Ibn Uthaimeen Rahimahullah

Ibn Uthaimeen Rahimahullah মানুষের নিকট শাইখ (রাহিমাহুল্লাহ)-কে জীবিত রাখার উদ্দেশ্যেই এই পেইজ।

Owner: Fahad Ibn Ibrahim uthaymeen.com (24.12.2021)
[7].

শাইখুল ইসলাম ইবনে উসাইমীন রাহিমাহুল্লাহ
নাম ও বংশ পরিচয়:
তিনি হলেন: ইমাম, মুহাক্কিক, ফকীহ, মুফাসসির, শাইখ আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মাদ বিন সালিহ বিন মুহাম্মাদ বিন সুলাইমান বিন আবদুর রহমান বিন উসমান বিন আবদুল্লাহ বিন আবদুর রহমান বিন আহমাদ বিন মুকবিল, আল- উসাইমীন, আল-উহাইবি, আত-তামিমি।
তাঁর পূর্বপুরুষ উসমান রাহিমাহুল্লাহ থেকে তাঁর পরিবার 'উসাইমীন' নামে পরিচিতি লাভ করে।[1]
জন্ম:
তিনি ১৩৪৭ হিজরির (১৯২৯ খ্র

িস্টাব্দ) বরকতময় রামাদান মাসের ২৭ তারিখে সৌদি আরবের 'আল-কাসিম' প্রদেশের 'উনাইজাহ' শহরে জন্মগ্রহণ করেন।
শিক্ষাজীবন ও শিক্ষকগণ:
তিনি তাঁর নানা আবদুর রহমান ইবন সুলাইমান আদ-দামিগ রাহিমাহুল্লাহর নিকট কুরআন তিলাওয়াত ও মুখস্থ করেন। অতঃপর তিনি অন্যান্য বিষয় সম্পর্কে জ্ঞানার্জনের দিকে মনোনিবেশ করেন এবং লেখা, গণিত ও অন্যান্য বিষয়ে জ্ঞানার্জন করেন। শাইখ আবদুর রহমান আস-সা'দী রাহিমাহুল্লাহ তাঁর দুজন শিষ্যকে তরুণ ছাত্রদের শিক্ষাদানের জন্য নিযুক্ত করতেন। তাদের মধ্যে একজন হলেন শাইখ আলী আস-সালিহি আর অপরজন শাইখ মুহাম্মাদ ইবন আবদুল আযীয আল-মুতাওয়া (রাহি.)। উনাদের অধীনে ইবন উসাইমীন এ শাইখ আস-সা'দী লিখিত 'আল-আকীদাতুল ওয়াসিতীয়া' ইবন তাইমিইয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহর সংক্ষেপিত সংস্করণ 'মিনহাজুস সালিকিন ফিল ফিকহ', সেই সঙ্গে 'আল- আজরুমিয়াহ' ও 'আল-আলফিয়াহ' অধ্যয়ন করেন। এছাড়াও তিনি শাইখ আবদুর রহমান ইবন আলী আল-আওদানের নিকট 'মিরাস' বা উত্তরাধিকার বণ্টনের বিধান ও ফিকহ সম্পর্কে জ্ঞানার্জন করেন।
শাইখ আবদুর রহমান ইবন নাসির আস-সা'দী রাহিমাহুল্লাহ-কে শাইখ ইবন উসাইমীন রাহিমাহুল্লাহর প্রথম শিক্ষক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কারণ তিনি তাঁর কাছে কিছু সময় অবস্থান করে ছিলেন। তাঁর অধীনে তিনি তাওহীদ, তাফসীর, হাদীস, ফিকহ, উসুলুল ফিকহ, মুস্তালাহুল হাদীস, ফারায়িয, নাহু ও সরফ বিষয়ক জ্ঞান অর্জন করেন।
তিনি মহান শাইখ, আবদুল আযীয ইবন বাযের অধীনেও শিক্ষা গ্রহণ করেন। তাই তিনি তাঁর দ্বিতীয় শিক্ষক হিসেবে পরিচিত। তাঁর অধীনে তিনি সহীহ বুখারি, শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়াহ রাহিমাহুল্লাহর কিছু ফিক্বহ বিষয়ক গ্রন্থ অধ্যয়ন করেন। এছাড়াও অনেক মহান ‘আলিমদের থেকে তিনি ইলম অর্জন করেন। যেমন- আল্লামা শাইখ মুহাম্মাদ আল-আমীন আশ-শানকিতি, শাইখ ফকীহ আবদুর রাযযাক বিন নাসির বিন রাশীদ, শাইখুল মুহাদ্দিস আবদুর রহমান আল-ইফরীকি রাহিমাহুমুল্লাহ।
ইলমী অগ্রগণ্যতা ও অবদান:
১৩৭১ হিজরিতে তিনি জুমআ মসজিদে শিক্ষাদান শুরু করেন। রিয়াদে যখন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহ প্রতিষ্ঠা করা হয়, তখন তিনি সেখানে ভর্তি হন। দুই বছর পরে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন এবং তাকে উনাইজাহর একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান 'মাহাদ আল-ইলম'-এ শিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত করা হয়। ইতোমধ্যে তিনি শারীয়াহ কলেজ সংশ্লিষ্ট পড়াশোনা চালিয়ে যেতে থাকেন এবং শাইখ আস-সা'দী এ'র নিকট শিক্ষা গ্রহণ করেন।
শাইখ আস-সা'দী ১৩৬৭ হিজরিতে (১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দ) মৃত্যুবরণ করেন। তখন শাইখ ইবন উসাইমীনকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি উনাইজাহর কেন্দ্রীয় মসজিদ 'আল-জামিউল কাবীর' ও কেন্দ্রীয় লাইব্রেরিতে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। আজীবন তিনি এই দায়িত্ব পালন করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে তিনি ইমাম মুহাম্মাদ বিন সাউদ ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের 'আল-কাসিম' শাখায় শরীয়াহ ও উসূলুদ দীন অনুষদেও শিক্ষা দান করেন। এছাড়াও তাঁকে সৌদি আরবের সর্বোচ্চ উলামা পরিষদের সদস্য হিসেবে নিযুক্ত করা হয়।
শাইখ ইবন উসাইমীন রাহিমাহুল্লাহ দাওয়াতি ময়দানে এবং মুসলিমদের শিক্ষাদানে অনেক বড়ো ও সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। তাইতো বিভিন্ন উপকারী ক্লাস ও উনাইজাহর কেন্দ্রীয় মসজিদে তাঁর জুমআর দিনের হৃদয়স্পর্শী খুতবাগুলোর কারণে তিনি মানুষের মাঝে পরিচিত হয়ে উঠেন। তিনি প্রতিবছর রামাদান মাসে ইতিকাফের দিনগুলোতে বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষাদান করতেন। মসজিদুল হারাম ও মসজিদুন নাবাওয়িতেও তিনি দারস দিতেন। মদীনা ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়েও তিনি সেমিনার ও দারস দিয়েছেন। হজের সময়ে পৃথিবীর উত্তর থেকে দক্ষিণ পর্যন্ত বিভিন্ন দেশ থেকে আগত মুসলিমদের, বিভিন্ন পত্রিকায় ও রেডিয়োতে সম্প্রচারিত হতো 'নূরূন আলাদ্দারব' ও 'কুরআনের বিধিবিধান' নামক অনুষ্ঠান। ছাত্রদের সঙ্গে বিভিন্ন চিঠিতে তিনি ফাতওয়া প্রদান করতেন। এছাড়াও দৈনন্দিন পেশকৃত বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিতেন। এর ফলে আল্লাহ তাআলা তাঁর সুনাম মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দেন।
সারাটি জীবন তিনি শিক্ষাদান, ফাতাওয়া দেওয়া ও দাওয়াতি কাজে ব্যয় করেছেন। আলহামদুলিল্লাহ।
যুহদ বা দুনিয়াবিমুখতা:
শাইখ ১৬৯ ছিলেন প্রচণ্ড রকমের দুনিয়াবিমুখ। তাঁর না ছিল অনেক সম্পদ, না ছিল অনেক টাকা-কড়ি। শাইখ যা বেতন পেতেন তা তাঁর পরিবারের জন্য খরচ করতেন। তাঁকে একবার একটি নতুন গাড়ি উপহার দেওয়া হয়েছিল কিন্তু তিনি তা ব্যবহার করেননি। ফলে তাতে ধুলোবালির স্তর পড়ে যায়। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ তার বাসার সামনে থেকে গাড়িটি সরিয়ে নেয়। তাঁকে একটি বড়ো বাড়িও দেওয়া হয়েছিল, যা তিনি তাঁর ছাত্রদের দিয়ে দেন। তাঁর ১৯৮০ সালের পুরোনো মডেলের একটি টয়োটা ক্রেসিডা (Cressida) গাড়ি ছিল।
কেউ তাঁর মাথার সাদা ঘুতরা (রুমাল), পরনের বিশত পোশাক ও জুতা দেখলেই বুঝতে পারত যে, এই মানুষটি দুনিয়াবিমুখ। তিনি দুনিয়ার ভোগবিলাসিতা নিয়ে মোটেও চিন্তিত নন।[২]
গ্রহণযোগ্যতা ও খ্যাতি:
শাইখ ইবন উসাইমীন রাহিমাহুল্লাহ ছিলেন প্রসিদ্ধ ও প্রশংসনীয় ব্যক্তিত্ব। সর্বস্তরের মানুষ তাঁকে গ্রহণ করে নিয়েছিলেন। সাধারণ মানুষ তাঁকে খুবই ভালোবাসতো, তাঁর আলোচনা ও দারস শোনার জন্য উদগ্রীব থাকতেন। তিনি ছিলেন একজন মহান আলিম ও প্রাঙ্ক ফকাহ। তাঁর সময়ের সৌদি আরবের বাদশাহগণ তাঁকে খুবই শ্রদ্ধা পারে তেমীই বাদশাহ খালিদ, ফাহাদ, যুবরাজ আব্দুযান। যুবরাজ সুলতান 'আল-কাসিম'-এ গেলে শাইখ রাহিমাহুল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতেন।
ছাত্রদের মাঝেও তাঁর বিশেষ সম্মান ও জনপ্রিয়তা ছিল কারণ তিনি ছিলেন তাদের প্রতি অত্যন্ত দয়াশীল ও তাঁদের ইলম অর্জনে পরম সহযোগী।
তাঁর ছাত্রগণ:
বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও মসজিদসমূহে তিনি আজীবন দারস দিয়েছেন। ফলে প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিকভাবে তাঁর ছাত্রের প্রকৃত সংখ্যা আল্লাহই সম্যক অবগত। সুপরিচিত কয়েকজন হলেন,
১। শাইখ বদর বিন আলী আল-উতাইবি,
২। শাইখ আবদুল মুহসিন আল-আব্বাদ,
৩। শাইখ সা'দ বিন নাসির আশ-শিসরি,
৪। শাইখ ফালাহ বিন ইসমাইল আল-মানদিকার,
৫। শাইখ মুহাম্মাদ বিন হাদি আল-মাদখালি,
৬। শাইখ ওয়াসী উল্লাহ আব্বাস,
৭। শাইখ আদাম আল-ইথিওবী,
৮। শাইখ মুহাম্মাদ যিয়াউর রহমান আল-আযমী প্রমুখ।
কিতাবাদি:
শাইখ মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-উসাইমীন রাহিমাহুল্লাহ এর বিপুল সংখ্যক মূল্যবান গ্রন্থ রয়েছে যার মাধ্যমে মানুষ উপকৃত হচ্ছে। যেমন- আকীদাহ, ফিক্বহ ও এর মূলনীতি, উপদেশ, দাওয়াহ ইত্যাদি বিষয়ক। যার মধ্য হতে বিপুল সংখ্যক বই সৌদি আরবের ধর্ম মন্ত্রণালয় থেকে সিলেবাসভুক্ত করা হয়েছে। তাঁর গ্রন্থসমূহ দুধরনের।
