05/03/2026
মুখোশের আড়ালে মানুষ: সতর্ক থাকার সময় এখন আতাউর রহমান : “মুখের উপর মুখোশ থাকে মিথ্যা ছবির আয়না, যতই তুমি মানুষ চেনো—বেইমান চেনা যায় না।” মানুষকে চেনা সহজ নয়.....
Non-Government High School Learners learn from Class ' Preparatory to SSC'
05/03/2026
মুখোশের আড়ালে মানুষ: সতর্ক থাকার সময় এখন আতাউর রহমান : “মুখের উপর মুখোশ থাকে মিথ্যা ছবির আয়না, যতই তুমি মানুষ চেনো—বেইমান চেনা যায় না।” মানুষকে চেনা সহজ নয়.....
03/06/2025
ুবারক
25/04/2025
খলিল চৌধুরী আদর্শ বিদ্যানিকেতন: উন্মেষ ও কিছু কথা
–Π আতাউর রহমান
সুরমা, কুশিয়ারা (ইক্ষুনদী) ও সুনাই বিধৌত সিলেটের এক প্রান্তিক উপজেলা—বিয়ানীবাজার। ইতিহাসের পাতায় যার পূর্বনাম টেঙ্গরী-চতুরক-পঞ্চখন্ড, এক সময় পরিচিত ছিল ক্ষুদে নবদ্বীপ নামে। শিক্ষার ঐতিহ্যে ঋদ্ধ এ জনপদের সন্তান ছিলেন পন্ডিত রঘুনাথ শিরোমণি। শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের মত বহু গুণীও জন্মেছেন এই মাটিতে। ‘পন্ডিতপাড়া’ নামের একটি মহল্লা আজও সাক্ষ্য দেয় সে ঐতিহ্যের।
১৯৮৩ সালের কথা। তখন বিয়ানীবাজারের শিক্ষাক্ষেত্রে শুরু হয়েছে এক ধস। লেখাপড়ার মান নিয়ে অভিভাবকদের উদ্বেগ বাড়ছিল। ঠিক তখনই বিয়ানীবাজার মহাবিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ, শ্রদ্ধেয় আব্দুল মন্নান চৌধুরী ও তাঁর সহকর্মী শ্রী সুভাষ চন্দ্র রায় উদ্যোগ নেন নতুন এক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গঠনের। সেই উদ্যোগের ফলস্বরূপ ১৯৮৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি, আজির মার্কেটের ভাড়াকৃত কক্ষে যাত্রা শুরু করে 'আদর্শ বিদ্যানিকেতন'।
শুরুতে ডা: আব্দুর রাজ্জাক (কসবা) ও মো: হাবিবুর রহমান (খাসাড়িপাড়া) কিন্ডারগার্টেন ভিত্তিক পাঠদান চালু করেন। পরে অধ্যাপক সুভাষ রায় অধ্যক্ষ হিসেবে যোগদান করেন। প্রশাসনের আন্তরিক সহযোগিতায়, বিশেষ করে তৎকালীন ইউএনও এ এফ এম মতিউর রহমানের সহায়তায় বিদ্যালয়টি স্থানান্তরিত হয় উপজেলা চত্বরে বন্যা আশ্রয়কেন্দ্রে। সেই সময় নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ এই প্রতিষ্ঠানের পেছনে ছিলেন নিরলসভাবে। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য: আকদ্দস সিরাজুল ইসলাম, আলী আহমদ, কাজি মতিউর রহমান, ডা. মঈন উদ্দীন আহমেদ, আছাদ উদ্দিন, সফর আলী, আব্দুল হাছিব মনিয়া, ফুরকান আলী, হাবিবুর রহমান, আব্দুছ ছালাম, আলতাফ হোসেন, আব্দুল আজিজ, মজির উদ্দিন, রফিক উদ্দিন, আব্দুল খালিক লালু, আব্দুল্লাহ মিয়া প্রমুখ।
১৯৮৯ সাল। বিদ্যালয়ের ছাত্রসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে অষ্টম শ্রেণি পাঠদানের জন্য সরকারি নিবন্ধনের প্রয়োজন দেখা দেয়। এ সময়ই আবির্ভাব ঘটে এক মহান হৃদয়ের, শিক্ষা-প্রেমিক, শিল্পপতি জনাব খলিলুর রহমান চৌধুরীর। তিনি তাঁর ব্যক্তিগত উদ্যোগে বিয়ানীবাজারের প্রাণকেন্দ্রে জমি ক্রয় করে আধুনিক অবকাঠামো নির্মাণ করেন। তাঁর অনবদ্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বিদ্যালয়টির নাম হয় “খলিল চৌধুরী আদর্শ বিদ্যানিকেতন”।
তিনি শুধু জমি ও ভবনই দেননি, বরং দীর্ঘ সময় ধরে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক দায়িত্ব নিজ কাঁধে বহন করেছেন। এর পাশাপাশি নয়াগ্রাম মৌজার ২০ শতক সরকারি লিজপ্রাপ্ত ভূমিতে আরেকটি ভবন নির্মাণে লন্ডনপ্রবাসী কমর উদ্দিন দেন ৫০ হাজার টাকার অনুদান। যদিও সে জমি নিয়ে পরে মামলা হয়, তবুও তার একাংশে খলিলুর রহমান নিজ খরচে প্রাথমিক শাখার জন্য ভবন নির্মাণ করেন, যা আজও সচল।
