07/09/2022
কেন জীবনে একবার হলেও অবশ্যই আপনার উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করা উচিত!
আমরা যারা পাবলিকে পড়েছি বা পড়ছি তারা একটা কথা বিশ্ববিদ্যালয়ের বড়ভাইদের কাছে শুনতাম।
"দেখ, জীবনে প্রত্যেকটা মানুষকে একবার হলেও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া দরকার! জীবনকে পরিপূর্ণতা দান করতেই বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে কিছুদিন হাঁটাহাঁটি করা দরকার! একেকটা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একেকটা দেশ না, একেকটা পৃথিবীর মতো!"
আশা করি এতোক্ষণে বুঝতেই পারছেন সেই বক্তব্যটি জীবনের কোন উপলব্ধি থেকে তারা করেছেন বা এখন আমরা জুনিয়রদেরকে করি।
এবার আলোচনা করব যে দুটি কারণে আমাদের সবাইকে একবার হলেও উন্নত দেশে এসে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করা উচিত।
প্রথমটি, পুরো পৃথিবীটা যে আপনার ঠিকানা সেটা বুঝার জন্যে!
দ্বিতীয়টি, সমস্ত হিসেবনিকেশ করে সফলতার চাবিকাঠি হাতে পাবার জন্যে!
হুমায়ুন আজাদ স্যারের একটি বিখ্যাত বইয়ের নাম "যতোই গভীরে যাই মধু, যতোই ওপরে যাই নীল!"
এর মানে এই লেখার মূল মধু খুজতে গেলে আপনাকে লেখার গভীর অংশে যেতে হবে! উপরে থাকবে নীল আকাশের কথা যে আকাশে আমাদের স্বপ্ন থাকে!
যুক্তি-১ঃ
John A. Shedd এর একটি জনপ্রিয় কথা আছে “A ship in harbor is safe — but that is not what ships are built for.”
মানুষের ক্ষেত্রেও এই কথাটি শতবাক্য সত্য।
আমি নানা জায়গায় একটি প্রশ্ন শুনি, বলা যায় এক ধরনের কটুক্তি! যে, পড়াশোনা শেষে সব বিদেশে চলে গেলে দেশের কী হবে? অথচ ওরা এভাবে কখনো চিন্তা করেনা যে আসলেই আমাদের একটা বড় অংশকে পৃথিবীর সেরা দেশগুলোতে যাওয়া উচিত। ওদের বাজার গুলোতে একটা শক্ত জায়গা তৈরি করা উচিত। এদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ হতে পারে এই অধিকসংখ্যক যুবকশ্রেণি। প্রত্যেক ঘর থেকে একজন করে উচ্চশিক্ষার জন্যে বিদেশে চলে আসা উচিত। এবং এটা নিশ্চিত করা উচিত যেন কাউকে দাসত্বের জীবনের জন্য বাহিরে না আসতে হয়। আচ্ছা, জাপান যে বাংলাদেশী আইনবিদ ডঃ রাধাবিনোদ পালের কারণে আজও আমাদের চিরবন্ধুরাষ্ট্র হয়ে আছে, যদি সেই শিক্ষিত আইনবিদ সে দেশে না যেতেন, তবে কি তা সম্ভব ছিল?! ইঞ্জিনিয়ার ফজলুর রহমান খান যুক্তরাষ্ট্রে না গেলে কি তখনকার আমেরিকার সর্বোচ্চ উচ্চতার ভবন সিয়ার্স টাওয়ার তৈরীর গৌরব বাংলাদেশ পেত? কিংবা সম্প্রতি আমেরিকার সরকার থেকে করোনা ভ্যাক্সিন পেতে যে চারজন বাঙালি বিশেষ কৌশলে নিজের মাতৃভূমির মানুষের জন্যে কাজ করেছেন, তা কি সেদেশে গিয়ে সপ্রতিভায় প্রতিষ্ঠিত না হলে সম্ভব ছিলো? আপনারা শুধু চান আমাদের অশিক্ষিত অবহেলিত শ্রেণিটি মধ্যপ্রাচ্যে গিয়ে রোদে পুড়ে দাসত্বের জীবন নিয়ে অর্থনীতি টিকিয়ে রাখুক। অথচ এই কাজটি করা দরকার এই বিশাল শিক্ষিত শ্রেণিটিকে। আমরা অন্যের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ নাই জেনেও বছরের পর বছর বেকার হয়ে নিজের অমিত শক্তিকে ধ্বংস করছি। এদিকে ভারত, শ্রীলঙ্কার লোকজন এসে দেশের বেসরকারি খাতের বড় বড় পদ দখল করছে সেই বিষয়ে কারও কোন আওয়াজ নেই। আমাদেরও যে সেই সকল দেশের বড় পজিশন গুলোতে যাওয়া দরকার সেই ভাবনা নেই!
