29/03/2026
তারকেশ্বর মগরা লাইনের স্মৃতি
(একটি লেখা থেকে সংগৃহীত নিচের লেখাটি—)
পৌষের প্রথম সপ্তাহ সবে শেষ হয়েছে। সকালের ঝকঝকে রোদ্দুরে ভেসে যাওয়া মাঠ, ঘাট, গাছপালাকে বিদায় জানাতে কষ্ট হচ্ছে ফণিভূষণের। সঙ্গী সাথীদের আজ বড় বেশি আপন মনে হচ্ছে। জল ভরা চোখে বিষাদ মাখা মুখে সবার দিকে তাকায়। বাবা বললেন— “সব ঠিকঠাক করে গুছিয়ে নিয়েছিস তো?” মাথা নেড়ে গরুর গাড়ির ছই-এর মধ্যে উঠে বসে ফণিভূষণ।
তারকেশ্বর থেকে অনেক দূরে ফণিভূষণের গ্রাম। প্রথমে সাত-আট মাইল মেঠো পথ দিয়ে গরুর গাড়িতে আসা, তারপর দশঘরা স্টেশনে ট্রেনে চড়া— দারুণ অভিজ্ঞতা। তবু গ্রাম ছেড়ে আসার সময় মন কেমন করে। বাড়ি, ঘর, বন্ধু-বান্ধবকে ছেড়ে আসার কষ্ট। মাকে প্রণাম করার সময় চোখে জল এসে যায়। সব সময়ের সঙ্গী গোবিন্দ বলে— “ফণী, বড় ইস্কুলে পড়তে যাচ্ছিস, আমাদের ভুলে যাবি না তো?” ফণীর বুকের ভিতরটা গুমরে ওঠে। একসঙ্গে সাঁতার কাটা, গাছে ওঠা, ছিপে করে মাছ ধরা— ভেবে ফণীর কান্না পায়।
এই প্রথম দশঘরা স্টেশন দেখল ফণী। ছোট্ট স্টেশনের একদিকে একটা প্রায় মাটির গা ঘেঁষাঘেঁষি করে প্ল্যাটফর্ম, মাথার ওপর ছাউনি। অনেক দিনের ইচ্ছা ছিল রেলগাড়ি চড়ার। আজ সেই ইচ্ছা পূরণ হতে চলেছে। এখনও গাড়ি এসে পৌঁছায়নি। ছাউনির তলায় জনা দশেক যাত্রী অপেক্ষা করছে। বসার জন্য কয়েকটা কাঠের তৈরি ভারী বেঞ্চ রাখা আছে, তাতে ক্ষোদাই করা— B.P.R। বাবা বললেন— “B.P.R-এর মানে জানিস? B.P.R-এর গোটা কথাটার মানে হল— Bengal Provincial Railway। উদ্বোধনের দিন দেখতে এসেছিলাম, আমার বয়স তখন বছর দশেক হবে। কত সাহেব-মেম এসেছিল! 1895 সালে প্রথমে তারকেশ্বর থেকে মগরা পর্যন্ত চালু হয়, প্রায় ৯ বছর পর ত্রিবেণী পর্যন্ত চলাচল শুরু করে। আবার দশঘরা থেকে জামালপুর পর্যন্ত শাখা লাইনও আছে।”
একদিকে সবাইকে ছেড়ে আসার কষ্ট, অন্যদিকে ট্রেন দেখার কৌতূহল— দুয়ের মাঝে পড়ে সব কথা মাথায় ঢুকল না। আর তর সইছে না— কখন যে ট্রেন আসবে! সারাদিনে মাত্র দু’বার ট্রেন চলাচল করে, আড়াই ফুটের রেললাইন। কেমন দেখতে ইঞ্জিনটা? কামরাগুলোই বা কিরকম! এসবই ভাবছে সে। কিছুক্ষণ পর ইঞ্জিনের হুইসেলের আওয়াজ শোনা গেল। কৌতূহল বাড়ল— এবার গাড়ি আসছে! দূর থেকে কালো ইঞ্জিনটাকে দেখা গেল, বেশি বড় নয়। ফণিভূষণের মনে হল, একটা কালো রঙের ভালুক যেন বগিগুলোকে টানতে টানতে নিয়ে আসছে। গাড়ি থামল। বাবা বললেন— “উঠে পড়।” বিস্ময় কাটে না— কী সুন্দর ইঁটরঙের ছোট ছোট কামরা! যাত্রীরা ওঠার সঙ্গে সঙ্গে নৌকার মতো দুলে ওঠে। বাবার সঙ্গে উঠে বসল ফণী। অল্পক্ষণের অপেক্ষা— ট্রেন ছেড়ে দিল।
দুলকি চালে চলা শুরু হল। একটু একটু করে গতি বাড়ছে ট্রেনের। জানালার ধারে বসেছে ফণী। চলমান কামরা থেকে পিছন দিকে চলে যাওয়া ছবির মতো দৃশ্যগুলো দেখার অনুভূতিটাই আলাদা। হেমন্তের সোনাঝরা সকালে রোদ্দুরে হাওয়ায় দোলা— সবুজে সোনালি রং মেশানো মাঠের পর মাঠ ধানের ক্ষেত দেখা যাচ্ছে, যতদূর চোখ যায়। মাঝে মাঝে সবুজ গাছের সারি। কোথাও বা শুধুই মাঠজোড়া রবি ফসলের উজ্জ্বল উপস্থিতি। ফণী মুগ্ধ দৃষ্টি নিয়ে হলুদ আর সবুজে মাখামাখি চলমান ছবি দেখে চলেছে। বাবা নানারকম কথা বলছেন বটে, কিন্তু সেসব ফণীর কানে ঢুকছে না। সে নিজের জগতেই বিভোর।
