স্বপ্ন যদি দেখতেই হয়, বড় স্বপ্ন দেখো; রাষ্ট্রপতি কিংবা প্রধানমন্ত্রী হওয়ার স্বপ্ন দেখো! অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আবু সাঈদ স্যার বলেন, মানুষ তার স্বপ্নের সমান বড়!
স্বপ্ন যদি দেখো কেরানি হবার
তোমার একজীবনে পিয়ন হবার ভাগ্যও হয়তো হবে না। রাষ্ট্রপতি কিংবা প্রধানমন্ত্রী হওয়ার স্বপ্ন দেখলে হয়তো মন্ত্রী কিংবা এমপি হয়ে যেতে পারো! কিংবা কোনো ভালো পজিশনে পৌঁছতে পারবে!
কোনো একটি অফিসের সামান্য কর্মকর্তা হওয়ার মধ্যেই যার সফলতা, তার দৌড় এখানেই শেষ হয়ে যায়! তার পক্ষে নতুন করে ভাবার কোনো সুযোগ থাকে না!
বড় স্বপ্ন দেখতে হলে বড় মানুষের সঙ্গে চলতে হয়। তাদের সংস্পর্শে যেতে হয়! যার নিত্যদিনই কেরানির সঙ্গে বসবাস, তার মনমানসিকতা কেরানির মতোই হবে! আমি কারো পেশাকে ছোট করে দেখছি না! সব পেশার মানুষের প্রতি আমার শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা আছে! আমি স্বপ্ন দেখার কথা বলেছি। স্বপ্নের পেছনে দৌড়াবার কথ বলেছি।
হ্যাঁ আমি রাষ্ট্রপতি হবার স্বপ্ন দেখি, প্রধানমন্ত্রী হবার স্বপ্ন দেখি! জানি না এই দুটো পারবো কি না, কিন্তু হয়তো মন্ত্রী কিংবা এমপিও হয়ে যেতে পারি!
হ্যাঁ আমি স্বপ্ন দেখি। কারণ, আমি মন্ত্রীদের সঙ্গে উঠাবসা করেছি, এমপিদের সঙ্গে উঠাবসা করেছি। জাতীয় নেতাদের সঙ্গে ঘুরেছি। একসাথে বসে চা পান করেছি। ডিনার করেছি। লাঞ্চ করেছি। একজন মেয়র এবং একজন এমপি প্রার্থীর নিউজ রিপোর্টার হিসেবে কাজ করেছি। এ সময় আমি সংস্পর্শে এসেছি এমন মানুষের, যারা একটি সময়ে এমপি ছিলেন, মন্ত্রী ছিলেন!
হ্যাঁ আমি মিশেছি অসংখ্য সচিব, প্রফেসর এবং দেশ-বিদেশের জ্ঞানী-গুণীদের সঙ্গে! তাঁদের সঙ্গই আমার স্বপ্নের ভিতকে তৈরি করেছে। হ্যাঁ আমার স্বপ্ন বড় হওয়াই স্বাভাবিক!
হ্যাঁ আমি জানি, এই স্বপ্নই আমাকে পৌঁছে দেবে আমার কাঙ্ক্ষিত মনজিলে! আর হ্যাঁ, এই স্বপ্নই আমাকে ঘুমাতে দেয় না, আমি জেগে থাকি; আমার অন্তরও এই স্বপ্নের সাথে পাখা মেলে উড়ে বেড়ায় দিকদিগন্তে!
Institute of Intellectuals
চিন্তার দাসত্ব থেকে মুক্তি, উপলব্ধির ?
19/10/2022
07/08/2022
চিন্তার দার্শনিক ভিত্তি
------প্রফেসর ড. ইব্রাহিম কালিন
ইবনে খালদুন বিশ্ববিদ্যালয়কে ধন্যবাদ জানাচ্ছি এমন চমৎকার একটি আয়োজন বাস্তবায়ন করার জন্য; সেই সাথে আমাকে আমন্ত্রণ করায় কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। পাশাপাশি ICYF কেও অভিনন্দন জানাচ্ছি এমন একটি ক্ষণে মজলিসটি আয়োজন করবার জন্য, যখন আমি প্রগাঢ় চিন্তার চর্চা এবং মুসলিম চিন্তকদের অভাব বোধ করছি। তাই আমি এ বিষয়ের উপর আজকে আলোচনা করাটা প্রয়োজন বলে মনে করছি।
তবে চিন্তা কী, চিন্তার সাথে আরো কি কি বিষয় সম্পৃক্ত আছে, এবং ‘ইসলামি আইডেন্টিটি’ প্রশ্নে চিন্তা কিভাবে অন্ধকারের মুখে পতিত — এ বিষয়ে আলাপ তোলার আগে আমি আবার ইবনে খালদুন বিশ্ববিদ্যালয় টিমের তারিফ করছি এমন উঁচু মানের একটি কর্মসূচি আয়োজন করার জন্য। কিছুক্ষণ আগে আমাকে অবহিত করা হলো যে- বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাদের সামগ্রিক পরিকল্পনায় গ্রাজুয়েট লেভেলের শিক্ষাকে অধিক গুরুত্বের জায়গায় রেখে এগুচ্ছেন। আমার সে মুহূর্তে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ এরিক শুমাচারের একটি বিখ্যাত উক্তি মনে পড়ে গেল যেটাকে তিনি তাঁর বইয়ের শিরোনাম হিসেবেও ব্যবহার করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, “অল্পই সুন্দর”। সুতরাং আমি বলব, আপনারা বিশ্ববিদ্যালয়কে ছোট রাখেন তবে গুণগত মানের দিক থেকে তা হোক উন্নত। ভাল কিংবা প্রাসাঙ্গিক হওয়ার জন্য আপনাকে আসলেই বড় কিছু করতে হবে না; বরং আমি মনে করি ইতোমধ্যে অনেক বড় বড় প্রকল্প চলছে যা কেবল সংখ্যার দিক থেকে বড় হচ্ছে, গুণ গত মানের দিক থেকে নয়। এখানে রেনে গেনন এর ‘The Reign of Quantity and the Signs of Time’ বইয়ের আলাপটি তোলা যায়— “আর সংখ্যা যত বড় হয়, আমি মনে করি, অবনতির লক্ষণ তত ঘনিয়ে আসে"। তাই বিশ্ববিদ্যলয়টিকে ছোট কিন্তু গভীর, গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রাসঙ্গিক রাখার জন্য আপনাদেরকে অনুরোধ করছি। আমার বিশ্বাস আপনারা সেটাই করছেন। চলুন এবার আজকের মূল আলোচনায় ফেরা যাক।
আমি মনে করছি এখন আমাদের নিজেদেরকে পয়লা যে প্রশ্নটি করা দরকার তা হচ্ছে- ‘চিন্তা’ কী? আমরা কথা বলছি ‘মুসলিম-ভবিষ্যৎ’ অথবা ‘ভবিষ্যৎ-মুসলিম-চিন্তক’ সম্পর্কিত বিষয় নিয়ে। অবশ্য এখানকার শব্দচয়ন কোনটা ঠিক, কোনটা বেঠিক তা নিয়ে আমাদের মধ্যে কিছুটা আলাপ হয়েছে; তবে এর জন্য আলাদা আলোচনা হওয়া প্রয়োজন বলে আমি মনে করছি। শব্দ নিয়ে খেলার করার কোনো ইচ্ছা আমার নেই। যাইহোক, প্রশ্ন হচ্ছে কিভাবে একজন মুসলিম চিন্তকের চিন্তা করার উচিত? এ প্রশ্ন তোলার আগে ‘চিন্তা’ কী— এ প্রশ্নের সুরাহা করতে হবে। তাহলে চিন্তা কী? দৈনন্দিন জীবনে সাধারণ অর্থে ‘চিন্তা’ বলতে বোঝায়— তথ্য জোগাড় করা। কিন্তু, এটা চিন্তার সংজ্ঞা নয়। চিন্তা মানে উপাত্ত বিশ্লেষণ করা নয়, কিংবা প্রত্যয়সমূহের এর মাঝে অথবা বস্তু ও প্রত্যয়ের মাঝে সম্পর্ক নির্ণয়ের বিষয়ও নয়। বরং চিন্তা এর চেয়েও আরো বেশি কিছু বিষয়কে অন্তর্ভুক্ত করে। তথ্য জোগাড় করবার মধ্যে চিন্তার একটি উপাদান বিদ্যমান থাকে। কিন্তু এক্ষেত্রে ‘তথ্য’ ও ‘জ্ঞান’ নিয়ে আমরা বড় একটি বিভ্রান্তিতে পড়ি। আমরা মনে করি, আমরা তথ্যের যুগে বাস করছি এবং তথ্য বিপ্লবের মাধ্যমে সামনে এগিয়ে গিয়েছি। ফলে আমরা তথ্যের সাথে জ্ঞান, প্রজ্ঞা কিংবা চিন্তাকে অনেকসময় একীভূত করে ফেলি। অথচ তথ্য আর জ্ঞান এক জিনিস নয়। বরং তথ্য হচ্ছে নিছক ঘটনা (Fact), সংখ্যা বা উপাত্তের কাঁচামাল। এগুলো তখনি জ্ঞানে পরিণত হয় যখন তথ্যসমূহ পরস্পর মিলিত ও সম্পর্কিত হয়ে একটি নির্দিষ্ট উপসংহারে উপনীত হয়। তারপরেও জ্ঞানের এমন সংজ্ঞায়ন করাটা চিন্তা কী তা বুঝতে যথেষ্ট হবে না। বরং আমাদেরকে জ্ঞানের এ স্তর অতিক্রম করে যেতে হবে। পাশাপাশি আমাদেরকে এমন জ্ঞানের উপর ভিত্তি করে অনুসন্ধান করতে হবে, ইসলামি সিলসিলায় যা প্রজ্ঞা বা ‘হিকমাহ’ নামে অভিহিত। ‘হিকমাহ’ কী— এ বিষয়ে আমি কিছুক্ষণ পরে কথা বলব।
চিন্তা বলতে নিঃসন্দেহে আমার মনোজগতের অভ্যন্তরীণ বোঝাপড়াকে বোঝায় না। দেকার্তের সময় থেকে পাশ্চাত্য দর্শনের একটা বড় অংশ যে পাটাতনের উপর নিজেদেরকে দাঁড় করিয়েছিল তা Subjectivism নামে পরিচিত। যেখানে ‘জ্ঞান’ কী সেটা জ্ঞানকর্তা (knowing Subject) হিসেবে আমরাই ঠিক করে দিই। জগতের অর্থও জ্ঞানের কর্তাই আরোপ করে। আমরা টের পাই বা না পাই, মুসলিমরা-সহ আমরা সবাই সচারচর এই ভ্রান্তির মধ্যে পড়ে আছি। আমরা এই ধারণা করে চলি যে, জগত হচ্ছে এমনকিছু যার কোনো অর্থ, তাৎপর্য, বুদ্ধিমত্তা নেই; এবং আমরা জ্ঞানের কর্তারাই অর্থ অথবা অর্থের বৈশিষ্ট্যসমুহ (properties) আরোপ করি বা ঠিক করে দিই। সুতরাং এ ধরণের দৃষ্টিভঙ্গি সকল ধরনের চিন্তা, দর্শনকে আমার নিজের মনোজগতের এর অভ্যন্তরীণ বোঝাপড়ার বিষয় বানিয়ে ফেলে। তাই জগতকে আমি যেভাবে দেখি, সংজ্ঞায়ন করি কিংবা চিত্রায়ন করি জগত হচ্ছে তা-ই। সুতরাং যাকে আমি বাস্তবতা (Reality) বলে সংজ্ঞায়ন করি সেটাই বাস্তবতা হয়ে যায়। এটা হচ্ছে Subjectivism এর চুড়ান্ত পর্যায়। আর আমরা এখনো Subjectivist চিন্তার অবশেষ থেকে পুরোপুরি মুক্ত হতে পারিনি। Subjectivism এর কথা অনুযায়ী যদি চিন্তা স্রেফ মনোঃজগতের এর অভ্যন্তরীণ বোঝাপড়ার চেয়ে বেশি কিছু না হয়, তাহলে আমরা কখনো আমাদের মন হতে বের হতে পারব না এবং আত্মজ্ঞানবাদ (Solipsism) এর সমস্যায় পড়ব। আমি কিভাবে জানি যে, আমার Mind এর মাঝে যা ধারণা (Concept) বা বিমূর্ত ভাবনা (Abstract Notion) আকারে আছে তা বহির্জগতের সাথে কিভাবে সম্পর্কিত? অথবা আমি কিভাবে জানি— যেটাকে আমি কলম বলি আসলে সেটা কলম, সেটা আমার কল্পিত কোন বিষয় নয়? ফলে আমি কখনোই আমার মনোজগতের বিষয়ের সাথে বাস্তব জগতের বিষয়ের সংযোগ সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারব না।
