23/04/2026
জনগণের অধিকার আদায়ের বিরোধী ছিল মুসলিম লীগ, সে জন্য তাদের প্রতিষ্ঠা হয়নি
বাঙালি মুসলমানের ইতিহাস, পর্ব ৭
সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আবু জাফর শামসুদ্দীনের আত্মজৈবনিক সাক্ষাৎকার, পর্ব ৭
[ সাক্ষাৎকারটি জাতীয় জাদুঘরের কথ্য ইতিহাস প্রকল্পের আওতায় ১৯৮৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ড. সালাহউদ্দীন আহমদ ও ড. মুস্তাফা নূরউল ইসলাম নিয়েছিলেন]
মু নূ ই: আপনি বললেন যে আজাদ যখন প্রথম ঢাকায় আসে, অর্থাৎ কলকাতা থেকে তার চলে আসার কথা হয়, তখন নাজিমুদ্দিন সাহেব, হামিদুল হক চৌধুরী খুব পক্ষে ছিলেন না। আমার জিজ্ঞাসা হচ্ছে, কলকাতাকেন্দ্রিক মুসলিম লীগ পার্লামেন্টারি পার্টির যে রাজনীতি ছিল, সেখানে তো একদিকে ছিলেন হামিদুল হক চৌধুরী, মওলানা আকরম খাঁ, নাজিমুদ্দিন, মোহন মিয়া প্রমুখ এবং অন্যদিকে ছিলেন সোহরাওয়ার্দী সাহেব, আবুল হাশিম সাহেব প্রমুখ। তাহলে আজাদ পত্রিকাকে ঢাকায় আনতে তাঁরা আপত্তি করছিলেন কেন?
আ জা শা: তাঁদের এই আপত্তির পেছনে একটা মনস্তাত্ত্বিক কারণ ছিল বলে আমি মনে করি। মওলানা আকরম খাঁ পশ্চিম বাংলার লোক। মুসলিম লীগের কাগজ নিয়ে এখানে (কাগজ তো একটা বড় অস্ত্র) এসে তাঁদের ওপর প্রভুত্ব করবেন, এটা বোধ হয় তাঁরা চাননি। মোহন মিয়া চাননি। হামিদুল হক চৌধুরীও চাননি। নাজিমুদ্দিনও চাননি। মুখে কিন্তু বলেছেন, হ্যাঁ, হ্যাঁ, আসা দরকার। কিন্তু তাঁদের দীর্ঘসূত্রতা থেকে আমাদের মনে হয়েছে, ব্যাপারটা তাঁরা চাননি। তবে নূরুল আমীন সাহেব এ ব্যাপারে একটু স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্বের পরিচয় দিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন তাঁদেরই দলের লোক। কিন্তু তিনি কেন জানি না, আজাদকে ঢাকায় আনার ব্যাপারে একটু বেশিই সহানুভূতিশীল ছিলেন। প্রধানত নূরুল আমীনের চেষ্টাতেই আজাদ-এর জন্য জমিটা পাওয়া গিয়েছিল।
মু নূ ই: আপনি রাজনৈতিক দিক থেকে এম এন রায়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। আর লাহোর প্রস্তাবের পর থেকে আজাদ সম্পূর্ণভাবে পাকিস্তান আন্দোলনের পক্ষপাতী হয়ে গেল। আজাদই এই আন্দোলনকে জনপ্রিয় করে তুলেছিল। তখন এখানকার আজাদ অফিসে তার প্রাথমিক অবস্থায় সাব-এডিটর, পরে অ্যাসিস্ট্যান্ট এডিটরের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে আপনি অ্যাডজাস্ট করেছিলেন কীভাবে?
