28/03/2023
Nabil Enterprise
''মানব জীবনের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব হচ্ছে ?
28/03/2023
প্রায় বছর দুয়েক হবে। এক ভাই আসলেন। অসম্ভব মেধাবী।
উনার ব্রেনে একটা ইউনিক বিজনেসের আইডিয়া এসেছে। সেই আইডিয়ার উপর ভিত্তি করে - উনাকে যেন একটা বিজন্যাস প্লান বানাতে সাহায্য করি। কিন্তু শর্ত একটা- এই আইডিয়া অন্য কারো সাথে শেয়ার করা যাবেনা। উনি এতো বেশি শংকিত- একটা নন ডিসক্লোজার এগ্রিম্যান্ট কাগজে সই করিয়ে নিলেন। যাতে নিশ্চিত হতে পারেন- এই আইডিয়া যেন কারো সাথে শেয়ার না হয়। আমাকে বললেন- একেবারে যখন সব প্রস্তুতি শেষ হবে, তিনি পূর্ণ ভাবে মনস্থির করতে পারবেন- ঠিক তখনই তার আইডিয়ার কথাটি বলবেন।
জীবন , সংসারের নানা ব্যস্ততায়- আজ, কাল, পরশু হবে এমন করে শুধু সপ্তাহ না, মাস চলে গেছে। উনার আইডিয়া উনার মাথায় রয়ে গেছে।
প্রায় বছর পর, এবার সিরিয়াসলি বসলেন। কাজ শুরু করে দিবেন। পূর্ণ প্রস্তুতি শেষ। আমাকে আইডিয়ার কথাটি বললেন।
আমি বললাম- খুবই চমৎকার। কিন্তু আপনার প্রায় দুবছর দেরি হয়ে গেছে।
আপনি যে আইডিয়া এতোদিন মাথার ভিতর পুষে রেখেছিলেন- এই যে দেখুন। গত এক বছরে অন্যরা এই বিজন্যাস অলরেডি দাঁড় করিয়ে ফেলেছে।
ভাই- একেবার হিমশীতল বরফ হয়ে গেলেন। এটা কিভাবে সম্ভব হলো।
আমি বললাম-সবই সম্ভব। মনে করবেন না যে, একটা আইডিয়া শুধু একজনের মাথায় আসে। হাজার হাজার মানুষের মাঝে প্রতি মুহুর্তে নানা এঙ্গেলে নানা আইডিয়া ধরা দেয়।
মার্কজুকার বার্গ তার ফেসবুক এক্সিকিউট করার আগে আরো কমপক্ষে বিশজন মানুষ তার আইডিয়া নিয়ে কাজ করতে চেয়েছে। জ্যাক ডরসির টুইটার, ইলন মাস্কের ইলেকট্রিক কার এসব কিছু নিয়ে মানুষ নানা সময়ে নানা চিন্তা ভাবনা করেছে। কিন্তু কেউ বোল্ড হয়ে শুরু করে আর কেউ কোল্ড হয়ে ব্রেণের মাঝে পোষে রাখে।
আইডিয়া ছোট ছোট টুকরো হয়েই মানুষের মাথায় আসে। কিন্তু যে সাহস নিয়ে এগিয়ে যায়- সেই কেবল তা জোড়া লাগাতে পারে।
Arif Mahmud
20/02/2023
আপনার চাহিদার গুণগত মান নিশ্চিত করতে আমরা আছি আপনার পাশে ।
আমাদের প্রতিষ্ঠানে আপনাকে স্বাগতম।
25/07/2022
বাংলাদেশের এত দুঃখ কিসে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক জরিপকারী সংস্থা গ্যালাপ মানসিক চাপ, অবসাদ, ক্রোধ, শারীরিক ব্যথা প্রভৃতি বিষয়ে জরিপ করে বিশ্....
20/07/2022
আতিক উল্লাহ হাফিজাহুল্লাহ
কুরআন বোঝার মূলনীতি (প্রথম পর্ব)
বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম
--
যে কোনও শাস্ত্র বোঝার জন্যে কিছু পরিভাষা জানা প্রয়োজন। কোনও বই পড়ার আগে, লেখকের উদ্দেশ্য ও রীতিনীতি সম্পর্কে ধারনা থাকা জরুরী। তাহলে শাস্ত্র অধ্যয়ন বা বইপাঠ ফলপ্রসূ হয়। কুরআন কারীম বোঝার জন্যেও কিছু পরিভাষা জানা থাকা ভালো।
আমরা একে একে ১৬-টি পরিভাষা (اصطلاح) বলবো। পরিভাষাগুলো ভালো করে জানা থাকলে, পরবর্তী আলোচনাগুলো বোঝা সহজ হয়ে যাবে। আর হাঁ, পরিভাষাগুলো মাদরাসা পড়ুয়াদের জন্যে। অন্যদের বুঝতে হয়তো কষ্ট হবে। চেষ্টা করবো যাতে সবাই বুঝতে পারে। সহজ ভাষায় বলার জন্যে পাক্কা তিন বছর অপেক্ষা করেছি। নইলে, পরিভাষাগুলো আরও তিন বছর আগে বলার জন্যে বসেছিলাম। তিন বছর আগে, লিখতে বসে দেখলাম সহজ করে বলতে পারছি না, তাই ক্ষান্ত হয়েছিলাম। এবারও যে পারছি, তা নয়। কিন্তু আর অপেক্ষা করা সম্ভব নয়। নেমে পড়ি। আল্লাহ তা‘আলাই আসান করে দেবেন। ইনশাআল্লাহ।
১: ১: দাওয়া (دعوى)
প্রতিটি সূরার এক বা একাধিক মূল আলোচ্য বিষয় থাকে। এটাকে ‘দাওয়া’ বা সূরার মাওদু (موضوع) মানে সূরার মারকাযী মাযমুন (مركزي مضمون) বলা হয়। এই মারকাযী মাযমুন (মূল আলোচ্যবিষয়)-ই সূরার কেন্দ্রবিন্দু (محور)। সূরার সমস্ত আলোচ্যবিষয় ‘মারকাযী মাযমূন’কে ঘিরে আবর্তিত হয়।
এর উদাহরণ বীজের মতো। গাছের প্রতিটি শাখা প্রশাখা, পত্র-পল্লবে বীজের প্রভাব বিদ্যমান থাকে। এ-কারণে এক জাতের গাছ আরেক জাতের গাছ থেকে ভিন্ন হয়ে থাকে। প্রতিটি সূরার ‘দাওয়া’ বা মারকাযী মাযমুনও বীজের মতো। সূরার প্রতিটি আয়াতে, ‘দাওয়ার’ প্রভাব বিদ্যমান থাকে।
সূরা বাকারার মূল দাওয়া বা মারকাযী মাযমুন হল ‘তাওহীদের আহ্বান’। সেটা এই আয়াতের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে,
يَا أَيُّهَا النَّاسُ اعْبُدُوا رَبَّكُمُ
হে মানুষ! তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের ইবাদত কর (বাকারা ২১)।
.
আল্লাহর ইবাদত করতে বলা হয়েছে। তাওহীদের দাওয়াত দেয়া হয়েছে। সূরা বাকারার প্রতিটি আয়াতই
কোনও না কোনওভাবে এই দাওয়া বা মারকাযী মাযমূনের সাথে সম্পৃক্ত। প্রতিটি আয়াতই কোনও না কোনওভাবে তাওহীদের দাওয়াতের সাথে জড়িত।
আলকুরআন বোঝার মূলনীতি: ২
আল্লাহ তা‘আলা কুরআন কারীমে, তাওহীদ বোঝানোর জন্যে প্রতিটি সূরায় এক বা একাধিক দাবী উপস্থাপন করেছেন। শুধু দাবিই করেননি, সাথে সাথে দলীলও পেশ করেছেন। আমাদের দ্বিতীয় পরিভাষার নাম
২: ‘দলীল’ (دليل)।
যে বক্তব্য দ্বারা উত্থাপিত দাবীর সত্যতা প্রমাণ করা হয়, তাকে দলীল বলা হয়।
দাওয়া বা দাবীকে প্রতিষ্ঠা করার জন্যে, আল্লাহ তা‘আলা কুরআন কারীমে তিন প্রকারের দলীল পেশ করেছেন।
১: আকলী (عقلي)। বৃদ্ধিবৃত্তিক।
২: নকলী (نقلي)। উদ্ধৃতি বা বর্ণনামূলক।
৩: ওহী (وحي)। আল্লাহর পক্ষ থেকে।
.
আকলী দলীল দুই প্রকার:
ক: নিখাদ বুদ্ধিবৃত্তিক (عقلي محضة) দলীল।
সুস্থ যুক্তিবোধ দলীলটা শুনেই মেনে নেয়। বাড়তি মৌখিক স্বীকৃতির প্রয়োজন হয় না। দাবি ছিল,
يَا أَيُّهَا النَّاسُ اعْبُدُوا رَبَّكُمُ
হে মানুষ! তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের ইবাদত করো,
الَّذِي خَلَقَكُمْ وَالَّذِينَ مِن قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ
যিনি সৃষ্টি করেছেন তোমাদেরকে এবং তোমাদের পূর্বে যারা গত হয়েছে তাদেরকে, যাতে তোমরা মুত্তাকী হয়ে যাও (বাকারা ২১)।
কেন ইবাদত করবে? তার স্বপক্ষে বুদ্ধিবৃত্তিক দলীল দেয়া হয়েছে। তিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন আরও অনেক কিছু করেছেন, তার এবাদত কেন করবে না?
এই দলীলে প্রতিপক্ষ থেকে স্বীকারোক্তি আদায় করা হয়নি। জানা কথা, স্বীকারোক্তি আদায় করার দরকার নেই। প্রতিপক্ষ এই দলীলকে মেনে নেবেই।
.
খ: প্রতিপক্ষের স্বীকারোক্তিমূলক বুদ্ধিবৃত্তিক ( عقلي مع اعتراف الخصم) দলীল।
সুস্থ যুক্তিবোধ দলীলটা শুনেই মেনে নেয়, পাশাপাশি (প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ) স্বীকারোক্তিও দেয়।
দলীলটা অবিশ্বাসী বিপক্ষের সামনে প্রশ্নাকারে পেশ করা হয়। দলীল শোনার পর বিপক্ষের মেনে নেয়ার ভঙ্গি দেখে, প্রশ্নের উত্তরও সাথে সাথে বলে দেয়া হয়।
قُلْ مَن يَرْزُقُكُم مِّنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ أَمَّن يَمْلِكُ السَّمْعَ وَالْأَبْصَارَ وَمَن يُخْرِجُ الْحَيَّ مِنَ الْمَيِّتِ وَيُخْرِجُ الْمَيِّتَ مِنَ الْحَيِّ وَمَن يُدَبِّرُ الْأَمْرَ ۚ
(হে নবী! মুশরিকদেরকে বলে দিন, কে তোমাদেরকে আসমান ও যমীন থেকে রিযক সরবরাহ করেন? অথবা কে শ্রবণ ও দৃষ্টিশক্তির মালিক? এবং কে মৃত হতে জীবিতকে এবং জীবিত থেকে মৃতকে বের করেন? এবং কে যাবতীয় বিষয় নিয়ন্ত্রণ করেন? এবং কে যাবতীয় বিষয় নিয়ন্ত্রণ করেন?
প্রশ্নের আঙ্গিকে বুদ্ধিবৃত্তিক দলীল পেশ করা হয়েছে। তারা উত্তর না দিয়ে থাকতে পারেনি। স্বীকার করে বসেছে।
فَسَيَقُولُونَ اللَّهُ ۚ فَقُلْ أَفَلَا تَتَّقُونَ
তারা বলবে, আল্লাহ! বলুন, তবুও কি তোমরা আল্লাহকে ভয় করবে না? (ইউনুস ৩১)।
.
নকলী দলীল ৭ প্রকার:
১: নবীগন থেকে নকল।
তাওহীদের দাওয়াত পেশ করার পর, দাবীকে সুদৃঢ় করার জন্যে, কোনও উদ্ধৃতি বা ঘটনা বর্ণনা করা। বোঝানোর জন্যে, তাওহীদের এমন দাবী আমিই প্রথম তুলিনি, আমার আগে আরও জাতি ও ব্যক্তিও এই তাওহীদে বিশ্বাস স্থাপন করে গেছেন। তাওহীদের দাওয়াত দিয়ে গেছেন।
.
