Islamic research center munshiganj/ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার মুন্সিগঞ্জ

Islamic research center munshiganj/ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার মুন্সিগঞ্জ

Share

যে কোন বিষয়ের ফতোয়াও ফারায়েজ দেওয়া হয়?

19/05/2025

গান করা বা নাটক সিনেমা করা জায়েজ কিনা এবং এর মাধ্যমে অর্জিত পারিশ্রমিক হালাল হবে কিনা?

উত্তর: গান করা বা নাটক সিনেমা করা ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে জায়েজ নেই এবং এর মাধ্যমে উপার্জিত আমদানিও হালাল নয়, তাই এই নাজায়েজ (অন্যায়) কাজ থেকে বিরত থাকা প্রতিটি মুসলমানের অবশ্য কর্তব্য। এর মাধ্যমে উপার্জিত অর্থ যেহেতু হালাল নয় তাই তা গ্রহণ না করা এবং গ্রহণ করে থাকলে তা সদকা করে দেওয়া আবশ্যক।
ফতোয়া মাহমুদিয়া: ১৭/১০৯

07/01/2025

ইলমে হাদিসের সূক্ষ্মতা ও পদে পদে পদস্খলনের আশঙ্কা।
হাদিসের ইলম এত সহজ নয়, যত সহজ আজ মনে করা হয়। এটা খেল-তামাশা নয় যে, অভিজ্ঞতা অর্জনের নামে যে কেউ নেমে পড়বে এই অঙ্গনে। এটা অনেক প্রশস্ত ও স্পর্শকাতর এলাকা! ফক্বীহ না হলে পদে পদে বিপদের আশঙ্কা রয়েছে। এমনকি ভয় আছে পদস্খলনের। প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস হযরত সুফিয়ান ইবনে উয়াইনা রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন,
الحديث مضلة إلا للفقهاء.
ফক্বীহ ছাড়া অন্যদের জন্য হাদিস পদস্খলনের জায়গা।
অর্থাৎ কোন ব্যক্তি যদি ফক্বীহ না হয়, তাহলে হাদিস তার জন্য গোমরাহীর কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। সীরাতে মুস্তাকিম থেকে সরে যাওয়ার কারণ হতে পারে।
এমনিভাবে হাদিস ও ফিক্বহের বড় আলেম ইমাম মালেক ও ইমাম লাইস ইবনে সাআদ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি এর অন্যতম প্রসিদ্ধ সাগরিদ ইমাম আব্দুল্লাহ বিন ওয়াহাব মিসরী রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন,
الحديث مضلة إلا للعلماء.
অর্থাৎ দিনের গভীর বুঝসম্পন্ন ওলামায়ে কেরাম ছাড়া অন্যান্য লোকের জন্য হাদিস পদস্খলনের ক্ষেত্রে।
ইমাম মালেক রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেছেন,
كثير من الأحاديث ضلالة.
অর্থাৎ এমন অনেক হাদিস রয়েছে কারো মাঝে সূক্ষ্ম বোঝ উত্তীর্ণ মেধা না থাকলে সেসবের মাধ্যমে সে বিভ্রান্তও হতে পারে।

(অতএব ইলমে হাদিসের ক্ষেত্রে আমাদের সতর্কতা অবলম্বন করা একান্ত কাম্য। যে কেউ হাদিস নিয়ে গবেষণা করলে গোমরা হওয়ার সম্ভাবনা আছে।)

ফিকহী ইখতেলাফ সালাফের পন্থা ও আমাদের করণীয়: ২০ পৃষ্ঠা।

08/12/2024

*সিরিয়ার বিজয়ে কেন আমরা শুকরিয়া আদায় করছি*

একে তো সিরিয়া মুসলিমদের দ্বারা বিজিত হয়েছে। পৃথিবীর যেখানেই মুসলমানদের বিজয় হোক সেটা আমাদের এই বিজয়। তাই আমরা শুকরিয়া আদায় করছি। বিশেষত সিরিয়া মুসলমানদের জন্য একটি বিশেষ ভূখণ্ড সেজন্যও সিরিয়ার বিজয় শুকরিয়ার দাবি রাখে।

‌সিরিয়া হল নবীজির যুগের শাম রাজ্য
নবীজি (সা.)-এর যুগে শাম একটি বৃহৎ ভৌগোলিক অঞ্চলকে নির্দেশ করত, যা বর্তমানের বেশ কয়েকটি দেশের অংশজুড়ে বিস্তৃত ছিল। ঐতিহাসিকভাবে শাম বলতে বোঝানো হতো পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের একটি বৃহৎ এলাকা। বর্তমানে শামের অন্তর্ভুক্ত অঞ্চলগুলো হলো:

১. সিরিয়া
শামের মূল অংশ সিরিয়াকে কেন্দ্র করেই গঠিত। এটি শামের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল এবং এখনো ঐতিহাসিকভাবে এর সঙ্গে শামের পরিচিতি জড়িয়ে আছে।

২. লেবানন
লেবানন শামের দক্ষিণ-পশ্চিম অংশে অবস্থিত। এটি ঐতিহাসিক শামের একটি অংশ, যা সমুদ্র উপকূলীয় অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত।

৩. জর্ডান
জর্ডানও শামের অন্তর্ভুক্ত ছিল। আম্মান ও আশপাশের এলাকা নবীজি (সা.)-এর সময় শামের দক্ষিণ অংশে অন্তর্ভুক্ত ছিল।

৪. ফিলিস্তিন
ফিলিস্তিন শামের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। বায়তুল মুকাদ্দাস বা আল-আকসা মসজিদ এই অঞ্চলে অবস্থিত, যা ইসলামের প্রথম কিবলা।

৫. ইসরায়েল (বর্তমান ফিলিস্তিনের একটি অংশ)
ফিলিস্তিনের সঙ্গে ইসরায়েলের বর্তমান এলাকা ঐতিহাসিক শামের অন্তর্ভুক্ত ছিল।

অতিরিক্ত:
শামের এই অঞ্চলটি ইসলামের প্রথম যুগ থেকেই গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও ধর্মীয় কেন্দ্র ছিল। এটি ইসলামি খেলাফতের শাসনামলে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছিল এবং এখান থেকেই অনেক বড় বড় ঘটনা সংঘটিত হয়েছে।

ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে:
শাম বলতে তৎকালীন সময়ের বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত সিরিয়া, ফিলিস্তিন, লেবানন, ও জর্ডানের সমন্বিত অঞ্চল বোঝানো হতো। নবীজি (সা.)-এর যুগে এই এলাকাগুলো ইসলামি খেলাফতের অধীনে আসার পর, একে ইসলামের একটি প্রধান কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়।

‌সিরিয়া (শাম) ভূমির ফজিলত।
সিরিয়া (শাম) সম্পর্কে ইসলামে বিভিন্ন হাদিস পাওয়া যায়, যা এর ফজিলত ও গুরুত্বকে উল্লেখ করে। এখানে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য হাদিস দেওয়া হলো:

১. শামের বিশেষ বরকত
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"তোমরা শামকে আঁকড়ে ধরো, কারণ তা আল্লাহর জমিনে সবচেয়ে উত্তম স্থান। আল্লাহ তাতে তাঁর সৃষ্টিকে একত্রিত করবেন।"
— (মুসনাদ আহমদ: ১৭৭৪৮)

২. শাম এবং ফিরিশতাদের ডানা
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"শাম হচ্ছে আল্লাহর জমিন। সেখানেই আল্লাহর ফেরেশতারা তাঁদের ডানা বিছিয়ে রাখেন।"
— (তিরমিজি: ৩৯৫৪)

৩. ফিতনার সময় শামের দিকে যাওয়ার নির্দেশ
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে হাওয়ালা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"একদিন ফিতনা হবে এবং তখন যদি তুমি জীবিত থাকো, তাহলে শামের দিকে যাও।"
— (সুনান আবু দাউদ: ২৪৮৩)

৪. শামে ইসলাম টিকে থাকবে
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"একদল মুসলিম সবসময় আল্লাহর আদেশ মেনে লড়াই করবে এবং বিজয়ী থাকবে। যারা তাদের সাহায্য করবে না বা বিরোধিতা করবে না, তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। তারা কিয়ামত পর্যন্ত শামে থাকবে।"
— (বুখারি: ৩৬৪১)

৫. শামের বিশেষ স্থান
হযরত আবু উমামা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"শাম হচ্ছে জান্নাতের দরজাগুলোর একটি দরজা।"
— (তাবারানি)

৬. শাম ও দাজ্জালের সময়
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, দাজ্জাল যখন আসবে, তখন ঈসা (আ.) শামে নেমে তাকে হত্যা করবেন।
— (মুসলিম: ২৯৩৭)

শাম শুধু একটি ভৌগোলিক স্থান নয়, বরং ইসলামের ঐতিহাসিক ও আধ্যাত্মিক দিক থেকে একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমি। শামের প্রতি দোয়া এবং ভালোবাসার জন্য মুসলমানদের বিশেষভাবে উৎসাহিত করা হয়েছে।

‌সিরিয়াতে মুসলমানের ঘাঁটি

সিরিয়ার গোতা (الغوطة) অঞ্চল সম্পর্কে হাদিসে উল্লেখ পাওয়া যায়। এটি সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কের (দিমাশক) নিকটবর্তী একটি উর্বর অঞ্চল। হাদিসে এই অঞ্চলকে বিশেষ ফজিলতপূর্ণ ও নিরাপদ স্থান হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, বিশেষত কিয়ামতের পূর্ববর্তী সময়ের প্রেক্ষাপটে।

হাদিসে গোতার উল্লেখ:
১. হযরত আবু দারদা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"ইমানের ঘাঁটি (অর্থাৎ কেন্দ্রস্থল) হবে শামের মধ্যে। আর শামের মধ্যে হবে দামেস্ক এবং দামেস্কের পাশে একটি এলাকা, যাকে বলা হয় গোতা।"
— (আবু দাউদ: ৪২৯৮)

২. রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"কিয়ামতের দিন মুসলমানদের শক্তিশালী ঘাঁটি হবে শামের একটি এলাকা, যা গোতা নামে পরিচিত। এটি দিমাশকের (দামেস্কের) নিকটবর্তী।"
— (আল-তাবারানি: আল-মুজামুল কাবীর)

ব্যাখ্যা:
গোতা: এটি একটি উর্বর ও কৃষিকেন্দ্রিক এলাকা, যা প্রাচীনকাল থেকেই গুরুত্বপূর্ণ।

হাদিসে এটিকে ইমানের ঘাঁটি ও মুসলমানদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

কিয়ামতের আগে দাজ্জালের আগমন এবং ঈসা (আ.)-এর ভূমিকা সম্পর্কিত বিভিন্ন বর্ণনায় শামের গুরুত্ব এবং তার মধ্যে দামেস্ক ও গোতার গুরুত্ব বিশেষভাবে উঠে এসেছে।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট:
গোতা ইসলামি খেলাফতের সময় থেকেই একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূখণ্ড হিসেবে পরিচিত। এটি শুধু সামরিক ঘাঁটি নয়, বরং কৃষি, বসতি, ও ঐতিহাসিক গুরুত্বে সমৃদ্ধ ছিল।

উপসংহার:
গোতা সম্পর্কে হাদিসে যে বিবরণ এসেছে, তা মুসলমানদের জন্য এই অঞ্চলের ফজিলত এবং এর আধ্যাত্মিক ও ঐতিহাসিক গুরুত্বের প্রতি নির্দেশ করে।

‌গোতা অঞ্চল

গোতা (Al-Ghouta বা الغوطة) অঞ্চলটি সিরিয়ার দামেস্কের (Damascus) উপকণ্ঠে অবস্থিত। এটি মূলত দামেস্ক শহরের পূর্ব এবং দক্ষিণ-পূর্ব দিকে বিস্তৃত একটি উর্বর এলাকা। আলেপ্পো (Aleppo) থেকে এটি বেশ দূরে, উত্তর দিকে অবস্থিত। সুনির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে:

গোতার অবস্থান:
1. দামেস্ক শহরের চারপাশে:
গোতা অঞ্চল দামেস্কের পাশেই একটি গ্রামীণ ও উর্বর এলাকা। এটি মূলত দামেস্ককে ঘিরে থাকা কৃষিজমি এবং ছোট ছোট গ্রাম নিয়ে গঠিত।

2. আলেপ্পো থেকে দূরত্ব:
দামেস্ক থেকে আলেপ্পোর দূরত্ব প্রায় ৩৬০ কিলোমিটার। আলেপ্পো উত্তর সিরিয়ায় অবস্থিত, আর গোতা অঞ্চল দামেস্কের খুব কাছাকাছি, যা দক্ষিণ সিরিয়ায় অবস্থিত।

3. উর্বরতা ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব:
গোতা এলাকা একটি সমতল ভূমি, যা প্রাচীনকাল থেকেই শস্য উৎপাদন এবং বসতির জন্য বিখ্যাত। এর ভৌগোলিক অবস্থান এবং উর্বর মাটি এটিকে সিরিয়ার একটি কৌশলগত ও ঐতিহাসিক অঞ্চল হিসেবে গড়ে তুলেছে।

মানচিত্র অনুযায়ী:
দামেস্কের কেন্দ্র থেকে পূর্ব দিকে ৫-১০ কিলোমিটার দূরেই গোতা অঞ্চলের শুরু।

এটি দক্ষিণ-পূর্ব দিকে বেশ প্রসারিত, যেখানে বিভিন্ন ছোট ছোট গ্রাম ও কৃষি জমি রয়েছে।

সাম্প্রতিক প্রেক্ষাপট:
গোতা অঞ্চল, বিশেষত পূর্ব গোটা (Eastern Ghouta), সাম্প্রতিক সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের সময়ও খুব আলোচিত ছিল। এটি দীর্ঘ সময় ধরে যুদ্ধ ও অবরোধের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।

উপসংহার:
গোতা অঞ্চল দামেস্কের নিকটবর্তী, এটি আলেপ্পো থেকে অনেক দূরে অবস্থিত। ইসলামের ঐতিহাসিক বিবরণে এর গুরুত্ব রয়েছে, বিশেষত দামেস্কের কেন্দ্রস্থল হিসেবে।

26/09/2024

#প্রয়োজন_এক_নতুন_শিক্ষাব্যবস্থা_

-হযরত মাওলানা #মুফতি_তাকী_উসমানী হাফিঃ

আব্বাজান হযরত মাওলানা #মুফতী_মুহাম্মাদ_শফী রাহি.-এর একটি কথা আমি প্রায়ই বলে থাকি। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পূর্বে ভারতবর্ষে (মুসলিমদের জন্য) বিশেষ তিনটি শিক্ষাধারা প্রচলিত ছিল।
#ক. দারুল উলূম দেওবন্দভিত্তিক শিক্ষাধারা। #খ. আলীগড় মুসলিম ইউনিভার্সিটি কেন্দ্রিক পড়াশোনা।
#গ. দারুল উলূম নদওয়াতুল উলামার সিলেবাস কেন্দ্রিক শিক্ষাধারা।

যথাসম্ভব ১৯৫০ সনে আব্বাজান রাহ. কোনো সাধারণ এক সমাবেশে বক্তৃতা করতে গিয়ে বলেছিলেন- ‘পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর আমাদের আলীগড়ের শিক্ষাব্যবস্থার প্রয়োজন নেই, নদওয়ারও প্রয়োজন নেই; এমনকি প্রয়োজন নেই দারুল উলূম দেওবন্দের শিক্ষাব্যবস্থারও; বরং আমাদের প্রয়োজন একটি তৃতীয় শিক্ষাব্যবস্থা, যা আসলাফ ও পূর্বসূরীদের ইতিহাসের ধারায় আমাদেরকে সম্পৃক্ত করবে।’
এমন কথা শুনে অনেকেই হয়ত ভ্রু কুঁচকে ফেলবেন। দারুল উলূম দেওবন্দের নুন খাওয়া এক সুবোধ সন্তান, দারুল উলূম দেওবন্দের আস্থাভাজন প্রধান মুফতী কীভাবে এমন কথা বলতে পারেন যে, পাকিস্তানে আমাদের জন্য দেওবন্দের শিক্ষাধারারও প্রয়োজন নেই। আমাদের প্রয়োজন একটি নতুন শিক্ষাব্যবস্থার!

