Bangladesh on Record

Bangladesh on Record

Share

23/04/2026

জনগণের অধিকার আদায়ের বিরোধী ছিল মুসলিম লীগ, সে জন্য তাদের প্রতিষ্ঠা হয়নি

বাঙালি মুসলমানের ইতিহাস, পর্ব ৭
সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আবু জাফর শামসুদ্দীনের আত্মজৈবনিক সাক্ষাৎকার, পর্ব ৭

[ সাক্ষাৎকারটি জাতীয় জাদুঘরের কথ্য ইতিহাস প্রকল্পের আওতায় ১৯৮৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ড. সালাহউদ্দীন আহমদ ও ড. মুস্তাফা নূরউল ইসলাম নিয়েছিলেন]

মু নূ ই: আপনি বললেন যে আজাদ যখন প্রথম ঢাকায় আসে, অর্থাৎ কলকাতা থেকে তার চলে আসার কথা হয়, তখন নাজিমুদ্দিন সাহেব, হামিদুল হক চৌধুরী খুব পক্ষে ছিলেন না। আমার জিজ্ঞাসা হচ্ছে, কলকাতাকেন্দ্রিক মুসলিম লীগ পার্লামেন্টারি পার্টির যে রাজনীতি ছিল, সেখানে তো একদিকে ছিলেন হামিদুল হক চৌধুরী, মওলানা আকরম খাঁ, নাজিমুদ্দিন, মোহন মিয়া প্রমুখ এবং অন্যদিকে ছিলেন সোহরাওয়ার্দী সাহেব, আবুল হাশিম সাহেব প্রমুখ। তাহলে আজাদ পত্রিকাকে ঢাকায় আনতে তাঁরা আপত্তি করছিলেন কেন?

আ জা শা: তাঁদের এই আপত্তির পেছনে একটা মনস্তাত্ত্বিক কারণ ছিল বলে আমি মনে করি। মওলানা আকরম খাঁ পশ্চিম বাংলার লোক। মুসলিম লীগের কাগজ নিয়ে এখানে (কাগজ তো একটা বড় অস্ত্র) এসে তাঁদের ওপর প্রভুত্ব করবেন, এটা বোধ হয় তাঁরা চাননি। মোহন মিয়া চাননি। হামিদুল হক চৌধুরীও চাননি। নাজিমুদ্দিনও চাননি। মুখে কিন্তু বলেছেন, হ্যাঁ, হ্যাঁ, আসা দরকার। কিন্তু তাঁদের দীর্ঘসূত্রতা থেকে আমাদের মনে হয়েছে, ব্যাপারটা তাঁরা চাননি। তবে নূরুল আমীন সাহেব এ ব্যাপারে একটু স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্বের পরিচয় দিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন তাঁদেরই দলের লোক। কিন্তু তিনি কেন জানি না, আজাদকে ঢাকায় আনার ব্যাপারে একটু বেশিই সহানুভূতিশীল ছিলেন। প্রধানত নূরুল আমীনের চেষ্টাতেই আজাদ-এর জন্য জমিটা পাওয়া গিয়েছিল।

মু নূ ই: আপনি রাজনৈতিক দিক থেকে এম এন রায়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। আর লাহোর প্রস্তাবের পর থেকে আজাদ সম্পূর্ণভাবে পাকিস্তান আন্দোলনের পক্ষপাতী হয়ে গেল। আজাদই এই আন্দোলনকে জনপ্রিয় করে তুলেছিল। তখন এখানকার আজাদ অফিসে তার প্রাথমিক অবস্থায় সাব-এডিটর, পরে অ্যাসিস্ট্যান্ট এডিটরের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে আপনি অ্যাডজাস্ট করেছিলেন কীভাবে?

আ জা শা: অ্যাডজাস্ট করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় যে ব্যাপারটা কাজ করেছে, সেটা হচ্ছে মওলানা আকরম খাঁ সরাসরি তাঁর নিজস্ব সম্পাদকীয় বা লেখাগুলো লিখে দিতেন। আবুল কালাম শামসুদ্দীন সাহেবকে ওপরে ডেকে নিয়ে গিয়ে হয়তো কখনো আলোচনা করতেন। কিন্তু একটা লেখার ওপর ডাইরেক্টলি হস্তক্ষেপ তিনি করতেন না। আমি যখন সম্পাদকীয় লিখতাম, আবুল কালাম শামসুদ্দীন সাহেব সেগুলো দেখে দিতেন। মুসলিম লীগের পয়েন্ট অব ভিউ থেকেই সবকিছু লেখা হতো। তবে তার মধ্যে যতখানি সম্ভব, আমি নিজে একটু রেডিক্যাল মনোভাব বা যুক্তিনির্ভর সম্পাদকীয় লেখার চেষ্টা করতাম। একটা ঘটনার কথা আমার মনে আছে। আমি একটা সম্পাদকীয় লিখেছিলাম। আবুল কালাম শামসুদ্দীন সাহেব সেটা পাস করে দিয়েছিলেন। ছাপাও হয়ে গিয়েছিল। সম্পাদকীয়টা যখন লিখেছিলাম, তখন একটা ব্যাপার ভয়ানকভাবে চলছিল, মুসলিম লীগের তথাকথিত কর্মীদের গুন্ডামি ও দুর্নীতি তখন প্রায় আকাশচুম্বী। ঢাকায়ও চুরিচামারি, দুর্নীতি ইত্যাদি আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গেছে। তখন সাধারণ মানুষের মধ্যে এ রকমের একটা ধারণা ছিল যে দুর্নীতিবাজ আর চোর-বাটপার মুসলিম লীগারদের ধরে নিয়ে চালান দেওয়া হলো, কিন্তু থানাওয়ালাদের বলে-কয়ে, তদবির করে মুসলিম লীগের নেতারা তাঁদের কর্মী বলে বের করে আনতেন। এ সম্পর্কেই তখন আমি একটা কড়া এডিটোরিয়াল লিখেছিলাম, সেটা ছাপাও হয়েছিল।

ছাপা হওয়ার পর ব্যস, আর কোনো কথা নেই, বোধ হয় সৈয়দ আবদুস সেলিম বা সাহেব আলমসহ ঢাকার মুসলিম লীগের আরও জনপ্রিয় নেতা মওলানা আকরম খাঁর কাছে অভিযোগ নিয়ে যান। তিনি ব্যাপারটাকে তাঁর গ্রাহ্যের মধ্যে নেন। আমাকে ডেকে একটা কথা বলেছিলেন তিনি। বেশি কিছু বলেননি, কেবল বলেছিলেন, ‘তুমি একটা সাদাসিধে লোক।’ এর বেশি কোনো মন্তব্য তিনি করেননি। বলেছিলেন, ‘এ ধরনের লেখাটেখা ঠিক নয়।’

এ ধরনের ব্যাপারস্যাপার নিয়ে আমার সঙ্গে তেমন একটা বনত না। তবে আবুল কালাম শামসুদ্দীন সাহেব লিখতেন মুসলিম লীগের পয়েন্ট অব ভিউ থেকে। কিন্তু আমরা যারা তাঁর সহকারী ছিলাম, তাদের লেখার ওপর তিনি খুব বেশি একটা হাত দিতেন না। তবে তাঁর একটা কথা আমার এখনো মনে আছে। তিনি একদিন বলেছিলেন, আমার একটা লেখা প্রসঙ্গে যে, ‘দেখেন, সাধারণ পাঠকসমাজেরও কিছু বুদ্ধিশুদ্ধি আছে। তারাও নিজের ধরনে চিন্তাভাবনা করে থাকে। এ কথাটা মনে রেখেই লেখা লিখবেন এবং যতটা সম্ভব সংক্ষেপে লিখবেন। তাদের চিন্তাভাবনা করার সুযোগটাও রাখবেন।’

এভাবে কোনোমতে আজাদ-এর সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিয়েছিলাম। আসলে ওটা ছিল আমার চাকরি। এখনো তো একটাই যুক্তি। আজকের দিনেও একটাই যুক্তি, যাঁরা চাকরি করেন, তাঁরাও প্রোগ্রেসিভ। কিন্তু চাকরি করি বলেই হুকুম মানতে হয়।

মু নূ ই: বাস্তব কারণেই খাপ খাইয়ে নিতে হয়। আপনার কাছে শেষ প্রশ্ন, তেভাগা আন্দোলন যখন বাংলাদেশের বেশ কতগুলো জায়গায় শুরু হয়, সেই আন্দোলন যদি সফল হতো, তাহলে মুসলমান চাষিরাই উপকৃত হতেন বেশি। সে সময় তো আপনারা কলকাতায় ছিলেন। আন্দোলনটা দেখেছেন। ওই সময় আজাদ পত্রিকার ভূমিকা কী ছিল?