এটা দুই প্রকার
ক: সংক্ষিপ্ত (إجمالي)।
দলীলে সুনির্দিষ্ট কোনও নবীর নাম উল্লেখ না করে, তাদের কথা বা অবস্থা বর্ণনা করা।
وَمَا أَرْسَلْنَا مِن قَبْلِكَ مِن رَّسُولٍ إِلَّا نُوحِي إِلَيْهِ أَنَّهُ
আমি আপনার পূর্বে এমন কোনও রাসূল পাঠাইনি, যার প্রতি আমি এই ওহী নাযিল করিনি যে,
لَا إِلَٰهَ إِلَّا أَنَا فَاعْبُدُونِ
‘আমি ছাড়া অন্য কোনও মাবুদ নেই। সুতরাং আমারই ইবাদত করুন (আম্বিয়া ২৫)।
প্রতিটি নবীই একথার দাওয়াত দিয়ে গেছেন।
.
খ: বিস্তারিত (تفصيلي)।
নবী বা নবীগণের নাম উল্লেখ করে উক্তি বা অবস্থা বর্ণনা করা হবে।
وَإِلَىٰ عَادٍ أَخَاهُمْ هُودًا ۗ قَالَ يَا قَوْمِ
আর আদ জাতির কাছে আমি তাদের ভাই হুদকে (পাঠাই)। সে বলল, হে আমার কওম!
اعْبُدُوا اللَّهَ مَا لَكُم مِّنْ إِلَٰهٍ غَيْرُهُ ۚ أَفَلَا تَتَّقُونَ
আল্লাহর ইবাদত কর। তিনি ছাড়া তোমাদের কোনও মাবুদ নেই। তবুও কি তোমরা (আল্লাহকে) ভয় করবে না? (আ‘রাফ ৬৫)।
.
সুনির্দিষ্ট একজন নবীর বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে। তার দাওয়াতে তাওহীদের ‘বাক্য’ তুলে ধরা হয়েছে।
.
২: পূর্ববর্তী কিতাব থেকে নকল।
وَآتَيْنَا مُوسَى الْكِتَابَ وَجَعَلْنَاهُ هُدًى لِّبَنِي إِسْرَائِيلَ
এবং আমি মুসাকে কিতাব দিয়েছিলাম, এবং তাকে বনী ইসরায়েলের জন্যে হিদায়াতের মাধ্যম বানিয়েছিলাম। আদেশ করেছিলাম,
أَلَّا تَتَّخِذُوا مِن دُونِي وَكِيلًا
তোমরা আমার পরিবর্তে অন্য কাউকে কর্মবিধায়করূপে গ্রহণ করো না (ইসরা ২)।
তাওরাত থেকে উদ্ধৃতি পেশ করা হয়েছে।
.
৩: পূর্ববর্তী কিতাবের অনুসারীদের থেকে।
الَّذِينَ آتَيْنَاهُمُ الْكِتَابَ يَتْلُونَهُ حَقَّ تِلَاوَتِهِ أُولَٰئِكَ يُؤْمِنُونَ بِهِ ۗ وَمَن يَكْفُرْ بِهِ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الْخَاسِرُونَ
যাদেরকে আমি কিতাব দিয়েছি তারা যখন তা তিলাওয়াত করে, যেভাবে তিলাওয়াত করা উচিত, তখন তারাই তার প্রতি (প্রকৃত) ঈমান রাখে। আর যারা তা অস্বীকার করে, তারাই ক্ষতিগ্রস্ত লোক (বাকারাহ ১২১)।
.
আগে যত জাতিকে কিতাব দেয়া হয়েছিল, তাদের অনেকেই তার তিলাওয়াত করত। এবং কিতাবে বর্ণিত ‘তাওহীদে’ বিশ^াস করত।
.
৪: ফিরিশতা থেকে।
فَادْعُوا اللَّهَ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ
সুতরাং ( হে মানুষ!) তোমরা আল্লাহকে ডাক তার জন্যে আনুগত্যে একনিষ্ঠ হয়ে (গাফের ১৪)।
.
এটা ছিল তাওহীদের স্বপক্ষে ‘দাওয়া’। ফিরিশতারাও আল্লাহর তাওহীদে বিশ্বাস স্থাপন করে, তার ইবাদত করে। তার কাছে দু‘আ করে।
الَّذِينَ يَحْمِلُونَ الْعَرْشَ وَمَنْ حَوْلَهُ يُسَبِّحُونَ بِحَمْدِ رَبِّهِمْ وَيُؤْمِنُونَ بِهِ وَيَسْتَغْفِرُونَ لِلَّذِينَ آمَنُوا
যারা (অর্থাৎ যে ফেরেশতাগণ) আরশ ধারণ করে আছে এবং যারা তার চারপাশে আছে, তারা তাদের প্রতিপালকের প্রশংসার সাথে তাঁর তাসবীহ পাঠ করে ও তাঁর প্রতি ঈমান রাখে এবং যারা ঈমান এনেছে তাদের জন্যে মাগফিরাতের দু‘আ করে (যে,)
رَبَّنَا وَسِعْتَ كُلَّ شَيْءٍ رَّحْمَةً وَعِلْمًا فَاغْفِرْ لِلَّذِينَ تَابُوا وَاتَّبَعُوا سَبِيلَكَ وَقِهِمْ عَذَابَ الْجَحِيمِ
হে আমাদের প্রতিপালক! আপনার রহমত ও জ্ঞান সমস্ত কিছু জুড়ে ব্যাপ্ত। সুতরাং যারা তাওবা করেছে ও আপনার পথের অনুসারী হয়েছে, তাদেরকে ক্ষমা করে দিন এবং তাদেরকে জাহান্নামের আযাব থেকে রক্ষা করুন (গাফের ৭)।
.
ফিরিশতাদের এই দু‘আর দিকে লক্ষ্য করলেই বোঝা যায়, তারাও আকীদায়ে তাওহীদে বিশ^াস করে। না হলে, তারা আল্লাহর কাছে দু‘আ করবে কেন?
হে মুশরিকরা! দেখেছ, ফিরিশতারাও তাওহীদে বিশ^াস করে? আর তোমরা তাদেরকে আল্লাহর ‘কন্যা’ ঠাউরে বসে আছো?
.
৫: জি¦ন থেকে।
قُلْ أُوحِيَ إِلَيَّ أَنَّهُ اسْتَمَعَ نَفَرٌ مِّنَ الْجِنِّ فَقَالُوا
(হে রাসূল!) বলে দিন, আমার কাছে ওহী এসেছে যে, জিনদের একটি দল মনোযোগ সহকারে (কুরআন) শুনেছে অতঃপর (নিজ সম্প্রদায়ের কাছে গিয়ে) বলেছে,
إِنَّا سَمِعْنَا قُرْآنًا عَجَبًا يَهْدِي إِلَى الرُّشْدِ فَآمَنَّا بِهِ ۖ
আমরা এক বিস্ময়কর কুরআন শুনেছি। যা সঠিক পথ প্রদর্শন করে। সুতরাং আমরা তার প্রতি ঈমান এনেছি।
.
কুরআন শুনেই তারা তাওহীদের দাওয়াত পেয়ে গেছে। সাথে সাথে তাওহীদে বিশ^াস স্থাপন করে ফেলেছে। দৃঢ়ভাবে ঘোষণা দিয়েছে,
وَلَن نُّشْرِكَ بِرَبِّنَا أَحَدًا
এখন আর আমরা আমাদের প্রতিপালকের সাথে (ইবাদতে) কখনও কাউকে শরীক করব না (জি¦ন ১-২)।
.
৬: পাখি থেকে।
وَتَفَقَّدَ الطَّيْرَ فَقَالَ مَا لِيَ لَا أَرَى الْهُدْهُدَ أَمْ كَانَ مِنَ الْغَائِبِينَ لَأُعَذِّبَنَّهُ عَذَابًا شَدِيدًا أَوْ لَأَذْبَحَنَّهُ أَوْ لَيَأْتِيَنِّي بِسُلْطَانٍ مُّبِينٍ فَمَكَثَ غَيْرَ بَعِيدٍ فَقَالَ أَحَطتُ بِمَا لَمْ تُحِطْ بِهِ وَجِئْتُكَ مِن سَبَإٍ بِنَبَإٍ يَقِينٍ إِنِّي وَجَدتُّ امْرَأَةً تَمْلِكُهُمْ وَأُوتِيَتْ مِن كُلِّ شَيْءٍ وَلَهَا عَرْشٌ عَظِيمٌ
এবং সে (সুলাইমান একবার) পাখিদের সন্ধান নিলেন। বললেন, কী ব্যাপার! হুদহুদকে দেখছি না যে? সে কি অনুপস্থিত না কি? আমি তাকে কঠিন শাস্তি দেব অথবা তাকে যবাহ করে ফেলব- যদি না সে আমার কাছে স্পষ্ট কোনও কারণ দর্শায়। তারপর হুদহুদ বেশি দেরি করল না এবং (এসে) বলল, আমি এমন বিষয় জেনেছি, যা আপনার জানা নেই। আমি আপনার কাছে ‘সাবা’ দেশ থেকে নিশ্চিত সংবাদ দিয়ে এসেছি। আমি সেখানে এক নারীকে সেখানকার লোকদের উপর রাজত্ব করতে দেখেছি। তাকে সর্বপ্রকার আসবাব-উপকরণ দেওয়া হয়েছে। আর তার একটি বিরাট সিংহাসনও আছে।
.
তাদের শিরকের ব্যাপারটাও হুদহুদ বিশেষভাবে লক্ষ্য করেছে,
وَجَدتُّهَا وَقَوْمَهَا يَسْجُدُونَ لِلشَّمْسِ مِن دُونِ اللَّهِ
আমি সেই নারী ও তার সম্প্রদায়কে দেখেছি আল্লাহর পরিবর্তে সূর্যের সিজদা করছে।
.
হুদহুদ তাদের শিরকে লিপ্ত হওয়ার কারণটাও ধরে ফেলেছে,
وَزَيَّنَ لَهُمُ الشَّيْطَانُ أَعْمَالَهُمْ فَصَدَّهُمْ عَنِ السَّبِيلِ فَهُمْ لَا يَهْتَدُونَ
শয়তান তাদের কাছে, তাদের কার্যকলাপকে শোভনীয় করে দেখিয়েছে। এভাবে সে তাদেরকে সঠিক পথ থেকে নিবৃত্ত রেখেছে, ফলে তারা হেদায়াত পাচ্ছে না।
.
শুধু আল্লাহকেই কেন সিজদা করব? তার স্বপক্ষে হুদহুদ চমৎকার কারণ উল্লেখ করেছে!
أَلَّا يَسْجُدُوا لِلَّهِ الَّذِي يُخْرِجُ الْخَبْءَ فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَيَعْلَمُ مَا تُخْفُونَ وَمَا تُعْلِنُونَ
(সে তাদেরকে নিবৃত্ত রেখেছে), যাতে তারা সিজদা না করে আল্লাহকে, যিনি আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর গুপ্ত বিষয়াবলী প্রকাশ করেন এবং তোমরা যা গোপন কর ও যা প্রকাশ কর সবই জানেন (নামল ২০-২৫)।
.
যিনি সবকিছু জানেন, একমাত্র তার ইবাদত করবে না-ই-বা কেন?
.
৭: কীট-পতঙ্গ থেকে।
وَحُشِرَ لِسُلَيْمَانَ جُنُودُهُ مِنَ الْجِنِّ وَالْإِنسِ وَالطَّيْرِ فَهُمْ يُوزَعُونَ حَتَّىٰ إِذَا أَتَوْا عَلَىٰ وَادِ النَّمْلِ قَالَتْ نَمْلَةٌ يَا أَيُّهَا النَّمْلُ ادْخُلُوا مَسَاكِنَكُمْ لَا يَحْطِمَنَّكُمْ سُلَيْمَانُ وَجُنُودُهُ
সুলাইমানের জন্যে তার সৈন্য সমবেত করা হয়েছিল যা ছিল জিন, মানুষ ও পাখি-সম্বলিত। তাদেরকে রাখা হত নিয়ন্ত্রণে। একদিন যখন তারা পিঁপড়ের উপত্যকায় পৌঁছল, তখন এক পিঁপড়ে বলল, ওহে পিঁপড়েরা! নিজ ঘরে ঢুকে পড়, পাছে সুলাইমান ও তার সৈন্যরা তাদের অজ্ঞাতসারে তোমাদেরকে পিষে ফেলে (নামল ১৭-১৮)।
.
এখানে পিঁপড়া কোথায় তাওহীদের স্বপক্ষে দলীল দিল? আয়াতের একেবারে শেষে আছে,
وَهُمْ لَا يَشْعُرُونَ
তারা টেরও পাবে না।
পিঁপড়া বোঝাতে চেয়েছে, গাইবের জ্ঞান একমাত্র আল্লাহ তা‘আলাই জানেন। সুলাইমান নবী হলেও, গাইবের জ্ঞান রাখে না। শুধু সুলাইমান কেন, গাইবের জ্ঞান আল্লাহর ছাড়া আর কারো কাছেই নেই। এটাই ‘আকীদায়ে তাওহীদ’।
.