বিদ্যালয়ের ইতিহাসে আরও এক গুরুত্বপূর্ণ দান ছিল পাতন নিবাসী লন্ডন প্রবাসী মরহুম কমর উদ্দিনের পঞ্চাশ হাজার টাকার অনুদান। যদিও সেই জমির ওপর বিদ্যালয় গড়া সম্ভব হয়নি, পরবর্তীতে খলিলুর রহমান চৌধুরীর ব্যয়ে সেখানে নির্মিত ভবনে বিদ্যালয়ের প্রাথমিক শাখা পরিচালিত হচ্ছে।
এ প্রতিষ্ঠানে আমার নিজের যাত্রা শুরু ১৯৮৭ সালের শেষ দিকে, এবং নিয়োগপত্র গ্রহণ করি ১৯৮৮ সালের ৫ জুন, মাসিক ৬০৫ টাকা বেতনে। দীর্ঘ প্রায় তিন দশক আমি এ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করি—মার্চ ২০১৭ পর্যন্ত। এই প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি ইট, প্রতিটি ক্লাসরুম জড়িয়ে আছে আমার কৈশোর-যৌবনের অমূল্য স্মৃতিতে।
একসময় বিদ্যালয়ে ছিল সেরা স্কাউট দল—যা গড়ে তোলেন মরহুম আব্দুল হান্নান এবং পরে উন্নত করেন মরহুম নাসির উদ্দিন। আমার সহকর্মীদের মধ্যে ছিলেন আব্দুছ ছালাম, এ কে এম গোলাম কিবরিয়া তাপাদার, মাসুক আহমদ, জয়নুল হক, মাহবুবে আলম সিদ্দিকী, লুৎফুন নাহার, বিষ্ণুপদ আচার্য্য, আব্দুল কুদ্দুছ, মেজর সফর উদ্দিন, গায়ত্রী দেব, দীপালি দে প্রমুখ। কলেজের অধ্যাপকগণও ছিলেন পাঠদানে সহায়ক: মো. মাহবুবুর রশীদ চৌধুরী, প্রশান্ত শেখর দে, আব্দুস শহিদ, ছালেহ আহমদ প্রমুখ। তাঁদের অনেকেই আজ বেঁচে নেই।
আমরা সবাই একত্র হয়ে কাজ করতাম, ছাত্রছাত্রীদের উন্নয়ন ও পাঠ্যপদ্ধতি নিয়ে চিন্তাভাবনা করতাম। আজ বিদ্যালয়টি একটি সুপ্রতিষ্ঠিত ও সম্মানজনক বিদ্যাপীঠ। এই প্রতিষ্ঠানের সাফল্যের মূল ভিত্তি গড়ে উঠেছে সেই সময়েই।
এ প্রতিষ্ঠানের আরেক অবিচ্ছেদ্য অংশ একজন আছেন —এমএলএসএস আবুল কালাম, বরিশালের ভোলা থেকে আগত। তিনিই প্রতিষ্ঠানটির নিরব ইতিহাসবহনকারী এক সাক্ষী। তার সহযোগী ছিলেন জলঢুপের শিপ্রা দাস ও কল্যাণী দে।
আমার অন্তরের শ্রদ্ধা তাঁদের প্রতি—যাঁদের অদৃশ্য ত্যাগ, শ্রম ও ভালবাসায় গড়ে উঠেছে আজকের এই প্রতিষ্ঠান। খলিল চৌধুরী আদর্শ বিদ্যানিকেতন শুধুই একটি স্কুল নয়, এটি বিয়ানীবাজারবাসীর স্বপ্ন, অহংকার ও আত্মপরিচয়ের প্রতীক।
আজও প্রতিষ্ঠানটি জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে যাচ্ছে, যার পেছনে বর্তমান প্রধান শিক্ষক জনাব আব্দুল মালিক-এর নিষ্ঠা ও নেতৃত্ব প্রশংসনীয়। তাঁর নেতৃত্বে সহযোগী শিক্ষকবৃন্দও নিরলস পরিশ্রম করে চলেছেন, যাঁদের জানাই আন্তরিক অভিনন্দন।
১৯৯১ সালের ১ জানুয়ারি স্কুলটি সরকার স্বীকৃতি পায় এবং ১৯৯৪ সালের জানুয়ারিতে এমপিওভুক্ত হয়। এরপর থেকে এ বিদ্যালয় আলোকিত করেছে অসংখ্য জীবন। প্রতিষ্ঠানের সুদীর্ঘ ৪২ বছরের যাত্রায় শিক্ষার আলো ছড়িয়েছে নিরন্তর।
শিক্ষা বিস্তারে এই প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা গৌরবোজ্জ্বল। এখান থেকে গড়ে উঠেছে অসংখ্য আলোকিত মানুষ, যাঁরা দেশে-বিদেশে কৃতিত্বের সাক্ষর রেখেছেন।
আমার এ লেখায় গভীর শ্রদ্ধা জানাই অধ্যক্ষ আব্দুল মন্নান চৌধুরী, খলিলুর রহমান চৌধুরী, হাবিবুর রহমান, ডা: আব্দুর রাজ্জাক, সহিব আলী চেয়ারম্যানসহ সকল স্বপ্নদ্রষ্টা ও সহায়তাকারীদের প্রতি। যাঁদের মেধা, শ্রম ও ত্যাগে প্রতিষ্ঠানটি আজ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। তাঁদের আমরা ভুলিনি, ভুলব না।
---
Π আতাউর রহমান
প্রধান শিক্ষক, দাসউরা উচ্চ বিদ্যালয় | প্রাক্তন শিক্ষক, খলিল চৌধুরী আদর্শ বিদ্যানিকেতন।