12/08/2026
⁉️ রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ইন্তেকাল, নাকি শাহাদাত?
🟢 রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ক্ষেত্রে ‘ইন্তেকাল’ শব্দটি ব্যবহার করার ফলে অধিকাংশ মানুষ তাঁর ওফাতকে স্বাভাবিক মৃত্যু হিসেবে মনে করতে শুরু করেছে।
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর মজলুমিয়তের একটি দিক, যা আজও অব্যাহত রয়েছে, তা হলো তাঁর শাহাদাতের বিষয়টি। শিয়া ও সুন্নি উভয় সম্প্রদায়ের কাছে গ্রহণযোগ্য বিভিন্ন সূত্র ও গ্রন্থে এ বিষয়ে বর্ণনা পাওয়া যায়। এসব বর্ণনার ভিত্তিতে তাঁর শাহাদাতের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, তাঁর জন্য ‘ইন্তেকাল’ শব্দটি বারংবার ব্যবহারের কারণে অধিকাংশ মানুষ তাঁর মৃত্যুকে স্বাভাবিক মৃত্যু হিসেবে ধারণা করে। ফলে ‘শাহাদাত’ শব্দটি শুনলে অনেকেই বিস্মিত হন।
কুরআনে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর শাহাদাতের উল্লেখ
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে তাঁর নবীর নিহত হওয়ার সম্ভাবনার কথাও উল্লেখ করেছেন, যাতে কেউ মনে না করে যে কোনো নবী বা রাসূলের শাহাদাত অসম্ভব।
﴿وَمَا مُحَمَّدٌ إِلَّا رَسُولٌ قَدْ خَلَتْ مِنْ قَبْلِهِ الرُّسُلُ أَفَإِنْ مَاتَ أَوْ قُتِلَ انْقَلَبْتُمْ عَلَىٰ أَعْقَابِكُمْ﴾
সূরা আলে ইমরান, আয়াত ১৪৪
"আর মুহাম্মাদ কেবল একজন রাসূল। তার পূর্বে নিশ্চয় অনেক রাসূল বিগত হয়েছে। যদি সে মারা যায় অথবা তাকে হত্যা করা হয়, তবে তোমরা কি তোমাদের পেছনে ফিরে যাবে ?”
অর্থাৎ, আয়াতটি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর স্বাভাবিক মৃত্যুর সম্ভাবনার পাশাপাশি নিহত হওয়ার সম্ভাবনাকেও স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে।
শিয়া সূত্রসমূহে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর শাহাদাত
শিয়া গ্রন্থসমূহে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর শাহাদাতের বিষয়টি কখনো ইঙ্গিতের মাধ্যমে এবং কখনো সরাসরি বর্ণিত হয়েছে।
‘কিফায়াতুল আসার’ এবং ‘ইসবাতুল হুদাত’-এ বর্ণিত হয়েছে যে, আমিরুল মুমিনীন হযরত আলী (আ.)-এর শাহাদাতের পর ইমাম হাসান (আ.) গোর্রা খুতবাতে উল্লেখ করেন:
“রাসূলুল্লাহ (সা.) আমাকে সংবাদ দিয়েছেন যে, তাঁর আহলে বাইতের মধ্য থেকে নির্বাচিত বারোজন ইমামের হাতে ইমামতের দায়িত্ব থাকবে। আমাদের মধ্য থেকে এমন কেউ নেই, যাকে হয় বিষপ্রয়োগ অথবা হত্যা করা হবে।”
এই বর্ণনার ভিত্তিতে বলা হয় যে, রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁর নিজের এবং তাঁর আহলে বাইতের সদস্যদের মৃত্যুকে সাধারণ ও স্বাভাবিক মৃত্যুকে অস্বীকার করেছেন।
অন্যদিকে ইমাম হাসান (আ.) তাঁর পরিবারের সদস্যদের উদ্দেশ্যে বলেছেন:
“আমি বিষপ্রয়োগে নিহত হব, যেমনটি রাসূলুল্লাহ (সা.) বিষপ্রয়োগের মাধ্যমে শাহাদাত বরণ করেছেন।”¹
শেখ মুফীদ ও শেখ তূসীর হযরত মুহাম্মদ সা.শাহাদাত সম্পর্কিত বক্তব্য
