Al Ihsan Internation kadet Madrasah & School

Al Ihsan Internation kadet Madrasah & School

Share

Contact information, map and directions, contact form, opening hours, services, ratings, photos, videos and announcements from Al Ihsan Internation kadet Madrasah & School, Sirajganj.

27/03/2025
15/12/2023

আল- জামি'আতুল ইসলামিয়া দারুল উলুম দপ্তরীপাড়া মাদরাসা নওগাঁর উদ্যোগে ১দিন ব্যাপী ইছলাহী মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়, গত-১৩ই নভেম্বর ২০২৩ইং রোজ: সোমবার বাদ মাগরিব হত আখেরী পর্যন্ত, সেখানে তাশরিফ আনেন তরজুমানে আকাবির আরেফবিল্লাহ শায়খুল হাদীস শায়খুল উলামা হযরত মাওলানা শাহ আবদুল মতীন বিন হুসাইন সাহেব দামাত বারাকাতুহুম এবং মোবারক দিল হতে উৎসারিত বিস্ময়কর কবিতা-'ভীষণ লালায়িত' পরিবেশন করেন,হাফেয আবূ হোরায়রা এর কণ্ঠে
ভিডিও আকারে দেওয়া হলো...

05/08/2023

সমাজে এক শ্রেণির কিছু মুসলমান আছে, যারা আশূরা-কারবালাকে একাকার করে ফেলেছে। আশূরার ধর্মীয় ঐতিহ্য মহিমা ও ঐতিহাসিক ঘটনাবলির সাথে হিজরি ৬১ সালে সংঘটিত কারবালা প্রান্তরে হযরত ইমাম হোসাইন (রাযি.)এর মর্মান্তিক শাহাদতের ঘটনাকে এক করে ফেলা হয়েছে। শিয়াদের তাজিয়া-মর্সিয়া এবং শোক সমাবেশও যেন আশূরার অংশ। এবার কিন্তু শিয়াদের এসকল চিরাচরিত মিছিল-সমাবেশ করোনাভাইরাসের কারণে অনুষ্ঠিত হতে পারবে না। প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, ইরাক সরকারও কারবালার শোকমিছিল সমাবেশের ওপর বিধি-নিষেধ আরোপ করেছে।

কিন্তু আমাদের আলোচনা ভিন্ন, আশূরার মর্মবাণী বিস্মৃত হয়ে ১০ মুহাররমকে ভিন্নখাতে নিয়ে যাওয়ার সূচনা করার ইতিহাস, কাহিনী স্মরণ করা এবং এখানে আমরা কারবালার প্রচলিত অনুষ্ঠানাদির গোড়াতে প্রবেশ করতে চাই এবং এগুলোর রহস্য কী তাও উদ্ভাবনের চেষ্টা করব।

যুগেযুগে শাসক শ্রেণির মধ্যে এমন কিছু লোকের সন্ধান পাওয়া যায়, যারা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার শীর্ষে অবস্থান করে বিভিন্ন উদ্ভট ঘটনার জন্ম দিয়ে গেছেন। ইতিহাসে এ শ্রেণির লোকেরা বিখ্যাত নয়, কুখ্যাত হয়ে রয়েছেন। এখানে আমরা আব্বাসীয় খেলাফত আমলের প্রবল ক্ষমতাশালী এক ব্যক্তির নাম স্মরণ করতে চাই, যিনি ছিলেন আব্বাসীয় খেলাফতের ন্যায় একটি সুন্নী খেলাফত রাষ্ট্রে প্রথম কারবালার মর্সিয়া-ক্রন্দনের জন্মদাতা মোয়েজদ্দৌলা বোওয়াইয়া (বুইয়া)।

আব্বাসীয় খেলাফত আমলে রাষ্ট্রের সবচেয়ে প্রভাবশালী শাসক বংশ ছিল বার্মাকীরা। খলিফা হারুনুর রশীদের আমলে তাদের পতন ঘটার পর এ খেলাফতে বনি বুইয়া সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী হয় এবং খলিফার নিয়োগ-বিয়োগ তাদের হাতেই চলে যায় এবং তারা বনি বুইয়াদের নিকট হয়ে পড়েন ক্ষমতাহীন। কিছুদিনের মধ্যেই খলিফা ক্ষমতাচ্যুত হন। ইরাকে বনি বুইয়া শাসন ক্ষমতা হিজরি ৩৩৪ সালের ১১ জমাদিউল আউয়াল থেকে হিজরি ৪৪৭ সালের ২২ মুহাররম পর্যন্ত বলবৎ ছিল। তাদের শাসন আমলে সবুজ-শ্যামল এই এলাকা ধ্বংস হয়ে যায়। তারা শিয়া মতাবলম্বী হওয়ার কারণে তীব্র ধর্মীয় বিরোধ ও সুন্নী মুসলমানদের মধ্যে দারুণ ক্ষোভের সঞ্চার হয়। ফলে নানা স্থানে মারাত্মক সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা-হাঙ্গামা ও খুনাখুনির ঘটনা সংঘটিত হতে থাকে।

প্রথম শাসক মোয়েজদ্দৌলার আমলে সুন্নী শাসনের স্থলে তিনি শিয়া শাসনব্যবস্থা প্রবর্তন করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু নানা কারণে সে উদ্যোগ হতে তিনি বিরত থাকেন বলে ইতিহাস হতে জানা যায়। তথাপি তিনি আশুরা দিবসে কিছু কুসংস্কার প্রবর্তন করে ইতিহাসে যে অভিনব দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন, তার প্রেতাত্মারা অনেক ক্ষেত্রে আজও তা আকঁড়ে ধরে আছেন, যার উদাহরণ বহুস্থানেই সুস্পষ্ট।

প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিকভাবে মোয়েজদ্দৌলার আমলে ইরাক ধ্বংস হওয়ার যেসব কারণ ঐতিহাসিকগণ লিপিবদ্ধ করেছেন, তার একটি হচ্ছে- বাগদাদে সাধারণত আহলে সুন্নাতের বসবাস ছিল, তাঁরা সাহাবায়ে কেরামের প্রতি গভীর ভক্তি-সম্মান প্রদর্শন করতেন। মোয়েজদ্দৌলা আশুরা দিবসে নির্দেশ দিলেন যে, ঐদিন সকল লোককে তাদের দোকানপাট বন্ধ রাখতে হবে এবং ইমাম হোসাইন (রা.) এর শোকে মাতম পালন করতে হবে। নারীরা উলঙ্গ মাথায়নূহা (বিলাপকরা) রত অবস্থায় রাস্তায় বের হয়ে আসবে।

মোয়েজদ্দৌলা ১৮ জিলহজকে ‘গাদীরে খুম’ দিবসকে ঈদ উৎসব ঘোষণা করেন। অর্থাৎ এই দিন আনন্দ উৎসব পালন করতে হবে। লোকেরা এইসব কর্মকান্ডকে দ্বীনের পরিপন্থি মনে করায় তাদের দ্বারা জোরপূর্বক এসব কাজ করানো হতে থাকে। ফলে বহু দাঙ্গা-হাঙ্গামা, খুন-খারাবী হয় এবং বহু স্থানে অসন্তোষ বিক্ষোভ দেখা দেয়। এতে মোয়েজদ্দৌলা আরো কঠোর হন এবং হিজরি ৩৫১ সালে সকল মসজিদে সাহাবায়ে কেরামের প্রতি ‘লানত’ সম্বলিত ঘোষণাপত্র টাঙিয়ে দেয়া হয়। শিয়া মতবাদের এ প্রভাবের ফলে আহলে সুন্নাতের বহু লোক সেখান থেকে অন্যত্র হিজরত করে চলে যান।