আব্বাজান রাহ.-এর এ বক্তব্যটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম এবং দূরদর্শিতাপূর্ণ। বিষয়টি না বোঝার দরুন আমাদের এখানে বড় ধরনের ভুল বোঝাবুঝি হয়ে গিয়েছে। ভারতবর্ষে যে তিনটি ধারা প্রচলিত ছিল তা স্বাভাবিক কোনো ধারা ছিল না; বরং তা ছিল বৃটিশপ্রবর্তিত ধারার প্রতিফল এবং তাদের চক্রান্তের প্রতিক্রিয়াস্বরূপ বিকল্প মাধ্যম অবলম্বন মাত্র। নতুবা ভারতবর্ষে বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদীদের প্রবেশের পূর্বে মাদরাসা এবং স্কুল নামের দুটি বিভাজিত ধারার অস্তিত্ব আপনি খুঁজে পাবেন না। এতদঞ্চলে ইসলামের সূচনা থেকে বৃটিশ পিরিয়ডের আগ পর্যন্ত বিদ্যালয়গুলোতে একসাথে দ্বীনী এবং জাগতিক দু’ধারার শিক্ষাব্যবস্থার প্রচলন ছিল।

শরীয়তের বক্তব্যও এমনই; প্রতিটি মুমিনের জন্য আলেম হওয়া ফরযে আইন নয়; বরং তা ফরযে কিফায়াহ। অর্থাৎ কোনো এলাকায় বা কোনো রাষ্ট্রে যদি প্রয়োজন অনুপাতে আলেম প্রস্তুত হয়ে যান, তাহলে অন্যদের থেকে সে দায়িত্ব রহিত হয়ে যায়। কিন্তু দ্বীনের মৌলিক ইলম হাছিল করা ফরযে আইন, প্রত্যেক মুসলমানের উপর তা ফরয। তো সেসকল বিদ্যালয়গুলোতে সবার জন্য ফরযে আইন ইলমের ব্যবস্থা ছিল। এতে কোনো বিভাজন ছিল না। মুসলমানমাত্রই সে ফরযে আইন ইলম হাছিল করত। আর যে দ্বীনী ইলমে বিশেষজ্ঞতা অর্জন করতে চাইত তার জন্য থাকত ভিন্ন এন্তেযাম। আর যে জাগতিক বিষয়ে পাণ্ডিত্য অর্জন করতে চাইত তার জন্য থাকত পৃথক ব্যবস্থা ।

মরক্কোর একটি কারগুযারি শুনুন
আমি গত বছর মারাকেশ সফরে গিয়েছিলাম। এ বছর মুহতারাম ভাইজান মুফতী মুহাম্মাদ রফী উসমানী ছাহেব সেখান থেকে সফর করে এসেছেন। মারাকেশকে ইংরেজিতে বলে মরক্কো। মরক্কো’র একটি শহর হল ‘ফাস’। আমাদের ফাসে যাওয়া হয়েছিল। সেখানে জামেয়া কারাউয়্যীন নামে এক জামেয়া এখনও কাজ করে যাচ্ছে।

ইসলামের ইতিহাসে প্রসিদ্ধ জামেয়া বা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পর্যালোচনা যদি আপনি সামনে আনেন তাহলে মৌলিকভাবে চারটি বিশ্ববিদ্যালয় আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ করবে। আর এর প্রথম সারিতে রয়েছে মারাকেশের এই জামেয়া। দ্বিতীয়তে রয়েছে তিউনিসিয়ার জামেয়া যাইতুনিয়া। তৃতীয়তে রয়েছে মিশরের জামেয়া আযহার। আর চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে দারুল উলূম দেওবন্দ। ঐতিহাসিক বিন্যাস এমনই।

তো এর মাঝে সর্বপ্রথম বিশ্ববিদ্যালয় হল মারাকেশের ফাস শহরে অবস্থিত জামেয়া কারাউয়্যীন। তৃতীয় হিজরী শতাব্দীতে এর প্রতিষ্ঠা। এটা শুধু ইসলামী দুনিয়ার নয়, পুরো বিশ্বের প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একটি। তৃতীয় শতাব্দীর এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস সম্বলিত প্রস্পেকটাসে পাওয়া যায়, এখানে একদিকে যেভাবে দ্বীনী বিষয় তথা কুরআন, হাদীস, তাফসীর, ফিকহ প্রভৃতির পাঠদান হত। পাশাপাশি যেগুলোকে আজ আমরা জাগতিক বিষয় বলি যেমন-চিকিৎসা বিদ্যা, গণিত শাস্ত্র, জ্যোতির্বিজ্ঞান ইত্যাদি সেগুলোও পড়ানো হত। ইবনে খালদুন রাহ., ইবনে রুশদ রাহ., কাযী ইয়ায রাহ.-সহ আমাদের বড়দের দীর্ঘ তালিকা রয়েছে, যারা সেখানে দরস দিতেন। তাদের নিকট আজ এ ইতিহাসও সংরক্ষিত রয়েছে যে, কোথায় বসে ইবনে খালদুন রাহ. দরস প্রদান করতেন। কোথায় ইবনে রুশদ রাহ.-এর দরস হত। কোথায় কাযী ইয়ায রাহ. দরস করাতেন। কোথায় ইবনে আরাবী মালেকী রাহ. সবক পড়াতেন। ইতিহাসের এ অনুষঙ্গগুলো আজও তাদের নিকট সংরক্ষিত রয়েছে। এটা ইসলামের ইতিহাসে প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয়। ছোট ছোট বিদ্যাপীঠ তো সবজায়গাতেই ছিল। কিন্তু জামেয়া কারাউয়্যীন একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা রাখত। আর তাতে দ্বীনী এবং বৈষয়িক সকল শাস্ত্রের পাঠদান হত।
এই ইউনিভার্সিটিতে তৃতীয়-চতুর্থ শতাব্দীর সায়েন্টিফিক আবিষ্কারের কিছু নমুনাও সংরক্ষিত রয়েছে। এই ইউনিভার্সিটির সন্তানরা সেকালে ঘড়িসহ কী কী সামগ্রি আবিষ্কার করেছে তার নমুনা তাদের নিকট সংরক্ষিত আছে।
আপনি তৃতীয় শতাব্দীর কথা কল্পনা করুন। ঐ যামানার জামেয়া বা বিশ্ববিদ্যালয় এটা। এতে একদিকে ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিদগ্ধ আলিম তৈরি হয়েছেন। তেমনি সেখানে তৈরি হয়েছেন ইবনে রুশদের মত দার্শনিক। সেখান থেকে জন্ম নিয়েছেন বড় বড় অনেক বিজ্ঞানী।