৩: ওহীর দলীল (دليل وحي)।
দাওয়া ও দাওয়ার স্বপক্ষে দলীল পেশ করার সাথে সাথে নবীজি সা. এও বলে দেন, আমি যা বলছি, নিজের থেকে বলছি না। আল্লাহর পক্ষ থেকে ওহীর মাধ্যমে এটা বলার আদেশ করা হয়েছে বলেই বলছি।
قُلْ إِنِّي نُهِيتُ أَنْ أَعْبُدَ الَّذِينَ تَدْعُونَ مِن دُونِ اللَّهِ لَمَّا جَاءَنِيَ الْبَيِّنَاتُ مِن رَّبِّي وَأُمِرْتُ أَنْ أُسْلِمَ لِرَبِّ الْعَالَمِينَ
غافر ৬৬
(হে রাসূল! কাফেরদেরকে) বলে দিন, তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে যাদেরকে ডাক তাদের ইবাদত করতে নিষেধ করে দেওয়া হয়েছে যখন আমার কাছে আমার প্রতিপালকের পক্ষ হতে সুস্পষ্ট নিদর্শনাবলী এসে গেছে। আর আমাকে আদেশ করা হয়েছে, আমি যেন জগতসমূহের প্রতিপালকের সামনে আনুগত্য স্বীকার করি (গাফের ৬৬)।
.
আল্লাহর রাসূল বলছেন, আমি একমাত্র আল্লাহরই ইবাদত করতে বাধ্য। কারণ, আল্লাহ তা‘আলা ওহীর মাধ্যমে, আমাকে এর ব্যতিক্রম করতে নিষেধ করেছেন।
.
.
কুরআন কারীমে তাওহীদের দাবীকে তিন প্রকার দলীল দ্বারাই প্রমাণ করা হয়েছে। তাওহীদকে অস্বীকার করার কোনও উপায়ই খোলা রাখা হয়নি। শিরকের যাবতীয় সম্ভবনাকে সমূলে উৎপাটন করা হয়েছে। তিন প্রকার দলীল পেশ করার উদ্দেশ্য ভিন্ন,
১: আকলী দলীল পেশ করা হয় যাতে, সুস্থ চিন্তা ও সুস্থ যুক্তিবোধ সহজেই তাওহীদ বুঝতে সক্ষম হয়। কুরআন কারীমের ‘আকলী দলীলগুলো’ সাধারণত অত্যন্ত সহজবোধ্য হয়ে থাকে। যেই শুনবে, সাথে সাথে, মেনে নিতে বাধ্য হবে, তাই তো! তিনি রাব্ব না হয়ে আর কে হবেন?
২: দলীলে নকলী: পেশ করা হয় যাতে বোঝা যায়, তাওহীদের দাওয়াত শুধু আমাদের নবীজি সা.-ই দেননি, পূর্বেকার সমস্ত নবী-রাসূলও তাওহীদের দাওয়াত দিয়েছেন।
৩: দলীলে ওহী পেশ করা হয় একটা প্রশ্নের উত্তর দেয়ার জন্যে। তাওহীদের দাওয়াত অস্বীকারকারীরা আপত্তি তোলে,
-দুনিয়াতে আরও কত বিষয় আছে, কত কিছু আছে, সেসব ফেলে তুমি শুধু এই ‘তাওহীদ’ নিয়ে পড়ে আছ কেন? চলো, আমাদেরকে অন্য কিছু শোনাও!
এর জবাবেই বলা হয়,
-আমি তাওহীদের দাওয়াত নিজ থেকে দিচ্ছি না। আমাকে ওহীর মাধ্যমে নির্দেশ দেয়া হয়েছে বলেই তাওহীদের দাওয়াতে নিজেকে নিয়োজিত করেছি।
.
.
আমাদের দ্বিতীয় পরিভাষা (এস্তেলাহটি) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই পরিভাষাটি বুঝতে পারলে, কুরআন কারীমের অসংখ্য আয়াত পরিষ্কার হয়ে যাবে। ইনশাআল্লাহ।
কুরআন বোঝার মূলনীতি: ৩
দাবীকে আলোকিতকরণ (تَنوِيرِ دَعْوَى)।
.
যারা তাওহীদের দাওয়াকে অস্বীকার করে, তাদের সামনে ‘দাওয়ার’ কিছু অংশ উপস্থাপন করা হয়। ওটুকু মেনে নিলে, দাওয়ার বাকি অংশ উল্লেখ করা হয়। ভাবটা এমন, আগেরটা যেহেতু মেনেছ, এটুকুও মেনে নাও! উভয়টা এক কথাই তো!
وَلَئِن سَأَلْتَهُم مَّنْ خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ
আপনি যদি তাদেরকে (মুশরিকদেরকে) জিজ্ঞেস করেন, আকাশম-লী ও পৃথিবী কে সৃষ্টি করেছে?
.
তারা একবাক্যে উত্তর দিয়েছে,
لَيَقُولُنَّ خَلَقَهُنَّ الْعَزِيزُ الْعَلِيمُ
তবে তারা অবশ্যই বলবে, এগুলো সৃষ্টি করেছেন সেই পরাক্রমশালী, সর্বজ্ঞ (আল্লাহ)।
স্বীকারোক্তি আদায় করার পর, সামনে বাড়া হচ্ছে! একমাত্র আল্লাহরই ইবাদত করতে হবে। তোমরা তাকে পরাক্রমশালী সর্বজ্ঞ বলে বিশ^াস করছ! তিনি তো এমন,
الَّذِي جَعَلَ لَكُمُ الْأَرْضَ مَهْدًا وَجَعَلَ لَكُمْ فِيهَا سُبُلًا لَّعَلَّكُمْ تَهْتَدُونَ وَالَّذِي نَزَّلَ مِنَ السَّمَاءِ مَاءً بِقَدَرٍ فَأَنشَرْنَا بِهِ بَلْدَةً مَّيْتًا ۚ كَذَٰلِكَ تُخْرَجُونَ وَالَّذِي خَلَقَ الْأَزْوَاجَ كُلَّهَا وَجَعَلَ لَكُم مِّنَ الْفُلْكِ وَالْأَنْعَامِ مَا تَرْكَبُونَ
যিনি তোমাদের জন্যে ভূমিকে বানিয়েছেন বিছানা এবং তোমাদের জন্যে তাতে বিভিন্ন পথ সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা গন্তব্যস্থলে পৌঁছতে পার। যিনি আসমান থেকে বারি বর্ষণ করেন পরিমিতভাবে। তারপর আমি তার মাধ্যমে এক মৃত অঞ্চলকে নতুন জীবন দান করি। এভাবেই তোমাদেরকে (কবর থেকে) বের করে নতুন জীবন দান করা হবে (যুখরুফ ৯-১১)।
.
তিনি আসমান ও যমীনের স্রষ্টা, এটা যখন মানো বাকিটুকুও তাহলে মেনে নাও!
.
কখনো এমন হয়, একটা মাসয়ালা বর্ণনা করার পর, সে মাসয়ালার কোনও অংশকে আরেকটু বেশি স্পষ্ট করার জন্যে বাড়তি আলোচনার অবতারণা করা হয়। অথবা সে মাসয়ালা থেকে উদ্ভূত সন্দেহকে দূর করার জন্যেও পরে নতুন করে আলোচনা করা হয়। এটাও একপ্রকার ‘তানভীর’।
সূরা নিসার ১২৭-তম আয়াতে তানভীর করা হয়েছে তৃতীয় আয়াতের।
কুরআন বোঝার মূলনীতি: ৪
ভীতি প্রদর্শন (تَخْوِيْف)।
.
দাওয়ায়ে তাওহীদ মানানোর জন্যে, অথবা কেউ তাওহীদ মানতে না চাইলে, আল্লাহ তা‘আলা আযাবের ভয় দেখান। এটাই ‘তাখভীফ’।
.
দুই প্রকার
১: দুনিয়াবি ভীতি প্রদর্শন (تخويف دُنْيُوِي)।
ভীতি প্রদর্শনটা দুনিয়া সম্পর্কিত হবে।
وَكَمْ أَهْلَكْنَا قَبْلَهُم مِّن قَرْنٍ هَلْ تُحِسُّ مِنْهُم مِّنْ أَحَدٍ أَوْ تَسْمَعُ لَهُمْ رِكْزًا
مريم ৯৮
তাদের আগে আমি কত মানব-গোষ্ঠীকেই ধ্বংস করেছি। আপনি কি হাতড়িয়েও তাদের কারও সন্ধান পান কিংবা আপনি কি তাদের কোনও সাড়া শব্দ শুনতে পান? (মারয়াম ৯)।
২: আখেরাতের ভীতি প্রদর্শন (تَخْوِيْف أُخْرُوِيْ)।
ভীতি প্রদর্শনটা আখেরাত সম্পর্কিত হবে।
وَنَسُوقُ الْمُجْرِمِينَ إِلَىٰ جَهَنَّمَ وِرْدًا
مريم ৮৬
আর অপরাধীদেরকে পিপাসার্ত অবস্থায় হাঁকিয়ে জাহান্নামের দিকে নিয়ে যাব (মারয়াম ৮৬)।
.
শাহ ওয়ালি উল্লাহ রহ.
প্রথমটিকে বলেছেন, (تَذْكِيْر بِأيَّامِ الله) আল্লাহর দিনগুলো সম্পর্কে সতর্কীকরণ।
দ্বিতীয়টিকে বলেছেন, (تَذْكِيْر بِما بَعْدَ المَوْت) মৃত্যু পরবর্তী আযাব সম্পর্কে সতর্কীকরণ।
-আলফাওযুল কাবীর।
.
কুরআন কারীমের আখেরাতের আযাব ও পূর্বের জাতিসমূহের ধ্বংস সম্পর্কিত যত আয়াত আছে, সবগুলোকে আমরা এই পরিভাষার আওতায় নিয়ে আসতে পারি।
.
একটা পরিভাষা আরেকটার সাথে সম্পর্কিত। আগের পরিভাষা ছিল, তানভীরে দাওয়া। দলীলের মাধ্যমে দাবীবে দৃঢ়ভাবে প্রমাণ করার পরও যদি তোমরা ‘তাওহীদ’ মানতে রাজি না হও, তাহলে তোমাদের জন্যে ‘আযাব’ (তাখভীফ) দেয়া হবে।
কুরআন বোঝার মূলনীতি: ৫
সুসংবাদদান (تبشير)।
.
তাখভীফের বিপরীতে ‘তাবশীর’। তাওহীদের দাওয়াত যারা মানে, তাদের জন্যে পুরষ্কারের সুসংবাদ প্রদান করা হয়।
.
দুই প্রকার:
১: দুনিয়াবী।
إِذَا جَاءَ نَصْرُ اللَّهِ وَالْفَتْحُ وَرَأَيْتَ النَّاسَ يَدْخُلُونَ فِي دِينِ اللَّهِ أَفْوَاجًا فَسَبِّحْ بِحَمْدِ رَبِّكَ وَاسْتَغْفِرْهُ ۚ إِنَّهُ كَانَ تَوَّابًا
যখন আল্লাহর সাহায্য ও বিজয় আসবে, এবং আপনি মানুষকে দেখবেন দলে দলে আল্লাহর দ্বীনে প্রবেশ করছে, তখন আপনি আপনার প্রতিপালকের প্রশংসাসহ তাঁর পবিত্রতা ঘোষণা করবেন এবং তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করবেন। নিশ্চয়ই তিনি অতি ক্ষমাশীল (নাসর)।
.
দুনিয়াবি সুসংবাদ দেয়া হয়েছে।
.
২: উখরভী (أُخرُوي)।
إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ كَانَتْ لَهُمْ جَنَّاتُ الْفِرْدَوْسِ نُزُلًا
(অপর দিকে) যারা ঈমান এনেছে ও সৎকর্ম করেছে তাদের আপ্যায়নের জন্যে অবশ্যই ফিরদাওসের উদ্যান রয়েছে (মারয়াম ১০৭)।
.
আকীদায়ে তাওহীদ গ্রহণ করার পরিণতি হিশেবে, আখেরাতের সুসংবাদ দেয়া হয়েছে।
.
উল্লেখ্য,
কুরআন কারীমে দুনিয়াবী সুসংবাদ (تَبْشِير) খুবই কম। দুনিয়া মুমিনের আসল ঠিকানা নয়। মুমিনের আসল ঠিকানা আখেরাত। তাই কুরআন কারীমের বেশির ভাগ জায়গায় প্রত্যক্ষ বা অপত্যক্ষভাবে আখেরাতের আলোচনা। আখেরাতের সুসংবাদ দেয়া হয়েছে। দুনিয়ার প্রাপ্তিকে খুব একটা গুরুত্ব দেয়া হয়নি।
.