এখানে শিয়াদের একটি ভ্রান্ত মতবাদের কথা উল্লেখ করতে হয় এবং তা হচ্ছে ‘গাদীরে খুম’ এর সর্ম্পকে ভ্রান্তনীতি। নির্ভরযোগ্য ইতিহাস অনুযায়ী, প্রকৃত ঘটনাটি হচ্ছে এই যে, হুজুর (সা.) মক্কায় বিদায় হজ্জের যাবতীয় কার্যাবলি সমাপ্ত করে মদীনার দিকে যাত্রা করেন, পথে জুহফা নামক স্থান হতে তিন মাইল দূরে খুম নামক একটি স্থান পড়ে, এখানে একটি পুকুর ছিল, যাকে আরবিতে ‘গাদীর’ বলা হয়। তাই স্থানটির নাম হয়ে যায় ‘গাদীরে খুম’। এখানে সকল সাহাবাকে সমবেত করে হুজুর (সা.) একটি সংক্ষিপ্ত ভাষণ প্রদান করেন। এ ভাষণে শেষ পর্যায়ে তিনি বলেন, আমি যার মাহবুব আলীও তাঁর মাহবুব। হে আল্লাহ! যে আলীকে ভালোবাসে, তুমিও তাকে ভালোবাস, আর যে আলীর সাথে শত্রুতা করে, তুমিও তার সাথে শত্রুতা করো।

বিভিন্ন বর্ণনা হতে জানা যায় যে, হযরত আলী (রাযি.)কে রসুলুল্লাহ (সা.) ইয়েমেনে প্রেরণ করেছিলেন, সেখান থেকে তিনি হজ্বে যোগদান করেন। ইয়েমেনে অবস্থানকালে তিনি নিজের এখতিয়ারে এমন একটি ঘটনা ঘটান, যা তার সঙ্গীদের পছন্দ হয়নি। তাদের মধ্যে একজন এসে রসুলুল্লাহ (সা.)এর খেদমতে অভিযোগ করে। হুজুর (সা.) বললেন, আলীর আরো বেশি অধিকার ছিল। এ ধরনের সন্দেহের অবসানকল্পে হুজুর (সা.) উপরোক্ত বাক্য উচ্চারণ করেন, এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে হযরত আলীকে পরবর্তী খলিফা করার ভ্রান্ত মতবাদ শিয়াদের মনগড়া, যার কোনো ভিত্তি নেই।
----------------------------------
লেখক: শায়েখে সানী ও সহকারী পরিচালক, জামিয়া আহলিয়া দারুল উলূম মুঈনুল ইসলাম হাটহাজারী, চট্টগ্রাম।

31/08/2021

জান্নাতে রাইয়ান নামক এক নহর রয়েছে যার কিনারায় থাকবে মুক্তাদানা খচিত এক শহর এবং তা স্বর্ণ এবং রূপা দ্বারা নির্মিত। এ শহরের ৭০ হাজার দরজা থাকবে যা কুরআন বহনকারীদের জন্য নির্মিত হয়েছে।

এখানে হাফেযে কুরআনের স্থলে হামিলে কুরআন শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে, কারণ তাঁরা কুরআন বহন করে চলছেন, এর মাঝে ওলামায়ে কিরামের পাশাপাশি হাফেযে কুরআনগণও অন্তর্ভূক্ত হবেন। আমল শর্ত নয় বরং হিফজ করার কারণেই তারা এরূপ সৌভাগ্যের অধিকারী হবেন। আর যদি কেউ সীনার ভেতর সংরক্ষণের পাশাপাশি আমলকেও যুক্ত করতে পারেন এবং তদনুযায়ী জীবনকে পরিচালনা করেন, তাহলে তাঁদের শুধুমাত্র একটি মহল প্রদান করা হবে সেখানে প্রবেশের জন্য স্বর্ণ ও রৌপ্য নির্মিত ৭০ হাজার দরজা তার সামনে উন্মুক্ত থাকবে। সে এর ভেতরে আসন গ্রহণ করার পর প্রধান ফটক দিয়ে ৭০ হাজার ফেরেশতা সম্ভ্রমে তার সামনে এসে বলবে, আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন আপনাকে সালাম প্রদান করেছেন। এরপর বিভিন্ন ধরনের ৭০ হাজার হাদিয়া তাঁর সামনে পেশ করে বলবে, এগুলো আপনার জন্য আল্লাহ্ তায়ালা পাঠিয়েছেন। এরপর তারা বিদায় নিয়ে চলে যাবেন। দ্বিতীয় দরজা দিয়ে ১ লাখ ৪০ হাজার ফেরেশতা তাঁর সামনে সালাম প্রদান পূর্বক হাদিয়া তোহফা পেশ করে বলবেন, এগুলো আল্লাহ্ তায়ালা আপনার জন্য পাঠিয়েছেন। হাদিয়া পৌঁছে দিয়ে তাঁরাও বিদায় নেবেন। এবার তৃতীয় দরজা দিয়ে দুই লাখ আশি হাজার ফেরেশতা সামনে এসে আল্লাহর পক্ষ থেকে সালাম এবং বিভিন্ন হাদিয়া পৌঁছে দিয়ে বিদায় নিবেন। ৪র্থ দরজা দিয়ে ৫ লাখ ৬০ হাজার ফেরেশতা প্রবেশ করে সালাম এবং ৫ লাখ ৬০ হাজার হাদিয়া পেশ করে চলে যাবেন। এরপর ৫ম দরজা দিয়ে পূর্বের দ্বিগুণ ফেরেশতা প্রবেশ করবেন এবং ক্রমাগত প্রত্যেকটি দরজা দিয়ে পূর্বের দরজার দ্বিগুণ ফেরেশতা প্রবেশ করে সালাম ও হাদিয়া প্রদান করবেন। দুনিয়ার লোকেরা তো ব্যঙ্গ বিদ্রুপ করত “অসহায় ইমাম সাহেব" "বেচারা মৌলভী সাহেব” মানুষের বাড়িতে খেয়ে জীবন ধারণ করে, কিন্তু সে অসহায় ছন্নছাড়া মানুষগুলো কিন্তু কিয়ামতের দিন এরূপ সৌভাগ্যের অধিকারী হবেন।

উৎসঃ ঈমানজাগানিয়া কাহিনী | পৃষ্ঠা-২১
──────⊱◈◈◈⊰──────

11/08/2021

প্রতি বছরের ন্যায় নতুন সৌকর্যের সওগাত নিয়ে এবারো এসেছে নব-দিন। উদিত হয়েছে নব-বর্ষের নতুন হিলাল। এই হিলালের নকীব হল মুহাররম। কালের বিবর্তনে হারিয়ে গেল সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না বিজড়িত কতগুলো দিন। দিনগুলো বছর বছর প্রতিটি ঋতুকে ছুঁয়ে ছুঁয়ে আবার ফিরে এলো নিজ কক্ষে; যেখান থেকে শুরু হয়েছিল। এ চলার নেই কোন অন্ত। যে কারণে মুহাররম মাস কখনো আসছে শীত কালে, কখনো হেমন্ত কালে, কখনো শরৎ কালে, কখনো আবার বর্ষা কালে। লুকিয়ে আছে এ মাসে বিশেষ একটি দিন মুর্হারামের দশম তারিখ। যে দিনটি বিভিন্ন কারণে বিশ্বের ইতিহাসে স্মরণীয় বরণীয়। এ দিনটি মুসলমান জাতির ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যবহ। কারণ পৃথিবীর বয়সে বহু বড় বড় ঘটনা এ দিনেই সংঘটিত হয়েছে।

