16/08/2026
#গুরুই_ভগবানের সাকার মূর্তি
 ̄ ̄ ̄ ̄ ̄ ̄ ̄ ̄ ̄ ̄ ̄ ̄
বেদান্তের সার কথা— “ব্রহ্ম সত্য, জগৎ মিথ্যা।” গীতার সার কথা— ত্যাগ। এই দুটি বাক্যের মধ্যেই যেন নিহিত হয়ে আছে সমস্ত শাস্ত্রের নির্যাস। মূল সত্যটি একবার জানা হয়ে গেলে শুধু গ্রন্থপাঠে আর কী লাভ? তখন প্রয়োজন সাধন-ভজন, ভগবানের জন্য কর্ম এবং সেই উপলব্ধিকে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা। সরষে পিষে যেমন তেল বের করতে হয়, মৌলপাতা বেটে যেমন রং তৈরি করতে হয়, কাঠ ঘষে যেমন আগুন জ্বালাতে হয়—তেমনি সাধনার মধ্য দিয়েই জীবনের অন্তর্নিহিত সত্যকে প্রকাশ করতে হয়। লোকশিক্ষার প্রসঙ্গে ঠাকুর তাঁর প্রিয় নরেনকে যেন সেই কথাই বলেছিলেন।
কিন্তু উচ্চশিক্ষিত নরেন্দ্রনাথ দত্ত কী করে সহজে এমন একজন গ্রাম্য, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাবঞ্চিত মানুষকে গুরু হিসেবে মেনে নেবেন—যিনি বাংলা ভাষাটুকুও ঠিকমতো উচ্চারণ করতে পারেন না? তাই পরখ না করে নরেন্দ্রনাথের উপায় ছিল না।
মানুষের মধ্যে কী করে অসীম ঈশ্বর অবতার ধারণ করতে পারেন—এই প্রশ্নই একদিন নরেন্দ্রনাথ দত্তের মনে জেগেছিল। তাঁর প্রশ্নের উত্তরে ঠাকুরের কণ্ঠে ছিল নিরুদ্বেগ অথচ গভীর প্রত্যয়—“অবিশ্বাস করছিস নরেন, সংশয় রেখে ঈশ্বর-দর্শন হয় না রে। চার পোয়া দুধ এক পোয়ায় কখন দাঁড়ায় জানিস? আগুনের তাপে বারবার জ্বাল দিয়ে ক্ষীর করতে হয় তাকে। অহংকার, অবিশ্বাস, জাত্যভিমান, লোভ—এসবকে ভক্তি-বিশ্বাসের আগুনে পুড়িয়ে দে, তবেই দেখতে পাবি এই মানুষের শরীরের ভেতরেই লুকিয়ে আছেন অসীম ঈশ্বর। নিরাকারে তো মন স্থির থাকে না। বাণ শিখতে গেলে আগে কলাগাছে তাক করতে হয়, তারপর শরগাছে, তারপর সুতোয়। বাপের ফটোগ্রাফ দেখলে যেমন বাপের কথা মনে পড়ে, প্রতিমাও তেমনি সত্যের উদ্দীপনামাত্র। রূপের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে অরূপ-রতন। তিনিই দয়া করে আমাদের জন্য রূপ ধারণ করে আসেন।”
এই একই সত্যের প্রতিধ্বনি শোনা যায় শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের বাণীতেও— “গুরুই ভগবানের সাকার মূর্তি।” তাঁর ভাষায়, অবতার মানে সদ্গুরু—One who comes from above the region of complexes and conveys the laws of being and becoming”—অর্থাৎ যিনি প্রবৃত্তিপরায়ণতার ঊর্ধ্বলোক থেকে অবতীর্ণ হয়ে জীবকে বাঁচা ও বাড়ার বিধি জানিয়ে যান। মহাপুরুষ শব্দের অর্থই যে মহা-পরিপূরণকারী—এই সত্য যেন এখানে নতুন করে উপলব্ধ হয়।
আমরা বাঁচতে চাই, বেঁচেও আছি। কিন্তু যে বেঁচে থাকার মধ্যে ঈশ্বরের দিকে এগিয়ে যাওয়ার কোনো গতি নেই, সেই জীবন কখনোই দুঃখ, হতাশা ও যন্ত্রণাকে অতিক্রম করতে পারে না। এইখানেই সদ্গুরুর প্রয়োজন। বৈষ্ণব সাহিত্যে তাই বলা হয়েছে—
