07/06/2026
ছোট্ট একটি মফস্বল শহর আবহাওয়া অফিস রোড, আকুর টাকুরপাড়া, চার রাস্তার মোড়ে অবস্থিত ক্রিয়েটিভ আর্ট স্কুল। তিনতলা বাড়িটির পাশ দিয়ে যখন প্রতিদিন বিকেলে হেঁটে যাই তখন ভেসে আসে ক্যানভাসে ব্রাশের খসখস শব্দ। এই প্রতিষ্ঠানটি শুধু একটা চার দেয়ালের একাডেমি নয়, এটি হলো একঝাঁক ক্ষুদে শিল্পীর স্বপ্ন বোনার আঙিনা।
আমি এই প্রতিষ্ঠানের একজন মেন্টর বা শিক্ষক। তবে নিজের চেয়েও বেশি আমি নিজেকে এই বাচ্চাদের একজন অভিভাবক মনে করি। প্রতিদিন যখন ওরা ছোট ছোট কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে, চোখে এক পৃথিবী কৌতুহল নিয়ে ভেতরে ঢোকে, তখন আমার মনে হয়—আমি শুধু ওদের আঁকা বা গান শেখাচ্ছি না, আমি ওদের জীবনের রঙ চিনতে শেখাচ্ছি।
ক্যানভাসে রঙের জাদু আর ভাঙা তুলির গল্প
কয়েক মাস আগের কথা। আমাদের একাডেমির বার্ষিক প্রদর্শনীর ঠিক দুই দিন বাকি। সব বাচ্চাই উদগ্রীব হয়ে তাদের সেরা কাজটা ফুটিয়ে তুলতে ব্যস্ত। তাদের মধ্যে আট বছরের ছোট্ট মেয়ে 'তুলি' ছিল একটু অন্যরকম। সে খুব একটা গুছিয়ে কথা বলতে পারত না, কিন্তু ক্যানভাসে যখন সে হাত দিত, তুলি যেন কথা বলত।
প্রদর্শনীর আগের দিন বিকেলে তুলি কাঁদ কাঁদ মুখে আমার ঘরে এসে দাঁড়াল। তার প্রিয় ক্যান্ডি-কালার করার ব্রাশটা মাঝখান থেকে ভেঙে গেছে। জলরঙের বাক্সের কয়েকটি রঙও শেষ। তার চোখে জল, "স্যার, আমি কি কাল প্রদর্শনীতে অংশ নিতে পারব না?"
আমি তাকে জড়িয়ে ধরে বললাম, "তুলি, আমাদের এই 'সুর আর তুলি' একাডেমি কিন্তু কাউকে মাঝপথে ছেড়ে দেয় না। তুমি এখানে একা নও।"
আমি আলমারি থেকে আমার নিজের এক সেট তুলি আর রঙ বের করে ওর হাতে দিলাম। শুধু তাই নয়, ক্লাসের অন্য ক্ষুদে শিল্পীরা—যেমন রোহিত, সামিয়া, নীল—সবাই এসে তুলিকে ঘিরে ধরল। রোহিত ওর নিজস্ব প্যালেট থেকে লাল রঙ দিল, সামিয়া দিল নীল। মুহূর্তের মধ্যে পুরো ক্লাসটা যেন একটা পরিবারে রূপ নিল।
একটি শিক্ষা যা একাডেমি আমাদের শিখিয়েছে: শিল্প কখনো একার নয়, শিল্প হলো সবাইকে জড়িয়ে ধরার এক পরম আশ্রয়।
প্রদর্শনীর সেই জাদুকরী দিন
প্রদর্শনীর দিন যখন শহরের বড় বড় গুণী মানুষরা আমাদের একাডেমির হলরুমে প্রবেশ করলেন, তখন পুরো চারপাশটা আলোয় আলোকময়।
সবাই ঘুরে ঘুরে দেখছিলেন। হঠাৎ এক প্রবীণ শিল্পী তুলির আঁকা ছবিটার সামনে গিয়ে থমকে দাঁড়ালেন। ছবিটায় একটা ভাঙা নৌকোকে অনেকগুলো ছোট ছোট হাত মিলে টেনে তুলছে তীরের দিকে। ছবির নিচে ছোট করে লেখা—"আমাদের একাডেমি, আমাদের শক্তি।"
