌসুমে (অক্টোবর থেকে শুরু হয়েছে) নির্মাণ খাতেও প্রাণ ফিরতে শুরু করে; কিন্তু তাতে বাদ সেধেছে নির্মাণসামগ্রীর চড়া দাম। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিগত ছয় মাসের ব্যবধানে ভবন নির্মাণ ব্যয় বেশ বেড়েছে। শীতের মৌসুম শুরু হলেও দাম এখনো কমছে না। এতে নির্মাণ খাতের সঙ্গে জড়িতরা পড়েছেন বিপাকে। ফ্ল্যাটের দামও বাড়ছে। অন্যদিকে স্বল্প সঞ্চয়ীদের বাড়ি নির্মাণের বহুদিনের লালিত স্বপ্ন এখন দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে।

রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) সহসভাপতি কামাল মাহমুদ আমাদের সময়কে বলেন, অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ভবন তৈরির প্রধান মৌসুম। এই সময়ে আবাসন খাতসহ ব্যক্তি পর্যায়েও ভবন নির্মাণের কাজ বেশি হয়ে থাকে। সাধারণত এ সময় নির্মাণসামগ্রীর দামও তুলনামূলক কম থাকে; কিন্তু এবার মৌসুমের দুই মাস পার হয়ে গেলেও দাম কমার লক্ষণ দেখছি না। এ নিয়ে আবাসন শিল্পের সঙ্গে জড়িত ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তারা দুশ্চিন্তায় রয়েছেন। বাড়তি ব্যয়ের চাপে অনেক ডেভেলপারের কাজ এখন মাঝপথেই বন্ধ রয়েছে। তিনি আরও বলেন, বিগত ছয় মাসে রড, সিমেন্ট, ইট, পাথর থেকে শুরু করে প্রতিটি নির্মাণসামগ্রীর দাম বেড়েছে। এক বছরের ব্যবধানে দাম বাড়ার এ হার আরও বেশি। এর মধ্যে সব থেকে বেশি বেড়েছে রডের দাম। ৩০ শতাংশেরও বেশি বেড়ে প্রতি টন রডের দাম ৮২ হাজার টাকা পর্যন্ত পৌঁছেছে। পাথরও ১৫ থেকে ২০ শতাংশ বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া অন্য নির্মাণসামগ্রীতে দাম কমপক্ষে ১০ শতাংশ বাড়তি রয়েছে।

নির্মাণসামগ্রীর দাম লাফিয়ে বাড়তে থাকায় ভবন নির্মাণকাজ অসমাপ্তই রয়ে গেছে রাজধানীর সবুজবাগ দক্ষিণগাঁও এলাকার বাসিন্দা নুরু মোহাম্মদ গাজীর। পেশাজীবনের সবটুকু সঞ্চয় দিয়ে সাড়ে তিন কাঠা জমিতে বসবাসের জন্য স্বপ্নের ভবন নির্মাণের কাজ হাতে নিয়ে কেবল ফাউন্ডেশনের কাজটুকুই শেষ করতে পেরেছেন। নুরু মোহাম্মদ বলেন, ধারণা করেছিলাম সব মিলিয়ে ৪৫ থেকে ৪৮ লাখের মধ্যে ভবনের ফাউন্ডেশন শেষ করতে পারব; কিন্তু নির্মাণসামগ্রীর দাম বেড়ে যাওয়ায় খরচ হয়ে গেছে ৫৩ লাখের বেশি টাকা।


নুরু বলেন, বাড়ির কাজ শুরুর সময় একেএস রডের টন ৬৮ হাজার টাকায় পেলেও গত মাসে কিনতে হয়েছে ৭৫ হাজার টাকায়। এখন তা আরও বেড়েছে। আগে এক ট্রাক ইট ২৭ হাজার ৫০০ টাকায় পেয়েছি। এখন ৩২ হাজার টাকা দিয়ে কিনতে হচ্ছে। এখন ট্রাকপ্রতি যমুনা বালুর দাম ৫ হাজার ৫০০ টাকা, পাকশি বালুর দাম ৬ হাজার ৫০০ থেকে ৭ হাজার টাকা। পাথর প্রতি বর্গফুট আগে ১৮৫ টাকায় পেলেও গত মাসে কিনেছি ২১০ টাকায়। এত চড়া বাজারে আমাদের মতো স্বল্পসঞ্চয়ী মানুষের পক্ষে বাড়ির কাজ শেষ করা এখন দুঃস্বপ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

নির্মাণসামগ্রী সরবরাহকারী, ডিলার-পাইকারি ও খুচরা বাজারমূল্যের পাশাপাশি ইট-বালি-সিমেন্ট ব্যবসায়ী, অন্য নির্মাণসামগ্রী বিক্রয়কারীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গেল বছরের চেয়ে বাজার এখন অনেক চড়া। রাজধানীর মাতুয়াইল এলাকার মেসার্স ফরহাদ এন্টারপ্রাইজের ব্যবসায়ী মো. ফরহাদ হোসেন বলেন, সবচেয়ে বেশি বেড়েছে রড ও পাথরের দাম। সিমেন্টের দাম তুলনামূলক কম বাড়লেও ইট ও বালুর দাম স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি। বর্তমানে প্রতি টন রডের দাম ৭৮ হাজার থেকে ৭৯ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি করছি। আরেকটু ভালো মানের রড কিনতে ৮১ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত খরচ পড়বে। গত সপ্তাহে ৭৭ হাজার টাকা টন বিক্রি করেছি। ছয় মাস আগে বিক্রি করেছি ৬৮ হাজার ৫০০ টাকা এবং গত বছর এমন সময় ছিল ৫৪-৫৫ হাজার টাকা।

