Mufti Mabrur Alam Qasmi

Mufti Mabrur Alam Qasmi ভালো এবং শিক্ষনীয় বিষয় পোস্ট করা হবে।

26/08/2026

দরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক তাঁর প্রতি
-- মুহাম্মাদ আশিক বিল্লাহ তানভীর
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আরহামুর রাহিমীন। তিনি জগদ্বাসীর জন্যে রহমাতুল্লিল আলামীন হিসাবে প্রেরণ করেছেন খাতামুন নাবিয়্যীন সায়্যিদুল মুরসালীন হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে। আমাদের প্রতি আল্লাহ তাআলার অনেক বড় অনুগ্রহ যে, তিনি আমাদেরকে আখেরী নবীর উম্মত হিসাবে মনোনীত করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন-

لَقَدْ مَنَّ اللهُ عَلَی الْمُؤْمِنِیْنَ اِذْ بَعَثَ فِیْهِمْ رَسُوْلًا مِّنْ اَنْفُسِهِمْ یَتْلُوْا عَلَیْهِمْ اٰیٰتِهٖ وَ یُزَكِّیْهِمْ وَ یُعَلِّمُهُمُ الْكِتٰبَ وَ الْحِكْمَةَ وَ اِنْ كَانُوْا مِنْ قَبْلُ لَفِیْ ضَلٰلٍ مُّبِیْنٍ.

বাস্তবিকপক্ষে আল্লাহ মুমিনদের উপর অনুগ্রহ করেছেন যে, তিনি তাদের মাঝে একজন রাসূল পাঠিয়েছেন তাদেরই মধ্য থেকে, যিনি তাদের নিকট তাঁর আয়াতসমূহ পাঠ করেন, তাদেরকে পবিত্র-পরিশুদ্ধ করেন এবং তাদেরকে কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেন। আর তারা তো এর পূর্বে ছিল স্পষ্ট ভ্রষ্টতার মধ্যে। -সূরা আলে ইমরান (৩) : ১৬৪

পবিত্র কুরআনুল কারীমে আল্লাহ তাআলা নবী আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালামের পরিচয় দিয়েছেন বিভিন্নভাবে। সূরা আহযাবে আল্লাহ তাআলা বলেন-

لَقَدْ جَآءَكُمْ رَسُوْلٌ مِّنْ اَنْفُسِكُمْ عَزِیْزٌ عَلَیْهِ مَا عَنِتُّمْ حَرِیْصٌ عَلَیْكُمْ بِالْمُؤْمِنِیْنَ رَءُوْفٌ رَّحِیْمٌ . فَاِنْ تَوَلَّوْا فَقُلْ حَسْبِیَ اللهُ لَاۤ اِلٰهَ اِلَّا هُوَ عَلَیْهِ تَوَكَّلْتُ وَ هُوَ رَبُّ الْعَرْشِ الْعَظِیْمِ.

(হে লোকসকল!) তোমাদের মাঝে তোমাদের মধ্য থেকেই রাসূল আগমন করেছেন, তোমাদের কষ্ট যার নিকট অসহনীয়, যিনি তোমাদের (কল্যাণের) জন্য ব্যাকুল, যিনি মুমিনদের প্রতি অত্যন্ত দয়াপরবশ, পরম মমতাবান। তারপরও যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয় তবে (হে নবী) আপনি বলে দিন, আমার জন্য আল্লাহ্ই যথেষ্ট। তিনি ব্যতীত কোনো ইলাহ নেই। তার উপরই আমি ভরসা করি এবং তিনি মহান আরশের মালিক। -সূরা তাওবা (৯) : ১২৮, ১২৯

নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মতের প্রতি অত্যন্ত দয়ার্দ্র ও স্নেহশীল ছিলেন। উম্মতের কল্যাণে তিনি সদা ব্যাকুল থাকতেন। উম্মত কীভাবে নাজাত ও মুক্তি লাভ করতে পারে এ ফিকিরে তিনি ছিলেন সদা বিভোর। সর্বোপরি এই উম্মতের উপর রয়েছে তাঁর অবারিত ইহসান-অনুগ্রহ, পার্থিব-অপার্থিব উভয় বিবেচনায়। তাই উম্মতের কর্তব্য হল, নবীজীর সেই ইহসানের দাবি রক্ষা করা।

উম্মতের উপর নবীজীর যে সীমাহীন ইহসান রয়েছে, এর অন্যতম দাবি হচ্ছে নবীজীর প্রতি দরূদ ও সালামের নাযরানা পেশ করা। এটা আমাদের উপর নবীজীর হক। নতুবা নবীজীর প্রতি দরূদ পেশ করার আমরা কে! যেখানে স্বয়ং আরহামুর রাহিমীন ও তাঁর ফিরিশতাগণ নবীজীর প্রতি দরূদ প্রেরণ করেন সেখানে আমাদের মতো নগণ্য উম্মতের দরূদের কোনোই প্রয়োজন নেই প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের। যেখানে খোদ রাব্বুল আলামীন স্বীয় হাবীবকে দান করেছেন মাকামে মাহমুদ-জান্নাতের সর্বোচ্চ মর্যাদা, সেখানে তাঁর জরুরত নেই আমাদের কারো দরূদ ও সালামের।

কিন্তু তবুও কেন এই নির্দেশ- দরূদ ও সালাম পাঠ করতে হবে তাঁর প্রতি? হাঁ, এতীম এ উম্মতীকে নিজের স্বার্থেই নিবেদন করতে হবে আখেরী নবী হযরত মুহাম্মাদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি দরূদ ও সালাম- ভক্তি, শ্রদ্ধা ও ভালবাসার সবটুকু দিয়ে। নবীজীর প্রতি আমাদের মহব্বত এমন কিছুই দাবি করে।

আল্লাহ তাআলা বলেন-

اِنَّ اللهَ وَ مَلٰٓىِٕكَتَهٗ یُصَلُّوْنَ عَلَی النَّبِیِّ یٰۤاَیُّهَا الَّذِیْنَ اٰمَنُوْا صَلُّوْا عَلَیْهِ وَ سَلِّمُوْا تَسْلِیْمًا.

নিশ্চয় আল্লাহ ও তাঁর ফিরিশতাগণ নবীর প্রতি ‘সালাত’ প্রেরণ করেন। হে যারা ঈমান এনেছ, তোমরা তার প্রতি ‘সালাত’ পৌঁছাও এবং অধিক পরিমাণে সালাম পেশ কর। -সূরা আহযাব (৩৩) : ৫৬

নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি সালাত ও সালাম পেশ করাকেই আমরা দরূদ বলে অভিহিত করে থাকি। বস্তুত আল্লাহ রাব্বুল আলামীন স্বীয় শান অনুযায়ী নিজ হাবীব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর দরূদ বর্ষণ করেন। ফিরিশতাগণও আপন আপন পর্যায় থেকে দরূদ প্রেরণ করেন নবীজীর প্রতি। আর তাই উম্মতেরও কর্তব্য হচ্ছে স্বীয় অবস্থান থেকে মহান মুহসিন সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি সালাত ও সালাম নিবেদন করা।

আল্লাহ তাআলা নবীজীর উপর দরূদ বর্ষণ করেন- এর অর্থ কী? এর অর্থ হচ্ছে আল্লাহ তাআলা নিজ হাবীবের উপর রহমত বর্ষণ করেন। তার গুণগান ও মর্যাদা বর্ণনা করেন ফিরিশতাদের নিকট। তিনি তাঁর বন্ধুর শ্রেষ্ঠত্ব, বড়ত্ব ও মহত্ত্ব বয়ান করেন এবং তার সম্মান ও মর্যাদা বৃদ্ধি করতে থাকেন।

আর ফিরিশতাগণ দরূদ প্রেরণ করেন- এর অর্থ হল, ফিরিশতাগণ আল্লাহ তাআলার নিকট নবীজীর মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব তলব করতে থাকেন। বরকতের দুআ করতে থাকেন নবীজী ও তাঁর পুত পবিত্র পরিবারের জন্য।

