Kanu Nath-a student of history
ভারতের ইতিহসের বিভিন্ন বিষয়
12/06/2019
ইংরেজী মাস- সপ্তাহের নামের উৎপত্তি এবং বিকাশ
গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের আগে ছিল জুলিয়ান ক্যালেন্ডারের প্রচলন। জুলিয়ান ক্যালেন্ডারেরও আগে রোমানরা গ্রিক পঞ্জিকা অনুযায়ী বছর ধরত ৩০৪ দিনে। যাকে ১০ মাসে ভাগ করা হয়েছিল। জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারির জন্ম তখনও হয়নি। মার্চ ছিল বছরের প্রথম মাস। এক সময় রাজা পম্পিলিয়াস দেখলেন ৩০৪ দিন হিসাবে বছর করলে প্রকৃতির সঙ্গে মিলছে না। খৃস্টপূর্ব ৭০০ সালে তিনি বছরের সাথে যোগ করলেন আরও ৬০ দিন। বছরের দিন বৃদ্ধি পেল ঠিকই সঙ্গে সমস্যাও বৃদ্ধি পেল ঋতুর চেয়ে সময় এগিয়ে আছে তিন মাস। তখনই জুলিয়াস সিজার ঢেলে সাজালেন বছরকে। নতুন দু'টি বছর জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিকে নিয়ে এলেন বছরের প্রথম দিকে।
January (জানুয়ারি) : রোমে ‘জানুস' নামক এক দেবতা ছিল। রোমবাসী তাকে সূচনার দেবতা বলে মানত। যে কোন কিছু করার আগে তারা এ দেবতার নাম স্মরণ করত। তাই বছরের প্রথম নামটিও তার নামে রাখা হয়েছে।
February (ফেব্রুয়ারি) : রোমান দেবতা ‘ফেব্রুস'-এর নাম অনুসারে ফেব্রুয়ারি মাসের নামকরণ করা হয়েছে।
March (মার্চ) : রোমান যুদ্ধ-দেবতা ‘মরিস' এর নামানুসারে তারা মার্চ মাসের নামকরণ করেন।
April (এপ্রিল) : বসন্তের দ্বার খুলে দেয়াই এপ্রিলের কাজ। তাই কেউ কেউ ধারণা করেন ল্যাটিন শব্দ ‘এপিরিবি' (যার অর্থ খুলে দেয়া) হতে এপ্রিল এসেছে।
May (মে) : রোমানদের আলোকে দেবী ‘মেইয়ার'-এর নামানুসারে মাসটির নাম রাখা হয় মে।
June (জুন): রোমানদের নারী, চাঁদ ও শিকারের দেবী ছিলেন ‘জুনো'। তার নামেই জুনের সৃষ্টি।
July (জুলাই) : জুলিয়াস সিজারের নামানুসারে জুলাই মাসের নামকরণ। মজার ব্যাপার হচ্ছে বছরের প্রথমে জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিকে স্থান দিয়ে তিনি নিজেই নিজেকে দূরে সরিয়ে দেন।
August (আগস্ট) : জুলিয়াস সিজার বছরকে ঢেলে সাজানোর পর আগস্ট মাসটি তার নিজের নামে রাখার জন্য সিনেটকে নির্দেশ দেন। সেই থেকে শুরু হয় আগস্ট মাসের পথচলা।
September (সেপ্টেম্বর) : সেপ্টেম্বর শব্দের শাব্দিক অর্থ সপ্তম মাস। কিন্তু সিজার বর্ষ পরিবর্তনের পর তা এসে দাঁড়ায় নবম মাসে। তারপর এটা কেউ পরিবর্তন করেনি।
October (অক্টোবর) : ‘অক্টোবরের' শাব্দিক অর্থ বছরের অষ্টম মাস। সেই অষ্টম মাস আমাদের ক্যালেন্ডারের এখন স্থান পেয়েছে দশম মাসে।
November (নবেম্বর) : ‘নভেম' শব্দের অর্থ নয়। সেই অর্থানুযায়ী তখন নবেম্বর ছিল নবম মাস। জুলিয়াস সিজারের কারণে আজ নবেম্বরের স্থান এগারতে।
December (ডিসেম্বর) : ল্যাটিন শব্দ ‘ডিসেম' অর্থ দশম। সিজারের বর্ষ পরিবর্তনের আগে অর্থানুযায়ী এটি ছিল দশম মাস। কিন্তু আজ আমাদের কাছে এ মাসের অবস্থান ক্যালেন্ডারের শেষ প্রান্তে।
প্রত্যেকটি দিনের নামের অর্থ ভিন্ন রকম। আমাদের সকলের নখদর্পণে সাতদিনের নাম। কিন্তু এই সাতদিনের নামের উৎপত্তিস্থল কোথায়, কিভাবে হলো তা আমাদের সকলের অজানা বা আমরা এই সম্পর্কে অবগত নই। তাহলে চলুন, আমরা নামগুলোর ইতিহাস থেকে ঘুরে আসি।
শনিবার : ইংরেজিতে বলা হয় Saturday : সে অনেক পুরনো কথা। রোমান সাম্রাজ্যের আমলের লোকেরা এই বলে বিশ্বাস করত যে, চাষাবাদের জন্য ‘স্যাটান; নামের একজন দেবতা আছেন। যার হাতে আবহাওয়া ভালো খারাপ করা লেখাটি আছে। তাই তাকে সম্মান করার জন্যই তার নামে একটি গ্রহের সাথে সপ্তাহের একটি দিনের নাম স্যাটনি ডেইজ রাখা হয়েছে। যার অর্থ হচ্ছে স্যাটানের দিন। বর্তমানে তা ‘স্যাটারডে' নামেই পরিচিত।
রবিবার : ইংরেজিতে বলা হয় Sunday : অনেকদিন আগের কথা, দক্ষিণ ইউরোপের সাধারণ ‘লোকেরা বিশ্বাস করত এবং ভাবত যে একজন দেবতা রয়েছেন যিনি শুধুমাত্র আকাশে গোলাকার আলোর বল অংকন করেন। ল্যাটিন ভাষায় যাকে বলা হয় ‘সলিছ'। এর থেকেই সলিছ ডে অর্থাৎ সূর্যের দিন। উত্তর ইউরোপের লোকেরা এই দেবতাকে ডাকত ‘স্যানেল ডেইজ' নামে। যা পরবর্তীতে বর্তমান সান ডে-তে রূপান্তরিত হয়।
সোমবার : ইংরেজিতে বলা হয় Monday : এই নামের সাথেও দক্ষিণ ইউরোপের লোকেরা জড়িত। রাতের বেলায় আকাশের গায়ে রূপালী বল দেখে তারা ডাকত ‘লুনা' নামে। ল্যাটিন শব্দ লুনা ডেইস। উত্তর ইউরোপের লোকেরা ডাকত মোনান ডেইজ। এ মানডে কিন্তু মোনান ডেজ থেকে রূপান্তর হয়।
মঙ্গলবার : ইংরেজি রূপ Tuesday : আগেকার রোমান রাজ্যের লোকেরা বিশ্বাস করত যে, টিউ নামক একজন দেবতা আছেন যিনি যুদ্ধ দেখাশুনা করেন। তারা ভাবত যারা টিউকে আশা করত টিউ তাদেরকে সাহায্য-সহযোগিতা করত যুদ্ধের ময়দানে এবং যারা পরলোক গমন করেছে তাদেরকে টিউ পাহাড় থেকে নেমে একদল মহিলা কর্মী নিয়ে বিশ্রামের জায়গা ঠিক করত। তারা একে ডাকত ‘ডুইস' নামে। যার ইংরেজি অর্থ টুইস ডে।
বুধবার : ইংরেজি রূপ Wednesday : দেবতাদের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী ‘উডেন' বলে দক্ষিণ ইউরোপের লোকেরা ভাবত। তিনি সারা দিন ঘুরে জ্ঞান লাভ করতেন যার জন্য তার একটি চোখ হারাতে হয়েছিল। এই হারানো চোখকে তিনি সবসময় লম্বাটুপি দিয়ে আবৃত করে রাখতেন। দুটো পাখি উডেনের গোয়েন্দা হিসেবে কাজ করত, তারা উডেনের কাঁধে বসে থাকত। রাতে তারা সারা পৃথিবীর ঘটনাবলি উডেনকে শুনাত। এভাবেই উডেন সারা পৃথিবীর খবর শুনতে সক্ষম হন। এজন্য লোকেরা নাম রাখল ওয়েডনেস ডেইস। যা বর্তমান ওয়েডনেস ডে নামে পরিচিত।
বৃহস্পতিবার : ইংরেজি রূপ Thursday : বজ্রপাত ও বিদ্যুৎ চমকানোর সম্পর্ক না জানার ফলে মানুষ মনে করত যে, বজ্রপাত ও বিদ্যুৎ চমকানোর জন্য একজন দেবতা দায়ী। তারা শুধু আলো জ্বলতে ও বিদ্যুৎ চমকাতে দেখত। তারা দেবতার নাম রাখে থর। তাদের মধ্যে এই অন্ধ বিশ্বাস ছিল যে, দেবতা থর যখন রাগান্বিত হন তখন তিনি রাগে আকাশে একটা হাতুড়ি নিক্ষেপ করেন দু'টি ছাগলের গাড়িতে বসে। ছাগলের গাড়ি চাকার শব্দ হচ্ছে বজ্রপাত ও হাতুড়ির আঘাত হচ্ছে বিদ্যুৎ চমকানো। থরের প্রতি সম্মান রক্ষার্থে তারা সপ্তাহের একটি দিনের নাম রাখেন থার্স ডেইস। যাকে আজ আমরা থার্স ডে বা বৃহস্পতিবার বলে ডাকি।
শুক্রবার : ইংরেজিতে বলা হয় Friday : ওডিন একজন শক্তিশালী দেবতা। তার স্ত্রী দেবী ফ্রিগ ছিলেন ভদ্র এবং সুন্দরী। ওডিনের পাশে সব সময় তার স্ত্রী থাকতেন। পৃথিবীকে দেখতেন, প্রকৃতিকে উপভোগ করতেন, প্রকৃতির দেবী ভালোবাসা ও বিবাহের দেবীও ছিলেন ফ্রিগ। এই জন্য লোকেরা বাকি একটি দিনের নাম ‘ফ্রিগ ডেইজ' বা ফ্রাইডে রাখেন।