আ জা শা: অ্যাডজাস্ট করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় যে ব্যাপারটা কাজ করেছে, সেটা হচ্ছে মওলানা আকরম খাঁ সরাসরি তাঁর নিজস্ব সম্পাদকীয় বা লেখাগুলো লিখে দিতেন। আবুল কালাম শামসুদ্দীন সাহেবকে ওপরে ডেকে নিয়ে গিয়ে হয়তো কখনো আলোচনা করতেন। কিন্তু একটা লেখার ওপর ডাইরেক্টলি হস্তক্ষেপ তিনি করতেন না। আমি যখন সম্পাদকীয় লিখতাম, আবুল কালাম শামসুদ্দীন সাহেব সেগুলো দেখে দিতেন। মুসলিম লীগের পয়েন্ট অব ভিউ থেকেই সবকিছু লেখা হতো। তবে তার মধ্যে যতখানি সম্ভব, আমি নিজে একটু রেডিক্যাল মনোভাব বা যুক্তিনির্ভর সম্পাদকীয় লেখার চেষ্টা করতাম। একটা ঘটনার কথা আমার মনে আছে। আমি একটা সম্পাদকীয় লিখেছিলাম। আবুল কালাম শামসুদ্দীন সাহেব সেটা পাস করে দিয়েছিলেন। ছাপাও হয়ে গিয়েছিল। সম্পাদকীয়টা যখন লিখেছিলাম, তখন একটা ব্যাপার ভয়ানকভাবে চলছিল, মুসলিম লীগের তথাকথিত কর্মীদের গুন্ডামি ও দুর্নীতি তখন প্রায় আকাশচুম্বী। ঢাকায়ও চুরিচামারি, দুর্নীতি ইত্যাদি আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গেছে। তখন সাধারণ মানুষের মধ্যে এ রকমের একটা ধারণা ছিল যে দুর্নীতিবাজ আর চোর-বাটপার মুসলিম লীগারদের ধরে নিয়ে চালান দেওয়া হলো, কিন্তু থানাওয়ালাদের বলে-কয়ে, তদবির করে মুসলিম লীগের নেতারা তাঁদের কর্মী বলে বের করে আনতেন। এ সম্পর্কেই তখন আমি একটা কড়া এডিটোরিয়াল লিখেছিলাম, সেটা ছাপাও হয়েছিল।
ছাপা হওয়ার পর ব্যস, আর কোনো কথা নেই, বোধ হয় সৈয়দ আবদুস সেলিম বা সাহেব আলমসহ ঢাকার মুসলিম লীগের আরও জনপ্রিয় নেতা মওলানা আকরম খাঁর কাছে অভিযোগ নিয়ে যান। তিনি ব্যাপারটাকে তাঁর গ্রাহ্যের মধ্যে নেন। আমাকে ডেকে একটা কথা বলেছিলেন তিনি। বেশি কিছু বলেননি, কেবল বলেছিলেন, ‘তুমি একটা সাদাসিধে লোক।’ এর বেশি কোনো মন্তব্য তিনি করেননি। বলেছিলেন, ‘এ ধরনের লেখাটেখা ঠিক নয়।’
এ ধরনের ব্যাপারস্যাপার নিয়ে আমার সঙ্গে তেমন একটা বনত না। তবে আবুল কালাম শামসুদ্দীন সাহেব লিখতেন মুসলিম লীগের পয়েন্ট অব ভিউ থেকে। কিন্তু আমরা যারা তাঁর সহকারী ছিলাম, তাদের লেখার ওপর তিনি খুব বেশি একটা হাত দিতেন না। তবে তাঁর একটা কথা আমার এখনো মনে আছে। তিনি একদিন বলেছিলেন, আমার একটা লেখা প্রসঙ্গে যে, ‘দেখেন, সাধারণ পাঠকসমাজেরও কিছু বুদ্ধিশুদ্ধি আছে। তারাও নিজের ধরনে চিন্তাভাবনা করে থাকে। এ কথাটা মনে রেখেই লেখা লিখবেন এবং যতটা সম্ভব সংক্ষেপে লিখবেন। তাদের চিন্তাভাবনা করার সুযোগটাও রাখবেন।’
এভাবে কোনোমতে আজাদ-এর সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিয়েছিলাম। আসলে ওটা ছিল আমার চাকরি। এখনো তো একটাই যুক্তি। আজকের দিনেও একটাই যুক্তি, যাঁরা চাকরি করেন, তাঁরাও প্রোগ্রেসিভ। কিন্তু চাকরি করি বলেই হুকুম মানতে হয়।
মু নূ ই: বাস্তব কারণেই খাপ খাইয়ে নিতে হয়। আপনার কাছে শেষ প্রশ্ন, তেভাগা আন্দোলন যখন বাংলাদেশের বেশ কতগুলো জায়গায় শুরু হয়, সেই আন্দোলন যদি সফল হতো, তাহলে মুসলমান চাষিরাই উপকৃত হতেন বেশি। সে সময় তো আপনারা কলকাতায় ছিলেন। আন্দোলনটা দেখেছেন। ওই সময় আজাদ পত্রিকার ভূমিকা কী ছিল?
