SK Safi Uddin

SK Safi Uddin শিক্ষা বিষয়ক ওয়েবসাইট

22/08/2026
16/08/2026

রবিউল আউয়াল: করণীয় ও বর্জনীয়

ইসলামী হিজরি সনের তৃতীয় মাস রবিউল আউয়াল। বিশ্বনবী রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর পবিত্র জীবনের বহু ঐতিহাসিক ও গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতি এ মাসের সঙ্গে জড়িত। তবে এ মাসকে কেন্দ্র করে শরিয়তে বিশেষ কোনো ইবাদত বা আনুষ্ঠানিকতা নির্ধারিত হয়নি। নবীজি ﷺ-এর প্রতি ভালোবাসার প্রকৃত প্রমাণ হলো তাঁর সুন্নাহ অনুসরণের মাধ্যমে জীবনকে আলোকিত করা। তাই এ মাসে সীরাত অধ্যয়ন, নিয়মিত দরুদ পাঠ, সোমবারে নফল রোজা রাখা, পরিবারকে সুন্নাহ শিক্ষা দেওয়া এবং বেশি বেশি তওবা-ইস্তিগফার করা যেতে পারে।

অপরদিকে, শরিয়তে ভিত্তিহীন কোনো আমলকে সওয়াবের কাজ মনে করা, 'ঈদে মিলাদুন্নবী'কে নির্দিষ্ট ধর্মীয় উৎসব বানানো, রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর প্রশংসায় সীমালঙ্ঘন করা, অপচয়-আলোকসজ্জা, বানোয়াট ভিত্তিহীন ঘটনা প্রচার কিংবা এ মাসকে অশুভ মনে করা থেকে বিরত থাকা আবশ্যক।

রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে ভালোবাসা কেবল একটি মাসের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা পুরো জীবনের অঙ্গীকার। লোকদেখানো প্রথার বদলে তাঁর সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরাই মুমিনের মূল সাফল্য।

ইসলামী হিজরি সনের তৃতীয় মাস হলো রবিউল আউয়াল। এ মাসের সঙ্গে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর পবিত্র জীবনের বহু গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতি ও ঘটনা জড়িত। বিশেষ করে বিশ্বনবী ﷺ-এর পবিত্র জন্ম ও ইন্তেকালের ঘটনা এ মাসের আলোচনায় বিশেষভাবে উঠে আসে।

তবে এ মাসকে কেন্দ্র করে কোনো বিশেষ আনুষ্ঠানিকতা শরিয়ত কর্তৃক নির্ধারিত হয়নি। একজন মুমিনের জন্য কোনো মাস বা বিশেষ দিনকে কেন্দ্র করে আমল করার মূলনীতি হলো, কুরআন ও গ্রহণযোগ্য হাদিসে যার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ রয়েছে, সেটিই গ্রহণ করা; আর যার শরয়ী প্রমাণ নেই, সেটিকে দ্বীনের বিশেষ আমল বা সওয়াবের মাধ্যম হিসেবে উদ্ভাবন না করা।

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা সুনির্দিষ্টভাবে নির্দেশ দিয়েছেন:

لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ

অর্থ: নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য রাসূলুল্লাহর মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ।

[সূরা আল-আহযাব: ২১]

রবিউল আউয়াল মাসে আলাদা কোনো বিশেষ ইবাদতের পদ্ধতি নেই। বছরের অন্যান্য দিনের মতো এ মাসের দিনগুলোও স্বাভাবিক ইবাদত-বন্দেগীতে অতিবাহিত করাই ইসলামসম্মত পদ্ধতি। অতএব, এ মাসকে কেন্দ্র করে আমাদের মূল কর্তব্য হলো রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সুন্নাহ জানা, তাঁর আদর্শ অনুসরণ করা, তাঁর প্রতি ভালোবাসা বৃদ্ধি করা এবং তাঁর নির্দেশিত জীবনব্যবস্থা বাস্তবায়ন করা। সে হিসেবে চাইলে নিচের আমলগুলো বেশি বেশি করা যেতে পারে।