তুলি খুব দূর থেকে ভয়ে ভয়ে দেখছিল। প্রবীণ ভদ্রলোক যখন জিজ্ঞেস করলেন, "এই অসাধারণ ছবিটা কে এঁকেছে?" তুলি গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে গেল। ভদ্রলোক পরম স্নেহে ওর মাথায় হাত রেখে বললেন, "মা, তোমার রঙে শুধু ছবি নেই, একটা গভীর ভালোবাসা আর একতা আছে।"
পাশে দাঁড়িয়ে আমার চোখ দুটো তখন জলে ভরে উঠেছিল। এটা শুধু তুলির একার সাফল্য ছিল না, এটা ছিল আমাদের পুরো প্রতিষ্ঠানের সংস্কৃতির জয়।
প্রতিষ্ঠানের প্রতি আমাদের ঋণ
"সুর আর তুলি" শুধু আমাদের রুটি-রুজির জায়গা বা বাচ্চাদের শুধু একটা ক্লাস নয়। এই প্রতিষ্ঠানটি আমাদের শিখিয়েছে কীভাবে শূন্য থেকে শুরু করতে হয়। প্রতিকূলতার ঝড়েও কীভাবে রঙ আর সুরের আলো জ্বেলে রাখতে হয়।
আজ যখনই আমি এই করিডোর দিয়ে হেঁটে যাই এবং বাচ্চাদের খিলখিল হাসির শব্দ শুনি, আমার বুকটা গর্বে ভরে ওঠে। এই ক্ষুদে শিল্পীরাই আমাদের ভবিষ্যৎ। আর এই প্রতিষ্ঠানটি হলো সেই উর্বর মাটি, যেখানে প্রতিদিন ডালপালা মেলছে হাজারো স্বপ্ন।
লোভ-লালসা বা পেশাদারিত্বের এই ব্যস্ত দুনিয়ায়, আমাদের এই ছোট্ট একাডেমিটি যেন এক টুকরো খাঁটি অক্সিজেন। যতদিন বেঁচে থাকব, এই বাচ্চাদের চোখের স্বপ্ন আর এই প্রতিষ্ঠানের গৌরব ধরে রাখতে নিজের সবটুকু বিলিয়ে দেব—এই আমার মৌন অঙ্গীকার।। চার তলা বাড়িটার ছাদ থেকে প্রতিদিন বিকেলে ভেসে আসে কখনো হারমোনিয়ামের মিষ্টি সুর, কখনো আবার ভেসে আসে ক্যানভাসে ব্রাশের খসখস শব্দ। এই প্রতিষ্ঠানটি শুধু একটা চার দেয়ালের একাডেমি নয়, এটি হলো একঝাঁক ক্ষুদে শিল্পীর স্বপ্ন বোনার আঙিনা।
আমি এই প্রতিষ্ঠানের একজন মেন্টর বা শিক্ষক। তবে নিজের চেয়েও বেশি আমি নিজেকে এই বাচ্চাদের একজন অভিভাবক মনে করি। প্রতিদিন যখন ওরা ছোট ছোট কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে, চোখে এক পৃথিবী কৌতুহল নিয়ে ভেতরে ঢোকে, তখন আমার মনে হয়—আমি শুধু ওদের আঁকা বা গান শেখাচ্ছি না, আমি ওদের জীবনের রঙ চিনতে শেখাচ্ছি।
ক্যানভাসে রঙের জাদু আর ভাঙা তুলির গল্প
কয়েক মাস আগের কথা। আমাদের একাডেমির বার্ষিক প্রদর্শনীর ঠিক দুই দিন বাকি। সব বাচ্চাই উদগ্রীব হয়ে তাদের সেরা কাজটা ফুটিয়ে তুলতে ব্যস্ত। তাদের মধ্যে আট বছরের ছোট্ট মেয়ে 'তুলি' ছিল একটু অন্যরকম। সে খুব একটা গুছিয়ে কথা বলতে পারত না, কিন্তু ক্যানভাসে যখন সে হাত দিত, তুলি যেন কথা বলত।
প্রদর্শনীর আগের দিন বিকেলে তুলি কাঁদ কাঁদ মুখে আমার ঘরে এসে দাঁড়াল। তার প্রিয় ক্যান্ডি-কালার করার ব্রাশটা মাঝখান থেকে ভেঙে গেছে। জলরঙের বাক্সের কয়েকটি রঙও শেষ। তার চোখে জল, "স্যার, আমি কি কাল প্রদর্শনীতে অংশ নিতে পারব না?"