আ জা শা: আমি ঠিক তখন কলকাতায় ছিলাম না বোধ হয়। তেভাগা আন্দোলনটা বোধ হয় ১৯৪৪-৪৫ সালের আগে থেকেই শুরু হয়। শুরু হয় ছেচল্লিশ সন থেকে। তখন আমি ঢাকায়। কারণ, ১৯৪৫ সালের মাঝামাঝি আজাদ-এর এখানকার প্রতিনিধি হিসেবে আমি ঢাকায় চলে আসি। তেভাগা আন্দোলন আমাকে খুবই আকর্ষণ করত। তবে সেটা ব্যক্তিগতভাবে এবং আমি ওটার সমর্থকও ছিলাম। কিন্তু আজাদ-এর ভূমিকা বোধ হয়, আমার মনে যত দূর পড়ছে, সর্বতোভাবে তেভাগা আন্দোলনের এবং তাতে অংশগ্রহণকারী জনগণের বিরোধীই ছিল। তাদের তো একমাত্র পুঁজি ছিল ইসলাম। তবে কখনো কখনো জনগণের কিছু দাবিদাওয়া তো সমর্থন করতেই হতো। সে রকমও তারা করত। আমার ঠিক এখনো এটা মনে পড়ছে না। তবে তেভাগা আন্দোলনকে তো সাংঘাতিকভাবে দমন করা হয়েছিল এবং রাজশাহী জেলে তো গুলি পর্যন্ত চালানো হয়েছিল। এতে অনেক লোকজনও মারা গিয়েছিল। তারপর হাজং-টংকদের নিয়ে মণি সিংহদের যেসব আন্দোলন, সেগুলোও সাংঘাতিকভাবে দমন করা হয়েছিল। পাকিস্তান কায়েম হওয়ার পর তো সেই আন্দোলনকে আরও বেশি দমন করা হয়। অথচ এসবই ছিল জনগণের অধিকার আদায়ের আন্দোলন। কিন্তু সে বিচারে জনগণের অধিকার আদায়ের বিরোধী ছিল মুসলিম লীগ, সে জন্য তাদের প্রতিষ্ঠা হয়নি। মুসলিম লীগ তো জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য ভারত বিভাগ করেনি। তারা সেটা করেছিল মুসলমানরা যে আলাদা জাতি, সেটা প্রমাণ করার জন্য। তাদের মধ্যে কোনো শ্রেণী নেই, এ রকমটাই তারা ভাবত। মুসলমানরা আলাদা জাতি যখন, জাতি হলেই হলো। আর লিডারশিপ সম্পর্কে এডমান বার্ক বলেছিলেন, চার্চ ও অভিজাত শ্রেণীই হচ্ছে ন্যাচারাল রুলার। তো মুসলিম লীগও ছিল চার্চ ও রুলিং ক্লাসের প্রতিনিধি। মি. জিন্নাহ তো ধার্মিক ব্যক্তি ছিলেন না। তাঁরা দেশ শাসন করবেন। আলাদাভাবে লুটপাট করবেন। এই মনোভাব ছাড়া তো আর কোনো মনোভাব কোনো রকম হাই ফিলোসফি বা মতাদর্শ তাঁদের ছিল বলে আমার মনে হয় না।
মু নূ ই: আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।
আ জা শা: আপনাকেও ধন্যবাদ।
ছবি: আবু জাফর শামসুদ্দীনের ৩টি বই
সূত্র: প্রতিচিন্তা, এপ্রিল ৮, ২০১৭
#বিংশশতকেবাংলাদেশ #বাংলাদেশেরইতিহাস
22/04/2026
21/04/2026
20/04/2026
19/04/2026