07/15/2025
ইম্পস্টার সিন্ড্রোম: একটি কলোনিয়াল লেগাসি
এমনটি কি কখনও হয়েছে যে একটি কাজের জন্যে চরমভাবে অপ্রস্তুত, অযোগ্য মনে হয়েছে নিজেকে? মনে হয়েছে, যে আপনার যে যোগ্যতা নেই আপনি তা দাবী করে চলেছেন, আপনার যা প্রাপ্য নয় তা আপনাকে দেয়া হচ্ছে? এমন ভাবনাকে বলা হয়ে থাকে ইম্পস্টার সিন্ড্রোম। এই অনুভূতি আপনাকে নিজের কাজ থেকে, কাজের গন্ডি থেকে ধীরে ধীরে সরিয়ে দেবে। নিজেকে দুর্বল করে উপস্থাপন করবে কর্মক্ষেত্রে, সমাজে। তবে প্রশ্ন হচ্ছে, এই সিন্ড্রোমের উৎস কী বা করা?
ইম্পস্টার সিন্ড্রোমের এই মনস্তাত্ত্বিক স্থিতির কথা ১৯৭৮ সালে প্রথম পল ক্ল্যান্স এবং সুজান আইমস নামের দুজন সাইকোলজিস্ট চিহ্নিত করেন। তাঁরা উচ্চপদধারী নারীদের ভেতর এই অনুভূতি লক্ষ্য করেন। একে তাঁরা "ইম্পস্টার ফেনোমেনা" বলে আখ্যা দেন সে সময়। তাঁরা বলেন যে কিছু বিশেষ পারিবারিক অভিজ্ঞতা এবং পরবর্তীতে, কর্মক্ষেত্রে লিঙ্গভিত্তিক স্টেরিওটাইপিং এর পেছনে দায়ী।
একটু ভেবে দেখুন, বাংলাদেশের, সত্যি বলতে উপমহাদেশের অধিকাংশ মানুষই কী একজন শ্বেতাঙ্গকে দেখলে, তার ভাষা শুনলে, কিংবা তার সাথে কর্মক্ষেত্রে অবস্থান করলে নিজেকে সেই ব্যক্তির চেয়ে অযোগ্য মনে করে না? আমরা ইংরেজীতে কথা বলতে পারলে নিজেকে বেশী যোগ্য বলে ধরে নেই; ইংরেজি গান শুনলে, হলিউডের ছবি কিংবা তার অভিনেতা-নির্দেশকের নাম জানলে নিজেকে চৌকষ মনে করি। ইম্পস্টার সিন্ড্রোম তাই নারীদের ভেতরই প্রবল, এটি আমাদের সমাজে খাটে না। ভিনদেশি যে কোনো মানুষের সামনে আমরা প্রায় সকলে এই সিন্ড্রোমে ভুগি; কেউ কম কেউবা বেশি।
এর কারণ হয়ত আমাদের ঔপনিবেশিক অতীত। নোবেলজয়ী সাহিত্যিক আব্দুলরাজ্জাক গুরনাহ তাঁর "বাই দা সি" উপন্যাসে উপনিবেশকারীদের একটি চমৎকার বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি বলছেন, উপনিবেশ যারা তৈরী করে তাদের চরিত্রে এক অদ্ভুত রকমের কনফিডেন্স লক্ষ্য করা যায়। একটি অচেনা দেশে, অজানা ভাষাভাষীর মানুষের সাথে প্রথম পরিচয় থেকেই এরা নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব জাহির করতে থাকে। তারা কিন্তু সেই দেশটি সম্পর্কে বা সেই মানুষের সংস্কৃতি সম্পর্কে তখনো তেমন কিছুই জেনে ওঠেনি। অথচ, নিজেদের ভাষায় তারা দিব্যি কথা বলে চলে, নিজেদের পোশাক, খাবার, প্রযুক্তির বড়াই করতে থাকে। তারা নিয়ে আসে নিজস্ব ভাষা, সাহিত্য, সংগীত, এমনকি সুগন্ধি পর্যন্ত। চাপিয়ে দেয় স্থানীয়দের ওপর। দাবী করতে শুরু করে যে উপনিবেশ গড়তে দেয়া যেন স্থানীয়দের দায়িত্ব। স্থানীয়রা এতে অনেক লাভবান হবে। আমাদের কিসে ভালো তা আমাদের চেয়ে তারাই যেন বেশি ভালো বোঝে! অনেকটা মধ্যপ্রাচ্যে রিভিয়েরা বানাবার মতো। ব্রিটিশরা তো এমনটিই করেছিল। স্প্যানিশ কনকিস্তাদর এভাবেই মেস্কিকোর টিনোচটিটলান দখল করেছিল।
আমরা তাই আমাদের দেশীয় প্রতিষ্ঠানের প্রধান করে নিয়ে আসি কোনো শ্বেতাঙ্গকে। দেশীয় ক্রীড়া দলের কোচ হিসেবে আমদানি করি একজন ফিরিঙ্গিকে। প্রবাসে যখন কাজ করতে যাই, তখন কেমন যেন ন্যুজ্ব হয়ে চলি। শ্বেতাঙ্গ সহর্মীকে তুষ্ট করাতেই যেন রয়েছে আমাদের আগামীর চাবি। কী অদ্ভুত এই সমাজ, কী বিচিত্র আমাদের চিন্তা-চেতনা!
নিজের যোগ্যতার বাইরে, আদতে কোনো কিছুই মানুষকে সামনে এগিয়ে নেয় না। আমরা উপনিবেশের অভিজ্ঞতাকে যতদিন ঝেড়ে ফেলতে না পারবো, ততদিন এই ইম্পস্টার সিন্ড্রোমের হাত থেকে রক্ষা নেই। এ চিন্তা ইংরেজী বিদ্বেষ নয়, এ ভাবনা গ্লোবাল হবার পরিপন্থী নয়; বরং এই অনুভূতি নিজের ক্ষমতা, নিজের ইতিহাস ও অভিজ্ঞতার ওপর বিশ্বাস রাখার প্রশিক্ষণ।