সেখানে কী হত?
ঐসময় ফরযে আইন পরিমাণ দ্বীনী ইলম সবাইকে শেখানো হত। এরপর কেউ দ্বীনী বিষয়ে পাণ্ডিত্য অর্জন করতে চাইলে এই ইউনিভার্সিটিরই দ্বীনী দরসের হালকায় বসত। কেউ গণিত শাস্ত্রে পাঠদান করতে চাইলে সেখানে তারও ব্যবস্থা ছিল। চিকিৎসা নিয়ে কেউ পড়তে চাইলে সেখানে তারও সুযোগ ছিল। পুরো ব্যবস্থাপনা এভাবেই চলত।
এই জামেয়া কারাউয়্যীনের মতো তিউনিসিয়ার জামেয়া যাইতুনিয়া এবং মিসরের জামেয়া আযহারের ব্যবস্থাপনাও একই রকম ছিল। এই তিন ইউনিভার্সিটিই আমাদের দূর অতীতের ইতিহাস। এখানে দ্বীনী এবং বৈষয়িক শিক্ষার ব্যবস্থা এভাবে রাখা হয়েছিল।

ইতিহাসের পাতা খুলে দেখুন। হাদীস ও সুন্নাহর ইমাম কাযী ইয়ায রাহ.-এর চাল-চলন, বেশভ‚ষা ও চেহারা-সুরত আপনি যেমন দেখতে পাবেন, দেখবেন ইতিহাস ও দর্শনের ইমাম ইবনে খলদুনের অবস্থাও তাই। তেমন কোনো পার্থক্য আপনার নজরে পড়বে না যে, ইনি দ্বীনের আলেম আর তিনি বৈষয়িক জ্ঞানী। উভয়ের জীবনযাপন, চলাফেরা, বেশভ‚ষা, লেবাস-পোশাক, এমনকি চিন্তাভাবনা এবং কথা বলার ধরন সব ছিল একই রকম। প্রসিদ্ধ মুসলিম দার্শনিক ও বিজ্ঞানী ফারাবী, ইবনে রুশদ, আবু রাইহান আলবেরুনী প্রমুখের জীবনযাপন দেখুন আর মুহাদ্দিস মুফাসসির ও ফকীহগণের বেশভ‚ষা দেখুন, উভয়কে একরকম পাবেন। ইনি নামায পড়েন তো তিনিও নামায পড়েন। ইনি নামাযের মাসায়েল জানলে তিনিও তা জানেন। ইনি রোযার মাসায়েল জানেন তো তিনিও তা জানেন। ইসলামের মৌলিক ফরযে আইন পরিমাণ ইলম সে যুগে সবাই হাছিল করত। আর এই ইউনিভার্সিটিতে সেগুলো পড়ানো হত।

* কখন থেকে বিভাজন শুরু?
বিভাজন শুরু হল তখন থেকে, যখন ইংরেজরা এ দেশে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে একটি শিক্ষাব্যবস্থা চাপিয়ে দিল। আর তা থেকে দ্বীনী বিষয়কে দেশান্তর করে দেওয়া হল। সে সময় আমাদের মুরব্বীগণ মুসলমানদের দ্বীন-ঈমানের ফরযে কিফায়াটুকু হেফাযতের স্বার্থে বাধ্য হয়ে দারুল উলূম দেওবন্দ প্রতিষ্ঠা করেছেন। আলহামদু লিল্লাহ, দারুল উলূম দেওবন্দ খেদমত ও অবদানের যে স্বাক্ষর রেখেছে, ইতিহাসে তার দ্বিতীয়টি বিরল। তবে যাইহোক, এটা ছিল প্রয়োজনের স্বার্থে বিকল্প চিন্তা মাত্র।
বাস্তবতা তাই ছিল, যা ছিল জামেয়া কারাউয়্যীন -এ। জামেয়া যাইতুনিয়া এবং জামেয়া আযহারের প্রথম যুগে যা ছিল, তা-ই ছিল আমাদের বাস্তবতা।

পাকিস্তান যদি সঠিক অর্থে ইসলামী রাষ্ট্র হত এবং তাতে ইসলামী অনুশাসন কার্যকর থাকত তাহলে আব্বাজান রাহ.-এর বক্তব্য অনুযায়ী আমাদের আলীগড়ের শিক্ষাব্যবস্থার প্রয়োজন পড়ত না, নদওয়ারও না, এমনকি দারুল উলূম দেওবন্দের শিক্ষাব্যবস্থারও না। আমাদের তো প্রয়োজন জামেয়া কারাউয়্যীন, জামেয়া যাইতুনিয়াহর শিক্ষাব্যবস্থা। আমাদের প্রয়োজন এমন বিশ্ববিদ্যালয়, যেখানে সকল শাস্ত্র সমানভাবে মর্যাদা পাবে। তাতে সবাই একই রঙে রঙীন হবে, দ্বীনের রঙে। কিন্তু আফসোসের কথা হল, আমাদের উপর এমন এক শিক্ষাব্যবস্থা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে, যা মানসিক দাসত্ব ছাড়া আর কিছুই শেখায় না। সেই শিক্ষাব্যবস্থা আমাদেরকে দাস বানিয়ে রেখেছে। আকবর এলাহাবাদী যথাযথ বলেছেন-

اب علیگڑھ کی بھی تم تمثیل لو ٭ یا معزز پیٹ تم اس کو کہو-

এবার আলীগড়ের প্রসঙ্গে আসি। একে তুমি সম্মানিত উদরও বলতে পার। কেবলই উদর পূর্তি ও উদর পালনের পথ ও পদ্ধতি আবিষ্কার করার জন্য বৃটিশ বেনিয়ারা আমাদেরকে এ শিক্ষাব্যবস্থা ‘উপহার’ দিয়েছে। আর এর মাধ্যমে মুসলমানদের গোটা ইতিহাস ও ঐতিহ্য বরবাদ করে দেওয়া হয়েছে।
আজকের প্রচলিত এই শিক্ষাব্যবস্থার দরুন অনিবার্যভাবে আমাদের সমাজে দু’টি সম্প্রদায় তৈরি হয়ে গিয়েছে। আর দুই দলের মাঝে সৃষ্টি হয়েছে বিস্তর ফারাক। বৈষয়িক শিক্ষাব্যবস্থায় ইসলামী শিক্ষা না থাকার দরুন ফরযে আইনের ইলমও তাতে হাছিল হচ্ছে না। ফলে স্কুল, কলেজ ও ইউনিভার্সিটির অধিকাংশ ছাত্র জানে নাÑ দ্বীনের ফরয বিধান কী?

* সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক আগ্রাসন
দ্বিতীয়ত তাদের মাঝে এই চিন্তা পুশ করে দেওয়া হয়েছে যে, উন্নতি যদি করতে চাও তবে তোমাকে পশ্চিমে তাকাতে হবে। তাদের সভ্যতা-সংস্কৃতি পরিবর্তন করে দেওয়া হয়েছে। মোটকথা, তাদের মাথায় একথা বসিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, এই দুনিয়ায় যদি উন্নতি করতে চাও তবে পশ্চিমের চিন্তায় তোমাকে চিন্তা করতে শিখতে হবে। অগ্রগতি লাভ করতে চাইলে তাদের মতো পরিবেশে, তাদের মতো করেই তা লাভ করতে হবে।

আফসোস এবং আশ্চর্যের বিষয় হল, এই নতুন শিক্ষাব্যবস্থা থেকে যারা গ্রাজুয়েট করে, ডক্টর, প্রফেসর হয়ে বের হয় তারা আমাদের মতো তালেবে ইলমদের উপর জোর আপত্তি তোলে যে, কুরআন-সুন্নাহ এবং ফিকহের একটি বড় বিষয় ছিল ইজতিহাদ। কিন্তু এই মৌলবীরা ইজতিহাদের দরজা বন্ধ করে রেখেছে। এরা ইজতিহাদ করে না।

