28/05/2026
সকলকে ঈদ-উল-আযহার শুভেচ্ছা 🙏🙏
#বকরিঈদ #ঈদউলআযহা
#বাংলাগল্প #গল্প
।। কুরবানী ।।
গ্রামের নাম হাসনপুর। চৈত্র-বৈশাখের রুক্ষতায় যে মাঠ তামাটে চামড়ার মতো ফেটে চৌচির হয়ে পড়ে থাকে, আষাঢ়ের প্রথম মেঘের স্পর্শে তা-ই আবার সবুজ মখমলে ঢাকা পড়ে। প্রকৃতির এই রূপান্তর সহজ, কিন্তু মানুষের মন বড় জটিল। সেখানে একবার ফাটল ধরলে তা আর সহজে জোড়া লাগে না; ঠিক হাসনপুরের মানুষের ওই চৈত্র শেষের ফাটা মাটির মতো শুষ্ক, জমাট বাঁধা জেদ।
নূর মহম্মদ খাঁন এই গ্রামের মাতব্বর গোছের মানুষ। মাথার কাঁচাপাকা চুলে আভিজাত্যের ছোঁয়া, চোখে সোনালী ফ্রেমের চশমাটা তাঁর ব্যক্তিত্বে একটা গম্ভীর ছাপ রেখেছে। তাঁর বৈঠকখানায় বসলে মনে হয় সময়টা বিগত শতকের কোনো এক অলস দুপুরে থমকে আছে। কিন্তু সেই বৈঠকখানা থেকে বেরিয়ে উঠোনে দাঁড়ালেই বাস্তবের রূঢ় রূপটা চোখে পড়ে। সেখানে একটা সদ্য তোলা ইটের পাঁচিল বুক চিরে দুই ভাগ করে দিয়েছে একসময়ের অখণ্ড উঠোনটাকে। দুই ভাই—নূর মহম্মদ আর শের মহম্মদ—আজ পরস্পরের ছায়াও মাড়ান না। স্রেফ একটা শরিকী আমগাছের মালিকানা আর সীমানার অধিকার নিয়ে অহংকারের এই দুর্ভেদ্য প্রাচীর খাড়া হয়েছে।
আজ জিলহজ মাসের নয় তারিখ, অর্থাৎ আরাফাহর দিন। আগামীকাল সকালে কুরবানীর ঈদ। বাতাসে এখন উৎসবের চেয়েও বেশি প্রতিযোগিতার গন্ধ। গ্রামের মোড়ে মোড়ে, চায়ের দোকানে এখন একটাই চর্চা—কার পশু কত বড়, কার টাকা কত বেশি। নূর সাহেব এবার কোনো খামতি রাখেননি; অনেক খুঁজে এক পেল্লাই সাইজের ধবধবে সাদা বলদ এনেছেন,রাজকীয় তার ভঙ্গি। গ্রামের উৎসুক মানুষ দল বেঁধে এসে দেখে যাচ্ছে, আর নূর সাহেবের বুকটা প্রচ্ছন্ন অহংকারে ভরে উঠছে।
তার ঠিক উল্টো পিঠে, শরিকী পাঁচিলের ওপারে শের মহম্মদের ঘরটায় এক ফালি লণ্ঠনের আলোও আজ ম্রিয়মাণ। এক থমথমে অন্ধকার সেখানে জাঁকিয়ে বসেছে। শের মহম্মদের ছোট ছেলে পল্টুর গা-পোড়ানো টাইফয়েড জ্বর, কদিন ধরে ধুঁকছে অবোধ শিশুটা। স্থানীয় ডাক্তারবাবু কপালে ভাঁজ ফেলে বলেছেন, “অবস্থা ভালো নয় শেরু। আজ রাতের মধ্যে সদরের বড় হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে ভর্তি করতে হবে। অনেক টাকার ধাক্কা, ওষুধ আর চিকিৎসার খরচ কম নয়।”
শের মহম্মদ কোত্থেকে পাবেন অত টাকা? ঘটিবাটি, জমিজমা যা ছিল, সব তো এই ভাইয়ের সাথে জেদের বশে করা মামলার পেছনেই গেছে। নূর সাহেবের কানেও খবরটা পৌঁছেছে বৈকি, কিন্তু তিনি একটা নিস্পৃহ ভাব নিয়ে বসে রইলেন। মনে মনে নিজেকে শোনালেন, "গাছ কাটার সময় তো খুব তেজ ছিল, মুরুব্বিয়ানা দেখিয়েছিল! এখন বুঝুক খাঁন সাহেবের সাথে লাগার মজা।"
বিকেলের দিকে গ্রামের প্রবীণ ইমাম সাহেব মোস্তফা কামাল এলেন নূর সাহেবের বৈঠকখানায়, ঈদের জামাতের কিছু জরুরি পরামর্শ করতে। বাইরের বলদটার দিকে তাকিয়ে তিনি মৃদু স্বরে বললেন, “মাশাআল্লাহ, খাঁন সাহেব! জব্বর পশু এনেছেন। তা, ত্যাগের মহিমা তো পশুর শরীরের মাপে নয়, নিয়তের গভীরতায়।”
নূর সাহেব চশমাটা নাকের ওপর সামান্য ঠিক করে নিয়ে, একটু তৃপ্তির হাসিতে বললেন, “সে তো বটেই ইমাম সাহেব। তবে আল্লাহর দরবারে সেরা জিনিসটাই দেওয়া বান্দার কাজ। মোটা অঙ্কের নগদ টাকা খসালাম এটার পেছনে, কম তো নয়!”
ইমাম সাহেব চায়ের কাপে আলতো চুমুক দিলেন। তাঁর চোখে একটা প্রাজ্ঞ অথচ মায়াবী দীপ্তি। তিনি বললেন, “সঠিক বলেছেন। আচ্ছা খাঁন সাহেব, ‘কুরবানী’ শব্দের আসল অর্থ জানেন তো? ‘কুরব’ মানে তো নৈকট্য। যা আমাদের আল্লাহর কাছাকাছি নিয়ে যায়। কিন্তু সেই নৈকট্য পাওয়ার জন্য আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা পবিত্র কুরআনে স্পষ্ট বলেছেন—‘লাঁই ইয়ানাল্লাহা লুহূমুহা ওয়া লা দিমাউ ওয়া লাঁই ইয়ানালুহুত্তাকওয়া মিনকুম’। অর্থাৎ, আল্লাহর দরবারে পশুর রক্ত বা মাংস পৌঁছায় না, পৌঁছায় কেবল আপনাদের অন্তরের ‘ তাকওয়া’—ভীতি আর শুদ্ধতা।”
ইমাম সাহেব কাপটা পিরিচে নামিয়ে রেখে সোজা তাকালেন নূর সাহেবের চোখের দিকে। তাঁর কণ্ঠস্বর হঠাৎ গম্ভীর ও ভারী হয়ে উঠল, “পশুর গলায় ছুরি চালানো তো বড্ড সহজ খাঁন সাহেব, ওটা তো স্রেফ একটা বাহ্যিক প্রতীক। আসল কুরবানী দিতে হয় নিজের ভেতরের ‘নফস’-কে, ওই অহংকারী আদিম পশুটাকে। এই যে ‘তাকাব্বুর’—লোকদেখানো লৌকিকতা, হিংসা আর ওই যে মনের ভেতরে পুষে রাখা পাঁচিলটা—ওটাকে কুরবানি না করতে পারলে ওপরওয়ালার দরবারে ওই রক্ত আর মাংস ছাড়া তো আর কিছুই পৌঁছাবে না। মনের ভেতর হিংসার আগুন জ্বালিয়ে রেখে, বাইরের ওই পশুর জবেহ স্রেফ একটা লোকদেখানো আচার খাঁন সাহেব, রিয়াকারী ছাড়া আর কিছুই নয়!”
কথাটা শেষ করেই ইমাম সাহেব উঠে গেলেন। কিন্তু নূর সাহেবের বুকের ভেতর কোথায় যেন একটা সূক্ষ্ম হুল বিঁধে রইল। সেই উদাসীন অথচ চাবুকের মতো সত্যগুলো তাঁর মাথার ভেতর ক্রমাগত চক্কর কাটতে লাগল।
রাতের দিকে একটা অদ্ভুত, ভারী নিস্তব্ধতা নামল হাসনপুরে। আকাশ প্লাবিত করা জোছনা, অথচ নূর সাহেবের ঘরের ভেতর এক নিরেট অন্ধকার। হঠাৎই নীরবতা ফালাফালা করে দিয়ে পাঁচিলের ওপার থেকে ভেসে এল এক বুকফাটা আর্তনাদ—পল্টুর মায়ের চাপা, রুদ্ধশ্বাস কান্নার আওয়াজ, “ওগো, খোদা কি আমাদের দিকে মুখ তুলে চাইবে না? আমার ছাওয়ালটা যে চোখের সামনে শেষ হয়ে যাচ্ছে!”
নূর সাহেব ঘুমাতে পারলেন না। ছটফট করে বারান্দায় এসে দাঁড়াতেই দেখলেন, চাঁদের আলোয় বলদটা উঠোনে দাঁড়িয়ে শান্ত, করুণ চোখে তাঁর দিকেই তাকিয়ে আছে। সেই চোখের মায়া বড় বিচিত্র, বড় উদাসীন। নূর সাহেব লক্ষ্য করলেন, বলদটার কোনো তাড়া নেই, কোনো জাগতিক অহংকার নেই—সে নিজেকে এক অদৃশ্য বিধাতার চরণে সঁপে দিয়েছে। অথচ তিনি নিজে? একটা সামান্য জড় গাছ আর মিথ্যে জেদের জন্য নিজের সহোদরের সঙ্গে বিবাদ তৈরি করে বসে আছেন!
নূর সাহেব ওপার থেকে আসা কান্নার আওয়াজ আর বলদের শান্ত চোখের দিকে তাকিয়ে অন্ধকারেই শিউরে উঠলেন। এক তীব্র অপরাধবোধ তাঁর মেরুদণ্ড বেয়ে নেমে গেল। ওই যে মাঝখানের পাঁচিলটা, ওটা কি কেবল ইটের ? নাকি তাঁর নিজেরই অন্ধ অহংকারেরও? তিনি যদি লাখ টাকা দিয়ে পশু কিনে নিজের নাম জাহির করেন, তবে সেটা কি কুরবানী, নাকি নিজের আত্মতুষ্টির এক নির্মম, কুৎসিত প্রদর্শনী? বুকের ভেতরটা হঠাৎ হাহাকার করে উঠল নূর সাহেবের।
পরদিন ভোরে, দূর মসজিদ থেকে ঈদের তাকবীরের সুমধুর ধ্বনি ভেসে আসছিল—আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার...। হাসনপুরের মানুষ ঈদের জামাতে যাওয়ার প্রস্তুতির মাঝেই এক অভূতপূর্ব দৃশ্য দেখল। নূর মহম্মদ খাঁন তাঁর বৈঠকখানায় ডেকে পাঠালেন ভাই শের মহম্মদকে। শের মহম্মদ এতদিনের বৈরিতা আর আশঙ্কায় ভয়ে ভয়ে, কুণ্ঠিত পায়ে এসে দাঁড়ালেন। তাঁর চোখ দুটো লাল, সারা রাত না ঘুমানোর ক্লান্তি আর আতঙ্কে হাত-পা কাঁপছে।
নূর সাহেব এক মুহূর্ত দ্বিধা না করে, সমস্ত সামাজিক মর্যাদা আর অহংকার এক লহমায় ছুঁড়ে ফেলে ভাইয়ের শীর্ণ হাত দুটো শক্ত করে ধরে ফেললেন। তাঁর চশমার ফ্রেম ছাপিয়ে তখন অবিরল ধারায় জল গড়িয়ে পড়ছে। শেরু কিছু বুঝে ওঠার আগেই নূর সাহেব তাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। এ এক বুকফাটা কান্না, যা এতদিনের জমে থাকা সমস্ত পাথরকে গলিয়ে দেয়।
কাঁপা গলায়, কান্নায় রুদ্ধ হয়ে নূর সাহেব বললেন, “শেরু, আমাকে মাফ করে দে ভাই! বাইরের বলদটার দাম অনেক হতে পারে, কিন্তু ওটা তোর ছেলের জীবনের চেয়ে, আমার ভাইয়ের চেয়ে বড় নয় রে। আমি অন্ধ হয়ে গিয়েছিলাম! শহরের এক ব্যবসায়ী কাল রাতেই বলদটা কিনতে চেয়েছিল, আমি ভোরেই তাকে খবর দিয়েছি। সে এখনই নগদ টাকা নিয়ে আসবে। এই নে আমার ঘরে থাকা জমানো টাকা, তুই এখনই ওকে নিয়ে সদরের হাসপাতালে ছোট। আমার ভাইপোকে সুস্থ করে আমার কোলে ফিরিয়ে আন। ওর যদি কিছু হয়, আমি আল্লাহর দরবারে মুখ দেখাতে পারব না রে ভাই!”
শের মহম্মদ যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারলেন না। বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে, বড় বড় চোখে দাদার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তাঁর চোখের কোণ বেয়েও তখন এতদিনের জমানো ক্ষোভ জল হয়ে ঝরে পড়ছে। থতমত খেয়ে বললেন, “কিন্তু দাদা, তোমার এত শখের কুরবানী? মহল্লার লোকে কী বলবে?”
নূর সাহেব উঠোনের সেই পাঁচিলটার দিকে তাকিয়ে এক টুকরো বিষাদমাখা হাসলেন। তাঁর চোখ তখন এক অপার্থিব শান্তিতে জ্বলজ্বল করছে। তিনি শেরুর কাঁধে হাত রেখে বললেন, “আমার কুরবানী তো হয়ে গেছে রে শেরু। যে পশুটোকে মারার সবচেয়ে বেশি দরকার ছিল, তাকে আজ সকালেই নিজের ভেতরে শেষ করে দিয়েছি। আল্লাহ খাঁটি নিয়ত আর বান্দার মহব্বত দেখেন, পশুর মাংস চান না। আজ থেকে এই পাঁচিল আমাদের আলাদা করতে পারবে না।”
হাসনপুরের আকাশে তখন ঈদের প্রথম সূর্য উঠছে। উঠোনের মাঝখানের ইটের পাঁচিলটা হয়তো এক লহমায় হাতুড়ি দিয়ে ভাঙল না, কিন্তু দুই ভাইয়ের মনের ভেতরে জমে থাকা বছরের পর বছরের জমাট বরফটা গলে জল হয়ে গেল। এক পরম আত্মিক তৃপ্তিতে নূর মহম্মদ খাঁন অনুভব করলেন, বাহ্যিক ত্যাগের লৌকিকতা ছাপিয়ে আজ তাঁর অন্তরে এক সত্যিকারের পবিত্র কুরবানী সম্পন্ন হয়েছে।
কলমে - #অর্ঘ্য_খামারু
#গল্পপ্রেমী #ঈদমোবারক