11/09/2026
ইয়েমেনের বিদ্রোহী হুতি শিয়াদের আসল চেহারা
ভূমিকা:
‘হুতি’ নামটি বর্তমানে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বহুল আলোচিত ও পরিচিত। ইয়েমেনের প্রেক্ষাপটে শুরু হওয়া এই সংকটে বহু বছর আগে সৌদি আরবের নেতৃত্বে ‘আসফাতুল হাজম’ (ঝড়ো হাওয়া) নামে সামরিক অভিযান পরিচালিত হয়েছিল। বর্তমানে ইয়েমেন ছাড়িয়ে পুরো লোহিত সাগর ও মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে হুতিদের তৎপরতা একটি বড় ধরনের অস্থিতিশীলতা ও আশঙ্কার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, বাংলাভাষী অনেক মুসলিমই হুতিদের প্রকৃত পরিচয় ও তাদের মতাদর্শ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা রাখেন না। এর ফলে বিভিন্ন শিয়া-প্রভাবিত ও ইসলামবিদ্বেষী গণমাধ্যমের সুক্ষ্ম প্রচারণায় অনেকে বিভ্রান্তির শিকার হন।
মুসলিম বিশ্বের ওপর এই ধারা ও ঘটনাপ্রবাহের সুদূরপ্রসারী প্রভাব অত্যন্ত গভীর। তাই এই বিভ্রান্তি দূর করা এবং মুসলিম তরুণদের মাঝে সঠিক আকিদা ও সচেতনতা জাগ্রত করা সময়ের এক চূড়ান্ত দাবি।
এই প্রেক্ষাপটে সৌদি আরবের ধর্ম মন্ত্রণালয় থেকে প্রকাশিত এবং কিং সউদ বিশ্ববিদ্যালয়ের 'আকিদা ও সমকালীন মতবাদ' বিভাগের অধ্যাপক ড. সুলাইমান বিন সালিহ আল-গুসন রচিত এই পুস্তিকাটি অনুবাদ করা হলো, যাতে বাংলাভাষী পাঠকরা এই ফিতনা সম্পর্কে সচেতন হতে পারেন।
এই পুস্তিকায় শিয়া হুতি সম্প্রদায়ের উৎস, পরিচিতি, ক্রমবিকাশ, বর্তমান কার্যক্রম, লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ও সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করা হয়েছে। একইসাথে, তাদের পেছনের মূল মতাদর্শিক ভিত্তি হিসেবে রাফেজি-ইমামিয়া-ইসনা আশারিয়া সম্প্রদায়ের মৌলিক আকিদা-বিশ্বাস সম্পর্কেও স্পষ্ট আলোকপাত করা হয়েছে।
অনুবাদক:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি
তারিখ: ১১-৯-২০২৬ খৃষ্টাব্দ
________________________________________
❑ হুতিদের উৎস ও পরিচয়:
হুতিরা উত্তর ইয়েমেনের সা'দাহ[1] অঞ্চলের একটি সম্প্রদায়ের নাম। এদের উৎপত্তি জারুদিয়া সম্প্রদায় থেকে। জারুদিয়ারা শিয়া-জায়দিয়াদের একটি গোঁড়া ও উগ্রপন্থী ফিরকা।
হুতিরা রাজেফি-ইসনা আশারিয়া সম্প্রদায়ের মতো উগ্রপন্থী আকিদা-বিশ্বাস প্রচার শুরু করে এবং ইরানের সহায়তা ও আশীর্বাদপুষ্ট হয়ে শিয়া বিপ্লবের নায়ক খোমেনির আদর্শ ও পদ্ধতির আলোকে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করতে থাকে।
হুতি সম্প্রদায়ের পরিচয়ের আগে জারুদিয়াদের সম্পর্কে আলোকপাত করা প্রয়োজন, যাতে স্পষ্ট হয় জারুদিয়াভুক্ত এই হুতি এবং রাজেফি ইসনা আশারিয়াদের মধ্যে কতটা গভীর সম্পর্ক রয়েছে এবং কীভাবে তারা ইমামিয়া-ইসনা আশারিয়াদের পৃষ্ঠপোষকতায় বর্তমান পর্যায়ে উপনীত হয়েছে।
