জ্ঞানের আলোয় - বিজ্ঞানীদের গল্প

  • Home
  • Canada
  • London, ON
  • জ্ঞানের আলোয় - বিজ্ঞানীদের গল্প

জ্ঞানের আলোয় - বিজ্ঞানীদের গল্প বিজ্ঞানের পেছনের মানুষগুলোর গল্প। তাদের ব্যর্থতা, সাফল্য, এবং অদম্য কৌতূহল যা পৃথিবী পাল্টে দিয়েছে।

কবুতরের সাথে কথা১৯৪৩ সাল। নিউ ইয়র্ক। এক হোটেল রুম।একজন বৃদ্ধ মানুষ মারা গেছেন। ৮৬ বছর বয়স। একাকী। পকেটে নেই এক পয়সাও।...
02/06/2026

কবুতরের সাথে কথা

১৯৪৩ সাল। নিউ ইয়র্ক। এক হোটেল রুম।

একজন বৃদ্ধ মানুষ মারা গেছেন। ৮৬ বছর বয়স। একাকী। পকেটে নেই এক পয়সাও। তার একমাত্র সঙ্গী ছিল কবুতর। হ্যাঁ, কবুতর।

এই লোকটা কে ছিল? তার নাম নিকোলা টেসলা। এবং এই মানুষটাই তৈরি করেছিলেন আধুনিক পৃথিবী।

গল্প শুরু হয়েছিল ১৮৫৬ সালে। মধ্যরাত। প্রচণ্ড ঝড়। বজ্রপাত। ঠিক একটা বিশাল বজ্রপাতের সাথে সাথে জন্ম নিলেন টেসলা। ধাত্রী বললেন, "অশুভ লক্ষণ। এ হবে অন্ধকারের সন্তান।" মা শান্তভাবে জবাব দিলেন, "না। এ হবে আলোর সন্তান।"

কত সত্যি ছিল!

ছোটবেলা থেকেই টেসলা ছিলেন অস্বাভাবিক। ফটোগ্রাফিক মেমরি। সম্পূর্ণ বই মুখস্থ করতে পারতেন। তিন ঘর দূর থেকে ঘড়ির টিক টিক শুনতে পেতেন। এবং সবচেয়ে অদ্ভুত? মনে মনে পুরো মেশিন ডিজাইন করতে পারতেন। চোখের সামনে ভেসে উঠত তিন-মাত্রিক ছবি। প্রতিটি অংশ। প্রতিটি মাপ।

২৬ বছর বয়সে হঠাৎ তার মাথায় এলো AC মোটরের ডিজাইন। মাটিতে লাঠি দিয়ে আঁকলেন। এই মোটর আজ প্রতিটি ফ্যাক্টরিতে চলছে।

১৮৮৪ সাল। ২৮ বছরের টেসলা জাহাজে চড়ে আমেরিকায় এলেন। পকেটে ৪ সেন্ট। হাতে একটা সুপারিশপত্র - থমাস এডিসনের জন্য। এডিসন তাকে চাকরি দিলেন। তারপর একটা চ্যালেঞ্জ দিলেন, "তুমি যদি আমার DC মেশিন ঠিক করতে পারো, বিশাল টাকা দেব।"

টেসলা প্রায় এক বছর কঠোর পরিশ্রম করলেন। প্রতিদিন ১৮ ঘণ্টা। এডিসনের ২৪টা মেশিন উন্নত করলেন। যখন টাকা চাইলেন, এডিসন হেসে বললেন, "টেসলা, তুমি আমেরিকান হিউমার বোঝো না।"

প্রতারণা। বিশ্বাসঘাতকতা। টেসলা সাথে সাথে চাকরি ছেড়ে দিলেন। কখনও ক্ষমা করেননি এডিসনকে।

এরপর শুরু হলো ইতিহাসের সবচেয়ে বিখ্যাত যুদ্ধ - "War of Currents"।

এডিসন চাইছিলেন DC। টেসলা আবিষ্কার করেছিলেন AC। এডিসন একটা নোংরা প্রচারাভিযান শুরু করলেন। "AC বিপজ্জনক! AC মানুষ মারে!" কুকুর, বিড়াল AC দিয়ে হত্যা করলেন জনসমক্ষে।