ইসলামি বুদ্ধিবৃত্তিক সিলসিলা কখনো এ ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হয়নি। কেননা এ সিলসিলাটি এ অনুমানের সাথে শুরু হয় যে, অস্তিত্ব জগত (The World of Existence) তার সৃষ্টির মুহূর্ত থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অর্থপূর্ণতার সাথে বিরাজমান। আমার জানার আগেই কিংবা বহিঃজগতের সাথে বৌদ্ধিকভাবে আমার মিথষ্ক্রিয়া শুরু হবার পূর্বেই (এখানে ‘Phenomenology’ র পরিভাষাঃ Intentionality ব্যবহার করা যেতে পারে) জগত তার নিজস্ব অর্থ ও গুরুত্ব নিয়েই হাজির থাকে। সুতরাং আমার অস্তিত্ব থাকুক বা না থাকুক, আমি জগত নিয়ে চিন্তা করি বা না করি, জগত ঠিকই আমার থেকে স্বাধীন হয়ে টিকে আছে। শুধু এটাই নয় যে জগত আমার কল্পনার বাইরে স্বাধীনভাবে টিকে আছে; বরং তেমনভাবে জগতের নিজস্ব অর্থও আছে আছে, যা একজন জ্ঞানকর্তা হওয়ার কারণে আমার উপর নির্ভর করে না। অর্থাৎ, আমি বস্তুর বাস্তবতা (Reality of Things) সম্পর্কে জানতে পারি, বস্তুর অর্থ আমি আবিষ্কার করতে পারি, কিন্তু বস্তুর অর্থ আমি তৈরি করি না। এই অর্থে সকল চিন্তা হচ্ছে— ‘Ontology’ এবং ‘অস্তিত্ব’ নিয়ে বোঝাপড়া করা। কেননা আমি মনে করি সকল ধরনের চিন্তার ক্ষেত্রে— হোক সেটা দার্শনিক, ধর্মতাত্ত্বিক, বৈজ্ঞানিক, কিংবা শিল্প বিষয়ক, সেটা কোনো বিষয় নয়— মৌলিক প্রশ্নটি হচ্ছে ‘কেন বাস্তবে অনস্তিত্ব না থেকে বরং অস্তিত্ব থাকে’। আপনারা কি কখনো এ নিয়ে ভেবে দেখেছেন যে কেন বাস্তবতা— কোনোকিছু নাই এটা না হয়ে বরং কোনোকিছু আছে এমন হল? কেন আমরা অস্তিত্বশীল থাকি? কেন এই জগতের অস্তিত্ব আছে বা কেন অস্তিত্বশীল জগতের অস্তিত্ব আছে? এটাই হচ্ছে আদি ও মৌলিক প্রশ্ন, যা সকল গুরুত্বপূর্ণ চিন্তাকে মোকাবেলা করতে হয় বা এর উত্তর খুঁজে বের করতে হয়। সুতরাং এটা আমাদের সামনে অস্তিত্ব নিয়ে মৌলিক প্রশ্ন হাজির করে— অস্তিত্ব কী? (মুসলিম দার্শনিকদের কাছে যা ‘ওজুদ’ নামে পরিচিত।) ‘অস্তিত্ব’ (ওজুদ) ও ‘অস্তিত্বশীল’ (মাওজুদ) এর মাঝে সম্পর্ক কী? অথবা এদের মাঝে পার্থক্য-ই বা কী? অস্তিত্ব (ওজুদ) কি অস্তিত্বশীলের (মাওজুদের) সমষ্টি? না কি যা-কিছু অস্তিত্বশীল আছে, অস্তিত্ব তার চেয়ে বেশি কিছুকে বুঝায়? আল ফারাবি, ইবনে সিনা, ইবনে আরাবি থেকে মোল্লা সদরা পর্যন্ত সকল মুসলিম দার্শনিকরা এই প্রশ্নের গুরুত্বপূর্ণ জওয়াব দিয়ে গেছেন। কিন্তু, আমরা তাদের সম্পর্কে কতটুকু জানি সেটাই গুরত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
সুতরাং আজকের প্রোগ্রামের শিরোনামটিকে (‘Muslim Future Thinkers Forum’) আমাকে বন্ধনীর মধ্যে রাখতে হবে। আগেই বলেছি, আমি শব্দ নিয়ে খেলা করতে চাই না। কিন্তু আমার মনে হয় আজকের সভার শিরোনামটি গুরুত্বপূর্ণ, যা আমাদেরকে সত্যিই ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করতে বাধ্য করে। এটা চমৎকার! আসলে আমাদের কোনো বিষয় সম্পর্কে খোলা মন এবং ভবিষ্যৎমুখী দৃষ্টিভঙ্গি থাকা জরুরি। কিন্তু আপনারা জানেন, একমাত্র আল্লাহ-ই ভবিষৎ সম্পর্কে জানেন, যেমনটা প্রফেসর মেহমুত ইঙ্গিত দিয়েছেন এবং আমরাও সেটাকে সত্য বলে মানি। এর মানে কি ভবিষ্যত নিয়ে আমাদের চিন্তা বন্ধ করে দেয়া উচিত? না, তা নয়। একমাত্র আল্লাহ তা’য়ালা ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আদ্যোপান্ত জানেন, তবুও আমাদেরকে চিন্তা করতে হবে— ভবিষ্যৎ কেমন হওয়া উচিত, কিরূপ হতে পারে, কিংবা একটা উজ্জ্বল ভবিষ্যত গড়ার জন্য আমরা কী কী অবদান রাখতে পারি। কিন্তু আমি মনে করি তার আগে আমাদেরকে এ প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে যে, আমরা কি আমাদের খোদ বর্তমান সম্পর্কে কিছু জানি? এবং আরো গুরুত্বের সাথে এ প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে যে, আমরা আমাদের অতীত সম্পর্কে কতটুকু জানি?
আমরা যেরকম চাই, আপনাদের যদি সেরূপ ভবিষ্যত নির্মাণ নিয়ে চিন্তা করতে হয়, তবে সেক্ষেত্রে আমার প্রশ্ন হল, আমরা আমাদের খোদ বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে কী জানি বা আপনারা কী জানেন? আমাদের নিজস্ব অতীত, ইতিহাস, সিলসিলা, সামষ্টিক স্মৃতি সম্পর্কে আমরা কতটুকু জানি? আমি এটাকে রূপক (রেটোরিকাল) বা কুট তর্কের প্রশ্ন হিসেবে বলিনি, বরং এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। আপনারা যদি খেয়াল করেন তবে দেখতে পাবেন যে, আমাদের বর্তমান চিন্তাজগতে প্রভাব রাখার জন্য নিজস্ব বুদ্ধিবৃত্তিক সিলসিলাকে হাজির করার ক্ষেত্রে কিভাবে আমরা ব্যর্থ হয়েছি। আমাদের বর্তমান দৃশ্যপট তেমন উজ্জ্বল নয়। ইসলামি বুদ্ধিবৃত্তিক সিলসিলার গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো আমরা এখনো ক্রিটিকাল এডিশন আকারে প্রকাশ করতে পারিনি। আল ফারাবি, ইবনে সিনা, আল কিন্দি এদের মতো প্রসিদ্ধ নামকরা দার্শনিকদের কাজগুলো এখনো গভীর পাণ্ডিত্যপূর্ণ, নির্ভরযোগ্য ক্রিটিক্যাল এডিশন-সহকারে প্রকাশ হয়নি; এমনকি এদেরকে অন্য ভাষায় তর্জমা করার মতো কাজও যথাযথ পরিমাণে হয়নি। আরো শতশত পণ্ডিতদের তাহলে কী অবস্থা— যাদের নিয়ে এখনো গবেষণা এবং আবিষ্কার করা বাকি আছে? এটা ঠিক যে, আমাদের পরিচিত বড় বড় চিন্তকদের কিছু কাজ সম্পর্কে নিঃসন্দেহে আমাদের জানাশোনা আছে। কিন্তু যদি আপনারা এর সাথে পাশ্চাত্যের পাণ্ডিত্যের তুলনা করে দেখেন, উদাহরণস্বরূপ— গ্রিক থেকে শুরু করে রোমান হেলেনিস্টিক আমল, মধ্যযুগ থেকে আধুনিক যুগ পর্যন্ত নিজস্ব বুদ্ধিবৃত্তিক ধারাকে তারা কিভাবে অধ্যয়ন করেছে! কোনো তুলনাই হয় না আসলে! প্লেটো, এরিস্টটল, অগাস্টিন, থমাস এ্যাকুইনাস, কান্ট, হেগেল-সহ পরবর্তীদের উপর হাজার হাজার গবেষণা করা হয়েছে। আক্ষরিক অর্থেই এদের উপর ইতোমধ্যে হাজার হাজার গবেষণা হয়েছে। আর এ হিসাবটা যখন আমাদের নিজস্ব পাণ্ডিত্যের বেলায় আসে, আমার মনে হয় সত্যিই আমাদের গবেষণা খুবই যৎসামান্য, ভীষণ অপর্যাপ্ত।
সুতরাং আমরা আমাদের নিজেদের বুদ্ধিবৃত্তিক পূর্বপুরুষদের কাছে ব্যাপকভাবে ঋণী হয়ে আছি। তাহলে আমাদের কাজ হচ্ছে— তাঁরা সংস্কৃতি, সভ্যতা, বিজ্ঞান, শিল্পচিন্তার যে বুনিয়াদ তৈরি করে গেছেন তা বোঝার চেষ্টা করা। তবে আমাদের মতন ভাসাভাসা স্তরের চিন্তা তাঁরা করেননি। বিষয়টি ‘কত সংখ্যক বই লেখা হয়েছে’— তার প্রশ্ন নয়। বরং প্রশ্ন মান ও গভীরতার; চিন্তার জন্ম দেয়ার। কেননা প্রগাঢ় চিন্তা ছাড়া কোনো সংস্কৃতি এবং সভ্যতার জন্ম হয় না। আমি যদি ‘সভ্যতা’র সংজ্ঞা দিতে চাই, তাহলে বলব— সভ্যতা হচ্ছে একটি নির্দিষ্ট বিশ্বদৃষ্টিকে (Worldview) বাস্তবায়ন করা এবং মানুষের সাংস্কৃতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক জীবনের ক্ষেত্রে অস্তিত্বের জগতকে উপলব্ধি করা, এবং সেই সাথে অধিবিদ্যাগত (metaphysics) অবস্থার সাথে সমাজ-রাজনৈতিক অবস্থার সম্পর্ক তৈরি করা। তার মানে হচ্ছে সেসব অধিবিদ্যাগত নীতিসমুহ (metaphysical principle) সম্পর্কে শুরুতেই আপনাদের যথাযথ বোঝাপড়া থাকতে হবে। কারণ এ নীতিগুলোই সমাজ, সংস্কৃতি, নগর, শিল্প, নন্দনতত্ত্বের বিকাশ ঘটায়। সুতরাং আপনাদেরকে এসব অধিবিদ্যাগত নীতিসমুহ দিয়ে বোঝাপড়া আরম্ভ করতে হবে। কিন্তু আমি জানি আমরা এখন যে যুগে বাস করছি, এখানে এ বিষয়গুলো তেমন পরিচিত নয়। কারণ আজকাল আমরা আর চিন্তা করি না; কেবল তথ্যকে প্রক্রিয়াজাত করি। আমরা মনে করি যে আমরা চিন্তা করছি; আসলে চিন্তা করছি না, বরং আমরা সোজাসাপ্টা তথ্যকে প্রক্রিয়াভূক্ত করছি। এমনকি বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম মারফতে আমাদের মনযোগের পরিসর ক্রমশ ছোট হয়ে আসছে। যোগাযোগমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিশেষ তথ্যকে প্রক্রিয়াজাত করে অর্থাৎ তথ্যকে গিলে ফেলার মাধ্যমে আমরা মনে করি আমরা চিন্তা করছি। মোটেও না, আমরা চিন্তা করছি না; বরং সোজাসাপটা তথ্যকে প্রক্রিয়াজাত করছি। আমরা তথ্য সংগ্রহ এবং উপাত্ত বিশ্লেষণ নামক এই ভাসাভাসা স্তরের বাইরে যেতে পারছি না।
