01/03/2020
রক্ত রাঙা পাপ
______ রশীদ জামীল
নরেন্দ্র মোদী ভারতবর্ষের ইতিহাস জানেন না, নাকি ইচ্ছাকরেই ভুলে থাকতে চান- প্রশ্ন সেখানে নয়। প্রশ্ন হচ্ছে তিনি যে পথে হাঁটছেন, সেই পথ কোথায় গিয়ে শেষ হচ্ছে?
গোজরাতের কলংক বয়ে বেড়ানো নরেন্দ্র দামোদারদাস মোদী মুসলমানের শত্রু কি না- প্রশ্ন আপাতত সেটাও নয়। প্রশ্ন হলো, তিনি ভারতের বন্ধু কি না!
কেউ চিরদিন রাষ্ট্র ক্ষমতায় থাকে না। নরেন্দ্র মোদীও থাকবেন না। একদিন সরে যেতে হবে। কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষতার ধ্বজাধরে সাম্প্রদায়িকতার বিষচাষ করে চলা মোদী এণ্ড কোম্পানি ভারতকে যে জাহান্নাম বানিয়ে দিয়ে যাচ্ছেন, ভবিষ্যতের ভারত সেই জাহান্নাম থেকে মুক্ত হবে কীভাবে?
ভারতে যারা শান্তিপ্রিয় মানুষ, যাদের মধ্যে মুসলমান আছেন, হিন্দু আছেন, অন্যান্য সম্প্রদায়ের মানুষ আছেন, তাঁরা এই বিষ উগলে আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসবে কেমন করে?
২
ভারতের কিছু উগ্র হিন্দু সন্ত্রাসীরা মসজিদে আগুন দিচ্ছে। মসজিদের মিনার ভেঙে ফেলছে। মুসলমানদের রাস্তায় ফেলে পেঠাচ্ছে। হত্যা করছে। অবাক হবার কিছু নেই। মোদি সরকার হিন্দুত্ববাদ কায়েমের ঘোষণা দিয়েই মাঠে নেমেছেন। এনআরসি, সিএএ, আর্টিক্যাল-৩৭০, স্টেপ বাই স্টেপ... তিনি তার কথা রাখছেন। তার প্লান আপন গতিতেই আগাচ্ছে।
নরেন্দ্র মোদিরা জানেন পৃথিবী এখন নষ্টদের দখলে। কেজরিওয়ালরা জানেন মুসলমানের রক্ত বিনামূল্যে চুষে খাওয়ার মতো। অমিত শাহরা জানেন পৃথিবীটা আজকাল শক্তের ভক্ত। সুতরাং, সাম্প্রদায়িকতার নগ্ন উল্লাস আর পৈশাচিকতার দন্ত বিকশিত করতে ভাবতে হচ্ছে না একবারও। মুসলমানের রক্তনেশায় তাদেরকে পাগল করে তুলেছে।
ভারত স্বাধীন করেছিল মুসলমানরা। স্বাধীনতা জন্য রক্ত দিয়েছিল দুইশ বছর। দখলদার ব্রিটিশদের চোখে চোখ রেখে কলিজাটা মেলে ধরেছিল সামনে। ভারতে মুসলমানরা রক্ত আজও দিয়ে যাচ্ছে। জীবন তখনও দিয়েছে, জীবন এখনও দিয়ে যাচ্ছে। তখন দিয়েছিল বিদেশিদের হাতে, আর এখন স্বদেশিদের।
মোদি এণ্ড কোম্পানি মুসলমানের ইতিহাস জানেন না। তারা জানেন না, তার পাইক পেয়াদা রক্ত নিতে নিতে টায়ার্ড হয়ে যাবে, মুসলমান রক্ত দিতে দিতে টায়ার্ড হবে না। হয় না। ইতিহাস সাক্ষি।
৩
১৮০৩ সালে শাহ আব্দুল আজিজ মুহাদ্দিসে দেহলবি ফতওয়ার উপর ভিত্তি করেই শুরু হয়েছিলে ভারতবর্ষের স্বাধীনতার আন্দোলন। তিনি ঘোষণা করেছিলেন, 'ভারতের মাটিকে স্বাধীন করবার জন্য ইংরজদের বিরুদ্ধে লড়াই করা প্রতিটি মুসলমানের উপর ফরজ'। শুরু হয়েছিল বৃটিশ খেদাও আন্দোলন।
যে দিল্লি আজ রঞ্জিত হচ্ছে মুসলমানের রক্তে, ইতিহাস সাক্ষি, সেই দিল্লির শেরশাহ রোডের এমন কোনো গাছ বাকি ছিল না যে গাছে কোনো না কোনো মুসলমানকে ইংরেজরা ফাঁসিতে ঝুলায়নি! আজকের ভারতের উগ্র সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসীরা এই ইতিহাস কীভাবে ভুলে যায়? কার মাটিতে দাঁড়িয়ে কাকে মারে?
ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম এক স্থপতি ছিলেন শায়খুল হিন্দ মাহমুদ হাসান। স্বাধীনতার পক্ষে আন্দোলনে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন বলে ইংরেজরা তাঁকে মাল্টার জেলে লোহার বেড়ি আগুন দিয়ে পুড়িয়ে লাল করে তাঁর কোমরে পরিয়ে দিতো। যন্ত্রনায় চিৎকার করে উঠতেন তিনি। ওরা বলতো, 'শুধু একবার আমাদের পক্ষে কথা বলো। মুক্ত করে দেওয়া হবে'। তিনি তাদের চোখে চোখ রেখে বলতেন, 'মুসলমান কাকে বলে- তোমরা এখনো টের পাওনি'। আবার শুরু হতো অত্যাচার।
ভারতবর্ষের স্বাধীনতার আরেক স্থপতি মাওলানা উবায়দুল্লাহ সিন্দী। স্বাধীনতার কথা বলতেন বলে ইংরেজরা তাকে বন্দি করে কালাপানিতে দিপান্তর করে রাখে। মানুষটিকে যখন গ্রেফতার করা হয়, তখন মুখে ঠিকমতো দাড়িও গজায়নি। যখন মুক্ত হন, চুলদাড়ি সব সাদা হয়ে গিয়েছিল! ২৫ বছর পর মুক্তি পেয়েছিলেন তিনি।
ভারতের স্বাধীনতার আরেক কারিগর মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদানি। কাফনের কাপড় সাথে নিয়ে গিয়ে দাড়িয়েছিলেন ইংরেজ আদালতে। তিনি ফতওয়া দিয়েছিলেন, 'ইংরেজদের সেনাবাহিনীতে ভর্তি হওয়া এবং তাদের সহায়তা করা হারাম'। আদালত তাঁকে তাঁর ফতওয়া ফিরিয়ে নিতে বলল। তিনি আদালতের আঙিনায় হুংকার ছুড়ে দিয়ে বলেছিলেন, 'ফতওয়া দিয়া তো কিয়া হুয়া, আজভি মেরে ইহি রায় হে কে, ইংরেজকে ফৌজমে শিরকত করনা হারাম হায়'।
কতজনের কথা বলব?
কত আত্মত্যাগের উদাহরণ টানব?
ভারতের বর্তমান চরমপন্থি সাম্প্রদায়িক শাসকশ্রেণি ইতিহাস ভুলে গেছে। মুসলমানের রক্তে স্বাধীন হওয়া মাটিকে মুসলমানের রক্তে রাঙাচ্ছে। ওরা ভুলে গেছে রক্ত কখনও বৃথা যায় না। আজ হোক, কাল হোক- রক্ত রক্তের ভাষায় কথা বলে। যে ভাষাটা বড় নির্মম হয়।
৪
ভারতের মুসলমানের ইমান আমাদের থেকে অনেক বেশি মজবুত। তাঁরা চরম ধৈর্যের পরিচয় দিয়ে যাচ্ছেন। মার খাচ্ছেন, কিন্তু এখনও পালটা আঘাত করছেন না। মসজিদ ভাঙার কারণে মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায়ও মন্দিরে হামলে পড়ছেন না। কারণ তাদের ইমান তাদেরকে মনে করিয়ে দিচ্ছে, অন্য ধর্মাবলম্ভিদের উপাসনালয়ে হামলা করা জায়েজ নেই।
ভারত সরকারের এই ন্যাক্কারজনক সন্ত্রাসী আচরণেরর বিরুদ্ধে তামাম বিশ্বের বিবেকবান মানুষ ঘৃণা জানাচ্ছেন। মুসলিম বিশ্ব ক্ষোভ প্রকাশ করছে, কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ট্য মুসলিম কোনো দেশে একটা মন্দিরও ভাঙা হয়নি- এটাই ইসলামের সৌন্দর্য। এটাই মানবতার পয়গাম।
আমরা বিশ্বাস করি ভারতের সকল হিন্দু উগ্র নয়। আমরা জানি ভারতের অনেক হিন্দুও মোদী সরকারের চলমান কট্টরপন্থা পছন্দ করছেন না। আমরা দেখিছে এন আর আই এবং সিএএ'র বিরুদ্ধে আন্দোলনরত মুসলমানদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে অনেক হিন্দুরাদেরও মাঠে নেমে আসতে। সুতরাং, আমরা যেমন উগ্র হিন্দুদের চলমান সন্ত্রাসী আচরণের কারণে তাদের দিকে থু থু ছুড়ব, একইভাবে শান্তির পক্ষে অবস্থান নেওয়া হিন্দুদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানাতে দ্বিধা করব না।
৫
আমরা আশা করতে চাই ভারত সরকার ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেবে। মানুষের এই পৃথিবীতে মানবিক হওয়ার চেষ্টা করবে। হাজার বছর ধরে ভারতে হিন্দু-মুসলিম মিলেমিশে বাস করে আসছে। ভারতের অখণ্ডতার স্বার্থে হলেও এই সহাবস্থানের পথ আগলে দাঁড়াবে না।
পৃথিবীর মানচিত্রে ভারত একটি বৃহৎ রাষ্ট্র। সময় আর মানচিত্র কিন্তু পরিবর্তনশীল। মনে করিয়ে দিই, ১৫ খণ্ডে বিভক্ত হওয়া সোভিয়েত ইউনিয়নের ইতিহাসটা কিন্তু খুব বেশিদিন আগের নয়।
মুহতারাম Rasid jamil