28/02/2026
২০১৪ সালের পর থেকে রমজান এলেই আমার জীবনে এক নিঃশব্দ নিয়ম শুরু হতো—যেটার কেন্দ্রজুড়ে ছিলেন আপনি। প্রায় প্রতিটি রাতেই, ঘড়ির কাঁটা যখন দশটার কাছাকাছি, ফোনটা বেজে উঠত। ওপাশ থেকে ভেসে আসত আপনার চেনা কণ্ঠ—স্নিগ্ধ, আপন, অদ্ভুত এক আশ্বাসে ভরা। জিজ্ঞেস করতেন, ইফতারে কী খেলাম, আজ তারাবীহ কোথায় পড়লাম—কোন মসজিদে, কেমন লাগল। সব মন দিয়ে শুনে নিয়ে হালকা হাসিতে বলতেন,
“তোমাদের তো বেশ মজা! আট রাকাআত নামাজ—ঝটাঝট পড়ে খালাস!”
এই কথার সঙ্গে থাকত খুনসুটি, আর তার আড়ালে গভীর স্নেহ।
এরপর শুরু হতো চিরচেনা আলোচনা। আজ কী পড়লে, নতুন কোনো ভাবনা বা তথ্য চোখে পড়ল কি না, রিসার্চের কাজ কতদূর এগোল—সবকিছু। স্যার, আপনি শুধু প্রশ্ন করতেন না, আমার প্রতিটি কথা এমনভাবে শুনতেন যেন সেটাই সবচেয়ে জরুরি বিষয়। আপনার দু-একটি মন্তব্যেই আমার অনেক জট খুলে যেত। মনে হতো, আমার ভাবনা, দ্বিধা, অস্থিরতার জন্য আপনার কাছে একটা নিরাপদ আশ্রয় আছে।
আপনার জীবনের শেষ রমজানে কথাগুলো আরও নরম হয়ে গিয়েছিল। ততদিনে সাবা হয়েছে। আপনি মুচকি হেসে বলতেন,
“সাবা তো রোজা ছিল—কী মজা ওর! রোজা করতে হয় না।”
এই দাদুসুলভ মশকরায় ভরে উঠত পুরো মুহূর্তটা। আজ বুঝি, সেই হাসির ভেতরে কতটা গভীর মমতা আর জীবনের প্রতি সহজ আনন্দ লুকানো ছিল।
আপনি চলে যাওয়ার পর থেকে রমজান মাসে তারাবীহ শেষ হলে মনটা অকারণেই আনচান করে ওঠে। অজান্তেই ফোনটার দিকে তাকাই—এই বুঝি আপনার কল আসবে। কিন্তু আসে না। তখন চোখ ভিজে যায়। সাবাকে কোলে নিয়ে, সাবার মাকে আড়ালে রেখে লুকিয়ে কাঁদি। কারণ এই শূন্যতা কাউকে দেখানোর নয়—এটা শুধু আমার আর আপনার মধ্যেকার।
স্যার, আমার বুকে কথার পাহাড় জমে আছে। কত কথা—পড়া, লেখা, জীবন, ভয় আর স্বপ্ন—যেগুলো আমি শুধু আপনাকেই বলতাম। আপনিই ছিলেন সেই মানুষ, যার কাছে কথা বললে হালকা হয়ে যেত বুক। আপনার পর আর কাউকেই সেই জায়গাটা দিতে পারিনি।
হে আল্লাহ, আপনি আমার যে শিক্ষককে পিতা-তুল্য করে দিয়েছিলেন—তাঁকে আপনার রহমতে ঢেকে দিন। তাঁর কবরকে প্রশস্ত করুন, নূরে ভরিয়ে দিন, আর জান্নাতের সর্বোচ্চ মাকামে স্থান দিন। এই শূন্যতার বদলে আখিরাতে আবার সাক্ষাতের সৌভাগ্য দিন।
আমীন!
ASP আরবি সহজ পাঠ