06/15/2017
নিবৃত পল্লীতে
হেরার আলো
আলোর মশালহাতে লক্ষাধিক নবি-রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওসাল্লাম আগমন করে আঁধারাচ্ছন্ন পৃথিবীকে করেছেন আলোকোজ্জ্বল। অন্ধকারে পথহারা মানুষদের দেখিয়েছেন সরল, সঠিক পথ। শুনিয়েছেন চিরমুক্তির বাণী। তাদের আহ্বানে যারা সাড়া দিয়েছেন, তারাই হয়েছেন সফল। আর যারা করেছে অবহেলা, তাদের জন্য অবধারিত লাঞ্চনাকর শাস্তি। কালের চাকা ঘুরে ঘুরে যখন ৬১০ খ্রিস্টাব্দ। তখনি আবির্ভাব ঘটল সর্বশেষ নবি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের। তিনি যখন আগমন করেন, আরবে তখন চলছে অন্ধকার যুগ। মনুষ্যত্বহীন মানুষের অভয়ারণ্য ছিল পুরো আরব। কন্যা সন্তান জন্ম হলে মেরে ফেলত। পুঁতে ফেলত জীবন্ত মাটিতে। কি করুণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল তারা। অন্ধকারে নিমজ্জিত এই জাতিকে উদ্ধারে মনোনিবেশ করলেন নবিজি।
৬১৪ খ্রিস্টাব্দে মক্কার সাফা পাহাড়ের পাদদেশে প্রতিষ্ঠা করলেন "দারুল আরকাম"। ইতিহাসবিদরা এই মাদরাসাটিকেই ইসলামের সর্বপ্রথম মাদরাসা হিসেবে অভিহিত করেন। ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত উমর রাজিয়াল্লাহু আনহু এই মাদরাসাঙ্গিনায় এসেই ইসলামধর্ম কবুল করেন। আরো ছয় বছর পর। নবুওতের দশম বর্ষ। জামারায়ে আকাবায় মদীনার কিছু লোক ইসলাম গ্রহণ করেন। কিছুদিন পর তারা নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে তাদের জন্যে শিক্ষক নিয়োগের আবেদন করেন। হযরত মাসআব বিন উমাইর রাজিয়াল্লাহু আনহুকে শিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত করেন নবিজি। এই সাহাবী মদীনায় প্রতিষ্ঠা করেন "দারুল আসআদ ইবনে যুরারা"। ইতিহাস বলে এটিই মদীনার সর্বপ্রথম মাদরাসা। তবে হ্যাঁ, আন্তর্জাতিক মানের আবাসিক সুবিধাসমৃদ্ধ মাদরাসাটি প্রতিষ্ঠিত হয় মসজিদে নববি চত্বরে। "মাদরাসায়ে সুফফা" নামে সর্বমহলে পরিচিত এই মাদরাসাটির শিক্ষার্থীদের বলা হত "আসহাবে সুফফা"।
এই মাদরাসায়ে সুফফার ছাত্রদের হাতে পরবর্তীতে স্থানে স্থানে প্রতিষ্ঠিত হতে থাকে মাদরাসা।
১২৭৮ সালে ঢাকার সোনারগাঁয়ে একটি ইসলামী বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন শারফুদ্দীন আবু তাওয়ামা রাহিমাহুল্লাহ।
