05/09/2026
অনেকেই মনে করেন মডার্ন কুলিনারি আর্ট মানেই ফোম, জেল আর স্ফেরিফিকেশন, আসলে কিন্তুু তা নয়। জানতে হলে পুরো টা পড়ুন..
একটি আন্তর্জাতিক রান্নাঘরে কাজ করার সময় প্রথম দিকে একটি বিষয় আমাকে বেশ অবাক করত। কিছু খাবার দেখতে খুব সাধারণ। প্লেটে হয়তো একটি মাছ, সামান্য সবজি, একটি সস এবং দু-একটি ছোট উপাদান। দেখে মনে হবে, এত সাধারণ খাবারকে আবার আধুনিক বলা হচ্ছে কেন? অন্যদিকে কোথাও দেখছি ফোম, জেল, ধোঁয়া, গোল গোল তরল বল কিংবা অদ্ভুত আকৃতির খাবার। তখন স্বাভাবিকভাবেই মনে হতো, বুঝি এগুলোই আধুনিক রান্নার আসল পরিচয়। কিন্তু রান্নাঘরে কাজ করতে করতে ধীরে ধীরে বুঝলাম, আমি আসলে আধুনিক রান্নার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টাই তখনও বুঝিনি।
একদিন একটি সাধারণ মাছ নিয়ে কাজ করার সময় বিষয়টি আমার কাছে পরিষ্কার হয়ে গেল। মাছটি খুব দামি কোনো উপকরণ ছিল না। কিন্তু শেফ মাছটি হাতে নিয়ে সরাসরি রান্না শুরু করলেন না। তিনি মাছটির গন্ধ দেখলেন, গঠন দেখলেন, ত্বক দেখলেন, মাংস কতটা শক্ত বা নরম সেটা বুঝলেন। তারপর তিনি আলোচনা করলেন মাছটির সঙ্গে কী ধরনের সস ভালো যাবে, কোন তাপমাত্রায় রান্না করলে এর স্বাভাবিক স্বাদ সবচেয়ে ভালো থাকবে এবং কীভাবে এর ত্বক মচমচে করা যায়। মাছটি রান্না করার পর প্লেটে খুব বেশি কিছু যোগ করা হলো না। কিন্তু যখন খেতে দিলেন, তখন বুঝলাম, খাবারটি দেখতে সাধারণ হলেও এর প্রতিটি সিদ্ধান্তের পেছনে চিন্তা আছে।
সেদিন আমার কাছে একটা বিষয় পরিষ্কার হয়ে গেল। মডার্ন কুলিনারি আর্টের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন প্লেটে দেখা যায় না, শেফের চিন্তার মধ্যে দেখা যায়।
আমরা অনেক সময় মডার্ন কুলিনারি বলতে শুধু ফোম, জেল, স্ফেরিফিকেশন, ধোঁয়া, তরল নাইট্রোজেন কিংবা অদ্ভুত আকৃতির খাবারকে বুঝি। এগুলো অবশ্যই আধুনিক রান্নার বিভিন্ন কৌশলের অংশ হতে পারে। কিন্তু এগুলো ব্যবহার করলেই একটি খাবার আধুনিক হয়ে যায় না। একটি প্লেটে ফোম আছে বলেই সেটি ভালো খাবার নয়। জেল আছে বলেই সেটি উন্নত রান্না নয়। স্ফেরিফিকেশন করা হয়েছে বলেই শেফের দক্ষতা প্রমাণ হয় না।
প্রযুক্তি তখনই মূল্যবান, যখন সেটি খাবারকে আরও ভালো করে।