ফণী হঠাৎ দেখে, রেলগাড়ি লোকের বাড়ির উঠোনের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। গরু-বাছুর অবাক হয়ে তাদের গাড়িটাকে দেখছে। ছাগল বাঁধা আছে রেললাইনের ধারে, মুরগির দল লাইনের পাশ দিয়ে দৌড়চ্ছে। দল বেঁধে হাঁসেরা চলেছে— বোধ হয় জল যেখানে আছে, সেই দিকে। মাঠে কাজে ব্যস্ত চাষিরা চলন্ত গাড়িটার দিকে তাকিয়ে দেখছে। তাদের গাড়িটা এখন ঘন বাঁশবনের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। বাঁশগাছ আর পাতা ছাড়া কিছুই দেখা যাচ্ছে না। হাওয়ায় বাঁশপাতার অদ্ভুত শব্দের সঙ্গে রেলগাড়ির মৃদু ঝমঝম শব্দ মিলেমিশে কিরকম যেন রহস্যময়তা তৈরি করেছে। রেলগাড়ির সঙ্গে বাঁশবনের এরকম আত্মীয়তা ফণী এই প্রথম অনুভব করল।
সম্বিত ফেরে বাবার কথায়। ততক্ষণে বাঁশবন পেরিয়ে এসেছে। বাবা মাঠের দিকে তাকিয়ে কপালে দু’হাত ঠেকিয়ে নম করলেন। ফণী দেখে, একটু দূরে মাঠের মধ্যে চিতায় আগুন জ্বলছে। দাহকাজে কিছু মানুষের ব্যস্ততা চোখে পড়ে। বাবা বলেন— “আমরা কাছাকাছি এসে পড়েছি, একটু পরেই তারকেশ্বর স্টেশনে নামব। ব্যাগপত্তরগুলো গুছিয়ে নিয়ে নামতে হবে। তাড়াহুড়ো করে নামার দরকার নেই— গাড়ি আর যাবে না, তারকেশ্বরই শেষ স্টেশন।”
কামরা থেকে নেমে ফণীর মনে হয়, সকাল অনেকটা গড়িয়ে গেছে। সাজানো-গোছানো তারকেশ্বর স্টেশন, অনেক লোকের আনাগোনা। আশেপাশে দু-একটা চা-জলখাবারের দোকান আছে। বাবা বললেন— “তারকেশ্বর জংশন! ওপাশে হাওড়া যাওয়ার বড় রেলগাড়ি আছে। এ লাইনের মতো ন্যারোগেজ লাইন নয়— ব্রডগেজ লাইন। দেখলে তফাৎটা বুঝতে পারবি। ও গাড়ির তুলনায় আমাদেরটা খেলনা গাড়ি। অবশ্য দুটোই স্টিম ইঞ্জিনে চলে— ওরটা বড় ইঞ্জিন।”
ফণিভূষণ এতক্ষণে কথা বলার সুযোগ পায়—
— “বাবা, হাওড়া যেতে কতক্ষণ লাগে?”
— “প্রায় তিন ঘণ্টা!”
— “এত দূর?”
— “হ্যাঁ রে, হবে না? হাওড়া দিয়েই তো কলকাতা যাওয়া যায়— গঙ্গা পেরিয়েই তো কলকাতা! বাংলার রাজধানী।”
ফণী বলে— “বাবা, ন্যারোগেজ আর ব্রডগেজ কি একসাথেই চালু হয়েছিল?”
— “না, একসাথে নয়। প্রায় দশ বছর আগে— মানে 1886 সালে ব্রডগেজ লাইন চালু হয়।”
ফণী আপন মনে বলে ওঠে— “বাঃ, বেশ তো! এখানে দু’রকম রেলগাড়িই সে ইচ্ছা করলে চড়তে পারবে!” এটা ভেবে ফণীর খুব আনন্দ হয়।
B.P.R ক্ষোদাই করা একটা বেঞ্চের ওপর ব্যাগপত্তর রাখা হলে বাবা বললেন— “তুই একটু বস, ওদিকটায় কোনো হোটেল আছে কিনা দেখে আসছি।” ফণী চারপাশটা ভালোভাবে তাকিয়ে দেখে। স্টেশনের পাশেই অনেকটা জায়গা জুড়ে আছে একটা ঝিল— পরিষ্কার জল। ঝিলের চারপাশটা সাজানো-গোছানো গাছপালার সারি। একটু দূরে দেখা যাচ্ছে ঝিলের ওপর একটা সাঁকো— সাদার ওপর নীলের ডোরা কাটা। ঝিলের পাড়ের ওপর পোড়া লাল রঙের সারিবদ্ধ ছবির মতো কয়েকটা বাড়ি— গঠনরীতিতে ইউরোপীয় ঘরানার ছোঁয়া। রেলের সাহেব কর্মচারীরা ওইসব বাড়িগুলোতে বসবাস করে।
উল্টো দিকে, স্টেশনের এ পাশটায় কয়েকটা দোকানঘর আছে। মনে হয় খাবার হোটেলও আছে। বাবা তো ওই দিকেই গেছেন। ফণী এবার ইঞ্জিনটার দিকে তাকায়। এটাই তো হেলতে দুলতে কামরাগুলোকে টানতে টানতে নিয়ে এসেছে। ইঞ্জিনের ধোঁয়া বেরোনোর চোঙ দিয়ে তখনও ধোঁয়া বেরিয়ে আসছে। ভালুকের মতো কালো ইঞ্জিনের গায়ে সাদা রং দিয়ে লেখা— 2-4-OT Lokomotive No—5 B.P.R, 1905
সৌজন্য : Tarakeswar Express