১। তিনি নিজে লিখেছেন এবং তাঁর জীবদ্দশায় বা মৃত্যুর পর প্রকাশিত হয়েছে।
২। তাঁর নিজে লিখেননি বরং তাঁর বিভিন্ন দারস, আলোচনা থেকে শ্রুতিলিখন করা হয়েছে।
তাঁর লিখিত কিছু গ্রন্থ নিম্নরূপ:
১. ফাতহ রব্বীল বারীয়াহ বিত তালখিস আল-হামাওয়িয়াহ এটি তাঁর প্রথম প্রকাশিত বই। তিনি এই বই লেখা শেষ করেন ১৩৮০ হিজরির যুলকাদা মাসের ৮ তারিখে। রিয়াদের মাকতাবাতুল মা'আরিফ থেকে এটি প্রকাশিত হয়।
২. আল-কাওয়াইদুল মুসলা ফি সীফাতিল্লাহ ওয়া আসমায়িহি আল-হুসনা -আল্লাহর গুণাবলি ও তাঁর সুন্দর নামসমূহ সম্পর্কে নীতিমালা।
এটি সবচেয়ে চমৎকার গ্রন্থগুলোর মধ্যে একটি।
৩. আকীদাহ আহলুস সুন্নাহ ওয়াল-জামাআহ এই বইটিতে তিনি সংক্ষিপ্ত পরিসরে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহর আকীদাহর বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরেছেন। মদীনা ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় এটি প্রকাশ করে।
৪. শারহু লুমআতুল ইতিকাদ লি ইবনিল কুদামাহ লুমআতুল ইতিকাদ এর ব্যাখ্যা: একটি সরল পথের দিশারি।[3]
এটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলোর মাধ্যমিক বিভাগের প্রথম বর্ষের তাওহীদ বিষয়ের জন্য নির্ধারণ করা হয়।
৫. নুবাজ ফিল আকীদাহ আল-ইসলামিয়্যাহ ইসলামি আকীদাহর উপরে একটি সংক্ষিপ্ত প্রবন্ধ।
এই গ্রন্থে শাইখ ঈমানের ছয়টি স্তম্ভের ব্যাখ্যা করেছেন। এটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলোর মাধ্যমিক বিভাগের তৃতীয় বর্ষের তাওহীদ বিষয়ের জন্য নির্ধারণ করা হয়। এটিও মাকতাবাতুল মাআরিফ থেকে প্রকাশিত হয়।
৬. শারহুল আকীদাহ আল-ওয়াসিতীয়া লি ইবন তাইমিয়াহ
এটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমিক বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের তাওহীদ বিষয়ের জন্য নির্ধারণ করা হয়।
৭. তাফসীর আয়াতিল কুরসি আয়াতুল কুরসির ব্যাখ্যা
এই তাফসীরটি আল্লাহর নাম ও গুণাবলির চমৎকার আলোচনায় পরিপূর্ণ, যা শাইখ ব্যাখ্যা করেছেন।
৮. আহকামুল উদহিয়াহ ওয়া যাকাত কুরবানি ও যাকাতের বিধান।
তাঁর দারস থেকে লিখিত বিখ্যাত ও উপকারী গ্রন্থ হলো, 'আশ-শারহুল মুমতি আলা যাদিল মুসতাকনি।'
তাঁর ইলমী গবেষণামূলক রচনার সংখ্যা ৫৫ টি।[4] উসূলুল ফিক্বহ, মুসত্বালাহুল হাদীস ও আক্বীদার উপর তাঁর লিখিত একাধিক নিবন্ধ মুহাম্মাদ বিন সাউদ ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগে পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত।
বাংলা ভাষায় শাইখের অনূদিত বই ও লিখনসমূহ:
প্রকাশিত বই:
১। তাম্বীহুল আফহাম বিশারহি উমদাতিল আহকাম, আত-তাওহীদ প্রকাশনী
২। ফাতাওয়া আরকানুল ইসলাম, তাওহীদ পাবলিকেশন্স
৩। কিতাবুল ইলম, মাকতাবাতুস সুন্নাহ রাজশাহী
৪। রমজান মাসের ৩০ আসর, সবুজপত্র পাবলিকেশন
৫। সালাত পরিত্যাগকারীর বিধান, তাওহীদ পাবলিকেশন্স/ইহইয়া-উস সুন্নাহ ফাউন্ডেশন
৬। ফিকহের মূলনীতি, মাকতাবাতুস সুন্নাহ রাজশাহী
৭। হাজ্জ, উমরা ও মদীনা যিয়ারত, মাকতাবাতুস সুন্নাহ রাজশাহী
৮। মতবিরোধপূর্ণ বিষয়ে সঠিক পন্থা অবলম্বনের উপায়, তাওহীদ পাবলিকেশন্স
৯। বিদআত ও তার অনিষ্টকারিতা, হাদীছ ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ
১০। যাকাতুল ফিতর, মাকতাবাতুস সুন্নাহ রাজশাহী
১১। মহিলাদের ঋতুস্রাব ও প্রসূতি অবস্থার বিধিবিধান সংক্রান্ত ৬০ টি প্রশ্ন, তাওহীদ পাবলিকেশন্স
১২। যুবকদের কিছু সমস্যা, হাদীছ ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ
১৩। সলাতে ভুল হলে কি করবেন? ও অসুস্থ ব্যক্তি কিভাবে সলাত আদায় করবেন, জায়েদ লাইব্রেরী
১৪। তাকদীরের প্রতি ঈমান, পরিশুদ্ধি প্রকাশন
১৫। কুরআন ও সহীহ হাদীসের আলোকে ইসলামী পর্দা, আত-তাওহীদ প্রকাশনী
১৬। ইসলামী পুনর্জাগরণ : পথ ও পদ্ধতি, হাদীছ ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ
১৭। ইসলাম স্বীকৃত অধিকার, তাওহীদ পাবলিকেশন্স
১৮। উসূলুল ঈমান থেকে গুরুত্বপূর্ণ দশটি মাস'আলা, মাকতাবাত আল মুফলিহুন
১৯। সমাজ সংস্কারে নারীর ভূমিকা, হাদীছ ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ
২০। শারহু সালাসাতিল উসূল, তাওহীদ পাবলিকেশন্স- আলোকধারা
>অনূদিত কিন্তু অপ্রকাশিত বই:
১। ছয়টি মূলনীতির ব্যাখ্যা (মাসিক আল-ইখলাছ, জুন'২০-নভেম্বর'২০ সংখ্যা)
২। আল্লাহ তা'আলার নান্দনিক নাম ও গুণসমগ্র: কিছু আদর্শিক নীতিমালা
৩। আল্লাহর দিকে দাওয়াতের সম্বল
৪। আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাতের আক্বীদা
৫। ঈমানের মূলনীতি সমূহের ব্যাখ্যা
৬। জানাজার বিধিবিধান সংক্রান্ত ৭০ প্রশ্ন
৭। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর গুণাবলি
৮। নবীর সুন্নাতকে আঁকড়ে ধরা ও তার প্রভাব (লেকচার)
৯। সৌন্দর্য প্রদর্শন ও বেপর্দা সম্পর্কে মুমিন নারীদের জন্য কতিপয় নির্দেশনা
(২-৯) এগুলোসহ আরও বেশ কয়েকটি বই ও প্রবন্ধ ইসলাম হাউজে পাওয়া যাবে।[5]
সন্তানসন্তুতি:
শাইখ রাহিমাহুল্লাহর সন্তানের সংখ্যা ৮ জন। ৫ জন ছেলে আর ৩ জন মেয়ে। ছেলেরা হলেন: আবদুল্লাহ, আবদুর রহমান, ইবরাহীম, আবদুল আযীয ও আবদুর রহীম।[6]
বাদশাহ ফয়সাল পুরস্কার:
শাইখ আজীবন ইসলামের খিদমতে ব্যয় করেছেন এজন্য ১৯৯৪ সালে বাদশাহ ফয়সাল পুরস্কার লাভ করেন। তাঁর পক্ষ থেকে পুরস্কার গ্রহণ করেন শাইখ ফাহদ বিন নাসির আল-উসাইমীন।[7]
মৃত্যু:
শাইখ এ দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন। চিকিৎসার জন্য তাঁকে আমেরিকাতে নিয়ে যাওয়া হয়। সেটি ছিল সৌদি আরবের বাহিরে তাঁর একমাত্র সফর। সেই সুযোগটিও তিনি সেখানে আল্লাহর পথে দাওয়াত দেওয়ায় কাজে লাগান। সেখানে জুমআর খুতবা দেন। আমেরিকা থেকে ফিরিয়ে আনার পর তাঁকে রিয়াদ বিশেষায়িত হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং তাঁর অবস্থার অবনতি হয়। হাসপাতালে থাকাবস্থায় রামাদান চলে আসে। কিছুদিন অতিবাহিত হওয়ার পর শাইখ মক্কায় মসজিদুল হারামে দারস দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। যেমনটি তিনি বিগত বছরগুলোতে দিচ্ছিলেন। শাইখ'র জন্য একটি বিশেষ রুমের ব্যবস্থা করা হয়। সেখানে বিছানায় শুয়ে মাইক্রোফোনে তিনি জীবনের শেষ দারস দেন। ছাত্ররা কেবল তাঁর গলা শুনতে পাচ্ছিল।
রামাদানের পর জেদ্দার একটি হাসপাতালে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানেই ১৪২১ হিজরির ১৫ই শাওয়াল, বুধবার (১০ই জানুয়ারি ২০০১ খ্রিস্টাব্দ), ৭৪ বছর বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। বৃহস্পতিবার মসজিদুল হারামে জানাযা সম্পন্ন হওয়ার পর মক্কার 'আল-আদল' কবরস্থানে আল্লামা শাইখ ইবন বায রাহিমাহুল্লাহর পাশে তাঁকে দাফন করা হয়। আমরা আল্লাহর নিকট দুআ করি মুসলিমরা যেন তাঁর রেখে যাওয়া জ্ঞান ও প্রজ্ঞা হতে উপকৃত হয়। আল্লাহ যেন তাঁকে উত্তম প্রতিদান দান করেন এবং তাঁর গুনাহসমূহ ক্ষমা করেন।[8]
*
[১]. ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-উসাইমীন রাহিমাহুল্লাহর জীবনী, শাইখ আব্দুল মুহসিন অল- আব্বাদ, ইংরেজি, পৃষ্ঠা-১৩
[2]. আদ-দুরুস সামীন ফি তাবযামাতি ফাকিছিল উম্মাহ আল-আল্লামা ইবন উসাইমীন, পৃষ্ঠা-২১৭
[3]. 'তাওহীদ পাবলিকেশন্স'-এর 'আলোকধারা' থেকে প্রকাশিতব্য
[4]. ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-উসাইমীন রাহিমাহুল্লাহর জীবনী, পৃষ্ঠা-২৩
[5]. তালিকাটি প্রস্তুত করেছেন মাহমুদুল হাসান ফয়সাল।
[6]. kingfaisalprize.org/shaikh-mohammad-bin-saleh-al-uthaimin (27.12.2021)
[8]. ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-উসাইমীন রাহিমাহুল্লাহর জীবনী, ইংরেজি, পৃষ্ঠা-২৫-২৬ থেকে সারমর্ম অনূদিত
[আর্টিকেলটি "বিংশ শতাব্দীর তিন কিংবদন্তি" নামক বই থেকে সংকলিত।]
~ ফাহাদ ইবনে ইব্রাহীম ইবনে আহমাদ