আর মুমিনগণ যে দরূদ পেশ করেন- এর অর্থ হল, তারা নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শেখানো পদ্ধতিতে দরূদ পাঠ করতে থাকেন। মুমিনগণ আল্লাহ তাআলার নিকট দরখাস্ত করতে থাকেন, ইয়া রব! আপনি আপনার হাবীবের শান ও মান বৃদ্ধি করতে থাকুন। দুনিয়াতে তাঁর আলোচনা সমুন্নত করুন। তাঁর আনীত শরীয়তকে প্রতিষ্ঠিত করুন। তাঁর দ্বীনকে আপনি বুলন্দ করে দিন। আখেরাতে তাঁকে শ্রেষ্ঠ প্রতিদানে ভূষিত করুন। উম্মতের জন্য তার শাফাআত কবুল করুন। তাঁকে মাকামে মাহমূদ দান করে সর্বোচ্চ মর্যাদা প্রদান করুন। এভাবে ঊর্ধ্বজগৎ ও ইহজগতের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্বের মহিমা। (দ্রষ্টব্য : ফাতহুল বারী, হাফেয ইবনে হাজার ১১/ ১৫৫, ১৫৬; আলকওলুল বাদী, হাফেয সাখাবী, পৃ. ৫১-৫৭)



দরূদ শরীফের ফযীলত

মূলত আমাদেরকে দরূদ পড়তে হবে আমাদের প্রয়োজনেই। আমাদের দরূদে নবীজীর কোনো প্রয়োজন নেই। যিনি দরূদ ও সালাম পেশ করবেন তার নিজেরই ফায়দা। দুনিয়া ও আখেরাতের নানাবিধ কল্যাণ সম্পৃক্ত রয়েছে দরূদের সাথে। কুরআনে কারীমের নির্দেশনাসহ হাদীস শরীফে দরূদের বহু ফযীলত বিবৃত হয়েছে। এখানে কিছু উল্লেখ করা হল।

দরূদ শরীফ : মুমিনদের প্রতি আল্লাহ তাআলার নির্দেশ

ঈমানদারদের প্রতি আল্লাহ তাআলার নির্দেশ হল, তোমরা নবীজীর প্রতি দরূদ ও সালাম পেশ কর। আল্লাহ বলেন-

اِنَّ اللهَ وَ مَلٰٓىِٕكَتَهٗ یُصَلُّوْنَ عَلَی النَّبِیِّ یٰۤاَیُّهَا الَّذِیْنَ اٰمَنُوْا صَلُّوْا عَلَیْهِ وَ سَلِّمُوْا تَسْلِیْمًا.

নিশ্চয় আল্লাহ ও তাঁর ফিরিশতাগণ নবীর প্রতি ‘সালাত’ প্রেরণ করেন। হে যারা ঈমান এনেছ তোমরা তার প্রতি ‘সালাত’ পৌঁছাও এবং অধিক পরিমাণে সালাম পেশ কর। -সূরা আহযাব (৩৩) : ৫৬

অতএব দরূদ পাঠের মাধ্যমে মহান রবের মহান নির্র্র্র্র্দেশ পালিত হয়। এছাড়া যেখানে খোদ রাব্বুল আলামীন স্বীয় হাবীবের প্রতি দরূদ প্রেরণ করছেন, ফিরিশতাগণও পেশ করছেন নবীজীর প্রতি দরূদ; ঊর্ধ্বজগতে গুঞ্জরিত হচ্ছে নবীর শানে দরূদ, সেখানে আমিও এই ধরাধাম থেকে দয়ার নবীর প্রতি দরূদ ও সালাম পেশ করার মাধ্যমে শামিল হচ্ছি সেই মুবারক কাফেলায়।



সাহাবায়ে কেরাম অধীর ছিলেন দরূদের জন্যে

ঈমানদারদের উপর যখন আল্লাহ্ তাআলার পক্ষ থেকে নবীজীর প্রতি দরূদ পেশ করার নির্দেশ আসে তখন সাহাবায়ে কেরাম অস্থির হয়ে পড়েন- কীভাবে নবীজীর প্রতি দরূদ পেশ করা যায়। তারা এ বিষয়ে নবীজীকে জিজ্ঞাসা করলে নবীজী তাদেরকে দরূদ শরীফ শিখিয়ে দেন। হযরত কা‘ব ইবনে উজরাহ রা. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন-

لَمَّا نَزَلَتْ اِنَّ اللهَ وَ مَلٰٓىِٕكَتَهٗ یُصَلُّوْنَ عَلَی النَّبِیِّ قَالُوا: كَيْفَ نُصَلِّي عَلَيْكَ يَا نَبِيَّ اللهِ؟ قَالَ: قُولُوا اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ، كَمَا صَلَّيْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ، وَعَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ، وَبَارِكْ عَلَى مُحَمَّدٍ، وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا بَارَكْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ وَعَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ.

যখন

اِنَّ اللهَ وَ مَلٰٓىِٕكَتَهٗ یُصَلُّوْنَ عَلَی النَّبِیِّ یٰۤاَیُّهَا الَّذِیْنَ اٰمَنُوْا صَلُّوْا عَلَیْهِ وَ سَلِّمُوْا تَسْلِیْمًا.

(নিশ্চয় আল্লাহ ও তাঁর ফিরিশতাগণ নবীর প্রতি ‘সালাত’ প্রেরণ করেন। হে যারা ঈমান এনেছ তোমরা তার প্রতি ‘সালাত’ পৌঁছাও এবং অধিক পরিমাণে সালাম পেশ কর।)

আয়াতটি নাযিল হয় তখন সাহাবীগণ বললেন, ইয়া নাবিয়্যাল্লাহ! আমরা আপনার প্রতি কীভাবে দরূদ পাঠ করব? নবীজী বললেন, তোমরা বলো-

اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ، كَمَا صَلَّيْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ، وَعَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ، وَبَارِكْ عَلَى مُحَمَّدٍ، وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا بَارَكْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ وَعَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ.

(হে আল্লাহ! আপনি সালাত ও রহমত বর্ষণ করুন মুহাম্মাদের প্রতি এবং মুহাম্মাদের পরিবার পরিজনের প্রতি। যেভাবে আপনি ইবরাহীমের প্রতি এবং ইবরাহীমের পরিবারের প্রতি রহমত বর্ষণ করেছেন। নিশ্চয় আপনি প্রশংসিত এবং মর্যাদাবান। আপনি বরকত নাযিল করুন মুহাম্মাদের উপর এবং মুহাম্মাদের পরিবারের উপর। যেভাবে আপনি বরকত নাযিল করেছেন ইবরাহীমের পরিবারের উপর এবং ইবরাহীমের পরিবারের উপর। নিশ্চয় আপনি প্রশংসিত এবং মর্যাদাবান।) -মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ১৮১৩৩; মুসনাদে ইবনে আবী শাইবাহ, হাদীস ৫০৫

এছাড়া এ ধরনের বর্ণনা আরো অনেক সাহাবী থেকেও এসেছে। সকলে নবীজী থেকে জিজ্ঞাসা করে করে দরূদ শিখে নিয়েছেন।

লক্ষণীয় বিষয় হল, নবীজীর প্রতি দরূদ পেশ করার এ নির্দেশনাটিকে সাহাবায়ে কেরাম নিজেদের জন্য অনেক বড় তোহফা মনে করতেন। সহীহ বুখারীর বর্ণনা মতে সাহাবী হযরত কা‘ব রা. তাবেয়ী হযরত আবদুর রহমান ইবনে আবী লাইলাকে বললেন-

أَلاَ أُهْدِي لَكَ هَدِيَّةً سَمِعْتُهَا مِنَ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ؟

আমি কি তোমাকে সেই হাদিয়া দিব না, যা আমি নবীজী থেকে লাভ করেছি? এরপর তিনি তাকে দরূদে ইবরাহীম শিখিয়ে দেন।

তো সাহাবায়ে কেরাম দরূদের এ আমলকে অনেক বড় গনীমত ও উপঢৌকন মনে করতেন এবং এর কদর ও মূল্যায়ন করতেন। (দ্রষ্টব্য : সহীহ বুখারী, হাদীস ৩৩৭০; সহীহ মুসলিম, হাদীস ৪০৬)



আল্লাহ্র পক্ষ থেকে রহমত ও করুণা বর্ষিত হয় যে কারণে

দরূদ এমন একটি আমল, যার মাধ্যমে বান্দা আল্লাহ তাআলার করুণা লাভে ধন্য হয়। বান্দা যদি আল্লাহ্র হাবীব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি একবার দরূদ শরীফ পেশ করে আল্লাহ তাআলা এর প্রতিদানে তার প্রতি দশ বার রহমত বর্ষণ করেন। নবীজী বলেন-

مَنْ صَلَّى عَلَيَّ وَاحِدَةً صَلَّى الله عَلَيْهِ عَشْرًا.