কিন্তু যেসকল বিষয়ে ইজতিহাদ ও গবেষণার দরজা-জানালা চতুর্দিক থেকে সম্পূর্ণ উন্মুক্ত তা তো এসকল বৈষয়িক বিষয়াবলিইÑ তাই নয় কি! সাইন্স, টেকনোলজি, গণিতসহ এসকল বিষয়ে তো কেউ ইজতিহাদের কপাট রুদ্ধ করেনি। আলীগড়ের মাধ্যমে কিংবা প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে আপনি কেন এমন মুজতাহিদ ও গবেষক তৈরি করলেন না, যারা পশ্চিমা বিজ্ঞানীদের মোকাবেলায় দাঁড়াতে পারে? আপনি তাতে এমন উদ্ভাবক কেন প্রস্তুত করলেন না, যে চিকিৎসা, জ্যোতির্বিজ্ঞান, গণিত ও বিজ্ঞানের অন্যান্য শাখায় নতুন নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে? যেখানে গবেষণা ও আবিষ্কারের চতুর্মুখ উন্মুক্ত সেখানে ইজতিহাদ করলেন না আর যেখানে কুরআন-সুন্নাহর পাবন্দি রয়েছে, কুরআন-সুন্নাহর বেঁধে দেওয়া সীমানায় থেকে যেখানে ইজতিহাদ করতে হয়, সেখানে আপনার আপত্তি হল, উলামায়ে কেরাম ইজতিহাদ কেন করেন না?

এই তো কয়েকদিন আগে এক ভাই আমার নিকট একটি ক্লিপ পাঠালেন। তাতে একজন আলেমে দ্বীনের নিকট প্রশ্ন রাখা হচ্ছিল- মাওলানা, উলামায়ে কেরামের খেদমত তো ঠিক আছে। কিন্তু আলেমদের কেউ তো বিজ্ঞানী হতে পারেননি। তাদের কেউ তো চিকিৎসক হতে পারেননি। তাদের কেউ কোনো আবিষ্কার দেখাতে পারেননি। বলুন, আলেম-সমাজের নিকট এর কি কোনো উত্তর আছে?

আল্লাহর বান্দা! এই প্রশ্ন তো আপনি আপনাকে করা উচিত ছিল। আমাদের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থায় এমন কেউ কি তৈরি হয়েছে, যে কিছু আবিষ্কার করেছে? না, সেখানে আবিষ্কার করা যাবে না! সেখানে তো আবিষ্কারের দরজা এভাবে খিল দিয়ে রাখা হয়েছে যে, ইংরেজরা যা বলবে তাই চূড়ান্ত কথা! পশ্চিমারা যে থিউরি দেবে সেটাই শেষ থিউরি! তারা যে ওষুধ বলে দেবে সেটাই একমাত্র ওষুধ! তারা যদি কোনো জিনিসের ব্যাপারে বলে দেয়, এটা সুস্থতা ব্যাহত করে। ব্যস, এখন এটাই চ‚ড়ান্ত কথা। তা মানা আরম্ভ করে দেয়। ডিমের কুসুমের ব্যাপারে বছরকে বছর একথা বলা হচ্ছিল, এটা কোলেস্টরল তৈরি করে। হার্টের জন্য ক্ষতিকর। হঠাৎ করে এখন ডাক্টাররা বলা শুরু করেছেন, ডিমের কুসুম খাবেন। এতে কোনো সমস্যা নেই। কেন? পশ্চিম থেকে খবর এসেছে, তাদের থিউরি পরিবর্তন হয়েছে। আর আপনি তা গ্রহণ করে নিয়েছেন!

আমাদের দেশে ওষুধী গাছের অভাব নেই। আপনি তা নিয়ে কতটুকু গবেষণা করেছেন? আপনি গবেষণা করে এমন কোনো ফলাফল সামনে আনতেন যে, অমুক গাছের এই উপকার। অমুক গাছন্ত সেবনে অমুক অমুক রোগ সারে। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কালোজিরার উপকারিতার কথা বলেছেন। আপনি এটা নিয়ে গবেষণা করতেন!
কিন্তু বাস্তবতা হল, যেটা গবেষণার বিষয় সেখানে গবেষণা পুরোপুরি বন্ধ। সেখানে গবেষণার কোনো খবর নেই, ফিকির নেই। আর কুরআন-সুন্নাহ ও দ্বীনী বিষয়াবলি যত গবেষণার ক্ষেত্র!
বন্ধু! এটা হল চিন্তাগত দাসত্বের ফলাফল, যা আমাদেরকে এ পর্যন্ত এনে দাঁড় করিয়েছে।

* দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করে দেওয়া হয়েছে
প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে আমাদের ভাবনা ও দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করে দেওয়া হয়েছে। প্রথমে জ্ঞান আহরণ ও বিদ্যা অর্জনের ক্ষেত্রে দৃষ্টিভঙ্গি একরকম ছিল। অর্থাৎ জ্ঞান একটি মহৎ গুণ। এর উদ্দেশ্যই ছিল দেশ ও জাতির কল্যাণে অংশগ্রহণ করা। এর মাধ্যমে যদি কিছু জীবিকাও হয়ে যায়, তবে তা হত গৌণ পর্যায়ের। মুখ্য ছিল মূলত মানবতার সেবা।

কিন্তু আজ দৃষ্টিভঙ্গি হয়ে গেছে পুরোই উল্টো। অর্থ উপার্জন জ্ঞান-বিদ্যার মূল উদ্দেশ্যে রূপান্তরিত হয়েছে। এখন দৃষ্টিভঙ্গি হল, এ পরিমাণ জ্ঞান অর্জন কর, যাতে মানুষের পকেট থেকে বেশি থেকে বেশি পয়সা হাতিয়ে নেওয়া যায়। তোমার জ্ঞান ও বিদ্যা তখনই ফলপ্রসূ ও উপকারী বলে গণ্য হবে যখন তুমি অন্যদের চেয়ে বেশি পয়সা কামাই করতে পারবে।

আপনি লক্ষ করুন, বর্তমানে শিক্ষার হার কত বেড়েছে! কতজন গ্রাজুয়েশন করছে, মাস্টার্স করছে! বিভিন্ন রকমের ডিগ্রি অর্জন করছে! তাদের ভাবনার কাছে আপনি প্রশ্ন রাখুন, কেন পড়া-লেখা করছেন? জবাব মিলবে, ক্যারিয়ার যাতে উন্নত হয়। ভালো চাকরি পাওয়া যায়। ভালো পয়সা কামানো যায়। মোটকথা, শিক্ষার সকল মহৎ উদ্দেশ্য ধামাচাপা দিয়ে এ ভাবনা প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে যে, জ্ঞান অর্জনের একমাত্র মৌলিক উদ্দেশ্য হল, টাকা কামানো আর পয়সা হাতানো। জ্ঞান অর্জন করে দেশ ও জাতির কল্যাণে ভূমিকা রাখবে, এ দৃষ্টিভঙ্গি বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় অনুপস্থিত। ফলশ্রুতিতে যা হয়েছে, সবাই অর্থের পিছনে ছুটছে। না দেশের স্বার্থের প্রতি ভ্রুক্ষেপ, না সমাজ ও জাতির কল্যাণচিন্তা। আর না সৃষ্টির সেবায় নিবেদিত হওয়ার কোনো ফিকির। রাত-দিন একটাই চিন্তা, কীভাবে টাকা কামানো যায়, টাকা বাড়ানো যায়। আর এর জন্য যতসব দৌড়ঝাঁপ! তাই এখন আর হালাল-হারামের তোয়াক্কা নেই! নীতি নৈতিকতার খবর নেই!!

