06/11/2023
গণিত সম্রাজ্ঞী
বাবা কাজ করতেন সার্কাসে | দেখাতেন ট্রাপিজের খেলা। সঙ্গে প্রায়ই উপস্থিত থাকত তার একরত্তি মেয়ে | মেয়ের বয়স তখন মাত্র ৫ কি ৬ | বাবা লক্ষ্য করলেন তাসের খেলায় তিনি যতই চেষ্টা করুন না কেন, নিজের মেয়েকে কিছুতেই হারাতে পারছেন না | বাবা বুঝলেন তার মেয়ে সকলের থেকে আলাদা | তিনি সার্কাসের কাজ ছেড়ে দিলেন | মেয়েকে নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে বিস্ময়কর বুদ্ধিমত্তার খেলা দেখতে লাগলেন | সকলেই মুগ্ধ মেয়েটির বিস্ময়কর প্রতিভায় | যত বড়ই হিসেব হোক, সঠিক উত্তর হাজির নিমেষের মধ্যে।
মাত্র ছ’ বছর বয়সে প্রথমবারের মতো বেশ বড় পরিসরে জ্ঞানীগুণীদের মাঝে মাইসোর বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজের প্রতিভা প্রদর্শনের সুযোগ পান। বলা বাহুল্য, উপস্থিত শিক্ষক-শিক্ষার্থী সকলেই মেয়েটির গণনা করার অসাধারণ ক্ষমতা দেখে মুগ্ধ হয়ে যান। এর দু বছর পর আন্নামালাই বিশ্ববিদ্যালয়ে আবারো নিজের এই বিশেষ গুণটি তুলে ধরেন তিনি।
দেশের একাধিক উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে বিস্মিত করার পরে ডাক এল টেমসের ওপার থেকে। ১৯৪৪ সালে বাবার সঙ্গে মেয়েটি পাড়ি দিলেন লন্ডন। নিজের বিস্ময়কর প্রতিভা দেখানোর সুযোগ পেলেন |
তাঁর বিস্ময়প্রতিভার কাছে নতজানু তাবড় প্রতিভাবান।
১৯৭৭ সালে সাদার্ন মেথডিস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি হারিয়ে দিলেন কম্পিউটারকে। তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, ৯১৬৭৪৮৬৭৬৯২০০৩৯১৫৮০৯৮৬৬০৯২৭৫৮৫৩৮০১৬২৪৮৩১০৬৬৮০১৪৪৩০৮৬২২৪০৭১২৬৫১৬৪২৭৯৩৪৬৫৭০৪০৮৬৭০৯৬৫৯৩২৭৯২০৫৭৬৭৪৮০৮০৬৭৯০০২২৭৮৩০১৬৩৫৪৯২৪৮৫২৩৮০৩৩৫৭৪৫৩১৬৯৩৫১১১৯০৩৫৯৬৫৭৭৫৪৭৩৪০০৭৫৬৮১৬৮৮৩০৫৬২০৮২১০১৬১২৯১৩২৮৪৫৫৬৪৮০৫৭৮০১৫৮৮০৬৭৭১-এর তেইশতম মূল কত? ৫০ সেকেন্ডের মধ্যে তিনি উত্তর দেন। তাঁর উত্তর ৫৪৬,৩৭২,৮৯১ যে সঠিক, সেটা জানাতেও কম্পিউটার সময় নিয়েছিল আরও ১০ সেকেন্ড বেশি!
১৯৮০ সালে তাঁকে লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজে জিজ্ঞাসা করা হল, ৭৬৮৬৩৬৯৭৭৪৮৭০ এবং ২৪৬৫০৯৯৭৪৫৭৭৯-র গুণফল কত? ২৮ সেকেন্ডের মধ্যে এল সঠিক উত্তর-১৮৯৪৭৬৬৮১৭৭৯৯৫৪২৬৪৬২৭৭৩৭৩০।
১৯৮৮ সালে তাঁর আমেরিকা সফর স্মরণীয়। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক আর্থার জেনসেনের মুখোমুখি হলেন তিনি। তাঁকে দু’টি প্রশ্ন করেন জেনসেন। জানতে চান ৬১,৬২৯,৮৭৫-এর কিউব রুট বা ঘনমূল এবং ১৭০,৮৫৯,৩৭৫-এর সেভেন্থ রুট বা সপ্তম মূল কত ? প্রশ্ন দু’টি করার পরে নিজের নোটবুকে লেখাও হয়নি জেনসেনের, তার আগেই হাজির সঠিক উত্তর! যথাক্রমে ৩৯৫ এবং ১৫। হতবাক জেনসেনের হাতের পেন্সিল হাতেই রয়ে গেল।
বিশ্বজয়ের পরে গণিতকন্যার কীর্তি জায়গা পেল গিনেস বুক অব ওয়র্ল্ড রেকর্ডসে। তাঁর নতুন নাম হল ‘হিউম্যান কম্পিউটার’।
আশাকরি চিনতে পেরেছেন ?
তিনি গণিত-সম্রাজ্ঞী শকুন্তলা দেবী | অঙ্কের পাশাপাশি জ্যোতিষচর্চাও করতেন। জ্যোতিষচর্চা এবং রান্নাবান্না নিয়েও বই আছে তাঁর। ভোটেও দাঁড়িয়ে ছিলেন | ১৯৮০ সালে লোকসভা নির্বাচনে নির্দল প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন ইন্দিরা গাঁধীর বিরুদ্ধে। তবে ভোট পেয়েছিলেন নামমাত্র |
আটের দশকের গোড়ায় শকুন্তলা দেবী ফিরে আসেন তৎকালীন ব্যাঙ্গালোর, আজকের বেঙ্গালুরুতে। ২০১৩ সালের ২১ এপ্রিল ৮৩ বছর বয়সে প্রয়াত হন বেঙ্গালুরুর এক হাসপাতালে।
গণিত-সম্রাজ্ঞী শকুন্তলা দেবীকে আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি |
সংগৃহীত
© অহর্নিশ