◆ জারুদিয়া সম্প্রদায়ের পরিচয়:
প্রতিষ্ঠাতা: জারুদিয়া সম্প্রদায়ের নামকরণ হয়েছে আবুল জারুদ নামক এক ব্যক্তির নামানুসারে। তার পুরো নাম জিয়াদ বিন মুনজির আল-হামাদানি আল-কুফি।
আহলে সুন্নাহর পূর্বসূরি ইমামগণ এই ব্যক্তিকে মিথ্যাবাদী হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।[2] শুধু তা-ই নয়, শিয়াদের কিছু গ্রন্থেও তার সমালোচনা করা হয়েছে।[3]
◆ জারুদিয়াদের কিছু মৌলিক আকিদা:
১) তারা বিশ্বাস করে, নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর পরে খলিফা হিসেবে আলি (রা.)-কে নির্দিষ্ট করে দিয়েছিলেন। তিনি আলি (রা.)-এর নাম উচ্চারণ না করলেও বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করার মাধ্যমে তাঁকেই বুঝিয়েছিলেন।
২) তাদের মতে, আলি (রা.)-এর মর্যাদা অন্য সব সাহাবির চেয়ে বেশি।
৩) আলি (রা.)-এর পরে ইমাম হবেন কেবল হাসান-হুসাইন এবং তাঁদের বংশধরদের মধ্য থেকে।
৪) তারা সাহাবিদের কাফের মনে করে। কারণ সাহাবিগণ রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর পরে আবু বকর (রা.)-কে খলিফা মনোনীত করেছিলেন। তাদের দাবি, সাহাবিরা রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর বলে যাওয়া গুণ-বৈশিষ্ট্য বুঝতে ব্যর্থ হয়েছিলেন এবং সে কারণে আলি (রা.)-কে খলিফা নিয়োগ করেননি।[4]
৫) রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর পরে যারা আলি ও তাঁর বংশধর থেকে ইমাম হওয়াকে আবশ্যক মনে করে না তারা কাফের।
৬) আবু বকর (রা.) ও উমর (রা.)-এর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করা এবং তাঁদের সমালোচনা-কটূক্তি করা। একইভাবে আয়েশা (রা.), মুয়াবিয়া (রা.) এবং আমর ইবনুল আস (রা.)সম্পর্কেও কটূক্তি করা।
৭) জারুদিয়া সম্প্রদায়ের কিছু মানুষ মনে করে, তাদের মৃত ইমামরা পুনরায় ফিরে আসবেন।
৮) তাদের অনেকে মুতা বিবাহ (চুক্তিভিত্তিক সাময়িক বিয়ে)-কে বৈধ মনে করে।[5]
জারুদিয়াদের এই আকিদাগুলো দেখলে বোঝা যায়, তারা রাজেফি-জাফরিয়া-ইমামিয়া-ইসনা আশারিয়া সম্প্রদায়ের অনেক কাছাকাছি অবস্থান করে।
❑ হুতিদের ইতিহাস ও প্রেরণার উৎস:
হুতিদের চরমপন্থী নেতার নাম: হুসাইন বিন বদরুদ্দিন আল-হুতি। তাঁর পিতা বদরুদ্দিন বিন আমিরুদ্দিন আল-হুতি তাদের ধর্মগুরু ও আধ্যাত্মিক নেতা।
এই ধর্মগুরু হিজরি ১৩৪৫ সালে উত্তর ইয়েমেনের সা'দাহর উপকণ্ঠে জন্মগ্রহণ করেন এবং সেখানেই বেড়ে ওঠেন। তাঁকে জারুদিয়াদের বড় আলেমদের মধ্যে গণ্য করা হয়।
জায়দিয়া সম্প্রদায়ের কিছু আলেমের সঙ্গে মতবিরোধ সৃষ্টি হলে তিনি ইরানে চলে যান এবং তেহরানে কয়েক বছর বসবাস করেন। পরবর্তীতে সমঝোতার মাধ্যমে তাঁকে নিজ এলাকায় ফিরিয়ে আনা হয়।
তিনি হিজরি ১৪৩১ সালের জিলহজ মাসের শেষ দিকে (২০১০ খৃষ্টাব্দ) মৃত্যুবরণ করেন।