দুনিয়ার রাজা-বাদশারা তাদের অনুগত প্রজাকে পুরষ্কৃত করে। বিদ্রোহী প্রজাকে তিরষ্কৃত করে। আল্লাহ তা‘আলাও তার অনুগত বান্দাদেরকে পুরষ্কৃত করেন। অবাধ্য বান্দাদেরকে তিরষ্কৃত করেন।
কুরআন বোঝার মূলনীতি: ৬
শাকওয়া (شَكْوى)। অভিযোগ।
দলীল অকাট্য যুক্তি দ্বারা প্রমাণিত হয়ে যাওয়ার পরও, কাফেররা হক মেনে নিতে চায় না। বরং উল্টাপাল্টা কথা বলতে শুরু করে। এ কথাগুলোকেই শাকওয়া বলা হয়।
শাকওয়া সাধারণত শুরু হয় (قالَ) বা (قَالُوا) দিয়ে।
.
দুই প্রকার:
ক: শাকওয়ার সাথে শাকওয়ার জবাবও থাকবে,
وَقَالُوا لَن نُّؤْمِنَ لَكَ حَتَّىٰ تَفْجُرَ لَنَا مِنَ الْأَرْضِ يَنبُوعًا أَوْ تَكُونَ لَكَ جَنَّةٌ مِّن نَّخِيلٍ وَعِنَبٍ فَتُفَجِّرَ الْأَنْهَارَ خِلَالَهَا تَفْجِيرًا أَوْ تُسْقِطَ السَّمَاءَ كَمَا زَعَمْتَ عَلَيْنَا كِسَفًا أَوْ تَأْتِيَ بِاللَّهِ وَالْمَلَائِكَةِ قَبِيلًا أَوْ يَكُونَ لَكَ بَيْتٌ مِّن زُخْرُفٍ أَوْ تَرْقَىٰ فِي السَّمَاءِ وَلَن نُّؤْمِنَ لِرُقِيِّكَ حَتَّىٰ تُنَزِّلَ عَلَيْنَا كِتَابًا نَّقْرَؤُهُ ۗ
তারা বলে, আমরা ততক্ষণ পর্যন্ত তোমার প্রতি ঈমান আনব না, যতক্ষণ না তুমি ভূমি থেকে আমাদের জন্যে এক প্রস্রবণ বের করে দেবে। অথবা তোমার জন্যে খেজুর ও আঙ্গুরের একটি বাগান হয়ে যাবে এবং তুমি তার ফাঁকে ফাঁকে মাটি ফেড়ে নদী-নালা প্রবাহিত করে দেবে। অথবা তুমি যেমন দাবি করে থাক, আকাশকে খন্ডবিখণ্ড করে আমাদের উপর ফেলে দেবে কিংবা আল্লাহ ও ফিরিশতাদেরকে আমাদের সামনা-সামনি দিয়ে আসবে। অথবা তোমার জন্যে একটি সোনার ঘর হয়ে যাবে অথবা তুমি আকাশে আরোহণ করবে, কিন্তু আমরা তোমার আকাশে আরোহণকেও ততক্ষণ পর্যন্ত বিশ্বাস করব না, যতক্ষণ না তুমি আমাদের প্রতি এমন এক কিতাব অবতীর্ণ করবে, যা আমরা পড়তে পারব।
.
এটা ছিল দুষ্ট মুশরিকদের ‘শাকওয়া’ বা অভিযোগমূলক চাহিদার ফিরিস্তি। ছোট্ট একটা বাক্যে তার জবাব দেয়া হয়েছে,
قُلْ سُبْحَانَ رَبِّي هَلْ كُنتُ إِلَّا بَشَرًا رَّسُولًا
(হে নবী!) বলে দিন, আমার প্রতিপালক পবিত্র। আমি তো একজন মানুষ মাত্র, যাকে রাসূল করে পাঠানো হয়েছে (ইসরা ৯০-৯৩)।
.
নবীর কাজ দাওয়াত দেয়া। তোমরা যেসব দাবী তুলেছ, সেসব আঞ্জাম দেয়ার ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহর।
.
খ: শাকওয়ার সাথে জাওয়াব উল্লেখ থাকবে না।
وَقَالُوا قُلُوبُنَا فِي أَكِنَّةٍ مِّمَّا تَدْعُونَا إِلَيْهِ وَفِي آذَانِنَا وَقْرٌ وَمِن بَيْنِنَا وَبَيْنِكَ حِجَابٌ فَاعْمَلْ إِنَّنَا عَامِلُونَ
(রাসূলকে) তারা বলে, তুমি আমাদেরকে যার দিকে ডাকছ, সে বিষয়ে আমাদের অন্তর গিলাফে ঢাকা, আমাদের কান বধির এবং আমাদের ও তোমার মাঝখানে আছে এক অন্তরাল। সুতরাং তুমি আপন কাজ করতে থাক আমরা আমাদের কাজ করছি (ফুসসিলাত ৫)।
.
আরেকটি উদাহরণ দেখি,
وَقَالَ الَّذِينَ كَفَرُوا لَا تَسْمَعُوا لِهَٰذَا الْقُرْآنِ وَالْغَوْا فِيهِ لَعَلَّكُمْ تَغْلِبُونَ
এবং কাফেররা (একে অন্যকে) বলে, এই কুরআন শুনো না এবং এর (পাঠের) মাঝে হট্টগোল কর, যাতে তোমরা জয়ী থাক (ফুসসিলাত ২৬)।
.
দুই আয়াতেই কাফেরদের অভিযোগ বর্ণনা করা হয়েছে। তবে অভিযোগের জবাব দেয়া হয়নি।
কুরআন বোঝার মূলনীতি: ৭
ধমক (زَجْر)।
দুই প্রকার
১: অবিশ্বাসীদেরকে ধমক।
তাওহীদের দাওয়ার অবিশ্বাসীরা অনেক সময় অযৌক্তিক দাবি করে বসে, তারা নানাবিধ গুনাহের কাজে লিপ্ত হয়ে পড়ে। আল্লাহ তখন তাদেরকে ধমক দেন।
فَلَمَّا جَاءَتْهُمْ رُسُلُهُم بِالْبَيِّنَاتِ فَرِحُوا بِمَا عِندَهُم مِّنَ الْعِلْمِ وَحَاقَ بِهِم مَّا كَانُوا بِهِ يَسْتَهْزِئُونَ
সুতরাং তাদের রাসূলগণ যখন তাদের কাছে সুস্পষ্ট নিদর্শনাবলী নিয়ে আসল, তখনও তারা তাদের কাছে যে জ্ঞান ছিল তারই বড়াই করতে লাগল। ফলে তারা যাা নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করত তাই তাদেরকে পরিবেষ্টন করে ফেলল (গাফের ৮৩)।
.
২: নবীগন কখনো, অনুত্তম (خلاف أولي) কাজ করেন। মানে কাজটা গুনাহ নয়, আবার উত্তমতরও নয়। নবীগণ এমন কোনও আচরণ/উচ্চারণ করে ফেললে, আল্লাহর পক্ষ থেকে সতর্কবার্তা আসে। এটাকে তাম্বীহ (تَنْبِيْه) বলা হয়।
قَالَ يَا نُوحُ إِنَّهُ لَيْسَ مِنْ أَهْلِكَ ۖ إِنَّهُ عَمَلٌ غَيْرُ صَالِحٍ ۖ فَلَا تَسْأَلْنِ مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ ۖ إِنِّي أَعِظُكَ أَن تَكُونَ مِنَ الْجَاهِلِينَ
আল্লাহ বললেন, হে নূহ! জেনে রেখ, সে তোমার পরিবারবর্গের অন্তর্ভুক্ত নয়। সে তো অসৎকর্মে কলুষিত। সুতরাং তুমি আমার কাছে এমন কিছু চেও না, যে সম্পর্কে তোমার কোনও জ্ঞান নেই। আমি তোমাকে উপদেশ দিচ্ছি তুমি অজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না (হুদ ৪৬)।
.
নূহ আ. স্বীয় মুশরিক সন্তানের জন্যে আল্লাহর কাছে আবেদন করেছিলেন। এরই প্রেক্ষিতে বলা হয়েছে, মুশরিক সন্তান নবীর পরিবারভুক্ত হয়ে পারে না।
.
عَفَا اللَّهُ عَنكَ لِمَ أَذِنتَ لَهُمْ حَتَّىٰ يَتَبَيَّنَ لَكَ الَّذِينَ صَدَقُوا وَتَعْلَمَ الْكَاذِبِينَ
(হে নবী!) আল্লাহ আপনাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। কারা সত্যবাদী আপনার কাছে স্পষ্ট হওয়া এবং কারা মিথ্যাবাদী তা না জানা পর্যন্ত আপনি তাদেরকে (জিহাদে শরীক না হওয়ার) অনুমতি কেন দিলেন? (তাওবা ৪৩)।
.
মুনাফিকরা যুদ্ধে যাওয়া থেকে বাঁচার জন্যে, মিথ্যা অজুহাত নিয়ে নবীজি সা.-এর এল। নবীজি তাদের অজুহাত গ্রহণ করে যুদ্ধযাত্রা থেকে তাদেরকে অব্যাহতি দিয়ে দিলেন। এজন্য আল্লাহ তা‘আলা নবীজিকে সতর্ক করেছেন।
.
يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ لِمَ تُحَرِّمُ مَا أَحَلَّ اللَّهُ لَكَ ۖ تَبْتَغِي مَرْضَاتَ أَزْوَاجِكَ ۚ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ
হে নবী! আল্লাহ যে জিনিস আপনার জন্যে হালাল করেছেন, আপনি নিজ স্ত্রীদেরকে খুশি করার জন্যে তা হারাম করছেন কেন? আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু (তাহরীম ১)।
.
স্ত্রীদের কারণে, হালাল মধুকে নিজের উপর হারাম করে নিয়েছিলেন নবীজি। আল্লাহ তা‘আলা এজন্য সতর্ক করে দিয়েছেন।
কুরআন বোঝার মূলনীতি: ৮
সান্ত্বনা (تَسْلِيَة)।
.
তাওহীদের দাওয়াত দিতে গিয়ে, কাফেরদের গালি-গালাজ, ঠাট্টা-বিদ্রুপ, নির্যাতন, হয়রনির শিকার হতে হয়েছিল। আল্লাহ তা‘আলা বিভিন্ন আয়াতে এর প্রেক্ষিতে সান্ত্বনা দিয়েছেন।
.
সান্ত্বনার ধরনটা স্বাভাবিক হবে।
وَإِن يُكَذِّبُوكَ فَقَدْ كُذِّبَتْ رُسُلٌ مِّن قَبْلِكَ ۚ
এবং (হে রাসূল!) তারা যদি আপনাকে মিথ্যাবাদী বলে, তবে আপনার পূর্বেও রাসূলগণকে মিথ্যাবাদী বলা হয়েছিল (ফাতির ৪)।
.
নবীজিকে মুশরিকরা মিথ্যাবাদী বলতো। আল্লাহ তা‘আলা এই আয়াতে নবীজি সা.-কে সান্ত্বনা দিয়েছেন। আবার কখনো সান্ত¡না দেয়ার আগে, একটু সতর্কও করে দিয়েছেন,
لَا تَمُدَّنَّ عَيْنَيْكَ إِلَىٰ مَا مَتَّعْنَا بِهِ أَزْوَاجًا مِّنْهُمْ وَلَا تَحْزَنْ عَلَيْهِمْ وَاخْفِضْ جَنَاحَكَ لِلْمُؤْمِنِينَ
আমি তাদের (অর্থাৎ কাফেরদের) বিভিন্ন লোককে মজা লোটার যে উপকরণ দিয়েছি, আপনি তার দিকে চোখ তুলে তাকাবেন না এবং তাদের প্রতি মনোক্ষুন্ন হবেন না। আর যারা ঈমান এনেছে তাদের জন্যে আপনার (বাৎসল্যের) ডানা নামিয়ে দিন (হিজর ৮৮)।
.
