29/05/2026
ফেলুদা: "ব্যাপারটা মোটেই ভালো ঠেকছে নারে তোপসে।"
তোপসে: TET নিয়ে রায়, বলছো?
ফেলুদা: উহু, শুধু ওটা না।
তোপসে: তাহলে ?
ফেলুদা: বিদ্যাঞ্জলি প্রকল্প শুনেছিস তো?
তোপসে: হ্যাঁ তো। খুব ভালো উদ্যোগ। বিনা পারিশ্রমিকে বিদ্যালয়ে পড়াতে পারবেন যে কেউ, যেমন উচ্চশিক্ষিত যুবক-যুবতী, গৃহবধূ, অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী ও শিক্ষক, এমনকী IT সেক্টরে কাজ করা বেসরকারি কর্মীরাও। ওনারা নিজের কাজের সঙ্গে স্কুলেও পড়াতে পারবেন। আমার ইচ্ছা হলে আমিও পারব।
ফেলুদা: তাহলে যে শিক্ষক বর্তমানে ক্লাস নিচ্ছেন, তাঁর ক্লাসে ভাগ বসাতে পারবি?
তোপসে: এটা তো জানা নেই ফেলুদা। প্রথমে হয়তো অতিরিক্ত কোনো ক্লাসের জন্য আবেদন নেওয়া হবে, তারপর হয়তো মূল বিষয়েও পারব—কোনো টিচার অবসর নিলে বা চাকরি ছেড়ে দিলে?
ফেলুদা: চাকরি ছেড়ে দেবে বলছিস কেন?
তোপসে: কেন শোনোনি? ২০২৮-এর অগাস্টের মধ্যে TET পাস না করতে পারলে চাকরি নাকি ছাড়তে হবে? সুপ্রিম কোর্টের রায়। মানে কেউ যদি পঞ্চাশ বছর বয়সী হন, আর ২ বছরের মধ্যে না পারেন, তাহলে তিনিও নাকি বাধ্য চাকরি ছাড়তে?
ফেলুদা: আশা করি কেন্দ্র অর্ডিন্যান্স এনে সেটা আটকাবে। আর বোকার মতো কথা কেন বলছিস? TET না থাকার কারণে সত্যিই যদি অবসর নিতে হয়, তাহলে বিদ্যাঞ্জলিতে যারা পড়াবেন, তাঁদের সবাই কি TET পাশ?
তোপসে: হতেই পারে। অনেক TET পাশ আছেন তো।
ফেলুদা: আরও একটা প্রশ্ন ভাবাচ্ছে বুঝলি—এইভাবে সবাই যদি শিক্ষকতা বিনা পারিশ্রমিক নিয়ে শুরু করে, সাধারণ মানুষের কাছে কোন বার্তাটা পৌঁছাচ্ছে? এতে তারা কী বুঝল?
তোপসে: বুঝলাম না।
ফেলুদা: আরে, উচ্চশিক্ষিত বেকার বা বেসরকারি কর্মচারী বা অবসরপ্রাপ্ত কিন্তু পেনশনভোগী কর্মচারীরা মিলে, শিক্ষকদের কাজটা যদি করেই দেন, ১ থেকে ১২ পর্যন্ত পড়িয়েই দেন—তাহলে টিচার পদটার তেমন দরকার আর কী? স্থায়ী বেতন কেন? চাকরিটাই বা কেন? এগুলো কি কারুর কারুর চিন্তাতে আসতে পারে না?
তোপসে: সত্যিই তো ফেলুদা। এতটা তো ভেবে দেখিনি। যদিও প্রকল্পে বলা আছে বিদ্যাঞ্জলি ব্যক্তিরা স্থায়ী শিক্ষকের বিকল্প না। কিন্তু তাহলে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়গুলো যেমন বাংলা, ইংলিশ, পদার্থবিদ্যা—এসব তারা পড়াতেই বা পারেন কোন অধিকারে? TET বা SLST পাশ করেছেন? B.Ed বা সমতুল্য ট্রেনিং নিয়েছেন সবাই এরা?