জীব নিত্য কৃষ্ণদাস ইহা ভুলি গেলা।
মায়া পিশাচী তায় গলায় বেড়িলা।।
এই পঙ্ক্তির ব্যাখ্যায় ঠাকুর বলছেন—ঈশ্বর-উপাসনার বেদীই পুরুষোত্তম; তাই জীবকে বলা হয়েছে কৃষ্ণদাস, নিছক ঈশ্বরদাস বলে ছেড়ে দেওয়া হয়নি। কারণ অমূর্ত, নিরাকার ঈশ্বরের উপাসনায় মানুষের প্রবৃত্তির গায়ে সরাসরি হাত পড়ে না; ফলে তার চরিত্র ও আচরণে প্রত্যক্ষ সংশোধনও ঘটে না। এটিই বলা হয়েছে নিত্যসম্বন্ধ—জীব যতই উন্নত স্তরে উঠুক না কেন, সে জীবই থেকে যায়; আর ঈশ্বর চিরকালই তার প্রভু। গীতাতেও একই সত্যের ইঙ্গিত রয়েছে—
ক্লেশোধিকতরস্তেষামব্যক্তাসক্তচেতসাম্।
অব্যক্তা হি গতির্দুঃখং দেহবদ্ভিরবাপ্যতে।।
যাঁরা নিরাকার রূপে আসক্ত, তাঁদের পক্ষে পরমার্থলাভ অত্যন্ত কষ্টসাধ্য; কারণ দেহধারী জীবের পক্ষে অব্যক্তের উপাসনার পথ দুঃখসাধ্য। আমরা যখন অসীম, অমূর্ত ভগবানের উপাসনা করি, তখন সেই উপাসনা অনেক সময় আমাদের নিজস্ব মানসিক প্রবৃত্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। নিরাকারে আত্মসমর্পণ করলেও তিনি তো এসে সরাসরি হাত ধরে আমাদের ভুল শুধরে দেবেন না। শাস্ত্রগ্রন্থ সামনে থাকলেও, সেই বাণীকে নিজের প্রবৃত্তি ও স্বার্থের অনুকূলে ব্যাখ্যা করে বিকৃত করে নেওয়া মানুষের পক্ষে খুবই সহজ। তাই জীবন্ত আদর্শে আত্মসমর্পণ ছাড়া ঈশ্বরকে উপলব্ধি করার পথ যেন অসম্পূর্ণ থেকে যায়। ঠাকুর রামকৃষ্ণদেব বলতেন—ভক্তির জন্য সাকার, মুক্তির জন্য নিরাকার। কিন্তু মানুষের জন্মই তো মুক্তির জন্য—এমন প্রশ্ন করেছিলেন নরেন্দ্রনাথ। হেসে ঠাকুর উত্তর দিয়েছিলেন— “ভক্তি দেওয়াই কঠিন রে, ছুটি পায় না ভগবান, লেগে থাকতে হয় সবসময়। তাই মুক্তি দিতে আমি কাতর নই, ভক্তি দিতে কাতর হই।”
শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র এই কথারই যেন আরও বিস্তৃত ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তাঁর শিক্ষায় মুক্তি বলতে বুঝতে হবে প্রবৃত্তিপরায়ণতা থেকে মুক্তি, স্বার্থপর কামনা-কলুষ থেকে মুক্তি। জন্ম-মৃত্যুর বন্ধনে আবদ্ধ থেকেও যদি প্রবৃত্তির বশবর্তী হয়ে জীবন পরিচালিত না করি, তবে সেই প্রবৃত্তি থেকে মুক্তির মধ্য দিয়েই দুঃখ-কষ্টকে সহ্য করে অতিক্রম করা সম্ভব। আর এই পথ সম্ভব হয় মূর্ত, জীবন্ত আদর্শের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে।
ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন—
নাস্তি বুদ্ধিরযুক্তস্য ন চাযুক্তস্য ভাবনা।
ন চাভাবয়তঃ শান্তিরশান্তস্য কুতঃ সুখম্।।
অর্থাৎ—যিনি ইষ্ট-ভাবনায় যুক্ত নন, তাঁর চিত্ত সংযত হয় না; আর চিত্ত সংযত না হলে পরমার্থিক বুদ্ধিরও উদয় হয় না। পরমার্থ-চিন্তাহীন মানুষের শান্তি নেই; আর শান্তি না থাকলে সুখই বা কোথায়?
শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র বলতেন—যুক্ত অর্থাৎ যোগ ছাড়া মুক্তি মেলে না। জীবন্ত ইষ্টের সঙ্গে যে যতখানি প্রাণের টানে যুক্ত হয়, প্রবৃত্তির বন্ধন তার ততখানি শিথিল হয়; দোষ-দুর্বলতার নাগপাশও ক্রমে আলগা হতে থাকে।
তাই সাধ্য বলতে যদি কিছু থাকে, তবে তা ইষ্টানুরাগ—আর একেই বলা যায় ভক্তি। ভক্ত জানে, ভগবানের যা কিছু করণীয়, তা-ই তার করণীয়। এই জীবনের মধ্যেই লুকিয়ে আছে মুক্তির সম্ভাবনা—প্রবৃত্তিপরায়ণতা থেকে মুক্তি, সংকীর্ণ স্বার্থপরতা থেকে মুক্তি, আলস্য, অবসাদ ও অননুসন্ধিৎসা থেকে মুক্তি, অজ্ঞান থেকে মুক্তি, অপ্রেম থেকে মুক্তি, অপারগতা থেকে মুক্তি, অসাফল্য থেকে মুক্তি এবং ভীরুতা থেকে মুক্তি। কিন্তু ভক্তি ছাড়া এই সর্বতোমুখী মুক্তি কারও কখনো হয়েছে বলে জানা নেই। ইষ্টের জন্য নিরন্তর কর্ম করে চলার পথেই তাই জীবনের সার্থকতা, জীবনের পূর্ণতা। কবিগুরুর ভাষায়—
নিতে চাও বলে ফিরাও আমায়/পূর্ণ করিয়া লবে এ জীবন তব/মিলনেরই যোগ্য করে/আধা ইচ্ছার সংকট হতে বাঁচায়ে মোরে।
জন্ম-মৃত্যুর বন্ধন থেকে মুক্তিলাভের অর্থ যদি হয় সমস্ত কর্মকাণ্ডের সমাপ্তি, তবে সেই মুক্তির জন্য সাধনা একদিকে যেমন ঈশ্বরের কাছে সকাম প্রার্থনা, অন্যদিকে তেমনই একপ্রকার স্বার্থপরতাও বটে। কারণ প্রকৃত ভক্ত কেবল নিজের মুক্তির কামনায় সাধনা করে না। সে বারবার পৃথিবীতে ফিরে আসতে চায়—ঈশ্বর-বিমুখ মানুষকে বাঁচা ও বাড়ার পথে নিয়ে আসতে।
ইষ্টস্বার্থ প্রতিষ্ঠায় প্রভুর জন্য নিরন্তর কাজ করে চলার পথেই সে খুঁজে পায় জীবনের আনন্দ, জীবনের মুক্তি। সহজ করে বলতে গেলে—রসগোল্লার স্বাদ আস্বাদন করব বলেই আমরা রসগোল্লা খাই। কিন্তু নিজেই যদি রসগোল্লা হয়ে যাই, তবে তার স্বাদ বুঝব কী করে? এখানেই দ্বৈতবাদী বনাম অদ্বৈতবাদীর পথের একটি মৌলিক পার্থক্য। অদ্বৈতবাদী নির্বিশেষ ব্রহ্মে বিলীন হতে চায়; দ্বৈতবাদী চায় ঈশ্বরের ভক্তিরস আস্বাদন করতে। ভক্তির পথে সবচেয়ে নিরাপদ ভাব যেন এই— তুমি প্রভু, আমি তোমার নিত্য সেবক। রামপ্রসাদী সুরে বলতে হয়—
মাগো নির্বাণে কী আছে ফল/জলেতে মিশায় জল।/চিনি হওয়া ভালো নয়,/মন চিনি খেতে ভালোবাসে।
ঠাকুরের আদর্শে ‘সোহহং’ কেবলই অহংকারের কথা—ভক্ত মানুষ কখনো “আমিই সেই” বলে না। “জীব নিত্য কৃষ্ণদাস”— এটাই ছিল শ্রীশ্রীঠাকুরের জীবনকথার মূল সুর। ঠাকুর বলেছেন, আত্মা সচ্চিদানন্দময়। অর্থাৎ মুক্ত আত্মা কোনো অবস্থাতেই প্রকৃত অর্থে বদ্ধ নয়; তাকে মুক্ত করার জন্য পৃথক কোনো সাধনারও প্রয়োজন নেই। আত্মা চিরকাল গতিশীল—সে নিরন্তর এগিয়ে চলেছে ঈশ্বরের দিকে। এই এগিয়ে চলার মধ্যেই যে আনন্দ, যতক্ষণ সেই আনন্দ, ততক্ষণই মুক্ত জীবন। এই পথের পথিকের পথের শেষ নেই; তার আনন্দেরও অন্ত নেই—
পিছু পিছু ছুটি যত যাব আমি,
আরো আরো দূরে র'বে তুমি,
ফুরাবে না তুমি, ফুরাব না আমি...!