আমরা এখনো চিন্তা করছি না। তাৎপর্যপূর্ণ চিন্তাকে বিমূর্ত, অপ্রাসঙ্গিক, অজনপ্রিয় ও অলাভজনক হিসেবে দেখা হয়। কেননা এটা কোনো তাৎক্ষণিক ফলাফল ঘটায় না, কোনো খবরের শিরোনামে আসে না, কিংবা অনেক জনপ্রিয়ও হয় না। তাই যদি হয়, তাহলে আপনাদের পড়াশোনা করার দরকারটা-ই বা কী? আমি বুঝাচ্ছি যে, কয়েকটা টুইট করে যদি আপনি সামাজিক মিডিয়া ব্যক্তিত্ব হতে পারেন, যখন আপনার এ ধরনের মোহিনীশক্তিই থাকে; তখন নিগুঢ় চিন্তা করার কী এমন দরকার পড়ে! আমরা বর্তমানে এ ধরনের মনস্তত্ত্ব এবং পরিবেশের মধ্যে বাস করছি। আর সে কারণেই আমাদের নিজেদেরকে বোঝার জন্য, অস্তিত্বের জগতকে বোঝার জন্য এবং আমরা যে বাস্তবতায় বাস করছি তার সাথে অস্তিত্বের জগতের যে সম্পর্ক আছে— তা বোঝার জন্য আমাদের তাৎপর্যপূর্ণ চিন্তা করার প্রয়োজন আছে; যাতে করে আমরা যথার্থভাবে জানতে পারি আমাদের সিলসিলা কী? আমাদের বর্তমান অবস্থা আমাদেরকে কী পয়গাম দেয়? এবং আমাদের ভবিষ্যত কেমন হওয়া উচিত? তাই এই তো কয়েক মিনিট আগে আপনাদের উদ্দেশ্যে যে প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছিলাম সে প্রশ্নে আবার ফিরে আসতে চাই। সকল তাৎপর্যপূর্ণ চিন্তার শুরু হয় এ প্রশ্নটি দিয়ে যে, কেন বাস্তব— কোনোকিছু নাই এমন না হয়ে বরং কোনোকিছু আছে এমন হল? বস্তু কি তার নিজ প্রকৃতির চেয়ে ভিন্ন কিছু হতে পারত? একটি পুরো ভিন্ন জগত ব্যবস্থার কথা চিন্তা করুন, উদাহরণস্বরূপ— যেখানে আমাদের মতো মানুষদের দুই পা না থেকে বরং তিন পা থাকে; কিন্তু প্রকৃত ঘটনা তো এমনটা নয়, তাইতো? কারণ আমাদের দু হাত আছে, দুই পা আছে। কিন্তু সেটা কেন? সবকিছু কি পরিবর্তন হতে পারত? সবকিছু একেবারে ভিন্নরকম হতে পারত? কে বস্তুকে তার স্ব-প্রকৃতিতে সৃষ্টি করেছিলেন? এবং আমি তাহলে কি করতে পারি? একজন মানুষ এবং কর্তাসত্তা হিসেবে আমাকে পয়লা বুঝতে হবে কেন বস্তুর নিজস্ব প্রকৃতি আছে; এর মাধ্যমে যাতে বস্তুজগতের জন্য কল্যাণজনক কিছু করতে পারি। ভিটগেনস্টাইন তার প্রথম দিকের ‘Tractatus Logico-Philosophicus’ বইয়ে Logical Atomism and Positivism এর কথা বলেছিলেন। পরবর্তী সময়ে তিনি তা পরিত্যাগ করেন এবং তার ধারাবাহিকতায় ‘ফিলসফিকাল ইনভেস্টিগেশন’ বইয়ে যখন Family Resemblance এর ধারণা নিয়ে আলাপ তুলেছিলেন, তখন সেখানে তিনি একবার বলছিলেন, আমি জগতকে আমার নিজের মন অনুযায়ী না বুঝে জগতকে তার মতো করে বোঝার চেষ্টা করছি।
তিনি বলেন বস্তু একেবারে ভিন্নরকম হতে পারত। কোন অর্থে তিনি এটা বলেছেন সেটা বলা কঠিন; কিন্তু তিনি বলেছেন যে, বস্তুগুলো অনেক ভিন্নরকম হতে পারত। হয়ত তিনি এটাকে একবারে সাধারণ অর্থে বুঝিয়েছিলেন। সম্ভবত এর মানে হচ্ছে, ভাষার কায়দা-কানুন একবারে ভিন্নরকম হতে পারত, ভাষার বাক্যরীতি একবারে ভিন্নরকম হতে পারত; কিংবা হয়ত তিনি বুঝিয়েছিলেন, উদাহরণস্বরূপ— তিনি একজন গরীব দার্শনিকের চেয়ে একজন ধনী ব্যবসায়ী হতে পারতেন। সম্ভবত তিনি এটাকে ভিন্ন পারিভাষিক অর্থে বুঝিয়েছিলেন যেটা আমরা জানি না। কিন্তু তিনি তার দিনলিপি অথবা দর্শন বিষয়ক নোটপত্রে এতটুকুই লিখে রেখেছিলেন যে, বস্তু অনেক ভিন্নরকম হতে পারত। যখন আমি এটা পড়লাম তৎক্ষণাৎ ‘Contingency’ ধারনাটা আমার মাথায় আসল, ইসলামি দর্শনে যা ‘মুমকিনুল ওজুদ’ নামে পরিচিত।
আমি বলেছিলাম, এ ধারণাটাই তিনি ধরার চেষ্টা করছিলেন। খেয়াল করেন ইবনে সিনা কী বলেছিলেন; প্রসঙ্গক্রমে তা তিনি আল ফারাবি থেকে নিয়েছিলেন। কেননা আপনারা ইবনে সিনার মাঝে যা দেখেন, তার অধিকাংশ চিন্তা আসলে আল ফারাবি থেকে এসেছে। তবে ইবনে সিনা অনেক প্রতিভাবান ছিলেন; কারণ তিনি সকল চিন্তাকে সংঘবদ্ধ করেছিলেন এবং সেগুলোকে আরো সূক্ষ্ম, নিগুঢ়ভাবে প্রকাশ ছিলেন; এবং আপনারা জানেন ‘অস্তিত্ব’কে তিনি তিন ভাগে ভাগ করেছিলেন। প্রথমটি হচ্ছে— ‘অত্যাবশ্যকীয় সত্তা’ (ওয়াজিবুল উজুদ) অর্থাৎ যা ছাড়া কোনোকিছুই অস্তিত্বশীল হতে পারে না। আর অত্যাবশ্যকীয় সত্তা সয়ংসম্পূর্ণ অস্তিত্বও বটে, অর্থাৎ যা নিজেই অস্তিত্বশীল; মানে যার অস্তিত্বের জন্য অন্য অস্তিত্ব অথবা উৎপত্তিস্থলের প্রয়োজন পড়ে না। এমন অস্তিত্ব, এমন সত্তা এবং এমন স্বয়ংসম্পূর্ণ সত্তা কেবল একটিই হতে পারে। দ্বিতীয়টি হচ্ছে— ‘মুমকিনুল ওজুদ’; ‘অনিশ্চিত সত্তা’ বা সম্ভাব্য সত্তা। অর্থাৎ যা অস্তিত্ব এবং অনস্তিত্বের মাঝে ঝুলে থাকে; যা অস্তিত্বশীল আছে কিন্তু অস্তিত্বশীল না থাকার সম্ভাবনাও আছে। এভাবে ইবনে সিনা অনিশ্চিত সত্তা বা মুমকিনুল ওজুদ নামে এ অসাধারণ চিন্তাটি হাজির করলেন। আপনারা এ নিয়ে চিন্তা করলে দেখবেন, আমি এবং আপনারা— যারাই এ সেমিনার রুমে এখন অবস্থান করছি, সবাই অনিশ্চিত সত্তা। আমরা এখন অস্তিত্বশীল আছি; কিন্ত আমরা অস্তিত্বশীল নাও থাকতে পারি। কাজেই আমাদের খোদ অস্তিত্বের নিশ্চয়তা কে দেয়? আগামীকাল হয়ত আমার অস্তিত্ব নাও থাকতে পারে। আমি জানি না, এটাই হয়ত আমার শেষ বক্তব্য হতে পারে।
সুতরাং এটা আমাকে চিন্তার খোরাক দেয় যে, আমরা অনেক ভিন্ন হতে পারতাম; দুনিয়ার অন্য প্রান্তে থাকতে পারতাম কিংবা আমরা ভিন্ন কিছু করতে বা হতে পারতাম। এ সবকিছুই মুমকিনুল ওজুদ ধারণার মধ্যে আছে। আচ্ছা, যখন আপনারা এ বিষয় নিয়ে চিন্তা করেন, আপনাদের যদি এক নতুন ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে হয়, যে ভবিষৎ বর্তমান অবস্থা থেকে ভিন্ন— সে বর্তমান অবস্থাকে বর্ণনা করার জন্য আমার অনেক কথা বলা লাগতে পারে। কিন্তু আমাদের সব কথা বা চিন্তার ভিত্তি হবে মুমকিনুল ওজুদ। তো, সে ভবিষ্যৎ নির্মাণের কায়দাকানুন এবং সে জন্য আমার চিন্তনপ্রক্রিয়াটা কেমন হতে পারে? আমার নিজের সিলসিলায় আমার যে মজবুতি বুনিয়াদ প্রোথিত আছে তার সাহায্যে আমাকে সে চিন্তা-ভাবনা করতে হবে।
তারপর ইবনে সিনা তাঁর তৃতীয় ধারণা— ‘মুমতানিউল ওজুদ’ বা ‘অসম্ভাব্য অস্তিত্বে’র কথা উপস্থাপন করলেন। আপনারা এটা ভালো করে জানেন যে, (২+২) কখনো পাঁচ হতে পারে না। কিংবা একটি বর্গাকৃতির বৃত্তের অস্তিত্ব থাকতে পারে না; এবং এই ধরণের অন্যান্য যেসব অসম্ভব বিষয় আছে। এরপরে তিনি (ইবনে সিনা) যুক্তিবিদ্যা এবং গণিতশাস্ত্র থেকে উদাহরণ দিলেন। আপনারা জানেন যে, এগুলো হচ্ছে অস্তিত্বের মৌলিক প্রতিজ্ঞা (Mode of Existence); এবং এ তিনটির বাইরে চতুর্থ কোনো প্রতিজ্ঞা হতে পারে না। ভাবেন, কিন্ত সেটা কেন? হতে পারে ইবনে সিনার এ ব্যাপারে চিন্তার ঘাটতি ছিল। কিন্তু, আপনারা চেষ্টা করতে পারেন। এটি একটি ভালো চ্যালেঞ্জ। আমিও প্রচেষ্টা চালাচ্ছি, কিন্ত, চতুর্থ প্রতিজ্ঞার নাগাল এখনো পাইনি। তবে নিঃসন্দেহে আপনারা চেষ্টা করতে পারেন। কিন্তু মূল বিষয়টি হচ্ছে, সকল চিন্তা ‘অস্তিত্ব’ এবং ‘অনস্তিত্বে’র নানান ধরণ (modalities) এর বোঝাপড়ার কাছে ফিরে আসে। উদাহরণস্বরূপ যখনই আমি বলি, এটি একটি কলম এবং একটি কক্ষে আমি এখন এই বক্তব্য দিচ্ছি; তখন আমি অস্তিত্বের কথা বুঝাচ্ছি, কলম নামক বস্তুকে নির্দেশ করছি; একটি স্থানের কথা বুঝাচ্ছি, যখন ইস্তান্বুলের ইবনে খালদুন ইউনিভার্সিটিতে আমরা সকলে একটি নির্দিষ্ট সময়ে অবস্থান করছি ইত্যাদি কিছু। কিন্ত এই সকল বস্তু স্রেফ কোনো বস্তু নয়; বরং অস্তিত্বের বিভিন্ন প্রকাশ এবং অস্তিত্বের বিভিন্ন ধরণ। বিষয়টা এমন নয় যে, এই সকল বস্তু অস্তিত্বকে গঠন করে। বরং অস্তিত্ব নিজেকে বিভিন্ন আঙিকে (mode), বিভিন্ন রঙে প্রকাশ করে। এটাকেই মুসলিম দার্শনিকরা ‘আনহাইয়ুল ওজুদ’ (Modalities of Existence) নামে অভিহিত করেছেন। মোল্লা সদরা এ নিয়ে অনেক লেখাজোখা করেছেন। বস্তুতপক্ষে তিনি পুনরায় ইবনে সিনার; তবে বেশীরভাগ ইবনুল আরাবির চিন্তাকে যোগসূত্র করে এই গোটা বিষয় সম্পর্কিত চিন্তাকে পরিবর্তন করে দিয়েছেন। সেখানে তিনি বলেন, অস্তিত্ব মানে অস্তিত্বশীলের সামগ্রিকতা বা সমষ্টি নয়; বরং অস্তিত্ব অস্তিত্বশীলের চেয়েও বেশি কিছু। কিন্তু সেটা কেন? উদাহরণস্বরূপ— যখন আপনারা কোনো ‘বই’য়ের কথা চিন্তা করেন; আচ্ছা— ‘বই’ কী? ‘বই’ কি এর মলাট, পৃষ্ঠাসংখ্যা, রঙ, কালি এসব-সহ আরো অনান্য ভৌত গুণের সমষ্টি? আসলে এ সকল কিছু হচ্ছে বইয়ের ভৌত সম্পত্তি; কিন্তু খোদ ‘বই’ নয়। বরং ‘বই’ এ সকল ভৌত বৈশিষ্ট্যের (physical properties) সমষ্টির চেয়েও বেশি কিছুকে বোঝায়। ‘বই’ হচ্ছে— যা আপনারা পড়েন। বই হচ্ছে— যা থেকে আপনারা কিছু শিখেন। একই বইটি আরো ছোট ফন্টে মুদ্রণ করা যেতে পারে, যেন বইয়ের কলেবর দেড়শত পৃষ্ঠায় চলে আসে; কিংবা বইটি ছবি সহকারে অথবা ছবি বাদে আরো বড় ফন্টে মুদ্রণ করলে দুইশ পৃষ্ঠায় চলে আসবে। কিন্তু এসব পরিবর্তনের কারণে বই তার ‘বই’ হওয়ার কিংবা জ্ঞান বা তথ্যের উৎস হওয়ার গুনাগুণ হারিয়ে ফেলে না। ভৌত বৈশিষ্ট্যের পরিবর্তন হয় ঠিক; কিন্তু ভৌত বৈশিষ্ট্য পরিবর্তনের কারণে বইয়ের মূল পরিচয় হারিয়ে যায় না। আচ্ছা, আপনারা এখন যে চেয়ারটিতে বসে আছেন; চিন্তা করতে পারেন— নানান কিসিমের, নানান রঙয়ের, নানান আকারের, নানান পায়ের এবং নানান আরামদায়ক রকমের কত হাজার হাজার চেয়ার আছে। সবগুলোই কিন্তু চেয়ার। তাহলে চেয়ার কী? মুসলিম দার্শনিকরা বলেছেন চেয়ারের সত্তা (Essence বা Quiddity) হচ্ছে চেয়ারের সংজ্ঞা। চেয়ারের আকার-রূপ পরিবর্তন হতে পারে, অনেক বিভিন্ন গড়নে চেয়ারের আকৃতি আসতে পারে।