19/12/2025

নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তিকে আপনার বলা " #অমুক_শহীদ", এই ব্যাপারে কিয়ামতের দিন আপনাকে জিজ্ঞাসা করা হবে যে, "তোমার কাছে কি গায়েবের জ্ঞান ছিল যে, সে শহীদ হিসেবে নিহত হয়েছে?" আর যার বাহ্যিক অবস্থা সৎকর্মশীল, আমরা তার জন্য শাহাদাতের আশা (রাজা’) করি, কিন্তু তার ব্যাপারে নিশ্চিত সাক্ষ্য দেই না এবং আল্লাহর ওপর আগ বাড়িয়ে কোনো হুকুম লাগাই না। আশা করা (রাজা’) হলো দু’টি স্তরের মধ্যবর্তী অবস্থা। তবে আমরা দুনিয়াতে তার সাথে শহীদদের হুকুম অনুযায়ী আচরণ করি। যদি সে আল্লাহর পথে জিহাদে নিহত হয়, তবে তাকে তার রক্তমাখা কাপড়ে জানাযার সালাত ছাড়াই দাফন করা হবে। আর যদি সে অন্য প্রকারের শহীদদের অন্তর্ভুক্ত হয়, তবে তাকে গোসল দেয়া হবে, কাফন পরানো হবে এবং তার ওপর সালাত আদায় করা হবে।

আর তাছাড়া, আমরা যদি নির্দিষ্ট কারও ব্যাপারে সাক্ষ্য দেই যে, " #সে_শহীদ", তবে এই সাক্ষ্যের আবশ্যকীয় ফলাফল হলো: তার জান্নাতি হওয়ার সাক্ষ্য দেয়া। এটি আহলুস সুন্নাহর মতাদর্শের বিরোধী। কারণ, তারা নির্দিষ্টভাবে কাউকে জান্নাতি হওয়ার সাক্ষ্য দেন না, কেবল তাকে ছাড়া, যার ব্যাপারে নবীজি (ﷺ) গুণের মাধ্যমে বা নির্দিষ্ট করে সাক্ষ্য দিয়েছেন।

শাইখুল ইসলাম ‘আল্লামাহ ইমাম মুহাম্মাদ ইবনু ছ্বলিহ আল-উসাইমীন রাহিমাহুল্লাহ-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল: নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তিকে কি “শহীদ” (যেমন: শহীদ অমুক) বলা জায়েয?

তিনি উত্তরে বলেছেন: আমাদের জন্য জায়েয নয় যে, আমরা নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির ব্যাপারে সাক্ষ্য দেব যে, সে “শহীদ”; এমনকি যদি সে অত্যাচারিত হয়ে নিহত হয় কিংবা সত্যকে রক্ষা করতে গিয়ে নিহত হয়। তবুও “অমুক ব্যক্তি শহীদ”, এ কথা বলা আমাদের জন্য জায়েয নয়। এটি বর্তমানে মানুষের যা প্রচলন, তার বিপরীত। তারা এই শাহাদাতের বিষয়টিকে সস্তা বানিয়ে ফেলেছে এবং প্রত্যেক নিহত ব্যক্তিকে, এমনকি যদি সে জাহেলী গোত্রীয় অহমিকা বা জাতীয়তাবাদের কারণে নিহত হয়, তাকে তারা “শহীদ” নাম দিচ্ছে।

এটি হারাম। কারণ, কোনো নিহত ব্যক্তি সম্পর্কে আপনার “সে শহীদ”, এ কথা বলাটা একটি সাক্ষ্য, যা সম্পর্কে কিয়ামতের দিন আপনাকে জিজ্ঞাসা করা হবে। আপনাকে বলা হবে: আপনার কাছে কি জ্ঞান আছে যে, সে শহীদ হিসেবে নিহত হয়েছে?

এ কারণেই নবীজি (ﷺ) বলেছেন,

ما من مكلوم يكلم في سبيل الله والله أعلم بمن يكلم في سبيله إلا جاء يوم القيامة وكلمه يثعب دما اللون لون الدم والريح ريح المسك

"আল্লাহর পথে আহত কোনো ব্যক্তি নেই, আর আল্লাহই সর্বাধিক অবগত কে তাঁর পথে আহত হয়, যে কিয়ামতের দিন এমন অবস্থায় আসবে না যে, তার ক্ষতস্থান থেকে রক্ত প্রবাহিত হতে থাকবে; যার রং হবে রক্তের রং, এবং সুগন্ধি হবে মিসকের সুগন্ধি।" [বুখারী, আস-সহীহ, খণ্ড নং ৪, পৃষ্ঠা নং ২৫, হাদীস নং ২৮০৩; মুসলিম, আস-সহীহ, খণ্ড নং ৩, পৃষ্ঠা নং ১৪৯৫, হাদীস নং ১৮৭৬।]

নবীজির (ﷺ) এই বাণীর দিকে গভীরভাবে লক্ষ্য করুন: والله أعلم بمن يكلم في سبيله “আর আল্লাহই ভালো জানেন কে তাঁর পথে আহত হয়”। এখানে يكلم “ইউকলামু” মানে يجرح “আহত হয়”। কারণ, কিছু মানুষের বাহ্যিক অবস্থা দেখে মনে হতে পারে, সে আল্লাহর কালিমাকে সমুন্নত করার জন্য যুদ্ধ করছে, কিন্তু আল্লাহ জানেন, তার অন্তরে কী আছে এবং তা তার কাজের বাহ্যিক রূপের বিপরীত। আর আমীরুল মু’মিনীন ফিল হাদীস ইমাম বুখারী রাহিমাহুল্লাহ তাঁর সহীহ গ্রন্থে এই মাস‘আলার ওপর একটি অনুচ্ছেদ রচনা করেছেন। তিনি বলেছেন: “অনুচ্ছেদ: ‘অমুক ব্যক্তি শহীদ’, এ কথা বলা যাবে না।”

কারণ, শাহাদাতের বিষয়টি অন্তরের সাথে সম্পৃক্ত, আর অন্তরে কী আছে, তা আল্লাহ ‘আয্যা ওয়া জাল্লা ছাড়া কেউ জানেন না। তাই নিয়্যতের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কত এমন দুজন ব্যক্তি আছেন, যারা একই কাজ করছেন, অথচ তাদের দু'জনের মধ্যে আসমান ও যমীনের ব্যবধান, আর তা কেবল নিয়্যাতের কারণে। নবীজি (ﷺ) বলেছেন,

إنما الأعمال بالنيات، وإنما لكل امرئ ما نوى، فمن كانت هجرته إلى الله ورسوله فهجرته إلى الله ورسوله، ومن كانت هجرته إلى دنيا يصيبها أو امرأة ينكحها فهجرته إلى ما هاجر إليه

"নিশ্চয়ই আমলসমূহ নিয়্যাতের ওপর নির্ভরশীল। আর প্রত্যেক ব্যক্তি তাই পাবে, যা সে নিয়্যাত করেছে। সুতরাং যার হিজরত আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের উদ্দেশ্যে হবে, তার হিজরত আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের দিকেই গণ্য হবে। আর যার হিজরত দুনিয়া অর্জন কিংবা কোনো নারীকে বিবাহ করার উদ্দেশ্যে হবে, তার হিজরত সেদিকেই গণ্য হবে, যেদিকে সে হিজরত করেছে।" [বুখারী, আস-সহীহ, খণ্ড নং ১, পৃষ্ঠা নং ৬, হাদীস নং ১; মুসলিম, আস-সহীহ, খণ্ড নং ৩, পৃষ্ঠা নং ১৫১৫, হাদীস নং ১৯০৭।] ওয়াল্লাহু আ‘লাম।

তাকে আরো জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল: “অমুক ব্যক্তি শহীদ”, এ কথার হুকুম কী?