আমি তাকে জড়িয়ে ধরে বললাম, "তুলি, আমাদের এই 'সুর আর তুলি' একাডেমি কিন্তু কাউকে মাঝপথে ছেড়ে দেয় না। তুমি এখানে একা নও।"
আমি আলমারি থেকে আমার নিজের এক সেট তুলি আর রঙ বের করে ওর হাতে দিলাম। শুধু তাই নয়, ক্লাসের অন্য ক্ষুদে শিল্পীরা—যেমন রোহিত, সামিয়া, নীল—সবাই এসে তুলিকে ঘিরে ধরল। রোহিত ওর নিজস্ব প্যালেট থেকে লাল রঙ দিল, সামিয়া দিল নীল। মুহূর্তের মধ্যে পুরো ক্লাসটা যেন একটা পরিবারে রূপ নিল।
একটি শিক্ষা যা একাডেমি আমাদের শিখিয়েছে: শিল্প কখনো একার নয়, শিল্প হলো সবাইকে জড়িয়ে ধরার এক পরম আশ্রয়।
প্রদর্শনীর সেই জাদুকরী দিন
প্রদর্শনীর দিন যখন শহরের বড় বড় গুণী মানুষরা আমাদের একাডেমির হলরুমে প্রবেশ করলেন, তখন পুরো চারপাশটা আলোয় আলোকময়।
সবাই ঘুরে ঘুরে দেখছিলেন। হঠাৎ এক প্রবীণ শিল্পী তুলির আঁকা ছবিটার সামনে গিয়ে থমকে দাঁড়ালেন। ছবিটায় একটা ভাঙা নৌকোকে অনেকগুলো ছোট ছোট হাত মিলে টেনে তুলছে তীরের দিকে। ছবির নিচে ছোট করে লেখা—"আমাদের একাডেমি, আমাদের শক্তি।"
তুলি খুব দূর থেকে ভয়ে ভয়ে দেখছিল। প্রবীণ ভদ্রলোক যখন জিজ্ঞেস করলেন, "এই অসাধারণ ছবিটা কে এঁকেছে?" তুলি গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে গেল। ভদ্রলোক পরম স্নেহে ওর মাথায় হাত রেখে বললেন, "মা, তোমার রঙে শুধু ছবি নেই, একটা গভীর ভালোবাসা আর একতা আছে।"
পাশে দাঁড়িয়ে আমার চোখ দুটো তখন জলে ভরে উঠেছিল। এটা শুধু তুলির একার সাফল্য ছিল না, এটা ছিল আমাদের পুরো প্রতিষ্ঠানের সংস্কৃতির জয়।
প্রতিষ্ঠানের প্রতি আমাদের ঋণ
"সুর আর তুলি" শুধু আমাদের রুটি-রুজির জায়গা বা বাচ্চাদের শুধু একটা ক্লাস নয়। এই প্রতিষ্ঠানটি আমাদের শিখিয়েছে কীভাবে শূন্য থেকে শুরু করতে হয়। প্রতিকূলতার ঝড়েও কীভাবে রঙ আর সুরের আলো জ্বেলে রাখতে হয়।
আজ যখনই আমি এই করিডোর দিয়ে হেঁটে যাই এবং বাচ্চাদের খিলখিল হাসির শব্দ শুনি, আমার বুকটা গর্বে ভরে ওঠে। এই ক্ষুদে শিল্পীরাই আমাদের ভবিষ্যৎ। আর এই প্রতিষ্ঠানটি হলো সেই উর্বর মাটি, যেখানে প্রতিদিন ডালপালা মেলছে হাজারো স্বপ্ন।
লোভ-লালসা বা পেশাদারিত্বের এই ব্যস্ত দুনিয়ায়, আমাদের এই ছোট্ট একাডেমিটি যেন এক টুকরো খাঁটি অক্সিজেন। যতদিন বেঁচে থাকব, এই বাচ্চাদের চোখের স্বপ্ন আর এই প্রতিষ্ঠানের গৌরব ধরে রাখতে নিজের সবটুকু বিলিয়ে দেব।