আ জা শা: আমি ঠিক তখন কলকাতায় ছিলাম না বোধ হয়। তেভাগা আন্দোলনটা বোধ হয় ১৯৪৪-৪৫ সালের আগে থেকেই শুরু হয়। শুরু হয় ছেচল্লিশ সন থেকে। তখন আমি ঢাকায়। কারণ, ১৯৪৫ সালের মাঝামাঝি আজাদ-এর এখানকার প্রতিনিধি হিসেবে আমি ঢাকায় চলে আসি। তেভাগা আন্দোলন আমাকে খুবই আকর্ষণ করত। তবে সেটা ব্যক্তিগতভাবে এবং আমি ওটার সমর্থকও ছিলাম। কিন্তু আজাদ-এর ভূমিকা বোধ হয়, আমার মনে যত দূর পড়ছে, সর্বতোভাবে তেভাগা আন্দোলনের এবং তাতে অংশগ্রহণকারী জনগণের বিরোধীই ছিল। তাদের তো একমাত্র পুঁজি ছিল ইসলাম। তবে কখনো কখনো জনগণের কিছু দাবিদাওয়া তো সমর্থন করতেই হতো। সে রকমও তারা করত। আমার ঠিক এখনো এটা মনে পড়ছে না। তবে তেভাগা আন্দোলনকে তো সাংঘাতিকভাবে দমন করা হয়েছিল এবং রাজশাহী জেলে তো গুলি পর্যন্ত চালানো হয়েছিল। এতে অনেক লোকজনও মারা গিয়েছিল। তারপর হাজং-টংকদের নিয়ে মণি সিংহদের যেসব আন্দোলন, সেগুলোও সাংঘাতিকভাবে দমন করা হয়েছিল। পাকিস্তান কায়েম হওয়ার পর তো সেই আন্দোলনকে আরও বেশি দমন করা হয়। অথচ এসবই ছিল জনগণের অধিকার আদায়ের আন্দোলন। কিন্তু সে বিচারে জনগণের অধিকার আদায়ের বিরোধী ছিল মুসলিম লীগ, সে জন্য তাদের প্রতিষ্ঠা হয়নি। মুসলিম লীগ তো জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য ভারত বিভাগ করেনি। তারা সেটা করেছিল মুসলমানরা যে আলাদা জাতি, সেটা প্রমাণ করার জন্য। তাদের মধ্যে কোনো শ্রেণী নেই, এ রকমটাই তারা ভাবত। মুসলমানরা আলাদা জাতি যখন, জাতি হলেই হলো। আর লিডারশিপ সম্পর্কে এডমান বার্ক বলেছিলেন, চার্চ ও অভিজাত শ্রেণীই হচ্ছে ন্যাচারাল রুলার। তো মুসলিম লীগও ছিল চার্চ ও রুলিং ক্লাসের প্রতিনিধি। মি. জিন্নাহ তো ধার্মিক ব্যক্তি ছিলেন না। তাঁরা দেশ শাসন করবেন। আলাদাভাবে লুটপাট করবেন। এই মনোভাব ছাড়া তো আর কোনো মনোভাব কোনো রকম হাই ফিলোসফি বা মতাদর্শ তাঁদের ছিল বলে আমার মনে হয় না।

মু নূ ই: আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

আ জা শা: আপনাকেও ধন্যবাদ।

ছবি: আবু জাফর শামসুদ্দীনের ৩টি বই

সূত্র: প্রতিচিন্তা, এপ্রিল ৮, ২০১৭





#বিংশশতকেবাংলাদেশ #বাংলাদেশেরইতিহাস

22/04/2026

ভয়ানক দুর্ভিক্ষ চলছে তখন

বাঙালি মুসলমানের ইতিহাস, পর্ব ৬
সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আবু জাফর শামসুদ্দীনের আত্মজৈবনিক সাক্ষাৎকার, পর্ব ৬

[সাক্ষাৎকারটি জাতীয় জাদুঘরের কথ্য ইতিহাস প্রকল্পের আওতায় ১৯৮৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ড. সালাহউদ্দীন আহমদ ও ড. মুস্তাফা নূরউল ইসলাম নিয়েছিলেন]

মু নূ ই: আপনি আজাদ-এ যোগ দিয়েছিলেন কখন?

আ জা শা: আজাদ-এ খুব সম্ভব ১৯৪১-৪২ সালের দিকে রাতের শিফটে সাব-এডিটর হিসেবে যোগ দিই। সার্বক্ষণিক নয়, খণ্ডকালীন হিসেবে। ঘণ্টা তিন-চার কাজ করতে হতো। আমার কাজ ছিল ইংরেজি থেকে বাংলায় সংবাদ অনুবাদ করা। পরবর্তীকালে আমি একই সঙ্গে তিন-চার জায়গায় কাজ করতাম। ১৯৪৩ সালের শেষ ভাগ সেটা। ভয়ানক দুর্ভিক্ষ চলছে তখন। কাজ করতাম ইনডিপেনডেন্ট ইন্ডিয়া ও ভ্যানগার্ড-এর কলকাতা প্রতিনিধি হিসেবে। ওরিয়েন্ট প্রেস অব ইন্ডিয়া নামে একটা নিউজ এজেন্সি ছিল, মুসলিম লীগেরই প্রতিষ্ঠান ছিল সেটা, সেখানেও আমি মোহাম্মদ ওয়ালীউল্লাহর সহকারী হিসেবে কাজ করতাম। আবার রাতের শিফটে, আগেই বলেছি, দৈনিক আজাদ-এ কাজ করতাম। ১৯৪৩ সালের ডিসেম্বর মাসের দিকে আমি খুব অসুস্থ হয়ে পড়ি। আমি বিশ্রামের জন্য কিছুদিন গ্রামের বাড়িতে চলে যাই। এই সময় আজাদ পত্রিকার তরফ থেকে আমাকে চিঠি লিখে বলা হয়, ‘আপনি চলে আসুন।’ আমি ১৯৪৫ সালে আবার কলকাতায় চলে যাই। তখন তারা আমাকে অ্যাসিস্ট্যান্ট এডিটর হিসেবে কাজ করার প্রস্তাব দিল। তখন বোধ হয় ইত্তেহাদ বেরিয়েছে কি বেরোয়নি, আমার ঠিক মনে নেই। ১৯৪৬ সালের দিকেই বোধ হয় সেটা বের হয়।

যা-ই হোক, আজাদ-এর তখন অ্যাসিস্ট্যান্ট এডিটরের প্রয়োজন ছিল। আমি বললাম, আমার শরীর এখনো খুব সুস্থ নয়। আমি তো স্থায়ীভাবে কলকাতায় থাকতে পারছি না। আরও কিছুদিন বিশ্রাম নিতে হবে। তখন আজাদ কর্তৃপক্ষ আমাকে প্রস্তাব দিল, ‘আমরা ঢাকায় অফিস খুলছি। আপনাকে ঢাকা অফিসের দায়িত্ব দিচ্ছি। ঢাকার প্রতিনিধি হিসেবে নিযুক্ত করছি। আপনি রাজি আছেন কি না?’

বলে দিলাম, ঠিক আছে। এটা আমার জন্য ভালোই হবে। ১৯৪৫ সালের মাঝামাঝি ঢাকায় এসে আমি আজাদ-এর স্থানীয় ঢাকা অফিস স্থাপন করি।

মু নূ ই: কোথায় ওটা হয়?

আ জা শা: তখন ঢাকায় বাড়ি পাওয়া মুশকিল ছিল। কারণ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের তখন শেষ অবস্থা। মার্কিন সেনারা তখনো এখানে আছে। এদিকে সর্বপ্রথম আমি ফুলবাড়িয়া রোডে একটা রুম ভাড়া নিই। মাসিক ভাড়া ১০ টাকা। অপ্রশস্ত রুম। খুবই অসুবিধা হতো কাজকর্ম করতে। পরে ওটা বদল করি। ইংলিশ রোডে ইয়ার মোহাম্মদ খানের কাছ থেকে একটা রুম নিই। সেখানেও খুব অসুবিধা হয়। পরে ইয়ার মোহাম্মদ খান কলতাবাজারে একটা বাড়ি করেন। সেই বাড়ির তিনটা কামরা ভাড়া নিয়ে অফিস এবং আমার থাকার ব্যবস্থা দুটোই একসঙ্গে করি। ১৯৪৬ সালের দিকে কলতাবাজারে অফিস খুলতে সক্ষম হই।

মু নূ ই: ঢাকেশ্বরী রোডে পরে যে আজাদ অফিস হলো, সেটা কীভাবে হলো? আপনি তো ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন। এই জমি নেওয়া থেকে শুরু করে আজাদ অফিস খোলা পর্যন্ত, যা কিছু ঘটেছে, তার একটা বিবরণ যদি দেন।

আ জা শা: এ ব্যাপারে আমি গোড়া থেকেই জড়িত ছিলাম। যখন পার্টিশন হয়ে গেল, তখন আমাকে মাঝেমধ্যে কলকাতা যেতে হতো। আজাদ কর্তৃপক্ষ একদিন আমাকে বলল, বিশেষভাবে মওলানা আকরম খাঁর বড় ছেলে সদরুল আনাম খাঁ ও মওলানা আকরম খাঁ নিজেও বললেন, ‘আমরা ঢাকা থেকে কাগজ বের করব ঠিক করেছি। তুমি একটু চেষ্টা করো।’ আমি এসে চেষ্টা করতে লাগলাম। নাজিমুদ্দিন সাহেব ছিলেন। নূরুল আমীন সাহেব তখন খাদ্যমন্ত্রী। তাঁদের সঙ্গে কথাবার্তা চালাতে লাগলাম। কলকাতা থেকে আজাদ ঢাকায় আসুক, সে ব্যাপারে তাঁরা যে খুব একটা আগ্রহান্বিত ছিলেন, সে কথা বলা যায় না। হামিদুল হক চৌধুরীর তো আদৌ কোনো ইচ্ছা ছিল না। কিন্তু আমরা কথাবার্তা চালিয়ে যেতে লাগলাম। এর মধ্যে আবার খায়রুল কবির সাহেবকে আমার সঙ্গে কাজ করার জন্য ঢাকায় পাঠানো হলো। তিনি কলকাতায় আজাদ-এ যোগ দিয়েছিলেন। খায়রুল কবির ও আমি দুজন মিলে এখানকার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা-চালাচালি করতে লাগলাম। এ ব্যাপারে নূরুল আমীন আমাদের যথেষ্ট সহায়তা করেছিলেন এবং ওদিক থেকে খলিল মিয়া, অর্থাত্ সদরুল আনাম খাঁ, মওলানা আকরম খাঁর ছেলে, ওই সময় তিনিও প্রায়ই ঢাকায় আসতেন। শেষ পর্যন্ত পাঁচ বিঘা জমি লিজ দেওয়ার সিদ্ধান্ত সরকারের তরফ থেকে পাওয়া গেল। আমার যত দূর মনে পড়ে, প্রতি বিঘার তখন সেলামি ছিল চার কিংবা পাঁচ হাজার টাকা। এই সেলামি দিয়ে জমিটা লিজ নেওয়া হয়েছিল। লিজ নেওয়ার ওই সময়টায় মওলানা আকরম খাঁ কিছুদিন ঢাকায় ছিলেন। এসেছিলেন তিনি আমার কলতাবাজারের দোতলার বাসায়। ওই সময় আমাকে যেমন আজাদ পত্রিকার ঢাকার প্রতিনিধিত্ব করতে হতো, তেমনি পত্রিকাটির কার্যালয় প্রতিষ্ঠায় ইট-কাঠ সংগ্রহ করা থেকে শুরু করে সব কাজই করতে হতো। তখন আমাকে কঠিন পরিশ্রম করতে হয়েছে। মওলানা আকরম খাঁ শেষ পর্যন্ত আমার ডেরা থেকে চলে গিয়ে ঢাকেশ্বরী রোডে থাকতে লাগলেন। এই তো ঢাকায় আজাদ অফিস চালু হওয়ার ইতিহাস। আমরা তো ঠিক চাকরি করলেও, আজাদ-এর কর্মচারী হলেও ভূমিকাটা ছিল উদ্যোগীর। যেখানে কোনো পত্রিকাই নেই, সেখানে অন্তত একটা পত্রিকা প্রতিষ্ঠা লাভ করুক, এটাই ছিল আমাদের একমাত্র কামনা। এবং সেদিক থেকে যতটা শ্রম দেওয়া সম্ভব, আমি ও খায়রুল কবির দুজনই ঠিক ততটাই দিয়েছিলাম। এভাবেই এখানে আজাদ প্রতিষ্ঠা লাভ করে। ঢাকায় আজাদ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর আমাকে পদ দেওয়া হলো সহকারী সম্পাদকের। খায়রুল কবির হলেন বার্তা সম্পাদক। কিন্তু আমার সঙ্গে আজাদ-এর বেশি দিন বনিবনা হলো না। ১৯৫০ সালের জুন মাসে আমার টাইফয়েড হয়। আমি তখন আগামসি লেনে থাকি। এক মাসের ছুটি নিয়েছিলাম। ছুটির পর এক মাসের বেতন পাওনা ছিল। বেতনটা চেয়েছিলাম। তারা সেটা না দিয়ে চিঠি পাঠাল এই বলে যে ইয়োর সার্ভিস ইজ নো লংগার রিকোয়ার্ড। ফলে, খুবই দুরবস্থায় পড়ে যাই। সেদিন আমার হাতে মাত্র তিন আনা পয়সা ছিল।

সা আ: আপনার সঙ্গে বনিবনা না হওয়ার কারণটা কী ছিল?

আ জা শা: বনিবনা না হওয়ার মূলে ছিল একটা অদ্ভুত ব্যাপার। এ সম্পর্কে অবশ্য তারা কখনোই কিছু বলেনি। কিন্তু আমার মনে হয়েছে, মওলানা আকরম খাঁর যে ছোট ছেলে ছিল, সে ছিল একটু বাউন্ডুলে ধরনের। মওলানা আকরম খাঁর স্বাক্ষরে (কলতাবাজারের আমার বাসায় তখন ওই ছেলে থাকত) চেকের টাকা ভাঙানো হতো। চেক বইটা বোধ হয় নিচের অফিসরুমে ছিল। হঠাত্ একদিন দেখি, একটা চেক নেই, চেকের পৃষ্ঠাও কম। আমি সাংঘাতিকভাবে ভয় পেয়ে গেলাম। ব্যাপারটা অনতিবিলম্বে আমি ইউনাইটেড ব্যাংক অব ইন্ডিয়াকে জানালাম। ওখানেই ছিল মওলানা আকরম খাঁর অ্যাকাউন্ট। আমি ওখানে টেলিফোন করে বললাম, ‘একটা চেক দেখছি না। আপনারা ওই চেকের এগেনেস্টে কোনো পেমেন্ট করবেন না।’ মওলানা আকরম খাঁকেও বললাম, ‘আপনি কি কোনো চেক সই করেছেন?’

