06/08/2024
মিশরের বিপ্লব খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছিল তাই বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতির সাথে কিছু তুলনামূলক বিশ্লেষণ শেয়ার করছি। হোসনি মোবারকের স্বৈরাচারী শাসনআমলের বর্বরতার কথা কম বেশী অনেকেই জানেন, মজার ব্যাপার হলো তার শাসনকালের সাথে শেখ হাসিনার শাসনকালের অনেক মিল রয়েছে। অনেক রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞের মতে, হাসিনা মুরসির কাছ থেকে শিখে গুম, হত্যা, পাতানো নির্বাচন এবং অন্যান্য কৌশল শিখে আমাদের দেশে প্রয়োগ করেছে।একটু ঘাটলে দেখবেন দুজনার স্বৈরাচারীতার একই ধরণের প্যাটার্ন।
মোবারক প্রায় ৩০ বছর ক্ষমতায় থাকার পর, ছাত্রদের পরে আমজনতার আন্দোলনের মুখে পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়। ২০১১ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি মোবারকের পদত্যাগের পর সামরিক বাহিনী ক্ষমতা নেয় এবং দেশ শাসন করে। পরে ২০১২ সালে মোহাম্মদ মুরসি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। কিন্তু ২০১৩ সালে সামরিক বাহিনী আবার ক্ষমতা গ্রহণ করে এবং এক বছরের মাথায় পরিকল্পিতভাবে মুরসিকে সরিয়ে দেয়। এরপর মুরসি সমর্থকদের ওপর ব্যাপক দমনপীড়ন চালানো হয়, তাকে আটক করা হয়, এবং কয়েক মাসের মধ্যেই কয়েক হাজার মানুষ নিহত হয়। বিশেষ করে রাবা' ও নাহদা স্কোয়ারে ফজরের সময় মাত্র এক ঘণ্টার মধ্যে ৪০০০-৫০০০ প্রতিবাদকারীকে হত্যা করা হয়।
আমি কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়ের হোস্টেলে থাকতাম, নাহদা স্কোয়ার থেকে মাত্র ৫ মিনিটের হাঁটা দূরত্বে। আমি নিজ চোখে দেখেছি কিভাবে হেলিকপ্টার থেকে এবং উঁচু বিল্ডিং থেকে গুলি করে ২৫০০ এর বেশি মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল। গ্রেনেড মেরে নিরস্ত্র অনশনরত তাবুগুলো ভস্মে পরিণত হয়েছিল। ছোট ছোট তাবু গেড়ে ৪/৫ হাজার মানুষ পুরো পরিবার নিয়ে এসে আন্দোলন শুরু করেছিলো, বাচ্চা-কাচ্চা নিয়ে ওখানেই খাওয়া-দাওয়া করতো, থাকতো। সিসির এই নৃশংসতা দেখে পুরো দুনিয়া কেঁদেছে। ছোট্ট ছোট্ট বাচ্চাদের লাশের আধপোড়া ভস্ম দুনিয়া আগে কখনো দেখেনি।
এখান থেকে আমাদের কি শেখার আছে? মোবারক চলে যাওয়া মানেই তার ৩০ বছরের সাম্রাজ্যের শেষ নয়। সিসির আবার ক্ষমতায় আসা এবং ডামি নির্বাচন ছিল পূর্ব পরিকল্পিত। বাংলাদেশে শেখ হাসিনা ক্ষমতা হারানোর পরেও আমাদেরকে সচেতন থাকতে হবে। হাসিনা ভারত পালিয়ে গেছে ঠিকই, কিন্তু তার সমর্থিত পুলিশ, সামরিক বাহিনী এবং বিগত ১৫ বছরে গড়া পুরো সাম্রাজ্য এখনো সক্রিয়। ভারতীয় মিডিয়া ইতিমধ্যেই হাসিনাকে নায়ক হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে এবং বর্তমান পরিস্থিতি সম্পূর্ণ পূর্ব পরিকল্পিত মনে হচ্ছে। বারবার গণভবনের লুটপাট, ভাস্কর্য ভাংচুরের ভিডিও দেখাচ্ছে, সংখ্যালঘুদের দমন-নিপীড়নের কথা বলা হচ্ছে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, সেনাবাহিনী যদি হাসিনার গেম প্ল্যান হয়ে থাকে, তাহলে বিপদ এখনো কাটেনি। হাসিনা আর সেনাবাহিনীর শক্তির সাথে তুলনা করা ভুল হবে। সতর্ক থাকুন, দোয়া করতে থাকুন, সামরিক নেতৃত্ব পুরোপুরি চলে না যাওয়া পর্যন্ত আনন্দিত না হয়ে পরবর্তী পদক্ষেপের জন্য প্রস্তুতি নিন।
স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে স্বাধীনতা রক্ষা করা কঠিন। এই স্বাধীনতা ১৮ কোটি মানুষের রক্ষা করার দায়িত্বও ১৮ কোটির। ২০২৪ এ স্বাধীন হওয়া বাংলাদেশ কোনো দলের না, এ দেশ সাঈদ-মুগ্ধর দেয়া রক্তের আমানত। যারা লাফালাফি করে তারা দেশের বন্ধু নয়, শত্রু। যে যেভাবে পারেন দেশটাকে গড়তে সাহায্য করুন। যারা লুটপাট, ভাংচুর এবং প্রতিশোধের নেশায় মত্ত, তারা দেশের বন্ধু হতে পারে না। এরা জেনে বা না জেনে শত্রুদের গেমের গুটি ছাড়া কিছু নয়। বাংলাদেশের দিকে পুরো দুনিয়া তাকিয়ে আছে, আর যাই করুন, ছাত্র সমাজের এই অর্জনকে সম্মান জানাতে না পারেন, অন্তত তাদের অসভ্য, উগ্র, লুটবাজ এবং ডাকাত হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেবেন না।
অনেকেই দেখছি অমুককে ধর, তমুককে মার, এমনকি বড় বড় ইনফ্লুন্সাররা ও আকার ইংগিতে আমজনতাকে আইন নিজ হাতে তুলে নেয়ার জন্য উস্কানী দিছে, ঠিকানা লিখে বা ছবি দিয়ে খুজে বের করার জন্য পোস্ট দিচ্ছে। হাসিনা পতনের আগে ভয় দেয়ার জন্য বলেছেন ভালো কথা এখন এব বলার কি মানে আছে জানিনা। মনে রাখবেন আইন নিজের হাতে না বরং আইনি শাসন কায়েমের জন্য এই স্বাধীনতা। যদি মুসলিম হয়ে থাকেন মনে রাখবেন রাসুল স: মক্কা বিজয়ের পরে ক্ষমতা পেয়েও ক্ষমার অনন্য নিদর্শন দেখিয়েছেন আমাদের জন্য। ধর্মের কথা বাদ দিলেও মানুষ হিসেবে হলেও নিজের বিবেকটা কে কাজে লাগিয়ে যার তার কথায় প্রভাবিত না হয়ে শান্ত থাকুন। আল্লাহ আমাদের সভ্যতা বাড়িয়ে দিন।
আমি বিশেষজ্ঞ নই, তবে এই বিষয়গুলো নিয়ে ভাবা দরকার বলে মনে হয়। সবাইকে সচেতন এবং প্রস্তুত থাকতে বলছি। আল্লাহ আমাদের বোঝার তাওফিক দিক। ইনকিলাব জিন্দাবাদ।