হুসাইন বিন বদরুদ্দিন আল-হুতি ছিলেন বদরুদ্দিনের বড় ছেলে। তিনি সা'দায় উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত পড়াশোনা করেন। এরপর সুদান থেকে শরিয়া বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর ডক্টরেট শুরু করেন। কিন্তু পড়াশোনা ছেড়ে দেন এবং এই যুক্তিতে স্নাতকোত্তরের সনদ ছিঁড়ে ফেলেন যে, একাডেমিক সনদ জ্ঞান-বুদ্ধিকে জমাটবদ্ধ করে দেয়।
১৯৯০ সালে (উত্তর ও দক্ষিণ) ইয়েমেন একত্রিত হওয়ে 'ইয়েমেন প্রজাতন্ত্র' গঠিত হওয়ার পর যখন রাজনীতির পথ উন্মুক্ত হয় তখন হুসাইন আল-হুতি শিয়া 'হিজবুল হক' (Hizb al-Haqq) নামক একটি দল প্রতিষ্ঠায় অংশ নেন এবং দলের পক্ষ থেকে ১৯৯৩-১৯৯৭ সালের সংসদীয় মেয়াদে সদস্য নির্বাচিত হন।
এদিকে দক্ষিণ ইয়েমেনের বিচ্ছিন্নতাবাদী কমিউনিস্টরা সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করলে হুসাইন আল-হুতি তাদের পক্ষ নেন, যার কারণে সরকার তাঁর বাড়িতে সশস্ত্র অভিযান চালায়। ফলে তিনি সুদানে পালিয়ে যান এবং সেখান থেকে ইরানে আত্মগোপন করেন। এরপর ইরানের কোম শহরে তাঁর পিতার সঙ্গে কয়েক মাস অবস্থান করেন।
সেখান থেকে তিনি লেবাননে যান হিজবুল্লাহ গোষ্ঠীর সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য।
পরে সরকার তাঁকে ক্ষমা ঘোষণা করলে তিনি আবার ইয়েমেনে ফিরে আসেন।
ইয়েমেনে ফিরে তিনি ভক্ত ও অনুসারীদের মধ্যে বক্তৃতা ও শিক্ষাদান শুরু করেন এবং বেশ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন, যেগুলোতে শত শত ছাত্র ভর্তি হয়।
❑ 'আশ-শাবাবুল মুমিন' (Believing Youth) সংগঠন প্রতিষ্ঠা:
বদরুদ্দিন আল-হুতি হিজবুল হক দলের সহসভাপতি হিসেবে কাজ করতেন। কিন্তু সংগঠনের সভাপতি মাজদুদ্দিন আল-মুয়াইদির সঙ্গে তাঁর মতবিরোধ সৃষ্টি হয়। এই মতবিরোধের দুটি কারণ ছিল:
১) ইমামিয়া বিষয়ে হুতি ও তাঁর অনুসারীদের গোঁড়া মনোভাব।
২) ইরানের খোমেনি বিপ্লবের আদর্শের প্রতি প্রবল ঝোঁক।
এই মতবিরোধের জেরে হুতি ও তাঁর অনুসারীরা হিজবুল হক (Hizb al-Haqq) থেকে বেরিয়ে আসেন এবং 'আশ-শাবাবুল মুমিন' (Believing Youth) সংগঠনে যোগ দেন, যে সংগঠন প্রতিষ্ঠায় তাঁরা ইতিমধ্যে ১৯৯৭ সালে অংশ নিয়েছিলেন।
ইরান ও তৎকালীন ইয়েমেন সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় আশ-শাবাব সংগঠনটি তাদের কর্মপরিধি বাড়িয়ে উত্তর ইয়েমেনের সা'দাহ অঞ্চলসহ বেশ কয়েকটি জেলার অনেক তরুণ, অল্পবয়সী কিশোর এবং বিভিন্ন গোত্রের সাধারণ মানুষকে তাদের দলে টানতে সক্ষম হয়।
১৯৯৭ সালে বদরুদ্দিন আল-হুতি সংসদ থেকে পদত্যাগ করে সম্পূর্ণভাবে সংগঠনের কাজে আত্মনিয়োগ করেন।
এরপর তারা শিয়া রাজেফি, ইমামিয়া, ইসনা আশারিয়া সম্প্রদায়ের সঙ্গে সমন্বয় সাধন করে একীভূত হওয়ার চেষ্টা শুরু করে এবং ইরান বিপ্লবের প্রশংসা করতে থাকে, যাতে সেই অভিজ্ঞতার আলোকে ইয়েমেনের মাটিতে বিপ্লব সাধন করা যায়।
