23/09/2021
"দেহবাদী "আহলে হাদিস/ সালাফি আকিদা" যেখানে এসে তাসের ঘরের মত ভেঙ্গে পড়ে"
( প্রসঙ্গঃ মরহুম প্রফেসর ড. আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর সাহেবের সালাফি আকিদা ও তাঁর বই পড়া)
-------------------------------------------------------------
আল্লাহ তায়া'লা বলেন,
"কুল্লু মান আ'লাইহা ফা-ন। ওয়া ইয়াবকা ওয়াজহু রাব্বিকা যুলজালালি ওয়াল ইকরাম"
শাব্দিক অর্থ করছি সালাফি ভাইদের মতো করেঃ
"এখানকার সবকিছুই ধ্বংসশীল। একমাত্র আপনার মহিমাময় ও মহানুভব পালনকর্তার ওয়াজহুন বা মুখমন্ডল ছাড়া।" (সূরা আর রাহমান, ৫৫ঃ২৬-২৭)
"কুল্লু শাইইন হালিকুন ইল্লা ওয়াজহাহু"
"আল্লাহর ওয়াজহুন বা মুখমন্ডল ব্যাতীত সবকিছু ধ্বংস হবে।" (সূরাতুল কাসাস, ২৮ঃ৮৮)
অথচ আমরা জানি কুরআন -সুন্নাহতে আল্লাহর হাত, পা, পায়ের গুছা ইত্যাদি সম্পর্কেও অনেক কিছু বলা আছে। এখন আল্লাহ পাকের এসব গুণকে আমরা যদি সালাফিদের মত শাব্দিকভাবে যেভাবে আছে সেভাবেই নিই, তবে এর মানে কী এই দাঁড়ায় যে, কেয়ামতের দিনে আল্লাহর মুখমণ্ডল ছাড়া বাকি অঙ্গসমূহ ধ্বংস হয়ে যাবে? মায়া'জাল্লাহ, আস্তাগফিরুল্লাহাল আজিম। আল্লাহ পাক কি তবে আংশিক ধ্বংসশীল?
ইমাম বুখারি রাহ. বুখারি শরিফের কিতাবুত তাফসিরে সাহাবা ও তাবিইন তথা সালফে সালিহিনদের অনুসরণে, এই ওয়াজহুন বা মুখমন্ডল এর তাফসির করেছেন আল্লাহর জাত বা অস্তিত্ব দ্বারা, এবং এটাই সঠিক। অর্থ্যাৎ আল্লাহ তায়ালার জাত বা অস্তিত্ব ছাড়া সব ধ্বংস হয়ে যাবে। এটা কমন সেন্সের বিষয় যে, এই গুণগুলো রুপক। কিন্তু সেজন্য সালাফিরা ইমাম বুখারির রাহ. প্রচন্ড সমালোচনা করে তার উপর গোমরাহীর (জাহমি) ফতোয়া দিয়েছে। নাউজুবিল্লাহ মিন জালিক। কারণ কমন সেন্স খুবই আনকমন।
আল্লাহ পাক আরশের উর্ধ্বে, এটা রুপক বিষয়। অপর আয়াতে এসেছে, তিনি আকাশের উর্ধ্বে। এসবই রুপক।
আপনি আল্লাহ পাককে আরশের উর্ধ্বে মানেন আমার আপত্তি নাই। কিন্তু আল্লাহর বাড়ি আরশে, তিনি আরশে বসে আছেন? তাহলে এর আগে "সুম্মাস তাওয়া ইলাস সামা-ই" (আল কুরআন, ২ঃ২৯) বলা হয়েছে। এর মানে কী এর আগে আকাশে ছিলেন আল্লাহ পাক? এভাবে স্থানান্তর হচ্ছেন আল্লাহ পাক আমরা সৃষ্টির মত করে? তাহলে আল্লাহ পাক আরশ ও আকাশ সৃষ্টির আগে, বিগ ব্যাং এর আগে আল্লাহ পাক কই ছিলেন? যখন টাইম, স্পেস