09/09/2026
চার দশক আগের একটি ছবি। ছবির সাতজনই সহোদর। আশি ও নব্বইয়ের দশকে তাঁরা পড়েছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। কুড়িগ্রামের মতো শিক্ষা ও অর্থনীতিতে পিছিয়ে থাকা একটি জনপদে, যখন মেয়েদের উচ্চশিক্ষার পথও ছিল নানা সামাজিক বাধায় সংকুচিত, তখন একই পরিবারের ছয় কন্যা ও এক পুত্রের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার গল্পটি ছিল ব্যতিক্রমী। সেই গল্পের নেপথ্যে ছিলেন ডা. সোহরাব আলী ও হুরমান নেছা।
চার দশক আগের ছবিটি দেখলে প্রথমে চোখে পড়ে সাতটি মুখ। পাশাপাশি দাঁড়িয়ে-বসে থাকা ভাই-বোনদের মুখে তখন তারুণ্যের ছাপ। ছবিটি এখন পুরোনো, সময় বদলে গেছে, বদলে গেছে তাঁদের জীবনের অনেক কিছু। কিন্তু ছবিটির দিকে তাকালে একটি বিষয় আজও স্পষ্ট—এই সাতজনের স্বপ্নের ঠিকানা ছিল একই।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।
আশি ও নব্বইয়ের দশকে তাঁরা একে একে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য ভর্তি হন। কেউ পড়েছেন বিজ্ঞান, কেউ বাংলা, কেউ মনোবিজ্ঞান, কেউ হিসাববিজ্ঞান। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা শেষ করে তাঁরা ছড়িয়ে পড়েছেন শিক্ষকতা, অধ্যাপনা ও বেসরকারি উন্নয়নমূলক কাজের নানা ক্ষেত্রে।
তবে তাঁদের গল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পরের নয়; বরং তারও আগে। কারণ তাঁরা এসেছিলেন কুড়িগ্রাম থেকে—তৎকালীন সময়ে শিক্ষা ও অর্থনীতিতে দেশের পিছিয়ে থাকা জনপদগুলোর একটি। আর সাতজনের মধ্যে ছয়জনই ছিলেন মেয়ে।
সেই সময়ে একটি মেয়েকে উচ্চশিক্ষার জন্য দূরের শহরে পাঠানোই অনেক পরিবারের কাছে ছিল বড় সিদ্ধান্ত। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা তো আরও দূরের বিষয়। সামাজিক রক্ষণশীলতা, নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ, অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা—সবকিছু মিলিয়ে মেয়েদের শিক্ষাজীবন অনেক সময় কলেজের গণ্ডি পেরোতে পারত না।
সেই বাস্তবতার মধ্যেই ভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন ডা. সোহরাব আলী ও হুরমান নেছা।
তাঁরা বিশ্বাস করেছিলেন, সন্তান ছেলে হোক কিংবা মেয়ে—তার সামনে উচ্চশিক্ষার দরজা খোলা থাকা উচিত। সামর্থ্য সীমিত ছিল, কিন্তু স্বপ্নের সীমা ছিল না। কুসংস্কার ও সামাজিক প্রতিবন্ধকতাকে পাশ কাটিয়ে তাঁরা সন্তানদের উচ্চশিক্ষার জন্য পাঠিয়েছিলেন।
একজন-দুজন নয়, সাতজনকেই।
সাত ভাই-বোনের শিক্ষাযাত্রার দিকে তাকালে পরিবারের সেই সিদ্ধান্তের গভীরতা আরও বোঝা যায়।
ছবিতে দাঁড়িয়ে বাঁ দিকে থাকা হালিমা খাতুন পড়েছেন বোটানি। পরবর্তী সময়ে কারমাইকেল কলেজে শিক্ষকতা করেছেন এবং সেখান থেকেই অবসর নিয়েছেন। তাঁর পাশের সাইদা খাতুনের বিষয় ছিল বাংলা। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি শিক্ষকতা করেছেন এবং শেরপুর সরকারি ভিক্টোরিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে অবসরে গেছেন।
ডানে থাকা সালমা খাতুন পড়েছেন মনোবিজ্ঞান। তিনিও শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত ছিলেন। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শেষ করেছেন।
ছবিতে বসে থাকা চারজনের শিক্ষাজীবনও সমান বৈচিত্র্যময়।
