10/07/2024
প্রশ্নফাসেঁর সাথে জড়িত এরা হলো একটা গ্যাং, একটা সংঘবদ্ধ চক্র। এরা আসলে মাফিয়া...
Sarabangla
বিসিএসে ৫০ লাখ, অন্যান্য চাকরি পেতে চুক্তি হতো ২০ লাখ টাকায়।
উজ্জল জিসান, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট
ঢাকা: বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (বিসিএস) ও অন্যান্য নন ক্যাডার পদে নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগে গ্রেফতার হওয়া সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) কর্মকর্তা কর্মচারীসহ ১৭ জনের নামে মঙ্গলবার (৯ জুলাই) মামলা হয়েছে। তাদের প্রত্যেককে আদালতে তোলা হলে ৬ জন স্বীকারোক্তিমুলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
এর আগে, সিআইডি কার্যালয় থেকে তাদের আদালতে নিয়ে যাওয়া হয়। এ সময় তদন্তকাজে নিয়োজিত সিআইডি কর্মকর্তাদের অনেকেই গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেন।
একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘এই চক্রের সঙ্গে প্রার্থীদের একটি চুক্তি হতো। চুক্তি অনুযায়ী বিসিএস এর তিন ধাপে মোট ৫০ থেকে ৬০ লাখ টাকার চুক্তি হতো। এছাড়া অন্যান্য পরীক্ষায় ১৮ থেকে ২০ লাখ টাকায় চুক্তি হতো। এই সব টাকা ধাপে ধাপে নেওয়া হতো।’
বিভিন্ন কোচিং সেন্টারের মাধ্যমে এ সব প্রার্থী সিলেক্ট করা হতো। যারা টাকা দেওয়ার সামর্থ্য রাখতেন কেবল তাদেরকেই আলাদা করে কোচিং করানো হতো। ধীরে ধীরে তাদের সঙ্গে চুক্তি করা হতো।
বেশির ভাগ প্রার্থী ম্যানেজ করার কাজটি করতো গ্রেফতার হওয়া পিএসসির উপ-পরিচালক আবু জাফর যিনি মালিবাগে জ্যোতি ইনস্টিটিউট নামে একটি সেন্টার চালাতেন। এই কোচিং সেন্টারটি তার স্ত্রীর নামে। এস এম আলমগীর কবির চালাতেন মিরপুরে একটি কোচিং সেন্টার। এ দুটো কোচিং সেন্টারে সরকারি চাকরির পড়া ছাড়া আর কোনো কিছু করানো হতো না।
সিআইডি কর্মকর্তারা বলেছেন, এই দুই কোচিং সেন্টার থেকেই মূলত বেছে বেছে প্রার্থী সিলেক্ট করা হতো। যেহেতু টাকা একেবারে লাগে না তাই প্রার্থীরাও ধীরে ধীরে টাকা দিতে পারে এবং পরীক্ষার একটি ধাপে টিকে গেলে আত্মবিশ্বাস বেড়ে যায়। পরবর্তীতে সম্পদ নষ্ট করে হলেও চাকরির জন্য টাকা দিয়ে দেয় প্রার্থীরা।
এ চক্রের অন্যতম হোতা বিপিএসসির অফিস সহায়ক সাজেদুল ইসলাম। সিআইডির প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সাজেদুল জানায়, বিভিন্ন পরীক্ষার প্রশ্ন সে পিএসসি’র উপ-পরিচালক আবু জাফরের কাছ থেকে সংগ্রহ করতেন। তার সহযোগী সাখাওয়াত ও সাইম দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে চাকরি প্রার্থী সংগ্রহ করতেন। পরে তাদের (চাকরিপ্রার্থী) ঢাকা ও আশেপাশের এলাকায় ভাড়া বাসা বা হোটেলে জড়ো করে পরীক্ষার আগে হুবহু প্রশ্নপত্র দিতেন।
প্রশ্নফাঁস করার পর বিলি করতেন যিনি।
গ্রেফতার হওয়া পিএসসির সাবেক গাড়ি চালক সৈয়দ আবেদ আলীকে জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে সিআইডি কর্মকর্তারা জানায়, আবু সোলেমান মো. সোহেল বাংলাদেশ রেলওয়ের নিয়োগ পরীক্ষার জন্য প্রার্থী সরবরাহ করতো এবং নিজেই বাসার একটি কক্ষে বুথ পরিচালনা করতো। এ ছাড়া নিয়োগ পরীক্ষা শুরুর আগে প্রশ্নপত্র প্রকাশ এবং বিতরণ কাজে সহযোগিতা করা বিপিএসসির সাবেক সহকারী পরিচালক নিখিল চন্দ্র রায়। যিনি পলাতক রয়েছেন। তাকে ধরতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
উপ পরিচালক আবু জাফর ও সহকারী পরিচালক আলমগীর কবিরের কোচিং ব্যবসার বিষয়টি পিএসসির সব কর্মকর্তা ও কর্মচারীই জানেন। পিএসসিতে থাকার পরও এমন কোচিং সেন্টারে তারা কীভাবে থাকলেন? এ নিয়ে সরাসরি তাদের কোনো জবাবদিহির আওতায় আনা হয়নি। এ বিষয়টিও তদন্তের আওতায় আনবেন বলে জানিয়েছে সিআইডি।