মুহাররম মাসের এ দিনটিরই নামকরণ করা হয়েছে আশূরা নামে। আশূরার দিনটি বড় মহৎ ও গভীর তাৎপর্যপূর্ণ। উম্মতে মুহাম্মদীর পূর্ব আমল হতেই এর মাহাত্ম্য, শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিত। হযরত মূসা (আ.) দীর্ঘদিন পর্যন্ত বনী ইসরাঈলকে আল্লাহর প্রতি দাওয়াত দিচ্ছিলেন। তাঁর দাওয়াতে একটা বৃহৎ জনপদ আল্লাহর একত্বের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে উঠে এবং হযরত মূসা (আ.)এর অনুসরণ করে আল্লাহ তায়ালার প্রিয় পাত্রে পরিণত হয়।

কিন্তু গদিনশীন সরকার ছিল আত্মম্ভরিতার তুঙ্গে। নাম ছিল তার অলিদ ইব্নে মাসআব ইব্নে রাইহান। নিয়ামতে ইলাহীর সপ্তডিঙ্গায় আরোহী এ নরাধম। এ নাফরমান নিজেকে সাধারণ মানুষ থেকে আলাদা করে প্রভুত্ব ফলাচ্ছিল সাধারণ প্রজাদের উপর। আকাশ তলে যমীন চরে আরো প্রভু আছে বটে, তবে তার মত এত বড় কেউ নেই বলে দাবী করেছিল সে। কুরআনুল কারীমের ভাষায়- “আনা রাব্বুকুমুল আ’লা” ছিল তার দাবী যার অর্থ- আমি তোমাদের সব চেয়ে বড় প্রভু।

আল্লাহর প্রিয় বান্দা বনী ইসরাঈল ছিল তার ও তার অনুসারীদের চাকর-চাকরানীর কাতারে। বাধ্যবাধকতা ছিল তাদের উপর কঠিনভাবে চাপানো। অত্যাচার, অনাচারের ষ্ট্রিম রোলার ছিল সর্বদাই গতিশীল। প্রত্যাখাত ছিল তাদের সকল আবদার আবেদন। বালকদের করেছিল হত্যা, আর মহিলাদের করে রেখেছিল দাসী।

তরমুজ বিক্রেতা চাষীর ছেলে যেখানে বড় প্রভু (?) আর আল্লাহর অনুগত বান্দারা যেখানে সাধারণ মযলুম প্রজা, সেখানে কি বিষাক্ত পরিবেশ বিরাজ করছিল তা আর নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না।

বনী ইসরাঈল গোত্র যালিম ফিরাঊন আর কিবতীদের মার খেতে খেতে কুকুরে শামিল হচ্ছিল, আর মহাপরাক্রমশালী আল্লাহর কাছে পরিত্রাণের আশায় প্রহর গুণছিল। ঠিক এমনি সময় একদিন আল্লাহ তায়ালা হুকুম করলেন- “ফাআস্রি বি ইবাদী লাইলান …।” হে মূসা (আ.) আমার প্রিয় বান্দাদের নিয়ে রাতের আঁধারে মিশর ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে প্রস্থান কর। যে রজনীতে এ শুভ সূচনার পথ উদঘাটিত হয়েছিল, সমুদ্র চিড়ে আল্লাহ তায়ালা বনী ইসরাঈলকে যেদিন মুক্তির পথ করে দিয়েছিলেন সে দিনটি ছিল পবিত্র আশূরার দিন।

ধর্মসংশ্লিষ্ট প্রশ্নোত্তর বিভাগ “জিজ্ঞাসা-সমাধান” পড়ুন
বুখারী শরীফের ব্যাখ্যাগ্রন্থ উমদাতুল ক্বারীর লিখক আল্লামা বদরুদ্দিন আইনী (রাহ্.)এর ভাষ্য অনুযায়ী দুর্বল সূত্রে বর্ণিত ঐতিহাসিক ঘটনাবলী ও আশূরা নাম করণের কারণ হিসেবে নিম্নরূপ বর্ণনা করা হয়েছে। এদিনে আল্লাহ তায়ালা দশ জন নবীকে সম্মান দান করেছেন বলে এ দিনকে আশূরা বলা হয়।

এ পৃথিবীর অস্তিত্ব লাভের সঙ্গেও ১০ তারিখের একটা গভীর সম্পর্ক রয়েছে। কেননা, এদিনেই আল্লাহ তায়ালা সৃষ্টি করেছেন আসমান, যমীন, লওহ-কলম। শুধু যে পৃথিবীর সৃষ্টির সাথেই এ দিনের সম্পর্ক রয়েছে তা নয়, বরং পৃথিবীর লয়ের সঙ্গেও রয়েছে এদিনের সম্পর্ক। কেনা, ক্বিয়ামত এদিনেই সংঘটিত হবে। অতএব, মুহাররমের দশম দিনটি মুসলিম জাতির কাছে বিশেষভাবে স্মরণীয়।

নূহ (আ.)-এর কিশ্তী এদিন জুদী পর্বতে অবতরণ করে।
ইউনূস (আ.)কে এদিন মাছের পেট থেকে মুক্ত করেছেন।
হযরত ইকরামা (রাহ্.)-এর বর্ণনা মতে আল্লাহ তায়ালা এদিন হযরত আদম (আ.)এর তাওবা কবুল করেছেন।
হযরত ইউসুফ (আ.)কে কূপ থেকে মুক্ত করেছেন।
ঈসা (আ.) এদিন জন্ম লাভ করেন এবং এদিনেই তাকে আকাশে উঠিয়ে নেওয়া হয়।
এদিন দাঊদ (আ.)এর তাওবা কবুল করা হয়।
এদিন ইব্রাহীম (আ.) জন্ম লাভ করেন।
ইয়াকূব (আ.)কে দৃষ্টি শক্তি ফিরিয়ে দেওয়া হয়।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলইহি ওয়াসাল্লামের অগ্র-পশ্চাতের সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয় এদিনেই। তিনি বলেন, আইউব (আ.)কে রোগ মুক্তি দেওয়া হয় এবং সুলাইমান (আ.)কে বাদশাহী দান করা হয়। (উমদাতুল ক্বারী- ১১/১১৭-১৮)।
ইমাম আহমদ (রাহ্.) ইবনে আব্বাস (রাযি.) সূত্রে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলইহি ওয়াসাল্লাম মদীনায় উপনীত হয়ে দেখলেন, পবিত্র আশূরার দিনে ইহুদীরা রোযা রাখছে। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, এদিন তোমরা রোযা রেখেছ কেন? তারা বল্ল, এটি অত্যন্ত পবিত্র দিন। এদিন আল্লাহ তায়ালা বনী ইসরাঈলকে তাদের দুশমন ফিরাঊনের কবল থেকে মুক্ত করেছিলেন। ফিরাঊন ও তার দলবলকে নীল নদে ডুবিয়ে চিরতরে খতম করে দিয়েছিলেন। এজন্য হযরত মূসা (আ.) এদিন রোযা রেখেছিলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, মূসা (আ.)-এর সাথে তোমাদের চেয়ে আমরা অধিকতর হকদার। অতঃপর হুযূর সাল্লাল্লাহু আলইহি ওয়াসাল্লাম রোযা রাখলেন এবং সকলকে রোযা রাখার নির্দেশ দিলেন। এ হাদীসটি বুখারী, মুসলিম, নাসাঈ, ইব্নে মাজাহ প্রভৃতি কিতাবসমূহে বর্ণিত হয়েছে। (তাফ্সীরে ইব্নে কাসীর-১/৫৭)।

