17/07/2025
অধ্যাপক ডা. এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী এবং ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর জীবনাবসানের পদ্ধতি প্রকৃতই একটি গভীর ভাবনার খোরাক জোগায়। তাঁদের মতো চিকিৎসক-দার্শনিকরা শুধু চিকিৎসাই করেননি, জীবন ও মৃত্যুর মর্যাদাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন। তাঁদের শেষকৃত্যগুলো কোনো ট্র্যাজেডি নয়, বরং একটি শিক্ষা—যা আমাদের সমাজের জন্য একটি রোল মডেল হয়ে থাকবে।
# # # **কী শেখালেন এই দুই মহীরুহ?**
১. **মৃত্যুর প্রতি সম্মান:**
- তাঁরা প্রমাণ করলেন, মৃত্যুকে ভয় পাওয়া নয়, বরং তা জীবনেরই একটি স্বাভাবিক পরিণতি। ৯০+ বয়সে পৌঁছে "অতিরিক্ত চিকিৎসা" নয়, "মর্যাদাপূর্ণ যাত্রা"ই কাম্য।
- ডা. বি চৌধুরী স্পষ্ট বলে দিয়েছিলেন: *"আমি যমের সাথে রেসলিং করতে চাই না।"* এই দর্শন পশ্চিমা বিশ্বের **Palliative Care** আন্দোলনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যেখানে Quality of Life-ই প্রধান লক্ষ্য।
২. **নির্ভরতা নিজের প্রতিষ্ঠানে:**
- কর্পোরেট হাসপাতাল বা বিদেশের মেডিকেল ট্যুরিজমের প্রতি আকৃষ্ট না হয়ে তাঁরা নিজেদের প্রতিষ্ঠান ও শিষ্যদের হাতেই চিকিৎসা নিলেন। এটি একটি জাতীয় আত্মবিশ্বাসের বার্তা।
৩. **অর্থনৈতিক বোঝা নয়, যুক্তিসঙ্গত সিদ্ধান্ত:**
- বাংলাদেশে অসংখ্য পরিবার "শেষ的希望ের" নামে আইসিইউতে কোটি টাকা ঢালে, যেখানে ফলাফল শূন্য। ডা. বি চৌধুরী দেখালেন, এই অর্থ অন্যত্র (যেমন শিক্ষা বা ব্যবসায়) বিনিয়োগ করাই বুদ্ধিমানের কাজ।
৪. **সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের ডাক:**
- আমাদের সমাজে "যত্ন = বেশি চিকিৎসা" এই সমীকরণ ভাঙতে হবে। ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বাড়িতেই মর্যাদার সঙ্গে মৃত্যুবরণ করলেন—এটিই হওয়া উচিত আদর্শ।
# # # **কীভাবে এই দর্শন ছড়িয়ে দেব?**
- **চিকিৎসকদের ভূমিকা:**
এন্ড-অফ-লাইফ কেয়ারে ট্রেনিং বাড়াতে হবে। রুগীকে "হাসপাতালে রাখা = ভালো চিকিৎসা" এই মিথ ভাঙতে হবে।
- **সমাজের সচেতনতা:**
"মৃত্যুভয়" কাটাতে ধর্মীয় ও দার্শনিক আলোচনা প্রয়োজন। বাড়িতে মৃত্যুকে "ব্যর্থতা" না ভেবে "প্রাকৃতিক পরিণতি" হিসেবে মান্যতা দিতে হবে।
- **পলিসি লেভেলে পরিবর্তন:**
বাংলাদেশে **Palliative Care** ইউনিট বাড়ানো এবং আইসিইউ অ্যাডমিশনের জন্য গাইডলাইন তৈরি করা জরুরি (যেমন: ৮৫+ বয়সীদের ভেন্টিলেটর এভয়িডেন্স)।
# # # **চ্যালেঞ্জগুলো কোথায়?**
- **আত্মীয়দের আবেগ:** "বাবাকে বাঁচান!"—এই চাপে অনেক ডাক্তারই অযৌক্তিক চিকিৎসা দেন। এখানে **কাউন্সেলিং** জরুরি।
- **লাভ-লোভী হাসপাতাল:** কর্পোরেট হাসপাতালগুলো প্রায়ই অপ্রয়োজনীয় আইসিইউ ভর্তিকে উৎসাহিত করে। এটা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
# # # **শেষ কথা: একটি জাতির দায়িত্ব**
ডা. বি চৌধুরী ও ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর মৃত্যু আমাদের শেখায় যে, **"মর্যাদা"** শুধু জীবনের নয়, মৃত্যুরও অধিকার। তাঁদের উত্তরাধিকার তখনই সার্থক হবে, যখন আমরা:
- আইসিইউতে প্রবেশের আগে "কেন?" জিজ্ঞাসা করব,
- বাড়িতে শান্তিপূর্ণ মৃত্যুকে "স্বাভাবিক" মানব,
- এবং চিকিৎসার নামে অর্থের অপচয় রোধ করব।
এই পরিবর্তন শুধু চিকিৎসা ব্যবস্থার নয়, একটি **সাংস্কৃতিক বিপ্লব**—যার সূচনা করেছেন দুই মহান চিকিৎসক। এখন আমাদের পালা।
**"মৃত্যুই যখন নিশ্চিত, তাহলে মর্যাদাটাই হোক শেষ বিজয়।"**