তিনি উত্তরে বলেছেন: এর উত্তর হলো, কাউকে শহীদ বলে সাক্ষ্য দেয়া দুভাবে হতে পারে:

প্রথমত: কোনো গুণের সাথে শর্তযুক্ত করে বলা। যেমন বলা হলো: যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে নিহত হয়, সে শহীদ, যে ব্যক্তি নিজের সম্পদ রক্ষা করতে গিয়ে নিহত হয় সে শহীদ, অথবা যে প্লেগ রোগে মারা যায়, সে শহীদ ইত্যাদি। এটি জায়েয, যেমনটি বিভিন্ন বর্ণনায় (নস) এসেছে। কারণ, আপনি সাক্ষ্য দিচ্ছেন, যা রাসূলুল্লাহ (ﷺ) খবর দিয়েছেন। আমাদের “জায়েয” বলার অর্থ হলো: এটি নিষিদ্ধ নয়, যদিও রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সংবাদকে সত্য বলে বিশ্বাস করে এরূপ সাক্ষ্য দেয়া ওয়াজিব।

দ্বিতীয়ত: নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তিকে “শহীদ” হিসেবে সাক্ষ্য দেয়া। যেমন নির্দিষ্ট করে বলা: “সে শহীদ”। এটি জায়েয নয়, কেবল তার ক্ষেত্রে ছাড়া, যার ব্যাপারে নবীজি (ﷺ) সাক্ষ্য দিয়েছেন, অথবা উম্মাহ যার ব্যাপারে একমত হয়েছে। আর ইমাম বুখারী রাহিমাহুল্লাহ এ বিষয়ে অধ্যায় রচনা করেছেন: “অনুচ্ছেদ: ‘অমুক শহীদ’, এ কথা বলা যাবে না।” ফাতহুল বারীতে (খণ্ড নং ৬, পৃষ্ঠা নং ৯০) বলা হয়েছে: “অর্থাৎ, নিশ্চিতভাবে এ কথা বলা যাবে না, ওহী ব্যতীত।” তিনি যেন ‘উমার ইবনুল খত্তাব (রায্বিয়াল্লাহু ‘আনহু)-এর হাদীসের দিকে ইঙ্গিত করেছেন, যেখানে তিনি খুতবায় বলেছিলেন:

تقولون في مغازيكم فلان شهيد، ومات فلان شهيدا ولعله قد يكون قد أوقر رحالته، إلا لا تقولوا ذلكم ولكن قولوا كما قال رسول الله صلى الله عليه وسلم، من مات في سبيل الله، أو قتل فهو شهيد

"তোমরা তোমাদের যুদ্ধগুলোতে বলে থাক: ‘অমুক শহীদ’, ‘অমুক শহীদ হয়ে মারা গেছে’; অথচ হতে পারে, সে তার বাহন (গণিমতের মাল চুরি করে) ভারী করেছে। সাবধান! তোমরা এমন বলো না। বরং তোমরা বলো, যেমন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন: من مات في سبيل الله، أو قتل فهو شهيد ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে মারা যায় অথবা নিহত হয়, সে শহীদ’।" [আহমাদ, আল-মুসনাদ, খণ্ড নং ১, পৃষ্ঠা নং ২৩, হাদীস নং ১৫৫; সা‘ঈদ ইবনু মানসূর তাঁর সুনানে এটি বর্ণনা করেছেন।]

হাফিয ইবনু হাজার বলেন: এটি হাসান হাদীস, যা ইমাম আহমাদ, সা‘ঈদ ইবনু মানসূর প্রমুখ বর্ণনা করেছেন মুহাম্মাদ ইবনু সীরীন থেকে, তিনি আবূল ‘আজফা থেকে, তিনি ‘উমার (রায্বিয়াল্লাহু ‘আনহু) থেকে। (ইবনু হাজারের কথা সমাপ্ত)।

তাছাড়া, কোনো বিষয়ে সাক্ষ্য দেয়া কেবল ইলম বা জ্ঞানের ভিত্তিতেই হতে পারে। আর মানুষ শহীদ হওয়ার শর্ত হলো: সে যুদ্ধ করবে আল্লাহর কালিমাকে সমুন্নত করার জন্য, যা একটি গোপন নিয়্যাত এবং তা জানার কোনো উপায় নেই। এ কারণেই নবীজি (ﷺ) এ দিকে ইঙ্গিত করে বলেছেন:

مثل المجاهد في سيبل الله، والله أعلم بمن يجاهد في سبيله

"আল্লাহর পথে জিহাদকারীর উদাহরণ, আর আল্লাহই সর্বাধিক অবগত কে তাঁর পথে জিহাদ করে..." [বুখারী, আস-সহীহ, খণ্ড নং ৪, পৃষ্ঠা নং ১৫, হাদীস নং ২৭৮৭; মুসলিম, আস-সহীহ, খণ্ড নং ৩, পৃষ্ঠা নং ১৪৯৬, হাদীস নং ১৮৭৮।]

তিনি আরও বলেছেন:

والذي نفسي بيده لا يكلم أحد في سبيل الله، والله أعلم بمن يكلم في سبيله إلا جاء يوم القيامة وكلمه يثعب دما اللون لون الدم، والريح ريح المسك

"সেই সত্তার কসম, যার হাতে আমার প্রাণ! আল্লাহর পথে আহত কোনো ব্যক্তি নেই, আর আল্লাহই সর্বাধিক অবগত কে তাঁর পথে আহত হয়, যে কিয়ামতের দিন এমন অবস্থায় আসবে না যে, তার ক্ষতস্থান থেকে রক্ত প্রবাহিত হতে থাকবে; যার রং হবে রক্তের রং, এবং সুগন্ধি হবে মিসকের সুগন্ধি।" [বুখারী, আস-সহীহ, খণ্ড নং ৪, পৃষ্ঠা নং ২৫, হাদীস নং ২৮০৩; মুসলিম, আস-সহীহ, খণ্ড নং ৩, পৃষ্ঠা নং ১৪৯৫, হাদীস নং ১৮৭৬।]

এই দু’টি হাদীস ইমাম বুখারী আবূ হুরাইরাহ (রায্বিয়াল্লাহু ‘আনহু) থেকে বর্ণনা করেছেন।

তবে যার বাহ্যিক অবস্থা সৎকর্মশীল, আমরা তার জন্য শাহাদাতের আশা (রাজা’) করি, কিন্তু তার ব্যাপারে নিশ্চিত সাক্ষ্য দেই না এবং আল্লাহর ওপর আগ বাড়িয়ে কোনো হুকুম লাগাই না। আশা করা (রাজা’) হলো দু’টি স্তরের মধ্যবর্তী অবস্থা। তবে আমরা দুনিয়াতে তার সাথে শহীদদের হুকুম অনুযায়ী আচরণ করি। যদি সে আল্লাহর পথে জিহাদে নিহত হয়, তবে তাকে তার রক্তমাখা কাপড়ে জানাযার সালাত ছাড়াই দাফন করা হবে। আর যদি সে অন্য প্রকারের শহীদদের অন্তর্ভুক্ত হয়, তবে তাকে গোসল দেয়া হবে, কাফন পরানো হবে এবং তার ওপর সালাত আদায় করা হবে।

তাছাড়া, আমরা যদি নির্দিষ্ট কারও ব্যাপারে সাক্ষ্য দেই, যে সে শহীদ, তবে এই সাক্ষ্যের আবশ্যকীয় ফলাফল হলো: তার জান্নাতি হওয়ার সাক্ষ্য দেয়া। এটি আহলুস সুন্নাহর মতাদর্শের বিরোধী। কারণ, তারা নির্দিষ্টভাবে কাউকে জান্নাতি হওয়ার সাক্ষ্য দেন না, কেবল তাকে ছাড়া যার ব্যাপারে নবীজি (ﷺ) গুণের মাধ্যমে বা নির্দিষ্ট করে সাক্ষ্য দিয়েছেন।

তবে তাদের মধ্য থেকে কেউ কেউ বলেছেন, যার প্রশংসা ও গুণাবলীর ব্যাপারে উম্মাহ একমত হয়েছে, তার জন্য এই সাক্ষ্য দেয়া জায়েয। শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ এই মতটি গ্রহণ করেছেন।

এর মাধ্যমে স্পষ্ট হলো যে, নস (কুরআন-হাদীসের দলীল) বা ইজমা (ঐকমত্য) ছাড়া নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তিকে শহীদ বলে সাক্ষ্য দেয়া জায়েয নয়। তবে যার বাহ্যিক অবস্থা ভালো, আমরা তার জন্য আশা রাখি, যেমনটি পূর্বে বলা হয়েছে। আর এটিই তার মর্যাদার জন্য যথেষ্ট, এবং তার প্রকৃত অবস্থা তার স্রষ্টা সুবহানাহু ওয়া তা‘আলার নিকট।

[আল-মানাহিল লাফয্বিইয়্যাহ (দারুস সুরাইয়া লিন-নাশরি ওয়াত তাওযী’, প্রথম প্রকাশ ১৪১৫ হিজরী) পৃষ্ঠা নং ৭৮-৮৪, প্রশ্ন নং ৬৪-৬৫।]

অনুবাদক:
ফাহাদ ইবনু ইব্রাহীম ইবনি আহমাদ

30/11/2025

শারহু রিয়ায্বিছ ছ্বলিহীন থেকে আজকের পাঠ : আল্লাহর জন্য কোনো কিছু পরিত্যাগ করে তাতে ফিরে যাওয়ার বিধান | ঈমানের উপর অটলতার মর্যাদা | রোগীদের সেবা করা বা দেখতে যাওয়া — (পর্ব: ১৪)

পূর্ববর্তী আলোচনার ধারাবাহিকতায়:

অতঃপর নবীজি (ﷺ) [১২ নং পর্বে উল্লেখিত হাদীস] বললেন: ((اللهم أمض لأصحابي هجرتهم)) "হে আল্লাহ! আমার সাহাবীদের হিজরত বলবৎ রাখুন।" তিনি আল্লাহর কাছে চাইলেন, যেন তিনি তাঁর সাহাবীদের হিজরত বলবৎ বা পূর্ণ করে দেন। এটি দু’টি বিষয়ের মাধ্যমে হয়:

প্রথম বিষয়: ঈমানের ওপর তাদের অবিচলতা; কারণ মানুষ যখন ঈমানের ওপর অবিচল থাকে, তখন সে হিজরতের ওপরও অবিচল থাকে।

দ্বিতীয় বিষয়: তাদের কেউ যেন আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের উদ্দেশ্যে হিজরত করে বের হওয়ার পর পুনরায় মক্কায় ফিরে না যায়। এটি এজন্য যে, আপনি যখন আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের উদ্দেশ্যে হিজরত করে কোনো শহর থেকে বের হয়েছেন; তখন তা সেই সম্পদের মতো, যা আপনি সদাকাহ করে দিয়েছেন। যে শহরটি আপনি পরিত্যাগ করেছেন, তা সেই সম্পদের মতো হয়ে যায়, যা আপনি সদাকাহ করেছেন; তা আর ফেরত নেওয়া সম্ভব নয়।

তদ্রূপ, মানুষ আল্লাহর জন্য যা কিছু পরিত্যাগ করে, তাতে সে আর ফিরে যায় না। এর অন্তর্ভুক্ত হলো: অনেক মানুষ আল্লাহর দিকে ধাবিত হয়ে তাওবাহস্বরূপ এবং টেলিভিশন ও তাতে বিদ্যমান অশ্লীলতা থেকে বাঁচার জন্য তাদের ঘর থেকে টেলিভিশন বের করে দেওয়ার তাওফীক্ব লাভ করেছেন। এরা প্রশ্ন করেন, ‘আমরা কি তা আবার ঘরে ফিরিয়ে আনতে পারি?’