প্রথমে একটু সতর্ক করেছেন। তারপর সান্ত্বনাবাক্য শুরু করেছেন।
যারা আকীদার ধারাগুলো, সিফাতের ক্ষেত্রে মতানৈক্য ও এর হাকিকত ইত্যাদি বুঝতে চান তাদের জন্য Abu Midfa Saiful Islam ভাইয়ের এই লেখাটি। এই পুরো লেখাটা এডভান্স লেভেলের হয়েছে। এটা যথার্থভাবে হৃদয়ঙ্গম করার জন্য আকীদার ধারাগুলো, মতানৈক্যের ধরন ও কারণ সম্পর্কে প্রাথমিক জানাশোনা জরুরি। নইলে অনেক কিছু মাথার উপর দিয়ে যাবে। একটা প্রবন্ধে পুরো বিষয়টাকে এতটা সুন্দর করে পয়েন্ট বাই পয়েন্ট আকারে গুছিয়ে উপস্থাপনা করা আর কারো লেখাতে নজর পড়েনি। এসব বিষয় যে অনেক স্পর্শকাতর ও অনেকক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের জন্য বোঝা কষ্টকর তা এই লেখা পড়লেও বুঝবেন। তাহলে তাদের করণীয় কী? তাদের করণীয় এই লেখার প্রথম দুই/তিন প্যারার মোটাদাগের কথাগুলো বিশ্বাস করা। এর বাইরে এত জটিল শাস্ত্রীয় আলোচনা তাদের না জানলেও ক্ষতি নেই।
--------------------------------
আল্লাহ তায়ালার শানে ব্যবহৃত আলফাজে উদ্বউইয়া (অঙ্গ সংশ্লিষ্ট শব্দগুলো) সম্পর্কে কিছু কথা:
এখানে দুটি বিষয়: একটা হচ্ছে আল্লাহ তায়ালার জাত (সত্তা), আরকেটা হচ্ছে আল্লাহ তায়ালার সিফাত (গুণ)। এই উভয় বিষয় সম্পর্কে আমাদের সামগ্রিক বিশ্বাস হচ্ছে,
آمنت بالله كما هو بأسمائه و صفاته و قبلت جميع أحكامه
আমি আল্লাহ তায়ালার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেছি যেমনটি তিনি স্বীয় নাম ও গুণাবলীসহ আছেন এবং আমি তাঁর সকল বিধিবিধান মেনে নিয়েছি।
এটাই আল্লাহ সম্পর্কে আকিদার মূলকথা।
আল্লাহর জাতের বিষয়টা তো খুবই স্পষ্ট। আল্লাহ তায়ালা ওয়াজিবুল ওজুদ, অবশ্যম্ভাবী অস্তিত্বের অধিকারী। তিনি সকলকিছুর সৃষ্টিকর্তা। এককথায় সমস্ত সৃষ্টির স্রষ্টা, মালিক ও প্রতিপালক। তিনি এক, অদ্বিতীয় ও অসমকক্ষ। তিনি অতুলনীয়, অসদৃশ। তাঁর মতো কোন কিছু নেই। তিনি অনাদি-অনন্ত। তাঁর কোন শুরু ও শেষ নেই। তিনি স্থান ও কালের ঊর্ধ্বে। স্থান ও কালকে তিনিই সৃষ্টি করেছেন। যখন কোন কিছুর অস্তিত্ব ছিল না তখনও তিনি ছিলেন৷ আবার যখন কোন কিছুর অস্তিত্ব থাকবে না তখনও তিন থাকবেন৷ তিনি আকার-আকৃতি, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ, সীমা, গন্ডি, দিক, উপকরণ প্রভৃতি জিনিস থেকে মুক্ত। তিনি এক অমুখাপেক্ষী সত্তা। সকল সৃষ্টি তাঁর মুখাপেক্ষী। কিন্তু তিনি কোন কিছুর মুখাপেক্ষী নন। তিনি সৃষ্টির কল্পনার বাহিরে। তিনি তাঁর সম্পর্কে যতটুকু জানিয়েছেন এর বেশি কেউ জানেনা এবং জানা সম্ভবও নয়। আর তাই সৃষ্টির মতো করে তাকে কল্পনা বা অনুধাবন করার চেষ্টা করা ভুল।
আল্লাহর সম্পর্কে এই আকিদা পোষণ করার ব্যাপারে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের অন্তর্ভুক্ত কোন ধারার সালাফদের মাঝেই কোনরুপ মতানৈক্য নেই৷ বরং আল্লাহ তায়ালার জাত সম্পর্কে এই বিশ্বাসগুলোকে মূল ধরেই সকল ধারার সালাফগণ আল্লাহর সিফাতসমূহ গ্রহণ করেছেন। একথার মানে হচ্ছে কোন সত্তার সিফাত বা গুণ কখনও ঐ সত্তার সাথে সাংঘর্ষিক হতে পারে না। সুতরাং আল্লাহ তায়ালার কোন সিফাতও তাঁর জাতের সাথে সাংঘর্ষিক হতে পারবে না, এমনকি আল্লাহর শানে ব্যবহৃত কোন শব্দের অর্থ গ্রহণ করার ক্ষেত্রেও দেখতে হবে তা যেন তাঁর জাতের সাথে সাংঘর্ষিক না হয়। আর তাই সিফাত গ্রহণের ক্ষেত্রে সকলেই আল্লাহ তায়ালার জাতকে বা জাত সম্পর্কে স্বীকৃত আকীদাকে অক্ষুন্ন রাখার চেষ্টা করেছেন।
আর যারাই আল্লাহ তায়ালার জন্য সিফাত সাব্যস্ত করতে গিয়ে তাঁর জাত সম্পর্কে স্বীকৃত আকিদাকে অক্ষুন্ন রাখতে পারেনি বা তাঁর জাতকে প্রশ্নের সম্মুখীন করে ফেলেছে, তারা সকলেই এক্ষেত্রে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআত থেকে বের হয়ে গেছে। বরং তাদের কেউ কেউ তো সিফাত সাব্যস্তকরণের ক্ষেত্রে চরম ভ্রান্তির শিকার হয়ে স্রষ্টাকে সৃষ্টির সাথে মিলিয়ে ফেলেছে। (মাআযাল্লাহ) সকল ভ্রান্ত দলগুলো এর উদাহরণ।
বলছিলাম, আল্লাহ তায়ালার সিফাত সাব্যস্ত করার ক্ষেত্রে সালাফদের সকলের মানহাজ ছিল আল্লাহর জাত সম্পর্কে স্বীকৃত আকিদাকে অক্ষুন্ন রাখা৷ আর সেজন্যই আমরা দেখি যে, আল্লাহ তায়ালার সিফাত সংক্রান্ত আয়াত, হাদিস বা শব্দগুলোর ক্ষেত্রে সালাফদের মধ্যে কোন মতানৈক্যের সৃষ্টি হয়নি। সিফাত সংক্রান্ত শব্দগুলো দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে ঐসকল শব্দ যেগুলোতে আক্ষরিকভাবেই সিফাতের (বিশেষণের) মা'না (অর্থ) রয়েছে। যেমন, শ্রবণ করা, দেখা, জানা, কথা বলা, ইচ্ছা করা, সৃষ্টি করা, অস্তিত্ব দান করা ইত্যাদি। এগুলো এমন শব্দ যেগুলোকে (ব্যাকরণগত ভাবেই) বিশেষণ হিসেবে ব্যবহার করা যায়। মানে আক্ষরিকভাবেই এধরনের শব্দগুলোতে বিশেষণের অর্থ রয়েছে।
এধরনের শব্দগুলো থেকে আল্লাহ তায়ালার জন্য সিফাত সাব্যস্ত করার ক্ষেত্রে সকল ধারার সালাফদের সর্বসম্মত মানহাজ হচ্ছে, ইসবাত মাআত তাফউইজ। অর্থাৎ শব্দের মধ্যে অন্তর্নিহিত সিফাতি (বিশেষণমূলক) অর্থটাকে আক্ষরিক অর্থেই আল্লাহ তায়ালার জন্য সিফাত হিসেবে সাব্যস্ত করা (এটাই হচ্ছে ইসবাত), কিন্তু এর কাইফিয়তের কোন বর্ণনা না দেয়া এবং সৃষ্টির সাথে তুলনা না করা (এটাই হচ্ছে তাফউইজ)। অর্থাৎ, আক্ষরিক সিফাতি অর্থকে সিফাত হিসেবে সাব্যস্ত করে তার কাইফিয়তকে তাফউইজ করা। এজন্য সকল ধারার সকল সালাফদের নিকটই এগুলো কাইফিয়ত জানা ছাড়া আল্লাহ তায়ালার গুণবাচক নাম হিসেবে স্বীকৃত। যেমন,
إِنَّ ٱللَّهَ سَمِیعُۢ بَصِیرࣱ
নিশ্চয়ই আল্লাহ সবকিছু শুনেন সবকিছু দেখেন। (সূরা হজ্জ: ৭৫)
এই আয়াতে শ্রবণ করা ও দেখার কথা এসেছে। তো সালাফদের সকলেই আল্লাহ তায়ালার জন্য শ্রবণ করা ও দেখার সিফাত সাব্যস্ত করেন। কিন্তু সেই শ্রবণ ও দেখার কি পদ্ধতি তা কেউ বলেন না। কোন সৃষ্টির শোনা ও দেখার সাথে তুলনাও করেন না এবং একথাও বলেন না যে, শোনা ও দেখার জন্য আল্লাহর কান বা চোখ আছে।
এখানে শব্দের আক্ষরিক অর্থ গ্রহণ করলে যেহেতু আল্লাহ তায়ালার জাত সম্পর্কে স্বীকৃত আকিদাতে কোন আঘাত আসছে না তাই সকলেই সর্বসম্মতিক্রমে এখানে শব্দের আক্ষরিক অর্থই গ্রহণ করেছেন। কিন্তু কাইফিয়ত বর্ণনা করতে গেলে যেহেতু আল্লাহ তায়ালার জাত সম্পর্কে স্বীকৃত আকিদাকে অক্ষুন্ন রাখা যাচ্ছে না বা জাত সম্পর্কে স্বীকৃত আকিদাকে অক্ষুন্ন রেখে কোন ব্যাখ্যা প্রদান (তাবীল) করাও সম্ভব হচ্ছে না, তাই সকলেই এখানে তাফউইজের নীতি গ্রহণ করেছেন।
এই হিসেবে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের অন্তর্ভুক্ত এমন কোন ধারা পাওয়া যাবে না যেখানে ইসবাত ও তাফউইজের নীতি গৃহীত হয়নি। বরং সর্বসম্মতিক্রমেই এই ক্ষেত্রটিতে সকল ধারাতে ইসবাত ও তাফউইজকে গ্রহণ করা হয়েছে। বুঝা গেল ইসবাত করা ও তাফউইজ করা উভয় নীতিই সকল ধারাতে একটি স্বীকৃত নীতি। এখন সকল ক্ষেত্রে সবাই এদুটোকেই গ্রহণ করবেন, নাকি কোন কোন ক্ষেত্রে তাবীলও করবেন, নাকি দুটোর একটাকে গ্রহণ করবেন, কিংবা দুটোর কোনটাকেই গ্রহণ করবেন না সেটা ভিন্ন কথা৷ ক্ষেত্র অনুপাতে ভিন্নতা আসতেই পারে৷
বাকি থাকলো আল্লাহ তায়ালার শানে ব্যবহৃত আলফাজে উদ্বউইয়া (অঙ্গ সংশ্লিষ্ট শব্দগুলো) সম্পর্কে সালাফদের মানহাজ কি ছিল সেই আলোচনা।
আলফাজে উদ্বউইয়া দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে, এমন শব্দ যেগুলোতে আক্ষরিকভাবে সিফাতের (বিশেষণের) অর্থ নেই। বরং আভিধানিকভাবে সেগুলো অঙ্গপ্রত্যঙ্গের অর্থ বহন করে, অথবা সেগুলোর আক্ষরিক অর্থটি কোন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ, স্থান ও সময়কে আবশ্যক করে। যারকারণে সেই আক্ষরিক অর্থটি আল্লাহ তায়ালার জাত সম্পর্কে স্বীকৃত আকিদার সাথে সাংঘর্ষিক হয়ে যায়৷
আমরা আগেই বলেছি যে, কোন সত্তার সিফাত বা গুণ কখনও ঐ সত্তার সাথে সাংঘর্ষিক হতে পারে না। তাই আল্লাহ তায়ালার কোন সিফাতও তাঁর জাতের সাথে সাংঘর্ষিক হতে পারবে না, এমনকি আল্লাহর শানে ব্যবহৃত কোন শব্দের অর্থ গ্রহণ করার ক্ষেত্রেও দেখতে হবে তা যেন তাঁর জাতের সাথে সাংঘর্ষিক না হয়।
কিন্তু আলফাজে উদ্বউইয়াগুলোর আক্ষরিক অর্থ যেহেতু সরাসরি আল্লাহ তায়ালার জাতের সাথে সাংঘর্ষিক তাই এক্ষেত্রে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের অন্তর্ভুক্ত সকল ধারার সকল সালাফদের সর্বসম্মত মানহাজ হচ্ছে তানযিহ। অর্থাৎ সালাফগণ আলফাজে উদ্বউইয়াগুলোর আক্ষরিক অর্থকে বর্জন করেছেন এবং এক্ষেত্রে কোন ধারার সালাফদের মাঝেই কোন মতানৈক্য নেই। আর যারাই আল্লাহ তায়ালার জন্য এসকল অঙ্গ সংশ্লিষ্ট শব্দগুলোর আক্ষরিক অর্থকে সাব্যস্ত করেছে তারাই আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআত থেকে বের হয়ে গেছে।