মেধাবীরা বিদেশ যাবেনা তো কী অশিক্ষিতরা যেয়ে দেশের পরিচয় তুলে ধরবে? বিজ্ঞানী আইনস্টাইনের মতো মানুষও শেষ জীবনে আমেরিকার নাগরিকত্ব নিয়েছেন!
ভাই দক্ষ হয়ে পুরো পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ুন। যাতে কোন অদক্ষ ভাইকে এসে দাসত্ব করতে না হয়।
আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চ ডিগ্রি নিয়েও যদি বোকার মতো ভাবি আমাদের সীমানা শুধু বাংলাদেশ। তাহলে ভুল করছেন ভাই! একটু ব্রড করে ভাবুননা। পুরো পৃথিবীতেই তো সৃষ্টিকর্তা আপনার জন্য রিঝিকের ব্যবস্থা করে রেখেছে। যে উক্তি দিয়ে শুরু
করেছিলাম আপনাকে দক্ষতা বাড়াতে হবে। সেই দক্ষতা দিয়ে দেশের গণ্ডি মাড়িয়ে বিদেশেও সফলতার শীর্ষে পৌঁছাতে হবে।
কতো সুন্দর এই পৃথিবী! একবার পুরোটা না দেখেই মরে যাবেন?
যুক্তি ১ অংশটি আমি না রাখলেও পারতাম তবে এটা আপনার দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে সহায়ক হবে বলেই লিখেছি। বিশ্বাস করেন ভাইয়ারা/আপুরা, কী পরিমাণ ছেলে-মেয়ে যে ভারত, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, চীন, আফ্রিকার সমস্ত দেশ, টার্কিশ এমনকি পাকিস্তান থেকে ইউরোপ আমেরিকার বাজারে প্রতিনিয়ত আসছে তা নিজে না দেখলে উপলব্ধি করতে পারবেননা। বৃটিশ শাসনামলে আমাদের দেশে যেমন ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণ করা পাপ ছিলো! এখন উচ্চশিক্ষার ব্যাপারটা যেন তাই হয়ে গেছে! আফসোস!
তাই বিশ্ববিদ্যালয় জীবন থেকেই নিজের দক্ষতাগুলোকে বিশ্বমানের করে গড়ে তুলুন। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কিছু শেখায় না- এই টাইপের যুক্তি দেখাবেন না। একটু গুগল করলেই সব তথ্য পাওয়া যায়। সমস্ত কোর্স এখন ফ্রি পাওয়া যায়। সময় মতো প্রস্তুত হয়ে যান এক অনিন্দ্য সুন্দর জীবনকে উপভোগ করার জন্যে। আর আপনার অন্য ভাই/বোন যারা অপেক্ষাকৃত কম দক্ষ তাদের জন্য সুযোগ করে দিন। বড় জীবনের স্বপ্ন দেখা শিখুন! কতো সুযোগ এখানে পড়ে আছে। আমাদের দেশে একটু সুযোগ কম বলে আমরা ক্লান্ত হয়ে একসময় হতাশ হয়ে ভাবি দেশেই ভাত নাই আবার বিদেশ! আসলে যদি বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শুরু থেকে পরিকল্পনা করে আগান। একটা পয়সাও লাগবেনা ইউরোপ আমেরিকা আসতে। বরং ওরাই আপনাকে
খরচ দিয়ে আনবে। আমি যে দেশে আছি তার একটা ছোট্ট পরিসংখ্যান দেই। শুধু জার্মানিতেই এর অর্থনীতি সহ অন্যান্য কার্যক্রম ঠিক রাখতে প্রতি বছর কমপক্ষে সাড়ে চার লাখ অভিবাসীকে আনতে হবে। এবার বুঝেছেন আপনি দক্ষ হলে ওরাই আপনার পিছনে ছুটবে!