সুতরাং মূল কথা হচ্ছে তারা এ চিন্তাকে অস্তিত্বের বাকিদের উপরে প্রয়োগ করেছেন। আপনাদের সামনে কত অজস্র ধরণের বস্তু আছে— যা নানা রূপে, নানা রঙে এবং নানা আকারে প্রকাশিত হয়। আর এসব কিছুকে অস্তিত্বের বাস্তবতা (Reality of Existence) ঐক্যবদ্ধ করে রাখে। বিষয়টা এমন নয় যে আমরা যাকে অস্তিত্ব বলি, তাকে এ সকল বস্তু তৈরি করে। বরং অস্তিত্বই নিজেকে বিভিন্ন আকার এবং আকৃতিতে প্রকাশ করে বা প্রকাশিত হয়। আর প্রতিটি তাৎপর্যপূর্ণ চিন্তা হচ্ছে অস্তিত্বের এসব বিভিন্ন ধরণ (Modalities) নিয়ে বোঝাপড়ার চর্চা করা। যখন আমরা এ ধারণাটা মেনে নিই যে, পয়লা আমাদেরকে আমাদের মনের অভ্যন্তরীণ বোঝাপড়ার প্রক্রিয়াকে অতিক্রম করতে হবে এবং খোদ অস্তিত্বে গিয়ে হাজির হতে হবে; তখন আমি আর নিজেকে চুড়ান্ত সত্তার ( Being) মতো সেমি-গড হওয়ার ভান ধরতে পারি না যে জগতকে অনেক উপর থেকে দেখে; অথবা থমাস নেগালের Position of Nowhere থেকে আমি জগতকে দেখতে পারি না। আধুনিকতার দম্ভ-অহমিকা এটাই যে— [সে মনে করে] ‘আমি জগতকে স্বাভাবিক অবস্থান থেকে দেখতে পারি, যেভাবে খোদা জগতকে দেখেন। কারণ আমি জগতের অর্থ ঠিক করে দিই। আমিই জগতের অর্থ প্রদান করি। কারণ জগতের কোনো অর্থ নাই’। ১৯৩০ এবং ১৯৪০ দশকের দিকে লজিকাল পজিটিভিস্টরা বিজ্ঞানবাদের চুড়ান্ত পর্যায়ে গিয়ে এ বিষয়টিই বলেন যে, জগতের নিজস্ব কোনো অর্থ নেই। জগত হচ্ছে নিছক বস্তু। আর বস্তু মানেই আঁধার এবং বস্তু মানেই এর কোনো নিজস্ব অর্থ নেই। কাজেই আমিই বস্তুর অর্থ ঠিক করে দেই। সুতরাং আধুনিকতা কয়েক শতাব্দী ধরে আলোকায়ন (এনলাইটেনমেন্ট) চিন্তার মধ্য দিয়ে যাওয়ায়, তা ব্যক্তি মানুষকে সেমি-গডে পরিণত করেছে যে, সে মনে করে— ‘আমি হচ্ছি মহাবিশ্বের কেন্দ্রবিন্দু’। এখানে স্ববিরোধিতার যে ব্যাপারটি ঘটেছে তা হল— জগতকে মহাবিশ্বের কেন্দ্রবিন্দুতে স্থান দেওয়ার কারণে আধুনিক বিজ্ঞান মধ্যযুগীয় খ্রিস্টান থিওলজিকে সমালোচনা করেছিল; অথচ আলোকায়ন চিন্তা সেই জায়গায় কর্তাসত্তা হিসেবে মানুষকে স্থলাভিষিক্ত করল। মানুষ হয়ে উঠল মহাবিশ্বের কেন্দ্রবিন্দু। কেননা শুধুমাত্র জগতের নয়, পুরো অস্তিত্বের এবং নক্ষত্রপুঞ্জসহ তামাম মহাবিশ্বের কোনো অর্থ নেই; বরং আমিই (মানুষ) এর অর্থ আরোপ করি। এটাই হচ্ছে আধুনিকতার দম্ভ। ইসলামি বুদ্ধিবৃত্তিক সিলসিলায় আমাদের কখনো এ সমস্যাটা ছিল না। কারণ হচ্ছে যে মূলনীতির কথাটা আমি আগে বলেছিলাম— ইসলামি চিন্তা অনুযায়ী যে মুহূর্তে অস্তিত্বের জগত অস্তিত্ববান বা সৃষ্টি হওয়া শুরু হয়, তখন তা অর্থ সাথে করেই নিয়ে আসে। আমি মনে করি কোরআনে এটা স্পষ্টভাবে বলা আছে। কোরআন আমাদেরকে শিক্ষা দেয় কিভাবে প্রার্থনা করতে হয়; رَبَّنَا مَا خَلَقْت هَذا بَاطِلاً, “হে আমার প্রতিপালক! এসব তুমি অনর্থক সৃষ্টি করনি” (সুরা আলে-ইমরান, আয়াতঃ ১৯১)। তাছাড়া আপনারা জানেন, অন্যান্য আয়াতে আকাশ এবং জমিনের কথা বলা হয়েছে; আর এ সবকিছু আল্লাহ মানুষের সেবার জন্য তৈরি করেছেন। তারপর তিনি মহাবিশ্বকে সুবিন্যস্ততা (মিযান) দান করেছেন। আল্লাহ আমাদেরকে এ প্রার্থনাটি করতে বললেন এবং আল্লাহ নিজের কাছে নিজে প্রার্থনা করছেন না, বরং তিনি আমাদেরকে তাঁর কাছে প্রার্থনা করতে বলছেন। তার মানে হচ্ছে এ সবকিছুর নিজস্ব উদ্দেশ্য আছে; সেটা আমি বুঝতে পারি বা না পারি। বিষয়টি যদি তা-ই হয়, তাহলে চিন্তন-প্রক্রিয়ায় দুটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান জড়িয়ে আছে। একদিকে আমি অবশ্যই ‘বস্তু’ এবং ‘ধারণা’র মাঝে সম্পর্ক তৈরি করি, সেই সাথে ধারণা বা প্রত্যয়সমূহ পরস্পর সম্পর্ক তৈরি করে তাদের মাঝে। এটা চিন্তন-প্রক্রিয়ার একটি দিক। একইসাথে বস্তুর প্রকৃতির মাঝে যে সহজাত অর্থ আছে তা আমি আবিষ্কার করি এবং প্রকাশ করি। তাহলে Generic Terms অনুযায়ী, আমরা প্রথম দিকটিকে বলতে পারি ‘ইনশা’; অর্থাৎ আমি নিজে অর্থ তৈরি করি। আর দ্বিতীয় দিকটিকে বলতে পারি ‘কাশফ’। সুতরাং ‘ইনশা’ হচ্ছে— আমি জ্ঞান এবং তথ্য তৈরি করি, পাশাপাশি আমি বিভিন্ন উদ্দেশ্যমূলক জ্ঞান জমায়েত করি। আমি যে নতুন কিছু তৈরি করছি, এতে কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু জ্ঞান নির্মাণের এ প্রক্রিয়া আমাকে জগতের একমাত্র মালিক বা ব্যাখ্যাকার বানিয়ে দেয় না। তবে অবশ্যই আমি আমার নিজের অবদান রাখছি।
তারপর দ্বিতীয় উপাদানটি হচ্ছে ‘কাশফ’— মানে উন্মোচন করা, আবিষ্কার করা, পর্দা সরিয়ে নেওয়া। যাতে করে খোদ সত্য প্রকাশিত হতে পারে। সুতরাং চিন্তার দ্বিতীয় বোঝাপড়া বা দিকটি হচ্ছে— আমার কাজ হল— আমি বস্তুকে তাদের মতো হতে দিব, আমি তাতে হস্তক্ষেপ করব না এবং তাদের অস্তিত্বের অবস্থার উপর সীমালঙ্ঘন করবো না; বরং আমি তাদেরকে তাদের মতো হতে দিব যাতে করে তারা নিজেরাই নিজেদের বাস্তবতাকে জাহির করতে পারে। অবশ্য তার জন্য আমাকে অস্তিত্বের বাস্তবতায় হাজির হতে হবে। আমাকে এ বিষয়টা গুরুত্বের সাথে নিতে হবে। আমি ‘জগতের প্রভু’ টাইপের আচরণ করতে পারি না। জগতের সাথে আমাকে আমার বিশ্বাস অনুযায়ী আচরণ করতে হবে এবং আমাকে জগতের জিম্মাদার হতে হবে। যে কারণে আধুনিক জমানায় পরিবেশ সংকট উদ্ভুত হয়েছে, তা হচ্ছে— আমাদেরকে আমানত হিসেবে দেয়া ‘জগত’-এর সঙ্গে আমরা বিশ্বাসের সাথে দেখভাল করা বন্ধ করে দিয়েছিলাম। বরং জগতকে আমাদের মালিকানাধীন কিছু হিসেবে চিহ্নিত করেছি। ফলে আমরা ধরে নিয়েছি যে জগতের সাথে আমরা যেকোনো কিছু করতে পারি; কিংবা জগতের কাছ থেকে যে কোনোকিছু আবদার করতে পারি। কিন্ত ঘটনাতো এমন হওয়ার কথা ছিল না। এর পরিণতি আমরা বর্তমান দুনিয়ায় দেখতে পাচ্ছি।
সুতরাং আমি যখন কাশফের কথা বলছি তখন আমি সাধারণত পরিভাষাটির মরমি অর্থে বুঝাচ্ছি না; যদিও পরিভাষাটি এমন বুঝাতে পারে। কাশফ হচ্ছে পর্দা উন্মোচন করার মতো; এবং আমার অধ্যাপক সাইয়্যেদ হুসেইন নাসর একবার আমাকে একটি ঘটনা বলেছিলেন। (আল্লাহ উনাকে দীর্ঘ এবং সুস্থ হায়াত দান করুন।) ঘটনাটি হচ্ছে, তখন হেনরি করবিন ইরানে পড়াচ্ছিলেন; এবং সেটা ছিলো বিপ্লবের আগে ১৯৭০ দশকের দিকে। একদিন খুব সম্ভবত আল্লামা তাবাতাবায়ি করবিনের কাছে জানতে চাইলেন, Phenomenology-কে কিভাবে তিনি ইসলামি পরিভাষায় তর্জমা করবেন। কারণ তিনি ফেনোমেনোলজি নিয়ে কথা বলছিলেন এবং তিনি এ বিষয়ে হুসার্ল, হাইডেগারসহ অন্যান্যদের লেখালেখিগুলো পড়াচ্ছিলেন; তাই তিনি এ কৌতূহলোদ্দীপক প্রশ্নটি করলেন। (কেননা ফেনোমেনোলজিকে আমি আমার নিজের ভাষায় বুঝতে চাই।) তাহলে ‘ফেনোমেনোলজি’কে আপনি কিভাবে আরবি, ফার্সি বা তার্কিশে তরজমা করবেন? আপনারা একবার চেষ্টা করে দেখতে পারেন। কখনো কি এ নিয়ে চিন্তাভাবনা করেছেন? আপনারা তো ‘ফেনোমেনোলজি’ সম্পর্কে জানেন, তাই না? ফেনোমেনোলজি হচ্ছে দর্শনের একটি শাখা যা দাবি করে বা এর লক্ষ্য হচ্ছে বস্তুকে তাদের নিজের মতো হতে দেয়া, নিজের মতো করে কথা বলতে দেয়া; কর্তাসত্তা (knowing Subject) এবং খোদ বস্তুর মাঝখানের দেয়াল/প্রতিবন্ধকতা সরিয়ে দিন, যাতে করে আপনি জানতে পারেন যে, সূর্য আপনা আপনি আলো দেয়, ফুল নিজে নিজে সুবাস ছড়ায়। আপনাকে কিছুই করতে হবে না, আপনি কেবল তাদেরকে তাদের মতো হতে দিন। তারপর হেনরি করবিন চমৎকার এক জওয়াব দিলেন। তিনি বললেন, আমি ফেনোমেনোলজিকে ‘কাশফুল মাহযুব’ পরিভাষায় তর্জমা করব। কাশফুল মাহযুব অর্থ হচ্ছে প্রতিবন্ধকতা সরিয়ে দেওয়া। অবশ্য এটা ‘তাসাওউফ’ নিয়ে কালাবাজি’র একটি বইয়ের নামও বটে [আসলে ‘তাসাওউফ’ নিয়ে আবু বকর আল কালাবাজি’র লিখিত বইয়ের নাম ‘কিতাব আত তা’আররুফ’ এবং ‘কাশফুল মাহজুব’ লিখেছেন আলী হুজওয়িরি – সম্পাদক]। কাজেই এটা আমাদের সিলসালার একটি জনপ্রিয় পরিভাষা। বস্তুকে জানার জন্য বস্তুর সামনের পর্দা সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে কাশফুল মাহযুবের মূল কাজ; উন্মোচন করা বা পর্দা সরিয়ে দেয়া। তার মানে হচ্ছে আপনাকে অবশ্যই বস্তুকে গুরত্বপূর্ণ মনে করতে হবে; অর্থাৎ তাদের সাথে আপনাকে বিজড়িত হতে হবে। এবার তাহলে এ ধারণাকে সামাজিক পর্যায়ে এবং অন্যান্য সমাজ-সংস্কৃতিতে প্রয়োগ করুন; দেখবেন আপনি তখন আর তাদেরকে অর্থহীন, গুরুত্বহীন, পরিচয়হীন এবং স্মৃতিশূন্য হিসেবে বিবেচনা করতে পারবেন না। এটা প্রয়োগ করতে পারেন অন্যান্য মানব গোষ্ঠী, সমাজ, সংস্কৃতির ক্ষেত্রে— যারা আমাদের কাছে বিলকুল অপরিচিত ছিল, যাদের সম্পর্কে আমাদের জানাশোনা ছিল না বললেই চলে।