কিছুই ছিল না, তখন? আল্লাহ পাক কোন স্থান -কাল- পাত্রের মূখাপেক্ষী না, তিনি সামাদ, সূরা ইখলাসের কথা, তিনি অমূখাপেক্ষী। তিনি আগেও যেভাবে ছিলেন, এখনো সেভাবেই আছেন এবং থাকবেন। আল্লাহ পাককে তাঁর সৃষ্টি আরশ, আকাশ ও পৃথিবী কোনকিছুই ধারণ করতে পারে না। তিনি সৃষ্টির মাঝে প্রবিষ্ট হতে পারেন না। তিনি সকল সৃষ্টিকে পরিবেষ্টন করে আছেন। ওয়া কা-নাল্লাহু বি কুল্লি শাইইম মুহিতা৷ (সূরা নিসা, আয়াত নং- ১২৬, সূরা ফুসসিলাত, আয়াত নং -৫৪)
হ্যাঁ, তাদের ওস্তাদ ও ইমাম শায়খ ইবনে তাইমিয়া সাহস করে তাদের প্রকৃত দেহবাদী আকিদা সুস্পষ্ট করে গেছেনঃ
"আমি এখন মিম্বরের উপরের সিড়ি থেকে নিচে যেভাবে নেমে আসলাম, আল্লাহ পাকও প্রতি রাত্রের শেষে আরশ থেকে দুনিয়ার আকাশে এভাবেই নেমে আসেন"। - শায়খ ইবনে তাইমিয়া রাহ.
নাউজুবিল্লাহ মিন জালিক। লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহিল আলিয়্যিল আজিম।
এটা দেহবাদ না হলে দেহবাদ কী?
সূত্রঃ রিহলাতু ইবনে বতুতা/প্রথম খন্ড- ৫৭ ও ৫৮ পৃষ্ঠা- প্রকাশক: মাত্ববাআতুল আযহার, মিসর, ১৩৪৬ হিজরী। বিখ্যাত পর্যটক ইবনে বাতুতা দামেশকের মসজিদে তাঁর স্বচক্ষে দেখা ঘটনা তিনি বর্ণনা করেন। (বিস্তারিত কমেন্ট বক্সে বইয়ের স্ক্রিনশটসহ দিচ্ছি)
এই যুগে আল্লাহর দেহ সাব্যস্তকারীরা পাবলিকের মাইর খাবে বলে এসব বলার সাহস করে না। অন্তরে সেই গোমরাহ বিশ্বাসই লালন করে।
অথচ আল্লাহ তায়ালা বলেন, লাইসা কামিছলিহি শাইউন। তাঁর মতো কোনকিছুই নেই। - আল কুরআন
তাঁর সিংহাসন সমস্ত আসমান ও যমীনকে পরিবেষ্টিত করে আছে। (আয়াতুল কুরসি, সূরা বাকারা, আয়াত নং-২৫৫)
তিনি তোমাদের সাথে আছেন তোমরা যেখানেই থাক। (সূরাতুল হাদিদ, আয়াত নং ৪)
আমি তার গ্রীবাস্থিত ধমনী থেকেও অধিক নিকটবর্তী। (সূরা কাফ, আয়াত নং -১৬)
তারা বলেন, এ সংক্রান্ত তাদের পক্ষের সব আয়াত বিনা তাভিল বা ব্যাখ্যা ছাড়াই মানতে হবে, যেভাবে আছে সেভাবেই। আবার আমাদের পক্ষের আয়াতগুলো ও হাদিসগুলো ঠিকই তারা তাভিল করে, ব্যাখ্যা করে। আজব প্রাণী এরা।
আমি এগুলো নিয়ে ওপেন মঞ্চে আলোচনা করতে রাজিই না। তবে করলে ব্যালেন্স ১০০% থাকতে হবে, কারণ এগুলো ইমান আকিদার বিষয়। অন্যথায় সাধারণ মানুষের আকিদার জটিল এসব বিষয় জানার কোন প্রয়োজনই নেই। অথচ আহলে হাদিস /সালাফিরা এসব প্রচারের জন্য ওঠেপড়ে লেগেছে। যত্রতত্র এসব নিয়ে আলোচনা। মানুষের জীবনের কঠিন কঠিন বিষয় নিয়ে কথা নেই।