রবিউল আউয়ালের করণীয়
১. রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সুন্নাহ ও আদর্শের অনুসরণ করা

রবিউল আউয়ালের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ করণীয় হলো রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সুন্নাহ জানা, শেখা এবং অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করা।

আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانْتَهُوا

অর্থ: রাসূল তোমাদের যা দেন তা গ্রহণ করো এবং যা থেকে নিষেধ করেন তা থেকে বিরত থাকো।

[সূরা আল-হাশর: ৭]

অপর আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন:

قُلۡ اِنۡ کُنۡتُمۡ تُحِبُّوۡنَ اللّٰہَ فَاتَّبِعُوۡنِیۡ یُحۡبِبۡکُمُ اللّٰہُ وَیَغۡفِرۡ لَکُمۡ ذُنُوۡبَکُمۡ ؕ وَاللّٰہُ غَفُوۡرٌ رَّحِیۡمٌ

অর্থ: (হে নবী! মানুষকে) বলে দাও, তোমরা যদি আল্লাহকে ভালোবেসে থাক, তবে আমার অনুসরণ কর, তাহলে আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন এবং তোমাদের পাপরাশি ক্ষমা করবেন। আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।

[সূরা আল-ইমরান: ৩১]

তাই রবিউল আউয়ালে সুন্নাহ অনুসরণের গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করা, পরিবারকে সুন্নাহ শেখানো এবং নিজের জীবনে সুন্নাহ বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর প্রতি ভালোবাসার প্রকৃত দাবি হলো তাঁর জীবন ও সুন্নাহকে অনুসরণ করা। তাই রবিউল আউয়াল আমাদের জন্য শুধু কোনো ঐতিহাসিক ঘটনা স্মরণ করার মাস নয়; বরং রাসূল ﷺ-এর আদর্শকে নিজেদের জীবনে বাস্তবায়নের একটি সুযোগ।

২. প্রতি সোমবারে রোজা রাখা

রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর জন্ম স্মরণে শুকরিয়া স্বরূপ প্রতি সপ্তাহের সোমবারে রোজা রাখতেন। হাদিসে এসেছে, তাঁকে সোমবারের রোজা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন:

قَالَ وَسُئِلَ عَنْ صَوْمِ يَوْمِ الاِثْنَيْنِ قَالَ ذَاكَ يَوْمٌ وُلِدْتُ فِيهِ وَيَوْمٌ بُعِثْتُ أَوْ أُنْزِلَ عَلَىَّ فِيهِ

অর্থ: অতঃপর সোমবারের রোযা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বললেন, এই দিন আমি জন্মগ্রহণ করেছি এবং এই দিনই আমি নবুওয়াত প্রাপ্ত হয়েছি বা আমার উপর (কুরআন) নাযিল করা হয়েছে।

[সহিহ মুসলিম, ১১৬২]

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় লক্ষণীয়—রাসূল ﷺ তাঁর জন্মের কথা স্মরণ করার ক্ষেত্রে কোনো বার্ষিক জন্মোৎসবের পদ্ধতি শিক্ষা দেননি; বরং সোমবার রোজা রাখার মাধ্যমে আল্লাহর ইবাদত করেছেন।

সুতরাং কেউ যদি রবিউল আউয়ালে রাসূল ﷺ-এর জন্মের কথা স্মরণ করে তাঁর সুন্নাহ অনুসারে সারা বছর বা নিয়মিত না পারলেও মাঝে মাঝে, কমপক্ষে রবিউল আউয়াল মাসের সোমবার রোজা রাখতে চান, তা সুন্নাহসম্মত নফল আমল হবে। তবে রবিউল আউয়ালের সোমবারগুলোকে শরিয়ত কর্তৃক নির্ধারিত বিশেষ ফজিলতের দিন মনে করা যাবে না।

৩. বেশি বেশি দরুদ শরিফ পড়া

রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর ওপর দরুদ পাঠ করা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ আমল।

আল্লাহ তাআলা বলেন:

إِنَّ اللَّهَ وَمَلَائِكَتَهُ يُصَلُّونَ عَلَى النَّبِيِّ ۚ يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا صَلُّوا عَلَيْهِ وَسَلِّمُوا تَسْلِيمًا

অর্থ: নিশ্চয়ই আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতারা নবীর ওপর দরুদ পাঠান। হে মুমিনগণ! তোমরাও তাঁর ওপর দরুদ ও সালাম পাঠ করো।

[সূরা আল-আহযাব: ৫৬]

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

مَنْ صَلَّى عَلَيَّ وَاحِدَةً صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ بِهَا عَشْرًا

অর্থ: যে ব্যক্তি আমার ওপর একবার দরুদ পাঠ করে, আল্লাহ তার ওপর দশবার রহমত নাজিল করেন।

[সহিহ মুসলিম, ৪০৮]

অতএব রবিউল আউয়ালসহ সারা বছরই বেশি বেশি দরুদ পাঠ করা উচিত।

৪. রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সীরাত অধ্যয়ন করা

এই মাসে বিশেষভাবে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর জীবন, চরিত্র, দাওয়াত, ধৈর্য, ইবাদত, পরিবার পরিচালনা, সাহাবাদের সঙ্গে আচরণ এবং উম্মতের প্রতি তাঁর মমতা সম্পর্কে পড়াশোনা করা যেতে পারে।

আল্লাহ বলেন:

لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ

অর্থ: নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য রাসূলুল্লাহর মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ।

[সূরা আল-আহযাব: ২১]

সীরাত পাঠের উদ্দেশ্য শুধু ইতিহাস জানা নয়; বরং রাসূল ﷺ-এর জীবন থেকে নিজের জীবন পরিবর্তনের শিক্ষা গ্রহণ করা।

৫. রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর চরিত্র অনুসরণ করা

রাসূলুল্লাহ ﷺ ছিলেন উত্তম চরিত্রের সর্বোত্তম আদর্শ।

আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَإِنَّكَ لَعَلَىٰ خُلُقٍ عَظِيمٍ

অর্থ: নিশ্চয়ই আপনি মহান চরিত্রের অধিকারী।

[সূরা আল-কলম: ৪]

তাই রাসূল ﷺ-এর প্রতি ভালোবাসার অর্থ শুধু তাঁর প্রশংসা করা নয়; বরং তাঁর চরিত্র নিজের জীবনে বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করা উচিত।

আমরা তাঁর কাছ থেকে শিখতে পারি, সত্যবাদিতা, আমানতদারি, নম্রতা, ক্ষমা, ধৈর্য, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা, প্রতিবেশীর হক আদায়, গরিব-দুঃখীর প্রতি দয়া, স্ত্রী-সন্তানের সঙ্গে উত্তম আচরণ, মানুষের কষ্ট দূর করা ইত্যাদি মহৎগুণ।

রবিউল আউয়ালকে কেন্দ্র করে এসব গুণ অর্জনের সংকল্প করা যেতে পারে।

৬. পরিবারকে রাসূল ﷺ-এর সুন্নাহ শিক্ষা দেওয়া

একজন মুসলমান শুধু নিজে সুন্নাহ পালন করলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। নিজের পরিবারকেও দ্বীনের শিক্ষা দেওয়া তার দায়িত্ব।

আল্লাহ তাআলা বলেন,

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا قُوا أَنْفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَارًا

“হে মুমিনগণ! তোমরা নিজেদের এবং নিজেদের পরিবারকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করো।”

[সূরা আত-তাহরীম, ৬]

তাই এ মাসে পরিবারে ছোট পরিসরে সীরাত পাঠের আসর করা, সন্তানদের রাসূল ﷺ-এর জীবন থেকে ঘটনা শোনানো এবং দৈনন্দিন সুন্নাহ শেখানো যেতে পারে।

৭. নফল ইবাদত ও তওবা-ইস্তিগফার বৃদ্ধি করা

রবিউল আউয়ালকে কেন্দ্র করে নতুন কোনো বিশেষ ইবাদত আবিষ্কার না করে শরিয়তে প্রমাণিত সাধারণ নেক আমলগুলো বেশি বেশি করা উচিত।

