02/08/2026
**পিতামাতা হিসেবে ব্যর্থ, সন্তান হিসেবেও সার্থক নই**
আজ সন্ধ্যার টিউশনিতে গিয়ে একটি ঘটনা শুনলাম। একজন মানুষ তিন দিন আগে মারা গেছেন, অথচ তার মৃত্যুর খবর কেউ জানে না। এমনকি তার নিজের সন্তানরাও জানে না যে, তাদের বাবা আর এই দুনিয়ায় নেই।
কিসের এত টাকা-পয়সা, কিসের এত অর্থ-সম্পদ, কিসের এত ব্যস্ততা—যদি দিন শেষে একজন ভালো মানুষ হিসেবেই নিজেকে গড়ে তুলতে না পারি? জীবনের শেষ সময়ে যদি পাশে দাঁড়ানোর মতো একজন মানুষও না থাকে, তাহলে এই অর্জনের মূল্য কোথায়?
ছোটবেলা থেকেই আমরা দেখে আসছি, কোনো মানুষ মারা গেলে আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী, পরিচিতজন ছুটে আসে। জানাজায় মানুষ অংশ নেয়, শেষবারের মতো মুখটি দেখে বিদায় জানায়। অথচ আজ এমন এক সমাজে আমরা বসবাস করছি, যেখানে একজন মানুষ মৃত্যুর পরও দিনের পর দিন একা পড়ে থাকেন। তার শরীরে পচন ধরে যায়, দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে, পথচারীরা চলাচলে অসুবিধায় পড়ে—অথচ আশেপাশের মানুষও হয়তো জানে না, এই মানুষটিরও একদিন পরিবার ছিল, সন্তান ছিল, স্বপ্ন ছিল, ভালোবাসার মানুষ ছিল।
সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো, জীবিত অবস্থায় হয়তো তিনি অনেকের সঙ্গে কথা বলেছেন, আড্ডা দিয়েছেন, মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। কিন্তু মৃত্যুর পর তার পাশে দাঁড়ানোর মতো আপনজনও পাওয়া গেল না। এর চেয়ে নির্মম বাস্তবতা আর কী হতে পারে?
আমাদের সমাজে এমন ঘটনা হয়তো একেবারে বিরল নয়। অনেক বৃদ্ধ বাবা-মা জীবনের শেষ বয়সে সন্তানের অপেক্ষায় থাকেন। সন্তানরা ব্যস্ত থাকে নিজেদের জীবন, চাকরি, ব্যবসা, সংসার আর অর্থের পেছনে। কেউ বাবা-মাকে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে নিশ্চিন্ত হয়ে যায়, কেউ আবার একই শহরে থেকেও মাসের পর মাস খোঁজ নেয় না। অথচ এই বাবা-মায়েরাই একসময় নিজেদের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়ে সন্তানকে মানুষ করেছেন।
মনে রাখতে হবে, বাবা-মা শুধু দায়িত্ব নয়, তারা আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় আমানত। তাদের প্রয়োজন শুধু টাকা-পয়সা নয়; প্রয়োজন একটু সময়, একটু কথা, একটু খোঁজ নেওয়া, একটু সম্মান এবং পাশে থাকার নিশ্চয়তা।
একদিন আমরাও বৃদ্ধ হবো। আমাদের সন্তানরাও আমাদের সঙ্গে কেমন আচরণ করবে, তার অনেকটাই নির্ভর করবে আমরা আজ আমাদের বাবা-মায়ের সঙ্গে কেমন আচরণ করছি তার ওপর। সন্তানকে শুধু ভালো স্কুলে পড়ানো, ভালো চাকরি কিংবা বড় মানুষ বানানোই যথেষ্ট নয়; তাকে একজন ভালো মানুষ, দায়িত্বশীল সন্তান এবং মানবিক নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলাও একজন পিতামাতার দায়িত্ব।
তাই সময় থাকতে পিতামাতাকে সম্মান করুন, তাদের খোঁজ নিন, তাদের সঙ্গে সময় কাটান। আর পিতামাতারাও সন্তানকে শুধু অর্থ-সম্পদ নয়, মানবিকতা, নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধের শিক্ষা দিন। যেন কোনো বাবা-মাকে জীবনের শেষ সময়ে সন্তানের জন্য অপেক্ষা করতে না হয়, আবার কোনো সন্তানকেও এমন আফসোস করতে না হয় যে—বাবা-মা বেঁচে থাকতে তাদের যথেষ্ট সময় দিতে পারিনি।
দিন শেষে আমাদের পরিচয় কত টাকা রেখে গেলাম, কত বড় বাড়ি বানালাম কিংবা কত সম্পদ অর্জন করলাম—তা দিয়ে নয়। আমাদের আসল পরিচয় হবে, আমরা কতটা ভালো মানুষ হতে পেরেছি এবং আমাদের কারণে কতজন মানুষ ভালোবাসা, সম্মান ও নিরাপত্তা পেয়েছে।
**পিতামাতা হিসেবে যেন আমরা ব্যর্থ না হই, আর সন্তান হিসেবেও যেন সার্থক হতে পারি—এটাই হোক আমাদের জীবনের অন্যতম বড় শিক্ষা।**