কিন্তু সত্য জিতল।

১৮৯৩ সাল। শিকাগো ওয়ার্ল্ড ফেয়ার। টেসলার AC দিয়ে ২ লাখ বাতি জ্বলল একসাথে। ২ কোটি ৭০ লাখ মানুষ দেখল। ১৮৯৫ সাল। নায়াগ্রা জলপ্রপাতে টেসলার সিস্টেম চালু হলো। বিদ্যুৎ গেল ২৬ মাইল দূরে।

আজ আপনার ঘরে যে বিদ্যুৎ আসছে - সেটা টেসলার AC। এডিসন হেরে গেলেন।

কিন্তু তারপর টেসলা একটা ভুল করলেন। এক মহান ভুল।

তার বন্ধু জর্জ ওয়েস্টিংহাউস আর্থিক সংকটে পড়লেন। এলেন টেসলার কাছে, "তুমি কি তোমার রয়্যালটি ছেড়ে দিতে পারবে?" টেসলা চুক্তিপত্র ছিঁড়ে ফেললেন। "আপনি আমাকে বিশ্বাস করেছিলেন। আমি আপনার বন্ধু।"

এই একটা সিদ্ধান্তে টেসলা হাতছাড়া করলেন প্রায় ১২ মিলিয়ন ডলার - আজকের ৩০০ মিলিয়ন! যদি তিনি সেই চুক্তি রাখতেন, তিনি হতেন বিল গেটসের মতো ধনী।

কিন্তু তিনি বেছে নিলেন বন্ধুত্ব।

টেসলা আবিষ্কার করে গেলেন - AC মোটর, রেডিও, রিমোট কন্ট্রোল, টেসলা কয়েল, নিয়ন লাইট, ওয়্যারলেস কমিউনিকেশন। ১৯৪৩ সালে সুপ্রিম কোর্ট বলল, মার্কোনি নয়, টেসলাই রেডিওর উদ্ভাবক। প্রায় ৩০০টা পেটেন্ট। একটা মানুষ। একটা জীবন।

কিন্তু বয়স বাড়ার সাথে সাথে টাকা শেষ হলো। তার আবিষ্কার অসম্ভব মনে হতো। মানুষ ভাবতে লাগল - পাগল হয়ে গেছে নাকি? সংবাদপত্র ডাকত "ম্যাড সায়েন্টিস্ট"। ধীরে ধীরে তিনি হোটেলের বিল দিতে পারতেন না।

এবং তার একমাত্র সঙ্গী হয়ে উঠল কবুতর।

প্রতিদিন তিনি পার্কে যেতেন কবুতর খাওয়াতে। অসুস্থ কবুতর নিয়ে আসতেন হোটেল রুমে। চিকিৎসা করতেন। তিনি লিখেছিলেন, "আমি একটা সাদা কবুতরকে ভালোবাসতাম যেমন একজন পুরুষ একজন নারীকে ভালোবাসে। যতদিন সে ছিল, আমার জীবনে একটা উদ্দেশ্য ছিল।"

সেই কবুতর মারা গেল। টেসলা বললেন, "যখন সে মারা গেল, আমার জীবনের কাজও শেষ হয়ে গেল।"

১৯৪৩ সালের ৭ জানুয়ারি। ৮৬ বছরের নিকোলা টেসলা মারা গেলেন। হোটেল রুমে। একাকী। পকেটে নেই এক পয়সা।

যে মানুষ আধুনিক পৃথিবী তৈরি করেছিলেন, তিনি মারা গেলেন দারিদ্র্যে।

কেন? কারণ টেসলা স্বপ্ন দেখতেন এমন এক পৃথিবীর যেখানে বিদ্যুৎ বিনামূল্যে। যেখানে প্রযুক্তি মানবতার সেবা করে।

সেই স্বপ্ন বিক্রি হয় না। কিন্তু সেই স্বপ্ন মরে না।

আজ, ৮০ বছর পরে - আপনার ঘরে AC বিদ্যুৎ, ফোনে ওয়্যারলেস চার্জিং, টেসলা ইলেকট্রিক গাড়ি, Wi-Fi - সব টেসলার।