যেমন—

পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ জামাতের সঙ্গে আদায় করা।

তাহাজ্জুদ পড়া।

কুরআন তিলাওয়াত করা।

যিকির-আযকার করা।

তওবা ও ইস্তিগফার করা।

নফল রোজা রাখা।

সদকা করা।

আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা।

গরিব-দুঃখীর সাহায্য করা।

গুনাহ থেকে বিরত থাকা। ইত্যাদি আমল বেশি করা যেতে পারে।

রবিউল আউয়ালে বর্জনীয় বিষয়

শরিয়তে প্রমাণিত নয় এমন কোনো বিষয়কে ইবাদত বা দ্বীনের অংশ মনে করে সওয়াবের নিয়তে করা জায়েজ হবে না। তা বিদআত হিসেবে অগ্রহণযোগ্য ও পরিত্যাজ্য বলে গণ্য হবে । শরীয়াতে কোনো ইবাদত নিজের ইচ্ছামতো নির্ধারণ করা যায় না।

হাদীসে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

مَنْ أَحْدَثَ فِي أَمْرِنَا هَذَا مَا لَيْسَ فِيهِ فَهُوَ رَدٌّ

অর্থ: যে ব্যক্তি আমাদের এ দ্বীনের মধ্যে এমন কিছু নতুন সৃষ্টি করবে, যা এর অন্তর্ভুক্ত নয়, তা প্রত্যাখ্যাত।

[সহিহ বুখারি, ২৬৯৭; সহিহ মুসলিম, ১৭১৮]



অন্য বর্ণনায় এসেছে:

مَنْ عَمِلَ عَمَلًا لَيْسَ عَلَيْهِ أَمْرُنَا فَهُوَ رَدٌّ

অর্থ: যে ব্যক্তি এমন কোনো আমল করবে, যার ওপর আমাদের নির্দেশ নেই, তা প্রত্যাখ্যাত।

[সহিহ মুসলিম, ১৭১৮]

অতএব কোনো আমলকে নির্দিষ্ট সময়, নির্দিষ্ট সংখ্যা বা বিশেষ ফজিলতসহ দ্বীনের অংশ হিসেবে গ্রহণ করার আগে গ্রহণযোগ্য দলিল আছে কিনা তা জেনেই আমল করা উচিত।

রবিউল আউয়াল মাসে আমাদের সমাজে এমন কিছু আমল প্রচলিত আছে যা গ্রহণযোগ্য নয়। এ জাতীয় আমল পরিহার করা আবশ্যক। নিচে এমন কিছু বর্জনীয় বিষয় উল্লেখ করা হলো—

১. ঈদে মিলাদুন্নবী পালন করা

রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর প্রতি ভালোবাসা অবশ্যই ঈমানের দাবি। কিন্তু তাঁর জন্মদিনকে প্রতিবছর একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় উৎসব বা ঈদ হিসেবে পালন করা জায়েজ নয়। বরং তা বিদআত হিসেবে পরিহার করা আবশ্যক। কোনো দিনকে শরীয়াতের দৃষ্টিভঙ্গিতে ঈদ বা উৎসব হিসেবে পালন করতে হলে অবশ্যই তা দলিল দ্বারা প্রমাণিত হতে হবে। আর শরীয়াতে ঈদ হিসেবে শুধু দুই ঈদ তথা ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা স্বীকৃত। তাই অন্য দিনকে শরয়ী ভাবে সওয়াবের আশায় ঈদ পালন করা জায়েজ নয়।

হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ মদিনায় এসে দেখলেন, লোকেরা দুটি দিন আনন্দ-উৎসব পালন করে। তিনি বললেন:

إِنَّ اللَّهَ قَدْ أَبْدَلَكُمْ بِهِمَا خَيْرًا مِنْهُمَا يَوْمَ الْأَضْحَى وَيَوْمَ الْفِطْرِ

অর্থ: আল্লাহ তোমাদেরকে ঐ দুই দিনের পরিবর্তে তার চেয়ে উত্তম দুটি দিন দিয়েছেন—কুরবানির দিন এবং ঈদুল ফিতরের দিন।