অবশ্য বর্তমানে মোটামুটি সবকিছু সম্পর্কে আমরা কিছুটা হলেও জানি। কিন্তু একশত বছর আগে যদি চীনা সংস্কৃতি বা অস্ট্রেলিয়ান আদিবাসীদের কিংবা উত্তর আমেরিকার নেটিভ আমেরিকানদের সম্পর্কে আপনাকে জিজ্ঞেস করা হতো, আমরা তাদের সম্পর্কে বেশি কিছু জানতাম না; তাদের ভাষা কী? সংস্কৃতি কী? কিংবা তাদের খাদ্যোভাস কী? সত্যি তখন আমরা আসলে তেমন কিছুই জানতাম না। কিন্তু এ মূলনীতি অনুযায়ী আপনাকে প্রথম ধরে নিতে হবে যে, তারা আমাদের সমপর্যায়ের; মানুষ হিসেবে তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি, সিলসিলা, অর্থের ব্যাপ্তি এবং সম্পর্কের প্রেক্ষাপট আছে। তাই আপনারা তাদের সাথে নৃশংস পশুর মতো আচরণ করতে পারেন না— যেমনটা উনবিংশ শতাব্দীর দিকে ইউরোপিয় উপনিবেশিকরা করেছিল। আমি আমার প্রকাশি
26/07/2022
রাষ্ট্রদর্শনে আল ফারাবীর অবদান
................অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ শাহজাহান
১) সমাজের প্রয়োজনীয়তা
মানুষ এমনভাবে সৃষ্ট যে তার উদ্দেশ্য সাধনের জন্যে অনেক কিছুর দরকার হয়। কিন্তু সে একা সেই প্রয়োজন মেটাতে পারে না। তাই প্রয়োজনের খাতিরে পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে গড়ে ওঠে সমাজ। বিভিন্ন প্রকার উদ্দেশ্য সাধনের জন্যে বিভিন্ন ধরনের সমাজ গঠিত হয়। সমাজ যত বড় হয়, মানুষ তত বেশি সুযোগ সুবিধা ভোগ করতে পারে। মানুষের সমাজ ঘরবাড়ির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। ধীরে ধীরে ক্রমবিকাশের ধারায় গড়ে ওঠে বস্তি, গ্রাম, শহর ও নগর। মানুষ সমাজের উন্নয়নকল্পে কাজ করে, যা পরবর্তীকালে রাষ্ট্রে পরিণত হয়। রাষ্ট্রে বসবাসকারী জনসমষ্টিকে জাতি (উম্মাহ) বলে আখ্যায়িত করা হয়। ভৌগোলিক পরিবেশ, আবহাওয়া ও জলবায়ু, আচার-আচরণ এবং ভাষার ভিত্তিতে এক জাতিকে অন্য জাতি থেকে পৃথক করা যায়।[1]
মানুষের সমাজ প্রধানত দুই প্রকার: (ক) অপূর্ণ সমাজ ও (খ) পূর্ণ সমাজ। একটি পূর্ণ সমাজ রাষ্ট্রের রূপ পরিগ্রহ করে। পূর্ণ সমাজ বা রাষ্ট্র আবার তিন ধরনের হতে পারে। যথা: বড়, মধ্যম ও ছোট। যখন সারা বিশ্বের রাষ্ট্রগুলো পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে মানব কল্যাণের জন্যে সুসংঘবদ্ধভাবে কাজ করে তখন গড়ে ওঠে বৃহত্তম বিশ্ব রাষ্ট্র। মাঝরি ধরনের সংগঠন বা রাষ্ট্র হচ্ছে সাম্রাজ্য ও খিলাফত, যা পৃথিবীর কোনো বৃহত্তর অংশে স্থাপিত হয়। আর নগরের জনসমষ্টি নিয়ে গঠিত হচ্ছে সবচেয়ে ছোট রাষ্ট্র। গ্রাম, বস্তি বা কোনো রাজপথভিত্তিক সংগঠনকে বলা যেতে পারে অপূর্ণ সমাজ।
মানুষের জীবনে কল্যাণ অথবা অকল্যাণ মূলত তাদের ইচ্ছা ও উদ্দেশ্যের উপর নির্ভরশীল। যে সমাজের জনগণ প্রকৃত সুখ অর্জনের উদ্দেশ্যে সহযোগিতার মনোভাব নিয়ে কাজে অগ্রসর হয় তাকে বলা হয় আদর্শ সমাজ। এই মনোভাবাপন্ন রাষ্ট্রকে বলা হয় আদর্শ রাষ্ট্র আর জাতিকে আদর্শ জাতি বলে আখ্যায়িত করা হয়।[2] এরূপ রাষ্ট্রে নাগরিকরা সদগুণসম্পন্ন হবার জন্যে পরস্পরকে সহযোগিতা করে এবং পরিণামে তাদের জীবন সুন্দর ও কল্যাণময় হয়ে ওঠে।[3]
২) রাষ্ট্রপ্রধান
একথা সত্য যে সবাই নেতা হতে পারে না। শারীরিক ক্ষমতা, মানসিক শক্তি, সৎচিন্তা, সদিচ্ছা ও সৎকাজ সম্পাদনের ক্ষেত্রে সবাই সমান নয়। প্রতিটি পেশায়, প্রতিটি বিভাগে নেতৃত্বের প্রয়োজন। সুস্থ শরীর, মুক্ত মন, সুন্দর আচরণ, মোহনীয় ব্যক্তিত্ব, সুদূর প্রসারী কল্পনাশক্তি, সাহসিকতা, মনোযোগ, সৃজনী প্রতিভা, সঠিক নির্দেশদানের ক্ষমতা প্রভৃতি গুণাবলি যে ব্যক্তির মধ্যে বিদ্যমান তিনিই নেতা হিসেবে পরিচিত। নেতারা প্রথম সারির লোক। তাঁদের গুণাবলি ও কার্যক্ষমতা দ্বারা জনসাধারণকে তাঁরা পরিচালিত করেন সত্যের দিকে, সুন্দরের পথে। বিভিন্ন পেশার ভিত্তিতেও নেতৃত্ব গড়ে ওঠে। যেমন কৃষি, ব্যবসা, শিক্ষকতা ইত্যাদি। রাষ্ট্রপ্রধান হবেন সেই ব্যক্তি যিনি রাষ্ট্রের কার্য পরিচালনায় পারদর্শী। তাঁর জন্যে বিজ্ঞান এবং কলা বিষয়ক জ্ঞানের অধিকারী কোনো ব্যক্তিবিশেষের কাছ থেকে কোনো রকম দিকনির্দেশনার প্রয়োজন নেই।[4] এসব গুণাবলির উল্লেখ দ্বারা আল ফারাবী সম্ভবত প্রধান নেতা হযরত মুহাম্মদ (সা) এর প্রতি ইঙ্গিত করেছেন। কল্যাণকামী রাষ্ট্রে রাষ্ট্রপ্রধান হবেন সেই ব্যক্তি যিনি নেতৃত্বের সবদিকেই পারদর্শী। আদর্শ রাষ্ট্রের মাধ্যমে সম্পূর্ণতা ও চরম শান্তি অর্জনের জন্যে তাঁর কাজ হবে সবার সেবা করা। তিনি কারও অনুগত হবেন না। তিনি হবেন সর্বগুণে গুণান্বিত। তিনি তাঁর ধ্যানে, কর্মে, জাগ্রত অবস্থায়, এমনকি নিদ্রিত অবস্থায় সক্রিয় বুদ্ধি থেকে সহযোগিতা পেয়ে থাকেন। তিনি তাঁর আত্মাকে ভালো ভাবে জানেন। তিনি অর্জিত বুদ্ধির অধিকারী। অর্জিত বুদ্ধির অবস্থান হচ্ছে নিষ্ক্রিয় ও সক্রিয় বুদ্ধির মাঝখানে। তিনি সাধনা বলে জাগতিক স্তর থেকে নিজেকে মুক্ত করে আধ্যাত্মিক স্তরে উন্নীত হন এবং সক্রিয় বুদ্ধি থেকে অনুকম্পা লাভ করেন। জড় থেকে মুক্তি এবং সক্রিয় বুদ্ধির অনুকম্পা এই দুইয়ের সমন্বয়ে সৃষ্টি হয় অর্জিত বুদ্ধি। তিনি সেই অর্জিত বুদ্ধির অধিকারী মহামানব।[5] আল্লাহ তায়ালা সক্রিয় বুদ্ধির (হযরত জিবরাঈল (আ) কে আল ফারাবী সক্রিয় বুদ্ধি বলে উল্লেখ করেছেন) মাধ্যমে তাঁর কাছে বাণী পাঠান, মানবতার চরম শীর্ষে তাঁর স্থান, তিনি খোদার আশীর্বাদপুষ্ট। তিনি ভালোভাবে জানেন কোন পথে চললে সুখ অর্জন সম্ভব; তাঁর আত্মা হবে সমুন্নত।
৩) আদর্শ রাষ্ট্রের প্রধান শাসকের গুণাবলি
(১) সুন্দর স্বাস্থ্য, প্রফুল্ল মনের অধিকারী হওয়া এবং নিখুঁত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সুষ্ঠু ব্যবহার ও অন্যান্য প্রবৃত্তির সাথে এর স্বাভাবিক সমন্বয় সাধনে সক্ষম হওয়া।
(২) এমন তীক্ষ্ণ বুদ্ধি বরং প্রজ্ঞার অধিকারী হওয়া যাতে স্থান-কালের প্রেক্ষিতে তিনি কোনো বক্তার উদ্দেশ্য বুঝতে সক্ষম হন।
(৩) এমন স্মরণশক্তির অধিকারী হওয়া যাতে করে তিনি যা দেখেন, শুনেন, বোঝেন ও প্রত্যক্ষ করেন তা স্মরণ রাখতে সক্ষম হন।
(৪) এমন বিজ্ঞতা ও বুদ্ধিমত্তার অধিকারী হওয়া যাতে করে তিনি উদ্ভূত সমস্যার দৃষ্টিকোণ ও প্রেক্ষিত বুঝতে পারেন।
(৫) এমন বাগ্মিতা ও বাকপটুতার অধিকারী হওয়া যার মাধ্যমে তিনি তাঁর মনোভাব সঠিকভাবে ব্যক্ত করতে পারেন।
(৬) শিক্ষা-দীক্ষার প্রতি অনুরাগ এবং সহজ, সরল, স্বাভাবিকভাবে ও ধৈর্য সহকারে জ্ঞান লাভের অভ্যাস।
(৭) কাজকর্মে ভারসাম্যবোধ, পানাহার ও যৌন ইচ্ছার উপর নিয়ন্ত্রণ, অত্যধিক আনন্দের প্রতি অনীহা।
(৮) সত্য গ্রহণ এবং সত্যাশ্রয়ী লোকের সাথে বন্ধুত্ব এবং মিথ্যা বর্জন ও মিথ্যাশ্রয়ী লোকের নিন্দা জ্ঞাপন করার ক্ষমতা অর্জন।
(৯) মহৎ মন, প্রশস্ত অন্তরসম্পন্ন হয়ে সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে থেকে মহানুভবতা ও উদারতার অধিকারী হওয়া।
(১০) ধনসম্পদ, দিনার-দিরহাম অর্জনের প্রতি অমনোযোগী হওয়া।
(১১) প্রকৃতিগতভাবে ন্যায় এবং ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তির প্রতি অনুরক্ত হওয়া এবং অন্যায় অত্যাচার ও অত্যাচারীর কাছ থেকে দূরে অবস্থান করা।
(১২) নিঃসংকোচ, নির্ভয় ও বিনা দ্বিধায় যা ভালো তা কার্যক্ষেত্রে প্রয়োগ করার ক্ষমতা; দৃঢ় সিদ্ধান্ত, অটুট মনোবল এবং সাহসিকতা অর্জন ও প্রয়োজনবোধে জিহাদ পরিচালনার ক্ষমতা।
৪) কল্যাণকামী রাষ্ট্র
যে কল্যাণকামী রাষ্ট্রে জনগণ একত্রিত হয়ে পরস্পরকে সৎকাজ সম্পাদন, সদগুণাবলি ও সুখ অর্জনে সহায়তা করে তাকে সদগুণসম্পন্ন আদর্শ রাষ্ট্র বলে। এ রাষ্ট্রে মানুষের চূড়ান্ত সাফল্য সম্পর্কে জ্ঞান এবং ভালো-মন্দ, সদগুণ, অসদগুণের মধ্যে পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। এখানে শাসক ও নাগরিক সকলেই এসব বিষয় সম্পর্কে নিজেরা জ্ঞান অর্জন করে এবং অপরকে জ্ঞান দান করে, আর সেসব চারিত্রিক সদগুণ অর্জনে তৎপর হয়, যা সুখ অর্জনে সহায়ক এবং সৎকাজের উন্মেষ ঘটায়।[6]
কল্যাণকামী রাষ্ট্রের শাসকদের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক অত্যন্ত জোরালো। তাদের ধ্যান-ধারণা ও কার্যাবলি একই সূত্রে গাঁথা। একই সময়ে অনেক শাসক বিভিন্ন রাষ্ট্র পরিচালনা করতে পারেন, কিন্তু তাঁদের মৌলিক নীতিমালা বাস্তবায়নের ব্যাপারে তাঁরা একতাবদ্ধ। রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিটি ক্ষেত্রে তাঁরা সুসংগঠিত।[7]
কল্যাণকামী রাষ্ট্রের নাগরিকদের মধ্যে রয়েছেন দার্শনিক, বুদ্ধিজীবী, কবি, সাহিত্যিক, ভাষ্যকার, প্রবন্ধকার, শিল্পী, হিসাববিজ্ঞানী, গণিতজ্ঞ, পরিসংখ্যানবিদ, জ্যোতিষী, ডাক্তার, ব্যবসায়ী ও কৃষকশ্রেণি ইত্যাদি।[8]
আদর্শ শাসকের গুণাবলির ভিত্তিতে কল্যাণকামী রাষ্ট্রকে চারভাগে বিভক্ত করা হয়েছে।[9]
৪.১) প্রথম কল্যাণকামী রাষ্ট্র: যে রাষ্ট্রের শাসকদের মধ্যে আদর্শ শাসকের জন্য নির্ধারিত সব গুণ বিদ্যমান তাকে প্রথম পর্যায়ের কল্যাণকামী রাষ্ট্র বলে।
