06/02/2026
পঞ্চব্রহ্মের মধ্যে ব্রহ্মা সরস্বতীযুক্ত, বিষ্ণু লক্ষ্মীযুক্ত, রুদ্র গৌরীযুক্ত, ঈশ্বর (জীব) ঈশ্বরী (জীবশক্তি)-যুক্ত, সদাশিব মনোন্মনীযুক্ত এবং পরশিব পরাশক্তিযুক্ত। অন্তিম পরশিব ও পরাশক্তি বস্তুত উপলক্ষ্য নাম। এঁদের স্থলে সাধকের ইষ্ট মহাবিদ্যা ও তাঁর ভৈরবই পূজিত হন। যেমন—
কালীসাধকের পরশিব মহাকাল, পরাশক্তি কালী;
তারাসাধকের পরশিব উচ্ছিষ্টগণেশ (পিশাচ), পরাশক্তি তারা;
ত্রিপুরাসাধকের পরশিব কামেশ্বর, পরাশক্তি ত্রিপুরসুন্দরী;
ভুবনাসাধকের পরশিব ভুবনেশ্বর, পরাশক্তি ভুবনা;
ভৈরবীসাধকের পরশিব কামভৈরব, পরাশক্তি ভৈরবী;
ছিন্নমস্তাসাধকের পরশিব হেরুক, পরাশক্তি ছিন্নমস্তা;
ধূমাবতীসাধকের পরশিব শরভেশ্বর, পরাশক্তি জ্যেষ্ঠা;
বগলাসাধকের পরশিব ঘোররুদ্র, পরাশক্তি বগলামুখী;
শ্যামাসাধকের পরশিব সুন্দরেশ্বর, পরাশক্তি শ্যামা;
সুমুখীসাধকের পরশিব উচ্ছিষ্টগণেশ (বিবাহ), পরাশক্তি উচ্ছিষ্টচাণ্ডালিণী;
লঘুমাতঙ্গীসাধকের পরশিব বটুক, পরাশক্তি লঘুমাতঙ্গী;
বারাহীসাধকের পরশিব ধ্বনিতাণ্ডবেশ, পরাশক্তি মহাবারাহী;
কমলাসাধকের পরশিব নারায়ণ, পরাশক্তি মহালক্ষ্মী;
দুর্গাসাধকের পরশিব তুম্বুরু, পরাশক্তি দুর্গা…
এইরূপে সকল মহাবিদ্যাই পরাশক্তি, তাঁদের ভৈরবেরা অনুরূপভাবেই পরশিব।
এইরূপে ছয়চক্রের ছয়শিবকে অতিক্রম সাধকের আত্মা পরশিবময় গুরুময় সচ্চিদানন্দ ব্রহ্মপদে সুস্থিত হয়। তখন সাধকের আত্মাই পরশিব, এবং এই জগৎসংসারের সবই পরাশক্তি। সেই অবস্থায় সাধক যখন জগতের রসাস্বাদন করে, তখন তাকেই বলে জগদানন্দ। সম্ভোগের ক্রিয়াকে বলে সহজানন্দ, অথচ পদ্মপাতায় জলের মতো নির্লিপ্ত থেকে আত্মাতেই সন্তুষ্ট থেকে দ্রষ্টামাত্র হয়ে থাকাকে বলে স্বানন্দ।
দশমহাবিদ্যার সঙ্গে তাঁদের ভৈরবের সাধনার মূলরহস্য এখানেই।
এইবার, এই ভৈরবেতর শিবগণকে ওই ওই ভৈরব-ভৈরবীর অঙ্গদেবতারূপে পূজা করাই নিয়ম। সেখান থেকেই পঞ্চায়তন ভাবনা।
ব্রহ্মার স্থলে সূর্য বসেছেন;
বিষ্ণু স্থলে ক্ষীরোদকশায়ী উপেন্দ্র বিষ্ণু বসেছেন;
রুদ্রস্থলে কৈলাসবাসী ব্রহ্মপুত্র রুদ্র বসেছেন;
ঈশ্বরস্থলে জীবের চৈতন্যশক্তি স্বয়ং শক্তি বসেছেন এবং
সদাশিবস্থলে শিবশক্তিময় গণেশ বসেছেন।
(কোনো কোনো মতে পরশিবের স্থূলপ্রকাশ সুব্রহ্মণ্য। আবার কোনো কোনো মতে ঈশ্বর জীবতত্ত্ব হওয়ায় ঈশ্বরের স্থূলপ্রকাশই সুব্রহ্মণ্য, পরশিবের স্থূলপ্রকাশ শক্তি স্বয়ং। এটি ষণ্মতক্রমে মান্য।)
এইরূপে সুক্ষ্ম পঞ্চ-চক্রেশ্বরই স্থূল পঞ্চদেবতা হয়েছেন। আর তাই পঞ্চদেবতার বিন্যাসে মূল আরাধ্য মহাবিদ্যার ভৈরবের সঙ্গে পঞ্চদেবতার বিন্যাসকে আলাদা রাখা কর্তব্য। উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, এই পঞ্চদেবতাদের প্রত্যেকেরই রূপভেদে, মন্ত্রভেদে সেই সেই মহাবিদ্যার পতি-মূর্তি আছে। মহাবিদ্যার পতিরূপে ওই ওই পঞ্চদেবতা ব্রহ্মমূর্তি হয়ে যান, পরশিব হয়ে যান, আর মহাবিদ্যার অঙ্গবিদ্যারূপে তখন সেই সেই পঞ্চদেবতার স্থূল মূর্তি বসে।
পরশিবময় পরব্রহ্মমূর্তিগুলিই দেবতাদের কারণশরীর;
সদাশিবময় চক্রেশ্বরমূর্তিগুলিই দেবতাদের সুক্ষ্মশরীর এবং
দেবতারূপ স্বর্গবাসীমূর্তিগুলিই দেবতাদের স্থূলশরীর।
সাধক নিজে এই ত্রিদেহাতীত স্বয়ং পরব্রহ্ম। সাধকের ব্যষ্টি (সাধকসত্তা) এবং সমষ্টি (ঈশ্বর—ঐ ত্রিদেহ) সত্তার পরপারে যে আলম্বনহীন অনপেক্ষ কেবলসত্তা আছে, সেটিই সর্বকারণের পরমকারণ “ভগবান”।
সেই ভগবানই লীলা করবেন বলে কারণ, সুক্ষ্ম ও স্থূল শরীর ধারণ করে ঈশ্বর, জীব ও জগতের রচনা করে করে লীলা করে থাকেন। এই চক্র চলতে থাকে।
মহাবিদ্যাদের পঞ্চদেবতাসমণ্বিত সাধনা আমাদের সেই ব্রহ্মজ্ঞানই প্রদান করে।
চিত্রঋণ-- Anirban Roy এর আঁকা পরাশক্তি ত্রিপুরসুন্দরী কর্তৃক ত্রিদেহ ধারণ করে ত্রিমূর্তির জন্মদান।