যে আমার প্রতি একবার দরূদ পাঠ করে আল্লাহ তার প্রতি দশবার রহমত বর্ষণ করেন। -সহীহ মুসলিম, হাদীস ৪০৮; সুনানে আবু দাঊদ, হাদীস ১৫৩০; সুনানে নাসায়ী, হাদীস ১২৯৬; মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ৮৮৫৪, ১০২৮৭

এজন্য বুযুর্গানে দ্বীন বলে থাকেন, যেকোনো মুশকিল বিষয় সামনে আসলে দরূদের প্রতি মনোযোগী হওয়া চাই। এতে আল্লাহ্র রহমত বান্দার প্রতি ধাবিত হয়।



নেকী হাছিল হয়, গুনাহ মাফ হয় এবং মর্যাদা বুলন্দ হয় দরূদের মাধ্যমে

দরূদের মাধ্যমে যেভাবে আল্লাহ্র রহমত লাভ হয় তেমনি এর মাধ্যমে অর্জিত হয় বহু নেকী, মাফ হয় বান্দার গুনাহ। পাশাপাশি বুলন্দ হতে থাকে বান্দার মর্তবাও। হাদীস শরীফে এসেছে-

مَنْ صَلَّى عَلَيَّ مِنْ أُمَّتِي صَلَاةً مُخْلِصًا مِنْ قَلْبِهِ، صَلَّى الله عَلَيْهِ بِهَا عَشْرَ صَلَوَاتٍ، وَرَفَعَهُ بِهَا عَشْرَ دَرَجَاتٍ، وَكَتَبَ لَهُ بِهَا عَشْرَ حَسَنَاتٍ، وَمَحَا عَنْهُ عَشْرَ سَيِّئَاتٍ.

আমার যে উম্মতী আমার প্রতি অন্তর থেকে একবার দরূদ পেশ করবে আল্লাহ তাআলা এর বিনিময়ে তার উপর দশবার রহমত বর্ষণ করবেন। তার মর্তবা দশ স্তর পর্যন্ত উন্নীত করবেন। তাকে দশ নেকী দান করবেন এবং তার দশটি গুনাহ মাফ করে দেবেন। -সুনানে কুবরা, নাসাঈ, হাদীস ৯৮৯২, ৯৮৯৩, ১২২১, ১০১২২; সুনানে নাসাঈ, হাদীস ১২৯৭; আমালুল ইয়াউমি ওয়াল লাইলাই, নাসাঈ, হাদীস ৩৬২

নবীজীর শানে দরূদ প্রেরণের মাধ্যমে এভাবে বান্দার সগীরা গুনাহগুলো ঝরতে থাকে, নেকী বৃদ্ধি পেতে থাকে, দারাজাত বুলন্দ হতে থাকে। তার দেহমন পুত-পবিত্র হয় এবং আত্মিক উৎকর্ষ সাধিত হয়। এক বর্ণনায় এসেছে-

صَلُّوا عَلَيَّ فَإِنَّهَا زَكَاةٌ لَكُمْ، وَاسْأَلُوا اللهَ لِي الْوَسِيلَةَ، فَإِنَّهَا دَرَجَةٌ فِي أَعَلَى الْجَنَّةِ، لَا يَنَالُهَا إِلّا رَجُلٌ، وَأَرْجُو أَنْ أَكُونَ أَنَا هُوَ.

তোমরা আমার প্রতি দরূদ পেশ কর। কেননা এটা তোমাদের জন্যে যাকাত স্বরূপ। আর আমার জন্য আল্লাহ্র নিকট ওসিলা তলব কর। কেননা এটা হচ্ছে জান্নাতের সর্বোচ্চ একটি মাকাম। যা কেবল একজনই লাভ করবে। আমি আশা করি, আমিই হব সেইজন। -মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ৮৭৭০; ফাযলুস সালাত আলাননাবিয়্যি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, ইসমাঈল আলকাযী, হাদীস ৪৬, ৪৭

মোটকথা, যাকাত যেভাবে সম্পদের ময়লা দূর করে তার প্রবৃদ্ধি ঘটায় তেমনি দরূদের আমলও মুমিনের দ্বীন-ঈমানকে কলুষমুক্ত করে তাতে নূর এনে দেয় এবং ব্যক্তিকে পরিশুদ্ধ করে। তার পাপগুলো মোচন করে দেয়।



যার মাধ্যমে গুনাহ মাফ হয় এবং মাকসাদ হাছিল হয়

হযরত উবাই ইবনে কা‘ব রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-

كَانَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذَا ذَهَبَ ثُلُثَا اللَّيْلِ قَامَ فَقَالَ: يَا أَيُّهَا النَّاسُ اذْكُرُوا اللهَ اذْكُرُوا اللهَ جَاءَتِ الرَّاجِفَةُ تَتْبَعُهَا الرَّادِفَةُ جَاءَ المَوْتُ بِمَا فِيهِ جَاءَ المَوْتُ بِمَا فِيهِ ، قَالَ أُبَيٌّ: قُلْتُ: يَا رَسُولَ اللهِ إِنِّي أُكْثِرُ الصَّلَاةَ عَلَيْكَ فَكَمْ أَجْعَلُ لَكَ مِنْ صَلَاتِي؟ فَقَالَ: مَا شِئْتَ. قَالَ: قُلْتُ: الرُّبُعَ، قَالَ: مَا شِئْتَ فَإِنْ زِدْتَ فَهُوَ خَيْرٌ لَكَ، قُلْتُ: النِّصْفَ، قَالَ: مَا شِئْتَ، فَإِنْ زِدْتَ فَهُوَ خَيْرٌ لَكَ، قَالَ: قُلْتُ: فَالثُّلُثَيْنِ، قَالَ: مَا شِئْتَ، فَإِنْ زِدْتَ فَهُوَ خَيْرٌ لَكَ، قُلْتُ: أَجْعَلُ لَكَ صَلَاتِي كُلَّهَا قَالَ: إِذًا تُكْفَى هَمَّكَ، وَيُغْفَرُ لَكَ ذَنْبُكَ.

রাতের দুই প্রহর অতিক্রান্ত হলে নবীজী উঠে যেতেন। বলতে থাকতেন, হে লোকসকল! তোমরা আল্লাহকে স্মরণ কর। তোমরা আল্লাহ্র যিকিরে মশগুল হও। প্রবল ঝাঁকুনি (কেয়ামত) চলে আসছে। তারপর এর পিছে আসছে আরেকটি (পুনরুত্থান)। মৃত্যু তার ভয়াবহতা নিয়ে চলে আসছে। মৃত্যু তার ভয়াবহতা নিয়ে চলে আসছে।

হযরত উবাই ইবনে কা‘ব রা. বলেন, আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি আপনার প্রতি বেশি বেশি দরূদ পড়ে থাকি। আমি আমার দুআর কতটুকু সময় আপনার দরূদে ব্যয় করব? নবীজী বললেন, যতটুকু ইচ্ছা। আমি বললাম, এক চতুর্থাংশ? বললেন, তোমার ইচ্ছা। তবে যদি এর চেয়ে বেশি কর তাহলে তোমার জন্য তা কল্যাণকর হবে। আমি বললাম, অর্ধেক? বললেন, তোমার ইচ্ছা। তবে যদি তুমি এরচে বেশি কর তাহলে তা তোমার জন্য কল্যাণকর হবে। আমি বললাম, তাহলে দুই তৃতীয়াংশ? বললেন, তোমার ইচ্ছা। তবে তুমি যদি এর চেয়ে বেশি কর তাহলে তা তোমার জন্যই ভালো হবে। আমি বললাম, আমি আমার দুআর পূর্ণ সময় আপনার দরূদে অতিবাহিত করব। নবীজী বললেন, তাহলে তোমার (দুনিয়া-আখিরাতের) প্রয়োজন পূরণ হবে, পেরেশানী দূর হবে এবং তোমার গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে। -জামে তিরমিযী, হাদীস ২৪৫৭; মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ২১২৪২

দরূদের শ্রেষ্ঠত্ব এ থেকেও অনুমিত হয় যে, নবীজী হযরত উবাই রা.-কে বারবার বলছেন-

مَا شِئْتَ فَإِنْ زِدْتَ فَهُوَ خَيْرٌ لَكَ .