এরপর তিনি অনুসারীদের যুদ্ধ-প্রশিক্ষণ দিতে শুরু করেন এবং তাদের এমনভাবে গড়ে তোলেন যাতে তারা অন্ধভাবে তাঁর নির্দেশ পালন করে।
তারপর ইয়েমেন সরকারের জুলুম-শোষণের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহের ডাক দেন এবং বাস্তবে তারা সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে। ২০০৪ সালে সরকারি বাহিনীর সঙ্গে হুতি বাহিনীর কয়েকটি সংঘর্ষ হয়, কিন্তু এই বছরই তিনি সরকারি বাহিনীর হাতে নিহত হন। তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে এসব সংঘাতের অবসান ঘটে।
◆ আব্দুল মালিক আল-হুতি:
হুসাইন আল-হুতি নিহত হওয়ার পর তাঁর ভাই আব্দুল মালিক আল-হুতি ‘আশ-শাবাব’ নামক সংগঠনের নেতৃত্বে আসেন। তিনি একজন প্রভাবশালী বক্তা ছিলেন এবং ভাইয়ের পথ অনুসরণ করে ইয়েমেন সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী আন্দোলন অব্যাহত রাখেন।
❑ হুতিদের কিছু গুরুত্বপূর্ণ আকিদা ও মতবাদ:
কিছু গবেষক নিশ্চিতভাবে বলেছেন যে, হুসাইন আল-হুতি শিয়াদের ইমামি ইসনা আশারিয়া মতবাদে দীক্ষিত হয়েছিলেন। তাঁর লেখা বই ও বক্তৃতার বিভিন্ন রেকর্ডিং তা প্রমাণ করে।
হুতিদের বিভিন্ন লেখা, বক্তৃতা ও কার্যক্রম বিশ্লেষণ করলে তাদের কিছু আকিদা ও মতবাদ স্পষ্ট হয়। সংক্ষেপে সেগুলো নিম্নরূপ:
১) তাদের দাওয়াতের মূল বিষয়বস্তু:
ক. ইমামিয়া আকিদাকে শক্তিশালী করা।
খ. এই বিশ্বাস পোষণ করা যে নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর পরে আলি (রা.)-কে খলিফা হিসেবে নির্ধারণ করেছিলেন।
গ. আলি (রা.)-এর পরে ইমাম হবেন হাসান (রা.) ও হুসাইন (রা.)।
ঘ. ইমামের ধারাবাহিকতা হাসান-হুসাইন (রা.)-এর বংশধর থেকে কখনো বাইরে যাবে না।
ঙ. এর ব্যতিক্রম আকিদা পোষণকারী ব্যক্তি কাফের।
২) খুলাফায়ে রাশেদিন—বিশেষত তিন খলিফা (আবু বকর, উমর ও উসমান, রা.)—এর সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ এবং অন্য সাহাবিদের কাফের গণ্য করা। তাদের ধারণা, মুসলিম বিশ্বে আজ পর্যন্ত যত ফিতনা-ফ্যাসাদ ও সমস্যা হয়েছে তার মূল কারণ এই তিন খলিফাসহ অন্যান্য সাহাবি।
বদরুদ্দিন আল-হুতি বলেন, "আমি বিশ্বাস করি, তারা (অর্থাৎ সাহাবিরা) কাফের। কারণ তারা রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নির্দেশ লঙ্ঘন করেছে।"
হুসাইন আল-হুতি বলেন, "আবু বকরের বাইয়াত গ্রহণের কুপ্রভাব এখনো বিদ্যমান। এ কারণেই মুসলিম বিশ্বের সব সমস্যা তৈরি হয়েছে এবং শত্রুরা মুসলিম জাতির ওপর চড়াও হয়েছে।"
তিনি আরও বলেন, আবু বকর, উসমান ও মুয়াবিয়া—সবাই উমরের কর্মকাণ্ডের ফসল।