02/06/2019
জামাই ষষ্ঠী বৃত্তান্ত:----
=============
বিগত কয়েক দশক ধরে ভাঙছে একান্তবর্তী পরিবার৷ নারীশিক্ষার প্রসার ঘটছে – কাজের জন্য বাইরে পা রেখেছে মেয়েরা৷ ধীরে ধীরে প্রকৃত অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্বাধীনতার স্বাদ পাচ্ছে মেয়েরা৷ তাই আগের মতো আজ আর বাপের বাড়ি যাওয়ার জন্য কোনও ছুতো খুঁজতে হয় না মেয়েদের ৷শুধু জামাই ষষ্ঠী কেন, যে কোনও দিনই চাইলে এখন বিবাহিত মেয়েরা একবার বাবা -মাকে দেখে আসতে পারে ৷ শুধু তাই নয় কোনও কোনও ক্ষেত্রে কন্যা সন্তানই তাদের বৃদ্ধ বাবা মায়ের দেখা শোনার ভার তুলে নিচ্ছে হয়তো সে বাবা মায়ের একমাত্র কন্যা সন্তান। ৷সেক্ষেত্রে কন্যার গৃহে থাকার সুবাদে তো প্রতিদিনই জামাইবাবাজির দর্শন পাচ্ছেন শাশুড়ি মা৷ যা দেখে কেউ কেউ মনে করেন জামাই ষষ্ঠী প্রথাটাই আজ অপ্রাসঙ্গিক ৷ কিন্তু প্রতিদিন জামাই দর্শন হলেও তার মধ্য থেকেই একটা বিশেষ দিনে জামাইকে একটু আলাদা করে দেখতে চাওয়ার শখ তো কোন শাশুড়ি মায়ের হতে পারে ৷তার আগের প্রজন্মের মানুষেরা যা শিখিয়েছেন স্থান, কাল, পাত্র বদলে গেলেও তিনি যদি নতুন আঙ্গিকে সেই ধারারাহিকতা বজায় রাখতে চান তাহলে বঙ্গজীবনে জামাই ষষ্ঠী রয়ে যাবে৷
ষষ্ঠী পুজোয় ব্রতীরা সকালে চান করে উপোস থেকে নতুন পাখার ওপর আম্রপল্লব, আমসহ পাঁচফল আর ১০৮টি দুর্বাবাঁধা আঁটি দিয়ে পূজার উপকরণের সঙ্গে রাখে। করমচাসহ পাঁচ-সাত বা নয় রকমের ফল কেটে কাঁঠাল পাতার ওপর সাজিয়ে পুজোর সামনে রাখা হয়। ধান এ পুজোর সমৃদ্ধির প্রতীক, বহু সন্তানের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয় এবং দুর্বা চিরসবুজ, চিরসতেজ বেঁচে থাকার ক্ষমতার অর্থে ব্যবহৃত হয়। অর্থাৎ দুর্বা হল দীর্ঘ জীবনের প্রতীক। শাশুড়ি-মেয়ে-জামাতার দীর্ঘায়ু কামনা করে ধানদুর্বা দিয়ে উলুধ্বনিসহ বরণ করেন। প্রবাদ আছে, যম-জামাই ভাগনা-কেউ নয় আপনা। কারণ যম মানুষের মৃত্যুর দূত। জামাই এবং ভাগনা অন্যের বাড়ির উত্তরাধিকারী। তাদের কখনও নিজের বলে দাবি করা যায় না। এদের খুশি করার জন্য মাঝে মাঝেই আদর আপ্যায়ন করে খাওয়াতে হয়। তাই মেয়ে যাতে সুখে-শান্তিতে তার দাম্পত্য জীবন কাটাতে পারে এজন্য জ্যৈষ্ঠ মাসে নতুন জামাইকে আদর করে বাড়িতে ডেকে এনে আম-দুধ খাইয়ে পরিতৃপ্ত করে। আশীর্বাদস্বরূপ উপহারসমাগ্রীও প্রদান করে।
গ্রামীণ জীবনে এখনো এর সার্বজনীন আবহ দেখতে পাওয়া যায়। জামাই ষষ্ঠীর সমস্ত আয়োজন করা হয় বাড়ির জামাইকে ঘিরে। জৈষ্ঠ্য মাসের শুক্ল পক্ষের ষষ্ঠী তিথিতে এই আচারটি পালন করা হয় বলেই এর নাম জামাই ষষ্ঠী। অবশ্য এর অন্য নাম অরণ্য ষষ্ঠী। পুজো হয়ে থাকে ষষ্ঠী দেবীরও । ষষ্ঠী দেবী মাতৃত্বের প্রতীক। সে কারণে ষষ্ঠী প্রতিমাতে দেখা যায় তিনি কোলে সন্তান ধারণ করে আছেন। ষষ্ঠী মাতার কাছে জামাইদের জন্য দীর্ঘায়ু কামনা করা হয়। ষষ্ঠী পুজোর আরেকটি বিশিষ্ট দিক হচ্ছে বেড়াল সেবা । বাড়ির গৃহপালিত বেড়ালদের এদিন খুব সেবা দেওয়া হয়। কারণ বেড়াল ষষ্ঠী দেবীর বাহন। প্রথমে জামাইরা পরে বাচ্চারা এবং সবশেষে বাড়ির বাকি সদস্যরা ষষ্টির জল নেয়। দূর্বা ঘাস জলে ডুবিয়ে শরীরে ছোঁয়ানো হয়। তারপর জলে ডোবানো পাখার বাতাস করতে করতে ‘ষাট ষাট, বালাই ষাট’ মন্ত্র আওড়ানো, সবশেষে দূর্বা পুঁটুলির চাল আর গামলাতে ডোবানো ফল হাতে দিয়ে প্রাথমিক ষষ্ঠীর ইতি টানা হয়। পরে শ্বাশুড়িরা মেয়ে জামাইকে নিয়ে মন্দিরে যান তাদের ভবিষ্যৎ মঙ্গল কামনার্থে।
এর পরের পর্বটি জামাইদের জন্য খুবই লোভনীয়। এ পর্বে দুপুরের ভুড়িভোজ, সাত রকমের ভাজা, শুক্তো, মুগের ডালের মুড়িঘন্ট, বিভিন্ন মাছের বাহারি রকমের পদ, কচি পাঁঠার ঝোল, চাটনি,দই-মিষ্টি, আম কাঁঠাল আরো কতো কি! সকাল থেকে শ্বাশুড়ি মায়েরা এতোসব রান্না করেন। নিজেরা কিন্তু উপবাস থাকেন কেউ কেউ আবার নিরামিশ খান। সনাতন ধর্মাবলম্বী মতে, এই পার্বণ মূলত পরিবেশ রক্ষার্থে গাছকে দেবতা বিশ্বাসে পুজো করা। কেননা এ আয়োজনে বিবিধ গাছের ডাল যেমন দরকার হয় তেমনি এ দিনে সনাতন পরিবারে থাকে বাহারি মৌসুমি ফল। কিন্তু এখন সময়ের পরিক্রমায় ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে এ পার্বনের মূল উদ্দেশ্য, শতবর্ষী ষষ্ঠী গাছ আর পুজোর জন্য পাওয়া যায় না। জৈষ্ঠ্যের মাঝামাঝি, যখন আম-কাঁঠালের গন্ধে চারদিক সুবাসিত, তখনই জামাই ষষ্ঠী ব্রতটি হওয়ায় এর হাওয়া ধর্মীয় গন্ডি পেরিয়ে প্রভাব ফেলে গ্রামীণ সাধারণ জনজীবনেও। এ সময় শ্বশুর বাড়িতে জামাইরা আমন্ত্রণ পান।। ঠিক পুজোর মত না হলেও বাড়িতে জামাই আদরের ঘটা পড়ে যায়।
তবে জামাইবাবাজী খালি হাতে শ্বশুরবাড়ি আসেনা এই বিশেষ দিনটিতে, যতই আত্মভোলা হোক না কেন, শাশুড়ি মায়ের জন্য শাড়ী, ঝুড়ি ভর্তি আম, কাঁঠাল, লিচু, পেয়ারা, পান-সুপুরী, কানকো নাড়ানো রুই-কাতল মাছ, রসগোল্লার হাঁড়ি, ছানার সন্দেশ সাথে আনতে ভোলেনা। মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যেও জ্যৈষ্ঠ মাসে জামাতাকে বাড়িতে এনে আম-দুধ খাওয়ানোর রেওয়াজ রয়েছে। তবে জামাই ষষ্ঠীর উপাচারগুলো সব অঞ্চলে এক রকম নয়। অঞ্চল ভেদে এর ভিন্নতা রয়েছে।
27/05/2019
ড.শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী
বাংলার বাঘ স্যার আশুতোষ মুখার্জীর সুযোগ্য সন্তান ছিলেন ভারতকেশরী ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী। তিনি একধারে যেমন ছিলেন রাজনেতিক আর এক দিকে ছিলেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, তিনি ভারতের বিভিন্ন উচ্চপদস্থ সংস্থার সভাপতি, সদস্য, চেয়ারম্যান হিসাবেও ছিলেন। তিনি যেমন রাজনীতিক, শিক্ষাবিদ ছিলেন তদ্রূপ ছিলেন একনিষ্ঠ সমাজ, ধর্ম, সাহিত্য সেবক ছিলেন।
ডঃ মুখার্জীর জীবনের সবথেকে বড় অবদান হল, যা অকৃতজ্ঞ বাঙালীরা অবহেলার চোখে ফেলে রেখেছে, সেটা হল পশ্চিমবঙ্গকে পাকিস্থানের কবল থেকে বাঁচিয়ে আনা। যখন ইংরাজ চক্রান্ত , মুসলিম লীগের চক্রান্ত এবং জাতীয় নেতাদের গদীর লোভের বসে ভারত বিভাজন হচ্ছে। জিন্নার পাকিস্থান দাবিতে সকলেই যখন নতি স্বীকার করে নিয়েছিল, যেই সময় ১৯৪১ গান্ধীজী নির্দেশ দিয়েছিলেন যে বাংলার জনগণ যাতে জনগনণায় অংশ গ্রহণ না করেন, অথচ মুসলিম লীগের নির্দেশ ছিল যে বাংলার প্রতিটি মুসলিম নাগরিক যাতে জনগননায় অংশ নেয়, তখন ডাঃ মুখার্জী বিপদের আঁচ পেয়ে বাংলার নেতাদের বুঝানোর চেষ্টাও করেছিলেন কিন্তু ঐ সকল কথা বুঝেও গদীর লোভের বসে সকলে মুখ বন্ধ রাখলেন, ফলস্বরূপ বিপদের আঁচ সত্যতাই প্রকাশ পেলো।