(তোমার ইচ্ছা। তবে তুমি যদি এরচে বেশি কর তাহলে তা তোমার জন্য কল্যাণকর হবে।) তো যে আমলের আধিক্য কল্যাণ বয়ে আনে তা কতটা মহিমান্বিত হতে পারে!

তাছাড়া দরূদের মাধ্যমে তো নিজের জন্য কোনো কিছু চাওয়া হয় না; কেবল নবীজীর দরজা বুলন্দির জন্য দুআ করা হয়। আর তাতেই মহান মালিক এতটা খুশি হন যেন বলেন, বান্দা! তুমি আমার হাবীবের জন্য দুআ করছ! তার শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদা তলব করছ! যাও, তোমার কিছু চাওয়া লাগবে না। তোমার জরুরতগুলো আমি দেখছি। আমি সেগুলো পুরা করে দিব।

আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সেই রূহ ও প্রেরণা নিয়ে, সেই প্রত্যাশা ও উপলব্ধি মনে জাগরূক রেখে নবীজীর ও উপলব্ধি প্রতি দরূদ ও সালাম নিবেদন করার তাওফীক দান করুন- আমীন।

এজন্য মাশায়েখে কেরাম বলে থাকেন, যেকোনো প্রয়োজনে দরূদের আমলের প্রতি মনোযোগী হওয়া চাই। কোনো পেরেশানীর সম্মুখীন হলে দরূদ শরীফ পড়তে থাক। এতে একদিকে দুশ্চিন্তা দূর হয় এবং দরূদের মাধ্যমে আল্লাহ্র রহমত নাযিল হওয়ার কারণে কাজও সহজে সমাধান হয়ে যায়।

তেমনিভাবে কোনো ধরনের গুনাহের প্রতি যদি নফস ফুঁসলাতে থাকে তখনও দরূদ অত্যন্ত কার্যকরী একটি আমল। বান্দার যদি গুনাহ ছাড়ার মজবুত নিয়ত থাকে আর সে দরূদের আমলের ইহতিমাম করতে থাকে তাহলে আল্লাহ তাআলা অবশ্যই নুসরত ও সাহায্য করবেন। তখন আল্লাহ্র মেহেরবানীতে তার জন্য গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা সহজ হয়ে যাবে, ইনশাআল্লাহ।

নবীজী খুশি হয়েছেন যে সুসংবাদ লাভ করে

নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে যখন দরূদের ফযীলত পেশ করা হয় তখন তিনি এ সুসংবাদ লাভ করে অত্যন্ত আনন্দিত হয়ে উঠেন। হযরত আবু তালহা রা. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন-

أَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى الله عَلَيْهِ وَسَلَّمَ جَاءَ ذَاتَ يَوْمٍ وَالسُّرُورُ فِي وَجْهِهِ ، فَقَالُوا : يَا رَسُولَ اللهِ إنَّا لَنَرَى السُّرُورَ فِي وَجْهِكَ؟ فَقَالَ : إِنَّهُ أَتَانِي الْمَلَكُ، فَقَالَ: يَا مُحَمَّدُ أَمَا يُرْضِيك أنَّهُ لاَ يُصَلِّي عَلَيْك مِنْ أُمَّتِكَ أَحَدٌ إلاَّ صَلَّيْت عَلَيْهِ عَشْرًا، وَلاَ يُسَلِّمُ عَلَيْك أَحَدٌ مِنْ أُمَّتِكَ إلاَّ سَلَّمْتُ عَلَيْهِ عَشْرًا؟ قَال : بَلَى.

একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লম (আমাদের মাঝে) আসলেন। তখন তার চেহারায় আনন্দের আভা বিরাজ করছিল। সাহাবীগণ জিজ্ঞাসা করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমরা আপনার চেহারায় আনন্দ লক্ষ্য করছি। নবীজী বললেন, আমার নিকট ফিরিশতা এসেছিল। বলল, ইয়া মুহাম্মাদ! এ বিষয়টি কি আপনাকে আনন্দিত করবে না যে, (আপনার রব বলেছেন,) আপনার কোনো উম্মতী যদি আপনার প্রতি দরূদ পাঠ করে তাহলে আমি (আল্লাহ) তার প্রতি দশবার রহমত বর্ষণ করব? আর কোনো উম্মতী যদি আপনার প্রতি সালাম পেশ করে তাহলে আমি তার প্রতি দশবার সালাম-শান্তি বর্ষণ করব? নবীজী বললেন, অবশ্যই অবশ্যই। -মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবাহ, হাদীস ৩২৪৪৮; সুনানে নাসাঈ, হাদীস ১২৮৩; সুনানে কুবরা, নাসাঈ, হাদীস ১২০৬, ১২০৭

বর্ণনায় এমনও পাওয়া যায় যে, নবীজী একথা শুনে শুকরিয়া আদায় স্বরূপ সিজদায় লুটিয়ে পড়েছিলেন। (দ্রষ্টব্য : মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ১৬৬২, ১৬৬৩, ১৬৬৪)

বস্তুত নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এ আনন্দ ছিল উম্মতের স্বার্থে। কেননা যার জন্য দরূদ পড়া হয় তার অপেক্ষা যিনি দরূদ পড়েন তার নিজেরই বেশি ফায়দা। তাই এ সুসংবাদ ছিল মূলত উম্মতের জন্য সুসংবাদ। আর নবীজী যেহেতু উম্মতের কল্যাণে সদা বিভোর থাকতেন তাই এ সংবাদ শুনে তিনি এরকম আনন্দিত হয়ে পড়েছিলেন।



যতক্ষণ বান্দা দরূদ পড়তে থাকে ফিরিশতাগণ দুআ করতে থাকেন

বান্দা যতক্ষণ দরূদে থাকে ফিরিশতাগণ ততক্ষণ তার জন্য রহমত, বরকত এবং মাগফিরাতের দুআ করতে থাকেন। হাদীস শরীফে এসেছে-

مَنْ صَلَّى عَلَيَّ صَلَاةً لَمْ تَزَلِ الْمَلَائِكَةُ تُصَلِّي عَلَيْهِ مَا صَلَّى عَلَيَّ، فَلْيُقِلَّ عَبْدٌ مِنْ ذَلِكَ أَوْ لِيُكْثِرْ.

আমার উপর কেউ দরূদ পড়লে ফিরিশতাগণ তার জন্য দুআ করতে থাকে যতক্ষণ সে আমার প্রতি দরূদে রত থাকে। এখন বান্দার ইচ্ছা- বেশি বেশি দরূদ পড়বে, না কম। -মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ১৫৬৮০; কিতাবুয যুহদ, ইবনুল মুবারক, হাদীস ১০২৪; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস ৯০৭

হাদীসের এ বক্তব্য শোনার পর আমার নিজেরই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা দরকার, আমি দরূদের প্রতি কতটুকু মনোযোগী হব।



যার ওসিলায় দুআ কবুল হয়

দরূদের আমল আল্লাহ তাআলার নিকট অত্যন্ত প্রিয় আমল। দরূদের ওসিলায় আল্লাহ তাআলা বান্দার দুআ কবুল করেন। হযরত উমর রা. বলেন-

إِنَّ الدُّعَاءَ مَوْقُوفٌ بَيْنَ السَّمَاءِ وَالأَرْضِ لاَ يَصْعَدُ مِنْهُ شَيْءٌ، حَتَّى تُصَلِّيَ عَلَى نَبِيِّكَ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ.

আসমান যমীনের মাঝে দুআ ঝুলন্ত থাকে। তুমি তোমার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি দরূদ পেশ করা পর্যন্ত তা উপরে ওঠে না। -জামে তিরমিযী, হাদীস ৪৮৬

তাই দুআ করার একটি আদব হচ্ছে, দুআর সূচনা-সমাপ্তি দরূদের মাধ্যমে করা।



নবীজীর নৈকট্য ও শাফাআত লাভ হয় যে ওসিলায়

দরূদের মাধ্যমে যেভাবে আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি লাভ হয় তেমনি এর মাধ্যমে অর্জিত হয় নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নৈকট্য। নবীজী বলেন-

أَوْلَى النَّاسِ بِي يَوْمَ القِيَامَةِ أَكْثَرُهُمْ عَلَيَّ صَلاَةً.

