13/07/2026
'শেষ বেঞ্চের শিশুটিও
মেধাহীন নয়,
প্রয়োজন শুধু একটু
বাড়তি ভালোবাসার'
------------------------------
শ্রেণিকক্ষের শেষ বেঞ্চে চুপচাপ বসে থাকা শিশুটি কিংবা পরীক্ষায় বারবার খারাপ নম্বর পাওয়া শিক্ষার্থীটি কিন্তু মেধাহীন নয়। হয়তো সে আমাদের প্রচলিত শিক্ষাপদ্ধতির সাথে খাপ খাওয়াতে পারছে না, কিংবা তার কোনো মানসিক বা পারিবারিক সহযোগিতা প্রয়োজন, যা আমরা খেয়াল করছি না।
পিছিয়ে পড়া এই শিক্ষার্থীদের অবহেলা না করে মূল ধারায় ফিরিয়ে আনতে আমাদের কিছু বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি:
🟨১. ঘাটতি ও সমস্যা চিহ্নিত করা:
একটি শিশু কেন পিছিয়ে পড়ছে, আগে তা সঠিকভাবে বুঝতে হবে।
🙂 সে কি কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে ভয় পায়?
🙂 তার কি ক্লাসের পড়া বুঝতে সমস্যা হচ্ছে?
🙂 পারিবারিক কোনো অশান্তি বা আর্থিক সংকট কি তার মনোযোগে ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে?
🙂 তার কি দৃষ্টিশক্তি, শ্রবণশক্তি বা অন্য কোনো শারীরিক/মানসিক বিশেষ চাহিদা রয়েছে?
শিক্ষক এবং অভিভাবক মিলে আলোচনার মাধ্যমে এই মূল কারণটি খুঁজে বের করা প্রথম ধাপ।
🟨 ২. আনন্দময় ও বাস্তবমুখী শিক্ষাপদ্ধতি:
প্রচলিত মুখস্থ নির্ভর পড়াশোনা অনেক সময় পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের কাছে বোঝা মনে হয়।
🙂 পড়ালেখাকে বাস্তব উদাহরণ, খেলাধুলা, ছবি, বা গল্পের ছলে উপস্থাপন করতে হবে।
🙂 তাত্ত্বিক আলোচনার চেয়ে হাতে-কলমে কাজ করার সুযোগ দিলে তারা সহজে পড়া লুফে নিতে পারে।
🟨৩. ব্যক্তিগত মনোযোগ ও রিমেডিয়াল ক্লাস:
পুরো ক্লাসের সাথে যারা তাল মেলাতে পারছে না, তাদের জন্য আলাদা পরিকল্পনার প্রয়োজন।
🙂 বিদ্যালয়গুলোতে নিয়মিত ক্লাসের বাইরে বা ক্লাসের একটি নির্দিষ্ট সময়ে পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের জন্য 'রিমেডিয়াল' বা নিরাময়মূলক ক্লাসের ব্যবস্থা করা।
🙂 বড় গ্রুপে কথা বলতে লজ্জা পাওয়া শিক্ষার্থীদের ছোট ছোট গ্রুপে বা ওয়ান-টু-ওয়ান (একজন শিক্ষক, একজন শিক্ষার্থী) পদ্ধতিতে বুঝিয়ে দেওয়া।
🟨 ৪. ইতিবাচক মনোভাব ও আত্মবিশ্বাস তৈরি:
পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীরা প্রায়ই হীনম্মন্যতায় ভোগে। তারা ধরে নেয় তারা কিছু পারবে না।
🙂 তাদের কখনোই 'দুর্বল', 'ধীরগতির' বা 'মেধাহীন' বলে সবার সামনে ছোট করা যাবে না।
🙂 ভুল করলে বকাঝকা না করে, ভুলটা কেন হলো তা বুঝিয়ে দিতে হবে।
🙂 তাদের যেকোনো ছোট সাফল্য বা ভালো কাজের জন্য সবার সামনে প্রশংসা করতে হবে, যা তাদের আত্মবিশ্বাস বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।
🟨 ৫. সহপাঠী সহায়তা পদ্ধতি:
শ্রেণিকক্ষের এগিয়ে থাকা শিক্ষার্থীদের সাথে পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের জোড়া (Pairing) করে দেওয়া যেতে পারে।
🙂 অনেক সময় একজন শিক্ষক যা বোঝাতে পারেন না, সহপাঠী বন্ধুটি সহজ ভাষায় তা বুঝিয়ে দিতে পারে।
🙂 এতে পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীর সংকোচ কাটে এবং এগিয়ে থাকা শিক্ষার্থীরও নেতৃত্ব ও সহানুভূতির গুণাবলি বিকশিত হয়।
🟨 ৬. ধারাবাহিক মূল্যায়ন:
বছরের শেষে একটি বড় পরীক্ষার ওপর ভিত্তি করে মূল্যায়ন না করে, প্রতিদিনের ক্লাসে সে কতটুকু শিখছে তা ছোট ছোট কাজের মাধ্যমে যাচাই করা উচিত। এতে তার অগ্রগতির ধারাবাহিক চিত্র পাওয়া যায় এবং সঙ্গে সঙ্গে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া যায়।
🟨 ৭. জোরালো শিক্ষক-অভিভাবক যোগাযোগ:
একটি শিশু দিনে মাত্র কয়েক ঘণ্টা বিদ্যালয়ে থাকে, বাকি সময়টা কাটায় পরিবারে।
🙂 তাই অভিভাবককে শিক্ষার্থীর বর্তমান অবস্থা বুঝিয়ে বলতে হবে এবং বাড়িতে তাকে চাপ না দিয়ে কীভাবে সহযোগিতা করা যায়, তার পরামর্শ দিতে হবে।
🙂 বিশেষ করে গ্রামীণ বা অসচেতন পরিবারগুলোতে হোম ভিজিট বা নিয়মিত মা সমাবেশ/অভিভাবক সভার মাধ্যমে সচেতনতা তৈরি করা জরুরি।
পরিশেষে:
কোনো শিশুই পিছিয়ে থাকার জন্য জন্মায়নি। আমাদের একটু বাড়তি সময়, ধৈর্য, ভালোবাসা এবং সঠিক দিকনির্দেশনাই পারে একটি শিশুকে পিছিয়ে পড়া অন্ধকার থেকে বের করে সফলতার মূল ধারায় ফিরিয়ে আনতে।