এডিসন মারা গেলেন ধনী এবং বিখ্যাত। টেসলা মারা গেলেন দরিদ্র এবং একাকী। কিন্তু আজ যখন আমরা "মহান উদ্ভাবক" বলি, টেসলার নামই প্রথমে আসে।

কারণ টেসলা ভবিষ্যৎ দেখতে পেতেন। এবং সেই ভবিষ্যৎ আজ আমাদের বর্তমান।

পরের বার যখন আপনি লাইট জ্বালাবেন, মনে করবেন সেই মানুষটিকে যিনি বজ্রপাতের রাতে জন্মেছিলেন। পরের বার যখন আপনি Wi-Fi ব্যবহার করবেন, মনে করবেন সেই মানুষটিকে যিনি তারবিহীন শক্তির স্বপ্ন দেখেছিলেন। পরের বার যখন আপনি পার্কে কবুতর দেখবেন, মনে করবেন সেই একাকী প্রতিভাকে যার একমাত্র সঙ্গী ছিল কবুতর।

নিকোলা টেসলা - যে মানুষ ভবিষ্যৎ আবিষ্কার করেছিলেন কিন্তু দারিদ্র্যে মারা গেলেন।

তার স্বপ্ন আজও বেঁচে আছে। তার আবিষ্কার আজও আমাদের জীবন চালাচ্ছে।

এবং কোথাও, হয়তো, একটা সাদা কবুতর উড়ছে - টেসলার আত্মার সাথে।

ব্যক্তিগত নোট-

নিকোলা টেসলা আমার কাছে শুধু একজন বিজ্ঞানী নন। তিনি আমার ব্যক্তিগত নায়ক। তিনি এমন এক ভবিষ্যৎ দেখেছিলেন যা ছিল মানুষের জন্য। নিজের জন্য কিছু রেখে যাওয়ার চেষ্টা করেননি। তার গল্প আমাকে মনে করিয়ে দেয়- সত্যিকারের মহত্ত্ব সম্পদে নয়, মহত্ত্ব জন্ম নেয় স্বপ্নে।

 # রাতের আলোপ্যারিসের বাইরে এক জীর্ণ শেড। ছাদ ফুটো, মেঝে কাদামাটি। শীতে হিমশীতল, গরমে অসহনীয়। মেডিক্যাল স্কুল এটাকে মৃত...
01/26/2026

# রাতের আলো

প্যারিসের বাইরে এক জীর্ণ শেড। ছাদ ফুটো, মেঝে কাদামাটি। শীতে হিমশীতল, গরমে অসহনীয়। মেডিক্যাল স্কুল এটাকে মৃতদেহ রাখার জন্যও যথেষ্ট ভালো মনে করত না।

এই শেডেই, ১৮৯৮ থেকে ১৯০২ - চার বছর ধরে - একজন ছোটখাটো মহিলা প্রতিদিন একটা বিশাল লোহার দণ্ড দিয়ে হাঁড়িতে উত্তপ্ত পিচব্লেন্ড নাড়ছেন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা। তার ওজন মাত্র ১০০ পাউন্ড, কিন্তু তিনি নাড়ছেন ২০ কিলোগ্রাম উপাদান।

তার নাম মেরি কুরি। পোল্যান্ড থেকে আসা এক দরিদ্র ছাত্রী, যিনি প্যারিসে এসেছিলেন স্বপ্ন নিয়ে। স্বপ্ন - বিজ্ঞানী হওয়ার।

সেই স্বপ্ন সহজ ছিল না। পোল্যান্ডে নারীদের বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢোকার অনুমতি ছিল না। ছয় বছর গভর্নেস (গৃহশিক্ষিকা) হিসেবে কাজ করে টাকা জমিয়েছেন। তারপর তিন দিন তিন রাত ট্রেনে চড়ে এসেছেন প্যারিসে - চতুর্থ শ্রেণীর কামরায়।

প্যারিসে থাকতেন এক ঠান্ডা অ্যাটিক ঘরে। শীতে জল জমে যেত। খাবার? রুটি, মাখন, আর চা। একবার না খেয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলেন।

কিন্তু হাল ছাড়েননি। পদার্থবিজ্ঞানে প্রথম, গণিতে দ্বিতীয় - দুটো ডিগ্রি নিয়েছেন।