এদিন দু’টো রোযা রাখা বিধেয়। এহেন নির্দেশের ব্যতিক্রম তথা একটি রোযা রাখাকে ফিকাহ শাস্ত্রবিদগণ মাকরূহ হিসেবে সাব্যস্ত করেছেন। আদি যুগের বিদ্আত প্রথা এড়িয়ে মাকরূহ থেকে মুক্ত হওয়ার লক্ষ্যেই এ নির্দেশ জারি করা হয়েছে। যার উপকার ও ফযীলত সর্বজনের অন্তরে বিদ্যমান। আমাদের ইচ্ছানুযায়ী আমরা দশম দিনের সাথে নবম বা একাদশ এ দু’দিনের যে কোন একটি দিন যোগ করে রোযা রাখতে পারি। এক্ষেত্রে আমাদের মর্জিই বিধিসম্মত।

আবু হুরাইরা (রাযি.) সূত্রে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন- “রমযানের পর শ্রেষ্ঠতম রোযা হচ্ছে মুহাররম মাসের রোযা (অর্থাৎ আশূরার দিন)।” (মুসলিম থেকে মিশকাত শরীফ-১/১৭৮)।

ইব্নে আব্বাস (রাযি.) সূত্রে বর্ণিত তিনি বলেন, আশূরার রোযা ব্যতীত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলইহি ওয়াসাল্লামকে কোন দিনের রোযার উপর অন্য কোন দিনের রোযাকে অধিকতর ফযীলতপূর্ণ বলে তালাশ করতে দেখিনি। (বুখারী, মুসলিম থেকে মিশকাত-১/১৭৮)।

ইব্নে আব্বাস (রাযি.) সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন, যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলইহি ওয়াসাল্লাম আশূরার রোযা রাখলেন এবং সকলকে রোযা রাখতে নির্দেশ দিলেন। সকলে বল্ল, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! এ দিনটিকে ইহুদী-নাসারারা সম্মান প্রদর্শন করে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যদি আমি আগামী বৎসর জীবিত থাকি তাহলে ৯ই মুহাররমেও রোযা রাখব। (মুসলিম থেকে মিশকাত-১/১৭৯)।

আবু কাতাদাহ (রাযি.) সূত্রে বর্ণিত, এক দীর্ঘ হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, আমি আশাকরি আশূরার এক দিনের রোযা বিগত এক বছরের গুনাহ মাফ করিয়ে দিবে। (মুসলিম থেকে মিশকাত-১/১৭৯)।

যাবের ইবনে সামুরাহ (রাযি.) সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলইহি ওয়াসাল্লাম আশূরার দিন রোযা রাখার জন্য নির্দেশ দিতেন, উৎসাহ দিতেন এবং খোঁজ খবর নিতেন। রমযানের রোযা ফরয হওয়ার পর আর কখনো আশূরার রোযা রাখার জন্য আমাদের নির্দেশ দিতেন না, উৎসাহ দিতেন না, খোঁজ খবরও নিতেন না। (মুসলিম, মিশকাত- ১/১৮০)।

আশুরার দিনের গুরুত্ব ও মাহাত্ম্য বক্ষমান নিবন্ধে আলোচিত হাদীস ও ঘটনাবলী দ্বারা অতি সহজেই অনুমেয়। এর গুরুত্ব ও মাহাত্ম্য কারবালার ঘটনার বহু পূর্ব যামানা থেকেই বিদ্যমান। কিন্তু রূঢ় হলেও সত্য, ঐতিহাসিক এ ঘটনাবলী না জানার কারণে শিয়া মতানুসারীদের ন্যায় অজ্ঞ লোকেরা আশূরার দিনকে কেবলমাত্র কারবালার ঘটনার সাথে সম্পৃক্ত করে থাকে, অথচ এটা সম্পূর্ণ ভুল।

হ্যাঁ, ঐতিহাসিক কারবালার ঘটনাও এ দিনেই সংঘটিত হয়েছিল; এতে কোন সন্দেহ নেই। তাই বলে কারবালার ঘটনার সাথেই আশূরাকে শোভিত-সজ্জিত মনে করা নিছক অজ্ঞতা বৈকি?

এদিনের বর্জনীয় আমলসমূহ
কতিপয় প্রচলিত কু-সংস্কার ও শরীয়তে ইসলামিয়ায় নবাবিস্কৃত বিষয়; যা শিয়া ও নাসেবী সম্প্রদায় থেকে উদ্ভূত, তার সংক্ষিপ্ত আলোচনা বক্ষমান নিবন্ধে স্থান দিতে প্রয়াস পাচ্ছি। দেশের প্রায় প্রতিটি অঞ্চলে দেখতে পাওয়া যায় যে, ইমাম হাসান-হুসাইন রাযিয়াল্লাহু আনহুমাকে উপলক্ষ করে হরেক রকম অমানবিক ও অযৌক্তিক কার্যকলাপ সংঘটিত হয়ে থাকে। অথচ এ সবের অনুমোদন ইসলামী শরীয়তে কোনভাবেই খুঁজে পাওয়া যায় না। বরং এসবের প্রতি নিন্দা-ধিক্কার আর অপছন্দই প্রকাশ পেয়েছে।

আশূরাকে উপলক্ষ করে সারা দেশে প্রচলিত জারিগান, পুঁথি পাঠ, হালুয়া-রুটি বিতরণ, কৃত্রিম শোকে মুহ্যমান হয়ে কালো কাপড় পরিধান, শূন্যপদে দিন কাটানো, মাথায় টুপি ব্যবহার না করে লাল কাপড় পেঁচানো, নিরামিশ ভোজন, লাগাতার কয়েকদিন ইমাম হাসান-হুসাইন (রাযি.)এর প্রতি অতিভক্তি দেখানোর অভিপ্রায়ে নিজ বক্ষে-পিঠে ছুরিকাঘাত করা, হায় হাসান! হায় হোসাইন! হায় আলী! ইত্যাদি বলে বিলাপ করা ও পরস্পরে রক্তারক্তির মাধ্যমে কারবালার মর্মান্তিক ঘটনাকে অলিক ও বিকৃত রূপে রূপায়িত করা।

এছাড়াও কথিত ‘হাফ্ত দানা’ পাকানো, মুরগী জবাই করে ‘ফাতিহা’ দেওয়া প্রভৃতি। এ ধরনের হাজারো প্রকার বিদ্আত ও কু-প্রথা নাসেবী শিয়াদের থেকে উদ্ভাবিত হয়ে আমাদের সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রোথিত হয়ে আছে। অতিব দুঃখের সাথে বলতে হচ্ছে যে, আজ আমাদের আহ্লে সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের দাবীদার মুসলিম সম্প্রদায় কর্তৃক অতি ধুমধাম ও গুরুত্ব সহকারে এসব কু-সংস্কার ও নবাবিস্কৃত বিষয়গুলোই পালনীয় ও বরণীয় হয়ে আসছে।

