23/06/2026
স্ত্রীর পর্দা, নিরাপত্তা ও পৃথক বাসস্থানের অধিকার: ইসলামের দৃষ্টিতে স্বামীর দায়িত্ব
বিবাহ শুধু দু’জন মানুষের একত্রে বসবাসের নাম নয়; বরং এটি একটি আমানত, দায়িত্ব ও পারস্পরিক অধিকার সংরক্ষণের চুক্তি। ইসলামে স্বামীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো স্ত্রীর দ্বীন, ইজ্জত, নিরাপত্তা ও পর্দার পরিবেশ নিশ্চিত করা।
বর্তমান সমাজে বহু পরিবারে যৌথভাবে বসবাসের কারণে নারীদের পর্দা রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে দেবর, ভাসুর বা অন্যান্য গায়রে মাহরাম আত্মীয়দের সঙ্গে অবাধ মেলামেশা অনেক সময় ফিতনা ও পারিবারিক অশান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই ইসলামী শরীয়ত এ বিষয়ে অত্যন্ত সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশ দিয়েছে।
গায়রে মাহরাম আত্মীয়দের ব্যাপারে ইসলামের সতর্কবাণী
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
عَنْ عُقْبَةَ بْنِ عَامِرٍ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ قَالَ: إِيَّاكُمْ وَالدُّخُولَ عَلَى النِّسَاءِ، فَقَالَ رَجُلٌ مِنَ الْأَنْصَارِ: يَا رَسُولَ اللَّهِ أَفَرَأَيْتَ الْحَمْوَ؟ قَالَ: الْحَمْوُ الْمَوْتُ
অর্থঃ “তোমরা নারীদের নিকট (নির্জনে) প্রবেশ করা থেকে বিরত থাকো।” তখন এক আনসারী সাহাবী জিজ্ঞাসা করলেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল! দেবর বা স্বামীর নিকটাত্মীয় সম্পর্কে কী বলবেন?’ তিনি বললেন, ‘দেবর (বা ভাসুর) তো মৃত্যুতুল্য।’
— সহীহ আল-বুখারী, হাদিস: ৫২৩২; সহীহ মুসলিম, হাদিস: ২১৭২
উলামায়ে কেরাম ব্যাখ্যা করেছেন যে, ‘মৃত্যুতুল্য’ বলার অর্থ হলো—এদের ব্যাপারে মানুষ সাধারণত অসতর্ক থাকে। ফলে শয়তান সহজে ফিতনা সৃষ্টি করতে পারে এবং এর পরিণতি অনেক সময় একটি পরিবারের ধ্বংস পর্যন্ত গড়ায়।
পর্দা কেবল মাথায় কাপড় দেওয়ার নাম নয়
অনেকেই মনে করেন, মাথায় ওড়না বা কাপড় থাকলেই পর্দা সম্পন্ন হয়ে যায়। অথচ শরীয়তের পর্দা এর চেয়ে অনেক বিস্তৃত।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَقُل لِّلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ وَيَحْفَظْنَ فُرُوجَهُنَّ وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا مَا ظَهَرَ مِنْهَا
অর্থঃ “মুমিন নারীদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি অবনত রাখে, নিজেদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে এবং তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে, তবে যা স্বাভাবিকভাবেই প্রকাশ পায় তা ছাড়া।”
— সূরা আন-নূর, আয়াত: ৩১
পর্দার অন্তর্ভুক্ত হলো—
- গায়রে মাহরাম পুরুষদের সামনে সৌন্দর্য প্রকাশ না করা।
- অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা ও হাসি-ঠাট্টা থেকে বিরত থাকা।
- নির্জনে অবস্থান না করা।
- চলাফেরা ও পোশাকে শালীনতা বজায় রাখা।
- ফিতনার আশঙ্কা সৃষ্টি করে এমন পরিবেশ এড়িয়ে চলা।
স্ত্রীর জন্য পৃথক বাসস্থানের অধিকার
ফকীহগণ উল্লেখ করেছেন যে, স্ত্রীর মৌলিক অধিকারগুলোর একটি হলো এমন বাসস্থানের ব্যবস্থা, যেখানে তিনি নিরাপদে ও স্বাচ্ছন্দ্যে বসবাস করতে পারেন এবং নিজের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা করতে পারেন।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