বলে রাখা ভালো, আক্ষরিক অর্থ গ্রহণ না করাটাও একধরনের তাবীল। অর্থাৎ যাকে আমরা তানযিহ বলছি সেটাই হচ্ছে "তাবীলে ইজমালী"। এই হিসেবে তাবীলটাও সকল ধারার সকল সালাফদের নিকট একটি সর্বসম্মত নীতি। বাকি সকল ক্ষেত্রে সবাই একই নীতি অনুসরণ করবেন, এটা জরুরী নয়।
সর্বসম্মতিক্রমে আলফাজে উদ্বউইয়াগুলোর আক্ষরিক অর্থকে বর্জন করার পর এই শব্দগুলোর ব্যাপারে কি সিদ্ধান্ত হবে শুধুমাত্র এই পয়েন্টে এসে সালাফদের মাঝে মতানৈক্যের সৃষ্টি হয়েছে৷ এক্ষেত্রে সর্বসম্মতিক্রমে তানযিহের পর মতানৈক্যের পয়েন্টে সালাফগণ তিনটি মানহাজ অনুসরণ করেছেন। যথা:
১. তাফউইজ তথা শব্দের আক্ষরিক অর্থ থেকে আল্লাহকে মুক্ত ঘোষণা করার পর ঐ শব্দটির কি অর্থ হবে সেটা আল্লাহর উপর ন্যস্ত করা। আক্ষরিক অর্থ বাদ দেয়ার পর তাবীল করে অন্য কোন অর্থ গ্রহণ না করা এবং শব্দটিকে আল্লাহ তায়ালার সিফাত হিসেবেও সাব্যস্ত না করা। সুতরাং এখানে দুটি নীতি পাওয়া যাবে। প্রথমে আক্ষরিক অর্থের 'তাবীলে ইজমালি' (যাকে আমরা তানযিহ বলছি), এরপর সেই শব্দের অর্থকে আল্লাহর তায়ালার নিকট 'তাফউইজ' করা।
২. ইসবাত তথা আক্ষরিক অর্থ থেকে আল্লাহকে মুক্ত ঘোষণা করার পর ঐ শব্দটিকে আল্লাহ তায়ালার সিফাত হিসেবে সাব্যস্ত করা। কিন্তু শব্দের আক্ষরিক অর্থ বাদ দেয়ার পর ঐ শব্দের উদ্দেশ্য ও প্রকৃত অর্থ কি হবে, তা আল্লাহর উপর ন্যাস্ত করা। অর্থাৎ একই সাথে এখানে তিনটি নীতিই পাওয়া যাবে। প্রথমে আক্ষরিক অর্থের 'তাবীলে ইজমালি' (তানযিহ), এরপর সেই শব্দকে সিফাত হিসেবে 'ইসবাত' এবং সবশেষে আসল উদ্দেশ্যের 'তাফউইজ'।
৩. তাবীল তথা আক্ষরিক অর্থ থেকে আল্লাহকে মুক্ত ঘোষণা করার পর আরবী ভাষার নিয়ম অনুযায়ী বক্তব্যের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ একটা অর্থ গ্রহণ করা। যেমন, আরবি শব্দ 'ইয়াদ' এর আক্ষরিক অর্থ বর্জন করে ক্ষেত্র অনুযায়ী 'অধিক দানশীল', 'শক্তি' ইত্যাদি অর্থ গ্রহণ করা হয়। একে 'তাবীলে তাফসিলী' বলা হয়৷ এখানে কেবল একটি নীতিই পাওয়া যাবে। প্রথমে তাবীলে ইজমালি এরপর তাবীলে তাফসিলী। ইসবাত ও তাফউইজের নীতি এখানে অনুপস্থিত।
এই তিনটি মতই সালাফদের থেকে প্রমাণিত। আর আমরা আগেই বলেছি যে, তাফউইজ, ইসবাত, তাবীল তিনটি নীতিই আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের সকল ধারার সকল সালাফদের নিকট স্বীকৃত। তবে সবাই সবক্ষেত্রে একই নীতি অনুসরণ করাটা জরুরী নয়। সুতরাং কোন নির্দিষ্ট ধারার সালাফদের জন্য নির্দিষ্ট একটি নীতিকে নির্ধারণ করে দেয়ার সুযোগ নেই (উপরের আলোচনায় আমরা বিষয়টি স্পষ্ট করেছি)। বরং উপরোল্লিখিত মতানৈক্যের পয়েন্টেও কোন নির্দিষ্ট ধারার সালাফগণ সকল ক্ষেত্রে কেবল একটি নীতিই তাদের একমাত্র মানহাজ হিসেবে গ্রহণ করেছেন, এমনটাও নয়।
বাস্তবতা হচ্ছে স্থানভেদে নিজস্ব ইজতিহাদ অনুযায়ী যখন যে নীতিকে উপযুক্ত মনে হয়েছে তখন তারা সে নীতিটিই গ্রহণ করেছেন।
তবে এতটুকু বলা যায় যে, কোন একটি নির্দিষ্ট ধারার ইমামগণের ইজতিহাদে হয়তো কোন একটি নির্দিষ্ট নীতির অনুসরণ বেশি হয়েছে। যেমন, আলফাজে উদ্বউইয়ার আক্ষরিক অর্থ বর্জনের পর শব্দগুলোর ব্যাপারে কি সিদ্ধান্ত হবে, এর সমাধানে আছারী ধারার সালাফগণ তাদের ইজতিহাদে মোটাদাগে ইসবাত ও তাফউইজ নীতির প্রয়োগ করেছেন৷ কিন্তু তার মানে এই নয় যে, তারা কখনো কোনো ক্ষেত্রে তাবিল করেননি। বরং ক্ষেত্র বিশেষে আছারী ইমামগণ থেকে তাবিলেরও প্রমাণ রয়েছে। আলোচনার পরিশিষ্টে আমরা এর স্বপক্ষে প্রমাণ পেশ করার প্রয়াস পাবো, ইনশাআল্লাহ।
ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রহ.) থেকে ইসবাতের বিষয়টি তো খুব বেশি প্রসিদ্ধ। আর তাঁর থেকে তাফউইজের বিষয়টি আমরা এখান থেকে পাই যে,
ইমাম খল্লাল রহ. আবু বকর আল মারওয়াযী (রহ.)-র সূত্রে আল্লাহ তায়ালার শানে ব্যবহৃত আলফাজে উদ্বউইয়া সম্বলিত হাদিসসমূহের ব্যাপারে ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বল (রহ.) থেকে বর্ণনা করেন,
'উম্মতের উলামারা এসব হাদীসকে যুগ যুগ ধরে সম্মিলিতভাবে গ্রহণ করেছেন। আমরা এসব হাদীস যেভাবে এসেছে সেভাবেই স্বীকার করি।'
وقد حدثنا أبو بكر المروذي رحمه اللَّه قال: سألتُ أبا عبد اللَّه عن الأحاديث التي تردها الجهمية في الصفات، والرؤية، والإسراء، وقصة العرش، فصححها أبو عبد اللَّه، وقال: قد تلقتها العلماء بالقبول، نسلم الأخبار كما جاءت.
قال: فقلت له: إن رجلًا اعترض في بعض هذِه الأخبار كما جاءت، فقال: يُجفى، وقال: ما اعتراضه في هذا الموضع؟ ! يسلم الأخبار كما جاءت.
[আস সুন্নাহ, খল্লাল ১/২৪৬]
ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বল (রহ.) এই ব্যাপারে আরও বলেন,
'এসব হাদীস ও এর মত অন্যান্য হাদীসসমূহের উপর আমরা ঈমান রাখি, সত্যায়ন করি তবে এসবের কোন ধরণ, প্রকৃতি ও কোন অর্থ আমরা জানিনা এবং এসব হাদীসের কোন কিছু আমরা অস্বীকারও করিনা।'
وما أشبه هذه الأحاديث نؤمن بها، ونصدق بها بلا كيف، ولا معنى، ولا نرد شيئا منها.
[তাহরীমুন নাযর ফী কুতুবিল কালাম, ইবনু কুদামা পৃ.৩৮-৩৯; যাম্মুত তাবীল, ইবনু কুদামা পৃ.২১]
এখানে স্পষ্টভাবে অর্থও না জানার কথা বলা হয়েছে। আর এটাই তাফউইজ। অর্থাৎ তানযিহের পর শব্দের কি অর্থ হবে তা আল্লাহ তায়ালার উপর ন্যাস্ত করা।
অনুরুপভাবে আশারী-মাতুরিদী ধারার সালাফগণ প্রধানত তাফউইজ নীতিটি গ্রহণ করেন। অবশ্য ক্ষেত্রবিশেষ তারা তাবীলও করেছেন। অর্থাৎ, তাফউইজ তাদের প্রধান নীতি হলেও তাদের থেকে তাবিলের প্রমাণও রয়েছে। তবে আলফাজে উদ্বউইয়ার আক্ষরিক অর্থ বর্জনের পর এই পয়েন্টে তারা ইসবাতের নীতিকে গ্রহণ করেননি। আর এখান থেকেই কিছু ভুল বুঝাবুঝির সৃষ্টি হয়েছে। এখানে আমরা এধরনের কিছু ভুল বুঝাবুঝির পর্যালোচনা করার চেষ্টা করবো ইনশাআল্লাহ।
কিছু ভুল বুঝাবুঝির পর্যালোচনা:
উপরে আমরা উল্লেখ করেছি যে, আল্লাহ তায়ালার জাত সম্পর্কে স্বীকৃত আকিদা, গুণবাচক শব্দগুলোর ক্ষেত্রে আক্ষরিক অর্থের ইসবাত ও কাইফিয়তের তাফউইজ এবং আলফাজে উদ্বউইয়ার ক্ষেত্রে আক্ষরিক অর্থ বর্জন, এই পয়েন্টগুলোতে কোন ধারার সালাফদের মধ্যেই কোন মতানৈক্য নেই। সুতরাং এই পয়েন্টগুলোতে ভুল বুঝাবুঝি বা পারস্পরিক বিরোধেরও কোন অবকাশই নাই। তবে সর্বসম্মতিক্রমে আলফাজে উদ্বউইয়ার আক্ষরিক অর্থ বর্জনের পর শব্দগুলোর ব্যাপারে পরবর্তী সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সালাফদের মধ্যে মতানৈক্য হয়েছে এবং এক্ষেত্রে তারা নিজেদের ইজতিহাদ অনুযায়ী উপরোল্লিখিত তিনটি নীতির আলোকে সমাধান পেশ করেছেন।
সুতরাং আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের অন্তর্ভুক্ত ধারাগুলোর মাঝে যেসকল ভুল বুঝাবুঝির সৃষ্টি হয়েছে এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাদের মধ্যে পারস্পরিক যেসব বিরোধিতা দেখা যায়, সেগুলো সব এই একটি ক্ষেত্রকে ঘিরে৷ আর বলাবাহুল্য, এই পয়েন্টে পরস্পর ভিন্ন মত পোষণ করার কারণে কেউই আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআত থেকে বের হয়ে যাবে না। কেননা এর দ্বারা মূল বিষয় তথা আল্লাহ তায়ালার জাত সম্পর্কে স্বীকৃত আকিদাকে অক্ষুন্ন রাখার উপর কোন প্রভাব পড়ে না।
কিছু ভুল বুঝাবুঝি যা হয়েছে তা হচ্ছে,
# আশারী-মাতুরিদী ধারার সালাফগণ যেহেতু আলফাজে উদ্বউইয়ার ক্ষেত্রে শব্দগুলোর আক্ষরিক অর্থকে বর্জন করার পর প্রধানত তাফউইজের কথা বলেছেন এবং ক্ষেত্র বিশেষ তাবীলকে প্রয়োগ করেছেন, কিন্তু কখনও ইসবাত নীতির প্রয়োগ করেননি, তাই অনেকে মনে করে নিয়েছে যে, আশারী-মাতুরিদী ধারার সালাফগণ বুঝি ইসবাতের নীতিকেই অস্বীকার করেছেন। ফলে এ বিষয়কে কেন্দ্র করে যেই ধারাতে ইসবাতের নীতি গৃহীত হয়েছে সেই ধারার অনুসারীদের সাথে আশারী-মাতুরিদী ধারার অনুসারীদের মাঝে একটা বিরোধের সৃষ্টি হয়েছে।
কিন্তু আসলে তো বিষয়টা তেমন নয়। আশারী-মাতুরিদী ধারার সালাফগণ তো শুধুমাত্র আলফাজে উদ্বউইয়ার মতানৈক্যপূর্ণ এই পয়েন্টে এসে তাদের ইজতিহাদ অনুযায়ী ইসবাতের নীতিকে প্রয়োগ না করে অন্য দুটি নীতিকে অনুসরণ করেছেন। কিন্তু অন্যত্র তথা গুণবাচক শব্দগুলোর ক্ষেত্রে তো অন্যান্য ধারার সালাফগণের মতো আশারী-মাতুরিদী ধারার সালাফগণও সরাসরি শব্দগুলোর আক্ষরিক অর্থকেই আল্লাহ তায়ালার সিফাত হিসেবে ইসবাত করেছেন। অর্থাৎ সেখানে তারা ইসবাতের নীতিকে অনুসরণ করেছেন। উপরের আলোচনায় আমরা এ বিষয়টি স্পষ্ট করেছি। সুতরাং এটা একটা ভুল বুঝাবুঝি যে, আশারী-মাতুরিদী ধারার সালাফগণ ইসবাত নীতিটিরই বিরোধিতা করেছেন!
