05/04/2026
আপনার মতো আমিও আতঙ্কিত!....ছেলের ভবিষ্যত নিয়ে .....বিশেষ করে স্কুল শিক্ষা নিয়ে।
সমস্যাটা সত্যি অন্যরকম।
কিছু মানুষ শিক্ষক বা শিক্ষিকাদের ঘাড়েই সবটা চাপিয়ে দেন.. ওরা ঠিক করে পড়ায় না .... কিন্তু আমি যেটুকু দেখেছি বা বুঝেছি জিনিসটা অতোটাও সরল না।
শিক্ষক/শিক্ষিকারা একটা বিশাল সিস্টেমের নাট আর বোল্ট, তাদের লিমিটেশন আছে , সামনে পিছনে ওপরে নিচে সর্বত্র চাপ আছে .... শিক্ষক বা শিক্ষিকাদের শিক্ষা দানের পূর্ণ স্বাধীনতা অনেক আগেই সিস্টেম ছিনিয়ে নিয়েছে।
যেকোনো পেশার মতই শিক্ষা প্রদান করার পেশায় ভালো আছে , মাঝারি আছে, পচা আলুও আছে.. সেটা আগেও ছিল , এখনো আছে , বাদেও থাকবে....
কিন্তু সিস্টেমটাকেই পচা আলু বানিয়ে দিলে খুব খুব মুস্কিল। কে বানিয়েছে সেই বিতর্কের মধ্যে যাচ্ছি না , কিন্তু কীভাবে পচা আলু বানানো হয়েছে সেটা নিয়ে খানিকটা মতামত দেবো আর একটা পথ খোঁজার চেষ্টা করবো..এই গাড্ডা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য।
জানি না আপনার সাথে আমার মতের মিল হবে কিনা।
প্রথম সমস্যার জায়গাটাই হলো নাম্বার! বোর্ড যাই হোক না কেনো...যেদিকেই তাকাবেন সেইদিকেই নাম্বারের ছড়াছড়ি ! সবাই নাকি "দুর্দান্ত" স্টুডেন্ট.... মোটামুটি একটু পড়তে জানলেই ৯০% বা তার বেশি।
প্রথম শুরু করেছিল CBSE... তারপর এক মহান মানুষ এসে বললেন বাংলা বোর্ডেও কেউ যেন নাম্বার কম না পায়। তারপর থেকে বাংলা বোর্ডেও নাম্বারের ছড়াছড়ি...
সবাই ভালো নাম্বার পাক , সেটা নিয়ে আমার কোনো আপত্তি নেই । কিন্তু এর একটা বাজে দিক আছে।
যে স্টুডেন্টরা সারা বছর ফাঁকিবাজি করে পড়ে নাইন্টি পার্সেন্ট পেলো , সে কোনোদিনই নিজেকে পাল্টানোর চেষ্টা করবে না। আপনি পেলে আপনি করতেন?
ফলটা মারাত্মক ! একটা স্টুডেন্ট পড়াশোনা না করে ফেল করলে তার একটা বছর পিছবে....কিন্তু একজন স্টুডেন্ট পড়াশোনা না করে নাইন্টি পার্সেন্ট পেলে সে সারাজীবনেও সামনে এগোতে পারবে না....তার পড়শোনা করার মোটিভেশনটাই ধ্বংস হয়ে যাবে।
অনেক বাবা মা এই সিম্পল জিনিসটা বোঝেন না যে একটা পরীক্ষায় নাম্বার কম পেলে কিচ্ছু যায় আসে না , কিন্তু বাচ্চার মাইন্ডসেট ঘেঁটে গেলে সারাজীবন সেই বাচ্চাকে নিয়ে ভুগতেই থাকতে হবে.....
এই ক্ষেত্রে আজকালকার বাবা মাও কম যান না, একটা সাব্জেক্ট এ কম নাম্বার পেলে হাল্লা শুরু করে দেন, স্কুলে গিয়ে ক্লাস টিচার এর নামে কমপ্লেন....ক্লাসে পড়ানো হয় না ...এটা ওটা...