আর ফেলুদা, আজকে আরও শুনলাম যে কোনো ব্যক্তি বা NGO নাকি স্কুলের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র যেমন আলমারি, কম্পিউটার, আসবাব, খাতা-কলম—মানে যা যা প্রয়োজন সব দিতে পারবেন। পোর্টালে স্কুলকে আবেদন করতে হবে শুধু। ব্যক্তি বা কোনো NGO কোম্পানি, স্কুলকে আর্থিক সহায়তা প্রদান করবে; বিভিন্ন বিল পেমেন্ট করে, সেটা ঘর তৈরি বা রঙ করার খরচ—যাই হোক, সরাসরি টেন্ডারপ্রাপকের কাছে পৌঁছে যাবে।
তোপসে: সরকার তাহলে কি আর টাকা দেবে না সরকারি খাতে?
ফেলুদা: দেবেন না, তা কি আর হয়! কিন্তু একা আর দেবে না। বাদামি লোকজন বা তুইও দিতে পারিস, যদি তোর দান করার আত্মতৃপ্তি পাওয়ার ইচ্ছা হয়। আর সেই ফাঁকে সরকারের ঘাড় থেকেও আর্থিক চাপ নেমে যায় তোর আত্মতৃপ্তির কারণে।
তোপসে: কিন্তু ফেলুদা, এত দান যদি কেউ করে তাহলে কি স্কুলের বিভিন্ন ক্লাস নেওয়ার জন্যও তার একটা অধিকারের মতোই জন্মে যাচ্ছে না? বা সিদ্ধান্ত নেওয়ার দাবিদার উনি কি হয়ে উঠছেন না?
ফেলুদা: নিয়মে তো পারেন না।
কিন্তু মনস্তাত্ত্বিক একটা প্রভাব কাজ করেই ঘাড়ের ওপর। আর হ্যাঁ, NGO টাকা দিলে ট্যাক্স ছাড় পায়। আসবাব দিলে কোম্পানির লোগো দেখতে দেখতে ছাত্রছাত্রী ভবিষ্যতে ওই জিনিসই কিনবে। বিজ্ঞাপনও হলো, ট্যাক্স ছাড়ও হলো।
তোপসে: আবার ২০১৬-ও বাতিল? ফ্রেশ সিলেকশন নিয়ে এখনো ধন্ধ। অগাস্ট পর্যন্তই চাকরি। ২০২৫ নিয়ে জটিলতা বাড়লে যদি নিয়োগে দেরি হয় আর কোর্ট কেসগুলো চলতে থাকে, তাহলে ২০১৬-এর এক্সটেনশন না হলে তো শিক্ষাব্যবস্থা ভেঙে পড়বে!
ফেলুদা: এক্সটেনশনই হয়তো হবে, যদি না ২০২৫-এর এই নিয়োগ নিয়ে জটিলতা বাড়ে। ওই উকিলবাবুই তো বললেন সেদিন। ওই যে আমিন বাবু।
তোপসে: কিন্তু এরপর?
ফেলুদা: সেটাই তো। আমার বিশ্বাস যে "যোগ্য"রা শাস্তি পাবে না। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির কারণে সরকারি ভ্রান্তির কোনো কোপ, আমার সৎ পথে পাওয়া চাকরির উপর পড়তে পারে না। এটা হতে দেওয়া যায় না। এটা মেনেও নেওয়া যায় না।
এটা বর্তমান শিক্ষক সমাজ যত তাড়াতাড়ি বুঝে সবাই সবার পাশে যত দ্রুত দাঁড়াবেন, ততই মঙ্গল। সেটা ২০১৬ হোক, বা আসতে চলা ৩১০০০, বা বাধ্যতামূলক TET।
কেক কাটাকাটি করলে, শেষে সবাই কাটাকুটি।
তোপসে: হুম।
ফেলু: আর ওই যে বিদ্যাঞ্জলি—খুব ভাবাচ্ছে রে তোপসে।
মানুষ যদি ভেবেই নেয় যে "শিক্ষক" যে কেউই হয়ে যেতে পারেন... কিন্তু সবাই কি আর শিক্ষক হয়ে উঠতে পারেন রে?