কেয়ামতের দিন আমার নৈকট্য লাভ করবে ঐ ব্যক্তি, যে আমার প্রতি বেশি বেশি দরূদ পাঠ করে। -জামে তিরমিযী, হাদীস ৪৮৪

নবীজীর প্রতি মহব্বত ও ভালবাসা প্রকাশের একটা মাধ্যম হল অধিক পরিমাণে দরূদ পেশ করা। অতএব যিনি নবীজীকে মহব্বত করবেন রহমতের নবী তাকে স্নেহের সাথে গ্রহণ করে নেবেন তা তো বলার অপেক্ষা রাখে না। বিশেষ করে কিয়ামতের বিভীষিকাময় মুহূর্তে নবীজী তাকে ভুলে বসবেন- তা কি ভাবা যায়! এ বিষয়টিই উল্লেখিত হয়েছে আলোচ্য হাদীসে।

কিয়ামতের দিন নবীজীর নৈকট্য লাভ করার একটি অর্থ হল, কিয়ামতের দিন সে নবীজীর শাফাআত লাভে ধন্য হবে, ইনশাআল্লাহ। এক বর্ণনায় এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-

من صلى عَليّ حِين يصبح عشرا وَحين يُمْسِي عشرا أَدْرَكته شَفَاعَتِي يَوْم الْقِيَامَة.

قال الحافظ المنذري : رَوَاهُ الطَّبَرَانِيّ بِإِسْنَادَيْنِ أَحدهمَا جيد.

যে আমার প্রতি সকালে দশবার আর সন্ধ্যায় দশবার দরূদ পড়বে কিয়ামতের দিন সে আমার শাফাআত লাভ করবে। -আততারগীব ওয়াততারহীব, মুনযিরী, হাদীস ৯৮৭

আল্লামা মুনাভী রাহ. বলেন, অর্থাৎ সে নবীজীর বিশেষ শাফাআত লাভ করবে।



যে আমল পৌঁছে দেওয়ার জন্য নিয়োজিত রয়েছে ফিরিশতাদের বিশেষ জামাত

আমরা যখন নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খেদমতে দরূদ ও সালাম পেশ করি তখন তা পৌঁছে যায় প্রিয় নবীজীর রওযা মুবারকে সোনার মদীনায়। যে যেখানে যত দূরেই অবস্থান করুক না কেন। বান্দার দরূদের হাদিয়া পৌঁছে দেওয়ার জন্য আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের পক্ষ থেকে নিযুক্ত রয়েছে ফিরিশতাদের বিশেষ জামাত। নবীজী বলেন-

إِنَّ لِلهِ فِي الْأَرْضِ مَلَائِكَةً سَيَّاحِينَ، يُبَلِّغُونِي مِنْ أُمَّتِي السَّلَامَ.

আল্লাহ্র পক্ষ থেকে যমিনে বিচরণকারী ফিরিশতাগণ নিযুক্ত রয়েছেন। তারা আমার উম্মতের পক্ষ থেকে আমার নিকট সালাম পৌঁছায়। -মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ৩৬৬৬, ৪২১০, ৪৩২০; সুনানে নাসাঈ, হাদীস ১২৮২; আমালুল ইয়াওমি ওয়াললাইলাহ, হাদীস ৬৬, সুনানে কুবরা, নাসাঈ, হাদীস ১২০৬, ৯৮১১, ১১৯৩২

বর্ণনায় এও পাওয়া যায় যে, দায়িত্বশীল ফিরিশতা দরূদ পেশকারীর নাম ও পিতার নামসহ দরূদের হাদিয়া নবীজীর খেদমতে পেশ করেন। কিয়ামত পর্যন্ত সকলের দরূদ নবীজীর খেদমতে এভাবে পেশ করা হতে থাকবে। (দ্রষ্টব্য : মুসনাদে বাযযার, হাদীস ১৪২৫)

তাই উম্মতের কর্তব্য হচ্ছে দরূদের হাদিয়ার মাধ্যমে নবীজীর নিকট নিজেকে বেশি বেশি পেশ করা। এই মেযাজ ও উপলব্ধি নিয়ে যদি দরূদ পড়া হয় তাহলে নবীজীর প্রতি ঈমানী মহব্বতও বৃদ্ধি পেতে থাকবে, ইনশাআল্লাহ।



যে আমলে অবহেলার ব্যাপারে এসেছে কঠোর হুঁশিয়ারি

পূর্বেই আমরা যেমনটি উল্লেখ করে এসেছি, আমাদের উপর নবীজীর একটি বড় হক হচ্ছে তাঁর শানে দরূদ ও সালাম নিবেদন করা। কখনো কখনো এ হক আরো জোরালো হয়। বিশেষ করে যখন নবীজীর নাম উচ্চারিত হয় তখন নবীজীর প্রতি দরূদ পড়া খুবই জরুরি। নবীজী বলেন-

رَغِمَ أَنْفُ رَجُلٍ ذُكِرْتُ عِنْدَهُ فَلَمْ يُصَلِّ عَلَيَّ، وَرَغِمَ أَنْفُ رَجُلٍ دَخَلَ عَلَيْهِ رَمَضَانُ فَانْسَلَخَ قَبْلَ أَنْ يُغْفَرَ لَهُ، وَرَغِمَ أَنْفُ رَجُلٍ أَدْرَكَ عِنْدَهُ أَبَوَاهُ الْكِبَرَ فَلَمْ يُدْخِلَاهُ الْجَنَّةَ.

ঐ ব্যক্তির জন্য ধিক, যার সামনে আমার নাম উচ্চারিত হয় আর সে আমার প্রতি দরূদ পড়ে না। ঐ ব্যক্তির জন্য ধিক, যে রমাযান পেল অতঃপর তার গুনাহ মাফ হওয়ার পূর্বেই তা গত হয়ে গেল। ঐ ব্যক্তির জন্য ধিক, যে পিতা-মাতাকে বৃদ্ধ অবস্থায় পেল অথচ তাদের (সেবা ও দুআ নেওয়ার) মাধ্যমে সে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারল না। -মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ৭৪৫১; জামে তিরমিযী, হাদীস ৩৫৪৫

অতএব নবীজীর নাম শুনলে দরূদের ইহতিমাম করা খুবই জরুরি। এক হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-

البَخِيلُ الَّذِي مَنْ ذُكِرْتُ عِنْدَهُ فَلَمْ يُصَلِّ عَلَيّ

আমার ওয়ালিদ সাহেব রাহঃ এর দৈনন্দিন জীবনের নিয়মিত আমল 💔👇🤲
26/08/2026

আমার ওয়ালিদ সাহেব রাহঃ এর দৈনন্দিন জীবনের নিয়মিত আমল 💔👇🤲

25/08/2026

এমন নাতে রাসুল সাঃ শুনেছেন?? 💔👇💔

25/08/2026

এমন নাতে রাসুল সাঃ শুনেছেন? 💔👇💔

24/08/2026

আব্দুল্লাহ আল মানসুরের কন্ঠে অসাধারণ একটি গজল 💔

24/08/2026

সম্মিলিত দুআ : একটি প্রশ্নের উত্তর
-- মাওলানা মুহাম্মাদ আব্দুল মালেক
শামসুল আরেফীন
ধানমন্ডি, ঢাকা
প্রশ্ন : আমি জামেয়া ইসলামিয়া মদীনা মুনাওয়ারার একজন ফাযেলের এক ইংরেজি বইয়ে পড়েছি যে, শরীয়তে সম্মিলিত দুআর কোনো অস্তিত্ব নেই। কুরআন-হাদীস দ্বারা সম্মিলিত দুআ কোথাও প্রমাণিত নয়। একবার উমর ইবনুল খাত্তাব রা. ইস্তেসকার জন্য হযরত আববাস রা-কে ওসীলা বানিয়েছিলেন। সে সময়ও আববাস রা. একা দুআ করেছেন। তদ্রূপ মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বা (হাদীস ৬২৪২) তে বর্ণিত হয়েছে যে, একবার উমর রা.-এর নিকটে এই সংবাদ পৌছল যে, কিছু মানুষ একত্র হয়ে মুসলিম উম্মাহ ও উমর রা.-এর জন্য দুআ করছে। এটা শোনামাত্র তিনি তার গোলামকে লাঠি হাতে পাঠালেন যেন তাদেরকে মেরে তাড়িয়ে দেয়।
প্রশ্ন এই যে, তার এই দাবি কি সঠিক এবং উপরোক্ত রেওয়ায়েত কি ইবনে আবী শায়বায় বিদ্যমান আছে? যদি থাকে তবে তার সনদ কেমন?
#উত্তর : উপরোক্ত দাবি সম্পূর্ণ ভুল। আর প্রশ্নোক্ত বর্ণনা মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বায় নেই।