তিনি জানালেন, না।

পরে খোঁজ নিয়ে জানলাম, আসলে তাঁর ছোট ছেলেটাই মওলানা আকরম খাঁর স্বাক্ষর জাল করে চেকটা নিয়ে গেছে।

আমি খুব ক্ষুব্ধ হলাম। আমার মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। আমি ছেলেটাকে গালমন্দ করার একপর্যায়ে তাকে বোধ হয় এ কথা বলেছিলাম, তোমাকে চড় মারা দরকার। তবে মুখে বললেও চড়টা মারা হয়নি। কথাটি বোধ হয় মওলানা আকরম খাঁকে জানানো হয়েছিল। একজন কর্মচারী তার মনিবের ছেলেকে, সে যত অপরাধই করুক না কেন, তার সঙ্গে এ রকম আচরণ করবে, এটা তো সহ্য করার কথা নয়। পরবর্তীকালে আজাদ যখন প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেল এবং তাদের কাছে আমার চাকরি বা সেবার কোনো প্রয়োজন আর থাকল না এবং আমিও তাদের সামনাসামনি নেই, টাইফয়েডে শয্যাশায়ী, এই সুযোগের সদ্ব্যবহারটাই করা হলো। ওই যে মওলানার ছেলেকে একদিন অপমান করেছিলাম, আমাকে চাকরি থেকে ছাড়িয়ে দিয়ে বোধ হয় তারই প্রতিশোধ গ্রহণ করা হলো। অবশ্য আমি একা ছিলাম না। মোহাম্মদ মোদাব্বেরও চাকরি পায়নি ওখানে। পরবর্তীকালে আবুল কালাম শামসুদ্দীনও বিতাড়িত হয়েছিলেন। চাকর-মনিবের সম্পর্ক এ রকমই হয়।

ছবি: আবু জাফর শামসুদ্দীনের ৩টি বই

সূত্র: প্রতিচিন্তা, এপ্রিল ৮, ২০১৭

21/04/2026

১৯৩৫ সালের গভর্নমেন্ট অব ইন্ডিয়া অ্যাক্ট সাম্প্রদায়িকতার উৎস হিসেবে কাজ করেছে

বাঙালি মুসলমানের ইতিহাস, পর্ব ৫
সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আবু জাফর শামসুদ্দীনের আত্মজৈবনিক সাক্ষাৎকার, পর্ব ৫

[ সাক্ষাৎকারটি জাতীয় জাদুঘরের কথ্য ইতিহাস প্রকল্পের আওতায় ১৯৮৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ড. সালাহউদ্দীন আহমদ ও ড. মুস্তাফা নূরউল ইসলাম নিয়েছিলেন]

মু নূ ই: আপনাকে আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, ১৯২৮ থেকে ১৯৩৩ সাল পর্যন্ত যেসব রাজনৈতিক ঘটনা ঘটেছিল, সেগুলো আপনার ওপর কী ধরনের প্রভাব বিস্তার করেছিল? এ ব্যাপারে অবশ্য আপনি নিজের কথা বলেছেন। কিন্তু তখনকার কলকাতার বাসিন্দা আপনাদের বয়সী যাঁরা ছিলেন, তাঁরা মোটামুটিভাবে কি একই ধরনের চিন্তাভাবনা করতেন, নাকি তাঁদের চিন্তা অন্য রকম কিছু ছিল?

আ জা শা: ১৯২৮ থেকে ১৯৩৩ সাল অবধি মেসে থেকেছি। ওই সময়, আমার ব্যক্তিগত ধারণা, আমি যাঁদের সঙ্গে মেলামেশা করেছি, তাঁদের মধ্যে সাম্প্রদায়িক চিন্তা খুব বেশি একটা ছিল না। তাঁরা মুসলমান সমাজের উন্নতি কামনা করতেন। কিন্তু যে ভয়াবহ সাম্প্রদায়িকতা পরবর্তীকালে দেখা দিয়েছিল, তেমন কিছু ছিল না। তখনো পর্যন্ত বেশির ভাগ শিক্ষিত মুসলিম তরুণ ছিলেন কংগ্রেসপন্থী এবং ১৯৩৩ সালের আন্দোলনের সময় তাঁদের অনেকেই খদ্দর ধরেছিলেন। আমি নিজেও তখন খদ্দর ধরেছিলাম। সিগারেটের পরিবর্তে অনেকেই বিড়ি ধরেছিলেন।

ওই সময় রাজনৈতিক দিক থেকে, আমার মনে হয়, কংগ্রেসই সবচেয়ে প্রভাবশালী ছিল। সে সময় অবশ্য বামপন্থী রাজনীতিও কিছুটা প্রভাব বিস্তার করেছে। কমিউনিস্ট পার্টি স্বনামে না থাকলেও ছিল ছদ্মাবরণে। তার নাম ছিল ‘ওয়ার্কার্স অ্যান্ড পিজেন্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া’। সে সময় আমাদের অনেকেই মুজফ্ফর আহমদ সাহেবের সঙ্গে, যেমন আমি নিজেও, পরিচিত হয়েছিলাম। কাদির সাহেবই আমাকে তাঁর কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন। মুজফ্ফর আহমদ, হালিম, মোমেন প্রমুখ ছিলেন ওই পার্টির, মানে কমিউনিস্ট পার্টির নেতা। এই সময় কাজকর্মের ভেতর দিয়ে তাঁরাও কিছুটা এগিয়ে গিয়েছিলেন। এই সময় তাঁদের উদ্যোগে অক্টারলনি মনুমেন্টের নিচে বড় বড় শ্রমিক-জমায়েত হতে দেখেছি। কাজেই মুসলমান ও হিন্দুদের মধ্যে যে উৎকট সাম্প্রদায়িকতা, তার শুরুটা হয়েছিল ১৯৩৭ সালের নির্বাচনের পর থেকেই। ১৯৩৬ সালের ডিসেম্বরে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৩৭ সালে ফজলুল হক সাহেব মন্ত্রিপরিষদ গঠন করেই মুসলিম লীগে যোগ দিয়ে বসলেন; যদিও তিনি কৃষক প্রজা পার্টি থেকে নির্বাচিত হয়েছিলেন। উৎকট সাম্প্রদায়িকতা বলতে গেলে তখন থেকেই শুরু হয়ে যায়। অর্থাৎ, ১৯৩৫ সালের গভর্নমেন্ট অব ইন্ডিয়া অ্যাক্ট সাম্প্রদায়িকতার উৎস হিসেবে কাজ করেছে। কারণ, ওই অ্যাক্টের মধ্যে সেপারেট ইলেক্টোরেট ও সিডিউলকাস্টদের জন্য বিশেষ আসন সংরক্ষণ-সংক্রান্ত ধারা ইত্যাদিই ছিল। আমার ধারণা, ১৯৩৫ সালের ওই কনস্টিটিউশন, অর্থাৎ ভারত শাসন আইনের মধ্যেই ভারত বিভাগের বীজ উপ্ত ছিল।

মু নূ ই: আপনার কলকাতার জীবন শুরু করেন সাংবাদিক হিসেবে। আজাদ পত্রিকা কীভাবে বের হয়, তার পেছনে কারা কারা ছিলেন? এবং ওই পত্রিকার সঙ্গে আপনার যোগাযোগ কীভাবে হয়, সে সম্পর্কে যদি কিছু আলোকপাত করেন...।

আ জা শা: আজাদ পত্রিকা যখন বের হয়, অর্থাৎ তার প্রাথমিক উদ্যোগ-আয়োজনের সঙ্গে আমার কোনো ধরনের যোগাযোগ ছিল না। ফজলুল হক সাহেব যখন মন্ত্রিসভা গঠন করলেন, তখন ওই মন্ত্রিসভায় নলিনী সরকারও ছিলেন, অর্থমন্ত্রী তিনি। মওলানা আকরম খাঁ সাহেব তো সারা জীবন কংগ্রেসই করতেন। পরবর্তীকালে তিনি মুসলিম লীগে যোগ দেন। ওই সময় তিনি দরখাস্ত দিয়ে সরকারের কাছ থেকে ৩০ হাজার টাকা পান। তাই দিয়ে তিনি কাগজটা বের করেছিলেন। এটা ছিল একেবারেই অভিনব একটা ব্যাপার এবং সাংবাদিকতার জগতে বোধ হয় সচরাচর ঘটে না, এমন একটা ব্যাপার।

মু নূ ই: আপনার সাহিত্যচর্চার বিষয়ে দু-একটা কথা জিজ্ঞেস করি। আমার যত দূর মনে হয়, আপনি প্রধানত ছোটগল্পই লিখেছেন, কিন্তু আপনার খ্যাতির সূচনা উপন্যাস পরিত্যক্ত স্বামী থেকে। আপনার ওই উপন্যাসে যে ধরনের ঘটনা তুলে ধরেছেন, সে ধরনের জীবনধারা মুসলমান সমাজে তখন ছিল না। এই উপন্যাস লেখার প্রেরণা বা ইচ্ছা আপনার কী করে হলো?