প্রখ্যাত শিয়া আলেম শেখ মুফীদ রা. উল্লেখ করেছেন যে:
“রাসূলুল্লাহ (সা.) দশম হিজরির ২৮ সফর, ৬৩ বছর বয়সে মদিনা মুনাওয়ারায় বিষপ্রয়োগের কারণে শাহাদাত বরণ করেন।”
এছাড়াও শিয়া জগতের অন্যতম বিশিষ্ট চিন্তাবিদ শেখ তূসী রা. লিখেছেন:
“রাসূলুল্লাহ (সা.) দশম হিজরির সফর মাসের শেষ হওয়ার দুই রাত আগে বিষপ্রয়োগের কারণে ইন্তেকাল করেন।”
আল্লামা হিল্লী ও আল্লামা মাজলিসীর দৃষ্টিতে:
প্রখ্যাত শিয়া আলেম আল্লামা হিল্লী-ও রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর বিষপ্রয়োগের মাধ্যমে শাহাদাতের কথা উল্লেখ করেছেন।
আর আল্লামা মাজলিসী উল্লেখ করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর শাহাদাত একাদশ হিজরিতে সংঘটিত হয়েছিল।
আহলে সুন্নাততের সূত্রে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর শাহাদাতের উল্লেখ
🔹 শা‘বী ও ইবনে মাসউদ
আল-মুস্তাদরাক আল ওয়াসায়েল-এ হাকিম নিশাপুরী শা‘বী থেকে একটি বক্তব্য বর্ণনা করেছেন। শা‘বী বলেছেন:
“আল্লাহর কসম! রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে বিষপ্রয়োগের মাধ্যমে হত্যা করা হয়েছিল।”
এছাড়াও ইবনে মাসউদ রা.-এর কাছ থেকেও রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নিহত হওয়ার বিষয়টি সমর্থনকারী বক্তব্য বর্ণিত হয়েছে।
সহীহ বুখারীতে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর বিষের কষ্টের উল্লেখ
‘আল-মাজদা ফিল আনসাব’-এ ইবনে সা‘দ থেকে এমন একটি বর্ণনা পাওয়া যায় যে, রাসূলুল্লাহ (সা.) ৬৩ বছর বয়সে বিষপ্রয়োগের পর ইন্তেকাল করেন।
এছাড়া সুন্নিদের অন্যতম প্রসিদ্ধ ও গ্রহণযোগ্য গ্রন্থ সহীহ বুখারী-তেও রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনের শেষ সময়ে দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতা ও তীব্র কষ্টের উল্লেখ রয়েছে।
এক বর্ণনায় রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁর পূর্বে গ্রহণ করা বিষের প্রভাব সম্পর্কে বলেন যে, তিনি যেন অনুভব করছেন তাঁর হৃদয়ের প্রধান ধমনী সেই বিষের কারণে কেটে যাচ্ছে।
খায়বারে বিষপ্রয়োগের ঘটনা
একটি প্রসিদ্ধ বর্ণনা হলো, খায়বারের যুদ্ধে এক ইহুদি নারী রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে বিষপ্রয়োগ করেছিলেন। বর্ণনা অনুযায়ী, সেই বিষের প্রভাব পরবর্তী সময়েও তাঁর শরীরে বিদ্যমান ছিল এবং শেষ পর্যন্ত সেই বিষের প্রভাবে তিনি শাহাদাত বরণ করেন।
সূত্র:
১-১.ইসবাতুল হুদাত, খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ১৫০, হাদিস ১২।
২.আল-খারায়িজ ওয়াল-জারায়িহ, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ২৪১, হাদিস ৭।
৩. বিহারুল আনওয়ার, খণ্ড ৪৪, পৃষ্ঠা ১৫৩।
৪.মুসনাদুল ইমাম আল-মুজতবা (আ.), পৃষ্ঠা ১২৩, হাদিস ৩৪।
৫.মুনতাহাল আমাল, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ১৬৮।
#রাসূলুল্লাহ #শাহাদাত #ইসলাম #কুরআন #হাদিস