এ বিষয়ে বাস্তব কথা এই যে, দুআ অনেক বড় আমল, এমনকি হাদীস শরীফে এসেছে যে, ‘দুআই ইবাদত।’ এই দুআ যেমন একা একা করা যায় তেমনি সম্মিলিতভাবেও করা যায়। শরীয়ত যেখানে কোনো একটি পন্থা নির্ধারণ করে দিয়েছে সেখানে ওইভাবে দুআ করতে হবে- একা হলে একা এবং সম্মিলিতভাবে হলে সম্মিলিতভাবে। কিন্তু শরীয়ত যেখানে কোনো একটি পন্থা নির্দিষ্ট করেনি সেখানে উভয় পন্থাই মুবাহ। বিনা দলীলে কোনো একটিকে যেমন নাজায়েয বলা যায় না তেমনি সুন্নত বা জরুরিও বলা যায় না। এধরনের ক্ষেত্রে উভয় পন্থাই মুবাহ ও দুআকারীর ইচ্ছাধীন থাকে।
উল্লেখ্য, সম্মিলিত দুআ দুইভাবে হতে পারে। এক. সমবেত লোকদের মধ্যে একজন দুআ করবে এবং অন্যরা আমীন বলবে। দুই. একস্থানে সমবেত হয়ে সবাই দুআ করবে, প্রত্যেকে নিজে নিজে দুআ করবে। এই উভয় ছুরত জায়েয।
এছাড়া সমবেত হওয়ারও দুই ছুরত হতে পারে। শুধু দুআর উদ্দেশ্যেই সমবেত হওয়া কিংবা কোনো দ্বীনি বা দুনিয়াবী কাজের উদ্দেশ্যে সমবেত হয়ে মজলিসের শুরু বা শেষে সম্মিলিতভাবে দুআ করা। এই দুই ছুরতই জায়েয। তবে কোথাও যদি কোনো শরয়ী সমস্যা যুক্ত হয় তবে তার হুকুম ভিন্ন।
এই সংক্ষিপ্ত মৌলিক আলোচনার পর শরীয়তের দলীলসমূহে সম্মিলিত দুআর সূত্র লক্ষ্য করুন।
১. প্রথম কথা তো হল, শরীয়তে সম্মিলিত দুআর এমন কিছু ক্ষেত্র বিদ্যমান রয়েছে যা একেবারেই সুস্পষ্ট এবং যে বিষয়ে দ্বিমতের কোনোই অবকাশ নেই। যেমন-
(ক) জামাতের নামাযের জাহরী (স্বশব্দে) কিরাআতে ইমাম যখন সূরা ফাতিহা সমাপ্ত করেন তো সবাই ‘আমীন’ বলে। নামাযে সূরা ফাতিহা মূলত কিরাআত হিসেবে পড়া হলেও তা একই সঙ্গে দুআও বটে। এজন্যই তা সমাপ্ত হওয়ার পর আমীন বলা সুন্নত। একই কারণে সূরা ফাতিহার অপর নাম ‘দুআউল মাসআলাহ।’
(খ) জানাযার নামায একদিকে যেমন নামায অন্যদিকে তা দুআও বটে। জানাযার নামাযের মূলকথা হচ্ছে দুআ। এই নামাযও জামাতের সঙ্গে আদায় করা হয় এবং তৃতীয় তাকবীরের পর ইমাম-মুকতাদী সবাই একসঙ্গে মাইয়্যেতের জন্য দুআ করে।
(গ) অনাবৃষ্টি দেখা দিলে এবং প্রয়োজন সত্ত্বেও যথারীতি বৃষ্টি না হলে শরীয়তে ‘ইস্তিসকা’র (অর্থাৎ আল্লাহর কাছে রহমতের বৃষ্টি কামনা করার) নির্দেশ এসেছে। ‘ইস্তিসকা’র বিভিন্ন পদ্ধতি আছে। একটি পদ্ধতি এই যে, সবাই সম্মিলিতভাবে দুআ করবে। যেমন সহীহ বুখারীতে আনাস রা.-এর বর্ণনা এসেছে যে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বৃষ্টির জন্য উভয় হাত উঠিয়ে দোয়া করেছেন এবং তাঁর সঙ্গে উপস্থিত সকলে হাত উঠিয়ে দোয়া করেছেন।-সহীহ বুখারী
(ঘ) জুমা ও দুই ঈদের খুৎবায় খতীব দুআ করেন এবং শ্রোতাগণ মনে মনে আমীন বলেন। সম্মিলিত দুআর এই পদ্ধতিও সব জায়গায় প্রচলিত রয়েছে। রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাধারণত ‘ইস্তিগফার’ এর মাধ্যমে খুৎবা সমাপ্ত করতেন (মারাসীলে আবু দাউদ; যাদুল মাআদ ১/১৭৯)
২. কুরআন মজীদে ইরশাদ হয়েছে-
قَالَ قَدْ اُجِیْبَتْ دَّعْوَتُكُمَا
‘তোমাদের দুজনের দুআ কবুল করা হয়েছে।’
এআয়াতে‘তোমাদের দুই জনের দুআ’ বলতে মুসা আ. ও হারূন আ. এর দুআ বোঝানো হয়েছে। একাধিক সাহাবী ও বেশ কয়েকজন তাবেঈ ইমামের সূত্রে বর্ণিত হয়েছে যে, হযরত মুসা আ. দুআ করেছেন এবং হারূন আ. আমীন বলেছেন। একেই আল্লাহ তাআলা ‘দুইজনের দুআ’ বলেছেন।
(তাফসীরে ইবনে কাছীর ২/৪৭০; আদ্দুররুল মানছূর ৩/৩১৫)
তো এটা তাঁদের দু’জনের সম্মিলিত দুআ ছিল, যা আল্লাহ তাআলা কবুল করেছেন এবং খোশখবরী শুনিয়েছেন যে- ‘তোমাদের দু’জনের দুআ কবুল করা হয়েছে।’
৩. সাহাবিয়ে রাসূল হযরত হাবীব ইবনে মাসলামা আলফিহরী রা., যিনি বড় ‘মুস্তাজাবুদ দাওয়াহ’ ছিলেন, একবার তাকে একটি বাহিনীর আমীর নিযুক্ত করা হয়। তিনি যুদ্ধের প্রয়োজনীয় প্রস্ত্ততি সমাপ্ত করার পর যখন যুদ্ধের সময় নিকটবর্তী হল তখন সহযোদ্ধাদের লক্ষ্য করে বললেন-
سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ : لَا يَجْتَمِعُ مَلَأٌ فَيَدْعُو بَعْضُهُمْ وَيُؤَمِّنُ سَائِرُهُمْ إِلَّا أَجَابَهُمُ اللَّهُ
‘আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি যে, কিছু মানুষ যখন কোথাও একত্র হয়ে এভাবে দুআ করে যে, একজন দুআ করে এবং অন্যরা আমীন বলে তো আল্লাহ তাআলা অবশ্যই তাদের দুআ কবুল করেন।’