# আছারী ধারার সালাফগণ যেহেতু আলফাজে উদ্বউইয়ার ক্ষেত্রে শব্দগুলোর আক্ষরিক অর্থকে বর্জন করার পর তাফউইজকে গ্রহণ করা ছাড়াও তাদের প্রসিদ্ধ মতানুসারে ইসবাতের নীতি গ্রহণ করেছেন, অর্থাৎ শব্দগুলোকে আল্লাহ তায়ালার সিফাত হিসেবে সাব্যস্ত করেছেন, সেহেতু প্রসিদ্ধ মতানুসারে তাদের নিকট এই শব্দগুলোও আল্লাহ তায়ালার সিফাত হিসেবে স্বীকৃত। আর এখান থেকেই এই শব্দগুলোর ক্ষেত্রে "সিফাতে খবারিয়া" নামের প্রচলন শুরু হয়েছে৷ তাই আমরা দেখি যে, সবাই 'সিফাতে খবারিয়া' শিরোনামের অধীনে আলফাজে উদ্বউইয়া শব্দগুলো নিয়ে আলোচনা করে থাকেন। কিন্তু প্রকৃত বাস্তবতা হচ্ছে, এই শব্দগুলো আভিধানিকভাবে আক্ষরিক অর্থে সিফাতের (বিশেষণের) অর্থ বহন করে না৷ যেমনটি আমরা পূর্বে আলোচনা করেছি। আর সেজন্যই তো আলফাজে উদ্বউইয়া গুলো থেকে আল্লাহ তায়ালার কোন গুণবাচক নাম নেই। পক্ষান্তরে সিফাতের অর্থ বহনকারী গুণবাচক শব্দগুলো আল্লাহ তায়ালার গুণবাচক নামের অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু আলফাজে উদ্বউইয়ার বিষয়টা তেমন নয়। একারণেই তো আমরা কখনো এভাবে কোথাও পাবো না যে,
هو الله الوجه اليد الساق.....
আর এভাবে বলা কখনো শুদ্ধও হবে না। এগুলো কখনো আল্লাহ তায়ালার গুণবাচক নাম হবে না। কেননা আক্ষরিকভাবেই এসব শব্দে সিফাতের অর্থ নেই। অর্থের দিক থেকে এগুলো সিফাতের শব্দই নয়।
শুধুমাত্র আছারী ধারার সালাফগণের একটি ইজতিহাদ হচ্ছে ইসবাতের নীতি অনুযায়ী প্রথমে তাবীলে ইজমালি (তানযিহ) করার পর এই শব্দগুলোকে সিফাত হিসেবে সাব্যস্ত করা। মোটকথা আলফাজে উদ্বউইয়ার ক্ষেত্রে একটা ইজতিহাদ হচ্ছে তানযিহের পর শব্দগুলো সিফাত হিসেবে গৃহীত হবে। এটা এবিষয়ে একটা ইজতিহাদ মাত্র৷ সর্বসম্মত কোন সিদ্ধান্ত নয়। আর সেজন্যই সচেতনভাবেই আমি শুরু থেকেই এই শব্দগুলোকে আলফাজে উদ্বউইয়া বলে এসেছি। সিফাতে খবারিয়া বলিনি৷ কেননা এই শব্দগুলোকে সিফাত বলা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের অন্তর্ভুক্ত ধারাগুলোর একটি ধারার একটি ইজতিহাদ। সকল ধারার নিকট স্বীকৃত মত নয়। যদিও কিভাবে যেন এই শব্দগুলোর ক্ষেত্রে সিফাতে খবারিয়া শিরোনামটিই প্রসিদ্ধি পেয়ে গেছে৷
যাইহোক, এই আলোচনাটুকু যদি পাঠক বুঝে থাকেন, তাহলে সামনের কথাগুলোও সহজেই বুঝতে পারবেন ইনশাআল্লাহ। সেই আলোচনায় প্রবেশের আগে বলে রাখা ভালো, যখন আলফাজে উদ্বউইয়া গুলো শুধু একটি ধারার সালাফদের একটি ইজতিহাদ মতে সিফাত হিসেবে স্বীকৃত, তখন তাদের ইজতিহাদ তাদের জন্য হুজ্জত (দলিল), অন্যদের জন্য নয়। কেননা একজনের ইজতিহাদ কখনও অন্য জনের ওপর হুজ্জত হয় না৷ সুতরাং এই শব্দগুলো তানযিহের পর আছারী ধারার একটি মতে আল্লাহর সিফাত হিসেবে সাব্যস্ত হওয়ার কারণে অন্য ধারার সালাফদের জন্য শব্দগুলো সিফাত হিসেবেই গ্রহণ করা আবশ্যক হবে না। বরং যেহেতু ক্ষেত্রটি ইজতিহাদের সেহেতু অন্য ধারার সালাফগণ স্বীকৃত নীতির আলোকে তাদের ইজতিহাদ অনুযায়ী ভিন্ন মত পোষণ করার সুযোগ থাকবে। আর হয়েছেও তাই। যেমনটি আমরা উপরে দেখিয়েছি। প্রকৃতপক্ষে এই পয়েন্টে ইসবাতের নীতিটি সর্বপ্রথম প্রয়োগ করেছেনই ইমাম আহমাদ (রহ.) এবং একইসাথে তাঁর থেকে তাফউইজের কথাও রয়েছে যা আমরা পূর্বে বলেছি। এর আগে এই পয়েন্টে কেউ ইসবাতের নীতি প্রয়োগ করেন নাই। অর্থাৎ ইমাম আহমাদ (রহ.)-র পূর্বে তানযিহের পর কেউই এই শব্দগুলোকে সিফাত হিসেবে নেননি। তবে এখানে যেহেতু সর্বসম্মত পয়েন্ট তথা প্রথমে তানযিহকে ঠিক রেখে পরে ইজতিহাদি পয়েন্টে এসে নতুন একটি ইজতিহাদ পেশ করা হয়েছে এবং তা "আহলে ইজতিহাদের" পক্ষ থেকেই এসেছে, তাই এই ইজতিহাদটি নতুন একটি ইজতিহাদ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে এবং তা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের অন্তর্ভুক্ত একটি স্বতন্ত্র ধারার মর্যাদা লাভ করেছে।
বলছিলাম, এই পয়েন্টে ভিন্ন মত গ্রহণের অবকাশের কথা, বস্তুত এখানে ভিন্ন মত গ্রহণের অবকাশ রয়েছে এবং অন্য ধারার সালাফগণ ভিন্ন মত গ্রহণ করেছেন বলেই তো এই পয়েন্টটা মতানৈক্যপূর্ণ পয়েন্ট হয়েছে৷ নইলে তো অন্যান্য ক্ষেত্রগুলোর মতো এই পয়েন্টকেও সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত বলা হতো।
যাইহোক, যেহেতু এই ইজতিহাদ অনুযায়ী আছরী ধারার সালাফগণ আলফাজে উদ্বউইয়া গুলোকে সিফাত হিসেবে নিয়েছেন, সেহেতু অন্য ধারার সালাফগণ যখন এক্ষেত্রে তানযিহের পর ইসবাত না করে তাবীল বা তাফউইজ করেন, তখন আছরী ধারার দৃষ্টিতে তারা আল্লাহর সিফাতকে অস্বীকার করেছেন বলে মনে হয়। কেননা তাদের নিকট যেটা সিফাত, সেটার ক্ষেত্রে যখন অন্যরা ভিন্ন মত পোষণ করেন, তখন তাদের সাব্যস্তকৃত সিফাতকে অন্যরা সিফাত হিসেবে নিচ্ছেন না, বিষয়টা এমনই দাঁড়ায়। আর এর জের ধরেই অন্য ধারার অনুসারীদের সাথে তাদের বিরোধের সূত্রপাত হয় এবং তা কোন কোন ক্ষেত্রে রক্তপাত পর্যন্ত গড়িয়ে যায়। ইতিহাসের পাতায় এগুলো উঠে এসেছে।
কিন্তু সচেতন বা অবচেতন মনে যেভাবেই হোক, আছারী ধারার অনুসারীরা হয়তো ভুলে গেছেন যে, যেই সিফাত অস্বীকার নিয়ে এতকিছু, সেই সিফাতটা আসলে তাদের একটা ইজতিহাদ মাত্র। তারা ইজতিহাদ করে একে সিফাত হিসেবে নিয়েছেন। নইলে তো মূলগতভাবে এই শব্দগুলোর মধ্যে সিফাতের অর্থ নেই। আর সেজন্যই তো খোদ ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রহ.)-ও এক্ষেত্রে তাফউইজের কথাও বলেছেন। আক্ষরিকভাবেই সিফাতের অর্থ থাকলে তো আর শুরুতে তানযিহ করতে হতো না। সরাসরিই ইসবাত করা হতো। যেমনটি গুণবাচক শব্দগুলোর ক্ষেত্রে সর্বসম্মতিক্রমে করা হয়েছে। তারা হয়তো এটাও ভুলে গেছেন যে, তাদের ইজতিহাদ অন্যদের জন্য কখনও হুজ্জত নয়। আল্লাহ সকলকে স্বীয় মাগফিরাতের চাদরে ঢেকে নেন।
এতক্ষণ আমরা যে বিষয়গুলো আলোচনা করেছি সেগুলো ছিল আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের অন্তর্ভুক্ত ধারাগুলোর মধ্যে পারস্পরিক কিছু ভুল বুঝাবুঝি। আর যারা স্পষ্টভাবেই আল্লাহ তায়ালার জন্য দেহ বা অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সাব্যস্ত করেছে তারা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআত থেকে বের হয়ে গেছে এবং ভ্রান্ত ধারা হিসেবে আখ্যায়িত হয়েছে৷
# এগুলো ছাড়াও পরবর্তীতে এমন কিছু ধারার জন্ম হয়েছে যাদের অবস্থান উসূল অনুযায়ী স্পষ্ট হলেও তারা সেই স্পষ্টতাকে মানতে নারাজ। ফলে এই ধারার সাথে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের অন্তর্ভুক্ত ধারাগুলো নতুন আরেকটি বিরোধে জড়িয়ে পড়েছে।
এক্ষেত্রে সমস্যা যেটা হয়েছে, তারা মনে করে যে, তারা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের স্বীকৃত তিন নীতির ইসবাতকে গ্রহণ করেছে। অর্থাৎ আলফাজে উদ্বউইয়ার ক্ষেত্রে তারা ইসবাতের নীতি অনুসরণ করে। আর একারণেই তারা নিজেদেরকে আছারী বলে দাবি করে৷ কেননা আমরা পূর্বেই বলে এসেছি যে, আছরী ধারাতে তানযিহের পর মোটাদাগে তাফউইক ও ইসবাত নীতির প্রয়োগ হয়েছে। সাথেসাথে আমরা একথাও বলেছি যে, আছারী ধারার সালাফগণ শুধু ইসবাতই গ্রহণ করেছেন এমনটা নয়। বরং ক্ষেত্র বিশেষ তারা তাবীলে ইজমালির (তানযিহের) পর তাবীলে তাফসিলিও অনুসরণ করেছেন।
যাইহোক, এই ধারার অনুসারীরা যদিও ইসবাতকে গ্রহণ করার কারণে নিজেদের আছারী বলে দাবি করে থাকে, কিন্তু তাদের ইসবাত আর আছারীদের ইসবাতের মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য বিদ্যমান; তাই তারা নিজেদের আছারী বলে দাবি করলেও আসলে তারা আছারী না। কেননা আছারী ধারার সালাফগণ যে ইসবাত করেন সেই ইসবাতের কারণে মূল বিষয় তথা আল্লাহর জাত সম্পর্কে স্বীকৃত আকিদাকে অক্ষুন্ন রাখার উপর কোন প্রভাব পড়ে না (যা আমরা পূর্বেও বলেছি)। কেননা আলফাজে উদ্বউইয়ার ক্ষেত্রে প্রথমে তারা তাবীলে ইজমালি (তানযিহ) করার পর মতানৈক্যের পয়েন্টে গিয়ে ইসবাতের কথা বলেন। অর্থাৎ আলফাজে উদ্বউইয়ার ক্ষেত্রে আছারী ধারার সালাফদের বক্তব্য হচ্ছে প্রথমে এই শব্দগুলোর আক্ষরিক অর্থকে বর্জন করতে হবে। আক্ষরিক অর্থকে বর্জনের পর তারা শব্দগুলোকে সিফাত হিসেবে ইসবাত করেন। (এটি তাদের একটি ইজতিহাদ)