যুক্তি-২ঃ
ইউরোপ-আমেরিকার একটা ভিসা যখন আপনার পাসপোর্টে লাগবে সত্যি হাজারটা দুয়ার আপনার সামনে খুলে যাবে।
১) পড়াশোনার পাশাপাশি পার্টটাইম বা যেকোন মিনি জব করে একটা ভালো উপার্জনের সুযোগ পাবেন। যেটি দেশে একটি বড় পদে যেয়ে করতে ৮-১০ বছর সময় লাগবে।
২) এখানে একবার ভর্তি হলে দক্ষতা না নিয়ে আপনি বের হতে পারবেন না! আপনার পড়াশোনা অন্য কেউ করে দিবেনা। গুগলে গিয়ে যেভাবে আমরা দেশে CCP করে সব এসান্টমেন্ট শেষ করে দিতাম এখানে তা সম্ভব নয় বলেই আপনি সত্যিকার অর্থেই দক্ষ হয়ে বের হবেন। আমাদের ছেলেমেয়েরা সত্যিই অনেক মেধাবী! অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়েই কোন না কোন কাজে আপনি 🇧🇩 শিক্ষার্থীদের দেখবেন। একটা লাইফটাইমের মুলধন আপনি ফ্রিতে আয় করে নিলেন ভার্সিটি থেকে!
৩) পড়াশোনা শেষে আপনি ফুলটাইম জবে ঢুকবেন, এর পর পর্যায়ক্রমে সেই দেশের নাগরিকত্বের সুযোগটিও পাবেন। মাত্র ৫-৭ বছরে এর থেকে ভালো ক্যারিয়ার আর আপনি কোথায় কল্পনা করবেন?
৪) দেখবেন কেউ যখন ইউরোপ আমেরিকায় পৌঁছে যায়। তখন তাকে সফল মানুষ হিসেবে গণ্য করা হয়! এবং আসলেই তাই। দুনিয়াতে যার টাকা নাই সেই বুঝে হাজারটা ডিগ্রির কোন মূল্য নাই! গোটা জীবনের এই অর্থনৈতিক নিশ্চয়তা এখানে পাওয়া যায় বলেই সবাই সফল বলে। আপনার অর্থনৈতিক মূল্য যদি দেশের থেকে বিদেশে বেশি দেয় আপনাকে সেখানেই যাওয়া উচিত।
৫) একবার নাগরিকত্ব পেলে পর্যায়ক্রমে পরিবারসহ অনেককেই আনার তৌফিক আল্লাহ তায়ালা আপনাকে দিবেন। একবার চিন্তা করেনতো আমাদের মতো মধ্যবিত্তের পরিবারের ছেলেমেয়েদের পক্ষে কী সম্ভব দেশে চাকরি-বাকরি করে বাবা মাকে দেশের বাহির থেকে একটু ঘুরিয়ে আনা? যখন পারবেন তখন হয়তো এই প্রিয় মানুষ দুজন আর পৃথিবীতে থাকবেন না! কিন্তু এটি আপনি খুব সহজে করতে পারবেন উচ্চশিক্ষার মাধ্যমে। আর এখানে যখন আপনার ভবিষ্যত প্রজন্ম আসবে তখন আরও শক্তিশালী একটা বাংলাদেশ এখানে তৈরী হবে। সন্তানদের শিক্ষাসহ নানা বিনিয়োগ সরকার নিজেই করে দিবে। বরং বেশী সন্তান নিলে আপনাকে তারা ভাতাও দিবে! আশ্চর্যের বিষয় হলো সন্তান হলে এখানে পিতা-মাতার সম্মান অনেক বেড়ে যায়!