এই হাদীস বয়ান করে তিনি আল্লাহ তাআলার হামদ ও ছানা করলেন এবং দুআ করতে আরম্ভ করলেন। তাঁর দুআর একটি অংশ এই ছিল-
اللَّهُمَّ احْقِنْ دِمَاءَنَا وَاجْعَلْ أُجُورَنَا أُجُورَ الشُّهَدَاءِ
‘ইয়া আল্লাহ, আমাদের প্রাণ রক্ষা করুন এবং আমাদেরকে শহীদদের সমতুল্য ছওয়াব দান করুন।’
তাঁরা সবাই দুআতেই মশগুলে ছিলেন ইতোমধ্যে রোমক বাহিনীর সেনাপতি (অস্ত্র ত্যাগ করে) হাবীব ইবনে মাসলামা রা-এর তাবুতে এসে উপস্থিত হল।-মুজামে কাবীর, তাবরানী ৪/২৬; মুসতাদরাকে হাকেম ৩/৩৪৭
বর্ণনাটির সম্পূর্ণ আরবী পাঠ নিম্নরূপ :
عَنْ حَبِيبِ بن مَسْلَمَةَ الْفِهْرِيُّ وَكَانَ مُسْتَجَابًا أَنَّهُ أُمِّرَ عَلَى جَيْشٍ فَدَرَّبَ الدُّرُوبَ، فَلَمَّا لَقِيَ الْعَدُوَّ، قَالَ لِلنَّاسِ : سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، يَقُولُ : لا يَجْتَمِعُ مَلأٌ فَيَدْعُو بَعْضُهُمْ وَيُؤَمِّنُ سَائِرُهُمْ إِلا أَجَابَهُمُ اللَّهُ، ثُمَّ إِنَّهُ حَمِدَ اللَّهَ وَأَثْنَى عَلَيْهِ، فَقَالَ : اللَّهُمَّ احْقِنْ دِمَاءَنَا وَاجْعَلْ أُجُورَنَا أُجُورَ الشُّهَدَاءِ، فَبَيْنَمَا عَلَى ذَلِكَ إِذْ نَزَلَ الْهِنْبَاطُ أَمِيرُ الْعَدُوِّ،فَدَخَلَ عَلَى حَبِيبٍ سُرَادِقَهُ.
رواه الطبراني في الكبير والحكم في المستدرك، والراوي عن ابن لهيعة أبو عبد الرحمن المقري، وهو أحد العبادلة الذين تعد روايتهم عن ابن لهيعة صحيحة.
এই রেওয়ায়েতের সনদ কম করে হলেও ‘হাসান’ পর্যায়ের।
প্রশ্ন এই যে, সম্মিলিত দুআর ভিত্তি প্রমাণের জন্য এরচেয়ে স্পষ্ট বর্ণনার প্রয়োজন আছে কি?
৪. ইতিহাসে ‘আলা আলহাযরামী রা-এর ঘটনা সুপ্রসিদ্ধ। বাহরাইনের মুরতাদদের সঙ্গে ১১ হিজরীতে যে লড়াই হয়েছিল তাতে তিনি সিপাহসালার ছিলেন। সেই অভিযানের একটি প্রসিদ্ধ ঘটনা এই যে, মুসলিম বাহিনী একস্থানে যাত্রাবিরতি করতেই কাফেলার সকল উট রসদপত্রসহ পলায়ন করল। একটি উটও পাকড়াও করা গেল না। অবস্থা এই দাড়াল যে, পরনের কাপড় ছাড়া কোনো রসদ কাফেলার সঙ্গে রইল না। সবার পেরেশান অবস্থা। ‘আলা আলহাযরামী রা. ঘোষকের মাধ্যমে সবাইকে একত্র করলেন এবং শান্তনা দিয়ে বললেন, ‘তোমরা মুসলমান, আল্লাহর রাস্তায় আছ তোমরা আল্লাহর সাহায্যকারী। অতএব আল্লাহ তোমাদেরকে সহায়-সঙ্গী বিহীন অবস্থায় ত্যাগ করবেন না।’ ইতোমধ্যে ফজরের আযান হল। তিনি নামাযে ইমামতি করলেন। নামাযের পর দোজানু হয়ে বসে অত্যন্ত বিনয় ও কাতরতার সঙ্গে দুআয় মশগুল হয়ে গেলেন। কাফেলার সবাই দুআ করতে লাগল। এ অবস্থায় সূর্য উদিত হল, কিন্তু তারা দুআয় মশগুল রইলেন। একপর্যায়ে আল্লাহ তাআলা তাদের সন্নিকটে একটি বড় জলাশয় সৃষ্টি করে দিলেন। সবাই সেখানে গেলেন, তৃষ্ণা নিবারণ করলেন এবং গোসল করলেন। বেলা কিছু চড়ার পর একে একে সকল উট সমস্ত রসদসহ ফিরে আসতে লাগল।
হাদীস ও তারীখের ইমাম ইবনে কাছীর রাহ. বলেন, এটা ওই লড়াইয়ের অনেকগুলো অলৌকিক ঘটনার একটি, যা লোকেরা সরাসরি প্রত্যক্ষ করেছে।
আলোচ্য বিষয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরবী ইবারতটুকু তুলে দিচ্ছি :
فلما قضا الصلاة جثا على ركبتيه وجثا الناس، ونصب في الدعاء ورفع يديه وفعل الناس مثله ...
দেখুন, আলবিদায়া ওয়াননিহায়া ৫/৩৪; তারীখে তাবারী ২/৫২৩