৩) কেবল কুরআন অনুসরণের এবং কুরআন ছাড়া ইসলামি শরিয়ার অন্য সব উৎস বর্জনের আহ্বান জানানো। কারণ তাদের মতে হাদিস সাহাবি ও তাবেয়িদের মাধ্যমে বিশ্বস্ততার সঙ্গে বর্ণিত হয়নি। ফলে যুগ যুগ ধরে মুসলিম বিশ্বে গৃহীত হাদিসকে তারা গ্রহণযোগ্য শরয়ি উৎস মনে করে না। এ কারণে তারা সহিহ বুখারি ও মুসলিমকে সরাসরি সমালোচনা করে।
৪) তাদের দাবি, তাফসির ও উসুলে ফিকহে হাদিসকে উৎস হিসেবে গ্রহণ করা যাবে না। এর উদ্দেশ্য হলো, অনুসারীরা যেন অজ্ঞতায় থেকে অন্ধভাবে তাদের অনুসরণ করে, যাতে তাদের ওপর প্রভাব বিস্তার করা এবং অন্যান্য রাজেফি আকিদা গ্রহণ করানো সহজ হয়।
৫) জনগণকে উত্তেজিত করে সেসব শাসকের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণের আহ্বান জানানো, যাদের মধ্যে ইমাম হওয়ার শর্তাবলি (তাদের মতে হাসান-হুসাইন রা.-এর বংশোদ্ভূত হওয়া) বিদ্যমান নেই। এই ধরনের শাসকদের বিরুদ্ধে জিহাদকে তারা আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের মাধ্যম মনে করে।
সংগঠনের সদস্য ও সহযোগীদের যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করা এবং অস্ত্রভাণ্ডার গড়ে তোলার আহ্বান জানানো।
৬) আহলে সুন্নত ওয়াল জামাআতের অনুসারীদের এই যুক্তিতে ‘সন্ত্রাসী’ আখ্যা দেওয়া যে, তারা তাদের সন্তানদের ভ্রান্ত আকিদা শেখাচ্ছে। আহলে সুন্নাহর মানুষদের বয়কট করা। কারণ তারা আবু বকর (রা.), উমর (রা.) ও উসমান (রা.)-কে ভালোবাসে এবং তাঁদের আলি (রা.)-এর ওপর অগ্রাধিকার দেয়।
৭) ইরানের খোমেনি বিপ্লব ও লেবাননের হিজবুল্লাহকে অত্যন্ত সম্মানের চোখে দেখা এবং সম্মান, মর্যাদা ও মুক্তির আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করা।
৮) মানুষের অনুভূতি উত্তেজিত করতে ইরান থেকে আমদানি করা কিছু স্লোগান ব্যবহার করা, যেমন—আমেরিকা ধ্বংস হোক, ইসরায়েল ধ্বংস হোক, ইহুদিদের ওপর লানত, ইসলামের বিজয় ইত্যাদি।
৯) শিয়া জায়দিয়া সম্প্রদায়ের বর্তমান অবস্থার সমালোচনা করে তাদের বিপ্লবের প্রতি উদ্বুদ্ধ করা।
১০) অনুসারীদের আহলে সুন্নতের তথাকথিত 'ওয়াহাবি'দের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ এবং হারামাইনের দেশকে তাদের নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত করার আহ্বান জানানো। আহলে সুন্নাহর সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার চিন্তাকে অযৌক্তিক আখ্যা দেওয়া।
১১) বিশ্বাসঘাতকতা ও অঙ্গীকার ভঙ্গের জন্য হুতিদের বিশেষ পরিচিতি রয়েছে বলে দাবি করা হয়।
❑ ইরান ও শিয়া-ইসনা আশারিয়া মতবাদের সঙ্গে হুতিদের সম্পর্ক:
জায়দিয়া সম্প্রদায়ের গ্রন্থাদি রাজেফি-ইমামিয়া-ইসনা আশারিয়া সম্প্রদায়ের সমালোচনায় পরিপূর্ণ—বরং তাদের স্পষ্টভাবে পথভ্রষ্ট ও কাফের আখ্যা দেওয়া হয়েছে। একইভাবে ইমামিয়াদের গ্রন্থাদি জায়দিয়াদের সমালোচনা ও কুফরের ফতোয়ায় পরিপূর্ণ।[6]