৪.২) দ্বিতীয় কল্যাণকামী রাষ্ট্র: আদর্শ শাসকের গুণাবলি যদি একত্রে দুই বা ততোধিক ব্যক্তির মধ্যে পাওয়া যায় এবং তাঁরা দেশ শাসন করেন তবে শাসকবৃন্দকে দ্বিতীয় পর্যায়ের আদর্শ শাসক এবং তাঁদের দ্বারা শাসিত রাষ্ট্রকে দ্বিতীয় পর্যায়ের কল্যাণকামী রাষ্ট্র বলে।
৪.৩) তৃতীয় কল্যাণকামী রাষ্ট্র: আদর্শ শাসকের জন্য নির্ধারিত গুণাবলি যদি দুই বা ততোধিক ব্যক্তির মধ্যে না পাওয়া যায়, কিন্তু এমন ব্যক্তি যদি পাওয়া যায় যার মধ্যে আদর্শ শাসকের গুণ না থাকলেও তাঁর প্রতিনিধিত্ব করার যোগ্যতা থাকে, এরূপ ব্যক্তি তৃতীয় পর্যায়ের শাসক; আর এ জাতীয় রাষ্ট্র তৃতীয় কল্যাণকামী রাষ্ট্র। এক্ষেত্রে শাসকের মধ্যে যে ছয়টি গুণ থাকা প্রয়োজন তা নিম্নে বর্ণিত হলো:
(ক) বিজ্ঞ দার্শনিকের মতো গুণাবলি অর্জন।
(খ) শরীয়তের নিয়ম-কানুনের উপর বিশেষজ্ঞ হওয়া এবং শিক্ষাদীক্ষার মাধ্যমে তাঁর পূর্ববর্তী আদর্শ শাসকের মতো সুচারুরূপে সমস্যাবলি সমাধানের ক্ষমতা অর্জন করা।
(গ) নতুন পরিস্থিতি থেকে উদ্ভূত যেসব সমস্যা সমাধানের জন্যে শরীয়তের সরাসরি কোনো নিয়ম বর্ণিত হয়নি, সেসব সমস্যা সমাধানকল্পে নিয়ম-কানুন বিশ্লেষণের ক্ষমতা অর্জন।
(ঘ) দূরদর্শিতা এবং সমাজ সংস্কারের জন্যে গৃহীত নির্দেশাবলিকে বাস্তবে রূপদানের শক্তি।
(ঙ) সুন্দর ভাষায় শরীয়তের বিধি-বিধান জনসাধারণের কাছে হৃদয়গ্রাহী করে উপস্থাপনের ক্ষমতা ও বলিষ্ঠভাবে বক্তব্য প্রদানের ক্ষমতা অর্জন।
(চ) সমরাস্ত্র ব্যবহারে সিদ্ধহস্ত ও জিহাদ পরিচালনায় পারদর্শিতা অর্জন।
৪.৪) চতুর্থ কল্যাণকামী রাষ্ট্র: আদর্শ একজন প্রতিনিধির মধ্যে নেতা হবার গুণাগুণ পাওয়া না গেলে দুই বা ততোধিক ব্যক্তির মধ্যে যদি ঐ গুণগুলো পাওয়া যায় এবং তাঁরা যদি প্রথম আদর্শ শাসকের গুণাবলির ভিত্তিতে একত্রে মিলেমিশে রাষ্ট্র পরিচালনা করেন, তাহলে শাসকবৃন্দকে চতুর্থ পর্যায়ের আদর্শ শাসক বলা হবে এবং রাষ্ট্রকে চতুর্থ পর্যায়ের কল্যাণকামী রাষ্ট্র বলা হবে।
যেসব রাষ্ট্র কল্যাণধর্মী নয়, সেই সব রাষ্ট্রকে আল ফারাবী তিনভাগে ভাগ করেছেন। যথা–
অকল্যাণকামী রাষ্ট্র,
অনৈতিক রাষ্ট্র
ভ্রান্ত রাষ্ট্র
৫) অকল্যাণকামী রাষ্ট্র (আল মদীনা আল জাহেলিয়াহ)
কল্যাণকামী রাষ্ট্রের শাসক হচ্ছেন বিচক্ষণ ও বিজ্ঞ ব্যক্তি, যার উদ্দেশ্য হচ্ছে রাষ্ট্রের উন্নতি ও সার্বিক শান্তি প্রতিষ্ঠা, যদি রাষ্ট্রের শাসনতন্ত্র জনগণের কল্যাণ সাধনে ব্যর্থ হয় এবং শাসকদের রাষ্ট্র শাসনের প্রয়োজনীয় গুণাবলি না থাকে তবে সেই রাষ্ট্রকে অকল্যাণকামী রাষ্ট্র বলা যেতে পারে। তিনি অকল্যাণকামী রাষ্ট্রকে ছয় শ্রেণিতে ভাগ করেছেন। যথা–
প্রয়োজনাত্মক রাষ্ট্র
ধনতান্ত্রিক রাষ্ট্র
ভোগবিলাসী রাষ্ট্র
গৌরব-প্রত্যাশী রাষ্ট্র
আধিপত্যবাদী রাষ্ট্র
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র।
পরিশেষে, কল্যাণকামী রাষ্ট্রের মধ্যে পরগাছাধর্মী স্বার্থান্বেষী মহলের অশুভ তৎপরতা সম্পর্কে ফারাবী আমাদেরকে সতর্ক করে দিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে সিয়াসাতুল মাদানীয়াহর অনুসরণে আমরা প্রথমে অকল্যাণকামী রাষ্ট্রের ছয়টি বিভাগ আলোচনার পরে অনৈতিক ও ভ্রান্ত রাষ্ট্র সম্পর্কে বর্ণনা দেব এবং সর্বশেষে কল্যাণকামী রাষ্ট্রে স্বার্থান্বেষী মহলের অশুভ তৎপরতা সম্পর্কে আলোচনা করব।[10]
৫.১) প্রয়োজনাত্মক রাষ্ট্র (আল মদীনা আল জরুরীয়াহ): যে রাষ্ট্রের নাগরিক শুধুমাত্র দেহের অস্তিত্ব সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে প্রয়োজনীয় সামগ্রী অর্জনে পরস্পরকে সাহায্য-সহযোগিতা করে, তাকে প্রয়োজনাত্মক রাষ্ট্র বলে। প্রয়োজনীয় সামগ্রী সংগ্রহের পথ অনেক। যেমন, কুটির শিল্প স্থাপন, শিকার, দস্যুবৃত্তি ইত্যাদি। প্রকাশ্য বা গোপনে উভয় প্রকারেই শিকার, দস্যুবৃত্তি চরিতার্থ করা যেতে পারে। কিছু প্রয়োজনাত্মক রাষ্ট্র আছে যেখানে প্রয়োজনীয় সামগ্রী উৎপাদনের ব্যবস্থা আছে। নাগরিকদের জন্যে প্রয়োজনীয় সামগ্রী সরবরাহে পারদর্শী ব্যক্তি শাসক হিসেবে বিবেচিত হন।[11]
৫.২) ধনতান্ত্রিক রাষ্ট্র (আল মদীনা আল নাযালাহ): যে রাষ্ট্রের নাগরিক শুধুমাত্র অঢেল টাকা-পয়সা, ধন-সম্পদ অর্জন, সংরক্ষণ ও সঞ্চয়ের জন্যে রাষ্ট্র গঠন করে সেই রাষ্ট্রকে ধনতান্ত্রিক রাষ্ট্র বলে। কেবল দৈহিক চাহিদা অনুযায়ী তাঁরা খরচ করেন। সমাজের কল্যাণমূলক কাজে তাঁরা কিছুই ব্যয় করতে নারাজ। ধন-সম্পদ অর্জনে যে ব্যক্তি পারদর্শী সেই ব্যক্তি উত্তম বলে বিবেচিত। অর্থাৎ যে ব্যক্তি নাগরিকদের জন্য যথেষ্ট পরিমাণে ধন-সম্পদ অর্জনে পারদর্শী সেই উত্তম ব্যক্তি বলে বিবেচিত। যে নাগরিকদের জন্য যথেষ্ট পরিমাণে ধন-সম্পদ অর্জন ও সঞ্চয়ের ব্যবস্থা করতে পারবেন তিনিই হবেন ধনতান্ত্রিক রাষ্ট্রের শাসক।[12]
৫.৩) ভোগবিলাসী রাষ্ট্র (আল মদীনা আল খাসসাহ): যে রাষ্ট্রের নাগরিক দৈহিক ও কাল্পনিক সুখ লাভ ও আনন্দ উপভোগের উদ্দেশ্যে একে অপরকে সাহায্য করে, তাকে ভোগবিলাসী রাষ্ট্র বলে। তাঁরা খাদ্য, পানীয়, কামনা ও বাসনার তৃপ্তি সাধনের মাধ্যমে আনন্দ উপভোগ করে থাকে। তাঁরা খেলাধুলা, আমোদ-প্রমোদে দিন কাটায়। তাঁরা মনে করেন, যে ব্যক্তির ভোগ-বিলাস ও আমোদ-প্রমোদের যত বেশি উপকরণ রয়েছে সে তত ভাগ্যবান।[13]
৫.৪) গৌরব-প্রত্যাশী রাষ্ট্র (আল মদীনা আল কারামিয়া): যে রাষ্ট্রের নাগরিক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কথা ও কাজে সম্মান অর্জন ও সম্মান প্রদানের জন্য একে অপরকে সাহায্য করে থাকে, তাকে গৌরব-প্রত্যাশী রাষ্ট্র বলে।[14]
৫.৫) আধিপত্যবাদী রাষ্ট্র (আল মদীনা আল তাগাল্লাব): যে রাষ্ট্রের জনগণ দেশে স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থা কায়েম করার জন্য একে অপরকে সাহায্য করে, তাকে আধিপত্যবাদী রাষ্ট্র বলে। আধিপত্যবাদীরা বিভ্ন্নি উদ্দেশ্য সাধনের জন্য তাঁদের শাসনযন্ত্র পরিচালিত করে। কারও ইচ্ছা খেয়াল-খুশি মতো রক্তপাত, কারও ইচ্ছা ভূমি জবর-দখল, আবার কারও ইচ্ছা মানুষকে দাসানুদাসে পরিণত করা। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ বল ও কৌশল উভয়পন্থা একসাথে প্রয়োগ করে স্বৈরশাসন পরিচালনা করে। স্বৈরাচারীরা অভ্যন্তরীণ বিষয়ে পরস্পরের প্রতি সহানুভূতিশীল এবং বাইরের শত্রু আক্রমণের সময় সমবেতভাবে একে অপরকে রক্ষা করে। জনগণের উপর প্রভুত্ব বিস্তারের জন্য যে ব্যক্তি তাঁর অধীনস্ত স্বৈরাচারী শাসকদেরকে দক্ষতার সাথে পরিচালনা করতে সক্ষম, তিনিই হলেন যোগ্য শাসক। তিনি চিরদিন শাসক হয়ে বেঁচে থাকতে চান। কোনোদিন শাসিত হয়ে জীবনযাপন করতে রাজি নন। প্রভুত্ব বিস্তারের প্রকৃতি, সামরিক সজ্জার বহর ও যুদ্ধাস্ত্রের প্রাচুর্যকে কেন্দ্র করে তাঁদের মধ্যে বাদানুবাদ, প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং বিবাদের সৃষ্টি হয়। এসব শাসকেরা নিষ্ঠুর, অতিরাগী, অপব্যয়ী, অতিলোভী, ভোজনবিলাসী, নেশাগ্রস্ত, কামাসক্ত হয়ে পড়ে। অন্যায়ভাবে অর্জিত সম্পদের মালিকানা নিয়ে পরস্পরের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিগ্রহে লিপ্ত হয় এবং সবসময় আধিপত্য বিস্তারের ফিকির-ফন্দিতে ব্যস্ত থাকে।
(১) কোনো কোনো সময় সারা দেশের জনগণ বৃহত্তর সমাজ গঠনের উদ্দেশ্যে অন্য দেশের উপর অধিপত্য বিস্তারের জন্য তৎপর হয়।
(২) কখনও কখনও বিজয়ী ও বিজিত উভয় দল একসাথে সমমর্যাদা নিয়ে বসবাস করে। আবার কখনও কখনও বিজয়ীরা গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো দখল করে বিজিতদেরকে শোষণ করে।
(৩) কোনো কোনো সময় মাত্র একজন আধিপত্যবাদী শাসক থাকেন। আর প্রশাসন পরিচালনার জন্যে তাঁর সাথে থাকে কিছু সহচর। তিনি এসব সহচরের মাধ্যমে দেশ শাসন করেন। দেশ থেকে প্রাপ্ত সম্পদ দিয়ে তিনি বিলাসী জীবনযাপন করেন এবং সহচরদের ধনসম্পদ অর্জনের সুযোগ দেন। আর দেশের জনসাধারণ শাসকের ইচ্ছানুযায়ী বসবাস করেন। তাঁরা বিনয়ী কিন্তু অবহেলিত। তাঁদের নিজের বলতে কিছুই নেই। তাঁদের কেউ চাষী, কেউ বা ব্যবসায়ী। তাঁরা শাসকহীন মনোবৃত্তির বশীভূত হয়ে জনগণকে শোষণ করে আনন্দ লাভ করেন। আর নাগরিকদের তাঁরা অবদমিত, বিনীত ও নম্র অবস্থানে দেখতে চান; স্বাধীনচেতা ও মহৎ মনের মানুষ সৃষ্টি করা তাঁর কাজ নয়। নিজেদের হীনস্বার্থ চরিতার্থ করার জন্যে শাসকেরা সাধারণ মানুষের সার্বিক উন্নতি কামনা করে না।[15]