একজন শেফ যদি শুধু দেখানোর জন্য ফোম ব্যবহার করেন, কিন্তু সেই ফোম খাবারের স্বাদে কোনো পরিবর্তন না আনে, তাহলে তার প্রয়োজন কী? একটি জেল যদি শুধু প্লেটের সৌন্দর্য বাড়ায় কিন্তু খাবারের স্বাদ বা গঠনে কোনো ভূমিকা না রাখে, তাহলে সেটি সেখানে কেন থাকবে? একজন শেফের প্রতিটি সিদ্ধান্তের পেছনে একটি কারণ থাকা উচিত।
এখানেই মডার্ন কুলিনারি আর্ট আর শুধু “আধুনিক দেখতে খাবার” এর মধ্যে পার্থক্য।
একজন আধুনিক শেফ প্রথমে প্রশ্ন করেন, খাবারটি কীভাবে আরও ভালো করা যায়। তারপর তিনি সিদ্ধান্ত নেন কোন কৌশল ব্যবহার করবেন। উল্টোটা নয়। অর্থাৎ আগে কোনো নতুন কৌশল শিখে নিয়ে সেটি জোর করে খাবারের মধ্যে ঢুকিয়ে দেওয়া আধুনিক রান্না নয়।
ধরুন, আপনি একটি দেশি মাছ রান্না করছেন। আপনি চাইলে এর সঙ্গে ফোম দিতে পারেন, জেল দিতে পারেন, আধুনিক আকৃতিতে সাজাতে পারেন। কিন্তু তার আগে আপনাকে জানতে হবে মাছটির নিজস্ব স্বাদ কী, তার সঙ্গে কোন স্বাদ ভালো যায়, কতটা অম্লতা প্রয়োজন, কতটা চর্বি প্রয়োজন, কী ধরনের গঠন দরকার এবং অতিথি প্রথম কামড়ে কী অনুভব করবেন।
যদি এসব প্রশ্নের উত্তর জানা থাকে, তাহলে আপনি আধুনিক রান্নার পথে আছেন।
আর যদি শুধু প্লেটটি দেখতে আধুনিক করার চেষ্টা করেন, তাহলে আপনি হয়তো একটি সুন্দর ছবি তৈরি করছেন, কিন্তু একটি উন্নত খাবার তৈরি করছেন না।
আমার কাছে আধুনিক রান্নার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো উপকরণকে নতুন চোখে দেখা।
একটি আলু শুধু আলু নয়। কাঁচা অবস্থায় তার গঠন একরকম, সেদ্ধ করলে অন্যরকম, ভাজলে অন্যরকম, রোস্ট করলে অন্যরকম। একটি পেঁয়াজ কাঁচা অবস্থায় ঝাঁঝালো, ধীরে রান্না করলে মিষ্টি, পুড়িয়ে দিলে অন্য ধরনের সুগন্ধ তৈরি করে। একটি টমেটো কাঁচা অবস্থায় যেমন, রোস্ট করলে তেমন নয়, শুকিয়ে নিলে আবার সম্পূর্ণ ভিন্ন।
একজন আধুনিক শেফ এই পরিবর্তনগুলো নিয়ে চিন্তা করেন।
তিনি শুধু বলেন না, “এটা দিয়ে কী রান্না করব?”
তিনি প্রশ্ন করেন, “এই উপকরণটি আর কী কী হতে পারে?”
এখান থেকেই গবেষণা শুরু হয়।
একটি উপকরণ কোন মৌসুমে সবচেয়ে ভালো, কোথা থেকে এসেছে, কতটা সতেজ, কীভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে, তার কোন অংশ ব্যবহার করা হচ্ছে এবং কোন অংশ ফেলে দেওয়া হচ্ছে, এসবও একজন আধুনিক শেফের চিন্তার অংশ।
একটি মাছের মাথা কি শুধু ফেলে দেওয়ার জিনিস? হাড় দিয়ে কি ভালো স্টক তৈরি করা যায় না? সবজির খোসা দিয়ে কি অন্য কিছু তৈরি করা যায় না? মাংসের অতিরিক্ত অংশ দিয়ে কি নতুন কোনো উপাদান তৈরি করা সম্ভব নয়?