আ জা শা: ওই সময় আসলে খুব চিন্তাভাবনা করেটরে যে লেখালেখি শুরু করেছিলাম, সে কথা এখন আর খুব মনে পড়ে না। তবে ইবসেন আর বার্নার্ড শর বই-পুস্তক পড়ার প্রভাব যে আমার ওপর পড়েছিল, সে কথা অস্বীকার করা যাবে না এবং পরিত্যক্ত স্বামীতে বর্ণিত ঘটনার মতো ঘটনা যে ওই সময় সমাজে কিছু কিছু ঘটেনি, তা-ও নয়। তবে বুঝতেই পারেন, ওটা ছিল কাঁচা হাতের লেখা। আমি তো ঠিক ওই ধরনের সমাজের একজন ছিলাম না। কলকাতা আসলে কসমোপলিটন সিটি। হিন্দু-মুসলমাননির্বিশেষে যে ধরনের সমাজে বসবাস করত, ওই উপন্যাসে বর্ণিত ঘটনার মতো ঘটনা ঘটা সেখানে অসম্ভব কিছু ছিল না। আমি তো দূরে থেকে দেখেছি। বলতে পারি, তার সবটাই কল্পনা। ওই উপন্যাসে বাস্তব জীবনের কোনো অভিজ্ঞতা নেই। বইটির খ্যাতির মূল কারণ খুঁজতে গেলে দেখা যাবে, ওই সময় কোনো মুসলমান লেখকের কলম থেকে ও ধরনের কোনো বই লেখা হয়নি। হ্যাঁ, আপনাদের মতে দুঃসাহসিক লেখাই বলতে পারেন। তার পর থেকে তো লেখা চলতে থাকে। এই সময় আমার আরেকটা বই বের হয়। নাম ছিল মুক্তি। সেটা ছিল কিছুটা কাল্পনিক, কিছুটা দর্শননির্ভর। তার পর থেকে যত গল্প-উপন্যাস লিখেছি, প্রায় সব কটিই সজ্ঞানে, ভেবেচিন্তেই লিখেছি। লক্ষ্য-আদর্শহীন কোনো সাহিত্যে আমি বিশ্বাস করি না। ‘আমি আর্ট ফর আর্টস সেক’-এ বিশ্বাস করি না। আমি বরং টলস্টয়ের সঙ্গে এ ব্যাপারে একমত। তিনি বলেছেন, যে সাহিত্যের পেছনে কোনো লক্ষ্যাদর্শ নেই, সেটা কোনো সাহিত্যই নয়। সে বিচারে আমি পরবর্তীকালে যা লিখেছি, অর্থাৎ পদ্মা-মেঘনা-যমুনা এমনকি তারপরও যতগুলো উপন্যাস বা গল্পের বই লিখেছি বা প্রকাশিত হয়েছে, তার মধ্যে আমার কিছু বক্তব্য, অর্থাৎ সামাজিক চিন্তাভাবনা, সমাজের লক্ষ্যাদর্শ কী হওয়া উচিত বা আমার কী লক্ষ্যাদর্শ, মোটামুটি তা আমার এসব সাহিত্যকর্মে স্থান পেয়েছে।

মু নূ ই: চল্লিশের দশকের গোড়ার দিকে রেনেসাঁ সোসাইটি হয়েছিল এবং তাদের একটা কনফারেন্সও হয়েছিল। সংগঠনটির সঙ্গে আপনি যুক্ত ছিলেন, এ সম্পর্কে কিছু বলুন।

আ জা শা: ওটার নাম ছিল পাকিস্তান রেনেসাঁ সোসাইটি। তার মিটিংয়ে আমি মাঝেমধ্যে যেতাম। একটা মিটিংয়ের কথা আমার মনে আছে। মুজীবর রহমান খাঁ বোধ হয় ওটার সেক্রেটারি ছিলেন। একটা মিটিংয়ে আমি ছিলাম। আমাদের জহুরও (জহুর হোসেন চৌধুরী, দৈনিক সংবাদ-এর সম্পাদক) বোধ হয় উপস্থিত ছিল। তখন ড. সাদেক বলে অর্থনীতির একজন অধ্যাপক ছিলেন। তিনি অর্থনীতির ওপর একটা প্রবন্ধ পাঠ করেছিলেন। তাতে তিনি বলেছিলেন, পাকিস্তান হলে টাকাকড়ির ব্যাপারে আমরা মোটেও আটকাব না। আমরা নিজেরাই সব নোট ছাপাব। এভাবে অর্থনীতিকে আমরা চাঙা করে তুলব। আমার মনে আছে, অর্থনীতির ছাত্র না হলেও আমি আগাগোড়া একজন স্বশিক্ষিত মানুষ ছিলাম। আমি জনাব সাদেকের ওই বক্তব্যের ব্যাপারে একটা বিতর্কের সৃষ্টি করেছিলাম। এটা যে একটা ফ্যান্টাস্টিক ননসেন্স ছিল, সে ব্যাপারে আলোচনা করেছিলাম। তর্ক-বিতর্কের সূচনা করেছিলাম। রেনেসাঁ সোসাইটির সভায় মাঝেমধ্যে প্রবন্ধ পড়া হতো। আমি কোনো কোনো মিটিংয়ে উপস্থিত থাকতাম।

সূত্র: প্রতিচিন্তা, এপ্রিল ৮, ২০১৭

ছবি: আবু জাফর শামসুদ্দীন

20/04/2026

আমার বাবা গোঁড়া ধার্মিক ছিলেন, কিন্তু সাম্প্রদায়িক ছিলেন না। আমার মুক্তচিন্তা করতে পারার মূলে প্রধান অবদান রেখেছেন কাজী নজরুল ইসলাম।

বাঙালি মুসলমানের ইতিহাস, পর্ব ৪
সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আবু জাফর শামসুদ্দীনের আত্মজৈবনিক সাক্ষাৎকার, পর্ব ৪

মু নূ ই: আরেকটা কথা। ১৯২৮ থেকে ১৯৩৩ সাল সময় পরিসরে অনেক রাজনৈতিক ব্যাপার ঘটে যায়। যেমন জিন্নাহ সাহেবের ১৪ দফা, মতিলাল নেহরুর ব্যাপার, গোলটেবিল বৈঠক, সূর্য সেনের ফাঁসি। আপনারা তখন যাঁরা তরুণ, যাঁরা কলকাতায় সাংবাদিকতা ও সাহিত্যকর্মের দিকে ঝুঁকেছেন, এসব ঘটনা আপনাদের কীভাবে স্পর্শ করেছে বা কতটা গভীরে স্পর্শ করেছে?

আ জা শা: আমার ব্যক্তিগত কথা আমি বলতে পারি। আমাকে তখনকার সশস্ত্র আন্দোলন ভয়ানকভাবে রোমাঞ্চিত করত। যেমন চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের ঘটনা, পরবর্তীকালে সরদার ভগত্ সিং, বটুকেশ্বর দত্ত ও চন্দ্রশেখর আযাদের মতো বিপ্লবীদের কার্যকলাপ আমাকে ভয়ানকভাবে রোমাঞ্চিত করত। অন্যদিকে, গোলটেবিল বৈঠক হচ্ছে, জিন্নাহ সাহেবের ১৪ দফা দেখছি, মহাত্মা গান্ধীও সেখানে গিয়েছেন। ব্যক্তিগতভাবে ১৪ দফাকে তখন মনে মনে সমর্থন করলেও রাজনৈতিক দল হিসেবে আমি কংগ্রেসকে প্রাধান্য দিতাম এবং হিন্দু-মুসলমান সমস্যার সমাধান হয়ে যাক, মনেপ্রাণে সেটা চাইতাম। কিন্তু নেতৃত্বের দিক থেকে আমি মহাত্মা গান্ধীকে জিন্নাহর ওপরে স্থান দিয়েছি বলে এখনো মনে পড়ছে। আমি মুসলিম লীগের সদস্য কখনো হইনি। আমার কল্পনার মধ্যেও কখনো সেটা আসেনি। আমি ভুলেও চিন্তা করিনি যে ভারত বিভক্ত হবে কিংবা হওয়া উচিত।