[সুনান আবু দাউদ, ১১৩৪]

এ থেকে বোঝা যায়, মুসলমানদের জন্য শরিয়ত নির্ধারিত ধর্মীয় ঈদ হলো ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা। সুতরাং রাসূল ﷺ-এর জন্মকে ভালোবাসা এক বিষয়, আর কোনো নির্দিষ্ট তারিখকে শরিয়ত-নির্ধারিত ধর্মীয় উৎসব বানানো আরেক বিষয়।

জন্মদিন/মৃত্যুবার্ষিকী পালন করা শরীয়াতে স্বীকৃত নয়। বরং কাফির-মুশরিকদের কাছ থেকে এ অপসংস্কৃতি মুসলমানদের মাঝে অনুপ্রবেশ হয়েছে। ইসলামের কোথাও জন্মবার্ষিকী/মৃত্যুবার্ষিকী পালন করা শেখানো হয়নি। যদি রাসূল ﷺ-এর জন্মদিন/মৃত্যুবার্ষিকী পালন করা পছন্দনীয় আমল হতো তাহলে রাসূল ﷺ কে সবচেয়ে বেশি যাঁরা ভালোবেসেছেন, যাঁরা তাঁর ভালোবাসায় নিজেদের জীবন বিলিয়ে দিতে বিন্দুমাত্র কুণ্ঠাবোধ করেননি অর্থাৎ রাসূল ﷺ-এর প্রিয় সাহাবায়ে কেরাম; তারা অবশ্যই খুব আগ্রহের সাথে তা পালন করতেন। অথচ সাহাবা, তাবেয়ীন, তাবে তাবেয়ীনের কোনো যুগে এ আমল ছিল না। ইসলামের স্বর্ণালী যুগের আমল শরীয়াতে দলিল হিসেবে গ্রহণযোগ্য; তাদের মধ্যে যে আমল ছিল না তা সওয়াবের নিয়তে করা এমন উদ্ভাবন বিদআত এবং সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যাত।

তাছাড়াও ১২ রবিউল আউয়াল দিনটি যদি রাসূল ﷺ-এর জন্মদিন হিসেবে ঈদে মিলাদুন্নবী পালন করা হয়, অথচ এদিন রাসূল ﷺ-এর জন্ম তারিখ হওয়ার ব্যাপারে ঐতিহাসিকদের মাঝে ব্যাপক মতভেদ রয়েছে। কেউ বলেছেন: ২ রবিউল, কেউ বলেছেন: ৮ রবিউল, কেউ বলেছেন: ৯ রবিউল, কেউ বলেছেন: ১০ রবিউল, কেউ বলেছেন: ১১ রবিউল, কেউ বলেছেন: ১২ রবিউল, কেউ বলেছেন: ১৭ রবিউল, কেউ বলেছেন: ১৮ রবিউল, কেউ বলেছেন: ২২ রবিউল। এমনকি কেউ কেউ বলেন: তিনি জন্মগ্রহণ করেছেন রমযান মাসে, কারো কারো মতে সফর মাসে; ইত্যাদি আরও অভিমত রয়েছে।

আল্লামা জাহেদ কাউছারী (রহ.) বলেন, ৮, ৯ ও ১০ এই তিন মতামত ব্যতীত অন্যান্য মতামত গ্রহণযোগ্য নয়। অনেক ঐতিহাসিকদের মতে যুক্তির আলোকে ৯ রবিউল আউয়াল বেশি গ্রহণযোগ্য। সুতরাং ১২ রবিউল আউয়ালকে নির্দিষ্ট করে জন্মদিন পালন করা কিভাবে যথাযথ হতে পারে?

অপরদিকে রাসূল ﷺ ১১ হিজরীর রবিউল আউয়াল মাসের গ্রহণযোগ্য মত অনুযায়ী ১২ তারিখ ইন্তেকাল করেন। যদিও জন্মদিন/মৃত্যুবার্ষিকী পালন করা জায়েজ নয়, তারপরেও যদি পালন করি তাহলে একজন মুসলমান কিভাবে ১২ রবিউল আউয়াল, যে দিন রাসূল ﷺ ইহজগত ত্যাগ করেছেন, সে দিনকে আনন্দময় ঈদ হিসেবে উদযাপন করতে পারে?