যখন একজন শেফ একটি উপকরণের পুরো সম্ভাবনা দেখতে শুরু করেন, তখন তার রান্নাও বদলাতে শুরু করে।
আরেকটি বিষয় হলো পুরোনো রান্নার কৌশল।
মডার্ন কুলিনারি মানে পুরোনো রান্নাকে ভুলে যাওয়া নয়। বরং পুরোনো জ্ঞানকে নতুনভাবে ব্যবহার করা। স্টক, সস কমিয়ে ঘন করা, সংরক্ষণ, আচার, ধোঁয়ায় রান্না, ধীরে রান্না, শুকিয়ে সংরক্ষণ, ফারমেন্টেশন, মাংস সংরক্ষণ, ভাজা, রোস্ট করা, এসব কৌশলের অনেকগুলোই বহু পুরোনো। কিন্তু একজন আধুনিক শেফ এগুলোকে আরও নিখুঁতভাবে ব্যবহার করতে পারেন।
একটি পুরোনো খাবারকে নতুনভাবে পরিবেশন করা মানেই তার পরিচয় নষ্ট করা নয়।
বরং কখনো কখনো আধুনিক কুলিনারির সবচেয়ে সুন্দর কাজ হলো পুরোনো একটি খাবারের আসল সৌন্দর্যকে আরও পরিষ্কারভাবে তুলে ধরা।
এই জায়গায় বাংলাদেশের জন্যও অনেক বড় সুযোগ রয়েছে।
আমাদের রান্নাঘরে এমন অসংখ্য উপকরণ আছে যেগুলো আমরা প্রতিদিন ব্যবহার করি, কিন্তু সেগুলোর সম্ভাবনা নিয়ে খুব কম গবেষণা করি। শুঁটকি, সরিষা, কাঁচামরিচ, তেঁতুল, নারকেল, দেশি মাছ, বিভিন্ন শাক, কাঁচা কলা, খেজুরের গুড়, আঞ্চলিক মসলা, ভর্তা, আচার কিংবা বিভিন্ন সংরক্ষিত খাবারকে আমরা শুধু ঐতিহ্যবাহী খাবার হিসেবে দেখি।
কিন্তু একজন আধুনিক শেফ যদি এগুলোকে নতুনভাবে দেখতে শুরু করেন, তাহলে গল্পটা বদলে যেতে পারে।
শুঁটকি শুধু শুঁটকি নয়। এর গভীর স্বাদকে কীভাবে অন্য উপাদানের সঙ্গে ব্যবহার করা যায়, সেটা নিয়ে গবেষণা করা যায়।
সরিষা শুধু ঝোলের মসলা নয়। এর ঝাঁঝ, তেল এবং সুগন্ধকে বিভিন্নভাবে ব্যবহার করা যায়।
তেঁতুল শুধু টক দেওয়ার উপকরণ নয়। এর অম্লতা, মিষ্টতা এবং ঘনত্ব নিয়ে কাজ করা যায়।
দেশি মাছ শুধু ভাজা বা ঝোলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তার নিজস্ব স্বাদকে সম্মান রেখে নতুন রান্নার কৌশলের মাধ্যমে তাকে নতুনভাবে উপস্থাপন করা যায়।
এটাই আমি মনে করি আধুনিক বাংলাদেশি রান্নার সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা।
আমাদের বিদেশি খাবার নকল করার প্রয়োজন নেই। আমাদের বিশ্বের রান্নার কৌশল শিখতে হবে, কিন্তু সেই কৌশল ব্যবহার করতে হবে নিজেদের উপকরণ, নিজেদের ইতিহাস এবং নিজেদের স্বাদের পরিচয় নিয়ে।
কারণ একটি বিদেশি খাবার সুন্দরভাবে নকল করতে পারা আপনাকে দক্ষ শেফ প্রমাণ করতে পারে। কিন্তু নিজের দেশের একটি সাধারণ উপকরণকে এমনভাবে তুলে ধরা, যাতে একজন বিদেশি অতিথি সেটি খেয়ে নতুন কিছু আবিষ্কার করার অনুভূতি পান, সেটিই একজন শেফের নিজস্ব পরিচয় তৈরি করতে পারে।
মডার্ন কুলিনারি আর্ট তাই শুধু নতুন প্রযুক্তির গল্প নয়। এটি নির্ভুলতার গল্প। এটি স্বাদের ভারসাম্যের গল্প। এটি টেক্সচারের গল্প। এটি উপকরণ বোঝার গল্প। এটি গবেষণার গল্প। এটি অপচয় কমানোর গল্প। এটি উপস্থাপনার গল্প। আর সবকিছুর ওপরে এটি একজন শেফের চিন্তার গল্প।
একজন আধুনিক শেফ খাবার তৈরি করার সময় শুধু ভাবেন না, “এটা দেখতে কেমন হবে?”
তিনি ভাবেন, “প্রথম কামড়ে কী অনুভূতি হবে?”
“এরপর কোন স্বাদ আসবে?”
“টেক্সচার কীভাবে পরিবর্তন হবে?”
“সস কি মূল উপকরণের স্বাদকে ঢেকে দিচ্ছে, নাকি আরও পরিষ্কার করছে?”
“শেষ কামড়ের পর অতিথির মুখে কোন স্বাদ থাকবে?”
এই প্রশ্নগুলোই একটি খাবারকে সাধারণ রান্না থেকে উন্নত কুলিনারি অভিজ্ঞতায় নিয়ে যেতে পারে।
তাই আমি মনে করি, নতুন শেফদের শুধু নতুন নতুন কৌশল শেখার পেছনে ছুটলে হবে না। ফোম কীভাবে বানাতে হয়, জেল কীভাবে তৈরি করতে হয়, স্ফেরিফিকেশন কীভাবে করতে হয়, এগুলো শেখা যেতে পারে। কিন্তু তার আগে জানতে হবে, এগুলো কখন ব্যবহার করা উচিত এবং কেন ব্যবহার করা উচিত।
কারণ একটি কৌশল জানা আর সেই কৌশল সঠিক জায়গায় ব্যবহার করতে পারা এক জিনিস নয়।
একজন শেফের হাতে যত বেশি কৌশল থাকবে, তার স্বাধীনতা তত বেশি হবে। কিন্তু কোন কৌশল ব্যবহার করবেন, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য প্রয়োজন জ্ঞান, অভিজ্ঞতা এবং বিচারবোধ।
এই কারণেই আমি বলি, মডার্ন শেফ হওয়ার অর্থ আধুনিক সরঞ্জাম হাতে নেওয়া নয়, আধুনিকভাবে চিন্তা করতে শেখা।
আপনি যদি একটি সাধারণ আলু দিয়ে অসাধারণ কিছু তৈরি করতে পারেন, আপনি আধুনিকভাবে চিন্তা করছেন।
আপনি যদি একটি পুরোনো বাংলাদেশি খাবারের স্বাদ নষ্ট না করে সেটিকে নতুনভাবে উপস্থাপন করতে পারেন, আপনি আধুনিকভাবে চিন্তা করছেন।
আপনি যদি একটি উপকরণের যে অংশ সবাই ফেলে দেয়, সেটির নতুন ব্যবহার খুঁজে বের করতে পারেন, আপনি আধুনিকভাবে চিন্তা করছেন।
আপনি যদি একটি খাবারের প্রতিটি উপাদান কেন প্লেটে আছে তার উত্তর দিতে পারেন, আপনি আধুনিকভাবে চিন্তা করছেন।
আর আপনি যদি শুধু খাবারটাকে দেখতে আধুনিক বানানোর চেষ্টা করেন, তাহলে হয়তো আপনার প্লেট আধুনিক দেখাবে, কিন্তু আপনার চিন্তা এখনো আধুনিক হয়নি।
আমার আন্তর্জাতিক রান্নাঘরের অভিজ্ঞতা থেকে সবচেয়ে বড় যে শিক্ষা পেয়েছি, তা হলো, একজন বড় শেফের পরিচয় তার প্লেটে থাকা ফোম, জেল বা কোনো বিশেষ কৌশল দিয়ে তৈরি হয় না। তার পরিচয় তৈরি হয় সে কীভাবে একটি উপকরণকে দেখে, কীভাবে একটি সমস্যার সমাধান করে এবং কীভাবে একটি খাবারের মাধ্যমে নিজের চিন্তা প্রকাশ করে তার মাধ্যমে।
মডার্ন কুলিনারি আর্টের আসল পরিবর্তন তাই প্লেটে নয়।
আসল পরিবর্তন শুরু হয় শেফের মাথায়।
আর যখন শেফের চিন্তা বদলায়, তখন তার রান্নাও একদিন বদলে যায়।