11/08/2020
বিজেপির দাবী পশ্চিমবঙ্গের জনক শ্যমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়!! হাসবো না কাঁদবো বুঝতে পারছি না।
২০ শে জুন ১৯৪৭ বাংলার আইন সভায় ভোটাভুটি হয় বাংলার ভবিষ্যৎ নির্ধারণের জন্য। হিন্দু মেজরিটি পশ্চিমবঙ্গ ভারতে থাকবে নাকি পাকিস্তানে যাবে তা নির্ধারন করতে। শ্যমাপ্রসাদ নয়, মুসলিম লীগের প্রস্তাবে এই ভোটাভুটি হয়েছিল। ত্রিপাক্ষিক এই ভোটাভুটিতে, সমস্ত বাংলার ফল দাড়িয়েছিল ১২০ পাকিস্তানের পক্ষে, ৯০ ভারতের পক্ষে। যদিও হিন্দু মেজরিটি পশ্চিমবঙ্গের জনপ্রতিনিধিদের ভোটাভুটির ফলাফল ছিল ২১ পাকিস্তানের পক্ষে, ৫৮ জন পশ্চিমবঙ্গের পক্ষে। ফলস্বরুপ পশ্চিমবঙ্গের ভারতে থাকায় আইনি স্ট্যাম্প পড়ে।
এবার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল আইনসভায় হিন্দু মহাসভার মাত্র ২ জন নির্বাচিত প্রতিনিধি ছিল, আর শ্যমাপ্রসাদ ইনডিপিন্ডেন্ট ক্যান্ডিডেট, মোট ৩ জন। অন্যদিকে কমিউনিস্ট পার্টির ৩ জন জনপ্রতিনিধি ছিল, জ্যোতি বসু সমেত, সবাই পশ্চিমবঙ্গের পক্ষে ভোট দিয়েছিল। কংগ্রেসের ৮৬ জন প্রতিনিধি ছিল অধিকাংশ পশ্চিমবঙ্গের পক্ষে ভোট দিয়েছিল। তাহলে মাত্র ৩ টি ভোট হাতে নিয়ে শ্যমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় কিভাবে পশ্চিমবঙ্গের জনক!
আপনারা বলবেন হিন্দু মহাসভার বেশী জনপ্রতিনিধি ছিল না, তবে আন্দোলনটা কে করেছিল দেখতে হবে। তাহলে দেখা যাক। আলাদা পশ্চিমবঙ্গের জন্য মোট ৭৬ টি জনসভা হয়েছিল, এর মধ্যে ৫৬ টি জনসভা হয়েছিল কংগ্রেসের নেতৃত্বে, হিন্দু মহাসভার নেতৃত্বে হয়েছিল ১২ টি জনসভা। তাহলে এই আন্দোলনের নেতৃত্ব শ্যমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় কিভাবে? এছাড়াও ইন্টেলেকচুয়ালদের আন্দোলনও সারা ফেলেছিল, যার নেতৃত্বে ছিল ডঃ মেঘনাদ সাহা, ঐতিহাসিক আর সি মজুমদার, ভাষাবিদ সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায়। পশ্চিমবঙ্গের দাবীতে ডাকা যানবাহন ধর্মঘট সাফল্যমন্ডিত হয় অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টির সাহায্যে। কংগ্রেসের তরফ থেকে এই আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন বিধান চন্দ্র রায়, নলিনী সরকার। সর্বোপরি ভাবে মুসলিম লীগের দাঙ্গা রাজনীতির বিরুদ্ধে পশ্চিমবঙ্গের প্রতিটি মানুষ পশ্চিমবঙ্গ চেয়েছিল এবং পেয়েছিল। তাহলে বিজেপি ক্রেডিট একা শ্যমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে কেন দিচ্ছে? এতো স্বাধীনতা আন্দোলনের ক্রেডিট ব্রিটিশ অনুগত সাভারকরকে একা দেওয়ার মতই হাস্যকর।
বরং ক্রেডিট যার প্রাপ্য সেই অতুল গুপ্তের নাম বিস্মৃত। Radcliff mission এ উনিই দরাদরি করে পশ্চিমবঙ্গের বহু এলাকা ভারতভুক্ত করেন। নয়তো পশ্চিমবঙ্গের আকার বর্তমানের অর্ধেক হত।
এখন দেখছি বিজেপি শ্যমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে রবীন্দ্রনাথ, নেতাজির সমকক্ষ একটি মনীষি করে তোলার জন্য কোমড় বেঁধে নেমেছেন। অন্যদিকে নেতাজির কংগ্রেস বিরোধিতাকে হাতিয়ার করে রাজনীতি করতে চাইছে বিজেপি। তাহলে দেখা যাক হিন্দু মহাসভা এবং শ্যমাপ্রসাদের সাথে নেতাজির সম্পর্ক কেমন ছিল।
নেতাজি ছিলেন হিন্দু মহাসভার সাম্প্রদায়িক রাজনীতির ঘোরতর বিরোধী। খুব কম সময়ের জন্য হলেও কংগ্রেসের প্রেসিডেন্ট থাকার সময় খোদ নেতাজি কংগ্রেস সদস্যদের হিন্দু মহাসভা এবং মুসলিম লীগের সদস্য হওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। যদিও এই দুটি দল বাদে অন্য রাজনৈতিক দল নিয়ে এই নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেননি।
ফরওয়ার্ড ব্লকের প্রতিষ্ঠাতা এবং ফরওয়ার্ড ব্লকের নেতা নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু ফরওয়ার্ড ব্লকের সাপ্তাহিক পত্রিকার সম্পাদকীয় তে লেখেন, ১৯৪০, ৪ঠা মে তে - " পূর্বে যদিও হিন্দু মহাসভা বা মুসলিম লীগের সদস্যরা কংগ্রেসের সদস্য হতে পারতেন, তবে আমি খুশি যে বর্তমানে কংগ্রেসের সংবিধান অনুসারে হিন্দু মহাসভা বা মুসলিম লীগের মত সাম্প্রদায়িক দলের সদস্যরা আর কংগ্রেসের সদস্য হতে পারবেন না।"
তখন শ্যমাপ্রসাদ বাবুর নেতাজি সম্পর্কে তার ডায়েরিতে লেখেন -" সুভাষচন্দ্র আমার সাথে দেখা করেন এবং বলেন হিন্দু মহাসভা যদি পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে মাথাচাড়া দিতে চায়, তবে সেটা জন্মের আগেই গুড়িয়ে দিতে বাধ্য হব, যদি বলপ্রয়োগ করতে হয় তাহলে সেটাই করব।" অন্য কেউ নন খোদ শ্যমাপ্রসাদ লিখেছেন এই ঘটনার কথা।
সুভাষচন্দ্র বসু কথায় খেলাপ করেননি। তখনকার হিন্দু মহাসভার নেতা বলরাজ মাধক এর কথায় -" সুভাষচন্দ্র বসু এবং তার দলবল হিন্দু মহাসভার প্রতিটি মিটিং বানচাল করতেন, যার ফলে শ্যমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় এবং সুভাষচন্দ্রের সম্পর্কের অবনতি হয়। এর প্রতিবাদে এক পথসভায় শ্যমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় বক্তব্য রাখতে উঠলে, সুভাষ চন্দ্রের দলবল একটি থান ইট ছোড়েন যা শ্যমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের মাথায় আঘাত করে, এবং উনি রক্তাক্ত হন।"
(কোটেশন গুলো ইংরেজি থেকে অনুবাদ করে দিয়েছি।)
বদলা নিয়েছিলেন শ্যমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, যখন আজাদ হিন্দ ফৌজ স্বাধীনতার লড়াই লড়ছে তখন শ্যমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, আরএসএস ব্রিটিশ বাহিনীর রিক্রুটমেন্ট ক্যাম্পেন করে কোলকাতায়। সেখানে বলা হয় প্রতিটি হিন্দু সন্তানের পবিত্র কর্তব্য ব্রিটিশদের পাশে দাড়ানো এবং আজাদ হিন্দ ফৌজকে পরাস্ত করা।
বিজেপি যতই চেষ্টা করুক শ্যমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে রবীন্দ্রনাথ, নেতাজির সমকক্ষ করে তুলে পশ্চিমবঙ্গের জনক করে তোলার, আমরা সেই প্রচেষ্টাকে রুখব। কারণ ব্রিটিশ দালাল শ্যমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় জনসংঘের জনক হতে পারেন, পশ্চিমবঙ্গের জনক কখনই নন।
২৩৷০৬৷২০২০
#শেয়ার_করুন