প্রাইভেট স্কুলের ম্যানেজমেন্ট এসেছে বিজনেস করতে .... ঝামেলা নিতে তারা চায় না। নাম্বার বেশি পেলে কোনো গার্জেন এসে ঝামেলা করবে না , তাই একদম স্ট্রিক্ট ইন্সট্রাকশন "স্টুডেন্টসরা না লিখলেও যেনো নাম্বার কম না পায়"
এটাই এখন প্রায় সব স্কুলের অলিখিত শান্তি চুক্তি ... বাবা মা এর সাথে স্কুলের। মাঝখানে ঘেঁটে যাচ্ছে কারা? বাচ্চাগুলো।
যেহেতু নাম্বার নিয়ে কোনো চাপ নেই , বাচ্চারাও বিন্দাস ক্লাসে বসে গল্প করছে , লুকিয়ে লুকিয়ে গেম খেলছে ......টিচার কী পড়াচ্ছে কোনো মনোযোগ নেই।
এদিকে টিচার একদিন চেষ্টা করছে , দুদিন চেষ্টা করছে ...তিনদিনের দিন হাল ছেড়ে বসে যাচ্ছে। কারণ সিস্টেম শাসন করার লাঠিটা টিচারদের হাত থেকে কেড়ে নিয়েছে।
পরীক্ষার আগে স্পেশাল ক্লাসের নাম করে আসল এক্সামের প্রশ্ন ঘুরিয়ে বলে দেওয়া....এটাই এখন ট্র্যাডিশন হয়ে গেছে।
আজকের দিনে কোনো একজন টিচার কারো কান মুলে দেখুক দিকি...পরের দিন থেকে একমাস টিচারকেই সবাই পড়াতে শুরু করে দেবে। বাবা মা থেকে শুরু করে স্কুল কর্তৃপক্ষ, লোকাল থানা , পুলিশ সবাই...
আপনি টিচার হলে এই ঝামেলা নিতেন?
এতো গেল ভালো টিচারদের কথা ....যাঁরা চেষ্টা করেও কিছু করতে পারছেন না । এর পর আছে ঘুষ দিয়ে চাকরি পাওয়া টিচার , পেটের দায়ে অসম্মানজনক স্যালারিতে চাকরি করতে বাধ্য হওয়া টিচার.... টিচারি ছেড়ে মিড ডে মিলের আরেঞ্জমেন্ট , এই ডিউটি ,ওই ডিউটিতে ফেঁসে থাকা টিচার.....
ফলটা ভয়াবহ!
একদিন নিজের বাচ্চাটাকে নিয়ে বসুন। ধরুন আপনার বাচ্চা ক্লাস এইটে পড়ে ...আপনার বাচ্চাকে ক্লাস সেভেন বা ক্লাস সিক্স এর বই থেকে ( যে বই সে আগের একটা কী দুটো বছর ধরে পড়ে এসেছে ) গুণে গুণে কুড়িটা প্রশ্ন করুন। সিনটা পরিষ্কার বুঝে যাবেন!
একশো জনের মধ্যে নব্বই জন দশটা প্রশ্নের উত্তর ঠিকঠাক দিতে পারবে কিনা সন্দেহ!
নাম্বার পাওয়ার জন্য তথ্য গিলেছে, নাম্বার পাওয়া হয়ে গেছে , মাথা থেকে বেরিয়ে গেছে। মানুষের ব্রেন সেটাকেই বছরের পর বছর মাথায় ধরে রাখে যেটা মানুষটা ভালোবেসে করে।
বিশ্বাস করুন, এরা কিচ্ছু শিখছে না। এদের শেখার , পড়াশোনা করার আগ্রহটাই তৈরি হচ্ছে না।
অথচ আজ আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স এতোটাই এগিয়ে গেছে যে আজ থেকে দশ বছর বাদের দুনিয়াটা সেই বাচ্চাদের বুকে টেনে নেবে যাঁরা নতুন কিছু নিজে থেকে শিখতে ভালোবাসে , যাঁরা নিজের মতো করে ভাবতে পারে।
অনেকে বলবেন সামনের দুনিয়াটা নতুন প্রজন্মের জন্য খুব কঠিন...আমার মত সম্পূর্ণ উল্টো !
সামনের দুনিয়ায় একশো জনের মধ্যে নিরানব্বই জনের স্বাধীন চিন্তা করার ক্ষমতা থাকবে না., বা থাকলেও এতোটাই কম থাকবে যে তাদের দিয়ে বিশেষ কিছু হবে না..
