20/04/2024
ইদানিং প্রতি বছর মার্চ এর শুরু থেকেই হঠাৎ করেই মাটি সহ হাওয়া উত্তপ্ত হতে শুরু করছে, এবং এপ্রিল-মে মাসে তা চরমে পৌঁছাচ্ছে! উষ্ণতা হামেশাই ৪০-৪৫ ডিগ্রী উঠে যাচ্ছে, বাতাসে যেন আগুনের হল্কা, বালি বা কংক্রিটের উপরে দাড়ানো যাচ্ছেনা, কংক্রিটের ঘরে থাকা যাচ্ছেনা, মানুষ ঘরে বাইরে তীব্র দাবদাহে কষ্ট পাচ্ছে। সকাল ১০ টার পরে আর বাইরে বেরোনো যাচ্ছেনা! শীতের শেষে সংকীর্ণ বসন্তের পরে হঠাৎই গ্রীষ্মের আগমন স্বাভাবিক হয়ে দাড়িয়েছে।
ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের রিপোর্ট অনুযায়ী ২০২২ সালের মার্চ মাস বিগত ১২২ বছরে উষ্ণতম মার্চ হিসাবে পরিগণিত হয়। এমনটা নয় যে তাপপ্রবাহ নতুন কিছু। আইএমডি তথ্য বলছে, ১৯৮১- ১৯৯০ দশকে ৪১৩ টি তাপপ্রবাহ দিবস এবং ২০০১- ২০১০ দশকে ৫৭৫ টি এবং ২০১১- ২০২০ দশকে ৬০০ টি তাপপ্রবাহ দিবস নথিভুক্ত করা হয়। সারা দেশজুড়ে প্রায় ১০৩ টি আবহাওয়া কেন্দ্র থেকে (স্থল অভ্যন্তর) উত্তরোত্তর উষ্ণ দিবসের ঘটনা নিয়মিত সামনে আসছে ১৯৬১-২০২০ এই সময়ে নথিভুক্ত তথ্য অনুযায়ী। ১৯৬১- ১৯৯১ এর তুলনায় ১৯৯১- ২০২০ তে স্থল অভ্যন্তর ভাগে তাপপ্রবাহ কবলিত এলাকা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়েছে।
তাপপ্রবাহ কাকে বলে?
ভারতীয় অবহাওয়া দপ্তর অনুযায়ী, সমতলে স্বাভাবিকের তুলনায় ৪.৫ ডিগ্রী বা ৪০ ডিগ্রির বেশি, উপকূলে ৩৭ ডিগ্রির বেশি এবং পাহাড়ে ৩১ ডিগ্রির বেশি উষ্ণতা পর পর দুই দিন বা তার বেশি নথিভুক্ত হলে তাকে তাপপ্রবাহ বলা হয়। উল্লেখ্য, সমতলে ৪৫ ডিগ্রী তাপমাত্রা উঠে গেলে সঙ্গে সঙ্গেই তা তাপপ্রবাহ হিসাবে ঘোষণা করা হয়।
ভারতে এই তাপপ্রবাহের কারণ কি?
তাপপ্রবাহের কারন জানার জন্য ভারতের ভৌগলিক অবস্থান, ভূপ্রকৃতি এবং ভারতের উপরে বায়ুমণ্ডলীয় অবস্থা জানা জরুরী। অনেকেই না সম্পূর্ণ জেনেই এল নিনো, বিশ্ব উষ্ণায়ন, দূষণ, সবুজ ধ্বংস, ইত্যাদি কারন হিসাবে বলছেন। কিন্তু এগুলো পরিপূর্ণ ব্যাখ্যা দিতে সক্ষম নয়। বিশেষত তাপপ্রবাহের স্থানিক বণ্টন বুঝতে গেলে এগুলোর পাশাপাশি ভারতের ভৌগলিক অবস্থান, ভূপ্রকৃতি এবং ভারতের উপরে বায়ুমণ্ডলীয় অবস্থা জানা জরুরী!