তারপর দেখা হলো পিয়ের কুরির সাথে। এক বিজ্ঞানী যিনি তাকে সমান মর্যাদা দিতেন, তার প্রতিভাকে স্বীকৃতি দিতেন। তারা বিয়ে করলেন। হানিমুন? সাইকেল চালিয়ে ফ্রান্সের গ্রামাঞ্চলে ঘুরে বেড়ানো।

মেরি খুঁজছিলেন এমন কিছু যা আগে কেউ দেখেনি। তিনি জানতেন ইউরেনিয়াম আকরিক পিচব্লেন্ড বিশুদ্ধ ইউরেনিয়ামের চেয়ে বেশি তেজস্ক্রিয়। কেন? অবশ্যই কোনো নতুন মৌল আছে!

চার বছর। দশ টন পিচব্লেন্ড। অগণিত রাত।

এবং অবশেষে - দুটি নতুন মৌল। প্রথমটির নাম দিলেন "পোলোনিয়াম" - তার প্রিয় মাতৃভূমি পোল্যান্ডের নামে। দ্বিতীয়টির নাম "রেডিয়াম" - যার অর্থ রশ্মি।

মেরি কুরি হলেন একমাত্র মহিলা যিনি দুটি মৌলের নামকরণ করেছেন। এবং পরে, তার সম্মানে আরেকটি মৌলের নাম দেওয়া হয় "কুরিয়াম"। পর্যায় সারণীতে চিরকালের জন্য খোদাই হয়ে গেল তার নাম।

প্রতিটি মৌল থেকে এক-দশমাংশ গ্রাম বিশুদ্ধ রেডিয়াম।

কিন্তু সবচেয়ে জাদুকরী অংশ?

রাতে, যখন তারা শেডে ঢুকতেন, দেখতেন টেবিলের উপর সাজানো ছোট ছোট কাঁচের পাত্র, প্রতিটি থেকে নির্গত হচ্ছে নীলাভ-সবুজ স্বপ্নময় আলো।

মেরি পরে লিখেছিলেন: "এই পাত্রগুলি জ্বলছিল তাদের নিজস্ব আলোয়। দুর্বল, পরীর মতো আভায়। আমরা দেখতাম এই চকচকে টিউবগুলি, যা ম্লান অস্বাভাবিক আলোর উৎসের মতো লাগত।"

অন্ধকারে দাঁড়িয়ে, হাতে হাত রেখে, মেরি এবং পিয়ের দেখতেন সেই উজ্জ্বল আলো। এটি ছিল তাদের সবচেয়ে সুখের মুহূর্ত। দারিদ্র্য, কষ্ট, ক্লান্তি - সব ভুলে যেতেন।

১৯০৩ সালে তারা নোবেল পুরস্কার পেলেন। মেরি হলেন প্রথম নারী নোবেল বিজয়ী।

কিন্তু জীবন নিষ্ঠুর হতে পারে। ১৯০৬ সালে, একটি ঘোড়ার গাড়ির দুর্ঘটনায় পিয়ের মারা গেলেন। মাত্র ৪৬ বছর বয়সে।

মেরি ভেঙে পড়লেন। দুটি ছোট বাচ্চা - ৮ বছরের ইরেন আর ১৮ মাসের ইভ। এবং সামনে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ।

কিন্তু হার মানেননি।

তিনি হলেন সোরবনের প্রথম নারী অধ্যাপক। চালিয়ে গেলেন গবেষণা। একাকী।

১৯১১ সালে দ্বিতীয়বার নোবেল পুরস্কার পেলেন - এবার রসায়নে। মেরি কুরি হলেন একমাত্র মানুষ যিনি দুটি ভিন্ন বিজ্ঞানে নোবেল পেয়েছেন।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তিনি মোবাইল এক্স-রে ইউনিট তৈরি করলেন। নিজে গাড়ি চালিয়ে ফ্রন্টলাইনে যেতেন। হাজার হাজার সৈন্যের জীবন বাঁচালেন।

কিন্তু সেই যে আলো তিনি ভালোবাসতেন, সেই আলোই একদিন তার জীবন নিয়ে নিল।

১৯৩৪ সালে, ৬৬ বছর বয়সে, মেরি কুরি মারা গেলেন। তেজস্ক্রিয় বিষক্রিয়া। দীর্ঘ বছর খালি হাতে রেডিয়াম নিয়ে কাজ করার ফল।

