28/09/2026
একটা কঠিন বাস্তবতা স্বীকার করার সময় এসেছে।
ইসরায়েলকে পৃথিবীর মানচিত্র থেকে মুছে দেওয়ার কথা বহুবার বলা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতার ময়দানে দেখা গেছে, ইসরায়েলকে নিশ্চিহ্ন করার সেই লক্ষ্য অর্জিত হয়নি; বরং যারা দীর্ঘদিন ধরে সামরিকভাবে তাকে পরাজিত করার চেষ্টা করেছে, তাদের নিজেদের শক্তি ও সক্ষমতাই ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
হামাসের সামরিক ও সাংগঠনিক সক্ষমতা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হিজবুল্লাহও দীর্ঘ সংঘাতের পর আগের অবস্থানে নেই। ইরান সরাসরি ইসরায়েলের সঙ্গে বড় ধরনের সংঘাতে জড়িয়েছে, কিন্তু ২০২৫ সালের সেই সংঘাতের পর যুক্তরাষ্ট্রও সরাসরি ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালায়। কয়েক দিনের মধ্যেই যুদ্ধবিরতি আসে।
এর অর্থ এই নয় যে ইসরায়েল অজেয়, কিংবা ভবিষ্যতে তার বিরুদ্ধে কোনো প্রতিরোধ সম্ভব নয়।
বরং এর অর্থ হলো—শুধু আবেগ, স্লোগান আর বিচ্ছিন্ন হামলা দিয়ে একটি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ জেতা যায় না।
আর এখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্নটা আসে।
যদি ইরান, হুথি, হামাস, হিজবুল্লাহ—প্রত্যেকেই কোনো না কোনো পর্যায়ে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে, তাহলে বৃহত্তর মুসলিম বিশ্বের হাতে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি কোনো সমন্বিত কৌশল আছে কি?
সামরিক শক্তি আছে কি?
অর্থনৈতিক পরিকল্পনা আছে কি?
কূটনৈতিক ঐক্য আছে কি?
নাকি প্রতিটি দেশ নিজের নিজের স্বার্থে আলাদা পথে হাঁটছে?
কারণ যুদ্ধ শুধু ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে হয় না। যুদ্ধ হয় অর্থনীতি দিয়ে, প্রযুক্তি দিয়ে, গোয়েন্দা সক্ষমতা দিয়ে, কূটনীতি দিয়ে, আন্তর্জাতিক জোট দিয়ে এবং দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা দিয়ে।
এই জায়গাতেই আমাদের আত্মসমালোচনা দরকার।
ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাতের প্রশ্নে মুসলিম বিশ্ব বহুবার ঐক্যের কথা বলেছে। কিন্তু বাস্তবে নিজেদের মধ্যকার বিভাজন, পারস্পরিক সংঘাত এবং ভিন্ন ভিন্ন জাতীয় স্বার্থ সেই ঐক্যকে দুর্বল করেছে।
ফলে আজকের বাস্তবতা হলো—
ইসরায়েল টিকে আছে।
এবং শুধু টিকে নেই—তার বিরুদ্ধে যারা সামরিক প্রতিরোধের কথা বলেছিল, তাদের অনেকের সক্ষমতাও আগের তুলনায় দুর্বল হয়েছে।
২০২৫ সালের যুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে; যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় দেশগুলোও ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে।
অন্যদিকে, নেতানিয়াহু জাতিসংঘের মঞ্চে দাঁড়িয়ে নিজের সরকারের অবস্থান জোরালোভাবে তুলে ধরেছেন।
এটাই বাস্তবতার কঠিন দিক।
ফেসবুকের স্ট্যাটাসে আমরা যাকে বিজয় বা পরাজয় বলে ঘোষণা করি, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে তার হিসাব অনেক বেশি নির্মম।
এখন প্রশ্ন হওয়া উচিত—
ইসরায়েলকে মানচিত্র থেকে মুছে ফেলার স্লোগান নয়;
বরং আগামী ১০, ২০ কিংবা ৫০ বছরে মুসলিম বিশ্বের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত ও কূটনৈতিক সক্ষমতা কীভাবে এমন পর্যায়ে নেওয়া যায়, যাতে কেউ আমাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে দিতে না পারে?
কারণ শুধু শত্রুকে ধ্বংস করার স্বপ্ন দেখলেই শক্তিশালী হওয়া যায় না।
নিজেকে শক্তিশালী করাই প্রথম যুদ্ধ।
আর সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে আমাদের সবচেয়ে কঠিন সত্যটা স্বীকার করতেই হবে—
আমরা সম্মিলিতভাবে এখনও সেই শক্তি অর্জন করতে পারিনি।