এই তো সেই পথ—হে অনন্ত, তুমি ফুরিয়ো না, আমিও ফুরাব না। এমন ভক্তের কাছে মুক্তি চাওয়াটাই যেন পাপ। এই সাধনার পথে মানুষকে ইষ্টকর্মে যুক্ত করে যোগ্য করে তুলতেই পুরুষোত্তম অমৃতবাণী নিয়ে যুগে যুগে আবির্ভূত হন।
শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র ফ্যারেঞ্জাইটিসে আক্রান্ত হয়েছিলেন; সেই সময় মাঝেমধ্যে কাশতেন তিনি। অসুস্থতার মধ্যেও একটু সামলে নিয়ে বলেছিলেন— “ভৃগুর কোষ্ঠীতে আছে, আগের জন্মে গলরোগেই আমার মৃত্যু হয়েছিল, তাই এ জন্মেও গলায় একটু দোষ থেকে যাবে। আরও আছে, আগের জন্মে আমি নাকি ছিলাম গঙ্গাতীরে, সাধন-ভজন করতাম।”
#কে_তুমি, হে মহামানব?
তিনি ধরা দেন না, অথচ কখনো-কখনো ধরা পড়েন ভক্তের বোধচক্ষুতে। তাঁর লীলার গভীরতা যুক্তির সীমা ছাড়িয়ে যায়; উপলব্ধির দরজা খুলে যায় ভক্তির মধ্য দিয়ে।
্রীশ্রীরামকৃষ্ণদেবের_১৪০তম তিরোধান দিবস। এক শতাব্দীরও অধিক কাল পেরিয়ে গেছে, তবু সেই মহাপ্রয়াণের দিনটি আজও যেন সমান জীবন্ত, সমান উজ্জ্বল। কারণ দেহের অবসান হলেও লীলার অবসান হয় না কখনো।
যে বাণী তিনি একদিন শুনিয়েছিলেন তাঁর প্রিয় শিষ্যকে, যে ইঙ্গিত তিনি রেখে গিয়েছিলেন সাকার ও নিরাকারের দ্বন্দ্ব অতিক্রমের পথে, তা আজও পথ দেখায় অগণিত অন্বেষণকারী হৃদয়কে। পুরুষোত্তমের সেই চিরন্তন লীলা কখনো একটি দেহের সীমানায় আবদ্ধ থাকে না; তা নতুন যুগে, নতুন রূপে, নতুন আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বহমান থাকে চিরকাল। ঠাকুর রামকৃষ্ণদেব থেকে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র—এই ধারাবাহিকতা যেন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, সদ্গুরুর আবির্ভাব কোনো একক ঘটনা নয়; তা এক অবিচ্ছিন্ন প্রবাহ, যা যুগ থেকে যুগান্তরে প্রসারিত হয়ে চলে। অনন্তের সেই লীলা অনন্তের পথেই বহমান ছিল, আছে এবং থাকবে। আর আমরা—তাঁর ভক্তকুল—সেই অসীম প্রবাহেরই এক ক্ষুদ্র অথচ অবিচ্ছেদ্য অংশ।
আসুন, সেই রথের রশি দৃঢ় হাতে ধারণ করি। ইষ্টের কাজে নিজেদের যুক্ত করি। প্রবৃত্তির বন্ধন অতিক্রম করে বাঁচা ও বাড়ার পথে এগিয়ে চলি। সেই পথেই খুঁজে নিই জীবনের সার্থকতা, জীবনের পূর্ণতা।
 ̄ ̄ ̄ ̄ ̄ ̄ ̄ ̄ ̄ ̄ ̄ ̄ ̄ ̄ ̄ ̄
লেখক— মলয় কুমার ঘোষ
গ্রাফিক্স— Satwata Katha | সাত্বত কথা