আপনি বলুন, প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার অধীনে যারা পড়ালেখা করে যাচ্ছেন জাতিকে তারা কতটুকু দিতে পেরেছেন? নিঃস্বার্থভাবে তারা জাতির কতটুকু উপকার করতে পেরেছেন?
আমাদের নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তো আমাদেরকে এ দুআ শিখিয়েছেন-
لَا تَجْعَلِ الدّنْيَا أَكْبَرَ هَمِّنَا وَلَا مَبْلَغَ عِلْمِنَا.
আয় আল্লাহ, আমাদের জন্য দুনিয়াকে আপনি এমন বানিয়েন না, যাতে সারাদিন আমাদের চিন্তা-ভাবনা এ নিয়েই আবর্তিত থাকে। আর (দ্বীন উপেক্ষা করে) দুনিয়াকেই আমাদের জ্ঞানের চূড়ান্ত চর্চার বিষয়ও বানিয়েন না। -জামে তিরমিযী, হাদীস ৪৩১
কিন্তু প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা আমাদের আখেরাতমুখী দৃষ্টিভঙ্গিকে পরিবর্তন করে সম্পূর্ণ বস্তুবাদি বানিয়ে দিয়েছে।

আব্বাজান হযরত মুফতী মুহাম্মাদ শফী ছাহেব রাহ. যা বলেছেন, তার উদ্দেশ্য এটাই যে, বৃটিশদের দাসত্বের ‘কল্যাণে’ শিক্ষার যে ধারা পরিবর্তিত হয়েছে তা ফিরিয়ে ঐ পথে নিয়ে আসো, যা জামেয়া কারাউয়্যীন আমাদেরকে দেখিয়েছে। জামেয়া যাইতুনিয়া যা দেখিয়েছে। শুরুর দিকে জামেয়া আযহার যা দেখিয়েছে। আমি প্রথম যামানার কথা এজন্য বলছি যে, জামেয়া আযহারেরও বর্তমান ধারা পরিবর্তিত হতে চলেছে। তাই শুরুর দিককার কথা বলছি।
এতদঞ্চলে রাষ্ট্রীয়ভাবে সে ধারা কার্যকর হয়নি। তাই বাধ্য হয়ে আমরা এ প্রচেষ্টায় রয়েছি যে, অন্তত দারুল উলূম দেওবন্দের ধারাটা যেন সংরক্ষিত থাকে। আলহামদু লিল্লাহ, এ উদ্দেশ্য নিয়েই মাদরাসা প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে।

রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা, রাষ্ট্র পরিচালনানীতি এবং রাষ্ট্রের কর্তৃপক্ষের প্রতি বর্তমানে আমাদের আস্থা ও ভরসা নেই। অদূর ভবিষ্যতেও আস্থা তৈরি হওয়ার কোনো অবকাশ এবং প্রত্যাশাও দেখা যাচ্ছে না। তাই যতদিন পর্যন্ত এ অবস্থা বিরাজ করবে, ততদিন পর্যন্ত আমরা আমাদের মাদরাসাগুলোর সম্পূর্ণ হেফাযত করব। দারুল উলূম দেওবন্দের নীতি ও আদর্শের উপর যেভাবে আমাদের আকাবির ও মুরব্বীগণ মাদরাসাগুলোকে প্রতিষ্ঠিত রেখে গেছেন আমরা সেভাবেই তার সুরক্ষা দেব। এর উপর কোনো প্রকার আঁচড় লাগুক, আমরা তা বরদাশত করব না, ইনশাআল্লাহ। তবে আমরা চাই, ধীরে ধীরে এ জাতি তার ঐতিহ্যে ফিরে আসুক। এরই ধারাবাহিকতায় হেরা ফাউন্ডেশনের এ ক্ষুদ্র পরিকল্পনা আপনাদের খেদমতে।

এখানে রঈসুল জামেয়ার সংক্ষিপ্ত আলোচনা হয়েছে। আমিও এ কথা প্রায়ই বলার চেষ্টা করি যে, আল্লাহ পাকের মেহেরবানীতে পাকিস্তানে দ্বীনী মাদারেসের সংখ্যা প্রয়োজন অনুসারে মোটামুটি হয়েছে। কিন্তু সকল মাদারাসা ফরযে কিফায়ার ইলম শিক্ষা দিচ্ছে। পুরো দেশের জনসংখ্যা অনুপাতে মাদরাসামুখী তালিবে ইলমের পরিমাণ শতকরা এক ভাগ হওয়াটাও মুশকিল হয়ে দাঁড়ায়। অবশিষ্ট নিরানব্বই ভাগ জনগণ কোন্ শিক্ষাব্যবস্থার অধীনে সমর্পিত হচ্ছে, কীভাবে ইংরেজদের মানসিক দাসত্ব বরণ করে নিচ্ছে, এর হিসাব-নিকাশের পর্বটা আপনি নিজেই সেরে নিতে পারেন।

আমি একথা বার বার বলেছি এবং বলেই যাচ্ছি, আল্লাহর দোহাই লাগে, আপনি আপনার প্রজন্মকে পশ্চিমাদের মানসিক দাসত্ব থেকে মুক্ত করুন। আমি এ চেতনা জাগ্রত করতে চাই, আলহামদু লিল্লাহ, আমরা একটি স্বাধীন সম্প্রদায়। আমরা চিন্তা-চেতনায় তাই লালন করি, যা লাভ করেছি আমাদের নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে।
মানসিক দাসত্বের এই যে প্রবণতা, উন্নতি অগ্রগতি পশ্চিমের পথেই রয়েছে। পশ্চিম থেকে আমদানি করেই আমরা সফলতা লাভ করব। আল্লাহর দোহাই, এমন মানসিকতা থেকে আপনার সন্তানের মগজ পবিত্র করুন। তাদের মাঝে দ্বীনী মানসিকতা জাগ্রত করুন। এ উদ্দেশ্য সামনে রেখেই আমরা এ প্রতিষ্ঠান আরম্ভ করেছি।

পশ্চিমের সকল বিষয় ঢালাওভাবে পরিত্যাজ্য নয়। ভালো ভালো বিষয়ও রয়েছে তাদের কাছে। ভালোগুলো গ্রহণ করুন। খারাপগুলো বর্জন করুন। এভাবে যদি বাছ-বিচার করে চলতে পারেন তাহলে গন্তব্যে পৌঁছা সহজ হবে, ইনশাআল্লাহ।

* কবি ইকবাল সুন্দর চিত্রায়ন করেছেন
কবি ইকবাল ভারি চমৎকার বিশ্লেষণ করেছেন। পশ্চিমা দুনিয়ার এই ‘অস্বাভাবিক উন্নতি’র বিশ্লেষণ করতে গিয়ে তিনি যে কবিতা রচনা করেছেন আমাদের জন্য তা আজও দ্যুতি ছড়াচ্ছে।
তিনি বলেন-
قوت مغرب نہ از چنگ ورباب ٭ نے ز رقص دختران بے حجاب۔
পশ্চিমের উন্নতি এজন্য নয় যে, সেখানে বাদ্যযন্ত্র আর বেপর্দা নারীর নৃত্যের অবাধ প্রচলন রয়েছে।
نے ز سحرساحران لا لہ روست٭ نے زعریاں ساق و نے قطع موست‏‏۔
এজন্যও নয় যে, সেখানে সুন্দরী রমণীর উন্মত্ত ও অবাধ নগ্ন বিচরণ রয়েছে।
قوت مغرب از علم و فن است٭ از ہمیں آتش چراغش روشن است۔
পশ্চিমের উন্নতি তো কেবল জ্ঞান-বিজ্ঞানে অক্লান্ত পরিশ্রম করার কারণে সাধিত হয়েছে। আর এই আলোয় তাদের বাতি আলোকিত হয়েছে।
এরপর ইকবাল মরহুম বড় চমৎকার সত্য বলেছেন-
حکمت از قطع و برید جامہ نیست ٭ مانع علم وہنرعمامہ نیست۔
পোশাক আশাকের ঠাটবাটের মাঝে প্রজ্ঞা নিহিত নয়। কেউ স্যুট বুট পরে স্যার বাবু সেজে গেল মানে শিক্ষিত হয়ে গেল, উন্নতি করে ফেলল! আর পাজামা-পাঞ্জাবি পাগড়ী পরল মানে উন্নতির ছোঁয়া বঞ্চিত সেকেলে হয়ে গেল- বিষয় এমন নয়।
কিন্তু আফসোস হল, তুমি এসব বিষয়কেই ভাবছ উন্নতি অগ্রগতির উপলক্ষ। তাই ছুটছ সেগুলোর পিছে। নিজেও ছুটছ বরবাদির দিকে আর সন্তানদেরও পরিচালিত করছ সে পথে। বন্ধু! একটু ফিকির কর। নিজেকে অন্তত হেফাযত কর।
ہاں دکھادے اے تصور پھر وہ صبح وشام تو ٭ دوڑ پیچھے کی طرف اے گردش ایام تو۔