৫.৬) গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র (আল মাদীনাতুল জামাআইয়া): গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হচ্ছে সেই রাষ্ট্র যেখানে মানুষের রয়েছে অবাধ স্বাধীনতা, নাগরিকরা সবাই সমান। কোনো দিক দিয়েই একজন অন্যজন অপেক্ষা শ্রেষ্ঠতর হতে পারে না। ফলে গড়ে ওঠে বিভিন্নধর্মী মনমানসিকতা, জন্ম নেয় নানা ধরনের নৈতিক প্রবণতা, এতেই মানুষ আনন্দ লাভ করে। নাগরিকেরা অসংখ্য দলে উপদলে বিভক্ত। সম্ভ্রান্ত ও অসম্ভ্রান্ত সব গোষ্ঠীর মিলনস্থল এই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। এ রাষ্ট্রে শাসক ও শাসিতের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই । বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে শাসিতরাই শাসকদেরকে নিয়ন্ত্রণ করে। অবশ্য যেসব নেতৃবৃন্দ জনগণের স্বাধীনতা সংরক্ষণ করে, ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষা পূরণে সহায়তা করে, অভ্যন্তরীণ সমস্যা ও বহিঃশত্রুর আক্রমণের সময় নিরাপত্তা বিধান করে, নাগরিকেরা সেসব নেতৃবৃন্দের প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে।
আদর্শচ্যুত রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য ও বৈশিষ্ট্য গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পুরোপুরিভাবে বিদ্যমান। আদর্শচ্যুত রাষ্ট্রের মধ্যে তুলনামূলকভাবে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র সবচেয়ে বেশি শান্তিপূর্ণ। তাই তা প্রশংসার দাবিদার। আপাতদৃষ্টিতে কারুকার্যখচিত চাকচিক্যময় পোশাকের মতোই মনে হয়। সবাই গণতান্ত্রিক দেশে বসবাসে আগ্রহী। কেননা, গণতান্ত্রিক দেশে সবার মনের বাসনা পূরণের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হয়। অন্য দেশের নাগরিকেরা সেখানে সুখে-শান্তিতে বসবাসের আশায় ভিড় করে এবং আশাতীতভাবে দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধি পায়। বিভিন্ন জাতির আগমন ও বহুমুখী শিক্ষার সংমিশ্রণে বৈচিত্র্যময় মনমানসিকতার উন্মেষ ও বিকাশ ঘটে।
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে স্থায়ী বাসিন্দা এবং বহিরাগতদের মধ্যে কোনো ভেদাভেদ নেই। সবাই মিলেমিশে একসাথে বাস করে। জীবনধারণের উপকরণ সেখানে সহজেই অর্জন করা যায়। এই পরিবেশে কালক্রমে সদ্গুণসম্পন্ন ব্যক্তিবর্গের আবির্ভাব খুবই স্বাভাবিক। আর সেখানে বসবাস করবে দার্শনিক, অলংকারশাস্ত্রবিদ, কবি-সাহিত্যিকদের মতো জ্ঞানীগুণী সুধীজনবৃন্দ। এখান থেকে আদর্শ রাষ্ট্রের জন্য কিছু মহৎ ব্যক্তি বাছাই করা যেতে পারে। অতএব, দোষগুণের সমাহারে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। যে রাষ্ট্র যত বড় সে রাষ্ট্র তত বেশি সভ্য, জনবহুল, উৎপাদনশীল ও স্বয়ংসম্পূর্ণ। এখানে সৎ ও অসৎ উভয় প্রকার লোক সমভাবে বিদ্যমান।
আদর্শচ্যুত রাষ্ট্র যেমন নৈতিকতা বিবর্জিত, আদর্শহীন নেতৃত্বও তেমনি নীতি বর্জিত। আদর্শহীন নেতৃত্বের উদ্দেশ্য হলো জীবনযাপনের জন্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী সংগ্রহ, আনন্দ উপভোগ, সম্মান, খ্যাতি, প্রশংসা, আধিপত্য অথবা অবাধ স্বাধীনতা অর্জন। অতএব, এ জাতীয় নেতৃত্ব টাকা দিয়ে কেনা যায়। বিশেষ করে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের শাসকদের পদমর্যাদার ক্ষেত্রে এ নীতি অধিক প্রযোজ্য। কেননা, এই রাষ্ট্রে পদমর্যাদার দিক থেকে সবাই সমান। কেউ কারো চেয়ে বড় নয়। গণতান্ত্রিক দেশে শাসকেরা নাগরিকদের অনুকম্পায় তাঁদের পদে অধিষ্ঠিত থাকেন। এর বিনিময়ে তাঁরা নগদ টাকা কিংবা মূল্যবান ব্স্তু দিয়ে নাগরিকদের খুশি রাখেন। জনগণের দৃষ্টিতে আদর্শ নেতা হচ্ছেন এমন ব্যক্তি যার সঠিক বিচারক্ষমতা রয়েছে এবং তিনি সুপরিকল্পিত উপায়ে এমনভাবে দেশ শাসন করবেন যেন তাঁদের সব ইচ্ছাই পূরণ হয়, সদা-সর্বদা শত্রুর কবল থেকে নিজেদেরকে রক্ষা করতে পারেন ও জানমালের নিরাপত্তা থাকে। যদি কোনো আদর্শ ব্যক্তি তাঁদের নেতা হন এবং সার্বিক সুখ লাভের চেষ্টা করেন, তবে জনগণ তাঁকে প্রশাসকের পদে অধিষ্ঠিত করতে নারাজ। এসব শাসক নাগরিকদের হাতে নিহত হন বা ক্ষমতাচ্যুত হন অথবা সবসময় তাঁর জানমালের নিরাপত্তা হুমকির সম্মুখীন থাকে। এক্ষেত্রে গণতান্ত্রিক ও অন্যান্য রাষ্ট্রের অবস্থা একইরূপ। কেননা, সব আদর্শচ্যুত রাষ্ট্রের নাগরিকরা এমন শাসক কামনা করেন যাঁরা তাঁদের ইচ্ছাপূরণ ও স্বার্থসিদ্ধির পথ সুগম করে দেন। তাই তারা মহৎ লোকের শাসন বর্জন করেন। তবুও একথা স্মরণ রাখা কর্তব্য যে, অন্যান্য আদর্শচ্যুত রাষ্ট্রের তুলনায় গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মাধ্যমে আদর্শ রাষ্ট্রে উত্তরণ ও আদর্শ শাসকের নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা সহজ ও ফলপ্রসূ। তাই আদর্শ রাষ্ট্রের পরই গণতন্ত্রের স্থান।[16]
অকল্যাণকামী রাষ্ট্রের নাগরিকরা মানবিক কল্যাণকে সম্মানের মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করে না। তাঁদের মতে সম্মানের মানদণ্ড হলো:
(ক) সম্পদ
(খ) খেলাধুলা ও আনন্দদানের উপকরণ লাভের ক্ষমতা
(গ) জীবন চলার পথে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য সামগ্রী অর্জন
(ঘ) অন্যের উপর আধিপত্য বিস্তারের ক্ষমতা।
শেষোক্ত বিষয়টিকেই অধিকাংশ লোক বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। এমনকি আধিপত্য বিস্তারের শক্তি এবং অন্যকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা অনেকের ঈর্ষার কারণ হয়ে থাকে। অতএব, জনগণের উপর প্রভাব বিস্তার ও রাষ্ট্রের উপর আধিপত্য বিস্তারের ক্ষমতা অকল্যাণকামী রাষ্ট্রে একটি বিশেষ গুণ হয়ে থাকে। কেননা, তাঁদের দৃষ্টিতে আধিপত্য বিস্তারের মাধ্যমে রাষ্ট্রে খ্যাতি অর্জন করা যায়। আর এই খ্যাতির ব্যাপ্তির উপর নির্ভর করে সম্মানের প্রসার। আর আধিপত্যের মাত্রা নির্ণীত হয় তাঁর অনুসারীর সংখ্যা ও শক্তির ভিত্তিতে। যাঁর অনুসারীর সংখ্যা ও শক্তি যত বেশি তিনি তত সম্মানের পাত্র। যাঁর শক্তিশালী সমর্থক রয়েছে তিনি তাঁর প্রতিপক্ষের ক্ষতি সাধন করতে পারেন অতি সহজে। যে ব্যক্তি মানুষের যত বেশি ক্ষতি সাধন করতে সক্ষম সমাজের লোকেরা তাকে সম্মান করে তত বেশি।
অকল্যাণকামী রাষ্ট্রের নাগরিকেরা কোনো কোনো সময় বংশগত ঐতিহ্য ও আভিজাত্যের ধ্বজাধারী ব্যক্তিকে সম্মান প্রদর্শন করে থাকেন। কেননা, অভিজাত পরিবারের বংশধরদের ধনসম্পদ, প্রভাব-প্রতিপত্তি ও সমর্থক থাকে। তাই জনগণ তাঁদেরকে সম্মান প্রদর্শন করে এই আশায় যে, বিনিময়ে কিছু সম্মান ও অর্থসম্পদ লাভ করা যাবে। অকল্যাণকামী রাষ্ট্রের নাগরিকরা মনে করেন যে, তাঁদের দৃষ্টিতে যাঁরা বেশি সম্মানিত তাঁরা হবেন শাসক, আর যাঁরা কম সম্মানিত তাঁরা হবেন শাসিত। ধনসম্পদ, প্রভাব-প্রতিপত্তি, বংশগত ঐতিহ্য ও আভিজাত্যহীন লোকের শাসক হবার কোনো যোগ্যতা নেই।
কোনো কোনো সময় শাসককে সম্মান করা হয় এজন্য যে, তিনি নাগরিকদের প্রয়োজনীয় সামগ্রী, ধনসম্পদ ও আনন্দের উপকরণ সরবরাহ করতে সক্ষম এবং তিনি তার প্রশাসনের মাধ্যমে নাগরিকদের সম্মান প্রদানের ব্যবস্থা করেন। এ ধরনের শাসককে জনগণ পছন্দ করেন। কেননা, তিনি জনগণের জন্য সবকিছুর ব্যবস্থা করেন। কিন্তু বিনিময়ে তিনি চান যে, তাঁর জীবদ্দশায় লোকে তাঁর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করুক এবং মৃত্যুর পরে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ করুক।
তিনি সম্মান লাভের আশায় ধনসম্পদ অর্জন করেন। এই জন্যেই কোনো কোনো শাসক দানশীল হন। তাঁরা একদিকে রাষ্ট্র থেকে কর আদায় করেন এবং অন্যদিকে তা জনগণের স্বার্থে খরচ করেন।
কোনো কোনো সময় শাসকেরা চান যে, তাঁর প্রতি এই সম্মান বংশ পরম্পরায় বজায় থাক এবং তাঁর সন্তান-সন্ততি পরবর্তীকালে সম্মান লাভ করুক। তাই কোনো কোনো শাসক জনসাধারণের কথা চিন্তা না করে ভবিষ্যতে তাঁর নিজের ও বংশের সম্মান লাভের আশায় অর্থ সঞ্চয় করেন। শাসকেরা কোনো কোনো দল উপদলের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করেন এই আশায় যে, তাঁরা বিনিময়ে শাসকদেরকে সম্মান প্রদর্শন করবেন এবং কোনো দল বা উপদলকে সন্তুষ্ট করতে যে সম্পদ ও আনন্দ-উপকরণ প্রভৃতি দরকার তা সরবরাহ করে থাকেন। তাঁরা জৌলুস বৃদ্ধির জন্য কারুকার্যখচিত ঐশ্বর্যমণ্ডিত এমন দালান-কোঠা নির্মাণ করেন, যেখানে জনসাধারণের প্রবেশ নিষেধ। আর তাঁর নিজের ও পরিবারের জন্য তিনি মহামূল্যবান পোষাক ও পদক তৈরি করেন। উপরন্তু তিনি এমনসব আইন প্রণয়ন করেন যাতে বংশানুক্রমে তার সন্তান-সন্ততিরা সেই সম্মনের ভাগী হয়। তাছাড়া, তিনি সেই সমস্ত লোকদের সুযোগ-সুবিধা দান করেন যাঁরা তাঁর সম্মান রক্ষার জন্য কাজ করে থাকেন। তাঁর সম্মান রক্ষার্থে নাগরিকদের মধ্যে যিনি যতটুকু কাজ করেন তাঁকে ততটুকু সুবিধা প্রদান করেন। অপরপক্ষে নাগরিকরা ততক্ষণ পর্যন্ত শাসককে সম্মান প্রদর্শন করেন যতক্ষণ তিনি তাঁদের স্বার্থ সংরক্ষণ করেন। গৌরব-প্রত্যাশী রাষ্ট্র অকল্যাণকামী রাষ্ট্রের মধ্যে সবচেয়ে ভালো, কল্যাণকামী রাষ্ট্রের মতো। তবে যখন সম্মন গ্রহণ ও প্রদানের আশা মাত্রাতিরিক্ত হয় তখন তা স্বৈরাচারী রাষ্ট্রে পরিণত হয়, যা ধীরে ধীরে আধিপত্যবাদী রাষ্ট্রে পরিবর্তিত হয়।
