15/08/2024
নমস্কার,
প্রধান শিক্ষক মহোদয়/মহোদয়া, সম্মানিত শিক্ষক ও শিক্ষিকা বৃন্দ, এবং আমার প্রিয় ছাএছাএী সবাইকে ৭৮তম স্বাধীনতা দিবসের আন্তরিক শুভেচ্ছা। এই বিশেষ দিনে আমাকে আপনাদের সামনে কিছু কথা বলার সুযোগ দেওয়ার জন্য আপনাদের সকলকে ধন্যবাদ।
১৯৪৭ সালের ১৪ই আগস্ট রাতে, যখন রাত বারোটা বাজতে আর কিছুই বাকি ছিল না, তখন জহরলাল নেহেরু তাঁর বিখ্যাত বক্তৃতা শুরু করেন এই লাইন দিয়ে: “মধ্যরাতের ঘণ্টার ধ্বনিতে, যখন পুরো পৃথিবী ঘুমিয়ে থাকে, ভারত জীবন ও স্বাধীনতার অভ্যুদয় ঘটবে।” এরপরই মধ্যরাতের ঘণ্টা বেজে ওঠে, আর ভারতীয় মাটিতে শুরু হয় নতুন একটি অধ্যায়। ১৫ই আগস্ট সকালে গণপরিষদে রাষ্ট্রীয় যাত্রা শুরু হয়, এবং সারা ভারতবর্ষে উত্তোলিত হয় জাতীয় পতাকা। ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট ২০০ বছরের ব্রিটিশ শাসনের পর, ভারত একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এই মুক্তির পেছনে অনেক বীরের আত্মবলিদান রয়েছে, যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, মহাত্মা গান্ধী, ভগত সিং, রাজগুরু, ক্ষুদিরাম বসু, মাস্টার দা সূর্য সেন, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, মাতঙ্গিনী হাজরা, এবং জহরলাল নেহেরু। তাঁদের আত্মবলিদানের জন্য আমরা কৃতজ্ঞ এবং তাঁদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই।
আজকের এই মহান দিনে, ভারতের স্বাধীনতার ইতিহাসের কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরতে চাই:
১৭ শতাব্দীর শুরু থেকে ইংরেজরা ভারতে আসতে শুরু করে, তখন ভারতে মোঘল শাসন চলছিল। যদিও তারা বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে এসেছিল, কিন্তু তাদের আসল লক্ষ্য ছিল সম্পত্তি লুট করা। পলাশী ও বক্সারের যুদ্ধে জয়লাভের পর, ভারতে ইংরেজ শাসনের সূচনা হয় এবং ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনের মাধ্যমে শোষণ শুরু হয়। ভারতীয়দের শোষণ করে ইংরেজরা ধীরে ধীরে ধনী হতে থাকে, আর অত্যাচার বেড়ে যায়। মঙ্গল পান্ডের নেতৃত্বে সিপাহী বিদ্রোহ শুরু হয়, তবে বিদ্রোহ ব্যর্থ হলে মঙ্গল পান্ডকে ফাঁসি দেওয়া হয়।
১৮৮৫ সালে ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস প্রতিষ্ঠিত হয়, যা ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রাণস্বরূপ হয়ে ওঠে। সেই সময় পশ্চিমবঙ্গের বহু যুবক “বন্দেমাতরম” ধ্বনি উচ্চারণ করতে থাকে। বাংলায় ব্রিটিশ বিরোধী মনোভাব তীব্র হলে লর্ড কার্জন বাংলাকে বিভক্ত করার সিদ্ধান্ত নেন। এই বিভাজন বিরোধী বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন শুরু হয় এবং সাহসী বিপ্লবীরা যেমন ক্ষুদিরাম বসু, প্রফুল্ল চাকী, বিনয়-বাদল-দীনেশ ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়াই করেন।
১৯১১ সালে বাংলায় ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের তীব্রতা বেড়ে গেলে ইংরেজরা কলকাতা থেকে দিল্লিতে রাজধানী স্থানান্তরিত করে। আন্দোলন দমন করতে রাওলাট আইন পাস করা হয়, যার ফলে গ্রেফতার শুরু হয় বিনা বিচারে। ১৩ই এপ্রিল অমৃতসরের জালিয়ানওয়ালাবাগে ব্রিটিশ সরকারের গুলিতে বহু মানুষ নিহত হয়, যার প্রতিবাদে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নাইট উপাধি ত্যাগ করেন।
১৯২৫ সালে কাকরি ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে হিন্দুস্তান রিপাবলিকান এসোসিয়েশনের প্রতিনিধিরা ইংরেজদের কাছ থেকে টাকা লুট করেন। ১৯২৯ সালে কংগ্রেস পূর্ণ স্বাধীনতার সিদ্ধান্ত নেয় এবং ৩১শে ডিসেম্বর নেহেরু লাহোরে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন। ২৬শে জানুয়ারি ১৯৩০ সালে প্রথম স্বাধীনতা দিবস পালন করা হয়, যদিও ব্রিটিশ সরকার এটি স্বীকৃতি দেয়নি। পরবর্তীতে আইন অমান্য আন্দোলনের ডাক দেওয়া হয় এবং কংগ্রেস পার্টিকে অবৈধ ঘোষণা করা হয়। গান্ধীজি ১৯৩৩ সালে জেল থেকে মুক্তি পান।
এরপর সত্যাগ্রহ আন্দোলন শুরু হয় এবং নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর নেতৃত্বে আজাদ হিন্দ ফৌজ গঠিত হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আজাদ হিন্দ বাহিনী দুর্বল হয়ে পড়ে, কিন্তু তাঁর লড়াকু মনোভাব আজও আমাদের অনুপ্রাণিত করে।
১৯৪২ সালে গান্ধীজি ভারত ছাড়ো আন্দোলন শুরু করেন এবং ৯ই আগস্ট তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। তবে আন্দোলন থামেনি; আন্দোলনকারীরা মৃত্যুভয় উপেক্ষা করে লড়াই চালিয়ে যায়। ১৯৪৬ সালে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ একটি মুসলিম রাষ্ট্র গঠনের প্রস্তাব দেন, যার ফলে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হয়। এই দাঙ্গা শান্ত করতে পাকিস্তানের জন্ম হয় এবং ১৫ই আগস্ট মধ্যরাতে ভারত স্বাধীন হয়।
আজকের এই মহান দিনে, দিল্লির লাল কেল্লা থেকে শুরু করে সব অফিস, বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে জাতীয় পতাকা উত্তোলিত হচ্ছে। নানা ভাষা, ধর্ম ও বর্ণের দেশ ভারতবর্ষে বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য বিরাজমান। আমরা শপথ গ্রহণ করি, আমাদের দেশের স্বাধীনতা, অখণ্ডতা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় পতাকার সম্মান রক্ষার জন্য সদা প্রস্তুত থাকব