07/04/2021
ভাস্করাচার্য : এক মহান প্রাচীন গনিতজ্ঞ
ভাস্করাচার্যের 'সিদ্ধান্ত শিরোমনি' প্রাচ্যের মহামূল্যবান গণিত ও বিজ্ঞানশাস্ত্র।প্রাচীন ভারতবর্ষের অমূল্য জ্ঞানসম্পদ প্রাচ্যের জ্ঞান ও বিজ্ঞানের অগ্রগতির ইতিহাস থেকে কোন অংশে কম ছিল না।শূন্যের আবিষ্কার শুধু নয়, আজ থেকে হাজারখানেক বছর আগে দক্ষিণ এশিয়ার মানুষ এগিয়ে গিয়েছিল গণিত, বিজ্ঞান ও জ্যোতিষশাস্ত্রেও। প্রাচীন ভারতবর্ষের অমূল্য জ্ঞানসম্পদ থেকে একটি গ্রন্থ নিয়েই আজ আমরা ঘুরে আসবো আমাদের অতীতের গণিত ও বিজ্ঞানরাজ্য থেকে, নাম তার ‘সিদ্ধান্ত শিরোমণি’, লিখে গিয়েছেন বিজ্ঞানী ভাস্করাচার্য (১১১৪-১১৮৫) বা ভাস্কর-২।
বিজ্ঞানী ভাস্করাচার্যৈর জন্ম ১১১৪ খ্রিস্টাব্দে, ভারতের কর্ণাটক প্রদেশে পশ্চিমঘাটে সহ্য পর্বতের নিকট প্রাচীন বিজুবিড় (বর্তমান বিজাপুর) এলাকায় এক বিখ্যাত বংশে। গণিত ও জ্যোতিষশাস্ত্রে ছিল তাঁর অসামান্য অবদান। প্রকাশ থাকে যে, ১২০২ খ্রিস্টাব্দে ইউরোপে প্রথম গণিতের বই প্রকাশিত হয়েছিল লিওনার্ডো দা পিসা’র হাত ধরে। এদিক থেকে বিচার করলে ভাস্করাচার্য রচিত ‘সিদ্ধান্ত শিরোমণি’ই পৃথিবীর প্রথম গণিতগ্রন্থ।
মহারাষ্ট্রের চালিসগাঁও থেকে সামান্য দূরে প্রাপ্ত একটি শিলালিপিতে ভাস্করাচার্য সম্পর্কে বলা হয়েছে,
ভাস্করের সর্বশ্রেষ্ঠ রচনা 'সিদ্ধান্ত-শিরমণি'(১১৫০)। ছত্রিশ বছর বয়সে তিনি এই বই লিখেন। 'করণ কুহুতল' ও 'সর্বতোভদ্র' বই দুটিও তার রচনা। 'সিদ্ধান্ত-শিরমণি' বইটিতে রয়েছে চারটি খণ্ড - লীলাবতী, বীজগণিত, গ্রহ গণিতাধ্যায় ও গোলধ্যায়।
সিদ্ধান্ত শিরমনি বইয়ের একটি খণ্ডের নাম লীলাবতী। লীলাবতী খণ্ডটি নিয়ে একাধিক কাহিনী প্রচলিত রয়েছে। লীলাবতী ও বীজগণিত হচ্ছে গণিতের বই। লীলাবতী সম্ভবত ভাস্করের কন্যা ছিলেন।ধারনা করা হয় খুব অল্প বয়সে বিধবা হয়ে তিনি বাবার ঘরে চলে আসেন।ভাস্কর তাকে ধীরে ধীরে পাটিগণিত শেখান। তখনই তিনি বইটি লিখেন। মেয়ের নামে নাম দেন। আর এক মতে, ভাস্করের কোন মেয়ে ছিল না। তার স্ত্রীর নাম ছিল লীলাবতী। তার স্মরণে তিনি বইটির নাম দেন। তবে বইয়ের নানা জায়গায় এমন কিছু সম্বোধন আছে যে অনেকে ভাবছেন লীলাবতী এক কাল্পনিক নাম। কোথাও বলেছেন- 'অয়ি বালে লীলাবতী', কোথাও সখে, কান্তে, বৎসে বলে সম্বোধন করেছেন। লীলাবতী লেখার ধরনটা কথপকথন। কথা বলতে বলতে অঙ্ক শেখাচ্ছেন। লীলাবতী শব্দটির অর্থ গুণসম্পন্না।
কিম লেসলি প্লফকার নামে একজন আমেরিকান গণিতবিদ তাঁর Mathematics in India বইতে দেখিয়েছেন ক্যালকুলাসের উৎস ভারতবর্ষেই, সপ্তম শতাব্দীতে; পশ্চিমে তখনও ক্যালকুলাস পৌঁছেনি। পরে একাদশ শতাব্দীতে এর বিস্তৃতি ঘটতে থাকে। তিনি মূলত ভাস্করাচার্যের ‘সিদ্ধান্তশিরোমনি’কেই বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন তাঁর আলোচনায়।
‘গ্রহ গণিতাধ্যায়’ ও ‘গোলধ্যায়’
এ দুটো অধ্যায়ে তিনি জ্যামিতি ও পরিমিতি নিয়ে আলোচনা করেন। আমরা হয়তো জানি যে আর্যভট্ট পাই এর মান নির্ণয় করেছিলেন মূল মানের অনেক কাছাকাছি, আর ভাস্করাচার্য সমকোণী ত্রিভুজ ও সুষম বহুভুজের মাধ্যমে পাই এর মান বের করেন ৩.১৪১৬৬৬।
নিউটনের প্রায় পাঁচশত বছর পূর্বে নিউটনের আবিষ্কৃত ইনটিগ্র্যাল ক্যালকুলাসের মতো করে ভাস্করাচার্য গোলকের তলের পরিমাণ ও আয়তন নির্ণয় করেন। এ নিয়মে গোলকটিকে তিনি প্রথমে অনেকগুলো ছোট ছোট অংশে ভাগ করে পরে সবগুলোকে একত্রিত করে যোগ করেছেন। ত্রিকোণমিতির সাইন-কোসাইনের সারণির জনকও তিনি।
ডিফারেন্সিয়াল ক্যালকুলাস ব্যবহার করে ভাস্করাচার্য গ্রহের গতি, গ্রহের তাৎক্ষণিক গতি ইত্যাদি বের করার পাশাপাশি সময়কে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অংশে ভাগ করার নিয়ম দেখিয়েছেন। সময়ের সবচেয়ে ক্ষুদ্র অংশের নাম দিয়েছিলেন ‘ত্রুটি’ (১ সেকেন্ড সময়ের ৩৩৭৫০ ভাগ)।
অতীতের মহামানবগণ তাদের গবেষণালব্ধ যে সমস্ত জিনিস রেখে গেছেন এখনো সারা পৃথিবীর মানুষ বিজ্ঞানের কাজে এবং ব্যবহারিক কাজে এখনো সমানভাবে ব্যবহারে করে যাচ্ছে ।
তথ্যসূত্র: ইউকোপিডিয়া ও ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত।