14/10/2020
#রোহিঙ্গা_ইস্যু ;
#পাখিরা_জেগে_গেছে__তোমরা_এখনো_জাগলেন_?
( ইতিহাস নির্ভর রূপক গল্প।-৩ )
১ম পর্ব।
কোকিল ডাকছে। ভোরের কাঁচা রোদ্দুরে ঘাসের ডগায় ঝুলে থাকা শিশিরকণাগুলো জ্বলজ্বল করছে। বিলে ঝাঁকে ঝাঁকে অতিথি পাখির কলরব। শূন্যে মেঘশিরীষের ছোট ছোট পাতার ওড়াউড়ি। আকাশে বিশাল বিশাল পরিযায়ী বুনোহাঁসের ডানার পতপত শব্দ। মেঘের পাহাড়ে নানাবর্ণের অপার্থিব দৃষ্টি নন্দন ভাস্কর্য। এ সবই যেন একটি সংবাদ দিচ্ছে, "শীত এসে গেছে"।
পাঠক! ধরেই নিয়েছ এখন আমি শীতকালীন সৌন্দর্য তুলে ধরব। ঘাসফড়িঙের নাচন আর ফুলেফলে বাগান সুরভিত হওয়ার কথা বলে তোমার মাঝে এক সম্মোহন সৃষ্টি করব।
হ্যাঁ, এটাই ছিল স্বাভাবিক কিন্তু আমার চোখে জল। হৃদয়ে রক্তক্ষরণ। আমি দেখছি হাড়কাঁপানো এ শীতে হাজার হাজার শীতপীড়িত বস্ত্রহীন শরণার্থী। উপরে পলিথিন আর নিচে চাটাই। বেশি হলে কোনরকম টিনের ছাপড়া। যুবকরাও ঠকঠক করে কাঁপছে।
চোখ বুজলেই ভেসে উঠে রোহিঙ্গা মুসলমানদের বিভৎস লাশ। সেনাবাহিনীর শ্বাপদ উল্লাসে ঝাঁপিয়ে পড়ার নির্মম দৃশ্য। " জীব হত্যা মহাপাপ" প্রবক্তা ভিক্ষুদের বেয়নেটের নৃশংস খোঁচায় শিশুর রক্তাক্ত করোটি। হাজার যুবকের রক্তস্নাত আরাকান ভূমি।
এসবের পরেও কি আমি শীতের কমনীয়তা তুলে ধরব? এক স্বাধীন জাতির পরাধীনতার উপখ্যান রেখে কচি পাতার স্নিগ্ধতার কথা লিখব!
হৃদয় হাহাকার করে উঠে। আমি পরিদর্শনে আসা শাহপরী দ্বীপের একটি কড়ই গাছের ছায়ায় বসে পড়ি।
একটু তন্দ্রা এসে গিয়েছিল মনে হয় হঠাৎ কিন্নরকণ্ঠে একটি ডাক শুনতে পেলাম। এদিকে ওদিকে দেখলাম।
কই, কেউ তো নেই! একি, পাখি! রক্তাক্ত ডানা!! আমি বিস্ময়ের দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম।
- হে ছেলে! অবাক হওয়ার কিছুই নেই। কালের বিবর্তন যেমন বালককে বুড়োতে পরিণত করে তেমনি তোমাদের অসহনীয় ঔদাসীন্য ও ভোঁতা চেতনাকে জাগিয়ে তুলতে আল্লাহ আমাকে বাকশক্তি দান করেছেন।
-- আচ্ছা! তুমি কি আহত, ডানায় রক্ত কেন?
- এক পরাধীন আকাশে ওড়ে বেড়ানো পাখির স্বাস্থ্যের কথা জিজ্ঞেস করছ? কষ্টে হৃদয় ফেটে মারা যায়নি এই তো বেশি।
- তোমরা তো স্বাধীন জাতি ছিলে। পরাধীন হলে কিভাবে?
পাখির চোখ ছলছল করে উঠে। বিষাদের দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, " সে এক করুণ ইতিহাস। শুনতে যেহেতু চাচ্ছ? তাহলে শোন…,
আরাকান। আমার প্রিয় মাতৃভূমি। তোমাদের দেশের মতো শ্যামলিমায় ঘেরা। একপাশে ইয়োমো পর্বতমালা সৌন্দর্য বর্ধনের পাশাপাশি দেশ সুরক্ষা করে যাচ্ছিল। অন্যদিকে নাফনদী এঁকেবেঁকে দেশকে ফুলে-ফসলে সমৃদ্ধ করছিল। তাই এর অধিবাসীরা ছিল স্বাবলম্বী আত্মনির্ভর ও সচ্ছল। চারপাশে সবুজের সমারোহ, ঝাঁকে ঝাঁকে পাখির কিচিরমিচির, শিশু-কিশোরদের হৈ-হুল্লোড়, সব মিলিয়ে এক আনন্দময় সরব জনপদ।
ওদিকে আবার আজান হওয়ার সাথে সাথে কৃষক, ব্যবসায়ী, বুড়ো, জোয়ান সবাই মসজিদ পানে ছুটতো। ধনী-গরীব নির্বিশেষে এক কাতারে মহান প্রভুর দরবারে সমর্পিত হত।
মা উড়ে উড়ে এগুলো উপভোগ করত। সন্ধ্যায় এসে আমাকে সব সোনাত। আনন্দে আমি এডাল থেকে ও ডালে লাফালাফি করতাম। পাখা গজায়নি বলে মার সাথে উড়ে গিয়ে দেখতে পেতাম না।
তখন ১৭৮৩ সাল। একদিন মা উৎকণ্ঠিত হয়ে ফিরে এলো। কাঁদো কাঁদো হয়ে বলতে লাগল, " সব শেষ "। বার্মার বৌদ্ধ রাজা ' রোদাওফার ' আরাকানের উপর হামলা করেছে। নির্বিচারে হত্যা করছে। সাজানো জনপদ বধ্যভূমিতে পরিণত করছে। আমি যেতে চাইলাম। মা আমায় বাঁধা দিলেন।
ওখান থেকেই শুরু হলো স্বাধীন আরাকানের পরাধীনতার উপাখ্যান।
৪২ বছর এ অত্যাচারী বৌদ্ধ রাজার কাছে থাকার পর ১৮২৫ সালে সাম্রাজ্যবাদী ইংরেজ আরাকান দখল করে।
আমার তখন বুঝার বয়স হয়েছে। আমি ডানায় ভর করে বিভিন্ন জনপদে যেতাম। ইংরেজদের শোষণে পর্যদুস্ত মুসলিমদের করুন অবস্থা দেখতাম।
কখনো আমি দেড় মাইল দীর্ঘ নাফনদী পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে আসতাম। তোমাদের অবস্থাও শোচনীয় ছিল। হিন্দুদের সহায়তায় তোমাদের উপর অসহনীয় নির্যাতন চলছিল। প্রতিনিয়ত তোমরা তাদের থেকে পরিত্রাণের দোয়া করে যাচ্ছিলে। সংগ্রামী হচ্ছিলে।
তবে আরাকান তখন গোলকধাঁধায়। ইংরেজরা তাদের স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। অপরিণামদর্শী নেতারা তাদের পাতা ফাঁদে পা দিল।
যুগ যুগ ধরে মুসলমানদের সাথে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের ইতিহাস থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে তাদের আশ্বাসে আশ্বস্ত হয়ে গেল। বিশ্বযুদ্ধে তাদেরই পক্ষ নিল।