সালাহউদ্দীন আহমদ: আমরা এতক্ষণ মুস্তাফা নূরউল ইসলাম সাহেবের সঙ্গে আপনার কথাবার্তা শুনছিলাম। আমার মনে একটা প্রশ্ন জেগেছে, গ্রামীণ রক্ষণশীল মুসলমান পরিবারে আপনার জন্ম, শৈশবে মাদ্রাসায় লেখাপড়া শিখেছেন, তা সত্ত্বেও পরবর্তীকালে, বিশেষ করে কলকাতায় আসার পর সব ধরনের তথ্য, বিশ্বাস ও কুসংস্কারকে মুক্তবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ হিসেবে আপনাকে দেখতে পাই এবং আরও পরে আপনি এম এন রায়ের অনুসারী বিপ্লবী মতবাদ গ্রহণ করেছিলেন। আপনার মধ্যে এই যে বিবর্তন, একটা রক্ষণশীল মুসলিম পরিবারের পরিমণ্ডল থেকে বেরিয়ে এসে একজন মুক্তমনের বুদ্ধিজীবী হিসেবে আপনার এই যে বিবর্তন, সেটা কী করে সম্ভব হয়েছিল?

আ জা শা: তাহলে আবার আমাকে আমার পরিবারের অন্দরে ঢুকতে হয়। আমার বাবার আচরণ থেকে আমি যা দেখেছি, সেটা হচ্ছে এই, তিনি গোঁড়া ধার্মিক ছিলেন, কিন্তু সাম্প্রদায়িক ছিলেন না। কারণ, আমাকে নিয়ে তিনি যখন ওই ব্রাহ্মণবাড়িতে ছোটবেলায় যেতেন, তারা আমাকে নাড়ু, মোয়া ইত্যাদি খেতে দিতেন। এসব কিছু যে আমি গ্রহণ করতাম, তাতে তাঁর কোনো আপত্তি ছিল না। আবার ঈদের চাঁদে আমার সমবয়সী সব না হলেও কিছু কিছু ব্রাহ্মণ ছেলে আমাদের বাড়িতে এসে কোরমা-পোলাও খেয়েছে, দু-একজন ব্রাহ্মণ নারী, বিশেষ করে একজন ব্রাহ্মণ নারী আমার মায়ের বন্ধু ছিলেন। বিধবা। তিনি প্রায়ই আমাদের বাড়িতে আসতেন এবং আমার মায়ের সঙ্গে গল্পগুজব করতেন। এ থেকে বুঝতে পারছেন, কিছুটা স্বাধীনতা, মানে চিন্তার স্বাধীনতা আমাদের ছিল। পরবর্তীকালে কলকাতায় যাওয়ার পর আমি আকৃষ্ট হই প্রধানত চলমান মীরাট ষড়যন্ত্র মামলার ব্যাপারে। আসল কথা হলো, স্বাধীনতা অর্জনের অনুকূল যেকোনো আন্দোলন, সেটা যেদিক থেকেই হোক, অর্থাৎ ব্রিটিশবিরোধী যেকোনো আন্দোলনের প্রতি আমার সব সময় একটা বিশেষ রকমের পক্ষপাতিত্ব ছিল। প্রথমে আমি যখন কলকাতায় যাই, সংবাদপত্রজগতের সঙ্গে কিছু লোকের মাধ্যমে কবি বেনজীর আহমদ, আশরাফ আলী খান, আবুল কালাম শামসুদ্দীন, পরবর্তীকালে আবুল মনসুর আহমদ প্রমুখের মতো অনেকের সঙ্গে পরিচিত হই। পরিচিত ব্যক্তিদের মধ্যে এই যে কয়েকজনের কথা বললাম, তাঁরা ইউরোপীয় সাহিত্য, সেকালে হাতের সামনে যা পাওয়া যেত, তাই পড়তেন। বিশেষ করে, ইবসেন, বার্নার্ড শর লেখা তাঁরা নিয়মিত পড়তেন এবং আমাদেরও তাঁরা বলতেন এসব পড়তে। ফলে, তাঁদের পরামর্শমতো পড়াশোনা করতাম। তার মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হচ্ছে, কবি বেনজীর আহমদ খুব সম্ভব ১৯৩২-৩৩ সালের দিকে আমাকে কার্ল মার্ক্সের দুই খণ্ডের দাস ক্যাপিটাল (এ-জাতীয় বই তখন প্রকাশ্যে বেচাকেনা হতো না) এবং এম এন রায়ের ইন্ডিয়া ইন ট্রানজিশন বইটি পড়তে দেন। তিনি বই দুটো কোথা থেকে সংগ্রহ করে এনেছিলেন, জানি না।

ওই বয়সে দাস ক্যাপিটাল-এর ইংরেজি অনুবাদ, ইডেনের অনুবাদ ছিল বোধ হয়, পড়ে বুঝতে খুব কষ্ট হয়েছে। আমার বিদ্যা বলতে তো ওই ম্যাট্রিক পাস পর্যন্ত। তার বেশি নয়। তবে কষ্ট হলেও আমি পাঁচ-ছয় মাসে দুই খণ্ডের দাস ক্যাপিটাল ও ইন্ডিয়া ইন ট্রানজিশন বইটিও পড়ে শেষ করেছিলাম। পড়ার পর, বিশেষ করে বার্নার্ড শ ও ইবসেনের বই পড়ার পর আমার মন অনেকটা মুক্ত হয়ে যায়। তবে একটা কনট্রাডিকশন যে মনের মধ্যে ছিল না, এমন নয়। মানে একদিকে যেমন মুসলিম সমাজের প্রতি, ইসলামের প্রতি ঝোঁক ছিল, অন্যদিকে তেমনি সর্বভারতীয় মানুষের সার্বিক উন্নতি এবং তাদের স্বাধীনতার ব্যাপারেও আগ্রহ ছিল। এর মধ্যে এম এন রায় সম্ভবত ১৯৩৭ সালে জেল থেকে বের হন। কলকাতায় আসেন। তাঁর সান্নিধ্যে আমাকে নিয়ে গিয়েছিলেন খুব সম্ভব বসুধা চক্রবর্তী ও বেনজীর আহমদ দুজনে মিলে। আপনারা জানেন, কবি বেনজীর আহমদ নওরোজ পত্রিকা বের করেছিলেন। তিনি সন্ত্রাসবাদী ছিলেন। সেকালে সন্ত্রাসবাদীদের ডাকাতও বলা হতো। তিনি ওই পথেই অর্থ সংগ্রহ করে তাঁর পত্রিকা বের করেছিলেন। সেকালে হিন্দু-মুসলমান মিলিয়ে যেসব পত্রপত্রিকা বের হতো, সেগুলোর মধ্যে নওরোজ ছিল প্রথম শ্রেণীর একটা পত্রিকা। তবে তার আয়ু ছিল মাত্র কয়েক মাসের।

সে সময় আমি ঢাকায়। নওরোজ পত্রিকা এখানে আসত। আমরা পড়তাম। নজরুল ইসলাম তাতে লিখতেন। আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ব্যাপার, কাজী নজরুল ইসলামের সান্নিধ্য। নজরুল ইসলামের লেখা যেটা যখন পেয়েছি, পড়েছি। তিনি আমাকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ভারতের স্বাধীনতাসংগ্রামে যোগ দিতে বিশেষভাবে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। সাহিত্যটাহিত্য যা করছি, তার প্রথম অনুপ্রেরণা দিয়েছেন নজরুল ইসলাম। উদ্বুদ্ধও করেছেন তিনি। কাজী নজরুল ইসলামের খ্যাতি তখন আকাশসমান। হিজ মাস্টার ভয়েজে অন্য শিল্পীদের দিয়ে গান রেকর্ড করান। আমার সেই দৃশ্যটা এখনো মনে আছে। তাঁর সঙ্গে প্রথম সাক্ষাতের দিন। দোতলায় গিয়ে বসলাম। এটা খুব সম্ভব ১৯৩৫-৩৬ সালের বা তার আগেকার কথা। আমার কিছু গল্পটল্প তখন বেরিয়েছে। তবে, পরিত্যক্ত স্বামী বের হয়েছে কি না, মনে নেই।

মু নূ ই: আপনি কখন গল্প লিখতে শুরু করেন?