১৮৬৬ সালে ভারতে প্রতিষ্ঠিত হয় দারুল উলুম দেওবন্দ। ইসলামী শিক্ষাবিপ্লবের সূতিকাগার এই মাদরাসার অনুসরণে বিশ্বের নানা প্রন্তে প্রতিষ্ঠিত হতে থাকে মাদরাসা। তারই ধারাবাহিকতায় চতুলের নিবৃত এই পল্লীতে প্রতিষ্ঠিত হয় জামেয়া ইসলামিয়া খাদিজাতুল কুবরা মহিলা মাদরাসা। তখন ৯০ দশকের সূচনাকাল। আলহাজ্ব মুসাব্বির সাহেবের ওয়াকফকৃত জমিতে প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়টি হেরার আলো ছড়াতে শুরু করল। টিনশেডের এই বিদ্যালয়টির অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখতে এগিয়ে আসলেন এলাকাবাসী। করতে লাগলেন সার্বিক সহযোগিতা। যুগসচেতন একঝাক আলেম ও মুরব্বিদের তত্ত্বাবধানে এগিয়ে চলল মাদরাসা। মুহতামিমের গুরু দায়িত্ব অর্পণ করা হল হাফিজ বিলাল আহমদ সাহেবের হাতে। তিনি পরিচালনা করলেন প্রায় ৪ বছর। পরবর্তীতে হাফিজ সাহেব উদ্দীনের পরিচালনায় পরিচালিত হয় প্রায় ৩ বছর। এরপর এই দায়িত্বটি অর্পণ করা হয় মাওলানা শরীফ আহমদের হাতে। উনার হাতেই মাদরাসাটি পার করতে শুরু করে যৌবনকাল। কিন্তু অপ্রিয় হলেও সত্য যে, এই দীর্ঘ সময়ে মাদরাসাটির উন্নতি ততটুকু হয়নি, যতটুকু হওয়া প্রয়োজন ছিল। বরং বাহ্যত মাদরাসার পরিচালনায় এসেছে শিথিলতা। শিক্ষাব্যবস্থায় এসেছে অমনোযোগিতা। হারতে লাগল মাদরাসার নিজস্ব ভূমি। হেরার আলোর ঝলকানি করতে লাগল নিবুনিবু।
এমনি করুণ মূহুর্তে এগিয়ে আসলেন মাওলানা আব্দুল হাই সাহেব। ২০১৭ সালের শুরুর দিকে তাকে সমঝিয়ে দেওয়া হয় মাদরাসার জিম্মাদারি। তিনি মহান এ জিম্মাদারি গ্রহণের পরই অনেক জল্পনা কল্পনার মধ্যদিয়ে নিজ খরচে উদ্ধার করেন মাদরাসার ভূমি। রেজিস্টারি করেন মাদরাসার নামে। দরদী দিলওয়ালা এই আলেম নিজস্ব অর্থায়নে তৈরি করলেন আরেকটি টিনশেড ঘর। মাদরাসা পরিচালনায় নিয়ে আসলেন স্বচ্ছতা। শিক্ষাব্যবস্থায় আনলেন ভিন্নতা। গ্রহণ করলেন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। ব্যক্ত করলেন এগিয়ে নেওয়ার দৃঢ়প্রত্যয়। হেরার আলোয় আলোকিত সমাজ বিনির্মাণের প্রতিজ্ঞায় ব্যস্তসময় পার করছেন তিনি।
হাফিজ সাওয়াব সাহেবের দানকৃত মসজিদটি মাদরাসাকে করেছে আকর্ষণীয়। আল্লাহ নামের সুরে সুরে মোহিত হচ্ছে এলাকা। বানাত অষ্টম পর্যন্ত মাদরাসাটিতে ছাত্রীসংখ্যা আড়াই শতাধিক।
বর্তমান মুহতামিম মাওলানা আব্দুল হাই সাহেবের স্বপ্ন- "কোন একদিন জামেয়া খাদিজাতুল কুবরায় বাজবে হাদ্দাসানার মধুর সুর"।
মাদরাসাটি বর্তমানে পূর্ব সিলেট আযাদ দ্বীনি আরবী মাদরাসা শিক্ষাবোর্ড ও চতুল আঞ্চলিক বোর্ডের অধীনে ফাইন্যাল পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে কৃতিত্বের সাক্ষর রাখছে।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার স্বীকৃত "আল-হাইয়াতুল উলইয়া লিল জামিয়াতিল কওমিয়া বাংলাদেশ" এর তত্ত্বাবধানে তাকমীল ফিল হাদীস (মাস্টার্স) খোলার প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণ করছেন মাওলানা আব্দুল হাই সাহেব।