২. রাসূল ﷺ-এর প্রশংসায় সীমালঙ্ঘন না করা

রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর মর্যাদা সর্বোচ্চ। কিন্তু তাঁর প্রশংসা করতে গিয়ে এমন কোনো কথা বলা যাবে না যা শরিয়তসম্মত নয়। প্রশংসায় এমন কোনো কথা বলা যা তাঁর বান্দা ও রাসুল হওয়ার মর্যাদাকে অতিক্রম করে আল্লাহর গুণাবলীর সাথে সাংঘর্ষিক হয়, তা বর্জনীয়।

রাসূলুল্লাহ ﷺ নিজেই বলেছেন:

لاَ تُطْرُونِي، كَمَا أَطْرَتْ النَّصَارَى ابْنَ مَرْيَمَ، فَإِنَّمَا أَنَا عَبْدُهُ، فَقُولُوا عَبْدُ اللَّهِ، وَرَسُولُهُ

অর্থ: তোমরা আমার প্রশংসা করতে গিয়ে অতিরঞ্জিত করো না, যেমন ঈসা ইবনে মারইয়াম (আলাইহিস সালাম) সম্পর্কে খ্রিস্টান অতিরঞ্জিত করেছিল। আমি তাঁর (আল্লাহর) বান্দা, বরং তোমরা আমার সম্পর্কে বলবে, আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল।

[সহিহ বুখারি, ৩৪৪৫]

অতএব রাসূল ﷺ-কে আল্লাহর বান্দা ও রাসূল হিসেবে সর্বোচ্চ ভালোবাসা ও সম্মান করতে হবে। কিন্তু ভালোবাস প্রকাশে অতিরঞ্জন করে তাঁকে আল্লাহর কোনো বিশেষ গুণে শরিক করে ফেলা যাবে না। এ বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।

৩. রাসূল ﷺ-এর জন্মদিন উপলক্ষে আলোকসজ্জা

রাসূল ﷺ-এর জন্মদিন উপলক্ষে ঘরবাড়ি বা রাস্তাঘাটে ব্যাপক আলোকসজ্জা করা হয়, যা অপচয়ের শামিল। কুরআন মাজিদে বলা হয়েছে:

وَلَا تُبَذِّرۡ تَبۡذِیۡرًا اِنَّ الۡمُبَذِّرِیۡنَ کَانُوۡۤا اِخۡوَانَ الشَّیٰطِیۡنِ

অর্থ: আর নিজেদের অর্থ-সম্পদ অপ্রয়োজনীয় কাজে উড়াবে না। জেনে রেখ, যারা অপ্রয়োজনীয় কাজে অর্থ উড়ায়, তারা শয়তানের ভাই।

[সূরা আল-ইসরা: ২৬-২৭]

৪. এ মাসকে অশুভ মনে করা

অনেকে মনে করেন নবীজি (সা.)-এর ওফাত হওয়ায় এ মাসটি অশুভ বা শোকের মাস, তাই বিয়ে-শাদি বা নতুন কাজ করা থেকে বিরত থাকেন। ইসলামে কোনো দিন বা মাস অশুভ নয়।

হাদীসে এসেছে, রাসূল ﷺ বলেছেন:

لاَ عَدْوَى وَلاَ طِيَرَةَ وَلاَ هَامَةَ وَلاَ صَفَرَ

অর্থ: রোগের কোন সংক্রমণ নেই, কুলক্ষণ বলতে কিছু নেই, পেঁচা অশুভের প্রতীক নয়, সফর মাসের কোন অশুভ নেই।

[সহীহ বুখারী, ৫৭০৭]