আর এই ধারার অনুসারীরা প্রথমেই ইসবাতের নীতি অনুসরণ করে। অর্থাৎ তারা আলফাজে উদ্বউইয়ার আক্ষরিক অর্থকে বর্জন করে না। তারা সরাসরি আক্ষরিক অর্থকেই গ্রহণ করে এবং শব্দের আক্ষরিক অর্থকেই আল্লাহর সিফাত হিসেবে সাব্যস্ত করে। অতপর তার কাইফিয়ত আল্লাহর ওপর তাফউইজ করে। অর্থাৎ তারা এক্ষেত্রে দুটি নীতি অনুসরণ করে। যথা: প্রথমে শব্দের আক্ষরিক অর্থের ইসবাত অতপর তার কাইফিয়তের তাফউইজ। আর আছারী সালাফগণের ইসবাত করার ইজতিহাদটিতে তিনটি নীতির প্রয়োগ পাওয়া যায়। যথা: প্রথমে আক্ষরিক অর্থের তাবীলে ইজমালি (তানযিহ), এরপর শব্দকে সিফাত হিসেবে ইসবাত ও সবশেষে তার কাইফিয়তের তাফউইজ।
এখানেই আছারী ধারার ইসবাতের সাথে এই ধারার ইসবাতের পার্থক্য। আছারীগণ ইসবাত করে প্রথমে তানযিহ করার পর৷ আর এই ধারার অনুসারীরা শুরুতেই ইসবাত করেন। তারা তানযিহ করেন না।
ফলে এখানে একটি নতুন বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। আর তা হচ্ছে আছারীদের সাথে পার্থক্য থাকা সত্বেও তারা নিজেদের আছারী বলে দাবি করে, আর পার্থক্যের ভিত্তিতে অন্যান্য ধারার অনুসারীরা তাদেরকে আছারী বলে স্বীকৃতি দেয় না।
আর পূর্বের সেই বিতর্ক তো আছেই। অর্থাৎ তারা যখন ইসবাত করেন, এর মানে হচ্ছে এই শব্দগুলো তাদের মতে আল্লাহর সিফাত। সুতরাং যারা ইসবাত করেন না এদের দৃষ্টিতে তারা আল্লাহর সিফাতকে অস্বীকারকারী। এই বিতর্কের সমাধান নিয়ে আমরা উপরে বিস্তারিত আলোচনা করেছি।
সমস্যা হচ্ছে, যেহেতু আছারী ধারার অনুসারীদের সাথেও আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের অন্তর্ভুক্ত অন্য ধারাগুলোর এই একই বিতর্ক ছিল যে, আছারী ধারার অনুসারীদের মতে অন্যরা সিফাত অস্বীকারকারী, এবং এই নতুন ধারাতেও সেই পুরাতন বিতর্কের পুনরাবৃত্তি হয়েছে ; তাই আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় যেন, এরা হয়তো আছারীদের অনুসরণেই অন্য ধারাগুলোর সাথে এই বিরোধে লিপ্ত হয়েছে। কিন্তু আসলে ব্যাপারটি তেমন নয়। বরং এটি একটি স্বতন্ত্র নতুন ধারা, আছারীদের সাথে তাদের স্পষ্ট পার্থক্য বিদ্যমান। বরং তারা যে নীতি অনুসরণ করেছে সেই নীতির ভিত্তিতেই তারা অন্য ধারাগুলোর সাথে বিরোধিতায় অবতীর্ণ হয়েছে। সুতরাং নতুন একটি ধারা হিসেবে গণ্য করেই তাদের বিষয়গুলো আলোচনা করতে হবে।
তাহলে এখানে একথা স্পষ্ট যে, আছারীদের একটি ইজতিহাদ মতে তাদের সাথে অন্য ধারাগুলোর বিরোধিতার পয়েন্ট হচ্ছে একটি৷ অর্থাৎ, আছারীদের গৃহীত ইজতিহাদি সিফাতকে অস্বীকার শীর্ষক বিরোধ। আর এই নতুন ধারার সাথে অন্য ধারাগুলোর বিরোধের পয়েন্ট হচ্ছে দুটি। যথা:
এক. আলফাজে উদ্বউইয়া শব্দগুলোর আক্ষরিক অর্থকে বর্জন করা না করার বিরোধ। এই পয়েন্টে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের অন্তর্ভুক্ত সকল ধারাগুলোর সাথে এই ধারার বিরোধ স্পষ্ট। এমনকি এই পয়েন্টে আছারী ধারাও তাদের সাথে বিরোধপূর্ণ।
দুই. এই ধারাতে সাব্যস্তকৃত আক্ষরিক অর্থের সিফাতকে অস্বীকার করা না করার বিরোধ। এই পয়েন্টেও আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের অন্তর্ভুক্ত সকল ধারাগুলোর সাথে এই ধারার বিরোধ স্পষ্ট। কেননা কোন ধারাতেই আলফাজে উদ্বউইয়ার আক্ষরিক অর্থকে সিফাত হিসেবে গ্রহণ করা হয়নি। অন্য ধারাগুলো তো আক্ষরিক অর্থ বর্জনের পরও সিফাতের কথা বলে না। আর আছারী ধারাতে যদিও তাদের একটি মতানুসারে সিফাতের কথা বলা হয়, তবে সেটা আক্ষরিক অর্থকে নয় বরং আক্ষরিক অর্থকে বর্জন করার পর।
এখন নতুন এই ধারার যে নামই দেয়া হোক না কেন, নামের কারণে ধারার মূলকথা পরিবর্তিত হয়ে যাবে না। নাম যাই হোক মূলকথা এগুলোই।
# কথা হচ্ছে, আলফাজে উদ্বউইয়ার ক্ষেত্রে আক্ষরিক অর্থের তানযিহ না করে সরাসরি আক্ষরিক অর্থের ইসবাত করলে কি সমস্যা? এটাকে এই ধারার সাথে অন্য ধারাগুলোর তৃতীয় আরেকটি বিতর্কের বিষয় বলা যায়। বরং তাদের সাথে এই পয়েন্টেই বিতর্ক বেশি হয়।
এই প্রশ্নের উত্তর হচ্ছে, আলফাজে উদ্বউইয়ার আক্ষরিক অর্থের তানযিহ না করে সরাসরি আক্ষরিক অর্থকে ইসবাত করা হলে, মূল বিষয় তথা আল্লাহর জাত সম্পর্কে স্বীকৃত আকিদাকে অক্ষুন্ন রাখার উপর প্রভাব পড়ে। অর্থাৎ আক্ষরিক অর্থকে ইসবাত করে তা আল্লাহর সিফাত হিসেবে গ্রহণ করার দ্বারা আল্লাহর সিফাত তার জাতের সাথে সাংঘর্ষিক হয়ে যায়। আল্লাহর জাত সম্পর্কে স্বীকৃত আকিদা হচ্ছে, আল্লাহ তায়ালা অঙ্গপ্রত্যঙ্গ থেকে পবিত্র৷ তিনি স্থান ও সময়ের উর্ধ্বে, বরং স্থান ও সময় তিনিই সৃষ্টি করেছেন। তাঁর সিফাতের মাঝে কোন পরিবর্তন নাই।
এখন যদি আলফাজে উদ্বউইয়ার আক্ষরিক অর্থ ইসবাত করা হয় তাহলে আল্লাহ তায়ালার জন্য অঙ্গ সাব্যস্ত করা হয়ে যায়। যদিও পরবর্তীতে তার কাইফিয়ত তাফউইজ করা হোক না কেন! এই ধারার অনুসারীরাও একথা বলে যে, আমরা তো সৃষ্টিকে স্রষ্টার সাথে তুলনা করছি না। আমরা বলছি এগুলো আল্লাহর সিফাত তবে তা সৃষ্টির মতো নয়। অতপর তাদের মতের পক্ষে তারা আছারীদের ইসবাত দ্বারা প্রমাণ পেশ করে যে, দেখো সালাফদের থেকেই এটা প্রমাণিত। বলাবাহুল্য আছারীদের ইসবাত আর তাদের ইসবাত যে এক নয় সেটা আমরা বিস্তারিত আলোচনা করেছি। কিন্তু তারা সজ্ঞানে বা অজ্ঞানে একথা বুঝতে পারে না যে, আলফাজে উদ্বউইয়া গুলো আক্ষরিকভাবে সিফাতের অর্থ বহন করে না। সুতরাং এগুলোর আক্ষরিক অর্থ গ্রহণ করলে সেটা আক্ষরিকভাবেই সাব্যস্ত হয়। অর্থাৎ অঙ্গ সাব্যস্ত করা হয়ে যায়, সেটা সিফাত হয় না। অতপর কাইফিয়ত তাফউইজ করার দ্বারা শুধু এতটুকু হয় যে, সেই অঙ্গটা কেমন তা আমরা জানিনা বা সেই অঙ্গটা সৃষ্টির অঙ্গের মতো না। তারা বুঝতে পারে না যে, সৃষ্টির মতো না হোক, স্রষ্টার মতো করে হলেও এর দ্বারা স্রষ্টার জন্য অঙ্গ সাব্যস্ত করা হয়ে যায়। একটা উদাহরণ দিলে আরও স্পষ্ট হবে।
যেমন, আরবি 'ইয়াদ' (يد) শব্দের আক্ষরিক অর্থ 'হাত' বা আক্ষরিকভাবে আমরা বাংলায় হাত বলতে যা বুঝি আরবিতে ইয়াদ বলতে তাই বুঝায়। আর আক্ষরিকভাবে এই শব্দের মাঝে সিফাতের অর্থ অনুপস্থিত। সুতরাং এখন যদি স্রষ্টার জন্য ইয়াদ (হাত) শব্দের আক্ষরিক অর্থকে গ্রহণ করা হয় তাহলে আক্ষরিকভাবে ইয়াদ (হাত) বলতে যা বুঝায় স্রষ্টার জন্য তেমন কিছুই সাব্যস্ত করা হয়। এরপর সেটাকে সিফাত বলা হোক বা যাই বলা হোক সেটা ঐ জিনিসই আক্ষরিকভাবে ইয়াদ (হাত) শব্দ যা বুঝায়। যার অবশ্যম্ভাবী অর্থ হচ্ছে ইয়াদ (হাত) দ্বারা যা বুঝায় তা সৃষ্টির জন্যও সাবেত (বিদ্যমান) এবং স্রষ্টার জন্যও সাবেত (বিদ্যমান)। বাকি এরপর সেই জিনিসের কাইফিয়ত তাফউইজ করার অর্থ শুধু এই দাঁড়ায় যে, সৃষ্টির জন্য বিদ্যমান ইয়াদের (হাতের) কাইফিয়ত যেমন হয়ে থাকে স্রষ্টার জন্য বিদ্যমান ইয়াদের (হাতের) কাইফিয়তটা তেমন নয়। মোটকথা কাইফিয়ত যেমনই হোক ইয়াদ (হাত) জিনিসটা স্রষ্টার রয়েছে। আর বলাবাহুল্য আক্ষরিকভাবে ইয়াদ (হাত) বলতে যা বুঝায় সেটাই তো অঙ্গ। তাহলে আক্ষরিক অর্থের ইসবাত করার দ্বারা একথাই বলা হচ্ছে যে, ইয়াদ (হাত) অঙ্গটি স্রষ্টার রয়েছে তবে তা সৃষ্টির ইয়াদ (হাত) অঙ্গের মতো না। ( অথচ আল্লাহ তায়ালার সত্তা এমন অঙ্গ থেকে পবিত্র।)
আলফাজে উদ্বউইয়ার আক্ষরিক অর্থের ইসবাত করলে এই
Click here to claim your Sponsored Listing.
Location
Telephone
Website
Address
Sylhet
3175