স্মর্তব্য যে, নবী দৌহিত্র হযরত হোসাইন (রাযি.) কারবালার প্রান্তরে নির্মমভাবে শাহাদাত বরণ করেন। ঈমানদার মাত্রই এহেন নির্মম ঘটনায় মর্মাহত হবেন এবং হওয়াটাই ঈমানের দাবী। নবীর উম্মত হয়ে নবী দৌহিত্রের নির্মম শাহাদাতে ব্যথিত হয় না, তাঁর মাগফিরাত কামনা করে না, তাঁর জন্য নবীর বাতলানো পন্থায় ঈসালে সাওয়াব করে না, সমবেদনা প্রকাশ করে না, শোকাহত হয় না এমন পাষুন্ড হৃদয়ের কল্পনাও করা যায় না। তবে যার মনে যেমন চায় তেমন করে শোক পালন করা এটা ইসলাম ও মুসলমানী নয়। বরং তা নির্ভেজাল প্রবৃত্তির দাসত্ব। আশূরা পালন, আশূরা উদযাপনের সঠিক ও নির্ভুল পদ্ধতি তো এটাই, যা রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে অনুসৃত। এতে সংযোগ ও বিয়োগের কোন অবকাশ নেই। তা হচ্ছে ১০ তারিখে রোযা রাখা। ইহুদীদের সামঞ্জস্যতা এড়িয়ে যাবার জন্য ১০ তারিখের সাথে আরো একটি রোযা রাখা।

ইসলামের বিধান মতে আমরা এ দিনটিকে স্মরণ করি কি? মোটেই করি না। একথা আজ আমাদের দেশের হাল-অবস্থা দেখে নির্দ্বিধায় বলে দেওয়া যায়। ইসলাম যাকে অবৈধ জ্ঞানে বর্জন করতে বলেছে, আমরা তাকে বৈধ জ্ঞানে গ্রহণ করছি। এ দিনটিকে উপলক্ষ করে হাজারো কু-সংস্কার বিরাজ করছে দেশের প্রতিটি অঞ্চলে। নিতান্ত পরিতাপের বিষয় এ নিয়ে আমরা কখনো ভাবিনা। এ বিষয়ে দৃষ্টিপাত করার গরজই বোধ করিনা। অথচ খ্রীস্টান মিশনারীরা দারিদ্রতার সুযোগ নিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করে চলেছে। এমনিভাবে কাদিয়ানী ও অন্যান্য বাতিল ফিরকার লোকেরা বিভিন্ন প্রকার প্রলোভন দিয়ে মানুষকে পথভ্রষ্ট ও আদর্শচ্যুত করার চক্রান্তে লিপ্ত রয়েছে।

ইসলামের এহেন স্মরণীয় দিনগুলো মুসলমানী তরীকায় স্মরণ করার শিক্ষা জাতিকে সর্বাগ্রে দিতে হবে। সাথে সাথে কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে এদিনের বর্জনীয় ও করণীয় দিকগুলোও তুলে ধরতে হবে জাতির সামনে। তবেই কু-সংস্কার মুক্ত সমাজ কায়েমে সক্ষম হব আমরা। মাহে মুহাররমের দশ তারিখকেই বলা হয় আশূরা। এ দিনের ফযীলত বিভিন্নগ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে। আশূরার দিন রোযা রাখা সুন্নাত, তার প্রমাণ বহন করছে হাদীসে মুহাম্মদী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। মুহাররমের ১০ তারিখ বহু বিস্ময়কর ঘটনাসমূহ সংঘটিত হয়েছে বলে পূর্ববর্তী সকল পয়গাম্বর ও তাঁদের উম্মতগণ মুহাররম মাসের ১০ তারিখ শুকরিয়া জ্ঞাপন স্বরূপ রোযা রাখতেন। এমন কি কোন কোন নবীর উম্মতের উপর উক্ত দিনের সিয়াম ফরযও করে দেওয়া হয়েছিল।

জ্ঞানী ও ডিগ্রীধারী বন্ধুদের বোধোদয় হোক। সাধারণ মানুষ যাই করুক না কেন, কোন জ্ঞানী ও শিক্ষিত ব্যক্তি যাতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশিত পথের বাইরে আমল না করে এটাই ঈমানের দাবী, এটাই ইসলামের দাবী। নিছক আনুষ্ঠানিকতা ও কৃত্রিমতা ইসলাম নয়। তা ইসলাম বহির্ভূত মনগড়া একটা রুসুম মাত্র।

পবিত্র মুার্হারাম মাস আরবী বছরের প্রথম মাস। এ মাসের নবভাস্কর নবদিগন্তের আমেজ নিয়ে উদয় হোক মুসলিম মিল্লাতের প্রতিটি জীবনে; এটা সকলেরই কামনা-বাসনা। কিন্তু গা ভাসিয়ে দিয়ে সব ধরনের প্রচলন ও কু-সংস্কারের স্রোতে ভেসে যেতে থাকলে কামনা- কামনাই থেকে যাবে। বাস্তবতার মুখ হবে ম্লান, হবে দীপ্তিহীন।

বিবেকবানদের কাছে আমার জিজ্ঞাসা সারা বছর কোন নামায রোযা নেই, ইসলামী আহ্কাম নেই, মুহাররমের ১০ তারিখ ব্লেড বা ছুরি দিয়ে বুকে আঘাত করে তাতে গ্লিসারিন মেখে হায় হাসান! হায় হোসাইন! বলে বুকে চাপড় মারতে থাকলে কি নবী দৌহিত্র, আলীর দুলাল, ফাতিমার কলিজার টুকরা হযরত হাসান ও হযরত হুসাইনের প্রিয়ভাজন হওয়া যাবে? ঘন্টা কয়েক হায় হাসান! হায় হোসাইন! করা বা এ বিলাপ প্রত্যক্ষ করাই কি ঈমানের পরিচায়ক?

হযরত হোসাইন (রাযি.)এর ঘোড়া তো নেই। কাঠ, বাঁশ, কাপড় ও কাগজ দিয়ে একটা নির্জীব ঘোড়া বানিয়ে রাস্তায় রাস্তায় ট্রাকের উপর চড়িয়ে ঘুরালে কি নেকীর মহড়া চলতে থাকবে? না, তা কখনই না। আচ্ছা বিলাপ করলে, জারী গাইলে এতে কি শহীদানে কারবালার আত্মার মাগফিরাত হবে? মোটেই না, তবে শিক্ষিত বিবেকবান হয়েও কেন সমূহ বাহুল্যতায় লিপ্ত হচ্ছে সমাজ? এর একটাই কারণ তা হচ্ছে, ইসলামী অনুশাসনের প্রতি উদাসিনতা ও বেপরোয়ায়ী। একটুখানি উদাসিনতার জন্য কতবড় ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে আজ মিল্লাতে মুহাম্মদী।

লেখক: প্রবীণ মুফতি ও মুহাদ্দিস, মুফতীয়ে আযম ফয়যুল্লাহ (রাহ.)এর শাগরিদে খাস এবং বিভাগীয় প্রধান- দারুল ইফতা, দারুল উলূম মুঈনুল ইসলাম হাটহাজারী মাদ্রাসা, চট্টগ্রাম।প্রতি বছরের ন্যায় নতুন সৌকর্যের সওগাত নিয়ে এবারো এসেছে নব-দিন। উদিত হয়েছে নব-বর্ষের নতুন হিলাল। এই হিলালের নকীব হল মুহাররম। কালের বিবর্তনে হারিয়ে গেল সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না বিজড়িত কতগুলো দিন। দিনগুলো বছর বছর প্রতিটি ঋতুকে ছুঁয়ে ছুঁয়ে আবার ফিরে এলো নিজ কক্ষে; যেখান থেকে শুরু হয়েছিল। এ চলার নেই কোন অন্ত। যে কারণে মুহাররম মাস কখনো আসছে শীত কালে, কখনো হেমন্ত কালে, কখনো শরৎ কালে, কখনো আবার বর্ষা কালে। লুকিয়ে আছে এ মাসে বিশেষ একটি দিন মুর্হারামের দশম তারিখ। যে দিনটি বিভিন্ন কারণে বিশ্বের ইতিহাসে স্মরণীয় বরণীয়। এ দিনটি মুসলমান জাতির ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যবহ। কারণ পৃথিবীর বয়সে বহু বড় বড় ঘটনা এ দিনেই সংঘটিত হয়েছে।