মুসলিম জনসংখ্যা ৫৮% হল , আর ফলে বাংলার বিভাজন নিয়ে আগুন আরও তীব্র হয়ে উঠলো। শুরু হল বৃহত্তর পাকিস্থানের পরিকল্পনা। কিন্তু ডঃ মুখার্জী থামবার পাত্র ছিলেন না তিনি বাংলার সকল জেলা ভিত্তিক পরিসংখ্যা তথ্য দেখিয়ে দাবী করলেন -- “যদি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল পাকিস্থানে যাবে তা হলে বাংলার হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল পাকিস্থানে কেন যাবে”? তিনি তীব্র বিরোধ শুরু করলেন, তাঁর যুক্তিকে তৎকালীন ইংরাজ সরকারও অস্বীকার করতে পারেনি। আর এরই ফলস্বরূপ আজ পশ্চিমবঙ্গ ভারতের অন্তর্গত। অথচ পশ্চিমবঙ্গের এই স্রষ্টা কে অনেকই চেনেন না, আর যারা জানে তারা তারা এই সত্যকে অস্বীকার করে।
ডঃ মুখার্জীর ১৯৫২ সনে দক্ষিণ কলকাতা কেন্দ্রর থেকে সংসদে নির্বাচিত হন। তিনি ছিলেন ভারতের জাতীয়তাবাদী খন্ডতার প্রতীক, তাই তিনি কাশ্মীরের ৩৭০ ধারা সম্পর্কে বলেছিলেন “"Ek desh mein do Vidhan, do Pradhan aur Do Nishan nahi challenge"।
তিনি ১৯৫৩ সনে কাশ্মীরের উদ্দেশে রওনা দেন, কিন্তু ভারত থেকে কাশ্মীরে প্রবেশ করার আদেশ না থাকার অপরাধের জন্য তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী শেখ্ আব্দুলার নির্দেশে ডঃ মুখার্জীকে ১১ মে ১৯৫৩ সনে গ্রেফতার করা হয়। কারাগারে তাঁর শারীরিক আসুস্থতার জন্য তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। শোনা যায়, সেখানে তাঁর বারন করা সত্বেও তাঁর উপর ভুল ইঞ্জেক্সন দেওয়া হয়েছিলো। তার ফলে ভুল চিকিৎসা বা বিনা চিকিৎসার কারনে ও অন্য কিছু অজানা কারনে রহস্যময় পরিস্থিতিতে ডঃ মুখার্জীর মৃত্যু ঘটে।
পুলিশি হেফাজতে তাঁর মৃত্যু সারা দেশে ব্যাপক সন্দেহ উত্থাপিত হয় ও স্বাধীন তদন্তের জন্য দাবী করে ডঃ মুখার্জীর মা যোগমায়া দেবী তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহারলাল নেহেরু কে আন্তরিকভাবে অনুরোধও করেন। কিন্তু যোগমায়া দেবীর দাবি বা অনুরোধ নেহরু গ্রহণ করেনি এবং একটি নিরপেক্ষ তদন্ত করার প্রয়োজন মনে করেনি। তাই এ কথা বলা যেতে পারে নেহেরুর উপেক্ষা এবং কোন তদন্ত কমিশন গঠন না করার ফলে মুখার্জীর 'রহস্যময় মৃত্যু' বিতর্কের একটি বিষয় রয়ে যায়
24/05/2019
ভারতের প্রথম নারী শিক্ষিকা :-
সাবিত্রীবাই ফুলে ভারতীয়
উপমহাদেশের প্রথম মহিলা শিক্ষিকা
সে এক মেয়ে ছিল, যে ভারতে প্রথম গার্লস স্কুল তৈরি করেছিল। তাও আবার তথাকথিত 'ছোট জাত' এর মেয়েদের জন্য, যাদের পড়াশোনার কথা কেউ ভাবতে পারত না।
আঠেরো বছরের হেড-দিদিমণি ঘর থেকে বেরনোর সময়ে ব্যাগে রাখত বাড়তি শাড়ি। রাস্তায় এত লোক কাদা ছুড়ত,যে ইস্কুলে গিয়েই শাড়ি বদলাতে হত।
তাতেও শিক্ষা হয়নি মেয়ের। গর্ভবতী হয়ে-পড়া ব্রাহ্মণ ঘরের বিধবাদের ডেকে এনে ঠাঁই দিত ঘরে। যাদের কথা শুনলে আজও লোকে কানে আঙুল দেয়।
একশো কুড়ি বছর আগে মারা গিয়েছেন সাবিত্রীবাই ফুলে।এই মার্চেই। ১০ মার্চ তাঁর মৃত্যু দিন। সাবিত্রীবাই ফুলের জীবনকথা— এমনকী তাঁর মৃত্যুর কথাও— চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় জাতীয়তা মানে কী, দেশপ্রেম কাকে বলে। কাকে বলে নারী অধিকার, সমমর্যাদা। তাঁরই উদ্যোগে পুণে শহরে সব নাপিত হরতাল করে এক দিন। বিধবা হলেই মাথা কামাতে হবে মেয়েদের? মানব না।
সাবিত্রীবাইয়ের জীবন থেকে গোটা পাঁচেক সিরিয়াল, গোটা দুয়েক হিন্দি সিনেমা, আর কয়েক ডজন নাটক-উপন্যাস নামিয়ে ফেলা যায়। ধরা যাক রাস্তায় হেনস্থার এপিসোডটা। শুধু কাদা নয়, পাথরও ছুড়ত লোকে। আটকাতে রাখা হল এক বডিগার্ড, বলবন্ত সখারাম কোলে। স্মৃতিকথায় তিনি লিখেছেন, সাবিত্রীবাই বলতেন, ‘তোমাদের গোবর, পাথর— আমার কাছে ফুল।’
যখন শুরু এ গল্পের, কোম্পানির সেপাইরা বিদ্রোহ করেনি। কলকাতায় বেথুন সাহেবের ইস্কুল তৈরি হয়নি। জেলায় জেলায় বালিকা পাঠশালা বিদ্যাসাগরের মাথায় একটা আইডিয়া। সেই ১৮৪৮ সালে একটা একুশ বছরের ছেলে তার আঠেরো বছরের বউকে নিয়ে মেয়ে-ইস্কুল খুলে ফেলল পুণেতে।
ফল মিলল হাতে হাতে। বাবা বাড়ি থেকে বার করে দিলেন ছেলে-বউকে। জ্যোতিরাও ফুলে আর তাঁর স্ত্রী সাবিত্রীবাই। ফুল থেকে ‘ফুলে’, মালির জাত। সোজা কথায়, দলিত। একে মালি হয়ে মাস্টারি, তা-ও দলিত আর মুসলিম মেয়েদের স্কুল? টাকা-পয়সা জোগাড়ে বেরোলেন জ্যোতিরাও, দুই বন্ধুর তত্ত্বাবধানে চলল সাবিত্রীর তালিম। ফের ১৮৫১ সালে স্কুল খুলল। সাবিত্রী প্রধান শিক্ষিকা, স্কুলের প্রাণকেন্দ্র। বছর দুয়েক না যেতে ‘পুনে অবজার্ভার’ কাগজ লিখছে, ‘মেয়েদের ইস্কুলে ছাত্রীরা অনেক ভাল শিখছে সরকারি ইস্কুলের ছেলেদের চাইতে। সরকার কিছু করুন, নইলে মেয়েরা বেশি ভাল ফল করলে আমাদের মাথা নিচু হয়ে যাবে।’ তত দিনে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বেথুন স্কুলের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। তাঁর নির্দেশে ছাত্রীদের গাড়ির পাশে লেখা হয়েছে
মহানির্বাণতন্ত্রের বাণী, ‘কন্যারাও সমান যত্নে পালনীয়, শিক্ষণীয়।’ কিন্তু মেয়ে শিক্ষক তৈরির প্রস্তাব বাতিল করে দিয়েছেন ঈশ্বরচন্দ্র। মেয়েরা বাড়ির বাইরে কাজ করবে, এটা মানার জন্য সমাজ তৈরি নয়, ছোটলাটকে চিঠিকে লিখেছিলেন। নিজের স্ত্রী, দুই কন্যাকেও লেখাপড়া শেখাননি তিনি। জ্যোতিরাও বিদ্যাসাগর এর চাইতে সাত বছরের ছোট, সাবিত্রী এগারো বছর। তাঁদের কাজের গোড়া থেকেই ছাত্রী তৈরি আর শিক্ষিকা তৈরি চলেছে পাশাপাশি। বিদ্যাসাগর যখন অতি কষ্টে কায়স্থদের ঢোকাতে পারছেন সংস্কৃত কলেজে, সুবর্ণ বণিক ছাত্রকে ঢোকাতে না পেরে আক্ষেপ করছেন, তখন একেবারে ‘অস্পৃশ্য’ মাং, মাহার, মাতং পড়তে আসছে সাবিত্রীবাইয়ের নেটিভ ফিমেল স্কুলে।
আজকের ইতিহাস বইতে দলিত আন্দোলনের চ্যাপ্টারে সাধারণত লেখা হয় জ্যোতিরাও ফুলে-র কথা। সাবিত্রী তার ফুটনোট। অথচ আশ্চর্য, ব্রাহ্মণ বিধবাদের দুঃখ নিজের মধ্যে অনুভব করেছেন সাবিত্রী। সময়টা ১৮৬৩। কাশীবাই নামে এক ব্রাহ্মণ বিধবা এক শাস্ত্রীজির কুকর্মের জন্য অকাল গর্ভবতী হয়ে পড়েন। কাশীবাই জন্ম দিয়ে গলা কেটে মারে শিশুকে।এর শাস্তি হিসাবে এজন্য কাশীবাইকে ইংরেজ সরকার আন্দামানে পাঠায়। আহত ফুলে দম্পতি গোটা শহরে পোস্টার সাঁটেন, শিশুহত্যা না করে আমাদের আশ্রমে আসুন। পরের কুড়ি বছরে প্রায় ৩৫ জন ব্রাহ্মণ বিধবাকে নিজের বাড়িতে আশ্রয় দেন সাবিত্রী।