আমরা বলি: ‘না, আপনারা আল্লাহর জন্য তা বের করে দেওয়ার পর তা আর ফিরিয়ে আনবেন না।’ কারণ মানুষ যখন আল্লাহর জন্য কোনো কিছু পরিত্যাগ করে এবং আল্লাহর জন্য কোনো কিছু বর্জন করে, তখন সে আর তাতে ফিরে যায় না। এজন্যই নবীজি (‘আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালাম) তাঁর রবের কাছে প্রার্থনা করেছিলেন যেন তিনি তাঁর সাহাবীদের হিজরত বলবৎ রাখেন।

তাঁর বাণী: ((ولا تردهم علي أعقابهم)) "এবং তাদেরকে তাদের পশ্চাতে ফিরিয়ে দেবেন না।" অর্থাৎ তাদের ঈমান থেকে বিচ্যুত করবেন না যাতে তারা তাদের পশ্চাতে (কুফরিতে) ফিরে যায়। কারণ কুফরি হলো পশ্চাৎপদতা, আর ঈমান হলো অগ্রগতি। এটি আজ নাস্তিকরা যা বলে, তার সম্পূর্ণ বিপরীত; তারা ইসলামকে ‘গোঁড়ামী’ বা পশ্চাদগামীতা হিসেবে আখ্যায়িত করে এবং বলে (দাবি করে) যে, ‘প্রগতিশীলতা’ হলো: মানুষ ইসলাম থেকে বের হয়ে যাবে এবং ধর্মনিরপেক্ষ (সেকুলার) হবে। অর্থাৎ, সে ঈমান ও কুফরির মধ্যে এবং পাপাচার ও আনুগত্যের মধ্যে কোনো পার্থক্য করবে না। আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই। অথচ প্রকৃতপক্ষে ঈমানই হলো অগ্রগতি।

অগ্রগামীগণ হলেন: মু‘মিনগণ। আর অগ্রগতি অর্জিত হয় ঈমানের মাধ্যমে। আর দীনত্যাগ (মুরতাদ হওয়া) হলো দুই গোড়ালির ওপর ভর করে পেছনে ফিরে যাওয়া। যেমন নবীজি (‘আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালাম) এখানে বলেছেন: ((ولا تردهم علي أعقابهم)) "এবং তাদেরকে তাদের গোড়ালির দিকে (পেছনের দিকে) ফিরিয়ে দেবেন না।"[১]

এই হাদীসটিতে অনেক মহান ফায়দা বা শিক্ষা রয়েছে।

তন্মধ্যে: রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর হিদায়াত বা আদর্শ হলো: রোগীদের সেবা করা বা দেখতে যাওয়া। কারণ তিনি সা‘দ ইবনু আবী ওয়াক্কাস (রায্বিয়াল্লাহু ‘আনহু)-কে দেখতে গিয়েছিলেন। রোগী দেখতে যাওয়ার মধ্যে সেবাকারী ও রোগী উভয়ের জন্যই ফায়দা রয়েছে।

সেবাকারীর (দর্শনার্থীর) ফায়দা: সে তার মুসলিম ভাইয়ের হক আদায় করে। কারণ আপনার মুসলিম ভাইয়ের অন্যতম হক হলো, সে অসুস্থ হলে আপনি তাকে দেখতে যাবেন।

তন্মধ্যে: মানুষ যখন রোগী দেখতে যায়, তখন সে ফিরে আসা পর্যন্ত ‘খুরফাতুল জান্নাহ’ বা জান্নাতের ফল আহরণে লিপ্ত থাকে।

তন্মধ্যে: এতে সেবাকারীর জন্য আল্লাহ তাকে যে সুস্থতার নি‘আমত দিয়েছেন, তার স্মরণ রয়েছে। কারণ যখন সে এই রোগীকে দেখে এবং তার রোগের কষ্ট দেখে, অতঃপর নিজের দিকে তাকায় এবং নিজের সুস্থতা ও নিরাপত্তা দেখতে পায়, তখন সে এই সুস্থতার মাধ্যমে প্রাপ্ত আল্লাহর নি‘আমতের কদর উপলব্ধি করতে পারে। কারণ কোনো বস্তুর মর্ম তার বিপরীত বস্তুর মাধ্যমেই চেনা যায়।

[শাইখুল ইসলাম ‘আল্লামাহ ইমাম মুহাম্মাদ ইবনু ছ্বলিহ আল-উসাইমীন রাহিমাহুল্লাহ, শারহু রিয়ায্বিছ ছ্বলিহীন মিন কালামি সায়্যিদিল মুরসালীন (ﷺ), খণ্ড নং ১, পৃষ্ঠা নং ৪৬-৪৮।]

অনুবাদক:
৩০/১১/২০২৫ ঈসায়ী
ফাহাদ ইবনু ইব্রাহীম ইবনি আহমাদ


[বিঃদ্রঃ আরো ভালো করে জানতে ১২ ও ১৩ নং পর্ব পড়ুন। ইনশা’আল্লাহ কমেন্টে এই দুই পর্ব সহ অন্যান্য সকল পর্বের লিংক উল্লেখ করা হবে।]

টীকা (অনুবাদক কর্তৃক)

[১] হাদীসটির মূল ভাষ্য: ولا تردهم على أعقابهم এর আক্ষরিক অর্থ হলো: “তাদেরকে তাদের গোড়ালির দিকে (পেছনের দিকে) ফিরিয়ে দিও না।” অথবা “তাদেরকে আবার আগের অবস্থায় ফিরিয়ে দিও না।”এখানে أعقاب শব্দটি عَقِب এর বহুবচন, যার অর্থ হলো: গোড়ালি, পেছন দিক, পশ্চাদগামী হওয়া ইত্যাদি। আর আরবিতে এটি একটি রূপক প্রকাশ : পেছনে ফিরে যাওয়া, আগের খারাপ অবস্থায় ফিরে যাওয়া, পশ্চাদমুখী হওয়া। আর এই শব্দটি যে অর্থ দেয়: পিছিয়ে পড়া / অবনতি / পূর্বাবস্থায় ফিরে যাওয়া। আরবিতে “الأعقاب” ব্যবহার হয় রিদ্দাহ (দীনত্যাগ) বোঝাতে; কারণ রিদ্দাহ হলো: ইসলাম ত্যাগ করে পূর্বের অন্ধকার অবস্থায় ফিরে যাওয়া। কুরআনুল কারীমেও একই প্রকাশভঙ্গি আছে:يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِن تُطِيعُوا الَّذِينَ كَفَرُوا يَرُدُّوكُمْ عَلَىٰ أَعْقَابِكُمْ فَتَنقَلِبُوا خَاسِرِينَ “হে মুমিনগণ! যদি তোমরা কাফিরদের আনুগত্য কর, তবে তারা তোমাদেরকে গোড়ালির দিকে ফিরিয়ে দেবে (পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে দেবে), ফলে তোমরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়বে।” তোমরা তোমাদের গোড়ালির দিকে ফিরে যেয়ো না (অর্থাৎ, পূর্বাবস্থায় ফিরে যেও না), তাহলে তোমরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।” [কুর‘আনুল কারীম: সূরাহ্ (৩) আলি-‘ইমরান, আয়াত নং ১৪৯।] এখানেও على أعقابكم হলো: দীনত্যাগ করে পেছনে ফিরে যাওয়া। কেন শাইখ (ইবনু উসাইমীন) রাহিমাহুল্লাহ হাদীসটি দলীল হিসেবে আনলেন?

জবাব: কারণ এই হাদীসের أعقاب শব্দটি রূপক অর্থে ব্যবহৃত হয় রিদ্দাহ (দীনত্যাগ) বোঝাতে। রিদ্দাহ হচ্ছে: সামনে থেকে পিছনে ফিরে যাওয়া। ঈমান হলো: সামনে এগিয়ে যাওয়া, এবং কুফর হলো: পিছনে ফিরে যাওয়া (نُكوص)। এমনকি আরবি ভাষায় একটি পরিভাষা আছে:نكوص على الأعقاب “গোড়ালির ওপর ভর করে পেছনে ফিরে যাওয়া”, যা রিদ্দাহ বোঝায়। নবীজির ﷺ ব্যবহৃত শব্দ: “على أعقابهم” ঠিক এই রূপক অর্থই প্রকাশ করে। সুতরাং, যেহেতু রিদ্দাহ (দীনত্যাগ) হলো: পিছনে ফিরে যাওয়া, এবং এটি “أعقاب” শব্দ দ্বারা বহু জায়গায় বোঝানো হয়েছে। হাদীসেও একই শব্দ ব্যবহার হয়েছে, তাই শাইখ এটিকে দলীল হিসেবে এনেছেন।

#শারহু_রিয়ায্বিছ_ছ্বলিহীন
#শারহু_রিয়ায্বিছ_ছ্বলিহীন_লিইবনি_উসাইমীন_রাহিমাহুল্লাহ
#রিয়াদুস_সালিহীনের_ব্যাখ্যা
#শারহু_রিয়াদিস_সালিহীন
#শারহু_রিয়াযিস_সালিহীন
#রিয়াযুস_সালিহীনের_ব্যাখ্যা
#ইবনু_উসাইমীন

28/11/2025

শারহু রিয়ায্বিছ ছ্বলিহীন থেকে আজকের পাঠ : একটি নববী আদর্শের বর্ণনা | অসিয়্যতের পরিমাণ এক-তৃতীয়াংশের চেয়ে কম হওয়া উত্তম ও অধিক পরিপূর্ণ হওয়া — (পর্ব: ১২)

হাদীস নং ০৬। আবূ ইসহাক্ব সা‘দ ইবনু আবী ওয়াক্কাস ইবনি উহাইব ইবনি ‘আবদি মানাফ ইবনি যুহরাহ ইবনি কিলাব ইবনি মুররাহ ইবনি কা‘ব ইবনি লুওয়াই আল-কুরাশী আয-যুহরী (রায্বিয়াল্লাহু ‘আনহুম) থেকে বর্ণিত, তিনি জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত দশজন সাহাবীর অন্যতম। তিনি বলেন,

جاءني رسول الله صلي الله عليه وسلم عام حجة الوداع من وجع اشتد بين فقلت: يا رسول الله إني قد بلغ بي من الوجع ما تري، وأنا ذو مال ولا يرثني إلا ابنة لي، أفاتصدق بثلثي مالي؟

“বিদায় হজ্জের বছর আমি যখন কঠিন রোগে আক্রান্ত হলাম, তখন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) আমাকে দেখতে আসলেন। আমি বললাম, ‘হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! আমার রোগ যে কি কঠিন আকার ধারণ করেছে, তা তো আপনি দেখছেন। আর আমি একজন বিত্তবান ব্যক্তি, অথচ এক কন্যা ছাড়া আমার আর কোনো ওয়ারিশ নেই। আমি কি আমার সম্পদের দুই-তৃতীয়াংশ সদাকাহ করে দেব?”

তিনি (ﷺ) বললেন, لَا "না।" আমি বললাম,فالشطر يا رسول الله؟ ‘তবে কি অর্ধেক দিয়ে দেব, হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)?’

তিনি (ﷺ) বললেন, لَا "না।" আমি বললাম, فالثلث يا رسول الله؟ ‘তবে কি এক-তৃতীয়াংশ দেব?’

তিনি (ﷺ) বললেন, الثُّلُثُ، وَالثُّلُثُ كَثِيرٌ - أَوْ كَبِيرٌ - إِنَّكَ أَنْ تَذَرَ وَرَثَتَكَ أَغْنِيَاءَ، خَيْرٌ مِنْ أَنْ تَذَرَهُ مْعَالَةً يَتَكَفَّفُونَ النَّاسَ، وَإِنَّكَ لَنْ تُنْفِقَ نَفَقَةً تَبْتَغِي بِهَا وَجْهَ اللَّهِ إِلَّا أُجِرْتَ عَلَيْهَا، حَتَّى مَا تَجْعَلُ فِي فِي امْرَأَتِكَ "এক-তৃতীয়াংশ (দিতে পার), আর এক-তৃতীয়াংশও অনেক - বা বিরাট। তুমি তোমার ওয়ারিশদের মানুষের কাছে হাত পাতা অবস্থায় অভাবী রেখে যাওয়ার চেয়ে ধনী রেখে যাওয়া উত্তম। আর তুমি আল্লাহর সন্তুষ্টির (চেহারার) অন্বেষণে যা-ই ব্যয় করবে, তোমাকে তার বিনিময় প্রদান করা হবে; এমনকি যে লোকমাটি তুমি তোমার স্ত্রীর মুখে তুলে দাও তারও।"

সা‘দ (রায্বিয়াল্লাহু ‘আনহু) বলেন, সুতরাং আমি বললাম, يا رسول الله اخلف بعد أصحابي؟ ‘হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! আমার সঙ্গীরা চলে যাওয়ার পর আমি কি পেছনে পড়ে থাকব (মক্কায় মারা যাব)?’ তিনি বললেন, إِنَّكَ لَنْ تُخَلَّفَ فَتَعْمَلَ عَمَلًا تَبْتَغِي بِهِ وَجْهَ اللَّهِ، إِلَّا ازْدَدْتَ بِهِ دَرَجَةً وَرِفْعَةً، وَلَعَلَّكَ أَنْ تُخَلَّفَ حَتَّى يَنْتَفِعَ بِكَ أَقْوَامٌ، وَيُضَرَّ بِكَ آخَرُونَ. اللَّهُمَّ أَمْضِ لِأَصْحَابِي هِجْرَتَهُمْ، وَلاَ تَرُدَّهُمْ عَلَى أَعْقَابِهِمْ، لَكِنِ البَائِسُ سَعْدُ بْنُ خَوْلَةَ "তুমি পেছনে পড়ে থাকবে না। তুমি আল্লাহর সন্তুষ্টির (চেহারার) অন্বেষণে যে আমলই করবে, তার দ্বারা তোমার মর্যাদা ও সম্মান বৃদ্ধি পাবে। সম্ভবত তুমি পেছনে থেকে যাবে (বেঁচে থাকবে), যার ফলে তোমার দ্বারা বহু সম্প্রদায় উপকৃত হবে এবং অন্যরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। হে আল্লাহ! আমার সাহাবীদের হিজরত বলবৎ রাখুন এবং তাদেরকে তাদের পশ্চাতে (মক্কায়) ফিরিয়ে দেবেন না।" কিন্তু দুঃখী তো সা‘দ ইবনু খাওলা। মক্কায় মৃত্যুবরণ করার কারণে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তার জন্য শোক প্রকাশ করেছিলেন।

[বুখারী, আস-সহীহ, খণ্ড নং ৩, পৃষ্ঠা নং ১৮৬, হাদীস নং ২৭৪২; মুসলিম, আস-সহীহ, খণ্ড নং ৩, পৃষ্ঠা নং ১২৫০, হাদীস নং ১৬২৮।]

[ব্যাখ্যা]

গ্রন্থকার (ইমাম নাওয়াওয়ী) রাহিমাহুল্লাহ সা‘দ ইবনু আবী ওয়াক্কাস (রায্বিয়াল্লাহু ‘আনহু) থেকে যা উদ্ধৃত করেছেন, তাতে তিনি উল্লেখ করেছেন যে, নবীজি (ﷺ) তাঁর অসুস্থতায় তাঁকে দেখতে এসেছিলেন। এই ঘটনাটি ঘটেছিল মক্কায়। সা‘দ ইবনু আবী ওয়াক্কাস (রায্বিয়াল্লাহু ‘আনহু) সেই মুহাজিরদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন, যারা মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত করেছিলেন এবং আল্লাহ ‘আয্যা ওয়া জাল্লার জন্য নিজেদের দেশ ত্যাগ করেছিলেন। নবীজির (ﷺ) অভ্যাস ছিল যে, তিনি তাঁর অসুস্থ সাহাবীদের দেখতে যেতেন, যেমনটি তিনি তাদের সাথে সাক্ষাৎ করতেন। কারণ নবীজি (ﷺ) ছিলেন মানুষের মধ্যে সর্বোত্তম চরিত্রের অধিকারী। তিনি অনুসৃত ইমাম (নেতা) হওয়া সত্ত্বেও, তাঁর ওপর আল্লাহর সালাত ও সালাম বর্ষিত হোক, তিনি ছিলেন মানুষের মধ্যে সর্বোত্তম চরিত্রের অধিকারী, সাহাবীগণের প্রতি সবচেয়ে কোমল এবং তাঁদের প্রতি সর্বাধিক ভালোবাসা পরায়ণ।

তিনি তাঁকে দেখতে আসলেন। তখন সা‘দ (রায্বিয়াল্লাহু ‘আনহু) বললেন: ‘হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! ((إني قد بلغ بي من الوجع ما تري)) আমার রোগ যে কি কঠিন আকার ধারণ করেছে, তা তো আপনি দেখছেন।’ অর্থাৎ তিনি কঠিন ও তীব্র ব্যথায় আক্রান্ত হয়েছিলেন। ((وأنا ذو مال كثير أوكبير)) ‘আর আমি একজন বিত্তবান ব্যক্তি’ অর্থাৎ তাঁর কাছে প্রচুর সম্পদ ছিল। ((ولا يرثني إلا ابنة لي)) ‘এক কন্যা ছাড়া আমার আর কোনো ওয়ারিশ নেই’ অর্থাৎ ফারায়েযের হিসেব অনুযায়ী এই কন্যা ব্যতীত তাঁর আর কোনো ওয়ারিশ নেই। ((أفأتصدق بثلثي مالي)) ‘আমি কি আমার সম্পদের দুই-তৃতীয়াংশ সদাকাহ করে দেব?’ অর্থাৎ তিন ভাগের দুই ভাগ। তিনি (নবীজি ﷺ) বললেন: ‘না।’ আমি বললাম: ‘তবে কি অর্ধেক, হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)?’ তিনি বললেন: ‘না।’ আমি বললাম: ‘তবে কি এক-তৃতীয়াংশ?’ তিনি বললেন: ((الثلث والثلث كثير)) ‘এক-তৃতীয়াংশ (দিতে পার), আর এক-তৃতীয়াংশও অনেক।’

তো সা‘দ (রায্বিয়াল্লাহু ‘আনহু)-এর কথা: ((أفأتصدق)) ‘আমি কি সদাকাহ করব?’ অর্থাৎ আমি কি তা দান করে দেব? নবীজি (ﷺ) তাঁকে তা থেকে বারণ করলেন। কারণ, সা‘দ সেই সময় এমন অসুস্থ ছিলেন যে, তাঁর মৃত্যুর আশঙ্কা ছিল। তাই রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাঁকে এক-তৃতীয়াংশের বেশি সদাকাহ করতে নিষেধ করলেন। কারণ ‘মারাযুল মাউত’ বা মৃত্যুশঙ্কাপূর্ণ রোগে আক্রান্ত রোগীর জন্য এক-তৃতীয়াংশের বেশি সদাকাহ করা জায়েয নয়। কারণ তার সম্পদের সাথে অন্যের অধিকার যুক্ত হয়ে গেছে, আর তারা হলো ওয়ারিশগণ। পক্ষান্তরে, যে ব্যক্তি সুস্থ, যার কোনো রোগ নেই অথবা এমন হালকা রোগ আছে যাতে মৃত্যুর আশঙ্কা নেই, সে যা ইচ্ছা সদাকাহ করতে পারে; এক-তৃতীয়াংশ, অর্ধেক, দুই-তৃতীয়াংশ অথবা তার পুরো সম্পদ, এতে তার কোনো সমস্যা নেই। তবে কারোরই উচিত নয় তার সম্পূর্ণ সম্পদ সদাকাহ করে দেওয়া, যদি না তার কাছে এমন কিছু থাকে, যা দিয়ে সে আল্লাহর বান্দাদের থেকে অমুখাপেক্ষী হতে পারে বলে নিশ্চিত জানে।

গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) তাঁকে এক-তৃতীয়াংশের বেশি সদাকাহ করতে নিষেধ করেছেন। এবং তিনি বলেছেন: ((الثلث والثلث كثير - أو كبير)) "এক-তৃতীয়াংশ, আর এক-তৃতীয়াংশও অনেক বা বিশাল।"

এতে দলীল রয়েছে যে, যদি অসিয়্যতের পরিমাণ এক-তৃতীয়াংশের চেয়ে কম হয়, তবে তা উত্তম ও অধিক পরিপূর্ণ। এজন্যই ইবনু ‘আব্বাস (রায্বিয়াল্লাহু ‘আনহুমা) বলেছেন: لو أن الناس غضوا من الثلث إلي الربع "মানুষ যদি এক-তৃতীয়াংশ কমিয়ে এক-চতুর্থাংশ করত (তবে ভালো হতো)।" [বুখারী, আস-সহীহ, খণ্ড নং ৪, পৃষ্ঠা নং ৩, হাদীস নং ২৭৪৪।] কারণ নবীজি (ﷺ) বলেছেন: الثلث والثلث كبير "এক-তৃতীয়াংশও অনেক বড়।"

আর আবূ বকর (রায্বিয়াল্লাহু ‘আনহু) বলেছেন: "আমি তা-ই পছন্দ করি, যা আল্লাহ নিজের জন্য পছন্দ করেছেন।" অর্থাৎ এক-পঞ্চমাংশ (গনীমতের মালের ক্ষেত্রে যেমন আল্লাহ এক-পঞ্চমাংশ নির্ধারণ করেছেন)। তাই তিনি (রায্বিয়াল্লাহু ‘আনহু) এক-পঞ্চমাংশের অসিয়্যত করেছিলেন।

এর মাধ্যমে আমরা জানতে পারি যে, বর্তমানে মানুষের যে আমল: তারা এক-তৃতীয়াংশ অসিয়্যত করে, তা উত্তম পন্থার বিপরীত; যদিও তা জায়েয। তবে উত্তম হলো এক-তৃতীয়াংশের চেয়ে কম করা; যেমন এক-চতুর্থাংশ বা এক-পঞ্চমাংশ। আমাদের ফকীহগণ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন: উত্তম হলো এক-পঞ্চমাংশের অসিয়্যত করা, এর বেশি না করা; আবূ বকর সিদ্দীক্ব (রায্বিয়াল্লাহু ‘আনহু)-এর অনুসরণে।