কেউ বলতে পারে, এটা হল পশ্চাতপদতা। কিন্তু ইকবালের মতো যুগসচেতন কবি বলছেন, তুমি একটু পিছন দিকে তো হেঁটে দেখ!
হাঁ, সেই পিছন দিকে জামেয়া কারাউয়্যীন, জামেয়া যাইতুনিয়াহ-এর ইতিহাসে প্রত্যাবর্তিত হতেই আমাদের এ আয়োজন। এই উদ্দেশ্যেই ‘হেরা ফাউন্ডেশন স্কুল’। হযরত ওয়ালিদ ছাহেব রাহ.-এর নির্দেশনার ভিত্তিতেই আমাদের এ উদ্যোগ গ্রহণ। আলহামদু লিল্লাহ, আরো অনেকে এ দিকে মনোযোগী হয়েছেন। অনেক স্কুলও চালু হয়েছে, যাতে আমরা ঐতিহ্যে ফিরে যেতে পারি।

আপনারা এর কিছু কার্যক্রম লক্ষ করতে পেরেছেন। আলহামদু লিল্লাহ, ছুম্মা আলহামদু লিল্লাহ, অল্প ক’দিনেই আল্লাহ তাআলা বেশ ফায়দা পৌঁছিয়েছেন। বলা ঠিক নয়, দুআ নেওয়ার জন্য বলছি, আমার ছেলে মাওলানা আশরাফ উসমানী এবং তার সহকর্মীরা দিনরাত মেহনত করে সুচিন্তিতভাবে এর কার্যক্রমকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। তাদের মেহনতের কিছু ঝলক আপনারা দেখতে পেয়েছেন।

আমরা বাধ্য হয়ে এর সিলেবাস ইংলিশ মিডিয়াম রেখেছি। এখন তো জোয়ার চলছে। যারা এই জোয়ারে গা ভাসিয়ে সেই শিক্ষাব্যবস্থার দ্বারস্থ হন তাদের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য এ প্রোগ্রাম ইংলিশ মিডিয়ামে রাখা হয়েছে। নতুবা শিক্ষাব্যবস্থা মাতৃভাষাতেই হওয়া উচিত।

আমাদের এখানে পাশাপাশি হিফযুল কুরআন এবং আরবী ক্লাসের ব্যবস্থাও রয়েছে। উল্লেখযোগ্য পরিমাণে উর্দূও পড়ানো হয়। আল্লাহ তাআলার নিকট দুআ করি, তিনি একে কবুল করুন। নিজ মেহেরবানীতে আমাদের নিয়তে ইখলাস দান করুন। আমাদের চলার পথ মসৃণ রাখুন। সকল অনিষ্ট ও ফেতনা থেকে নিরাপদ রাখুন। তিনি তার সন্তুষ্টি মোতাবেক এ প্রোগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে যান। মহান রবের দরবারে এই আমাদের মিনতি।
(মাসিক আল কাউসার থেকে)

18/09/2024

চন্দ্রগ্রহণের সময় যে আমলের নির্দেশনা দিয়েছেন নবীজি সা.


চন্দ্রগ্রহণকে আরবিতে ‘খুসুফ’ বলা হয়। গ্রহণ লাগলে সূর্য যেমন অন্ধকার ছায়ার আবর্তে পতিত হয়ে অন্ধকার হয়ে যায়, তেমনি চন্দ্রও বছরে দুইবার স্বীয় কক্ষপথে পরিভ্রমণরত অবস্থায় অন্ধকারের ছায়ায় আচ্ছাদিত হয়ে থাকে। ইহার আংশিক রূপ কখনো দৃশ্যমান হয়। আবার কখনো সার্বিক রূপ পরিদৃষ্ট হয়। চন্দ্রের এ কালো রঙ বা অন্ধকারের হাতছানিকেই চন্দ্রগ্রহণরূপে আখ্যায়িত করা হয়।

কুরআনুল কারিমে আল্লাহ তাআলা এ সম্পর্কে সুস্পষ্ট বর্ণনা দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন-

فَإِذَا بَرِقَ الْبَصَرُ - وَخَسَفَ الْقَمَرُ - وَجُمِعَ الشَّمْسُ وَالْقَمَرُ

‘যখন দৃষ্টি চমকে যাবে। চন্দ্র জ্যোতিহীন হয়ে যাবে। এবং সূর্য ও চন্দ্রকে একত্রিত করা হবে।’ (সুরা কিয়ামাহ : আয়াত ৭-৯)
উল্লেখিত আয়াতে ‘চন্দ্র জ্যোতিহীন হয়ে পড়া’র বাস্তব রূপই হচ্ছে চন্দ্রগ্রহণ।

চন্দ্রগ্রহণ সম্পর্কে নবিজী সা.-এর নির্দেশনা

জাহেলি যুগে চন্দ্রগ্রহণ কিংবা সূর্যগ্রহণ সম্পর্কে বিরূপ ধারণা ছিল। তারা মনে করত দুনিয়ায় বড় বড় ব্যক্তিত্বের অধিকারী লোকদের কোনো অঘটন ঘটলে এসব হয়। আর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ছেলে ইবরাহিম-এর মৃত্যুর দিনে সুর্যগ্রহণ হয়। তখন সাহাবায়ে কেরাম তা বলাবললি করছিল। তা শুনে বিশ্বনবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম চন্দ্রগ্রহণ ও সূর্যগ্রহণ সম্পর্কে তাদের সুস্পষ্ট বর্ণনা দেন। হাদিসে এসেছে-

> হজরত মুগিরা ইবনে শুবা রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন-
إِنَّ الشَّمْسَ وَالْقَمَرَ آيَتَانِ مِنْ آياتِ اللهِ، لاَ يَنْخَسِفَانِ لِمَوْتِ أَحَدٍ وَلاَ لِحَيَاتِهِ، فَإِذَا رَأَيْتُمْ ذلِكَ فَادْعُوا اللهَ وَكَبِّرُوا وَصَلُّوا وَتَصَدَّقُوا
‘সূর্য ও চন্দ্র আল্লাহর নিদর্শনসমূহের মধ্যে দু’টি নিদর্শন। কারো মৃত্যু বা জন্মের কারণে সূর্যগ্রহণ ও চন্দ্রগ্রহণ হয় না। কাজেই যখন তোমরা তা দেখবে তখন-
১. তোমরা আল্লাহর কাছে দোয়া করবে।
২. তাঁর মহত্ব ঘোষণা করবে আর
৩. নামাজ আদায় করবে এবং
৪. সাদকা প্রদান করবে।’ (বুখারি ও মুসলিম)

> হজরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
إِنَّ الشَّمْسَ وَالْقَمَرَ مِنْ آيَاتِ اللهِ، وَإِنَّهُمَا لَا يَنْخَسِفَانِ لِمَوْتِ أَحَدٍ، وَلَا لِحَيَاتِهِ، فَإِذَا رَأَيْتُمُوهُمَا فَكَبِّرُوا، وَادْعُوا اللهَ وَصَلُّوا وَتَصَدَّقُوا،
‘সূর্য ও চন্দ্র আল্লাহর কুদর (ক্ষমতার) বিশেষ নিদর্শন। কারো মৃত্যু বা জন্মের কারণে সূর্যগ্রহণ হয় না। অতঃপর যখন তোমরা চন্দ্রগ্রহণ বা সূর্যগ্রহণ দেখতে পাও, তখন-
১. তাকবির (اَللهُ اَكْبَر) বল;
২. আল্লাহর কাছে দোয়া কর;
৩. নামাজ আদায় কর এবং
৪. দান-সদকা কর।’ (মুসলিম)

হাদিসের নির্দেশনা থেকে এ কথা সুস্পষ্ট যে, চন্দ্র ও সূর্য মহান আল্লাহ তাআলার নিদর্শনসমূহের মধ্যে দুটি নিদর্শন। আর তাতে গ্রহণ লাগা আল্লাহ তাআলার হুকুমেই হয়। তাদের নিজস্ব কোনো শক্তি বা ক্ষমতা নেই। আল্লাহ তাআলার হুকুমের অধীনেই তাদের চলাচল এবং কার্যক্রম।

তাতে গ্রহণ লাগলে মুমিন মুসলমানের করণীয় সম্পর্কে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সুতরাং চন্দ্রগ্রহণের এ সময়ে বেশি বেশি দোয়া করা, তাসবিহ পড়া, তাওবাহ-ইসতেগফার করা, নামাজ পড়া এবং দান-সাদকার আবশ্যক কর্তব্য।

এ সময় অযথা অনর্থক গল্প-গুজব, হাসি-তামাশায় সময় অতিবাহিত না করে অন্তরে মহান আল্লাহর প্রতি ভয় রাখা জরুরি। কেননা এসবই মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে বান্দার জন্য সতর্কতা। অনেক হাদিসে চন্দ্রগ্রহণ ও সূর্যগ্রহণকে বিশেষ বিপদের সময় বা ক্রান্তিকাল বলে গণ্য করা হয়েছে।

চন্দ্রগ্রহণের নামাজ

হাদিসে সূর্যগ্রহণের নামাজের মতো চন্দ্রগ্রহণের নামাজও প্রমাণিত এবং সুন্নাত। তবে এ নামাজ জামাআতে ও একাকি পড়া নিয়ে মতভেদ রয়েছে। হানাফি অনুসারীরা এ নামাজ একাকি নিজ নিজ ঘরে পড়ার ওপর তাগিদ দিয়েছেন। এ সম্পর্কে ফিকহের বিখ্যাত গ্রন্থ বাদায়েউস সানাঈ-তে এসেছে-

ﺃَﻣَّﺎ ﻓِﻲ ﺧُﺴُﻮﻑِ ﺍﻟْﻘَﻤَﺮِ ﻓَﻴُﺼَﻠُّﻮﻥَ ﻓِﻲ ﻣَﻨَﺎﺯِﻟِﻬِﻢْ؛ ﻟِﺄَﻥَّ ﺍﻟﺴُّﻨَّﺔَ ﻓِﻴﻬَﺎ ﺃَﻥْ ﻳُﺼَﻠُّﻮﺍ ﻭُﺣْﺪَﺍﻧًﺎ

‘চন্দ্রগ্রহণের সময় ঘরে নামাজ আদায় করা হবে। কেননা সুন্নাহ হচ্ছে, তখন একাকি নামাজ পড়া।’ (বাদায়েউস সানাঈ : ১/২৮২)

সংগৃহীত।

18/09/2024

একটি ভুল ধারণা

সূর্যগ্রহণের সময় কি গর্ভবতী নারী কিছু খেতে পারবে না?



কোনো কোনো মানুষের ধারণা, সূর্য বা চন্দ্রগ্রহণের সময় গর্ভবতী নারীরা কিছু খেতে পারবে না; এসময় খেলে নাকি গর্ভস্থ সন্তানের ক্ষতি হবে। তেমনি কেউ কেউ এমনও ধারণা করে থাকে যে, এসময় গর্ভবতী নারী তরিতরকারি বা কোনো কিছু কাটতে পারবে না; তাতে নাকি গর্ভস্থ সন্তান বিকলাঙ্গ হওয়ার আশংকা রয়েছে। এ উভয় ধারণাই অমূলক।

জাহেলী যুগের মানুষের ধারণা ছিল, পৃথিবীতে বড় কোনো পরিবর্তনের কারণে সূর্য বা চন্দ্রগ্রহণ হয়ে থাকে; যেমন কারো জন্মগ্রহণ করা বা কারো মৃত্যু হওয়া অথবা কোনো দুর্ভিক্ষের আগমন ইত্যাদি। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের এ অমূলক ধারণা খ-ন করে বলেন-

إِنّ الشّمْسَ وَالقَمَرَ لاَ يَخْسِفَانِ لِمَوْتِ أَحَدٍ وَلاَ لِحَيَاتِهِ، وَلَكِنّهُمَا آيَتَانِ مِنْ آيَاتِ اللهِ، فَإِذَا رَأَيْتُمُوهَا فَصَلّوا.

সূর্য বা চন্দ্রগ্রহণ কারো মৃত্যু বা জন্মের কারণে হয় না; এগুলো আল্লাহ্র নিদর্শনাবলির দুটি নিদর্শনমাত্র। যখন তোমরা তা দেখবে তখন নামাযে মশগুল হবে। -সহীহ বুখারী, হাদীস ১০৪২; সহীহ মুসলিম, হাদীস ৯১৪ (মেরকাতুল মাফাতীহ, সংশ্লিষ্ট হাদীসের ব্যাখ্যা দ্রষ্টব্য)

এসময় কী করা উচিত- সে বিষয়ে হাদীস শরীফে স্পষ্ট নির্দেশনা এসেছে। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে একবার সূর্যগ্রহণ হল। তখন নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীদের নিয়ে দীর্ঘ কেরাত ও দীর্ঘ দীর্ঘ রুকু-সিজদার মাধ্যমে নামায আদায় করলেন। এরপর বললেন-

إِنّ الشّمْسَ وَالقَمَرَ آيَتَانِ مِنْ آيَاتِ اللهِ، لاَ يَخْسِفَانِ لِمَوْتِ أَحَدٍ وَلاَ لِحَيَاتِهِ، فَإِذَا رَأَيْتُمْ ذَلِكَ، فَادْعُوا اللهَ، وَكَبِّرُوا وَصَلّوا وَتَصَدّقُوا.

সূর্য ও চন্দ্র আল্লাহ্র নিদর্শনাবলির দুটি নিদর্শনমাত্র। কারো মৃত্যু বা জন্মের কারণে সূর্য বা চন্দ্রগ্রহণ হয় না। যখন তোমরা তা দেখবে তখন বেশি বেশি আল্লাহকে ডাকবে (দুআয় মশগুল হবে), বেশি বেশি তাকবীর বলবে, নামাযে মশগুল হবে এবং সদকা করবে। -সহীহ বুখারী, হাদীস ১০৪৪

কোনো বর্ণনায় রয়েছে-

فَإِذَا رَأَيْتُمْ كُسُوفًا، فَاذْكُرُوا اللهَ حَتّى يَنْجَلِيَا.

যখন সূর্যগ্রহণ দেখবে তখন তা দূরিভূত হওয়া পর্যন্ত বেশি বেশি আল্লাহ্র যিকির করবে। -সহীহ মুসলিম, হাদীস ৯০১

মোটকথা, এসময় সূর্যগ্রহণ শেষ হওয়া পর্যন্ত নামায, যিকির-তাসবীহ, তিলাওয়াত ইত্যাদি আমলের মাঝে থাকা; গাফেল না থাকা। কিন্তু গর্ভবতী নারী বা অন্য কেউ এসময় কিছু খেতে পারবে না- এগুলো অমূলক ধারণা।

সংগৃহীত।

Want your school to be the top-listed School/college?

Telephone

Website