....বাকি ওই একজনের কিন্তু ভবিষ্যত উজ্জ্বল!
আপনার বাচ্চাকে "ওই একজন" করতে হলে কী করবেন?
১. বাকি সব কাজ ডেলিগেট করুন ...কিন্তু নিজের বাচ্চা নিজের হাতে মানুষ করুন। দরকার পড়লে নিজের কেরিয়ার খানিকটা জলাঞ্জলী দিয়েও সেটা করুন।
২. শুধু স্কুলের ওপর নির্ভর করে বসে থাকবেন না। হয় নিজে বাচ্চাকে পড়াশোনা করতে ভালোবাসতে শেখান, নয়তো এমন কাউকে দায়িত্ব দিন যে আপনার বাচ্চাকে নাম্বারের পিছনে দৌড়াতে শেখাবে না .....বরং পড়াশোনাটাকে ভালোবাসতে শেখাবে।
ফর গড সেক..... বাচ্চাকে পড়াশোনা জিনিসটাকে ভালোবাসতে শেখান। এটার জন্য জরুরী এমন একজনের সংস্পর্শে আপনার বাচ্চাকে রাখা যে নিজে পড়তে ভালোবাসে।
আমার ক্লাস টুয়েলভ পর্যন্ত পড়াশোনা তারকেশ্বর নামে একটা মফস্বল শহরে। মাধ্যমিকের পর আমি ফিজিস্ক এর টিউশন পড়তে যেতাম যার কাছে সেই দেবাশীষবাবু ছিলেন খুব মুডি মানুষ ....কোনোকালে সিলেবাস শেষ করতে পারতেন না....কিন্তু তিনি নিজে ফিজিস্ক সাব্জেক্টটাকে ভালবাসতেন ....পড়ানোর সময় সিলেবাসের বাইরে গিয়ে হাজার জিনিস আলোচনা করতেন..গল্প করতেন।
সত্যিকারের ভালো টিচার তিনি , যিনি স্টুডেন্টদের সবজেক্টটাকে ভালোবাসতে শেখান। যেকোনো স্কিলের জন্ম কিন্তু সাব্জেক্ট এর প্রতি ভালোবাসা থেকে।
আজকের দিনে এই "দেবাশীষবাবুরা" সিস্টেমের চাপে পড়ে প্রায় extinct. আর বাকি এই হ্যাট জুনিয়র, এই ওয়ালা ওই ওয়ালা সব ওই একই সিস্টেম এর হিস্যা .... ডাইরেক্ট বা ইনডাইরেক্ট । দিনের শেষে এরা কেউই জানতে চায় না যে আপনার বাচ্চা পড়াশোনা টাকে ভালোবাসতে শিখছে কিনা।
মাথায় গেঁথে নিন .... ক্লাস এইট, নাইন টেন এই তিনটে বছর একটা বাচ্চার জীবনের সন্ধিক্ষণ। এর আগে বাচ্চারা অনেক জিনিস শেখে বটে...কিন্তু লাইফে সামনের তিরিশ চল্লিশ বছর কী করবে সেটা তৈরি হয় এই এইট নাইন টেন তিনটে বছরে।
বাচ্চারা হলো রেলগাড়ির মতো ....একজন ভালো টিচারের কাজ শুধু রেল লাইনের ওপর ঠিকঠাক বসিয়ে স্টার্ট ধরিয়ে দেওয়া....একবার রেলগাড়ি ঠিকঠাক লাইনে বসে চলতে শুরু করলে চলতেই থাকবে....