কিন্তু ইংরেজরা বিশ্বাসঘাতকতা করে স্বাধীন আরাকানকে বার্মার অঙ্গরাজ্য বানিয়ে দিল।
এমন কি বার্মার ১৩৫ টি জাতির তালিকা থেকে রোহিঙ্গাদের নাম মুছে দিল। নেতারা হায় হায় করে উঠল।
ধূর্ত ইংরেজ ১৯৫৮ সালে গণভোটের মাধ্যমে ভাগ্য নির্ধারণের অঙ্গীকার দিল অথচ এটাও ছিল ফাঁকা বুলি। নীলনকশার অংশ।
শুরু হল অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। ১৯৬৩ সালে সামরিক শাসক নে-উইন আসে। " দুনিয়ার মজদুর এক হও" আপাতমধুর শ্লোগান দিয়ে জনগণকে সমাজতন্ত্রের ধূম্রজালে আবদ্ধ করে। সে জানতো আরাকানের মুসলমানগন স্বাধীনচেতা। সমাজতন্ত্রের শিকলে আবদ্ধ হবে না। ফলে তাদের উপর নতুন মাত্রায় বর্বর নির্যাতন শুরু করে।
আরাকানে বৌদ্ধ- মুসলিমের মাঝে ভাতৃত্বমূলক সম্প্রীতি ছিল।
নে-উইন আশঙ্কা করল মগরা মুসলিমদের সংস্পর্শে জেগে যাবে তাই ষড়যন্ত্রমূলকভাবে মগদের মধ্যে উগ্র জাতীয়তাবাদী চেতনা ঢুকিয়ে দিল। এতে কাজও হল
বৌদ্ধ-মুসলিম সম্প্রীতি ভেঙে গেল।
জেনারেল নে-উইন ১৯৫৮ সালের গণভোটের অঙ্গীকার থেকে ফিরে গিয়ে ১৯৭৮ সালে আরাকানের স্বায়ত্তশাসন রহিত করে দেয়।
১৯৯২ সালে এ সামরিক জান্তারা বিশ্ববিবেককে লাথি মেরে মাতৃভূমিতে নাগরিকত্ব বাতিল করার মতো জঘন্য ইতিহাস সৃষ্টি করে।
রোহিঙ্গারা এখন নিজ দেশেই অপয়া। মাতৃভূমিতে উদ্বাস্তু। রুখে দাঁড়াবার শক্তি তো পূর্বেই হারিয়েছে। এ বিষয়টি সার্বজনীন যে, #মুসলিম_জাতির_শক্তির_উৎস_হল_তাদের_আদর্শ। যতদিন তাদের শিক্ষা-সংস্কৃতি বহাল থাকবে ততদিন তাদের সর্বোতভাবে দমানো যাবেনা।
তাই ২০১২ সালের অক্টোবরে রোহিঙ্গাদের শিক্ষাদীক্ষা নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়। বার্মিজরা এভাবে তাহজিব-তামাদ্দুন ও ধর্মীয় মূল্যবোধের ওপর সর্বগ্রাসী হামলা চালায়।
তখন যদি তুমি আরকানি মুসলিমদের দেখতে! প্রতিটি চেহারায় যেন সাঁঝের আঁধার। শিশু-কিশোররা হাসতে ভুলে গেছে। সবাই যেন দুঃখে, শোকে পাথর হয়ে গেছে।
মুসলিমবিশ্বের তখন তার ভাইদের দিকে তাকানোর সময় কোথায়? সবাই নিজের মসনদ নিয়ে ব্যস্ত কিন্তু পাখিরা! বিষাদগ্রস্ত হয়েছে। তাদের জন্য কেঁদেছে। সকাল-সন্ধ্যা তখন আনন্দের কিচিরমিচির শোনা যেত না। গল্পের রানী আমার মা-ও কেমন বোবা হয়ে গিয়েছিল।
তুমি জানো কিনা জানি না। বান্দা যখন ভালো কাজ করে প্রাণীজগতও আনন্দিত হয়। পুণ্যবান ব্যক্তি কষ্টে পড়লে প্রাণীরাও শোকাহত হয়।
চলবে.....…….