৬) অনৈতিক রাষ্ট্র (আল মদীনা আল ফাসেকাহ): যে রাষ্ট্রের নাগরিকরা সত্তার অস্তিত্ব ও নীতিমালায় (প্রথম কারণ, দ্বিতীয় কারণ, সক্রিয় বুদ্ধি, কার্যকারণ সম্পর্ক, জড়পদার্থ ও আত্মা) বিশ্বাস করে শান্তির প্রকৃতি ও সুখ অর্জনের পন্থা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হওয়া সত্ত্বেও ঐ সব নীতিমালার উপর আমল করে না এবং ইহকাল ও পরকালে সুখ কামনা করে না, সেই রাষ্ট্রকে অনৈতিক রাষ্ট্র বলে। ঐ রাষ্ট্রের নাগরিকরা অকল্যাণকামী রাষ্ট্রের নাগরিকদের মতো ধন-সম্পদ আহরণ, সম্মান অর্জন ও আনন্দ উল্লাসে মত্ত থাকে। অকল্যাণকামী রাষ্ট্রের নাগরিক এবং অনৈতিক রাষ্ট্রের নাগরিকদের কার্যাবলি প্রায় একই রকম। তাঁদের মধ্যে পার্থক্য এটুকুই যে, অকল্যাণকামী রাষ্ট্রের নাগরিকরা সত্তার অস্তিত্ব ও নীতিমালায় বিশ্বাস করে না, অপরপক্ষে অনৈতিক রাষ্ট্রের নাগরিকরা এসব নীতিমালায় বিশ্বাসী। অবশ্য, একথা স্মরণ রাখা প্রয়োজন যে, অকল্যাণকামী রাষ্ট্র এবং অনৈতিক রাষ্ট্রের নাগরিকদের কেউই সুখ অর্জনে সক্ষম নয়।[17]
৭) ভ্রান্ত রাষ্ট্র (আল মদীনা আল দাল্লাহ): যে রাষ্ট্রের নাগরিকরা সুখ অর্জনের প্রতিষ্ঠিত নীতিমালা উপেক্ষা করে শুধুমাত্র ধারণার বশবর্তী হয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করে, সেই রাষ্ট্রকেই ভ্রান্ত রাষ্ট্র বলে। ভ্রান্ত রাষ্ট্রের মাধ্যমে প্রকৃত সুখ অর্জন সম্ভব নয়।[18]
৮) কল্যাণকামী রাষ্ট্রে স্বার্থান্বেষী মহলের তৎপরতা: আদর্শ রাষ্ট্রে বিভিন্ন শ্রেণির অবাঞ্ছিত ব্যক্তির আনাগোনা দেখা যায়। আল ফারাবী এসব লোককে কল্যাণকামী রাষ্ট্রের আগাছা বলে উল্লেখ করেছেন। আগাছা যেমন একটা সুন্দর প্রাণবন্ত চারাগাছের স্বাভাবিক বিকাশের অন্তরায় তেমনি রাষ্ট্রে আগাছাধর্মী এসব অবাঞ্ছিত ব্যক্তি কল্যাণকামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধক। তাদের মধ্যে –
(ক) এক শ্রেণির লোক আছে যাদের কার্যাবলি রাষ্ট্রের শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্যে সহায়ক। কিন্তু তারা সম্মান, শাসনক্ষমতা ও ধনসম্পদ অর্জনের জন্য এসব কাজ করে থাকে। এরা হচ্ছে সুবিধাবাদী দল।
(খ) কেউ কেউ আদর্শচ্যুত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রতি অনুরাগী। যখন তাদেরকে রাষ্ট্রীয় আইন বা ধর্মীয় বিধিবিধান দ্বারা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হয়ে থাকে, তখন তারা স্বপক্ষ সমর্থনের জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে ঐসব বিধিবিধানের ভুল ব্যাখ্যা করে। এই শ্রেণির লোক অপব্যাখ্যাকারী হিসেবে পরিচিত।
(গ) এমন কিছু সংখ্যক লোক আছে যারা সুখ অর্জন ও তার মূলনীতি সম্পর্কে শুধু কল্পনা করতে পারে, কিন্তু তা যথাযথভাবে অনুধাবনে অক্ষম। অতএব, তারা সত্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারে না। তাদের ভ্রান্ত অনুমানের ফলশ্রুতিতে সত্যদর্শীকেও তারা অসত্যবাদী প্রতারক বলে আখ্যায়িত করে। এমনকি তারা এমন ধারণাও পোষণ করে যে, যেসব ব্যক্তি সত্যের অনুসন্ধান করে তারা ভ্রান্ত।
(১) তাদের কেউ কেউ বলে যে, প্রতিটি বস্তুর মধ্যে জটিলতা রয়েছে।
(২) তাদের কেউ কেউ চিন্তা করে যে, সত্য সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করা সম্ভব নয় এবং যারা সত্যের অনুসন্ধান করছে বলে দাবি করে তারা প্রকৃতপক্ষে মিথ্যা কথা বলে। কেননা সত্য সম্পর্কে তারা যা ভাবে, তা সম্পর্কে নির্দিষ্ট কিছু বলতে পারে না।
(৩) তাদের মধ্যে কেউ কেউ এই চিন্তা করে যে, প্রতিটি ব্যক্তির সম্মুখে যা প্রতিভাত হয় তাই সত্য, সে যা চিন্তা করে তাই সঠিক।
(৪) কেউ কেউ এই চিন্তা করে যে, আসলে সত্যের বাস্তব আস্তিত্ব রয়েছে, কিন্তু তা এ পর্যন্ত অনুকরণ করা সম্ভব হয়নি।
(৫) কেউ কেউ এই ধারণা পোষণ করে যে, সত্যের বাস্তব অস্তিত্ব রয়েছে এবং সত্যানুসন্ধানী ব্যক্তিরা সত্য অনুধাবনে সক্ষম। কিন্তু তারা (আগাছাধর্মী ব্যক্তিবর্গ) এই সত্য অনুধাবনে ব্যর্থ হয়েছে। কেননা, তারা মনে করে সত্য অনুধাবনের জন্য যে কষ্ট, পরিশ্রম ও সাধনার প্রয়োজন, সেসব প্রয়োজনীয় গুণাবলি তাদের নেই, অথবা তারা আনন্দ-উল্লাসে বিভোর বিধায় শক্তি থাকা সত্ত্বেও এই সুদূর পথপরিক্রমা ও কঠোর সাধনার প্রতি তাদের আগ্রহ নেই। পরিণামে তারা সত্যাদর্শী লোকদের ভণ্ড, মিথ্যাবাদী, পদলোভী ও স্বার্থান্বেষী বলে আখ্যায়িত করে। তাদের মধ্যে এমন কিছু লোক আছে যারা নিজেদের ভুল বুঝতে পারে এবং অনুতাপ করে, কিন্তু এমন কোনো বিজ্ঞানসম্মত পথের সন্ধান পায় না, যা তাদের সত্যপথ প্রাপ্তির সহায়ক হয়। তারা তখন হতাশাগ্রস্ত অবস্থায় স্থুল আনন্দ লাভের নেশায় ছুটে বেড়ায় এবং রাষ্ট্রে বিভিন্ন ধরনের বিশৃংখলার সৃষ্টি করে। এসব হতাশাগ্রস্ত ব্যক্তি আনন্দ-উল্লাসে বিভোর হয়ে জীবনের দুঃখ-কষ্ট ভুলে থাকতে চায়। তারা সমাজের কোনো কাজে অংশ গ্রহণ করতে পারে না।[19]
এই হলো আগাছাধর্মী ব্যক্তিবর্গের বিভিন্ন শ্রেণির বর্ণনা। তাদের গুণাবলি দিয়ে কোনো আদর্শ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা কিংবা বৃহত্তর জনগোষ্ঠী সৃষ্টি হতে পারে না।
কল্যাণকামী রাষ্ট্রের আদর্শ শাসকের উচিত এসব অবাঞ্ছিত ব্যক্তির প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রাখা। তাদেরকে বিভিন্ন কাজে নিয়োজিত রাখার জন্য এমন ব্যবস্থা গ্রহণ করা যা তাদের পরিশুদ্ধিকরণে সহয়ক হয়। যেমন, (ক) রাষ্ট্র থেকে বহিষ্কার করা, (খ) শাস্তি প্রদান, (গ) কারাগারে আটক রাখা, (ঘ) সৎকাজ সম্পাদনে বাধ্য করা ইত্যাদি।
উপসংহার
ফারাবীর রাষ্ট্রদর্শন রচনার পদ্ধতি অনন্য। ভাষা বলিষ্ঠ ও তাৎপর্যপূর্ণ। জোরালো যুক্তি রয়েছে, পুনরাবৃত্তি নেই। ক্ষেত্র বিশেষে গ্রিক দর্শন দ্বারা প্রভাবিত হলেও ইসলামের মৌলিক ভাবধারাপুষ্ট। ফারাবীর রাষ্ট্রদর্শনে প্লেটোর প্রভাবের চেয়ে ইসলামের প্রভাবই বেশি। এ প্রসঙ্গে রিচার্ড ওয়ালযার যথার্থই বলেছেন:
“It is obvious that Al-Farabi did not intend to proclaim a Utopian philosopher king by taking up Plato’s programme of a perfect state under philosophical rule. He did not mean to compose a philosophical novel, but he rather had in mind the contemporary caliphate, the specific type of supreme rule which Islam had in mind the contemporary caliphate, the specific type of supreme rule which Islam had brought into existence and gradually developed.”[20]
ফারাবী রাষ্ট্রপ্রধানকে ইমাম হিসেবে আখ্যায়িত করেন এবং ইমাম ও রাসূলকে একই সূত্রে গেঁথে রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে রাসূলের কথাও বলেছেন। তিনি রাষ্ট্রপ্রধানের জন্য কতগুলো গুণাবলি নির্ধারণ করেছেন এবং সেই গুণাবলির অভাব দেখা দিলে সদগুণসম্পন্ন ব্যক্তিবর্গ সমষ্টিগতভাবে যাতে দেশ শাসন করতে পারেন, তার বিধান রেখেছেন। প্রজ্ঞা, প্রত্যাদেশ ও অভিজ্ঞতাকে সম্বল করে কল্যাণকামী রাষ্ট্র গঠনের পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে তাঁর অভিমত বাস্তবসম্মত। এই পৃথিবীতে এর দৃষ্টান্ত আছে। হযরত মুহাম্মদ (সা) এবং খোলাফায়ে রাশেদীনের আমলে এমন রাষ্ট্র ছিল। চেষ্টা করলে এখনও এ জাতীয় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।
ই আই জি রোজানথাল বলেন, ফারাবী মানুষের কল্যাণের জন্য যে কথা বলেছেন তা একমাত্র ইসলামী অনুশাসন অর্থাৎ শরীয়াহর মাধ্যমে সম্ভব। রোজেনথালের ভাষায়, “This happiness is guaranteed by Shariah alone”।[21] নৈতিকতা ও অধিবিদ্যার ভিত্তির উপর ফারাবীর রাষ্ট্রদর্শন রচিত ও প্রতিষ্ঠিত। তিনি মদিনাতুল ফাজীলাহ এবং সিয়াসাতুল মাদানীয়াহ গ্রন্থ দুটোর শুরুতেই রাষ্ট্রের তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক ভিত্তি সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। যেমন– খোদার অস্তিত্ব, খোদার গুণাবল
Click here to claim your Sponsored Listing.
Location
Category
Telephone
Website
Address
Sylhet