মুহাররম মাসের এ দিনটিরই নামকরণ করা হয়েছে আশূরা নামে। আশূরার দিনটি বড় মহৎ ও গভীর তাৎপর্যপূর্ণ। উম্মতে মুহাম্মদীর পূর্ব আমল হতেই এর মাহাত্ম্য, শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিত। হযরত মূসা (আ.) দীর্ঘদিন পর্যন্ত বনী ইসরাঈলকে আল্লাহর প্রতি দাওয়াত দিচ্ছিলেন। তাঁর দাওয়াতে একটা বৃহৎ জনপদ আল্লাহর একত্বের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে উঠে এবং হযরত মূসা (আ.)এর অনুসরণ করে আল্লাহ তায়ালার প্রিয় পাত্রে পরিণত হয়।

কিন্তু গদিনশীন সরকার ছিল আত্মম্ভরিতার তুঙ্গে। নাম ছিল তার অলিদ ইব্নে মাসআব ইব্নে রাইহান। নিয়ামতে ইলাহীর সপ্তডিঙ্গায় আরোহী এ নরাধম। এ নাফরমান নিজেকে সাধারণ মানুষ থেকে আলাদা করে প্রভুত্ব ফলাচ্ছিল সাধারণ প্রজাদের উপর। আকাশ তলে যমীন চরে আরো প্রভু আছে বটে, তবে তার মত এত বড় কেউ নেই বলে দাবী করেছিল সে। কুরআনুল কারীমের ভাষায়- “আনা রাব্বুকুমুল আ’লা” ছিল তার দাবী যার অর্থ- আমি তোমাদের সব চেয়ে বড় প্রভু।

আল্লাহর প্রিয় বান্দা বনী ইসরাঈল ছিল তার ও তার অনুসারীদের চাকর-চাকরানীর কাতারে। বাধ্যবাধকতা ছিল তাদের উপর কঠিনভাবে চাপানো। অত্যাচার, অনাচারের ষ্ট্রিম রোলার ছিল সর্বদাই গতিশীল। প্রত্যাখাত ছিল তাদের সকল আবদার আবেদন। বালকদের করেছিল হত্যা, আর মহিলাদের করে রেখেছিল দাসী।

তরমুজ বিক্রেতা চাষীর ছেলে যেখানে বড় প্রভু (?) আর আল্লাহর অনুগত বান্দারা যেখানে সাধারণ মযলুম প্রজা, সেখানে কি বিষাক্ত পরিবেশ বিরাজ করছিল তা আর নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না।

বনী ইসরাঈল গোত্র যালিম ফিরাঊন আর কিবতীদের মার খেতে খেতে কুকুরে শামিল হচ্ছিল, আর মহাপরাক্রমশালী আল্লাহর কাছে পরিত্রাণের আশায় প্রহর গুণছিল। ঠিক এমনি সময় একদিন আল্লাহ তায়ালা হুকুম করলেন- “ফাআস্রি বি ইবাদী লাইলান …।” হে মূসা (আ.) আমার প্রিয় বান্দাদের নিয়ে রাতের আঁধারে মিশর ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে প্রস্থান কর। যে রজনীতে এ শুভ সূচনার পথ উদঘাটিত হয়েছিল, সমুদ্র চিড়ে আল্লাহ তায়ালা বনী ইসরাঈলকে যেদিন মুক্তির পথ করে দিয়েছিলেন সে দিনটি ছিল পবিত্র আশূরার দিন।

ধর্মসংশ্লিষ্ট প্রশ্নোত্তর বিভাগ “জিজ্ঞাসা-সমাধান” পড়ুন
বুখারী শরীফের ব্যাখ্যাগ্রন্থ উমদাতুল ক্বারীর লিখক আল্লামা বদরুদ্দিন আইনী (রাহ্.)এর ভাষ্য অনুযায়ী দুর্বল সূত্রে বর্ণিত ঐতিহাসিক ঘটনাবলী ও আশূরা নাম করণের কারণ হিসেবে নিম্নরূপ বর্ণনা করা হয়েছে। এদিনে আল্লাহ তায়ালা দশ জন নবীকে সম্মান দান করেছেন বলে এ দিনকে আশূরা বলা হয়।

এ পৃথিবীর অস্তিত্ব লাভের সঙ্গেও ১০ তারিখের একটা গভীর সম্পর্ক রয়েছে। কেননা, এদিনেই আল্লাহ তায়ালা সৃষ্টি করেছেন আসমান, যমীন, লওহ-কলম। শুধু যে পৃথিবীর সৃষ্টির সাথেই এ দিনের সম্পর্ক রয়েছে তা নয়, বরং পৃথিবীর লয়ের সঙ্গেও রয়েছে এদিনের সম্পর্ক। কেনা, ক্বিয়ামত এদিনেই সংঘটিত হবে। অতএব, মুহাররমের দশম দিনটি মুসলিম জাতির কাছে বিশেষভাবে স্মরণীয়।

নূহ (আ.)-এর কিশ্তী এদিন জুদী পর্বতে অবতরণ করে।
ইউনূস (আ.)কে এদিন মাছের পেট থেকে মুক্ত করেছেন।
হযরত ইকরামা (রাহ্.)-এর বর্ণনা মতে আল্লাহ তায়ালা এদিন হযরত আদম (আ.)এর তাওবা কবুল করেছেন।
হযরত ইউসুফ (আ.)কে কূপ থেকে মুক্ত করেছেন।
ঈসা (আ.) এদিন জন্ম লাভ করেন এবং এদিনেই তাকে আকাশে উঠিয়ে নেওয়া হয়।
এদিন দাঊদ (আ.)এর তাওবা কবুল করা হয়।
এদিন ইব্রাহীম (আ.) জন্ম লাভ করেন।
ইয়াকূব (আ.)কে দৃষ্টি শক্তি ফিরিয়ে দেওয়া হয়।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলইহি ওয়াসাল্লামের অগ্র-পশ্চাতের সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয় এদিনেই। তিনি বলেন, আইউব (আ.)কে রোগ মুক্তি দেওয়া হয় এবং সুলাইমান (আ.)কে বাদশাহী দান করা হয়। (উমদাতুল ক্বারী- ১১/১১৭-১৮)।
ইমাম আহমদ (রাহ্.) ইবনে আব্বাস (রাযি.) সূত্রে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলইহি ওয়াসাল্লাম মদীনায় উপনীত হয়ে দেখলেন, পবিত্র আশূরার দিনে ইহুদীরা রোযা রাখছে। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, এদিন তোমরা রোযা রেখেছ কেন? তারা বল্ল, এটি অত্যন্ত পবিত্র দিন। এদিন আল্লাহ তায়ালা বনী ইসরাঈলকে তাদের দুশমন ফিরাঊনের কবল থেকে মুক্ত করেছিলেন। ফিরাঊন ও তার দলবলকে নীল নদে ডুবিয়ে চিরতরে খতম করে দিয়েছিলেন। এজন্য হযরত মূসা (আ.) এদিন রোযা রেখেছিলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, মূসা (আ.)-এর সাথে তোমাদের চেয়ে আমরা অধিকতর হকদার। অতঃপর হুযূর সাল্লাল্লাহু আলইহি ওয়াসাল্লাম রোযা রাখলেন এবং সকলকে রোযা রাখার নির্দেশ দিলেন। এ হাদীসটি বুখারী, মুসলিম, নাসাঈ, ইব্নে মাজাহ প্রভৃতি কিতাবসমূহে বর্ণিত হয়েছে। (তাফ্সীরে ইব্নে কাসীর-১/৫৭)।