৬) খুব সহজেই পৃথিবীর অধিকাংশ দেশ আপনার পাসপোর্টের বদৌলতে দেখার সুযোগ পাবেন। যারা ভ্রমণপিপাসু, তাদের জন্য এর থেকে লোভনীয় সুযোগ আর কি হতে পারে?
৭) আমাদের তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে একরকম স্বাধীনতা নেই বললেই চলে! বিশেষ করে মেয়েদের। কিন্ত এখানে চলাফেরা বা বৈষম্যহীন কাজের সুযোগ নারী পুরুষ সবার জন্য সমান। অনেকেই ওদের স্বাধীনতা বলতে উচ্ছৃঙ্খল জীবন কল্পনা করে থাকেন। যা সম্পূর্ণ আমাদের মনগড়া। এখানে সবাই একটি উঁচু মানের রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা মেনেই স্বাধীনভাবে চলে। তাই আমাদের বোনেরাও উচ্চ শিক্ষার ব্যাপারে আরও আগ্রহী হতে পারেন। যারা বলেন মেয়ে মানুষ কেন বিদেশে যাবে? আমি তাদের বলব ভাই যে মেয়ে অনার্স পর্যন্ত নিজেকে ঠিক রেখেছে সে দুনিয়ার যেখানেই যাক আর মন্দ দিকে যাবার সুযোগ নেই!
৮) এখানে আসলে দেশ এবং দেশের বাহিরের একটা বিশাল জগতের মানুষের সাথে আপনার যোগাযোগ তৈরি হবে। যার মাধ্যমে আপনি আপনার মেধার সর্বোচ্চ স্বীকৃতি পাবেন। এই নেটওয়ার্কটি আপনার বড় স্বপ্ন পূরণে বিশাল ভূমিকা রাখবে। যা আজ আপনি কল্পনাও করতে পারবেন না।
Last but not least,
৯) Albert Einstein এর একটা কথা আছে,
“Live life to the fullest... Laugh some every day. Keep growing, keep dreaming, keep following your heart.”
মোদ্দা কথা, এই ফুলেস্ট লাইফটা আপনি উচ্চ শিক্ষার মাধ্যমে এখানে আসতে পারলে খুব সহজেই পেয়ে যাবেন।
অনেকেই বলে সব কিছু গুছিয়ে নিই, তারপর স্বপ্নপূরণের জন্য কাজ করব! এটি একটি স্বান্ত্বনা বাক্য! স্রেফ ফাঁকি মারা কথা। মানুষকে আসলে সৃষ্টিকর্তা এতো সময় দেননি। স্বপ্নকে অর্জন করতে হলে প্রতিদিনই একটু একটু করে এগোতে হয়। ব্যাপারটা এমন নয় যে সচিব হবো, বড় কর্পোরেট ব্যক্তিত্ব হবো, অনেক টাকাপয়সার মালিক হবো তারপর জীবনকে কিছু দিতে বের হবো। এটা আসলে হয়না, সব হাতে আসলেও সময় আর আসেনা। যৌবনের ইবাদত যেমন সর্বোত্তম। তেমনি সেই যৌবনই স্বপ্নপূরণের শ্রেষ্ঠ সময়। তা না হলে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ পরিব্রাজক ইবনে বতুতা কিংবা দি আলকেমিস্ট উপন্যাসের সেই জগতবিখ্যাত চরিত্র সান্তিয়াগো বৃদ্ধ বয়সেই পৃথিবী দেখার উদ্দেশ্যে বের হতেন!
#আমাদের_স্বপ্ন_আকাশ_ভেদ_করুক!
Billal Mahmud
Master in International Management and Information System (IMIS)
South Westphalia University of Applied Sciences, Germany.