৫. রাসূল ﷺ-এর নামে দুর্বল বা বানোয়াট ঘটনা প্রচার না করা

রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর প্রতি ভালোবাসার কারণে অনেক সময় তাঁর জীবনী সম্পর্কে বিভিন্ন ঘটনা প্রচার করা হয়। কিন্তু সেগুলোর সবগুলো সহিহ নয়।

রাসূল ﷺ-এর নামে কোনো কথা বলার ক্ষেত্রে অত্যন্ত সতর্ক হওয়া জরুরি। কারণ মিথ্যা কথা রাসূল ﷺ-এর দিকে সম্বন্ধ করা অত্যন্ত ভয়াবহ অপরাধ।

তাই সীরাত মাহফিল, আলোচনা বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো ঘটনা প্রচারের আগে তার উৎস ও গ্রহণযোগ্যতা যাচাই করা উচিত।

বিশেষত রাসূল ﷺ-এর জন্ম, শৈশব, মিরাজ, মুজিজা ও ইন্তেকাল সম্পর্কিত এমন অনেক কাহিনি মানুষের মধ্যে প্রচলিত রয়েছে, যেগুলোর সবগুলো নির্ভরযোগ্য নয়।

উপসংহার

রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর প্রতি ভালোবাসা একজন মুমিনের হৃদয়ের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। তাঁর প্রতি ভালোবাসা ছাড়া ঈমান পূর্ণ হয় না। কিন্তু এই ভালোবাসা শুধু মুখের দাবি নয়; বরং তাঁর সুন্নাহ অনুসরণ, তাঁর আদর্শ গ্রহণ এবং তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে সেই ভালোবাসার সত্যতা প্রমাণ করতে হয়।

সবশেষে মনে রাখতে হবে—

রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে ভালোবাসা শুধু রবিউল আউয়ালের বিষয় নয়; বরং একজন মুমিনের পুরো জীবনের বিষয়।

আমরা যেন শুধু তাঁর জন্মের আলোচনা না করি; বরং তাঁর সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরি।

আমরা যেন শুধু তাঁর প্রশংসা না করি; বরং তাঁর আদর্শ অনুসরণ করি।

আমরা যেন শুধু তাঁর প্রতি ভালোবাসার দাবি না করি; বরং তাঁর আনুগত্যের মাধ্যমে সেই ভালোবাসার সত্যতা প্রমাণ করি।

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা প্রদর্শনের সর্বোত্তম মাধ্যম হলো তাঁর রেখে যাওয়া সুন্নাতকে লালন করা এবং জীবন থেকে বিদআত ও কুসংস্কার দূর করা। তাই লোকদেখানো আনুষ্ঠানিকতার চেয়ে রাসুল ﷺ-এর জীবনকে নিজের চালচলন ও চরিত্রে ধারণ করাই রবিউল আউয়ালের প্রকৃত শিক্ষা।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর প্রকৃত ভালোবাসা, তাঁর সুন্নাহর অনুসরণ এবং কিয়ামতের দিন তাঁর শাফাআত লাভের তাওফিক দান করুন।

آمِين يَا رَبَّ الْعَالَمِينَ

15/08/2026

Happy Independence Day ���

15/08/2026

Dampur DVC Bridge

13/08/2026

যেমন রমাজানের দান অন্যান্য মাসের তুলনায় অধিক মর্যাদাপূর্ণ, তেমনি জুম্মার দিনের দানও অন্যান্য দিনের চেয়ে বিশেষ ফজিলতপূর্ণ।

13/08/2026

যেমন রমাজানের দান অন্যান

13/08/2026

শুক্রবার দিন ও রাত-- উভয় সময়ে অধিক পরিমাণে দরুদ শরীফ পাঠ করা, সদকা করা এবং সৎকর্মে মনোনিবেশ করা সুন্নাত।

আমাদের গ্রামের শেষ জলসার কাগজ পুরাতন বইয়ের ভেতর থেকে খুঁজে পেলাম আজ।।
10/08/2026

আমাদের গ্রামের শেষ জলসার কাগজ পুরাতন বইয়ের ভেতর থেকে খুঁজে পেলাম আজ।।

Address

Pandua

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when SK Safi Uddin posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Shortcuts

Share