এদিন দু’টো রোযা রাখা বিধেয়। এহেন নির্দেশের ব্যতিক্রম তথা একটি রোযা রাখাকে ফিকাহ শাস্ত্রবিদগণ মাকরূহ হিসেবে সাব্যস্ত করেছেন। আদি যুগের বিদ্আত প্রথা এড়িয়ে মাকরূহ থেকে মুক্ত হওয়ার লক্ষ্যেই এ নির্দেশ জারি করা হয়েছে। যার উপকার ও ফযীলত সর্বজনের অন্তরে বিদ্যমান। আমাদের ইচ্ছানুযায়ী আমরা দশম দিনের সাথে নবম বা একাদশ এ দু’দিনের যে কোন একটি দিন যোগ করে রোযা রাখতে পারি। এক্ষেত্রে আমাদের মর্জিই বিধিসম্মত।

আবু হুরাইরা (রাযি.) সূত্রে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন- “রমযানের পর শ্রেষ্ঠতম রোযা হচ্ছে মুহাররম মাসের রোযা (অর্থাৎ আশূরার দিন)।” (মুসলিম থেকে মিশকাত শরীফ-১/১৭৮)।

ইব্নে আব্বাস (রাযি.) সূত্রে বর্ণিত তিনি বলেন, আশূরার রোযা ব্যতীত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলইহি ওয়াসাল্লামকে কোন দিনের রোযার উপর অন্য কোন দিনের রোযাকে অধিকতর ফযীলতপূর্ণ বলে তালাশ করতে দেখিনি। (বুখারী, মুসলিম থেকে মিশকাত-১/১৭৮)।

ইব্নে আব্বাস (রাযি.) সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন, যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলইহি ওয়াসাল্লাম আশূরার রোযা রাখলেন এবং সকলকে রোযা রাখতে নির্দেশ দিলেন। সকলে বল্ল, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! এ দিনটিকে ইহুদী-নাসারারা সম্মান প্রদর্শন করে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যদি আমি আগামী বৎসর জীবিত থাকি তাহলে ৯ই মুহাররমেও রোযা রাখব। (মুসলিম থেকে মিশকাত-১/১৭৯)।

আবু কাতাদাহ (রাযি.) সূত্রে বর্ণিত, এক দীর্ঘ হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, আমি আশাকরি আশূরার এক দিনের রোযা বিগত এক বছরের গুনাহ মাফ করিয়ে দিবে। (মুসলিম থেকে মিশকাত-১/১৭৯)।

যাবের ইবনে সামুরাহ (রাযি.) সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলইহি ওয়াসাল্লাম আশূরার দিন রোযা রাখার জন্য নির্দেশ দিতেন, উৎসাহ দিতেন এবং খোঁজ খবর নিতেন। রমযানের রোযা ফরয হওয়ার পর আর কখনো আশূরার রোযা রাখার জন্য আমাদের নির্দেশ দিতেন না, উৎসাহ দিতেন না, খোঁজ খবরও নিতেন না। (মুসলিম, মিশকাত- ১/১৮০)।

আশুরার দিনের গুরুত্ব ও মাহাত্ম্য বক্ষমান নিবন্ধে আলোচিত হাদীস ও ঘটনাবলী দ্বারা অতি সহজেই অনুমেয়। এর গুরুত্ব ও মাহাত্ম্য কারবালার ঘটনার বহু পূর্ব যামানা থেকেই বিদ্যমান। কিন্তু রূঢ় হলেও সত্য, ঐতিহাসিক এ ঘটনাবলী না জানার কারণে শিয়া মতানুসারীদের ন্যায় অজ্ঞ লোকেরা আশূরার দিনকে কেবলমাত্র কারবালার ঘটনার সাথে সম্পৃক্ত করে থাকে, অথচ এটা সম্পূর্ণ ভুল।

হ্যাঁ, ঐতিহাসিক কারবালার ঘটনাও এ দিনেই সংঘটিত হয়েছিল; এতে কোন সন্দেহ নেই। তাই বলে কারবালার ঘটনার সাথেই আশূরাকে শোভিত-সজ্জিত মনে করা নিছক অজ্ঞতা বৈকি?

এদিনের বর্জনীয় আমলসমূহ
কতিপয় প্রচলিত কু-সংস্কার ও শরীয়তে ইসলামিয়ায় নবাবিস্কৃত বিষয়; যা শিয়া ও নাসেবী সম্প্রদায় থেকে উদ্ভূত, তার সংক্ষিপ্ত আলোচনা বক্ষমান নিবন্ধে স্থান দিতে প্রয়াস পাচ্ছি। দেশের প্রায় প্রতিটি অঞ্চলে দেখতে পাওয়া যায় যে, ইমাম হাসান-হুসাইন রাযিয়াল্লাহু আনহুমাকে উপলক্ষ করে হরেক রকম অমানবিক ও অযৌক্তিক কার্যকলাপ সংঘটিত হয়ে থাকে। অথচ এ সবের অনুমোদন ইসলামী শরীয়তে কোনভাবেই খুঁজে পাওয়া যায় না। বরং এসবের প্রতি নিন্দা-ধিক্কার আর অপছন্দই প্রকাশ পেয়েছে।

আশূরাকে উপলক্ষ করে সারা দেশে প্রচলিত জারিগান, পুঁথি পাঠ, হালুয়া-রুটি বিতরণ, কৃত্রিম শোকে মুহ্যমান হয়ে কালো কাপড় পরিধান, শূন্যপদে দিন কাটানো, মাথায় টুপি ব্যবহার না করে লাল কাপড় পেঁচানো, নিরামিশ ভোজন, লাগাতার কয়েকদিন ইমাম হাসান-হুসাইন (রাযি.)এর প্রতি অতিভক্তি দেখানোর অভিপ্রায়ে নিজ বক্ষে-পিঠে ছুরিকাঘাত করা, হায় হাসান! হায় হোসাইন! হায় আলী! ইত্যাদি বলে বিলাপ করা ও পরস্পরে রক্তারক্তির মাধ্যমে কারবালার মর্মান্তিক ঘটনাকে অলিক ও বিকৃত রূপে রূপায়িত করা।

এছাড়াও কথিত ‘হাফ্ত দানা’ পাকানো, মুরগী জবাই করে ‘ফাতিহা’ দেওয়া প্রভৃতি। এ ধরনের হাজারো প্রকার বিদ্আত ও কু-প্রথা নাসেবী শিয়াদের থেকে উদ্ভাবিত হয়ে আমাদের সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রোথিত হয়ে আছে। অতিব দুঃখের সাথে বলতে হচ্ছে যে, আজ আমাদের আহ্লে সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের দাবীদার মুসলিম সম্প্রদায় কর্তৃক অতি ধুমধাম ও গুরুত্ব সহকারে এসব কু-সংস্কার ও নবাবিস্কৃত বিষয়গুলোই পালনীয় ও বরণীয় হয়ে আসছে।