[শাইখুল ইসলাম ‘আল্লামাহ ইমাম মুহাম্মাদ ইবনু ছ্বলিহ আল-উসাইমীন রাহিমাহুল্লাহ, শারহু রিয়ায্বিছ ছ্বলিহীন মিন কালামি সায়্যিদিল মুরসালীন (ﷺ), খণ্ড নং ১, পৃষ্ঠা নং ৪১-৪৪।]

অনুবাদক:
২৮/১১/২০২৫ ঈসায়ী
ফাহাদ ইবনু ইব্রাহীম ইবনি আহমাদ


#শারহু_রিয়ায্বিছ_ছ্বলিহীন
#শারহু_রিয়ায্বিছ_ছ্বলিহীন_লিইবনি_উসাইমীন_রাহিমাহুল্লাহ
#রিয়াদুস_সালিহীনের_ব্যাখ্যা
#শারহু_রিয়াদিস_সালিহীন
#শারহু_রিয়াযিস_সালিহীন
#রিয়াযুস_সালিহীনের_ব্যাখ্যা
#ইবনু_উসাইমীন

17/11/2025

রিয়াদুস সালিহীনের উপর শাইখ ইবনু উসাইমীনের ব্যাখ্যা থেকে নিয়মিত ফাওয়ায়িদের (শিক্ষা/উপকারী বক্তব্য) জন্য এই গ্রন্থের উপর আলাদা গ্রুপ খোলা হয়েছে। আপনি চাইলে এড হতে পারেন।👇

সম্মানিত ভাই! একজন মা এক ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় তার পিঠের বা মেরুদণ্ডের আঘাত এতটাই গুরুতর যে, হাসপাতালের বড় ডাক্তারগণ জ...
29/10/2025

সম্মানিত ভাই! একজন মা এক ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় তার পিঠের বা মেরুদণ্ডের আঘাত এতটাই গুরুতর যে, হাসপাতালের বড় ডাক্তারগণ জানিয়ে দিয়েছেন, এক্ষুণি জটিল অপারেশনে না গেলে তাঁর জীবন বিপন্ন। কিন্তু এই জীবন বাঁচানোর অপারেশনের জন্য ডাক্তারগণ এক অকল্পনীয় শর্ত দিয়েছেন: প্রথমে গর্ভের সেই পাঁচ মাসের জীবন্ত ভ্রূণটিকে অবশ্যই অপসারণ (Abortion) করতে হবে। এবং যদি তা না করা হয়, তবে মায়ের পক্ষাঘাত অথবা মৃত্যুর ঝুঁকি থেকে যাবে। কিন্তু সেই মা কিছুতেই এতে রাজী নন।

এই মর্মান্তিক পরিস্থিতিতে আমরা দিশেহারা। একদিকে একজন মায়ের পক্ষাঘাত অথবা মৃত্যুর ভয়াল ঝুঁকি, অন্যদিকে এক নিষ্পাপ প্রাণের নিশ্চিত মৃত্যু। যখন চিকিৎসা বিজ্ঞান একটি জীবন বাঁচাতে গিয়ে অন্য একটি জীবনকে বিসর্জন দিতে বলছে, আমরা কার জীবনকে প্রাধান্য দেব? এই কঠিনতম অবস্থায় আমাদের করণীয় কী?

জবাব: আপনার প্রশ্নটি এমন এক গভীর সংকটের প্রতিচ্ছবি, যা চিকিৎসা বিজ্ঞান এবং ঈমানের মধ্যে এক সূক্ষ্ম অথচ অনিবার্য পরীক্ষার মুহূর্ত নিয়ে আসে। এটি একবিংশ শতাব্দীর বাস্তবতা, যেখানে আমরা প্রায়শই জীবনের কঠিনতম মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকি, একদিকে মানবিক প্রজ্ঞা ও প্রযুক্তির আশ্বাস, অন্যদিকে আল্লাহু আয্যা ওয়া জাল্লার অটল বিধান।

যখন একজন গর্ভবতী মা, যিনি জীবনের সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক অধ্যায়ে—মাতৃত্বের পঞ্চম মাসে—বিচরণ করছেন, তখন তার পিঠে এমন এক মারাত্মক আঘাত আসে, যা তার জীবনকে পক্ষাঘাত বা মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যায়, তখন আমাদের হৃদয় স্বভাবতই বিগলিত হয়। ডাক্তারগণ যখন তাদের অভিজ্ঞতার আলোকে বলেন যে, এই মাকে বাঁচাতে হলে তার গর্ভের সন্তানকে—পাঁচ মাস বয়সী এক জীবন্ত আত্মাকে—বের করে আনতে হবে, তখন এক বিভীষিকাময় সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হতে হয়। মা অস্বীকৃতি জানিয়েছেন, আর এই অস্বীকৃতিই ঈমানের প্রথম স্ফুরণ।

এখন প্রশ্ন হলো, শারী‘আত এই যুগল সংকটে কোন পথ দেখায়?

এর জবাবটি হৃদয়ের গভীরে অনুভব করতে হবে। পাঁচ মাস বয়সী ভ্রূণ নিছক একটি কোষপিণ্ড নয়; এটি এমন এক সত্তা, যার মধ্যে রূহ ফুঁকে দেওয়া হয়েছে। সে এখন একটি পূর্ণাঙ্গ ‘নাফস’ বা প্রাণ, একজন মু’মিন আত্মা। এই অবস্থায়, মায়ের জীবনের সম্ভাব্য ঝুঁকির অজুহাতে তাকে বের করে আনা—যখন আমরা নিশ্চিত জানি যে এই নিষ্কাশন তার মৃত্যুকে অনিবার্য করে তুলবে—এটি জায়েয নয়।

কেননা, এটি একটি ‘সম্ভাব্য’ ক্ষতি থেকে বাঁচতে গিয়ে একটি ‘নিশ্চিত’ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করার নামান্তর।

আমরা একটি জীবন বাঁচানোর আশায় আরেকটি জীবন্ত প্রাণকে ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যা করতে পারি না। এটি সেই নিষিদ্ধ কাজের অন্তর্ভুক্ত, যার ভয়াবহতা সম্পর্কে আল্লাহু জাল্লা ওয়া‘আলা আমাদের সতর্ক করেছেন। তিনি বলেন,وَمَن يَقْتُلْ مُؤْمِنًا مُّتَعَمِّدًا فَجَزَاؤُهُ جَهَنَّمُ خَالِدًا فِيهَا وَغَضِبَ اللَّهُ عَلَيْهِ وَلَعَنَهُ وَأَعَدَّ لَهُ عَذَابًا عَظِيمًا "আর যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো মু’মিনকে হত্যা করবে, তার প্রতিদান হলো— জাহান্নাম, সেখানে সে স্থায়ী হবে। আর আল্লাহ তার উপর ক্রুদ্ধ হয়েছেন, তাকে লা‘নাত করেছেন এবং তার জন্য প্রস্তুত রেখেছেন মহা শাস্তি।" [কুর‘আনুল কারীমঃ সূরাহ্ (৪) আন-নিসা’, আয়াত নং ৯৩।]

এই আয়াতে ‘ইচ্ছাকৃত’ শব্দটি অত্যন্ত প্রণিধানযোগ্য। ভ্রূণটিকে অপসারণ করা একটি সুস্পষ্ট ইচ্ছাকৃত কাজ, যার পরিণতি—মৃত্যু—আমাদের কাছে নিশ্চিত।

অন্যদিকে, মায়ের আরোগ্য লাভের বিষয়টি দেখুন। ডাক্তারগণ যদি ভ্রূণ অপসারণ করেন, তবেই কি মায়ের বেঁচে যাওয়া বা পক্ষাঘাত থেকে মুক্তি পাওয়া নিশ্চিত? চিকিৎসাবিজ্ঞানে এমন নিশ্চয়তা কোথায়? বরং এমনও তো হতে পারে, এই জটিল অপারেশনটিই তার মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ালো। তখন আমরা এমন এক অপরাধে অপরাধী হবো, যেখানে আমরা একটি নিশ্চিত নিষিদ্ধ কাজ (হত্যা) করলাম, অথচ যে কল্যাণের আশায় (মায়ের জীবন) তা করা হলো, সেই কল্যাণটিও অর্জিত হলো না।

এর বিপরীতে, যদি আমরা আল্লাহু তা‘আলার ওপর ভরসা করে ভ্রূণটিকে তার মাতৃগর্ভের নিরাপদ আশ্রয়ে রেখে দিই, অতঃপর মায়ের মৃত্যু বা পক্ষাঘাত—যাই ঘটুক না কেন—তার জন্য আমরা দায়ী হবো না। সেটি আমাদের কৃতকর্মের ফল নয়, বরং তা আল্লাহু আয্যা ওয়া জাল্লার অমোঘ নির্ধারণ। আমরা তো কেবল তাঁর বিধান মানতে আদিষ্ট। আল্লাহু তা‘আলা যা চান, তা-ই নির্ধারণ করেন।

আমাদের এই যান্ত্রিক সভ্যতার একটি বড় দুর্বলতা হলো, আমরা নিজেদের জ্ঞান ও প্রযুক্তিকে বড্ড বেশি বিশ্বাস করি এবং প্রায়শই আল্লাহু তা‘আলার চূড়ান্ত ফয়সালার কথা ভুলে যাই। চিকিৎসাবিজ্ঞান অনেক দূর এগিয়েছে, কিন্তু তা আজও চূড়ান্ত সত্যের সন্ধান পায়নি। কতবার এমন হয়েছে যে, ডাক্তারগণ কোনো ভ্রূণকে ‘বিকৃত’ বলে রায় দিয়েছেন, কিন্তু জন্মের পর সেই সন্তানটিই তার ভাই-বোনদের মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর ও সুস্থ হয়ে প্রকাশিত হয়েছে! এই ঘটনাগুলো প্রমাণ করে, তাদের জ্ঞান ও যন্ত্রপাতির হিসাব-নিকাশেও ভুল হতে পারে।

