15/08/2026
স্বাধীনতার ৮০তম বর্ষে বিদ্যালয়ে বর্ণাঢ্য উদ্যাপন ও রক্তদান কর্মসূচি
নিজস্ব সংবাদদাতা:
দেশের ৮০তম স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে আজ বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হল এক বর্ণময়, সাড়ম্বর ও তাৎপর্যপূর্ণ অনুষ্ঠান। জাতীয়তাবোধ, দেশপ্রেম, সাংস্কৃতিক চেতনা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার এক অপূর্ব মেলবন্ধনে বিদ্যালয়ের স্বাধীনতা দিবস উদ্যাপন এদিন এক বিশেষ মাত্রা লাভ করে।
সকালের নির্মল পরিবেশে যথাযোগ্য মর্যাদায় জাতীয় পতাকা উত্তোলনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শ্রী সুব্রত ঘোষ জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন। পতাকা উত্তোলনের পর জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশিত হয় এবং সমগ্র বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ এক গম্ভীর অথচ আবেগঘন দেশাত্মবোধের আবহে মুখরিত হয়ে ওঠে।
এরপর প্রধান শিক্ষক তাঁর স্বাগত ভাষণে স্বাধীনতার প্রকৃত তাৎপর্য, দেশ ও সমাজের প্রতি ছাত্রছাত্রীদের দায়িত্ব এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্যে মানবিক ও দেশপ্রেমিক মূল্যবোধ গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন। অনুষ্ঠানে তিনি নিজেও আবৃত্তি পরিবেশন করে উপস্থিত সকলকে মুগ্ধ করেন।
স্বাধীনতা দিবসের অন্যতম আকর্ষণ ছিল বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের সুসজ্জিত কুচকাওয়াজ। সুশৃঙ্খল কুচকাওয়াজের মাধ্যমে প্রধান শিক্ষককে প্রদান করা হয় গার্ড অফ অনার। বিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা, ঐক্য ও ছাত্রছাত্রীদের প্রশিক্ষণের এক সুন্দর নিদর্শন হয়ে ওঠে এই পর্ব।
এদিন বিদ্যালয়ের দুই বর্ষীয়ান শিক্ষক মৃণালবাবু ও উত্তমবাবুকে বিশেষভাবে সংবর্ধিত করা হয়। তাঁদের দীর্ঘদিনের নিষ্ঠা, অভিজ্ঞতা, শিক্ষাক্ষেত্রে অবদান এবং বিদ্যালয়ের প্রতি আন্তরিকতার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে প্রধান শিক্ষক ও বিদ্যালয় পরিবারের পক্ষ থেকে তাঁদের সম্মানিত করা হয়। এই সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে উপস্থিত সকলের মধ্যে আবেগ ও শ্রদ্ধার আবহ তৈরি হয়।
অনুষ্ঠানের অন্যতম প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বারাসাত বিধানসভার নবনির্বাচিত বিধায়ক শ্রী শংকর চ্যাটার্জী মহাশয়। তাঁর উপস্থিতি অনুষ্ঠানের মর্যাদা আরও বৃদ্ধি করে। বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি বিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ, ছাত্রছাত্রীদের সাফল্য এবং বিদ্যালয়ের সার্বিক উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন। বিদ্যালয়ের উন্নয়নের প্রয়োজনে ভবিষ্যতেও তিনি বিদ্যালয়ের পাশে থাকার অঙ্গীকার করেন। তাঁর এই আশ্বাস বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষিকা, ছাত্রছাত্রী এবং অভিভাবক মহলে যথেষ্ট আশার সঞ্চার করে। বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে প্রধান শিক্ষক মহাশয় তাঁকে স্মারক প্রদান করে সম্মানিত করেন।
এরপর শুরু হয় মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক ও শিক্ষিকাদের সম্মিলিত পরিবেশনায় গান, আবৃত্তি, নৃত্য ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক পরিবেশনা অনুষ্ঠানে এক অন্য মাত্রা যোগ করে। দেশপ্রেম, স্বাধীনতার চেতনা এবং বাংলার সংস্কৃতির নানা দিক উঠে আসে এই পরিবেশনাগুলিতে। দর্শকাসনে উপস্থিত অভিভাবক, আমন্ত্রিত অতিথি এবং এলাকাবাসী তাঁদের প্রাণবন্ত পরিবেশনায় মুগ্ধ হন।
তবে এবারের স্বাধীনতা দিবস উদ্যাপনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সামাজিক সংযোজন ছিল বিদ্যালয় ও পল্লীমেলা কমিটির যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত রক্তদান কর্মসূচি। স্বাধীনতার আনন্দকে কেবল আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে মানুষের জীবন রক্ষার মহান কাজে নিজেদের যুক্ত করার এই উদ্যোগ অনুষ্ঠানে এক অনন্য মানবিক মাত্রা যোগ করে।
একটি শীততাপ নিয়ন্ত্রিত ভলভো বাসে বিশেষভাবে আয়োজিত রক্তদান শিবিরে এলাকার উৎসাহী মানুষেরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে রক্তদান করেন। স্বাধীনতা দিবসের সকালে দেশের প্রতি ভালোবাসাকে মানুষের প্রতি ভালোবাসার সঙ্গে যুক্ত করে রক্তদাতারা যে মানবিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন, তা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। রক্তদানের এই উদ্যোগকে কেন্দ্র করে এলাকাবাসীর মধ্যেও যথেষ্ট উৎসাহ ও আগ্রহ পরিলক্ষিত হয়।
তবে ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও বেশ কিছু মানুষ শারীরিক ও স্বাস্থ্যগত কারণে রক্তদানের উপযুক্ত বিবেচিত না হওয়ায় তাঁদের রক্তদান থেকে বিরত থাকতে হয়। তাঁদের এই আগ্রহ এবং রক্তদানের মানসিকতাও আয়োজকদের কাছে সমানভাবে প্রশংসনীয় হয়ে ওঠে। কারণ রক্তদান কেবল রক্ত দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; অন্যের জীবন রক্ষার জন্য এগিয়ে আসার মানসিকতাটিই এর মূল শক্তি।
স্বাধীনতার ৮০তম বর্ষে বিদ্যালয়ের এই আয়োজন তাই নিছক একটি আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠান হয়ে থাকেনি। জাতীয় পতাকার প্রতি শ্রদ্ধা, স্বাধীনতার ইতিহাসের প্রতি দায়বদ্ধতা, সংস্কৃতির প্রতি ভালোবাসা, প্রবীণদের প্রতি সম্মান এবং অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মানবিক অঙ্গীকার—সবকিছুকে একসূত্রে বেঁধে দিয়েছে আজকের এই আয়োজন।
সবমিলিয়ে, আজকের স্বাধীনতা দিবস বিদ্যালয়ের ইতিহাসে একটি স্মরণীয় দিন হয়ে রইল। বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষিকা, ছাত্রছাত্রী, অভিভাবক, পল্লীমেলা কমিটির সদস্যবৃন্দ, রক্তদাতা এবং এলাকাবাসীর সম্মিলিত অংশগ্রহণে দিনটি হয়ে উঠল দেশপ্রেম, সংস্কৃতি, সম্মান ও মানবিকতার এক অনন্য উৎসব।
স্বাধীনতার এই অমৃতচেতনা আগামী দিনের প্রজন্মকে আরও দায়িত্বশীল, মানবিক, সংবেদনশীল ও দেশপ্রেমিক নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলবে—আজকের আয়োজন যেন সেই প্রত্যয়েরই এক উজ্জ্বল ঘোষণা।