আ জা শা: আমার প্রথম লেখা বের হয় ১৯৩৩ সালে। প্রথম প্রকাশিত আমার রচনাটা ছিল ইংরেজিতে লেখা। বের হয়েছিল ১৯৩২ সালে স্টার অব ইন্ডিয়ায়। পরে প্রকাশিত হয় বাংলা রচনা। প্রথম বের হয় একটা প্রবন্ধ। তারপর গল্প। আমার রচনা প্রকাশের শুরু ১৯৩৩ সাল থেকে। তার কিছুদিন পর কাজী নজরুল ইসলামের বাসায় যাই। কবি আবদুল কাদির সাহেবের সঙ্গে আমার খুব ঘনিষ্ঠতা ছিল। ঢাকায় নয়, তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয় ঢাকা থেকে কলকাতায় যাওয়ার পথে। তিনি আমাকে ওই বাড়িতে নিয়ে গিয়েছিলেন। দৃশ্যটা মনে পড়ে। দোতলায় গিয়ে বসলাম। বসার পরই কিছু খাবার এল। মিষ্টি। কাজী বললেন, ‘আমি আসছি।’ নিচে থেকে তিনি সেজেগুজে এলেন। যখন এলেন, তখন তাঁর পরনে একটা সিল্কের পাঞ্জাবি ও ধুতি। মাথায় খদ্দরের টুপি এবং সারা গা থেকে বের হচ্ছে ভুরভুরানো সুগন্ধি। তিনি সুগন্ধি খুব ভালোবাসতেন। তাঁর তখন একটা গাড়ি ছিল। মোটরগাড়ি। আমাদের বললেন, ‘চলো।’ আমাদের তুললেন তাঁর গাড়িতে। ড্রাইভার চালিয়ে নিয়ে গেল।

পরে বললেন, ‘আমি হিজ মাস্টার্স ভয়েসে নেমে যাব। তোমাদের ওই পর্যন্ত নিয়ে যাই।’ তিনি ওখানে নামলেন। আমরা ওখান থেকে চলে আসি। এই হচ্ছে তাঁর সঙ্গে প্রথম পরিচয়ের স্মৃতি। পরবর্তী জীবনে তাঁকে আমরা আরও অনেক জায়গায় দেখেছি। দেখেছি নবযুগ পত্রিকায়। ১৯৪২ সালের দিকে পত্রিকাটির প্রধান সম্পাদক ছিলেন। আমিও কিছুদিন নবযুগ-এ চাকরি করেছি। তারপর দু-একটি বাসায় তাঁর সঙ্গে আমি সংগীতের জলসায় উপস্থিত ছিলাম।

যে কথা বলছিলাম, এই যে আমি কিছুটা মুক্তচিন্তা করতে সক্ষম হয়েছি, তার স্থলে রয়েছে নানা ধরনের মানুষের সঙ্গে আমার মেলামেশার ফল। কাজী নজরুল ইসলামের অনুপ্রেরণা এবং শেষ পর্যায়ে এসে এম এন রায়ের সঙ্গে পরিচয় আমাকে আলোকিত হতে সাহায্য করেছে। এম এন রায় যে ইনডিপেনডেন্ট ইন্ডিয়া বের করেছিলেন, আমি ছিলাম সেই পত্রিকার কলকাতা সংবাদদাতা। পরে ডেইলি ভ্যানগার্ড দিল্লি থেকে বের করতেন, তারও কলকাতা সংবাদদাতা ছিলাম আমি। এম এন দীন ছদ্মনামে আমি তাঁর পত্রিকা ইনডিপেনডেন্ট ইন্ডিয়াতে কিছু প্রবন্ধ লিখেছি। যখন এম এন রায় এখানে আসতেন, তাঁর সঙ্গে মাঝেমধ্যে কিছু আলাপ-আলোচনা হতো। তিনি যেসব রাজনৈতিক বক্তৃতা দিতেন, সেগুলো শুনতাম। লক্ষ্ণৌতে যুদ্ধের সময় একটা সম্মেলন হয়। রেডিকেল পার্টির ওই সম্মেলনে আমি যোগ দিয়েছিলাম। আমার মুক্তচিন্তা করতে পারার মূলে প্রধান অবদান রেখেছেন কাজী নজরুল ইসলাম। কবি বেনজীর আহমদও প্রথম দিকে বইপত্র দিয়ে সহায়তা করেছেন। আমার জীবনে কবি আবদুল কাদিরেরও প্রভূত অবদান রয়েছে। আর শেষের দিকে এসে আমার মানস গঠনে সাহায্য করেছেন এম এন রায়।

ছবি: পাকিস্তান রেডিওর অনুষ্ঠানে আবু জাফর শামসুদ্দীন ( ডান থেকে দ্বিতীয়)

সূত্র: প্রতিচিন্তা, এপ্রিল ৮, ২০১৭







#বাংলাদেশেরইতিহাস #বাংলাদেশেরসাহিত্য #বিংশশতকেবাংলাদেশ

19/04/2026

গ্রামে হিন্দু-মুসলমান হিসেবে ঝগড়া হতো না, সেটা হতো আর দশটা ঝগড়া-ফ্যাসাদের মতোই।

বাঙালি মুসলমানের ইতিহাস, পর্ব ৩
সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আবু জাফর শামসুদ্দীনের আত্মজৈবনিক সাক্ষাৎকার, পর্ব ৩

১৯২৬ সালে কলকাতায় হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে যে দাঙ্গা হয়েছিল, তার প্রভাব ঢাকাতেও পড়েছিল। আমিও দাঙ্গার মধ্যে পড়েছিলাম। ঢাকাতেও দাঙ্গা হয়েছিল। তবে তার ব্যাপকতা কেমন ছিল, সে সম্পর্কে আমার খুব বেশি ধারণা নেই। আমি তখন নারিন্দার একটা মেসে থাকতাম। ওদিক থেকে ঢাকা মাদ্রাসায় আসতে হতো লক্ষ্মীবাজার ঘুরে। আমরা মাদ্রাসায় আসতাম লক্ষ্মীবাজার হয়ে পাঁচ ভাইঘাট লেনের গলির ভেতর দিয়ে। [পুরান ঢাকার রোকনপুরের কাছে পাঁচ ভাইঘাট লেন অবস্থিত। একসময় এ লেনের মাথায় ছিল ধোলাই খাল। এ খালে স্থানীয় মহল্লার এক পরিবারের পাঁচ সন্তান একটি বাঁধানো ঘাট নির্মাণ করেছিলেন বলে জানা যায়। সে থেকে এই নামে পরিচিতি পায়।] এ পথে তো হিন্দুপাড়া ছিল। আমরা ভয়ে ভয়ে আসতাম। কিন্তু আমি বা অন্য যে ছেলেরা আসতাম, অন্ততপক্ষে তারা কোনো খানে আক্রান্ত হয়নি। শুনতাম, কাগজিটোলা বা আগামসি লেনের দিকে বা অমুক জায়গায় আক্রমণ প্রতি-আক্রমণের ঘটনা ঘটেছে। তবে খুব বেশি একটা খুনখারাবি হওয়ার আগেই বোধ হয় সেটা মিটে গিয়েছিল। কিন্তু ওই সময় মফস্বলের অবস্থাটা সম্পূর্ণ অন্য রকম ছিল।

আমার মনে পড়ে, আমাদের গ্রামে এবং পার্শ্ববর্তী কোনো গ্রামে সাম্প্রদায়িকতা বলতে আমরা যা বুঝি, তেমন কিছু হয়নি বা তার তেমন অস্তিত্বও ছিল না। সে সময়ে গ্রামাঞ্চলে মানুষজন ঠিক তেমন শ্রেণীসচেতন না হলেও সামাজিক আচার-আচরণ কতকটা শ্রেণীভিত্তিক ছিল। আর সেটা এই অর্থে যে গ্রামে হিন্দু-মুসলমান হিসেবে ঝগড়া হতো না, সেটা হতো আর দশটা ঝগড়া-ফ্যাসাদের মতোই। এসবই আমার বাল্যকালের সামাজিক চালচিত্র। বিশের দশকের ঘটনা।