أَسْكِنُوهُنَّ مِنْ حَيْثُ سَكَنتُم مِّن وُجْدِكُمْ
অর্থঃ “তোমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী যেখানে তোমরা বসবাস কর, সেখানে তাদেরও বসবাসের ব্যবস্থা কর।”
— সূরা আত-তালাক, আয়াত: ৬
ইসলামী আইনবিদগণ এ আয়াত থেকে স্ত্রীর জন্য উপযুক্ত ও নিরাপদ বাসস্থানের অধিকার প্রমাণ করেছেন।
যৌথ পরিবারে বসবাসের ক্ষেত্রে করণীয়
যদি কোনো কারণে যৌথ পরিবারে বসবাস করতেই হয়, তাহলে স্বামীর উচিত—
১. পৃথক ঘরের ব্যবস্থা করা
স্ত্রীর জন্য এমন কক্ষ নির্ধারণ করতে হবে, যেখানে তিনি নিরাপদে অবস্থান করতে পারেন এবং গায়রে মাহরামদের অবাধ যাতায়াত না থাকে।
২. পৃথক বাথরুম ও গোসলখানার ব্যবস্থা করা
এটি শুধু পর্দার বিষয় নয়; বরং ব্যক্তিগত মর্যাদা ও স্বাচ্ছন্দ্যের সঙ্গেও সম্পর্কিত।
৩. প্রবেশের আদব নিশ্চিত করা
আল্লাহ তাআলা বলেন—
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَدْخُلُوا بُيُوتًا غَيْرَ بُيُوتِكُمْ حَتَّىٰ تَسْتَأْنِسُوا وَتُسَلِّمُوا عَلَىٰ أَهْلِهَا
অর্থঃ “হে মুমিনগণ! তোমরা নিজেদের ঘর ছাড়া অন্য ঘরে প্রবেশ করো না, যতক্ষণ না অনুমতি গ্রহণ কর এবং অধিবাসীদের সালাম দাও।”
— সূরা আন-নূর, আয়াত: ২৭
সুতরাং পরিবারের সদস্যদেরও অনুমতি ছাড়া স্ত্রীর নির্ধারিত কক্ষে প্রবেশ করা উচিত নয়।
৪. আলাদা রান্না বা খাবারের ব্যবস্থা (প্রয়োজনে)
যদি পারিবারিক পরিবেশে দ্বন্দ্ব, অস্বস্তি বা পর্দা রক্ষার সমস্যা দেখা দেয়, তাহলে আলাদা রান্না বা খাবারের ব্যবস্থাও করা যেতে পারে।
৫. নির্জনতা থেকে বিরত রাখা
দেবর, ভাসুর বা অন্য গায়রে মাহরাম পুরুষের সঙ্গে স্ত্রীর নির্জনে অবস্থান করা শরীয়তে নিষিদ্ধ।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
لَا يَخْلُوَنَّ رَجُلٌ بِامْرَأَةٍ إِلَّا كَانَ الشَّيْطَانُ ثَالِثَهُمَا
অর্থঃ “কোনো পুরুষ কোনো নারীর সঙ্গে নির্জনে অবস্থান করবে না; কারণ তাদের তৃতীয়জন হয় শয়তান।”
— সুনান আত-তিরমিযী, হাদিস: ২১৬৫
বিয়ের পূর্বেই পরিকল্পনা করা জরুরি
অনেক সময় দেখা যায়, বিয়ের পর স্ত্রীকে এমন পরিবেশে রাখা হয় যেখানে তার জন্য পর্দা রক্ষা করা অত্যন্ত কঠিন। এতে দাম্পত্য জীবনে অশান্তি সৃষ্টি হয় এবং দ্বীনি অনুশীলন ব্যাহত হয়।
তাই একজন দায়িত্বশীল মুসলিম যুবকের উচিত বিয়ের আগেই চিন্তা করা—
- কোথায় স্ত্রীকে রাখা হবে?
- পর্দার পরিবেশ থাকবে কি না?
- গায়রে মাহরামদের থেকে নিরাপদ ব্যবস্থা আছে কি না?
- পৃথক ঘর ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা সম্ভব কি না?
কারণ একজন স্ত্রীকে শুধু ভরণ-পোষণ দিলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না; বরং তার ঈমান, পর্দা, মর্যাদা ও নিরাপত্তা রক্ষা করাও স্বামীর অন্যতম বড় দায়িত্ব।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
كُلُّكُمْ رَاعٍ وَكُلُّكُمْ مَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ
অর্থঃ “তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।”
— সহীহ আল-বুখারী, হাদিস: ৮৯৩; সহীহ মুসলিম, হাদিস: ১৮২৯
cp
:
#হাদিস
21/06/2026
20/06/2026
20/06/2026
18/06/2026
16/06/2026
16/06/2026
16/06/2026