11/09/2023
আল-আমীন মিশন। খলতপুর, হাওড়া।
======================
কল্যাণী এইমস্-এ এমবিবিএস পড়ার সুযোগ
মুর্শিদাবাদের শ্রমজীবী পরিবারের সন্তানের
মেধা কোথায় জন্মায় বা জন্মাবে তার কোনও নির্দিষ্ট নিয়ম ও ভূখণ্ড নেই। তবে অভিজ্ঞতায় দেখা যায় দুঃস্থ ও গরীবদের কুঁড়ে ঘরেই তাদের আগমন ঘটে তুলনামূলকভাবে একটু বেশি।সেরকমই এক রূপকথার মুখ্য চরিত্র মুহাম্মদ রসুল। মুর্শিদাবাদ জেলার সামশেরগঞ্জ থানার ইসলামপুর গ্রামের প্রকৃত অর্থেই শ্রমজীবী পরিবার আবদুল মান্নানের। কখনও দিনমজুরি, কখনও বাড়ি বাড়ি সব্জী বিক্রি করা কিংবা সামান্য জমি ভাগ চাষ করে কোনওক্রমে সংসার চালান। এই জনপদের অধিকাংশজনই বিড়ি বেঁধে, রাজমিস্ত্রির কাজ করে কিংবা রাজ্যের বাইরে পরিযায়ী শ্রমিক হিসেবে জীবিকা নির্বাহ করে থাকে।
আবদুল মান্নানের অন্য সন্তানগণও সেই পথের পথিক। কেবলই ব্যতিক্রম কনিষ্ঠ পুত্র মুহাম্মদ রসুল। মেধাবী রসুল ছোট থেকেই সব ক্লাসেই অতুলনীয় রেজাল্ট করে থাকে। পড়াশোনায় যাতে তার ছেদ না পড়ে সেটি নিয়ে আবদুল মান্নানের সঙ্গে সঙ্গে রসুলের দাদারাও সাধ্যমত চেষ্টা করেছেন। মুর্শিদাবাদের অধিকাংশ পরিবারের ইচ্ছে থাকে ছেলেমেয়েকে আল-আমীন মিশনে পড়াবার, সেই মত রসুলও মিশনের প্রবেশিকা পরীক্ষায় পাস করে অষ্টম শ্রেণিতে ভর্তি হয়। একেবারেই নামমাত্র মাসিক ফিজে মিশনের ধুলিয়ান শাখায়। ২০১৯ সালে এখান থেকেই ৮৯ শতাংশ নম্বর পেয়ে পাস করার পর একাদশ শ্রেণির বিজ্ঞান বিভাগে মিশনের বর্ধমান শাখায় ভর্তি হয় সে। ২০২১-এ ৯০ শতাংশ নম্বর পেয়ে পাস করে।
এর পর শুরু হয় তার ছোটবেলার স্বপ্ন অর্থাৎ ডাক্তারি পড়ার ছাড়পত্র অর্জনের অদম্য প্রচেষ্টা। মিশনের খলিশানি ক্যাম্পাসে নিট-প্রস্তুতি শুরু করে সে। প্রথমবার নিটে ২০২২ সালে ৫৬৫ নম্বর পেলেও সরকারি মেডিকেল কলেজের ছাড়পত্র না হওয়ায় শুরু হয় পুনরায় কঠোর পরিশ্রম। সেই পরিশ্রম ও একাগ্রতা তাকে এনে দেয় কাঙ্খিত সাফল্য অর্থাৎ এবছর ৬৭০ নম্বর পেয়ে সর্বভারতীয় র্যা ঙ্ক হয় ২৮১৬।
রসুলের মুখেই শোনা যাক কেন সে ডাক্তার হতে চেয়েছে—‘‘আল-আমীন মিশনের ভর্তি পরীক্ষা দিতে যাওয়ার সময় শুনি মা পড়ে গিয়েছেন এবং প্যরালাইসিসে আক্রান্ত। ২০১৬ থেকে ২০১৯ পর্যন্ত এভাবেই ছিলেন তিনি। ভাল চিকিৎসা করালে হয়তো সুস্থ হয়ে জেতেন তিনি; কিন্তু আর্থিক অনটনে সেটি সম্ভব হয়নি। সেই থেকেই মাথায় আসে চিকিৎসক হতে হবে। আমি চাই উপযুক্ত চিকিৎসা ছাড়া আমাদের এলাকার কেউ যেন না মারা যান। আমার ইচ্ছে এলাকায় চেম্বার খুলে দুঃস্থ ও অসুস্থ মানুষের পরিষেবা দেওয়া।’’ উল্লেখ্য মাধ্যমিক পরীক্ষার কয়েক মাস আগে তার মা সোনাভান বিবি ইন্তেকাল করেছেন।
সম্প্রতি আব্বা আবদুল মান্নানকে সঙ্গে করে রসুল সেক্রেটারি স্যার এম নুরুল ইসলামের সঙ্গে দেখা করতে যায়। বৃদ্ধ আবদুল মান্নানের শরীর এখন বেশ নড়বড়ে; কোনওদিন কাজ করেন আবার অন্যদিন শারিরীক কারণে বাড়িতেই থাকেন। ছেলে রসুল ডাক্তার হচ্ছে এতে গোটা পরিবার ও পাড়া প্রতিবেশীর সঙ্গে তিনি খুশি হলেও বেশ চিন্তায় আছেন। কারণ ছেলে কল্যাণী এইমস্-এ এমবিবিএস পড়ার জন্যে ভর্তি হয়েছে। মেডিকেল কলেজে তার পড়াশোনা, বইপত্র ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক মাসিক খরচ কীভাবে জোগাড় করবেন সে নিয়ে বাপ-বেটার ঘুম হয় না। অগত্যা মনস্থির করা হয় ভরসার জায়গা আল-আমীনের কাছেই পুনরায় আবেদন নিয়ে হাজির হবেন।
সেই মত গতকাল সেক্রেটারি স্যারের কাছে ছেলের জন্য স্কলারশিপের আবেদন করেন তিনি। সেক্রেটারি স্যর মাসে ৩০০০ টাকা আল-আমীন মেরিট স্কলারশিপ মঞ্জুর করে পিতা-পুত্রের মুখে হাসি ফোটান। পিতা আবদুল মান্নান ও পুত্র মুহাম্মদ রসুল উভয়েই তাদের সাফল্যের সঙ্গী আল-আমীনের কথা কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করে।
প্রসঙ্গক্রমে রসুল বলল—‘‘ মিশন আমাকে পড়ার সুযোগ না দিলে কখনও এই জায়গায় আসতে পারতাম না। মুর্শিদাবাদের প্রত্যন্ত গ্রামের দিকে ছেলেরা যেভাবে বিড়ি বাঁধেন, কেউ বা রাজমিস্ত্রি বা অন্য কাজ করেন, হয়তো আমাকেও সেই কাজ করতে হত। কিন্তু মিশন যেভাবে আমাকে নামমাত্র খরচে পড়ার সুযোগ করে দিয়েছে তাতে সমগ্র আল-আমীন পরিবার বিশেষকরে এম নুরুল ইসলাম স্যারের কাছে কৃতজ্ঞ।’’