এমনকি যদি আমরা শতভাগ নিশ্চিতও হয়ে যাই যে, ভ্রূণটি পেটে থাকলে মা এবং সন্তান উভয়েই ধ্বংস বা মৃত্যুবরণ করবে, তবুও আমাদের জন্য সেই ভ্রূণটিকে নিজ হাতে হত্যা করার অনুমতি নেই। যদি উভয়েই মারা যায়, তবে তা আমাদের কর্মের দ্বারা নয়, বরং আল্লাহু তা‘আলার হুকুমে। আল্লাহু জাল্লা ওয়া‘আলা মানুষের হাতের অর্জিত কর্ম এবং তাঁর নিজ পক্ষ থেকে আসা ফয়সালার মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য করেছেন। যেমন তিনি বলেছেন,قُلْ هَلْ تَرَبَّصُونَ بِنَا إِلَّا إِحْدَى الْحُسْنَيَيْنِ وَنَحْنُ نَتَرَبَّصُ بِكُمْ أَن يُصِيبَكُمُ اللَّهُ بِعَذَابٍ مِّنْ عِندِهِ أَوْ بِأَيْدِينَا "আপনি বলুন, তোমরা কি আমাদের জন্য দুটি কল্যাণের একটি ব্যতীত অন্য কিছুর অপেক্ষা করছো? আর আমরা তোমাদের জন্য অপেক্ষা করছি যে, আল্লাহ তোমাদেরকে তাঁর পক্ষ থেকে শাস্তি দেবেন অথবা আমাদের হাত দ্বারা (শাস্তি দেবেন)।" [কুর‘আনুল কারীমঃ সূরাহ্ (৯) আত-তাওবাহ, আয়াত নং ৫২।]

লক্ষ্য করুন, ‘তাঁর পক্ষ থেকে’ এবং ‘আমাদের হাত দ্বারা’—এই দুটি বিষয় সম্পূর্ণ আলাদা। ভ্রূণটিকে রেখে দিলে যদি মায়ের মৃত্যুও ঘটে, তবে তা ‘আল্লাহর পক্ষ থেকে’। আর যদি আমরা তাকে বের করে হত্যা করি, তবে তা ‘আমাদের হাত দ্বারা’ সংঘটিত অপরাধ।

এটি সেই সূক্ষ্ম বিশ্বাসের জায়গা, যেখানে তথাকথিত যুক্তিবাদীরা কুর‘আন ও সুন্নাহর বাণীর ওপর নিজেদের সীমিত জ্ঞান-বুদ্ধিকে প্রাধান্য দেয়। তারা বলে, ‘মা মারা গেলে তো সন্তানও মারা যাবে!’ আমরা বলবো, ‘তা-ই হোক।’ যদি আল্লাহু আয্যা ওয়া জাল্লার নির্ধারণে উভয়েই মারা যায়, তবে তা তাঁরই ফয়সালা। কারণ, আল্লাহু তা‘আলা বলেন,لِكُلِّ أَجَلٍ كِتَابٌ "প্রত্যেক মেয়াদের জন্য (লিখিত) নির্ধারণ রয়েছে।" [কুর‘আনুল কারীমঃ সূরাহ্ (১৩) আর-রা‘দ, আয়াত নং ৩৮।]

তবে হ্যাঁ, আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান যদি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, মায়ের মৃত্যুর মুহূর্তে দ্রুততম সময়ে সন্তানকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়, তবে সেটি ভিন্ন বিষয় এবং তা অবশ্যই করণীয়।

সুতরাং, হে ভাই, মূল কথা হলো—দৃঢ়তার সাথে কিতাব ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরুন। কে কী বললো, সেদিকে পরোয়া করার প্রয়োজন নেই। এই দুনিয়া চিরস্থায়ী আবাস নয়। আজ যে মৃত্যুবরণ করলো না, সে আগামীকাল করবে। আমাদের একমাত্র লক্ষ্য হওয়া উচিত—আল্লাহু তা‘আলার সামনে এমনভাবে উপস্থিত হওয়া, যেন আমাদের হাত কোনো নিরপরাধ প্রাণের রক্তে রঞ্জিত না থাকে।

—————————————————
উত্তর প্রদানে:
আল্লাহু জাল্লা ওয়া‘আলার মুখাপেক্ষী
— অতি নগণ্য একজন বান্দা
ফাহাদ ইবনু ইব্রাহীম ইবনি আহমাদ

18/08/2025

একজন ঈমানদারের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, তার জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে—সুখে-দুঃখে, জ্ঞানে-কর্মে, প্রকাশ্যে-গোপনে—আল্লাহর সাথে তার সম্পর্ককে নিরন্তর বা অবিচ্ছিন্ন রাখার সাধনা করে যায়, মৃত্যু পর্যন্ত।

১. আল্লাহর নিরন্তর স্মরণ (যিকির)
ইসলামে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ "নিরন্তর" কাজটি হলো আল্লাহর যিকির বা স্মরণ। যিকির কেবল তাসবীহ গণনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি একটি মানসিক ও আত্মিক অবস্থা, যা একজন মু‘মিনকে সর্বাবস্থায় আল্লাহর সাথে সংযুক্ত রাখে। কুরআনুল কারীমে আল্লাহ্ তা‘আলা জ্ঞানীদের প্রশংসায় বলেন:

الَّذِينَ يَذْكُرُونَ اللَّهَ قِيَامًا وَقُعُودًا وَعَلَىٰ جُنُوبِهِمْ وَيَتَفَكَّرُونَ فِي خَلْقِ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ

“যারা দাঁড়িয়ে, বসে এবং শুয়ে আল্লাহর স্মরণ করে এবং আসমানসমূহ ও যমিনের সৃষ্টি সম্পর্কে চিন্তা করে।” [কুর‘আনুল কারীমঃ সূরাহ্ (৩) আলে ইমরান, আয়াত নং ১৯১।]

এই আয়াতটি প্রমাণ করে যে, আল্লাহর স্মরণ কোনো নির্দিষ্ট সময় বা অবস্থার সাথে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি একটি নিরন্তর প্রক্রিয়া, যা মু‘মিনের জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে চলমান থাকে।

২. নিরন্তর ইবাদত ও আনুগত্য
একজন মুসলিমের জীবনের মূল উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর ইবাদত করা। এই ইবাদত মৃত্যু পর্যন্ত চলমান থাকবে। আল্লাহ্ তা‘আলা তাঁর নবী (ﷺ)-কে নির্দেশ দিয়ে বলেন:

وَاعْبُدْ رَبَّكَ حَتَّىٰ يَأْتِيَكَ الْيَقِينُ

“এবং আপনার রবের ইবাদত করুন, যতক্ষণ না আপনার কাছে ইয়াক্বীন (অর্থাৎ মৃত্যু) আসে।” [কুর‘আনুল কারীমঃ সূরাহ্ (১৫) আল-হিজর, আয়াত নং ৯৯।]

এর অর্থ হলো, ইবাদতের এই সফর জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত নিরন্তর চলতে থাকবে। শুধু সালাত, সিয়াম নয়, বরং একজন মুসলিমের প্রতিটি হালাল কাজ—তার ব্যবসা, চাকরি, পারিবারিক জীবন—সবকিছুই ইবাদতে পরিণত হতে পারে, যদি তা আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে করা হয়। ফলে তার পুরো জীবনটাই এক নিরন্তর ইবাদতে রূপান্তরিত হয়।

৩. নিরন্তর জ্ঞানার্জন
জ্ঞানার্জন মুসলিমের উপর ফরয এবং এটিও একটি নিরন্তর প্রক্রিয়া। ‘ইলম হাসিলের কোনো নির্দিষ্ট বয়স বা সময়সীমা নেই। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন:

مَنْ سَلَكَ طَرِيقًا يَلْتَمِسُ فِيهِ عِلْمًا، سَهَّلَ اللهُ لَهُ بِهِ طَرِيقًا إِلَى الْجَنَّةِ

“যে ব্যক্তি জ্ঞানার্জনের জন্য কোনো পথ অবলম্বন করে, আল্লাহ তার বিনিময়ে তার জন্য জান্নাতের পথ সহজ করে দেন।” [মুসলিম, আস-সহীহ, হাদীস নং ২৬৯৯।]

প্রখ্যাত ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বল রাহিমাহুল্লাহকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, "কতদিন পর্যন্ত জ্ঞানার্জন করতে হবে?" তিনি উত্তরে বলেছিলেন:

مَعَ الْمَحْبَرَةِ إِلَى الْمَقْبَرَةِ

“কালির দোয়াতের সাথে, কবর পর্যন্ত।” [ইবনুল জাওযী, আল-মানাক্বিব পৃ. ৫৫।]

অর্থাৎ, জ্ঞানার্জনের এই যাত্রা হবে দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত নিরন্তর।

৪. নিরন্তর তাওবা ও ইস্তিগফার
মানুষ হিসেবে আমরা প্রতিনিয়ত ভুল করি। তাই আল্লাহর ক্ষমা প্রার্থনা বা ইস্তিগফারও হতে হবে একটি নিরন্তর অভ্যাস। রাসূলুল্লাহ (ﷺ), যিনি ছিলেন সকল গুনাহ থেকে মুক্ত, তিনিও প্রতিদিন ৭০ বারের বেশি বা ১০০ বার আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতেন।

আবূ হুরাইরাহ (রায্বিয়াল্লাহু ‘আনহু) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে বলতে শুনেছি:

وَاللَّهِ إِنِّي لَأَسْتَغْفِرُ اللَّهَ وَأَتُوبُ إِلَيْهِ فِي الْيَوْمِ أَكْثَرَ مِنْ سَبْعِينَ مَرَّةً

“আল্লাহর কসম! আমি প্রতিদিন সত্তর বারেরও অধিক আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করি এবং তাওবা করি।” [বুখারী, আস-সহীহ, হাদীস নং ৬৩০৭।]

এটি আমাদের শিক্ষা দেয় যে, তাওবা কেবল বড় কোনো গুনাহের পর নয়, বরং এটি মু‘মিনের জীবনের একটি নিরন্তর অংশ।

৫. নিরন্তর ধৈর্য (সবর) ও কৃতজ্ঞতা (শুকর)
মু‘মিনের জীবন দুটি অবস্থার মধ্যে আবর্তিত হয়: সুখ ও দুঃখ। এই উভয় অবস্থায় তার দুটি কাজ নিরন্তর করতে হয়। বিপদে পড়লে সে নিরন্তর ধৈর্য ধারণ করে, আর নে‘আমত পেলে সে নিরন্তর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন:

عَجَبًا لِأَمْرِ الْمُؤْمِنِ، إِنَّ أَمْرَهُ كُلَّهُ خَيْرٌ... إِنْ أَصَابَتْهُ سَرَّاءُ شَكَرَ، فَكَانَ خَيْرًا لَهُ، وَإِنْ أَصَابَتْهُ ضَرَّاءُ صَبَرَ، فَكَانَ خَيْرًا لَهُ

“মু’মিনের অবস্থা কতই না আশ্চর্যজনক! তার সকল অবস্থাই তার জন্য কল্যাণকর... যদি সে সুখ লাভ করে, তবে শুকরিয়া আদায় করে, ফলে তা তার জন্য কল্যাণকর হয়। আর যদি সে কষ্টে পতিত হয়, তবে ধৈর্য ধারণ করে, ফলে সেটাও তার জন্য কল্যাণকর হয়।” [মুসলিম, আস-সহীহ, হাদীস নং ২৯৯৯।]

~ ফাহাদ ইবনু ইব্রাহীম ইবনি আহমাদ

Address

Unaizah
56215

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when Ibn Uthaimeen Rahimahullah posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Shortcuts

Share