এমন পরস্পরবিরোধী মতবাদ থাকা সত্ত্বেও ইরানি বিপ্লব 'তাকিয়া' (গোপনীয়তা রক্ষা) নীতির আড়ালে জায়দিয়াদের কাতারে প্রবেশ করাতে সক্ষম হয় এবং বিচ্ছিন্নতাবাদী হুতি জারুদিদের চিন্তাধারার মধ্যে তাদের উপযুক্ত মিত্র খুঁজে পায়।
তারা দেখল, ইয়েমেনের মাটিতে তাদের বিপ্লব ও আকিদা-বিশ্বাস রপ্তানির জন্য হুতিরাই সবচেয়ে উপযুক্ত প্রতিনিধি ও সৈনিক হতে পারে। এদের মাধ্যমেই ইয়েমেনে তাদের আদর্শ ও পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা সম্ভব।
উল্লেখ্য, বদরুদ্দিন আল-হুতি ও তাঁর ছেলে হুসাইন আল-হুতি ইতিপূর্বে ইরানে বসবাস করে রাজেফি আকিদা ও বিপ্লবী চিন্তাধারা আত্মস্থ করে এসেছিলেন।
এটাও অজানা নয় যে হুতি ইরানের খোমেনি বিপ্লবে মুগ্ধ ছিলেন এবং একে ‘আল্লাহর রহমত ও নিয়ামত’ মনে করতেন। তিনি বলেন, "ইমাম খোমেনি ছিলেন একজন ন্যায়নিষ্ঠ, আল্লাহভীরু ইমাম, যাঁর দোয়া বিফলে যায় না।"
ইয়েমেনের জায়দিয়া সম্প্রদায়ের আলেমরা সতর্ক করেছিলেন যে, হুতিরা গোঁড়া ও বিচ্ছিন্নতাবাদী ইসনা আশারিয়া মতবাদ ও কর্মপদ্ধতি বহন করছে এবং এ ব্যাপারে তারা একটি বিবৃতিও প্রকাশ করেছিল।
বাস্তবে হুতিদের হাত ধরেই ইসনা আশারিয়া ও ইরান বিপ্লবের সঙ্গে জায়দিয়াদের ঐকমত্য ও নৈকট্য বিস্তার লাভ করে।
❑ সম্পর্কের প্রমাণ:
ধারাবাহিক কিছু ঘটনার মধ্য দিয়ে তাদের গভীর সম্পর্কের প্রমাণ পাওয়া যায়:
১) 'গাদির খুম' দিবস পালন, যা ইয়েমেনের মাটিতে নতুন সংযোজন। এদিন তারা বড় মিছিল বের করে, যাতে থাকে বিশেষ স্লোগান ও বক্তৃতা। হুসাইন আল-হুতি এক বক্তৃতায় বলেন, রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আলি বিন আবি তালিব (রা.)-কে উম্মতের পরবর্তী খলিফা ঘোষণা না করে দুনিয়া থেকে বিদায় নেননি।
২) হুসাইন (রা.)-এর শাহাদাত দিবস পালন এবং এ উপলক্ষে হুসাইনি মাহফিলের আয়োজন।
৩) আবু বকর (রা.)-এর হাতে বাইয়াত গ্রহণকারী সব সাহাবি ও তাঁদের অনুসারীদের কাফের গণ্য করা। এ প্রসঙ্গে হুসাইন আল-হুতি এক দরসে বলেন, আলির ইমামত ও খেলাফত বিষয়ে রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নির্দেশ যাদের কাছে পৌঁছার পরও তা অমান্য করে তারা কাফের।
৪) হুতি ও ইরানিদের মধ্যে একাধিক দ্বিপক্ষীয় সফর ও গোপন বৈঠক। ইরাকে অবস্থিত ইরানি দূতাবাসের পক্ষ থেকে ইসনা আশারিয়া আকিদা প্রচারের উদ্দেশ্যে নাজাফে ইয়েমেনি হুতিদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা।
৫) হুতিদের পক্ষ থেকে ইরানি বিপ্লবের প্রশংসা এবং তাদের স্লোগান ব্যবহার করা; একইভাবে লেবাননের হিজবুল্লাহর স্লোগান ব্যবহার এবং কোনো কোনো কেন্দ্রে হিজবুল্লাহর পতাকা উত্তোলন করা।
৬) ইরানের বিভিন্ন টিভি চ্যানেল ও গণমাধ্যমের মাধ্যমে হুতিদের বিপ্লবী কার্যক্রমকে সমর্থন দেওয়া।
৭) ইরান ও উপসাগরীয় অঞ্চলের রাজেফিদের পক্ষ থেকে হুতিদের দুর্বল অর্থনৈতিক অবস্থার সুযোগে তাদের অনুসারীদের মধ্যে বিতরণের জন্য আর্থিক সহায়তা পাঠানো।
৮) ইরান ও লেবাননের হিজবুল্লাহর পক্ষ থেকে হুতিদের সামরিক সহায়তা প্রদান। বিভিন্ন পথে—ইয়েমেনের দ্বীপ, উপদ্বীপ ও সমুদ্রবন্দর দিয়ে—তেহরান থেকে পাঠানো অস্ত্রের চালান হুতিদের হাতে পৌঁছায়। ইরান ও লেবাননের অস্ত্র বিশেষজ্ঞরা হুতি ও তাদের সহযোগীদের বিভিন্ন আধুনিক অস্ত্রের প্রশিক্ষণ দেয়, যাতে ইয়েমেনে হুতিদের একটি প্রভাবশালী অবস্থান তৈরি হয় এবং তাদের মাধ্যমে ইয়েমেন ও প্রতিবেশী দেশগুলোতে ইরানি এজেন্ডা বাস্তবায়ন করা যায়—লেবাননে হিজবুল্লাহর মাধ্যমে যেমনটা করা হয়।
সাম্প্রতিক সময়ে দেখা গেছে, সা'দাহ জেলা প্রশাসনের সহায়তায় হুতিদের শক্তি বৃদ্ধি পেয়েছে এবং ইয়েমেনের অস্থির রাজনৈতিক পরিস্থিতি, সরকারের দুর্বল নিয়ন্ত্রণ, সেনাবাহিনীর সীমাবদ্ধতা, আধুনিক অস্ত্রের স্বল্পতা এবং দুর্গম পার্বত্য ভূপ্রকৃতির সুযোগে তারা অন্যান্য এলাকা দখলের চেষ্টা করেছে।
হুতিরা আহলুস সুন্নাহর মানুষদের সা'দাহ জেলা থেকে বিতাড়নের চেষ্টা করত—চাপ প্রয়োগ, চেকপয়েন্টে তল্লাশি, এমনকি ঘেরাও করে সংঘর্ষ বাধানো পর্যন্ত, যেমনটা ঘটেছিল ইয়েমেনের দাম্মাজ এলাকায়, যেখানে একাধিক ঘটনায় বেশ কয়েকজন নিহত হন।
৯) প্রতীক্ষিত ইমাম মাহদির আগমনের সুসংবাদ প্রচার করা। তারা দাবি করত, হুসাইন আল-হুতি হলেন ইমাম মাহদি। তাঁর নিহত হওয়া পর্যন্ত এই বিশ্বাস তাদের মধ্যে বহাল ছিল। পরে ঘোষণা করা হয় তিনি অন্তর্হিত হয়েছেন। তবে প্রায় দশ বছর পর তাঁর মৃত্যুর কথা তারা স্বীকার করে।
১০) ইসনা আশারিয়া আকিদার প্রতি আহ্বান জানিয়ে লিফলেট বিতরণ।
১১) ইরানের পক্ষ থেকে হুতি ও হুতি-সমর্থক ছাত্রদের পড়াশোনার জন্য ইরানে নিয়ে যাওয়া হতো, যেখানে তাদের মধ্যে ইমামিয়া রাজেফি আকিদা ও খোমেনি বিপ্লবের চিন্তাধারার বীজ বপন করা হতো, যাতে তারা ইরানি শিয়া মতাদর্শের প্রচারক ও সৈনিক হিসেবে ফিরে আসে।
❑ রাজেফি সম্প্রদায়ের কিছু মৌলিক আকিদা-বিশ্বাস:
ইরান বিপ্লব যে মতাদর্শে বিশ্বাসী, তা হলো 'ইমামিয়া ইসনা আশারিয়া' মতবাদ—একটি গোঁড়া শিয়া-রাজেফি ফিরকা। এর কিছু মৌলিক আকিদা নিম্নরূপ:
১) আল্লাহর সঙ্গে শিরক: এই মতবাদে বিশ্বাসীরা তাদের ইমামদের কাছে দোয়া করে, সাহায্য প্রার্থনা করে, তাদের কবরে হজের উদ্দেশ্যে যায়, কবর তাওয়াফ করে, কবর জড়িয়ে ধরে বরকত নেয়। তারা এসব কবরকে কাবা ও বাইতুল্লাহর চেয়েও শ্রেষ্ঠ মনে করে।
২) তারা দাবি করে, ইমামত দ্বীনের একটি স্তম্ভ, যা রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) স্পষ্টভাবে ঘোষণা করে গেছেন এবং বারো জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখেছেন।
৩) তারা বলে থাকে, ইমামরা ভুল-ত্রুটির ঊর্ধ্বে ও নিষ্পাপ; তাঁরা অদৃশ্যের সব খবর রাখেন এবং বিশ্বজগৎ পরিচালনায় তাঁদেরও ক্ষমতা রয়েছে।