এ ছাড়া অভিযুক্ত জাহাঙ্গীরও এই চক্রের একজন সক্রিয় সদস্য। তাকে শনাক্ত করে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় থেকে আটক করা হয়। এই চক্রের আরও সক্রিয় সদস্য শাহাদাত হোসেন, মামুন ও নিয়ামুলকে জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, প্রশ্নফাঁস চক্রের অন্যতম সক্রিয় সদস্য খলিল। তিনি (খলিল) বাংলাদেশ রেলওয়ের নিয়োগ পরীক্ষা সহ বিভিন্ন পরীক্ষার প্রশ্নপত্র দীর্ঘদিন যাবত ফাঁস করে আসছেন। খলিলকে জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, তাকে এসব পরীক্ষার জন্য প্রার্থী সরবরাহ করতো পিএসসি’র সহকারী পরিচালক আলমগীর। তিনি (আলমগীর) বিভিন্ন পরীক্ষার প্রশ্নপত্র দীর্ঘদিন ধরে ফাঁস করে আসছেন।
সাজেদুল জিজ্ঞাসাবাদে জানায়, সে তার সহযোগীদের মাধ্যমে চাকরি প্রত্যাশীদের সংগ্রহ করার পাশাপাশি নির্দিষ্ট অর্থের বিনিময়ে চক্রের অন্যতম সদস্য বিপিএসসির সাবেক চালক সৈয়দ আবেদ আলীর কাছে নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্ন ও উত্তর সরবরাহ করতেন।
এই চক্রটি শুধু চাকরির প্রশ্নপত্র ফাঁস করত না। তারা বিভিন্ন মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশ্নও ফাঁস চক্রের সদস্য ছিলেন। তাদের বিরুদ্ধে মেডিকেলের প্রশ্নফাঁসের মামলারও আসামি করা হবে।
প্রতিরক্ষা ও অর্থ বিভাগের অডিটর প্রিয়নাথ রায়ের জবানবন্দি থেকে জানা যায়, ডিজিএফআইয়ে কর্মরত থাকা অবস্থায় তার এক সহকর্মীর মাধ্যমে সাবেক সেনা সদস্য নোমান সিদ্দিকের সঙ্গে পরিচয় হয় তার। পরে নোমান বিভিন্ন চাকরি ও মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের ভর্তি করার বিষয়ে তদবির করেন বলে জানায়। নোমানের কথা মতো ২০১৫ সালে তার এক আত্মীয়কে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে ভর্তি করেন। পরীক্ষার আগের দিন রাতে নোমান তার মিরপুর-১০ সেনপাড়া পর্বতা এলাকার বাসায় বুথ খুলে পড়াতেন। তার মাধ্যমে পরে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরে আরও দুইজনকে চাকরি পাইয়ে দেন। এ ছাড়া বিভিন্ন সময় বিভিন্ন চাকরিতে লোক দিয়েছেন তিনি।
গত ৬ জুলাই সাইবার মনিটরিং করার জানতে পারি বিপিএসসি কর্তৃক আয়োজিত বাংলাদেশ রেলওয়ে (নন ক্যাডার) সাব এসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার পদে নিয়োগ পরীক্ষা শুরু হওয়ার আগে পরীক্ষার হুবহু প্রশ্নপত্র ফাঁস করে বেশকিছু পরীক্ষার্থীদের কাছে টাকার বিনিময়ে প্রশ্নের উত্তর বিতরণ করেছে।
গোপেন তথ্যের ভিত্তিতে ঢাকার শ্যামলী থেকে অভিযুক্ত লিটন সরকারকে ৭ জুলাই আটক করে জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, অভিযুক্ত লিটন গ্রেফতার প্রিয়নাথ ও জাহিদের কাছ থেকে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র নিয়েছে। এর জন্য তাদের চুক্তির অর্থ পরিশোধও করেছে। তার তথ্যের ভিত্তিতে মহাখালী থেকে প্রিয়নাথকে আটক করা হয়। তিনি জানান, সে অভিযুক্ত জাহিদের কাছ থেকে প্রশ্নপত্র নিয়েছে। পরে শ্যামলী থেকে জাহিদকে আটক করা হয়। জাহিদ জানায় রংপুরের সুমনের মাধ্যমে প্রশ্নপত্র জোগাড় করত।
তাদের জিজ্ঞাসাবাদে সাবেক সেনা সদস্য নোমান সিদ্দীকী প্রশ্নফাঁস চক্রের সক্রিয় সদস্য। তাকে মিরপুর থেকে গ্রেফতার করার পর তার সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করে।
সিআইডি জানিয়েছে, এই চক্রের আরও ১৪ জনকে খোঁজা হচ্ছে। তাদেরকেও পল্টন থানার এই মামলায় আসামি করা হয়েছে। বাকি আসামিদের গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
আদালতে আসামিরা সিআইডি হেফাজতে নির্যাতনের অভিযোগ এনেছেন এ বিষয়ে জানতে চাইলে সিআইডি জানিয়েছে, এরকম কোনো ঘটনা ঘটেনি।
collected