তার কফিনকে সীসার আবরণে ঢাকতে হয়েছিল - কারণ তার দেহ এখনও তেজস্ক্রিয়। তার নোটবুক আজও সীসার বাক্সে রাখা। স্পর্শ করতে হলে বিশেষ সুরক্ষা লাগে।

কিন্তু মেরি কুরির গল্প এখানে শেষ নয়।

তার মেয়ে ইরেন এবং জামাই ফ্রেডেরিক? তারাও ১৯৩৫ সালে নোবেল পুরস্কার পেলেন। এক পরিবারে পাঁচটি নোবেল - একটি রেকর্ড যা আজও অটুট।

আজ, প্রায় ৯০ বছর পরে, রাতের সেই আলো এখনও জ্বলছে।

জ্বলছে বিশ্বের প্রতিটি হাসপাতালে যেখানে ক্যান্সার রোগীরা রেডিয়েশন থেরাপি পাচ্ছেন।

জ্বলছে লক্ষ লক্ষ নারী বিজ্ঞানীর হৃদয়ে যারা জানেন - হ্যাঁ, আমিও পারব।

জ্বলছে প্রতিটি সেই মেয়ের চোখে যে স্বপ্ন দেখে বিজ্ঞানী হওয়ার।

মেরি কুরি আমাদের শিখিয়েছেন - দারিদ্র্য বাধা নয়। বৈষম্য বাধা নয়। অন্য কারও অবিশ্বাসও বাধা নয়।

যদি তোমার কৌতূহল থাকে, সংকল্প থাকে, এবং স্বপ্ন থাকে - তুমি পৃথিবী বদলে দিতে পারো।

এমনকি যদি তোমাকে কাজ করতে হয় এক জীর্ণ শেডে, হিমশীতল রাতে, একটা ভারী লোহার দণ্ড নিয়ে।

কারণ সেখানেই লুকিয়ে আছে সেই আলো। যে আলো অন্ধকারেও জ্বলে। যে আলো কখনও নেভে না।

অন্ধকার ঘরের গল্প১০১১ সাল। কায়রো শহরে এক ছোট্ট ঘরে বন্দী জীবন কাটাচ্ছেন একজন মানুষ। তার অপরাধ? তিনি একটা বড় দাবি করেছি...
01/19/2026