মোটকথা, শরীয়তের দৃষ্টিতে সম্মিলিত দুআর প্রমাণ-সিদ্ধতা একটি স্পষ্ট বিষয়। এসম্পর্কে অতিরিক্ত দলীল-প্রমাণের প্রয়োজন নেই। সম্মিলিত দোয়া সম্পর্কে আরো হাদীস জানতে হলে শায়েখ আব্দুল হাফিজ মাক্কী সংকলিত ‘ইসতিহবাবুদ দোয়া বা‘দাল ফারাইয’ কিতাবটি (পৃ. ৬৮-৭৯) দেখা যেতে পারে।
প্রশ্নোক্ত বর্ণনা দু’টির স্বরূপ
প্রশ্নে আপনি জামেয়া ইসলামিয়া মদীনা মুনাওয়ারার ওই ফাযেলের উদ্ধৃতিতে দু’টি রেওয়ায়েত উল্লেখ করেছেন, যার মাধ্যমে তিনি সম্মিলিত দুআর ভিত্তিহীনতা প্রমাণ করতে চেয়েছেন।
প্রথম বর্ণনা : একবার ইস্তিসকার সময় হযরত উমর রা. হযরত আববাস ইবনে আবদুল মুত্তালিব রা.কে দুআর জন্য অসীলা বানিয়েছিলেন। তিনি সেসময় একা দুআ করেন, সম্মিলিতভাবে নয়।
লক্ষ্য করুন, যদি এই রেওয়ায়েত সঠিকও ধরে নেওয়া হয় তাহলে এর মাধ্যমে শুধু একা দুআর বৈধতা প্রমাণ হতে পারে অথবা খুব বেশি হলে এটুকু যে, দুআ জামাতের সঙ্গে হওয়া অপরিহার্য নয়, একাকীও হতে পারে। কিন্তু এ বর্ণনা থেকে সম্মিলিত দুআ নিষেধ-এটা কীভাবে বোঝা গেল?!
এরপর মজার বিষয় এই যে, সে সময় হযরত আববাস রা. একা দুআ করেছিলেন- এ কথাটাই বানানো। হযরত আববাস রা-এর ওই দুআ সম্মিলিত দুআই ছিল।
সহীহ বুখারী ও তার ব্যাখ্যাগ্রন্থ ফাতহুল বারীতে পূর্ণ ঘটনা উল্লেখিত হয়েছে, যার সারাংশ এই যে, লোকেরা বৃষ্টির জন্য দুআর উদ্দেশ্যে একত্র হল। হযরত উমর রা. খুৎবা দিলেন এবং বললেন, রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (তার চাচা) আববাসকে পিতার মতো মনে করতেন। অতএব তোমরা তাঁর সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অনুসরণ কর এবং তাঁকে আল্লাহর দরবারে অসীলা বানাও। এরপর হযরত আববাস রা. ও উপস্থিত সবাই দুআ করতে আরম্ভ করেন। হযরত আববাস রা-এর দুআ এই ছিল-
اللَّهُمَّ إِنَّهُ لَمْ يَنْزِلْ بَلَاءٌ مِنَ السَّمَاءِ إِلَّا بِذَنْبٍ، وَلَمْ يَكْشِفْ إِلَّا بِتَوْبَةٍ، وَقَدْ تَوَجَّهَ الْقَوْمُ بِي إِلَيْكَ لِمَكَانِي مِنْ نَبِيِّكَ، وَهَذِهِ أَيْدِينَا إِلَيْكَ بِالذُّنُوبِ وَنَوَاصِينَا إِلَيْكَ بِالتَّوْبَةِ، فَاسْقِنَا الْغَيْثَ.
সবাই দুআয় মশগুল ছিলেন। ইতোমধ্যে মুষলধারে বৃষ্টি হতে আরম্ভ করে। (ফাতহুল বারী ২/৫৭৭ কিতাবুল ইস্তিসকা)
দুআটির তরজমা এই, ‘ইয়া আল্লাহ, গুনাহর কারণে বিপদাপদ আসে আর তাওবার মাধ্যমেই তা দূর হয়। যেহেতু আপনার নবীর সঙ্গে আমার বিশেষ সম্বন্ধ আছে এজন্য সবাই আমাকে অসীলা বানিয়ে আপনার দয়ার ভিখারী হয়েছে। আমাদের গুনাহগার হাতগুলো আপনার দরবারে উত্তোলিত রয়েছে আর আমাদের কপাল তওবার সঙ্গে আনত রয়েছে। বৃষ্টির মাধ্যমে আপনি আমাদের ফরিয়াদ কবুল করুন।’
পাঠকবৃন্দই বলুন, এই দুআ সম্মিলিত ছিল না একাকী? তাছাড়া এ বিষয়ে তাবাকাতে ইবনে সাআদ : -এ স্পষ্ট উল্লেখ আছে যে, সে দোয়ায় ওমর রা. এবং সকল মানুষ হাত উঠিয়ে দীর্ঘক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহর দরবারে কেঁদেছিলেন।
দ্বিতীয় বর্ণনা : আপনি বলেছেন যে, দ্বিতীয় রেওয়ায়েত তিনি মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বা (হাদীস ৬২৪২)-এর উদ্ধৃতিতে লিখেছেন, কিন্তু মুসান্নাফের কোনো এডিশনেই উপরোক্ত নম্বরে এমন কোনো রেওয়ায়েত নেই। তদ্রূপ মুসান্নাফের অন্য কোনো স্থানেও আমরা ওই বর্ণনা পাইনি। তবে মুসান্নাফের ২৬৭১৫ নম্বরে (নতুন সংস্করণ) একটি রেওয়ায়েত আছে, সম্ভবত লেখক ইচ্ছাকৃতভাবে বা অজ্ঞাতসারে তা বিকৃত করে উল্লেখ করেছেন, কেননা, সম্মিলিত দুআর সঙ্গে ওই বর্ণনার কোনো সম্পর্ক নেই। পূর্ণ বর্ণনা নিম্নে উদ্ধৃত হল-
عن أبي عثمان قال : كتب عامل لعمر بن الخطاب رضي الله عنه إليه : أن ههنا قوماً يجتمعون، فيدعون للمسلمين وللأمير. فكتب إليه عمر : أقبل وأقبل بهم معك فأقبل. فقال عمر، للبواب : أعِدَّ لي سوطاً، فلما دخلوا على عمر، أقبل على أميرهم ضرباً بالسوط. فقال: يا أمير المؤمنين! إنا لسنا أولئك الذين يعني أولئك قوم يأتون من قبل المشرق.
অর্থ : আবু উছমান বলেন, উমর ইবনুল খাত্তাব রা.-এর একজন প্রশাসক তাকে পত্র লিখলেন যে, এখানে কিছু মানুষ আছে যারা একস্থানে একত্র হয় এবং মুসলমানদের জন্য ও ‘আমীরে’র জন্য দুআ করে। (হযরত) উমর রা. তাকে উত্তরে লিখলেন, ‘তুমি তাদেরকে নিয়ে আমার কাছে আস।’ প্রশাসক তাদেরকে নিয়ে উপস্থিত হলেন। এদিকে (হযরত) উমর রা. প্রহরীকে বললেন, একটা চাবুক প্রস্ত্তত করে রাখ। যখন তারা (হযরত) উমর রা.-এর দরবারে উপস্থিত হল তখন তিনি তাদের আমীরকে চাবুক মারতে লাগলেন। সে বলল, আমীরুল মু’মিনীন, আমরা ওই গোষ্ঠী নই, তারা মাশরিক থেকে আসে। (মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বা, হাদীস ২৬৭১৫, কিতাবুল আদব, মান কারিহাল কাসাসা ওয়াজজারবা ফীহ)
উপরোক্ত রেওয়ায়েত মনোযোগ সহকারে অধ্যয়ন করলে আপনি পরিষ্কার বুঝতে পারবেন যে, হযরত উমর রা. কেন নারাজ হয়েছেন এবং কেন প্রহার করেছেন।
এরা কোনো উদ্দেশ্যে একত্র হয়েছিল এবং নিজেদের মধ্যে একজনকে আমীর বানিয়েছিল। এরপর প্রতিদিন সম্মিলিত হয়ে মুসলমানদের জন্য ও নিজেদের আমীরের জন্য (আমীরুল মু’মিনীন উমর রা.-এর জন্য নয়) দুআ করত। বলাবাহুল্য, ইসলামী খিলাফত বিদ্যমান থাকা অবস্থায় গোপনে ভিন্ন নেতৃত্ব তৈরির কোনোই অবকাশ নেই। হযরত উমর রা. অত্যন্ত বিচক্ষণ ও দূরদর্শী ছিলেন। তাদের এই কার্যকলাপ থেকে বিদ্রোহ বা ফিৎনার আশঙ্কা করে তৎক্ষণাৎ তাদের শাস্তির ব্যবস্থা করেছেন।
মোটকথা, বিষয়টা সম্মিলিত দুআর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয়, গোপন নেতৃত্ব সৃষ্টির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। এজন্য এখান থেকে এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা ভুল হবে যে, হযরত উমর রা. তাদেরকে সম্মিলিত দুআর জন্য প্রহার করেছিলেন।
সহীহ বুখারী (হাদীস ৬৪০৮) সহীহ মুসলিম (হাদীস ২৬৮৯)সহ বহু হাদীসের কিতাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ওই হাদীস বর্ণিত হয়েছে, যাতে যিকরের হালকার ফযীলত বয়ান করেছেন। সে হাদীসে যিকরের হালকায় কী আমল হয় তারও বিবরণ আছে। এই হাদীস যাদের জানা আছে তারা জানেন যে, তাতে তাসবীহ ও তাহলীলের সঙ্গে জান্নাতের প্রার্থনা, জাহান্নাম থেকে পানাহ চাওয়া ও ইস্তেগফারের আমলও শামিল রয়েছে। প্রশ্ন এই যে, জান্নাত লাভের ও জাহান্নাম থেকে মুক্তির প্রার্থনা, ইসতিগফার- এগুলো কি দুআ নয়? আর যিকিরের হালকায় যিকরের সঙ্গে যখন দুআও শামিল রয়েছে তো এটা কি সম্মিলিত দুআ হল না?
এই হাদীস এবং এ বিষয়ের অন্যান্য হাদীস আর এ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য শরয়ী দলীল বিদ্যমান থাকা অবস্থায় সম্মিলিত দুআর ওপর কীভাবে কাউকে প্রহার করা যেতে পারে?
আলোচনা দীর্ঘ হয়ে গেল তবুও একটি প্রয়োজনীয় বিষয়ে ইঙ্গিত করে দেওয়া মুনাসিব মনে করছি। বিষয়টি এই যে, উপরোক্ত সম্পূর্ণ আলোচনা এমন সম্মিলিত দুআ সম্পর্কে যাতে কোনো শরয়ী সমস্যা নেই। যদি কোথাও সম্মিলিত দুআর নামে এমন কোনো কাজ করা হয়, যা শরীয়তের দৃষ্টিতে আপত্তিকর, তবে অবশ্যই তা সংশোধনযোগ্য। যেমন কোথাও এই রেওয়াজ হয়ে গেল যে, মাইয়্যেতের ঈসালে ছওয়াবের জন্য এটা অপরিহার্য মনে করা যে, অবশ্যই মাইয়্যেতের জন্য ঈসালে ছওয়াবের মাহফিল করে সম্মিলিত দু্আ করতে হবে, তা না হলে মাইয়্যেতের নিকট ছওয়াব পৌঁছবে না এবং তার হক আদায় হবে না! এটা অবশ্যই একটা ভ্রান্ত ধারণা যা সংশোধন করা জরুরি।
কিংবা যেখানে শরীয়ত সম্মিলিত দুআকে শুধু মুস্তাহাব বা মুবাহ সাব্যস্ত করেছে কোনো অঞ্চলের মানুষ যদি তাকে অপরিহার্য মনে করতে থাকে যেন তা একটি অবশ্য পালনীয় সুন্নত তবে এটাও একটা ভুল ধারণা যা সংশোধন করা জরুরি।
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সকল বিষয় নির্ধারিত সীমারেখার ভিতরে রাখার তাওফীক দান করুন। আমীন ।
[ মাসিক আলকাউসার » শাবান-রমযান ১৪২৯ . আগস্ট ২০০৮ ]

Address

Kathaltali, Hafijabad
Karimganj
788725

Website

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when Mufti Mabrur Alam Qasmi posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Shortcuts

Share