মেয়েদের জন্য রামমোহন, বিদ্যাসাগর অনেক লড়াই করেছেন।কিন্তু রাজা রামমোহন রায়েরও তিন স্ত্রী ছিল, কারও সঙ্গেই মনের ঘনিষ্ঠতার কথা জানা যায় না। শোনা যায়, তাঁর দত্তক নেওয়া সন্তান রাজারাম নাকি মুসলিম উপপত্নীর গর্ভজাত। বিদ্যাসাগরের বিপুল কর্মকাণ্ডে স্ত্রী দয়াময়ী কই? অথচ একই প্রজন্মের মানুষ জ্যোতিরাও-এর মেয়েদের স্কুলে সাবিত্রী চালিকাশক্তি, তাঁর সত্যশোধক সমাজে সাবিত্রী ৯০ জন মেয়ে নিয়ে শামিল, সম্মেলনে তিনি সভানেত্রী। ১৮৬৮ সালে স্বামীকে সাবিত্রী চিঠি লিখছেন, ‘এক ঘটনা হয়ে গেল। এই গণেশ ছেলেটি ব্রাহ্মণ, মেয়েটি মাহার। মেয়েটি গর্ভবতী জেনে সবাই ওদের পিটিয়ে মারার চেষ্টায় ছিল। আইনের ভয় দেখিয়ে আমি অনেক কষ্টে বাঁচিয়েছি। তোমার কাছে পাঠালাম।’ ওই যুগলের কী হয়েছিল, জানা যায় না। তবে এক বিধবার গর্ভজাত পুত্রকে দত্তক নেন ফুলে দম্পতি। সেই ছেলে যশোবন্তের বিয়ে সম্ভবত আধুনিক ভারতের প্রথম অসবর্ণ বিবাহ।তবে তার চাইতেও যা চমকে দেয় তা হল, বিয়ের আগে পুত্রবধূ লক্ষ্মীকে বাড়িতে এনে রেখেছিলেন সাবিত্রী। যাতে ছেলে-বউ এ-ওর মন বুঝতে পারে। সিরিয়ালের শাশুড়িদের দেখলে মালুম হয়, আজও এমন মেয়েকে চিত্রনাট্যে ফিট করা সোজা হবে না। মঞ্চে নারীবাদী বিস্তর, সংসারে বিরল।
আশ্চর্য এই মহিলা প্রায় আড়ালে রয়ে গেলেন। দাবি উঠেছে, ৩ জানুয়ারি, তাঁর জন্মদিনটি ‘শিক্ষক দিবস’ বলে পালন করা হোক। সর্বেপল্লি রাধাকৃষ্ণণ বরেণ্য দর্শনবিদ, আদর্শ শিক্ষক। শিক্ষার উৎকর্ষ তাঁকে দেখে শিখতে হয়। কিন্তু যে শিক্ষক সব শিশুকে সমান শিক্ষা না দেওয়ার অপরাধে গোটা দেশকে বেঞ্চে দাঁড় করাতে পারেন, প্রথম পাঠ নিতে হবে তাঁর থেকেই। ‘শিক্ষার অধিকার’ মানে কী, জানতে হলে সাবিত্রীর জীবনটা জানতে হবে। শেষ অবধি তাঁর জন্মদিনে তেমন কিছুই হয়নি, তবে গুগল তাঁকে নিয়ে ডুড্ল করেছিল সে দিন। তাঁর দুই বাহুর মধ্যে মেয়েরা, সবাইকে যেন তিনি টেনে নিচ্ছেন কাছে। গত তিন দশকে তাঁর উপর তেমন কোনও বইও লেখা হয়নি। কিন্তু মেয়েদের স্কুলে আনার লড়াইটা স্বামীর পাশে দাঁড়িয়ে যে মারাঠি মেয়েটি লড়ে গেল সবার আগে, বিস্মৃতির বাঘ তাকে খেয়ে গিয়েছে।
বেঁচে থাকতে সম্মান কম পাননি সাবিত্রী। পণ্ডিতা রমাবাই, আনন্দীবেন জোশি, রমাবাই রণদে, সে কালের শিক্ষিতা মেয়েরা এসে দেখা করে গিয়েছেন। সাবিত্রী ছিলেন মাঝারি গড়নের, সুমুখশ্রী, শান্ত মানুষ। তাঁকে কেউ নাকি রাগতে দেখেনি। যা করার, হাসিমুখে করে গিয়েছেন।জীবনের শেষ দিন অবধি ব্যতিক্রমী সাবিত্রী। প্লেগ তখন মহামারী। মায়ের কথায় যশোবন্ত সেনাবাহিনীতে ডাক্তারির চাকরি থেকে ছুটি নিয়ে পুণেতে প্লেগের ক্লিনিক খুলে বসলেন। সাবিত্রী নিজে রোগীদের সঙ্গে করে নিয়ে আসতেন। রোগ ছোঁয়াচে, তা জেনেও। শেষে একদিন পরিচিত এক মাহার পরিবারের বালক সন্তানকে পিঠে করে নিয়ে এলেন ক্লিনিকে। ছোঁয়াচে রোগ বাসা বাঁধল তাঁরও শরীরে। তাতেই মারা গেলেন ১৮৯৭ সালে।
এত নির্ভয়ও কোনও মেয়ে হতে পারে!!
20/05/2019
History is the memory of the nation, with history a nation called civilized society . A person having memory called complete person . Without memory person called mad person.
দেশের প্রতিটি নাগরিক এর কর্তব্য ইতিহাস থাকে শিক্ষা নেওয়া। কে গান্ধী ? কি করেছেন ? কে নাথুরাম কি করেছে? দেশ কোথায় ছিলো কিভাবে এখানে এলো ? এর পেছনে কাদের অবদান রয়েছে ? এ বিষয়ে আজকের দিনের নেতাদের উপর আমাদের নির্ভর করতে হবে না । আমাদের রয়েছে সমৃদ্ধ ইতিহাস। ইতিহাস সবার শিক্ষক । তোমরা আর আমাদের বোকা বানাতে পারবে না !!!!!!!??!?
19/04/2019
দেবী ত্রিপুরাসুন্দরী
শক্তিপীঠের নাম - ত্রিপুরেশ্বরী উদয়পুর
ত্রিপুরা খুব প্রাচীন রাজ্য। এর
ঐতিহাসিক গুরুত্বও অনেক । বর্তমানে
ত্রিপুরা বলতে ভারতবর্ষের ত্রিপুরা
রাজ্যকে বোঝায়। অতীতে এই ত্রিপুরা
রাজ্য বিশাল ছিল। ভারতের প্রাচীন
ইতিহাস বলে ত্রিপুরা রাজ্য অবিভক্ত
ভারতবর্ষের বিশাল পরিধি এমন কি
বর্তমান বাংলাদেশের কুমিল্লা,
নোয়াখালি, পার্বত্য চট্টগ্রামের একাংশ
নিয়ে ছিল । ত্রিপুরাতে দেবীর দক্ষিণ
চরণ পতিত হয় । দেবীর নাম ত্রিপুরা আর
ভৈরবের নাম নল। শাস্ত্রে লিখিত
আছে---------
“ত্রিপুরায়ং দক্ষপাদো দেবতা ত্রিপুরা
নলঃ”।
ভারতচন্দ্র তাঁর অন্নদামঙ্গল কাব্যে
লিখেছেন----------
দক্ষিণচরণখানি পড়ে ত্রিপুরায় ।
নল নামে ভৈরব ত্রিপুরা দেবী তায় ।।
তন্ত্রচূড়ামণি মতে দেবীর নাম
ত্রিপুরাসুন্দরী এবং ভৈরবের নাম
ত্রিপুরেশ । ত্রিপুরার উদয়পুরে এই মন্দির
অবস্থিত । গুয়াহাটি থেকে বাসে ৫৯৯
কিমি গিয়ে ত্রিপুরার রাজধানী
আগরতলা নেমে ট্যাক্সিতে ৫৬ কিমি
গেলে উদয়পুরে এই মন্দির । ত্রিপুরাতে
প্রচুর বাঙালীর বসবাস এখানে পরীক্ষা,
ভাষা, সংস্কৃতি বাংলা ভাষাতেই ।
ত্রিপুরা পার্বত্য উপত্যকা । এই মন্দির
উদ্ভবের পেছনে একটি কাহিনী আছে।
একবার চন্দ্রনাথের অনতিদূরে এক রজকের
বাস ছিল। সেই রজকের একটি দুধেলা
গাভী ছিল । কিছুদিন ধরে রজক লক্ষ্য
করলো গাভীটি আর আগের মতো দুধ দিচ্ছে
না। রজক ভাবল কেউ নিশ্চয়ই দুধ চুরি করে
। একদিন রজক গাভীটিকে ঘাস
খাওয়াতে ছেড়ে আড়ালে থেকে
দেখতে লাগলো- কে দুধ চুরি করে? তারপর
চোর ধরে রাজার কাছে নালিশ জানাবে
। রজক দেখলো গাভীটি জঙ্গলে ঢুকল ।
রজক পিছু নিল। গাভীটি এক উচু জায়গায়
দাঁড়িয়ে নিজে নিজে বাঁট থেকে দুধ
দিতে লাগলো। রজক আশ্চর্য হয়ে সে
স্থানে এসে দেখলো সেখানে একটি
দেবী মূর্তি ও একটি সুন্দর শিবলিঙ্গ আছে
। রজক রাজাকে গিয়ে সব জানালো ।
রাজা ধনমাণিক্য শুনে ভাবলেন সেই
শিবলিঙ্গ মন্দির বানিয়ে স্থাপন করে
নিত্য পূজোর ব্যবস্থা করেন । এই ভেবে
রাজা লোক লস্কর নিয়ে শিবলিঙ্গ
তোলার অনেক চেষ্টা করলেন । কিন্তু
বিফল হলেন। হাতি দিয়ে টেনেও তুলতে
পারলেন না । রাজা ফিরে গেলেন
রাজধানীতে দুঃখী মনে । সে রাত্রে
রাজা স্বপ্নে ভগবান শঙ্করের দর্শন
পেলেন । ভগবান মহেশ জানালেন- “হে
রাজন। তুমি আমার সেই শিবলিঙ্গ
কোনদিন তুলতে পারবে না । তবে দেবীর
বিগ্রহ নিয়ে যেতে পারো। মনে রেখো
ভোর না হওয়া পর্যন্ত তুমি যতটুকু যেতে
পারবে- সেখানেই দেবীর মন্দির
স্থাপনা করবে ।” স্বপ্ন ভঙ্গ হলে
মাঝরাতে রাজা দেবী মূর্তি নিয়ে
রওনা হলেন। উদয়পুরে আসতেই সূর্য দেব
আকাশে উদিত হলেন। রাজা সেখানেই
মন্দির স্থাপনা করলেন । ১৫০১ খ্রীঃ
দেবীর মন্দির নির্মাণ করলেন ।
মা ত্রিপুরেশ্বরী হলেন ভগবান