স্বাভাবিক কারন:
এপ্রিল মে মাসে ভারতবর্ষের স্থলভাগের অভ্যন্তরে তাপপ্রবাহ খুব স্বাভাবিক একটা ঘটনা এবং এর জন্য ভারতের ভৌগোলিক অবস্থান, ভূপ্রকৃতি এবং এই সময়ে ভারতবর্ষের উপরে বায়ুমণ্ডলীয় অবস্থা দায়ী।
২১ মার্চ এর পর থেকে সূর্য উত্তর গোলার্ধের দিকে সরতে শুরু করে, যাকে আমরা সূর্যের উত্তরায়ন বলে থাকি এবং ভারতবর্ষের অবস্থান যেহেতু কর্কটক্রান্তি রেখার উপরে তাই সূর্য ক্রমশ ভারতবর্ষের উপরে লম্ব কিরণ দিতে শুরু করে এই সময় এর পর থেকে। ফলে ভারতবর্ষের স্থলভাগ দ্রুত গরম হতে শুরু করে এবং তার সঙ্গে ভারতবর্ষের উপরে বায়ুমণ্ডলও উষ্ণ হতে শুরু করে।
“ভারতবর্ষের ভূপ্রাকৃতিক অবস্থান এই উষ্ণতাকে ভারতবর্ষের মধ্যে আবদ্ধ রাখে।”
কারণ হিসেবে বলাযায়, ভারতবর্ষের উত্তর, পূর্ব ও উত্তর-পশ্চিম অংশে সুউচ্চ হিমালয় পর্বত প্রাচীরের মতো কাজ করে ফলে এই আবদ্ধ উষ্ণতা বের হতে পারে না। তার সঙ্গে এই সময়, অর্থাৎ মার্চ, এপ্রিল, মে এই তিন মাস ভারতবর্ষের উপরে ঊর্ধ্ব বায়ুমন্ডলে ক্রান্তীয় পশ্চিমা জেট বায়ুপ্রবাহের (জেট বায়ুপ্রবাহ হল উর্ধ্ব বায়ুমন্ডলে ট্রপোপজ উচ্চতায় প্রবাহিত উচ্চগতির বায়ু) দক্ষিণ শাখা হিমালয়ের দক্ষিণ দিক দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার ফলে আবদ্ধ উষ্ণ বায়ু উপরে উঠতে বাধা পায়, এবং এই জেট বায়ু প্রবাহ উপর থেকে নিচের দিকে বাতাসে একটা ধাক্কা দিতে থাকে, ফলে ভারতের স্থল মধ্যভাগে সুস্পষ্ট নিন্মচপ তৈরি হতে পারেনা (ছবি-১)। আকাশ পরিষ্কার থাকে, উচ্চ চাপীয় অবস্থা বিরাজ করে (বায়ু প্রবাহের ম্যাপ দেখুন- ছবি-২)। এই অবস্থা তাপপ্রবাহের মত অবস্থা সৃষ্টি করে।
অস্বাভাবিক কারন:
১. জীবাশ্ম জ্বালানী দহন, গ্রিন হাউস গ্যাসের নির্গমন ও বিশ্ব উষ্ণায়ন:
ও ভারতবর্ষ সহ অধিকাংশ ক্রান্তীয় অঞ্চলের দেশগুলিতে তথা নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলের দেশ গুলিতেও গড় উষ্ণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর পেছনে কারণ হিসাবে বিশ্ব উষ্ণায়নকে দায়ী করা হচ্ছে। ভারতীয় আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ বিভাগ এর বক্তব্য অনুযায়ী, ভারতে গ্রীষ্মকালীন গড় উষ্ণতা ১ ডিগ্রী থেকে ১.৫ ডিগ্রী বৃদ্ধি পেয়েছে।
শিল্পায়ন ও নগরায়নের সাথে সাথে উত্তরোত্তর বেড়ে চলেছে বৈদ্যুতিন শক্তির চাহিদা যা মেলে একমাত্র জীবাশ্ম জ্বালানি দহনের মাধ্যমে। শিল্প, কলকারখানা সহ রাস্তার গাড়ি, বাড়ির বিভিন্ন বৈদ্যুতিন যন্ত্র চালাতে লাগে শক্তি যা আসে জীবাশ্ম জ্বালানি দহনের মাধ্যমে। এর থেকে বাতাসে নির্গত হচ্ছে কার্বন ডাই অক্সাইড সহ অন্যান্য গ্রিনহাউস গ্যাস যা কংক্রিটের আচ্ছাদন থেকে বিকিরিত উত্তাপ শোষণ করে বায়ুমন্ডলের উষ্ণতা বৃদ্ধি করছে।
২. নগরায়ণ ও কংক্রিটের জঙ্গল:
পৃথিবী জুড়েই নগরায়ন(শহর বসতি) উত্তরোত্তর বেড়ে চলেছে ভারতবর্ষ ও তার ব্যতিক্রম নয়। নগরায়ন অর্থাৎ শহর বসতির বৃদ্ধি মানেই মাটির উপরে কংক্রিটের ও বিটুমিনের আচ্ছাদন বৃদ্ধি, খুব কাছাকাছি উঁচু উচু কংক্রিটের বাড়ি, সবুজ ছায়া প্রদানকারী গাছের অনুপস্থিতি তাপপ্রবাহকে ত্বরান্বিত করছে।
শহরে, মাটি কংক্রিটে ঢাকা (সেই বালি, পাথর); ছায়া প্রদানকারী গাছের দ্রুত কমে যাওয়া; এবং সর্বোপরি পাশাপাশি উঁচু উঁচু পাঁকা বাড়ি। এর ফলে গাছ হীন উন্মুক্ত বালি ও পাথুরে কংক্রিটের ভূমি গ্রীষ্মে সূর্যের উত্তাপে দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে পড়ছে, সেই উত্তাপ চারিদিকে ছড়িয়ে পড়তে চাইছে, কিন্তু উঁচু উঁচু ইমারতে আবদ্ধ হয়ে পড়ছে। ফলে উষ্ণতা আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে।
**তার সাথে ভিলেন হিসাবে বাতাসে উপস্থিত অতিরিক্ত দুষক পদার্থ, গ্রিন হাউস গ্যাস কিছুটা উত্তাপ শোষণ করে অবস্থার আরও অবনতি ঘটাচ্ছে।
***সর্বোপরি গোঁদের উপর বিষ ফোঁড়ার মত গ্রীষ্ম কালে অতিরিক্ত জলীয়বাষ্প বাতাসে আরও দ্রুত ও মাত্রারিক্ত তাপ শোষণ করে ধরে রাখছে। ফলে অবস্থা দাঁড়াচ্ছে "heat chamber" এর মত। একেই ‘urban heat island’ বলে।
****এর উপরে আর এক ভিলেন বড় লোকদের এয়ার কন্ডিশন মেশিন থেকে নির্গত জলীওবাষ্প অবস্থার আরো অবনতি ঘটাচ্ছে!
এসি তাপপ্রবাহের সমাধান নয়, বরং তাপপ্রবাহ সহায়ক!
এসি চালাতে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ লাগে যার জন্য অতিরিক্ত জীবাশ্ম জ্বালানী পোড়ানোর দরকার পড়ে। ফশ্রুতিতে গ্রিন হাউস গ্যাসের অতিরিক্ত নির্গমন, অতিরিক্ত তাপের শোষণ ও উষ্ণায়ন!
৩. অরণ্য ধ্বংস:
আমাদের চার পাশে যদি ছায়া প্রদানকারী গাছ বেশি থাকে তাহলে সেই গাছের ছায়া আমাদের অনেকটা আরাম দেয়। গাছ অন্যতম তাপ শোষক, কংক্রিটের মেঝেতে ছায়া বিছিয়ে উত্তপ্ত হতে বাধা দেয়। গাছ হীন উন্মুক্ত বড় বড় পাকা রাস্তা, কংক্রিটের জঙ্গল দ্রুত গরম হয়ে বাতাসেও গরম ছাড়ছে, আমাদের অস্বস্তি বাড়ছে।
৪. এল নিনো:
ক্রান্তীয় পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে (দক্ষিণ আমেরিকা উপকূল) সৃষ্ট অস্বাভাবিক উষ্ণ সমুদ্র স্রোত এল নিনো নামে পরিচিত। এই সময় ক্রান্তীয় প্রশান্ত মহাসাগরের পূর্ব অংশে সমুদ্র জলের উষ্ণতা বৃদ্ধি পায়, ফলে সেখানে নিম্নচাপ অবস্থান করে এবং পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অংশে (অস্ট্রেলিয়া-ইন্দোনেশিয়া অঞ্চলে) সমুদ্র জলের উষ্ণতা স্বাভাবিকের তুলনায় কম থাকায় সেখানে উচ্চচাপ অবস্থান করে। এর প্রভাবে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে নিম্নচাপ সৃষ্টি বাধা প্রাপ্ত হয় ফলে ভারতীয় উপদ্বীপীয় মৌসুমী বায়ু প্রবাহ শক্তিশালী হতে পারে না (ছবি-৩)।
মৌসুমী বায়ুপ্রবাহ দুর্বল থাকলে ভারতীয় উপদ্বীপীয় অংশের ঊর্ধ্ব বায়ুমন্ডলে ক্রান্তীয় পূবালী জেট বায়ুপ্রবাহ সৃষ্টি হতে বাধা পায়, যার ফলে ক্রান্তীয় পশ্চিমা জেট বায়ু প্রবাহ ভারতের উপরে দীর্ঘস্থায়ী হয় ও উষ্ণায়ন ত্বরান্বিত করে।