যাত্রাবাড়ীর বিসমিল্লাহ্ ইন্টারন্যাশনাল ট্রেডিং করপোরেশনের ব্যবসায়ী মাহমুদুল হাসান মাসুদও বলেন, রডের দাম বেড়ে সাম্প্রতিক সময়ে সর্বোচ্চ দামে পৌঁছেছে। কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়ায় রডের দাম না হয় বেড়েছে; কিন্তু মৌসুমের মধ্যেও ইটের দাম কমছে না। এখন এক ট্রাক (৩ হাজার পিস) ইটের দাম পড়ছে ৩০ থেকে ৩১ হাজার টাকা, যেখানে এমন সময় দাম আরও কম থাকার কথা। পাথরের দাম প্রতি বর্গফুট ২১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে এখন। ছয় মাস আগে যা ১৭০ টাকায় বিক্রি করেছি।

মাতুয়াইল, রায়েরবাগ, যাত্রাবাড়ী ও গাবতলী আমিনবাজারসহ বেশকিছু এলাকার ইট-বালু-পাথর ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আস্তর বালুর ট্রাকপ্রতি (২০০ ফুট) খরচ পড়ছে তিন থেকে তিন হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত। তুলনামূলক ভালোমানের আস্তর বালুর ক্ষেত্রে ট্রাকপ্রতি দাম পাঁচ হাজার টাকা থেকে শুরু। প্রতি ট্রাক সিলেকশন বালুর (লাল) দাম ৭ হাজার টাকা থেকে শুরু করে বিভিন্ন দামে বিক্রি হচ্ছে। তবে সিমেন্টের দাম তুলনামূলক কম বেড়েছে। প্রতিবস্তা সিমেন্টের (৫০ কেজি) পেছনে এখন খরচ পড়ছে ৪৩০ থেকে ৪৫০ টাকা পর্যন্ত। ছয় মাস আগেও পাওয়া গেছে ৪০৫ থেকে ৪২০ টাকার মধ্যে। থাই গ্লাস, অ্যালুমিনিয়াম পণ্যের দোকানগুলোয় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ১০ থেকে ২০ শতাংশ দাম বেশি রয়েছে এখন।

সরকারি বিপণন সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্যও বলছে, রডের দাম গত এক মাসেই বেড়েছে ৭ দশমিক ২৬ শতাংশ এবং বছরের ব্যবধানে বেড়েছে ৩২ দশমিক ৯২ শতাংশ। টিসিবির হিসাবে বর্তমানে প্রতি টন এমএস রডের (৬০ গ্রেড) দাম ৭৮ হাজার থেকে ৮১ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত। গত বছর একই সময়ে এর দাম ছিল ৫৪ হাজার থেকে ৬৬ হাজার টাকা।

নির্মাণসামগ্রীর অব্যাহত দাম বৃদ্ধিতে এ খাতের শিল্পোদ্যোক্তারা দুশ্চিন্তায় রয়েছেন বলে জানিয়েছে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইর নির্মাণ খাতবিষয়ক স্ট্যান্ডিং কমিটি। গত ২৮ নভেম্বর খাতসংশ্লিষ্টদের সঙ্গে এক বৈঠকে স্ট্যাডিং কমিটি জানায়, করোনার প্রকোপ কমে আসায় নির্মাণ খাত ঘুরে দাঁড়ানোর আশা করেছিলেন এ খাতের শিল্পোদ্যোক্তারা; কিন্তু নির্মাণসামগ্রীর অব্যাহত দাম বৃদ্ধিতে উল্টো বিপাকে পড়েছেন। বর্তমানে নির্মাণসামগ্রীর দাম প্রায় ২০ থেকে ২৫ শতাংশ বেড়ে গেছে। ফলে খাতসংশ্লিষ্টদের বড় লোকসানে পড়তে হচ্ছে।

এফবিসিসিআইয়ের পরিচালক এবং জেসিএক্স ডেভেলপমেন্ট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইকবাল হোসেন চৌধুরী আমাদের সময়কে বলেন, করোনার ফলে এক বছরেরও বেশি সময় ব্যবসা বন্ধ ছিল। ভাইরাসের প্রকোপ কমায় ঠিক যখন ব্যবসায় ফিরতে শুরু করেছি, তখনই নির্মাণসামগ্রীর দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। একদিকে করোনায় মানুষের আর্থিক সামর্থ্য হ্রাস পাওয়ায় ফ্ল্যাটের ক্রেতা অর্ধেক কমে গেছে, অন্যদিকে ভবন নির্মাণ খরচ বৃদ্ধির ফলে বিগত ছয় মাসে আমরা ফ্লাটের দাম ১০ শতাংশ বাড়াতে বাধ্য হয়েছি। এতে বিক্রিও কমে যাচ্ছে। ফলে নতুন প্রজেক্ট দূরে থাক, চলমান প্রজেক্ট শেষ করতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, কিচেন ও বাথরুম ফিটিংয়ের দাম অনেক বেড়েছে। ইনডোর ফিটিংসগুলোর দামও ১০ থেকে ২০ শতাংশ বেড়েছে। করোনায় পণ্য আমদানি ব্যাহত হওয়ায় বর্তমানে বাজারে অনেক নির্মাণসামগ্রীর ঘাটতি রয়েছে। তা ছাড়া প্রয়োজনীয় অনেক পণ্যও পাওয়া যাচ্ছে না। অন্যদিকে ফ্ল্যাটের ইনটেরিয়র খরচও ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে গেছে। তাই ভবন নির্মাণ খরচ ও ফ্ল্যাটের দাম দুটোই বেড়ে যাচ্ছে।

Want your school to be the top-listed School/college in Abdullapur?

Click here to claim your Sponsored Listing.

Location

Website

Address


Abdullapur