শামসুন নাহের রেশমা পড়েছেন পদার্থবিজ্ঞান। সাইদুল ইসলাম বাবু পড়েছেন গণিত। নাজমুন নাহের সুইটির বিষয় ছিল বাংলা সাহিত্য। আর কামরু নাহের রুমা পড়েছেন হিসাববিজ্ঞান। তাঁদের কর্মজীবনও বিস্তৃত হয়েছে অধ্যাপনা, শিক্ষকতা ও বেসরকারি সাহায্য সংস্থার মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে।
অর্থাৎ, একই পরিবারের সাত সন্তান—সাতটি ভিন্ন বিষয়, ভিন্ন পেশা, ভিন্ন কর্মজীবন। কিন্তু তাঁদের জীবনের ভিত তৈরি হয়েছিল একই জায়গায়—শিক্ষা।
এই পরিবারের গল্পকে শুধু সাতজন ভাই-বোনের সাফল্য দিয়ে ব্যাখ্যা করলে হয়তো পুরো বিষয়টি ধরা পড়বে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি সময়ের সামাজিক বাস্তবতা।
আজকের দিনে বিশ্ববিদ্যালয়ে মেয়েদের উপস্থিতি স্বাভাবিক দৃশ্য। কিন্তু চার দশক আগে কুড়িগ্রামের একটি পরিবার থেকে একসঙ্গে ছয় মেয়ের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যাওয়া ছিল সহজ কোনো ঘটনা নয়। তখন উচ্চশিক্ষা ছিল অনেক পরিবারের কাছে ছেলেদের জন্য বেশি অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত। মেয়েদের ক্ষেত্রে বিয়ে, সংসার কিংবা সামাজিক নানা প্রত্যাশা শিক্ষার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াত।
সেই জায়গায় সোহরাব আলী ও হুরমান নেছার সিদ্ধান্ত ছিল ভবিষ্যৎমুখী।
তাঁরা হয়তো তখন জানতেন না, তাঁদের সন্তানদের ছবি একদিন চার দশক পর ফিরে তাকানোর মতো একটি গল্প হয়ে উঠবে। জানতেন না, তাঁদের পরিবারের শিক্ষার সিদ্ধান্ত একটি জনপদের সামাজিক পরিবর্তনের গল্পের সঙ্গেও যুক্ত হয়ে যাবে।
কিন্তু তাঁরা একটি বিষয় বুঝেছিলেন—একটি সন্তানকে শিক্ষিত করার অর্থ শুধু তার নিজের জীবন বদলে দেওয়া নয়; তার মাধ্যমে একটি পরিবার, এমনকি একটি সমাজও বদলে যেতে পারে।
সাত ভাই-বোনের জীবন যেন সেই বিশ্বাসেরই প্রতিফলন।
তাঁদের কেউ শিক্ষক হয়েছেন, কেউ প্রধান শিক্ষক, কেউ অধ্যাপনায় যুক্ত হয়েছেন, কেউ কাজ করেছেন উন্নয়নমূলক প্রতিষ্ঠানে। তাঁদের কর্মজীবনের মধ্য দিয়ে শিক্ষা আবারও ফিরে গেছে মানুষের কাছে।
এক প্রজন্ম তাঁদের সন্তানদের বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠিয়েছিল। পরের প্রজন্ম সেই শিক্ষাকে পেশা ও সামাজিক দায়িত্বের মাধ্যমে অন্যদের কাছে পৌঁছে দিয়েছে।
কুড়িগ্রামের মতো জনপদে শিক্ষার প্রসারে এমন পরিবারগুলোর অবদান তাই শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের হিসাব দিয়ে মাপা যায় না। তাঁরা নিজেদের ঘরের ভেতর থেকেই শিক্ষার পক্ষে একটি অবস্থান তৈরি করেছিলেন। সেই অবস্থান হয়তো অনেক নীরব ছিল, কোনো ব্যানার বা স্লোগান ছিল না; কিন্তু তার প্রভাব ছিল দীর্ঘস্থায়ী।
চার দশক আগের ছবিতে তাই শুধু সাতজন তরুণ-তরুণীকে দেখা যায় না। দেখা যায় একটি সময়কে। দেখা যায় একটি পরিবারের সাহসী সিদ্ধান্তকে। দেখা যায় এমন এক বাবা-মাকে, যাঁরা সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও সন্তানের স্বপ্নকে সীমাবদ্ধ করেননি।
আর সবচেয়ে বড় করে দেখা যায়—একটি পরিবারের ছয় কন্যা ও এক পুত্রের শিক্ষার পথে এগিয়ে যাওয়ার দৃশ্য।
কুড়িগ্রামের মাটি থেকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। সেখান থেকে শিক্ষকতা, অধ্যাপনা ও মানুষের সেবায় ছড়িয়ে পড়া জীবন।
ছবিটি চার দশকের পুরোনো। কিন্তু ছবির গল্পটি আজও নতুন।
কারণ সময় বদলালেও একটি সত্য বদলায়নি—একটি পরিবার যখন শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দেয়, তখন তার প্রভাব শুধু একটি প্রজন্মে থেমে থাকে না।