অন্ধকার ঘরের গল্প

১০১১ সাল। কায়রো শহরে এক ছোট্ট ঘরে বন্দী জীবন কাটাচ্ছেন একজন মানুষ। তার অপরাধ? তিনি একটা বড় দাবি করেছিলেন যা পূরণ করতে পারেননি। নীলনদকে বাঁধ দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করবেন বলেছিলেন তিনি। কিন্তু মাঠে নেমে বুঝলেন - একাদশ শতাব্দীর প্রযুক্তিতে এটা অসম্ভব।
সমস্যা হলো, মিশরের খলিফা আল-হাকিম ছিলেন ভয়ংকর এক মানুষ। তিনি ছোট ভুলের জন্যও মন্ত্রীদের হত্যা করতেন। এই পাগল শাসকের কাছে ব্যর্থতা স্বীকার করা মানে নিশ্চিত মৃত্যু।
তাই হাসান ইবনে আল-হাইথাম একটা সাহসী সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি পাগল হওয়ার ভান করলেন।
কৌশল কাজ করল। খলিফা তাকে হত্যা করলেন না, কিন্তু সব সম্পত্তি কেড়ে নিয়ে বাড়িতে বন্দী করে রাখলেন। দশটা বছর।
কী করবেন এই দশ বছরে? হাল ছেড়ে দেবেন? বসে বসে সময় কাটাবেন?
না।
তিনি তার ঘরকে পরীক্ষাগারে পরিণত করলেন। একটা অন্ধকার ঘর বানালেন - কোনো জানালা নেই, শুধু দেয়ালে একটা ছোট্ট ছিদ্র। সেই ছিদ্র দিয়ে বাইরের আলো ঢুকে বিপরীত দেয়ালে উল্টো ছবি তৈরি করছিল।
এই সরল পর্যবেক্ষণ থেকে শুরু হলো একটা বিপ্লব।
তিনি বুঝলেন - আলো সরলরেখায় চলে। হাজার বছর ধরে মানুষ ভুল বুঝে এসেছে। গ্রীক দার্শনিকরা বলতেন চোখ থেকে আলো বের হয়ে বস্তুতে পড়ে, তাই আমরা দেখি। কিন্তু ইবনে আল-হাইথাম প্রমাণ করলেন - বস্তু থেকে আলো প্রতিফলিত হয়ে চোখে আসে।
সূর্যের দিকে তাকালে চোখে ব্যথা করে কেন? কারণ অনেক আলো চোখে আসছে। অন্ধকারে কিছু দেখা যায় না কেন? কারণ বস্তু থেকে কোনো আলো প্রতিফলিত হচ্ছে না।
দশ বছর বন্দী অবস্থায় তিনি লিখলেন সাত খণ্ডের বিশাল গ্রন্থ - "কিতাব আল-মানাজির" বা "Book of Optics"। এই বইয়ে তিনি শুধু আলোর রহস্য উন্মোচন করলেন না, একটা নতুন পদ্ধতি দেখালেন - কীভাবে বিজ্ঞান করতে হয়।
প্রশ্ন করো। অনুমান করো। পরীক্ষা করো। ফলাফল লেখো। প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নাও।
এটাই হলো "বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি"। এবং তিনি এটা করেছিলেন ইউরোপীয় রেনেসাঁর প্রায় পাঁচ শতাব্দী আগে।
১০২১ সালে খলিফা মারা গেলেন। ইবনে আল-হাইথাম মুক্ত হলেন। কিন্তু তিনি ধনী হতে চাইলেন না, ক্ষমতা চাইলেন না। আল-আজহার মসজিদের কাছে একটা ছোট ঘরে থেকে শিক্ষকতা করতেন, বই লিখতেন, পাণ্ডুলিপি কপি করে জীবিকা নির্বাহ করতেন।
১০৪০ সালে তিনি মারা গেলেন। কিন্তু তার কাজ বেঁচে রইল।
তার বই ল্যাটিনে অনুবাদ হলো। পুরো ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ল। তার প্রভাব ইউরোপীয় বিজ্ঞানীদের ওপর পড়ে।
তার অন্ধকার ঘর থেকেই জন্ম নিল ক্যামেরা। তার আলোকবিদ্যা ছাড়া আজকের টেলিস্কোপ, মাইক্রোস্কোপ, চশমা, স্মার্টফোনের ক্যামেরা - কিছুই সম্ভব ছিল না।
২০১৫ সালে UNESCO যখন "আন্তর্জাতিক আলোর বর্ষ" ঘোষণা করল, তখন তারা ইবনে আল-হাইথামকে "আলোকবিদ্যার জনক" হিসেবে সম্মানিত করল। চাঁদে একটা গর্ত তার নামে। মহাকাশে একটা গ্রহাণু তার স্মৃতি বহন করছে।
কিন্তু সবচেয়ে বড় শিক্ষা কী?
একজন মানুষ, দশ বছর বন্দী, কোনো যন্ত্রপাতি নেই, কোনো বিশাল পরীক্ষাগার নেই। শুধু একটা অন্ধকার ঘর, একটা ছোট্ট ছিদ্র, এবং অদম্য কৌতূহল।
এবং সেটাই যথেষ্ট ছিল পুরো পৃথিবী বদলে দিতে।
পরিস্থিতি কখনো আমাদের সংজ্ঞায়িত করে না। আমরা কীভাবে প্রতিক্রিয়া দিই, সেটাই গুরুত্বপূর্ণ।
ইবনে আল-হাইথাম কারাবাসকে পরাজয় মানেননি। তিনি সেটাকে সুযোগে পরিণত করেছিলেন। অন্ধকার ঘরে বসে তিনি আলোর রহস্য খুঁজে পেয়েছিলেন।
আর আমাদের? আমাদের কী অজুহাত?

#বিজ্ঞান #ইতিহাস #ইবনেআলহাইথাম #অনুপ্রেরণা #বাংলা

Address

Neptune Crescent
London, ON
N6M

Website

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when জ্ঞানের আলোয় - বিজ্ঞানীদের গল্প posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Shortcuts

Share