ত্রিপুরেশের শক্তি। তিনি শিবশক্তি,
তিনিই অসুরদলনী চণ্ডীকা । দেবীর পূজো
এখানে ষোড়োশীদেবীর পূজার নিয়মে
করা হয়। তন্ত্রআচারে দেবীর পূজা হয় ।
# শ্রীশ্রীদেবীত্রিপুরসুন্দরী বা # ষোড়শী
বা # ললিতা। ইনি # দশমহাবিদ্যা র
অন্যতমা। ত্রিপুরসুন্দরী # রাজরাজেশ্বরী
নামেও পরিচিতা। ত্রিপুরসুন্দরীর
ষোড়শী রূপটি ষোড়শবর্ষীয়া এক
বালিকার রূপ। এই রূপ ষোড়শপ্রকার
কামনার প্রতিক। ষোড়শীতন্ত্রে
ত্রিপুরাসুন্দরীকে "শিবের নয়ন জ্যোতি"
বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি
কৃষ্ণবর্ণা ও শিবোপরি উপবিষ্টা। শিব ও
ষোড়শীকে শয্যা, সিংহাসন অথবা ব্রহ্মা,
বিষ্ণু ও ইন্দ্রের মস্তকোপরিস্থিত
বেদিতে উপবিষ্ট রূপে কল্পনা করা হয়।
ললিতা শ্রীবিদ্যা সংক্রান্ত অন্যতমা
দেবী। ললিতা ধনুক, পঞ্চবাণ, পাশ ও
অঙ্কুশধারিনী। পাশ - অঙ্কুশ বন্ধন ও
মুক্তির প্রতিক, পঞ্চবাণ পঞ্চ ইন্দ্রয়ের
প্রতিক এবং ইক্ষুধনু মনের প্রতিক।
ভারতীয় রাজ্য ত্রিপুরার নাম
ত্রিপুরসুন্দরীর নাম থেকে বুৎপত্তিলাভ
করেছে। উদয়পুর শহরের অদূরে
রাধাকিশোরপুর গ্ৰামের নিকট একটি
পাহাড় চূড়ায় অবস্থিত ত্রিপুরসুন্দরী
মন্দির দেবীর প্রধান মন্দির। কাশ্মীরি
পন্ডিতরা ত্রিপুরাসুন্দরীর পাঁচটি
স্তবগান সংকলন করেছেন। পঞ্চস্তবী
নামে পরিচিত। এই স্তবগানগুলি উক্ত
সম্প্রদায়ের মধ্যে আজও জনপ্রিয়।
ত্রিপুরা শব্দের অর্থ ত্রিভুবন; অর্থাৎ
স্বর্গ, মর্ত্য ও পাতাল। এই কারণে
ত্রিপুরসুন্দরী শব্দের অর্থ ত্রিভুবনের
শ্রেষ্ঠ সুন্দরী। অন্য এক মতে, দেবীর অপর
নাম ত্রিপুরা। কারণ তিনি ব্রহ্মা, বিষ্ণু
ও শিবের শক্তি ব্রহ্মাণী, বৈষ্ণবী ও
রুদ্রাণীর সম্মিলিত রূপ।
সাহিত্যে ত্রিপুরসুন্দরী - হিন্দু ধর্ম
সাহিত্যে ত্রিপু্রসুন্দরীকে পরমাসুন্দরী
দেবী রূপে বর্ণনা করা হয়েছে। ললিতা
সহস্রনাম ও সৌন্দর্যলহরী স্তোত্রে তাঁর
রূপ বর্ণনা করা হয়েছে। হিন্দু বিশ্বাস
অনুযায়ী, কামনা সৃষ্টির মাধ্যমে তিনি
সৃষ্টির স্রোত অবারিত রাখেন।আদি
শঙ্করাচার্য তাঁর ত্রিপুরসুন্দরী অষ্টকম
স্তোত্রে ত্রিপুরসুন্দরীকে বিশ্বজননী
বলেছেন।
ত্রিপুরা সুন্দরীর মধ্যে কালীর শক্তি ও
দুর্গার সৌন্দর্য ও মহত্বের সম্মিলিত রূপ
লক্ষিত হয়। ধর্মীয় সাহিত্যের বর্ণনা
অনূযায়ী তিনি ত্রিনয়নী, চতুর্ভূজা,
রক্তাম্বর পরিহিতা, স্বর্ণালংকারভূষ
িতা এবং স্বর্ণসিংহাসনের উপর
পদ্মাসনে উপবিষ্টা। তাঁর হস্তধৃত বস্তূগুলি
শিবের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। তাঁর মূ়র্তিতে
রাজকীয় আভা থাকায় তাঁকে
রাজরাজেশ্বরী নামে অভিহিতা করা
হয়।
খ্রিষ্টীয় পঞ্চদশ শতকে মোগলরা ত্রিপুরা
রাজ্য আক্রমণ করেন। যবন সৈন্যরা কামান,
সেনা নিয়ে মন্দির আক্রমণ করেন । লক্ষ্য
একটাই মন্দির লুটপাট, ধ্বংস । মোগলদের
নীতি ছিল- হয় মোগলদের আধিপত্য
স্বীকার করে বার্ষিক খাজনা দাও, নচেৎ
যুদ্ধ করো । ত্রিপুরা ছোটো রাজ্য।
সেখানকার হিন্দু রাজার শক্তি কম ।
তিনি কিভাবে লড়বেন বিশাল
মোগলবাহিনীর সাথে । শ্রী শ্রী
চণ্ডীতে বলে –
রোগানশেষানপহংসি তুষ্টা
রুষ্টা তু কামান্ সকলানভীষ্টান্ ।।
ত্বামাশ্রিতানাং ন বিপন্নরাণাং
ত্বামাশ্রিতা হ্যাশ্রয়তাং প্রয়ান্তি ।।
( অর্থাৎ- হে দেবী ! তুমি তুষ্ট হলে সকল
রকম রোগ নাশ করে থাকো। আবার তুমি
রুষ্ট হলে তাঁর সকল প্রকার আশা, ইচ্ছা নষ্ট
হয় । যাহারা তোমাকে আশ্রয় করে,
তাহাদের বিপদ হয় না। কারন তোমাকে
আশ্রয় করিলে জগতের আশ্রয় হওয়া যায় । )
ত্রিপুরার তৎকালীন রাজধানী উদয়পুর
মোগলরা দখল করে মন্দিরের দিকে
এগোতে থাকলে মোগলসেনাদের মধ্যে
ভয়ানক মহামারী দেখা যায়। প্রচুর
মোগলসেনা রোগে মারা যায় ।
মোগলদের হাকিমরাও ঔষধ দিতে
পারেনি। বাকী মুষ্টিমেয় জীবিত কিছু
সেনা পলায়ন করে। দেবীর মন্দির লুঠপাঠ
করবার বাসনা নিয়ে গিয়ে তারা জীবন
হারালো । দেবীর মধ্যে পালিনী
বৈষ্ণবী মূর্তি দেখা যায় আবার তাঁর
মধ্যে সংহারিনী মহাকালী মূর্তিও
দেখা যায় ।
ত্রিপুরার প্রাচীন যে রাজ্য সীমা ছিল
তাঁতে তিনটি শৈব পীঠের উল্লেখ দেখা
যায় । বাংলাদেশের কুমিল্লার সতেরো
রত্ন মন্দির, রাজরাজেশ্বরী মন্দির,
পার্বত্য চট্টগ্রামের চন্দ্রনাথ মন্দির ।
বিভিন্ন পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শন দেখে
অনুমান করা যায়- এই অঞ্চলে একসময় পাল,
দেব, চন্দ্র বংশীয় রাজারা রাজত্ব
করতেন । প্রাচীন বাংলার ইতিহাসে
আমরা পাল বংশের রাজত্বের কথা
জানতে পারি । মন্দির টি ৭৫ ফুট উচু । দূর
থেকে মন্দিরের চূড়া দেখা যায় ।
মন্দিরের তিনদিকে ভোগ রান্নার ঘর,
পুরোহিত সেবাইতদের থাকার ঘর আছে।
মন্দিরের স্থাপত্যে বৌদ্ধ প্রভাব সুস্পষ্ট ।
মন্দিরে ত্রিপুরী শৈলী কলার উৎকৃষ্ট
নিদর্শন দেখা যায় । মন্দিরের বেদীতে
দুটি দেবী বিগ্রহ দেখা যায় । একটি বড়
অপরটি ক্ষয়প্রাপ্ত ছোটো । বড়
প্রতিমাটি কষ্টি পাথরের দেবী কালীর
মূর্তি। উচ্চতায় প্রায় ৫ ফুট । চতুর্ভুজা, শব
রূপ শিবের ওপর দণ্ডায়মানা । তিনি পাশ,
মুণ্ড, অঙ্কুশ ও বর মুদ্রা ধারন করে আছেন ।
দ্বিতীয় দেবী বিগ্রহ টি উচ্চতায় ২ ফুট
হবে। ইনিও দণ্ডায়মানা, চতুর্ভুজা, বস্ত্রে
আচ্ছাদিতা । স্থানীয় লোকেদের মতে
ইনি আসল দেবী ত্রিপুরেশ্বরীর বিগ্রহ ।
এই বিগ্রহ যে প্রাচীন- বোঝাই যায়।
স্থানীয় লোকেরা এঁনাকে “ছোটি মা”
বলে ডাকেন । মন্দিরের শীর্ষে
চারচালার সংযোগ স্থলে একটি প্রস্ফুটিত
পদ্ম আছে। পদ্মের বীজাধারে রয়েছে
একটি প্যাগোডা। এর উচ্চে রয়েছে একটি
বলয় । প্যাগোডার মাথায় সাতটি কলসি
আছে । একটি ধ্বজ ।
মন্দিরের উত্তর পূর্ব কোনে কল্যাণসাগড়
নামক এক জলাশয় আছে । এটি ত্রিপুরার
রাজা কল্যাণমাণিক্য ১৬২৫-১৬৬০ এর
মধ্যে এই দিঘী নির্মাণ করেন । দেবী
ত্রিপুরেশ্বরী হলেন দশমহাবিদ্যার
ষোড়োশী দেবী। দেবীর পূজা তৃতীয়
মহাবিদ্যা ত্রিপুরাসুন্দরী দেবীর পূজার
নিয়মে হয়ে থাকে । দেবীর পূজায় ছাগ
বলির ব্যবস্থা আছে । আপনারা ছাগ বলি
দিতে চাইলে মন্দির কমিটির সাথে
যোগাযোগ করতে পারেন । তাঁরাই
ব্যবস্থা করে দেবেন । প্রথমেই বলা
হয়েছিল রাজা ত্রিপুরা দেবীর ভৈরবকে
আনতে পারেন নি। তাই তিনি ত্রিনেত্র
শিবকে ভৈরব রূপে প্রতিষ্ঠা করেন ।
শক্তিপীঠ শক্তি দেবীর সাথে সাথে
ভৈরব মহাদেব ও বিরাজ করেন ।
ত্রিপুরার রাজ্যের হিন্দুদের মধ্যে দুটি
জনগোষ্ঠী দেখা যায় । একটি উপজাতি
হিন্দু অপরটি বাঙালি হিন্দু। দীর্ঘ কাল
একত্রে থাকার ফলে দুটি গোষ্ঠীর মধ্যে
সংস্কৃতির মেল বন্ধন হয় । আজও ত্রিপুরায়
দুই জনগোষ্ঠী ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ
হয়ে একত্রে বসবাস করছেন । ত্রিপুরার
কিছু তীর্থ স্থান হল- কসবার জয়কালী
মন্দির, উদয়পুরের ভুবনেশ্বরী মন্দির, কমলা
সাগড়ের কালী মন্দির, অমরপুরে
মঙ্গলচণ্ডী মন্দির, আগরতলার জগন্নাথ
মন্দির, আগরতলার শিব বাড়ী, আগরতলার
দুর্গা বাড়ী, আগরতলার উমা মহেশ মন্দির।
এছাড়া উনকোটি নামক স্থানে পাহাড়ের
গাত্রে মহাদেব সহ বিভিন্ন খোদিত
মূর্তি পর্যটক দের বিস্মিত করে।
ঐতিহাসিক দের মত এইগুলো অজন্তা-
ইলোড়ার সমসাময়িক ।
অনেকে বলেন কলকাতার গড়িয়ারর কাছে
বোড়াল সেখানেই আদি ত্রিপুরা পীঠ।
এখানে দেবীর অঙ্গুল হীন করতল পতিত
হয়েছিল। যদিও সকলে ত্রিপুরাকেই
মানেন । বোড়াল অঞ্চলের মন্দির টি
কালীঘাট মন্দিরের সমসাময়িক । কিছু
পণ্ডিত দের মতে মধ্যপ্রদেশের জব্বলপুরে
এই পীঠ রয়েছে বলে মনে করেন ।
বোড়ালের দেবী মন্দিরে দেবীর
অষ্টধাতুর মূর্তি আছে। তিনি শিবের
নাভিপদ্মে উপবিষ্টা । তবে যুগ যুগ ধরে
ত্রিপুরা রাজ্যকেই শক্তিপীঠ ধরা হয় ।
পোস্টটি পড়ে যদি ভালো লাগে লাইক শেয়ার করে পরবর্তী পোস্ট পেতে অনুপ্রেরণার আবেদন রইল ।
12/04/2019
পিলাক এর ভাষ্কর্য
ত্রিপুরার উপজাতিদের রূপকথা, ছড়া, পুরাণ ,প্রবাদে ত্রিপুরার অপর নাম ‘মায়ানী দেশ’ অর্থাৎ যাদু –সূর্যের দেশ।
উঁচুনীচু অগভীর অপ্রশস্ত উপত্যকা সবুজ ঘন জঙ্গলে ঢাকা। তার মধ্যে দিয়ে বয়ে চলেছে ছোটো–বড়ো গভীর– অগভীর নদী। এসবের মাঝেই ইতিউতি ছড়িয়ে আছে প্রাচীন যুগের সভ্যতার আকর। যাদু–সূর্যের আলোয় কখনও তা চকচক করে ওঠে ,কখনও বা আদিম অরণ্যের অন্ধকারে হারিয়ে যায়। প্রত্নতত্ত্বের ঝুলিতে সমগ্র ত্রিপুরা জুড়ে উপজাতি–হিন্দু–বৌদ্ধ এই তিন মিশ্র সংস্কৃতির চিহ্ন। কুমারী প্রকৃতির কোলে ইতিহাসের সঙ্গে উপকথা জড়াজড়ি করে আছে এখানে। সব মিলিয়ে ত্রিপুরা তাই মোহময়ী,রহস্যাবৃতা।
আগরতলা থেকে ১০০ কিলোমিটার বা উদয়পুর থেকে ৪৫ কিলোমিটার দূরে ইতিহাসের সাক্ষ্য নীরবে বহন করে চলেছে ছোট্ট গ্রাম পিলাক। গ্রামের পেছনে অতন্দ্র পাহারায় টাক্কাতুলসী পাহাড়। বৌদ্ধ দর্শণ অনুযায়ী ‘পিলা’ কথার অর্থ ‘এগিয়ে আসা’। গ্রামের মধ্যে বহুবছর ধরেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে বেলে পাথরের নানা দেবমূর্তি। ১৯৯৫ সালে খনন কার্য শুরু হয় ভারতীয় পুরাতাত্ত্বিক বিভাগের অধীনে। শ্যামসুন্দর টিলায় মাটির ঢিবি সরাতেই বের হয়ে এল প্রাচীন মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ। জ্যামিতির নিঁখুত নকশায় বারোটা দেওয়াল আর আটকোন বিশিষ্ট মন্দিরটি । কারোর মতে এটি বৌদ্ধস্তূপ। পুজোর বেদী একেবার মন্দিরের কেন্দ্রস্থলে। গোলাকার পুজোর ঘরের চারদিক থেকেই প্রবেশ করা যায়। পাথরের বেদীটির ওপর ক্ষয়ে যাওয়া একটা পাথর।সেটি একটা অবয়বের পা এর অংশবিশেষ।হয়তো অবয়বটি পূজিত হতো। গাছের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড় করানো সূর্যমূর্তি। আরো দুটো ভাস্কর্য্যের দেখা মিলল এখানে। তার মধ্যে একটি বিখ্যাত ‘অবলোতিকেশ্বর’ । ভেঙে যাওয়া মন্দিরের দেওয়ালে ছিল টেরাকোটার কারুশিল্প। এর সাক্ষ্য এখনও কিছুটা বয়ে চলেছে বিস্মৃতির স্তূপ থেকে উঠে আসা কিন্নর–গন্ধর্ব–বিদ্যাধর–গাছ লতাপাতা–পশুপাখির ভাস্কর্য্য। পাশাপাশি বৌদ্ধ কৃষ্টির ধারায় জায়গা করে নিয়েছে অর্ধমানব,অর্ধপশু ,পদ্মকোষ মন্দিরের গায়েই। পুরাতত্ত্বিকরা বলেন বাংলাদেশের ময়নামতীতে ধ্বংসস্তূপ থেকে পাওয়া স্থাপত্য–ভাস্কর্য্যের সাথে পিলাকের পুরাকীর্তির আশ্চর্য মিল। কুমিল্লার ময়নামতী ছিল বৌদ্ধধর্ম ও দর্শন চর্চার বড়কেন্দ্র। সেখান থেকে বক্সানগর হয়ে বৌদ্ধসন্ন্যাসীরা যেতেন পিলাক । সেখান থেকে সাব্রুম হয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের পথ ধরতেন তাঁরা।
একটু এগিয়েই পিলাক বাজার। বাজারের পাশেই ঠাকুরাণী টিলা। ১৯৯৮–৯৯ সালে স্তুপীকৃত মাটির স্তর সরাতেই পাওয়া গেল আরও পুরাকীর্তি। চাতালের নীচে রাখা দশফুট উচ্চতার সূর্যমূর্তি। গ্রামের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে আছে গণেশ,শেষনাগসহ আরো মূর্তি । বাড়ির দেওয়াল ঘেষে, ধানজমির মাঝে জেগে আছে আরো ঢিবি, সেগুলো এখনও খননের অপেক্ষায়। এছাড়া আশপাশের গ্রামগুলোতেও ছড়িয়ে আছে এমন অনেক নিদর্শণ। মুহুরীরপুরে সাড়ম্বরে পূজা হয় আঠারো হাতবিশিষ্ট দেবী রাজরাজেশ্বরীর। সঙ্গে আছে সূর্যদেব,মঙ্গলচন্ডী,গণেশ। মহারাজা বীরবিক্রম মানিক্যের আমল থেকেই এখানে এই চার দেবদেবী অধিষ্ঠিত। এছাড়া পাওয়া গাছে কিছু সোনা ও রূপোর মুদ্রা। প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে এই মুদ্রাগুলো সপ্তম থেকে ত্রয়োদশ শতকের । এখানে ভারতীয় পুরাতাত্ত্বিক বিভাগের অধীনে গড়ে উঠেছে সংরক্ষণশালা, যদিও তা সাধারণের জন্য এখনও রুদ্ধ। এখানে রক্ষিত আছে ধ্বংসস্তূপ থেকে পাওয়া স্ফটিকের শিবলিঙ্গ সহ অনেক পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শণ। বিষ্ণুমূর্তি আবার আগরতলা রাজ্য যাদুঘরে সংরক্ষিত আছে।
এতো গেল ইতিহাস আর পুরাতত্ত্ব। লোককথা অন্য গল্প বলে। উপজাতি মগ সম্প্রদায়ের মতে পিলাকে ছিল প্লেং রাজার রাজত্ব। রাজা ছিলেন বৌদ্ধ। পাশে ছিল কোলা রাজ্য। প্লেংরাজা কোলা রাজ্যে বেড়াতে গিয়ে সেখানকার বৌদ্ধবিহার ও বিগ্রহ দেখে মুগ্ধ হন। কোলা রাজাকে শ্বেতহস্তী উপহার দেন প্লেংরাজা। পরিবর্তে প্লেং রাজা একজন দক্ষ ভাস্করকে পাঠান কোলা রাজার কাছে। সে একে একে গড়ে তোলে এইসব মূর্তি আর ভাস্কর্য। প্লেং রাজকন্যা মুগ্ধ হন শিল্প ও শিল্পীকে দেখে। তরুন ভাস্করকে মন দিয়ে ফেলেন তিনি। আর ভাস্করের হাতুড়ির আঘাতে পাথরের বুকে জেগে উঠল রাজকন্যার প্রতিমূর্তি। টনক নড়ল রাজার। জানতে পারলেন রাজকন্যা অন্তসত্ত্বা। শিল্পীর দুহাত কেটে নেওয়া হল রাজার আদেশে। খবর পেয়ে কোলা রাজা যুদ্ধ ঘোষণা করলেন। তছনছ হয়ে গেল প্লেং রাজ্য। লুঠ হল সম্পদ। প্লেং রাজা পালিয়ে গেলেন। যাবার সময় তাঁর সৈন্যরা কেটে দিয়ে গেল পিলাকছড়া নদীর বাঁধ। জলের তোড়ে ভেসে গেল কোলা রাজার সৈন্যরা। প্লেং রাজকন্যা এই জলস্রোতে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। টাক্কাতুলসী পাহাড়ের কোলে সবুজ বনানী ঘেরা ছোট্ট গ্রাম পিলাকে আজও প্রতিধ্বনিত হয় এই প্রেম কাহিনী।
26/03/2019
কাশ্মীর ও সংবিধানের ৩৭০ নং অনুচ্ছেদ: কী, কেন, কোথা থেকে এল
৩৭০ ধারা বিলোপ করা হোক, এমন দাবি মাঝে মাঝেই শুনতে পাওয়া যায়। ৩৭০ ধারা কী, তার তাৎপর্যই বা কী, কাশ্মীরে গণভোটের কথা কেন উঠে আসে বারবার?