কিন্তু এই লাইনে বসানোর কাজটা ভীষন ভীষণ কঠিন, সবাই পারে না।
আমি নিজে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার সময় স্টুডেন্ট পড়াতাম....নিজের কলেজের ফি আর হাত খরচ চালানোর জন্য। পড়াতাম কম , স্বপ্ন দেখাতাম বেশি । দেবাশীষবাবুর মতো আমিও সিলেবাস কোনোকালে কমপ্লিট করার কথা ভাবতাম না....একটাই লক্ষ্য থাকতো যেনো সাবজেক্টটাকে ভালোবাসতে শেখে।
বহু বছর বাদে যখন সেই স্টুডেন্টদের দেখি , এখন মনে হয় সিদ্ধান্তটা সঠিক ছিলো। একজনের কথা বলি...যখন আমার কাছে প্রথম পড়তে এসেছিল খুব খুব এভারেজ স্টুডেন্ট ...আজ সে বিদেশে একটা ইউনিভার্সিটিতে পড়ায় , ভালোবেসে টিচিং টাকেই প্রফেসন করে নিয়েছে।
স্বপ্ন আর সাব্জেক্ট এর প্রতি ভালোবাসা একজন মানুষকে কোথা থেকে কোথায় যে নিয়ে চলে যেতে পারে ভাবতেও পারবেন না। আর এই স্বপ্নটা , ভালোবাসাটা ছড়ানো যায়..... শিক্ষকের থেকে স্টুডেন্ট দের।
জানি না কোথায় আপনারা এই ধরনের টিচার খুঁজবেন । কিন্তু খুঁজুন.... নাহলে সত্যি আপনার বাচ্চার ভবিষ্যত অন্ধকার। পড়াশোনাকে ভালো না বাসলে সামনের দুনিয়াটা ভীষণ ভীষন কঠিন । মেশিন আর AI সব লো এন্ড কাজ কেড়ে নিচ্ছে ... আরও নেবে।
আমি নিজেও খুব ছোটো করে হলেও একটা চেষ্টা চালাবো। পাঁচজন দশজন হলেও কিছু বাচ্চাকে অন্তত পড়াশোনা জিনিসটাকে ভালোবাসতে শেখাবো।
কিন্তু বাচ্চা বাদে....সবার আগে বাবা মা এর মাইন্ডসেট ঠিক করা দরকার। নাম্বারের পিছনে ছোটা বন্ধ না করলে ঘুরে ফিরে সেই একই চরকিতে ঘুরতে থাকবে।
একটা প্ল্যান করেছি...আপাতত ক্লাস এইট নাইন আর টেনের বাচ্চাদের নিয়ে শুরু করবো। সপ্তাহে দুটো ক্লাস ,অনলাইনেই ...সায়েন্স আর ম্যাথ ।
যেখানে নাম্বারের পিছনে ছোটা থাকবে না , সিলেবাস শেষ করার খাঁড়া থাকবে না.....সাথে বাবা মা দের জন্য কাউন্সিলিং সেশন থাকবে । বাচ্চারা এক্সাম দেওয়ার জন্য পড়বে না , শেখার আনন্দে শিখবে।
একদম অন্য ফরম্যাটে সপ্তাহে দুদিন এক ঘন্টা করে দু ঘণ্টা কাটানো। পড়াশোনা করছি বলে যেন মনেই না হয়।
উদ্দেশ্য একটাই ....বাচ্চাকে পড়াশোনাটা যে একটা ভীষণ ইন্টারেস্টিং জিনিস , যেটা নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা নেশাগ্রস্তের মতো থাকা যায় ...সেটা শেখানো।
খুব বাচ্ছাবেলায় মনে আছে ম্যাথস একদম ভালো লাগতো না... সবসময় মনে হতো এসব জেনে কী হবে। তারপর একটা বই হাতে পাই "History of Mathematics" .... বাকিটা সত্যি ইতিহাস। আজও ম্যথস আমার ফেভারিট সাব্জেক্ট ।
বাচ্চাদের পড়াশোনাটাকে ভালোবাসতে শেখানোটা অপশনাল না , এটা ছাড়া সামনের দুনিয়ায় সারভাইভ করতে পারবে না।এই সহজ জিনিসটা সবাই জানে , কিন্তু সেই সব ভুলে চরকির মতো ভালো স্কুল, ভালো নাম্বারের পিছনে ছুটে চলে!
জানিনা আমার মত আপনার মত কিনা । পক্ষে বা বিপক্ষে আপনার মত কমেন্টে জানান। আলোচনা হোক....এইসব আলোচনা কোথাও হয় না , কারণটা ইকোনমিকস.... স্কুলশিক্ষা আজকের দিনে একটা ব্যবসা। মানুষ যতো এই চরকিতে ঘুরবে ততো ব্যবসায়ীদের লাভ।
বাকি রইলো এই সোশ্যাল মিডিয়ায় ওপেন প্ল্যাটফর্ম!
তাই মত দিন...আলোচনা চলুক!
শেয়ার করুন। সচেতনতা দরকার।
© সংগৃহীত