১৯১৮ থেকে ১৯২৫-২৬ সাল এবং তার পরের কালের ঘটনাও আছে। তখন যে জমিদার ও তালুকদার শ্রেণী, অর্থাত্ হিন্দু-মুসলমাননির্বিশেষে মধ্যস্বত্বভোগী যে অভিজাত শ্রেণী ছিল, তারা পরস্পর সমানে সমানে ওঠা-বসা করত এবং সাধারণ মানুষের তুলনায় তারা অবশ্যই আলাদা ছিল। হিন্দু-মুসলমাননির্বিশেষে যারা ছিল সাধারণ গরিব মানুষ তাদের ওপর নিপীড়ন বা শোষণ যেটা হতো, হিন্দু-মুসলমান উভয় অভিজাত শ্রেণীই সমানভাবে সেটা করত। আবার উভয় শ্রেণীর অভিজাত ব্যক্তিরা তাদের, অর্থাৎ সাধারণ মানুষজনকে হেয়জ্ঞান করতেন। হিন্দু-মুসলমান পরস্পরের বিরুদ্ধে মামলা-মোকদ্দমা লাগলে, মজার ব্যাপার, উভয় পক্ষে উভয় শ্রেণীর ভেতর থেকেই সাক্ষী-সাবুদ পাওয়া যেত। এসব মামলা-মোকদ্দমা বা গ্রাম্য ঝগড়াঝাঁটির মধ্যে ঠিক সাম্প্রদায়িক ভেদবুদ্ধি ছিল না। এসব ঘটনাকে সাম্প্রদায়িকভাবেও মোকাবিলা করা হতো না।

১৯১১ থেকে ১৯১৪ সালের মধ্যে এ দেশে যে ভূমি জরিপ এবং এ-সংক্রান্ত যে আপসরফা হয়, তাতে করে ১৮৮৫ সালের প্রজাস্বত্ব আইনের প্রভাব কিছুটা পরিলক্ষিত হয়। ওই সময় একদিন আমাদের বাড়িতে এক ব্রাহ্মণ ভদ্রলোক এলেন। তাঁর সঙ্গে আরও পাঁচ-ছয়জনের মতো লোক ছিলেন। তাঁরা দুটো চেয়ার বা জলচৌকিতে বসেছিলেন। ব্রাহ্মণ ভদ্রলোকটির নাম ছিল হেমন্ত কুমার ভট্টাচার্য। এসে তিনি আমার বাবাকে বললেন, ‘মুনশি সাহেব’, আমার বাবাকে তারা মুনশি সাহেব বলতেন, ‘এ তো বড় মুশকিলের ব্যাপার হলো। যে অবস্থা দেখছি, তাতে করে আমাদের পক্ষে তো আর মানসম্মান নিয়ে বাস করাই মুশকিল হয়ে পড়বে। সাধারণ লোকজন গাছটাছ সব কেটেকুটে নিয়ে যাচ্ছে। পুকুর নিতে এখন আর আমাদের অনুমতি লাগবে না। তারা আমাদের আর নগদ সেলামিও দিতে চায় না। আমাদের তো বড় মুশকিল হয়ে দাঁড়াল। সাধারণ লোকজনই এসব করছে।’

আরেকটা ঘটনা আমার মনে আছে। ঘটনাটা ঘটেছিল হাটে। আমি সেখানে ছিলাম। কিছু কৈবর্ত বা জেলে মাছ বিক্রি করছিল। একজন কৈবর্তের কাছে কতগুলো বড় কই মাছ ছিল। মাছগুলোর গ্রাহক ছিল বেশি। তার মধ্যে একজন ব্রাহ্মণও দামাদামি করছিলেন। জেলে বেচারা তার মাছের দাম বোধ হয় বেশি চেয়েছিল। হঠাৎ ব্রাহ্মণ করলেন কী, তাঁর পা’টা কৈবর্তের ঘাড়ের ওপর, নাকি মাথার ওপর চাপিয়ে দিলেন। চাপিয়ে দিয়ে বললেন, ‘মাছগুলো দে।’ কৈবর্ত তখন নিরুপায়। তাঁর খলুইয়ের মধ্যে মাছগুলো তুলে দিল। তার জন্য দাম কত দিয়েছিলেন সেই ব্রাহ্মণ বা আদৌ দিয়েছিলেন কি না, সে কথা এখন আর আমার স্মরণে নেই। কিন্তু কৈবর্তের মাথায় যে পা তুলে দিয়েছিলেন সেই ব্রাহ্মণ, সেটা আমার বেশ মনে আছে।

মু নূ ই: আপনার বাল্যকালে এবং পরবর্তীকালে যখন মাদ্রাসার ছাত্র, আপনার বয়সী ছেলেরা কি বাধ্যতামূলকভাবে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তেন? ইসলামি আচার-আচরণ অনুসরণ করতেন?

আ জা শা: বাল্যকালের আমাদের বাড়ির কথা স্বতন্ত্র। কেননা, আমাদের বাড়িতে তো দুই প্রজন্ম আগে থেকেই নিয়মিত ধর্মকর্মের প্রচলন শুরু হয়েছে। আমাকে বোধ হয় সাত-আট বছর বয়সেই নামাজ শিক্ষা দেওয়া হয়েছিল। বাবার সঙ্গে নামাজ পড়তে হতো। তবে মাঝেমধ্যে কাজাও করতাম। একটা ঘটনার কথা মনে আছে। সেটা ছিল রোজার দিন। রমজান মাসে সব ছেলেকে তারাবির নামাজে শামিল হতে হতো। জিঞ্জিরায় তখন এক হাফেজ সাহেব ছিলেন। তাঁকে মোটা হাফেজ বলা হতো। তিনি আমাদের মসজিদে পবিত্র কোরআন খতম করাচ্ছিলেন। পড়াচ্ছিলেন তখন তারাবির নামাজও। সেদিন ছিল বোধ হয় রোজার শেষ দিন। বেশি সওয়াব পাওয়ার দিন। আমি গিয়েছিলাম। আমার বড় চাচাতো ভাইও আমার সঙ্গে ছিলেন। আরবি উচ্চারণ শেখানোর ব্যাপারে ওই হাফেজ সাহেব খুবই দক্ষ ছিলেন। তিনি উচ্চারণ করছিলেন ‘আরাইতাল্লাজি...ইয়াউল ইয়াতিম’। এতটাই শুদ্ধভাবে তিনি আরবি কথাগুলো উচ্চারণ করছিলেন যে তাঁর বলার ধরনে পেছনে বসে থাকা আমরা কয়েকজন উচ্চহাসিতে ভেঙে পড়েছিলাম এবং দ্রুতই আমরা সেখান থেকে সরে পড়েছিলাম।

মু নূ ই: মাদ্রাসার ছাত্র হিসেবে নামাজ-রোজা আদায় করা কি তখন বাধ্যতামূলক ছিল? নাকি স্বেচ্ছায় পড়তেন?

আ জা শা: না, বাধ্যতামূলক এমন কিছু ছিল না। ঢাকায় আসার পরও নামাজ হয়তো পড়েছি। অনেক সময় পড়িওনি। কিন্তু ব্যাপারটা তেমন বাধ্যতামূলক কিছু ছিল না। তবে জুমার নামাজে যেতাম, সে কথা মনে আছে। মেসে থাকার সময় বা জায়গির থাকতে অবশ্য ওয়াক্তের নামাজ নিয়মিত পড়তে হতো। তবে মেসে থাকার সময় খুব নিয়মিত নামাজ পড়েছি বলে মনে পড়ে না।

সূত্র: প্রতিচিন্তা, এপ্রিল ৮, ২০১৭
ছবি: সংবর্ধনা সভায় কথা বলছেন আবু জাফর শামসুদ্দীন , ২৩শে ডিসেম্বর, ১৯৮৬।

Want your school to be the top-listed School/college?

Telephone