৩৭০ ধারা কী
৩৭০ ধারা সংবিধানের অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল ১৯৪৯ সালের ১৭ অক্টোবর। এই ধারাবলে জম্মুকাশ্মীরকে ভারতীয় সংবিধানের আওতামুক্ত রাখা হয় (অনুচ্ছেদ ১ ব্যতিরেকে) এবং ওই রাজ্যকে নিজস্ব সংবিধানের খসড়া তৈরির অনুমতি দেওয়া হয়। এই ধারা বলে ওই রাজ্যে সংসদের ক্ষমতা সীমিত। ভারতভুক্তি সহ কোনও কেন্দ্রীয় আইন বলবৎ রাখার জন্য রাজ্যের মত নিলেই চলে। কিন্তু অন্যান্য বিষয়ে রাজ্য সরকারের একমত হওয়া আবশ্যক। ১৯৪৭ সালে, ব্রিটিশ ভারতকে ভারত ও পাকিস্তানে বিভাজন করে ভারতীয় সাংবিধানিক আইন কার্যকর হওয়ার সময়কাল থেকেই ভারতভুক্তির বিষয়টি কার্যকরী হয়।
স্বাধীনতার পর প্রায় ৬০০টি রাজন্য পরিচালিত রাজ্যের সার্বভৌমত্ব পুনরুদ্ধার করা হয়। ওই আইনে তিনটি সম্ভাবনার কথা রয়েছে। প্রথমত স্বাধীন দেশ হিসেবে থেকে যাওয়া, দ্বিতীয়ত, ভারতের যোগদান অথবা, পাকিস্তানে যোগদান। এ ব্যাপারে কোনও লিখিত ফর্ম না থাকলেও, কী কী শর্তে এক রাষ্ট্রে যোগদান করা হবে, তা রাজ্যগুলি স্থির করতে পারত। অলিখিত চুক্তি ছিল, যোগদানের সময়কালীন প্রতিশ্রুতি রক্ষিত না হলে, দু পক্ষই নিজেদের পূর্বতন অবস্থানে ফিরে যেতে পারবে।
অন্যান্য বেশ কিছু রাজ্য এই বিশেষ সুবিধা ভোগ করে সংবিধানের ৩৭১, ৩৭১ এ ও ৩৭১ এল ধারার মাধ্যমে।
ভারতভুক্তির শর্ত হিসেবে জম্মু কাশ্মীরে সংসদ প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র ও যোগাযোগ- এই তিনটি বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ব্যাপারে ক্ষমতাধর। কাশ্মীরের ভারতভুক্তির ৫ নং উপধারায় জম্মু-কাশ্মীরের রাজা হরি সিং স্পষ্টত উল্লেখ করে দিয়েছিলেন যে তাঁর সম্মতি ছাড়া ভারতের স্বাধীনতা আইনে এ রাজ্যের ভারতভুক্তি কোনও সংশোধনী আইনের মাধ্যমে বদলানো যাবে না। ৭ নং উপধারায় বলা ছিল যে এই ভারতভুক্তির শর্তাবলী ভবিষ্যৎ কোনও সংবিধানের মাধ্যমে বদলাতে বাধ্য করা যাবে না।
370 এর বৈশিষ্ট্য
👉এই ধারা অনুসারে এই রাজ্যে ১৯৭৬ সালের ভূমি সংক্রান্ত আইন এই রাজ্যে লাগু হয় না। যার কারণে ভারতের অন্যান্য রাজ্যের বাসিন্দারা জম্মু-কাশ্মীরে জমি কিনতে পারবেন না।
👉জম্মু-কাশ্মীরে ৩৬০ ধারা লাগু হয় না।
👉৩৭০ ধারা অনুসারে জম্মু কাশ্মীরের বাসিন্দারা যে বিশেষ কয়েকটি আলাদা সুবিধা পেয়ে থাকেন।
👉জম্মু-কাশ্মীরের বাসিন্দাদের দুটি নাগরিকত্ব থাকে।
👉জম্মু-কাশ্মীরের রাষ্ট্রীয় পতাকা আলাদা।
👉জম্মু-কাশ্মীরের বিধানসভার কার্যকাল ৬ বছরের অন্যান্য রাজ্যের ক্ষেত্রে ৫ বছরের হয়ে থাকে।
👉এমনকি জম্মু-কাশ্মীরের ভিতরে ভারতের রাষ্ট্রীয় পতাকার অপমান করা অপরাধ নয়।
👉জম্মু-কাশ্মীরের কোন মহিলা ভারতের কোন কোন রাজ্যের কোন পুরুষের সাথে বিবাহ করলে ওই মহিলার জম্মু-কাশ্মীরের নাগরিত্ব সমাপ্ত হয়ে যায়।
👉ঠিক একইভাবে ভারতের অন্য কোন রাজ্যের কোন মহিলা জম্মু-কাশ্মীরের কোন বাসিন্দাকে বিয়ে করলে তিনি জম্মু-কাশ্মীরের নাগরিকত্ব পেয়ে যান।
👉৩৭০ ধারার বলে ভারতের কোন আইন কানুন জম্মু-কাশ্মীরে লাগু হয় না।
👉৩৭০ ধারার বলে পাকিস্তানের কোন নাগরিক জম্মু-কাশ্মীরে থাকলে তিনিও ভারতের নাগরিকত্ব পেয়ে যান।
👉জম্মু-কাশ্মীরে পঞ্চায়েত ব্যবস্থার আইন নেই।
👉ভারতের সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ বা আদেশ জম্মু-কাশ্মীরের লাগু হয় না।
👉পাকিস্তানের কোন নাগরিক জম্মু-কাশ্মীর কোন মহিলাকে বিয়ে করলে ভারতের নাগরিকত্ব মিলে যায়।
👉৩৭০ ধারার বলে কাশ্মীরে আর.টি আই., সি.এ.জি.,আর.টি.ই. ও লাগু হয় না।
👉কাশ্মীরে থাকা হিন্দু এবং শিখদেরও ১৬ শতাংশ সংরক্ষণ মিলে না।
👉কাশ্মীরে মহিলাদের ওপর শরীয়ত আইন লাগু রয়েছে।
👉জম্মু-কাশ্মীরের ভারতের কোন কোন রাজ্যের বাসিন্দা জমি কিনতে না পারলেও জম্মু কাশ্মীরের বাসিন্দা ভারতের অন্য কোন রাজ্যে জমি কিনতে পারেন।
জম্মু-কাশ্মীরের জন্য রয়েছে আলাদা সংবিধান।
ভারতভুক্তি কীভাবে হল?
