05/07/2019
হাতে সময় আর মাত্র একটা বছর। নীতি আয়োগের রিপোর্ট অনুযায়ী ২০২০ সালের মধ্যে চেন্নাই, দিল্লি, বেঙ্গালুরু, হায়দ্রাবাদ সহ ভারতের ২১টা বড় শহরের ভূ-গর্ভস্থ জল একদম শেষ হয়ে যাচ্ছে যার প্রভাব পড়তে চলেছে ১০ কোটিরও বেশি মানুষের উপর। ২৪ টি রাজ্যের তথ্য বিশ্লেষণ করে এই রিপোর্টে বলা হয়েছে ২০৩০ সালের মধ্যে পানীয় জলের চাহিদা, যোগানের থেকে দ্বিগুন বৃদ্ধি পাবে। এদেশের ৪০ শতাংশ অর্থাৎ প্রায় ৬০ কোটি মানুষ খাওয়ার জলটুকুও পাবেন না। এখনই প্রতি বছর দেশজুড়ে প্রায় ২ লক্ষ মানুষ মারা যাচ্ছেন কেবলমাত্র পর্যাপ্ত পানীয় জলের অভাবে এবং দূষিত জল পান করে। আমাদের দেশের ৭০% জলই কোনও না কোনও ভাবে সংক্রমিত, ব্যবহারের অযোগ্য। জলের গুণগত মানের দিক থেকে বিশ্বের ১২২টি দেশের মধ্যে ভারতের স্থান হয়েছে লজ্জাজনক ১২০তম স্থানে।
কেন্দ্রীয় ভূগর্ভস্থ সংস্থার সমীক্ষা বলছে, ভারতে ৪০ শতাংশ জলের উৎস ভূগর্ভস্থ জল। রাষ্ট্রপুঞ্জের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ভারতের বর্তমান জনসংখ্যা প্রায় ১৩৬ কোটি। ভারতের মানুষ যে পরিমাণ ভূগর্ভস্থ জল ব্যবহার করে থাকে - তা কিন্তু আমেরিকা ও চীনের মোট ব্যবহার্য পরিমাণের চেয়েও বেশি। আমাদের দেশে ৮০ শতাংশেরও বেশি জলসম্পদ ব্যবহৃত হয় কৃষিতে। উচ্চফলনশীল প্রজাতির এক কিলো ধান উৎপাদনেই লেগে যাচ্ছে তিন থেকে চার হাজার লিটার জল। জলের সংকটের ব্যাপক প্রভাব পড়তে চলেছে দেশবাসীর খাদ্যের যোগানে। 2030 সালের ভিতর প্রায় 70 কোটি মানুষ শুধু মাত্র জলের জন্য গৃহহারা হবেন। অথচ এক তৃতীয়াংশ জলসম্পদ শুধু অপচয় হয়। পাইপ বাহিত জলের প্রায় ৪০% লিকেজ ও কল খোলা থাকায় নষ্ট হচ্ছে। রেন ওয়াটার হারভেস্টিং বা বৃষ্টির জল সংরক্ষণ কিছুটা হলেও পরিস্থিতি সামাল দিতে পারে। কিন্তু বিশ্ব উষ্ণায়নের ফলে বৃষ্টির হার কমে যাওয়ায় নদী শুকিয়ে যাচ্ছে, তাই কমছে মাটির তলার জল। নীতি আয়োগের ডেপুটি চেয়ারম্যান রাজীব কুমার জানিয়েছেন, "ইতিহাস সম্ভবত এই প্রথমবার টানা ছ'বছর ধরে ভারতে মৌসুমি বৃষ্টিপাতে ঘাটতি দেখা যাচ্ছে।" বিপুলভাবে পরিমাণে গাছ লাগানো ছাড়া উপায় নেই। বৃষ্টিপাতে সাহায্য করে, ভূগর্ভস্থ জলের ঘাটতি সামাল দিতে পারে গাছই।
জলের অভাবে হাহাকার করছে মানুষ। মহারাষ্ট্রের কিছু এলাকায় পানীয় জল আনতে ট্রেনে করে ১৪ কিমি যেতে হচ্ছে। চেন্নাই, বেঙ্গালুরু, দিল্লি, গুরুগ্রাম ইত্যাদি শহরে জলের জন্য হাহাকার চলছে, চড়া দামে বিকোচ্ছে জল। জলসঙ্কটের ছায়া পড়েছে এরাজ্যেও। গ্রীষ্মের মরসুমের শুরুতেই তীব্র জলকষ্টের শিকার হয়েছেন পশ্চিম বর্ধমান, বাঁকুড়া, পুরুলিয়া সহ দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন জেলার মানুষ। Central Ground Water Board (CGWB) এর রিপোর্ট অনুযায়ী ২০০৭ থেকে ২০১৭ এই ১০ বছরে আমরা ভূ-গর্ভস্থ জলের ৬১℅ শেষ করে দিয়েছি। বাকিটা শেষ করতে ২ বছরও লাগবে না। জলসঙ্কট নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দও। আপনি হয়তো ভাবছেন আপনার এলাকায় কিছু হবে না, কিন্তু আপনি জানেন না যে কোনও দিন আপনার জলের পাইপেও কালো জল আসতে শুরু করবে। আর তার কয়েক দিন পর জল আসাই বন্ধ হয়ে যাবে। আমরা জানতেও পারব না যে কখন এক ফোঁটা জলের জন্য ছটফট করতে হবে।
নিজেদের এবং আগামী প্রজন্মকে এই ভয়াবহ ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দেওয়ার থেকে বাঁচাতে পারি আমরা নিজেরাই।
আজ এগিয়ে আসতে হবে কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র ছাত্রী, শিক্ষক, ডাক্তার, অধ্যাপক সমাজের সকল স্তরের মানুষকেই। সমস্ত সচেতন মানুষ এবং সমাজসেবী স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের কাছে আমাদের আবেদন এই সচেতনতাকে গণসচেতনতায় পরিণত করে এই সঙ্কট দূর করতে এগিয়ে আসুন। আমরা সবাই মিলে তো একটাই পরিবার, একে যে বাঁচাতেই হবে। তাই আপনাদের সকলকেই যে আজ ভীষণ প্রয়োজন।