৪) তারা মনে করে, প্রতীক্ষিত ইমাম মাহদি বর্তমানে ইরাকের সিরদাব সামাররায় আত্মগোপন করে আছেন।
৫) তারা মনে করে, কুরআনকে বিকৃত করা হয়েছে এবং তা অসম্পূর্ণ।
৬) চারজন সাহাবি (আলি, ফাতিমা, হাসান ও হুসাইন, রা.) ছাড়া বাকি সব সাহাবিকে কাফের মনে করা ও কটূক্তি করা—বিশেষত আবু বকর (রা.), উমর (রা.) ও আয়েশা (রা.)-কে।
৭) 'তাকিয়া' (গোপনীয়তা রক্ষা) নীতি অবলম্বন করা—আহলে সুন্নাহর প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করলেও তা বাহ্যিক আচরণে প্রকাশ না করা।
৮) বাদাআত মতবাদে বিশ্বাস, অর্থাৎ আল্লাহর কাছে এমন কিছু প্রকাশিত হয় যা তিনি আগে জানতেন না, যার কারণে তিনি সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন—এমন বিশ্বাস।
৯) আহলে সুন্নতের যারা তাদের বিরোধিতা করে, তাদের কেবল কাফেরই মনে করা নয়, বরং তাদের হত্যা ও সম্পদ লুণ্ঠনকে বৈধ মনে করা।
১০) মুতা বিয়ে (চুক্তি ভিত্তিক সাময়িক বিয়ে-যা হারাম ও কবিরা গুনাহ)-এর মাধ্যমে নারী ভোগ করাকে বৈধ মনে করা।
এই হলো হুতি সম্প্রদায়, তাদের কার্যক্রম, উৎস, লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ও পরিকল্পনা সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলোচনা।
আল্লাহর কাছে দোয়া করি, তিনি যেন তাদের হেদায়াত দান করেন এবং মুসলমানদের তাদের অনিষ্ট ও ষড়যন্ত্র থেকে হেফাজত করেন। নিশ্চয় তিনি সর্বশক্তিমান।
সাল্লাল্লাহু আলা নাবিয়্যিনা মুহাম্মাদিন ওয়া আলা আলিহি ওয়া সাহবিহি ওয়া সাল্লাম।
________________________________________
টিকা:
[1] ইয়েমেনের রাজধানী সানা থেকে উত্তর-পশ্চিমে ২৪২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত একটি জেলা।
[2] মিজানুল ই'তিদাল ২/৯৩, আল-কামিল ৩/১০৪৬-১০৪৮
[3] রিজালুল কিশশি, পৃষ্ঠা ১৯৯; আল-ফিহরিস্ত, ইবনে নাদিম, পৃষ্ঠা ২৫৩
[4] আল-ফারকু বাইনাল ফিরাক, পৃষ্ঠা ৩০-৩২
[5] জিয়াদ ইবনে মুনজিরের জীবনী, মিজানুল ই'তিদাল—ইমাম যাহাবি; রাফিদাতুল ইয়ামান, পৃষ্ঠা ১২৬-১২৮; মুহাম্মদ ইমাম, জায়দিয়া: পরিচয় ও আকিদা-বিশ্বাস, কাজি ইসমাইল আল-আকওয়া, পৃষ্ঠা ২৪-২৫
[6] আল-ইমামাতুল ইসনা আশারিয়া লিয জায়দিয়া বাইনা আদাইল আমস ওয়া তাকিয়াতুল ইয়াওম, মুহাম্মদ আল-খুজার।
________________________________________
মূল রচয়িতা: প্রফেসর ড. সুলাইমান বিন সালিহ আল-গুসন
(অধ্যাপক, কিং সউদ বিশ্ববিদ্যালয় (KSU), রিয়াদ)
অনুবাদক: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি
(লিসান্স, মদিনা ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়)
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব)
প্রকাশনায়: ধর্ম মন্ত্রণালয়, সৌদি আরব
তারিখ: ১৯-০৪-২০১৫ খৃষ্টাব্দ