অথচ মরহুম প্রফেসর ড. আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর সাহেবের খুব বড় ভক্ত আমাদের দেশের সবচাইতে বড় আজহারী তথাকথিত সেলিব্রেটিকে বক্তব্য দিতে দেখলাম, তিনি বলছেন, (আল্লাহ সম্পর্কে কথা বলতে গিয়ে কি বলল আজহারি এটা, সম্পূর্ণভাবে আজহারের আকিদার বিপরীত) "আল্লাহ বলেন, আর রাহমান, আমরা বলি ভাল হইছে আপনি আর রাহমান, আপনি থাকেন কই? আল্লাহ বলেন, আর রাহমানু আলাল আরশিসতাওয়া। আমার বাড়ি আরশে।" নাউজুবিল্লাহ মিন জালিক। মায়াজাল্লাহ আস্তাগফিরুল্লাহাল আজিম।
এর মানে কি? এটা আল্লাহর শানে কথা বলার আদব? এটা এপ্রোচ? ভাই বন্ধু নিয়ে কথা বলছে নাকি সে? "ভালো হইছে আপনি রাহমান, আপনার বাড়ি কই!" ছিঃ! এভাবে আল্লাহ সম্পর্কে মন্তব্য!
"আল্লাহর বাড়ি আরশে" গত ১৪০০ বছরে কোন সালফে সালিহিন কী এমন কথা বলেছেন?
আধুনিক ও স্টাইলিশ হতে হতে পচাইয়া ফেলছে সমাজ। আজব। ইসলাম পুরোটাই আদবের নাম, অথচ আদব নামক কোন জিনিস নাই। আর ভন্ড পীরের মুরিদদের মত আপনারাও শায়খ পূজায় মজে আছেন। শায়খ যা বলে তাই ঠিক। আজব!
পরিশেষে সবার প্রতি অনুরোধ, দয়া করে সালাফি আহলে হাদিসদের এসব বিভ্রান্তিকর আকিদাতে বিশ্বাসী প্রফেসর ড. মরহুম আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর সাহেবের কিতাবসমূহ সাধারণ মানুষজন পড়বেন না প্লিজ। বিভ্রান্ত হবেন। উলামায়ে কেরামকে পড়তে দিন এসব। আর যদি সাধারণ মানুষ পড়েনও, তবে দয়া করে কোন আকিদা গ্রহণ করবেন না তাঁর কিতাব থেকে। আল্লাহ পাক তাঁকে ও আমাদের সকলকে ক্ষমা করে দিন। আমিন।
আর সকলের প্রতি আরেকটা অনুরোধ, আল্লাহর ওয়াস্তে মৃত কিংবা জীবিত কাউকে গালাগালি, বকাবকি, লানত করা ইত্যাদি কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য বন্ধ করি। বিভ্রান্তির জবাব একাডেমিক ভাষায় দিতে হবে। যাদের কাছে দলিল থাকে না তারাই আক্রমণাত্মক ভাষায় কথা বলে, গালাগালি করে। আমাদের সাথে ১৪০০ বছরের সালফে সালিহিন আছেন, কুরআন সুন্নাহের দলিল আছে, তদোপরি আমরা গালাগালি, লানত, বকাবকি, অশ্লীল শব্দচয়ন, কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য কেন করব? এগুলো মুসলমানদের ভাষা হতে পারে না।
কৃতঃ সৈয়দ গোলাম কিবরিয়া আজহারী