রাজা হরি সিং প্রাথমিক ভাবে স্থির করেছিলেন তিনি স্বাধীন থাকবেন, এবং সেই মোতাবেক ভারত ও পাকিস্তানের সঙ্গে স্থিতাবস্থার চুক্তি স্বাক্ষর করবেন। পাকিস্তান সে চুক্তিতে স্বাক্ষরও করেছিল। কিন্তু জনজাতি এবং সাদা পোশাকের পাক সেনা যখন সে দেশে অনুপ্রবেশ করে, তখন তিনি ভারতের সাহায্য চান, যা শেষপর্যন্ত কাশ্মীরের ভারতভুক্তি ঘটায়। ১৯৪৭ সালের ২৬ অক্টোবর হরি সিং ভারতভুক্তির চুক্তি স্বাক্ষর করেন। পরদিন, ২৭ অক্টোবর ১৯৪৭, গভর্নর জেনারেল লর্ড মাউন্টব্যাটেন সে চুক্তি অনুমোদন করেন।
এ ব্যাপারে ভারতের অবস্থান ছিল খোলামেলা। ভারতের বক্তব্য ছিল এই ভারতভুক্তির বিষয়টি কোনও একজন শাসকের মতামতের ভিত্তিতে স্থির হতে পারে না, এর জন্য সে জায়গার অধিবাসীদের মতামত নেওয়া প্রয়োজন। লর্ড মাউন্টব্যাটেন বলেছিলেন, “আমার সরকার মনে করে, কাশ্মীর আক্রমণকারীদের হাত থেকে মুক্ত হওয়ার অব্যবহিত পরেই সে রাজ্যের ভারতভুক্তির বিষয়টি রাজ্যের অধিবাসীদের দ্বারা স্থিরীকৃত হওয়া উচিত।” কাশ্মীরের ভারতভুক্তি যে সাময়িক সিদ্ধান্ত, তা ১৯৪৮ সালে জম্মু-কাশ্মীর সম্পর্কিত শ্বেত পত্রে ঘোষণা করে ভারত সরকার। ১৭ মে ১৯৪৯ সালে প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু, সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল এবং এন গোপালস্বামী আয়েঙ্গারের সম্মতিক্রমে জম্মু-কাশ্মীরের প্রধানমন্ত্রী শেখ আবদুল্লাকে একটি চিঠি লেখেন। সে চিঠিতে তিনি বলেন, ভারত সরকারের স্থির সিদ্ধান্ত হল জম্মু-কাশ্মীরের সংবিধান সে রাজ্যের অধিবাসীদের নিয়ন্ত্রণের বিষয়। সেই মতামতের প্রতিনিধিত্ব বহন করার উদ্দেশ্যেই গণপরিষদ গঠিত হয়েছে।
৩৭০ ধারা কীভাবে কার্যকর হয়েছিল?
মূল খশড়া দেওয়া হয়েছিল জম্মু কাশ্মীর সরকারকে। কিছু অদলবদলের পর ৩০৬ এ ধারা (বর্তমান ৩৭০) ২৭ মে, ১৯৪৯ সালে গণপরিষদে পাশ হয়। প্রস্তাব পেশ করে আয়েঙ্গার বলেন, যদিও ভারতভুক্তি সম্পন্ন হয়ে গেছে, তা সত্ত্বেও ভারতের তরফ থেকে প্রস্তাব দেওয়া হচ্ছে যে পরিস্থিতি তৈরি হলে গণভোট নেওয়া হোক, এবং গণভোটে ভারতভুক্তি যদি গৃহীত না হয়, তাহলে “আমরা কাশ্মীরকে ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পথে বাধা সৃষ্টি করব না।“
৩৭০ ধারা কি সাময়িক অবস্থান?
সংবিধানের একবিংশ অংশের প্রথম অনুচ্ছেদ এটিই। এ অংশের শিরোনাম হল- সাময়িক, পরিবর্তনসাপেক্ষ, এবং বিশেষ বিধান। ৩৭০ ধারাকে সাময়িক বলে বিবেচনা করা যেতেই পারে। জম্মু কাশ্মীর বিধানসভা এ ধারা পরিবর্তন করতে পারত, একে বিলোপ করতে পারত বা একে ধারণ করতে পারত। বিধানসভা একে ধারণ করার পক্ষে মত দেয়। আরেকটি ব্যাখ্যা হল- গণভোট না হওয়া পর্যন্ত ভারতভুক্তির সিদ্ধান্ত সাময়িক বলে গণ্য। গত বছর সংসদে এক লিখিত জবাবে ভারত সরকারের তরফ থেকে জানানো হয়েছে যে ৩৭০ ধারা বিলুপ্তির কোনও প্রস্তাব নেই। ৩৭০ ধারা সাময়িক এবং একে বহাল রাখা সংবিধানের সঙ্গে জালিয়াতি- এ কথা বলে মামলা করেছিলেন কুমারী বিজয়লক্ষ্মী। ২০১৭ সালে এ মামলা নাকচ করে দেয় দিল্লি হাইকোর্ট।
২০১৮ সালের এপ্রিল মাসে সুপ্রিম কোর্ট জানিয়ে দিয়েছিল, শিরোনামে সাময়িক লেখা থাকলেও ৩৭০ ধারা সাময়িক নয়। ১৯৬৯ সালে সম্পৎ প্রকাশ মামলায় ৩৭০ ধারাকে সাময়িক বলে মানতে অস্বীকার করে সুপ্রিম কোর্ট।
৩৭০ ধারা কি বিলোপ করা যেতে পারে?
রাষ্ট্রপতির আদেশের ভিত্তিতে অনুচ্ছেদ ৩৭০ (৩) বিলোপ করা যেতেই পারে। তবে তেমন নির্দেশের জন্য জম্মু কাশ্মীরের গণপরিষদের সম্মতি প্রয়োজন। কিন্তু গণপরিষদ বিলুপ্ত হয়ে গেছে ২৬ জানুয়ারি, ১৯৫৭-তে। ফলে একটা মত হল, ৩৭০ ধারা আর বিলোপ করা যেতে পারে না। তবে এ ব্যাপারে আরেকটি মতও রয়েছে, সেটা হল রাজ্য বিধানসভার সম্মতিক্রমে এই বিলোপের সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে।
ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রে ৩৭০ ধারার তাৎপর্য কী?
৩৭০ ধারার ১ নং অনুচ্ছেদ উল্লিখিত হয়েছে, যেখানে রাজ্যগুলির তালিকায় জম্মু-কাশ্মীরকে রাখা হয়েছে। বলা হয়েছে ৩৭০ ধারার মাধ্যমে জম্মু-কাশ্মীরে সংবিধান লাগু হবে। তবে ১৯৬৩ সালের ২৭ নভেম্বর নেহরু লোকসভায় বলেছিলেন যে ৩৭০ ধারার ক্ষয় হয়েছে। জম্মু কাশ্মীরে ভারতীয় সংবিধান কার্যকর রাখার জন্য অন্তত ৪৫ বার ৩৭০ ধারা ব্যবহার করা হয়েছে। এ ভাবে রাষ্ট্রপতির আদেশের ভিত্তিতে জম্মু-কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা প্রায় নাকচ করা হয়েছে। ১৯৫৪ সালের নির্দেশ মোতাবেক প্রায় গোটা সংবিধানই, সমস্ত সংশোধনী সহ জম্মু-কাশ্মীরে কার্যকর করা হয়েছে। ৯৭টির মধ্যে ৯৪টি যুক্তরাষ্ট্রীয় তালিকা জম্মু কাশ্মীরে লাগু, ৩৯৫ টি অনুচ্ছেদের মধ্যে ২৬০টি রাজ্যে কার্যকর, ১৩টির মধ্যে ৭টি তফশিলও লাগু রয়েছে সেখানে।
জম্মু কাশ্মীরের সংবিধান সংশোধনের জন্য ৩৭০ ধারাকে একাধিকবার ব্যবহার করা হয়েছে যদিও ৩৭০ ধারার অন্তর্গত ভাবে রাষ্ট্রপতিরও সে ক্ষমতা নেই। পাঞ্জাবে এক বছরের বেশি রাষ্ট্রপতি শাসন জারি রাখতে সরকারের ৫৯তম, ৬৪ তম, ৬৭ তম এবং ৬৮তম সংবিধান সংশোধনী প্রয়োজন হয়েছিল। কিন্তু জম্মুকাশ্মীরের ক্ষেত্রে শুধু ৩৭০ ধারা প্রয়োগ করেই সে কাজ চলে যায়। তালিকাভুক্ত রাজ্যগুলির জন্য আইন প্রণয়নের জন্য প্রয়োজনীয় ২৪৯ নং অনুচ্ছেদ জম্মু কাশ্মীরে লাগু করার জন্য বিধানসভায় কোনও প্রস্তাব পাশ করানো হয়নি, রাজ্যপালের সুপারিশের ভিত্তিতেই তা কার্যকর হয়ে যায়। এসব দিক থেকে দেখলে ৩৭০ ধারা জম্মু কাশ্মীরের অধিকারকে অন্য রাজ্যগুলির তুলনায় খর্ব করে। এখন ৩৭০ ধারা, জম্মু কাশ্মীরের থেকে ভারত রাষ্ট্রের পক্ষে বেশি সহায়ক।
জম্মু কাশ্মীরকে ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ হওয়ার জন্য ৩৭০ ধারার কি কোনও প্রয়োজন আছে?
জম্মু কাশ্মীরের সংবিধানের ৩ নং অনুচ্ছেদে বলা রয়েছে যে জম্মু কাশ্মীর ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ। সংবিধানের প্রস্তাবনায় কোনও সার্বভৌমত্বের কথা তো বলাই নেই, বরং সংবিধানের উদ্দেশ্য হিসেবে অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সুসম্পর্ক তৈরির কথা বলা রয়েছে। এ রাজ্যের জনগণ স্থায়ী বাসিন্দা হিসেবে স্বীকৃত, নাগরিক নয়। ৩৭০ ধারা সংহতি বিষয়ক নয়, স্বায়ত্তশাসন বিষয়ক। যাঁরা এর বিলোপ চাইছেন, তাঁরা সংহতি নিয়ে ভাবিত নন, তাঁদের মাথাব্যথা অভিন্নতা নিয়ে।
৩৫ এ ধারা কী?
৩৭০ ধারা থেকেই প্রবাহিত হয়েছে ৩৫এ ধারা, যা ১৯৫৪ সালের রাষ্ট্রপতির নির্দেশের মাধ্যমে কার্যকর হয়। ৩৫এ ধারানুসারে, জম্মু কাশ্মীরের বাসিন্দা বলতে কী বোঝায়, তাঁদের বিশেষ অধিকারগুলি কী কী, এ সম্পর্কিত সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার জম্মু কাশ্মীর বিধানসভার উপর ন্যস্ত রয়েছে।
Click here to claim your Sponsored Listing.
Location
Contact the school
Telephone
Website
Address
Agartala
799003