স্মর্তব্য যে, নবী দৌহিত্র হযরত হোসাইন (রাযি.) কারবালার প্রান্তরে নির্মমভাবে শাহাদাত বরণ করেন। ঈমানদার মাত্রই এহেন নির্মম ঘটনায় মর্মাহত হবেন এবং হওয়াটাই ঈমানের দাবী। নবীর উম্মত হয়ে নবী দৌহিত্রের নির্মম শাহাদাতে ব্যথিত হয় না, তাঁর মাগফিরাত কামনা করে না, তাঁর জন্য নবীর বাতলানো পন্থায় ঈসালে সাওয়াব করে না, সমবেদনা প্রকাশ করে না, শোকাহত হয় না এমন পাষুন্ড হৃদয়ের কল্পনাও করা যায় না। তবে যার মনে যেমন চায় তেমন করে শোক পালন করা এটা ইসলাম ও মুসলমানী নয়। বরং তা নির্ভেজাল প্রবৃত্তির দাসত্ব। আশূরা পালন, আশূরা উদযাপনের সঠিক ও নির্ভুল পদ্ধতি তো এটাই, যা রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে অনুসৃত। এতে সংযোগ ও বিয়োগের কোন অবকাশ নেই। তা হচ্ছে ১০ তারিখে রোযা রাখা। ইহুদীদের সামঞ্জস্যতা এড়িয়ে যাবার জন্য ১০ তারিখের সাথে আরো একটি রোযা রাখা।

ইসলামের বিধান মতে আমরা এ দিনটিকে স্মরণ করি কি? মোটেই করি না। একথা আজ আমাদের দেশের হাল-অবস্থা দেখে নির্দ্বিধায় বলে দেওয়া যায়। ইসলাম যাকে অবৈধ জ্ঞানে বর্জন করতে বলেছে, আমরা তাকে বৈধ জ্ঞানে গ্রহণ করছি। এ দিনটিকে উপলক্ষ করে হাজারো কু-সংস্কার বিরাজ করছে দেশের প্রতিটি অঞ্চলে। নিতান্ত পরিতাপের বিষয় এ নিয়ে আমরা কখনো ভাবিনা। এ বিষয়ে দৃষ্টিপাত করার গরজই বোধ করিনা। অথচ খ্রীস্টান মিশনারীরা দারিদ্রতার সুযোগ নিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করে চলেছে। এমনিভাবে কাদিয়ানী ও অন্যান্য বাতিল ফিরকার লোকেরা বিভিন্ন প্রকার প্রলোভন দিয়ে মানুষকে পথভ্রষ্ট ও আদর্শচ্যুত করার চক্রান্তে লিপ্ত রয়েছে।

ইসলামের এহেন স্মরণীয় দিনগুলো মুসলমানী তরীকায় স্মরণ করার শিক্ষা জাতিকে সর্বাগ্রে দিতে হবে। সাথে সাথে কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে এদিনের বর্জনীয় ও করণীয় দিকগুলোও তুলে ধরতে হবে জাতির সামনে। তবেই কু-সংস্কার মুক্ত সমাজ কায়েমে সক্ষম হব আমরা। মাহে মুহাররমের দশ তারিখকেই বলা হয় আশূরা। এ দিনের ফযীলত বিভিন্নগ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে। আশূরার দিন রোযা রাখা সুন্নাত, তার প্রমাণ বহন করছে হাদীসে মুহাম্মদী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। মুহাররমের ১০ তারিখ বহু বিস্ময়কর ঘটনাসমূহ সংঘটিত হয়েছে বলে পূর্ববর্তী সকল পয়গাম্বর ও তাঁদের উম্মতগণ মুহাররম মাসের ১০ তারিখ শুকরিয়া জ্ঞাপন স্বরূপ রোযা রাখতেন। এমন কি কোন কোন নবীর উম্মতের উপর উক্ত দিনের সিয়াম ফরযও করে দেওয়া হয়েছিল।

জ্ঞানী ও ডিগ্রীধারী বন্ধুদের বোধোদয় হোক। সাধারণ মানুষ যাই করুক না কেন, কোন জ্ঞানী ও শিক্ষিত ব্যক্তি যাতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশিত পথের বাইরে আমল না করে এটাই ঈমানের দাবী, এটাই ইসলামের দাবী। নিছক আনুষ্ঠানিকতা ও কৃত্রিমতা ইসলাম নয়। তা ইসলাম বহির্ভূত মনগড়া একটা রুসুম মাত্র।

পবিত্র মুার্হারাম মাস আরবী বছরের প্রথম মাস। এ মাসের নবভাস্কর নবদিগন্তের আমেজ নিয়ে উদয় হোক মুসলিম মিল্লাতের প্রতিটি জীবনে; এটা সকলেরই কামনা-বাসনা। কিন্তু গা ভাসিয়ে দিয়ে সব ধরনের প্রচলন ও কু-সংস্কারের স্রোতে ভেসে যেতে থাকলে কামনা- কামনাই থেকে যাবে। বাস্তবতার মুখ হবে ম্লান, হবে দীপ্তিহীন।

বিবেকবানদের কাছে আমার জিজ্ঞাসা সারা বছর কোন নামায রোযা নেই, ইসলামী আহ্কাম নেই, মুহাররমের ১০ তারিখ ব্লেড বা ছুরি দিয়ে বুকে আঘাত করে তাতে গ্লিসারিন মেখে হায় হাসান! হায় হোসাইন! বলে বুকে চাপড় মারতে থাকলে কি নবী দৌহিত্র, আলীর দুলাল, ফাতিমার কলিজার টুকরা হযরত হাসান ও হযরত হুসাইনের প্রিয়ভাজন হওয়া যাবে? ঘন্টা কয়েক হায় হাসান! হায় হোসাইন! করা বা এ বিলাপ প্রত্যক্ষ করাই কি ঈমানের পরিচায়ক?

হযরত হোসাইন (রাযি.)এর ঘোড়া তো নেই। কাঠ, বাঁশ, কাপড় ও কাগজ দিয়ে একটা নির্জীব ঘোড়া বানিয়ে রাস্তায় রাস্তায় ট্রাকের উপর চড়িয়ে ঘুরালে কি নেকীর মহড়া চলতে থাকবে? না, তা কখনই না। আচ্ছা বিলাপ করলে, জারী গাইলে এতে কি শহীদানে কারবালার আত্মার মাগফিরাত হবে? মোটেই না, তবে শিক্ষিত বিবেকবান হয়েও কেন সমূহ বাহুল্যতায় লিপ্ত হচ্ছে সমাজ? এর একটাই কারণ তা হচ্ছে, ইসলামী অনুশাসনের প্রতি উদাসিনতা ও বেপরোয়ায়ী। একটুখানি উদাসিনতার জন্য কতবড় ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে আজ মিল্লাতে মুহাম্মদী।

লেখক: প্রবীণ মুফতি ও মুহাদ্দিস, মুফতীয়ে আযম ফয়যুল্লাহ (রাহ.)এর শাগরিদে খাস এবং বিভাগীয় প্রধান- দারুল ইফতা, দারুল উলূম মুঈনুল ইসলাম হাটহাজারী মাদ্রাসা, চট্টগ্রাম।

31/07/2021

বন্ধু কবরেও গিয়ে পর্ণগ্রাফি পাঠায়

একটা ঘটনা মনে পড়ল। আরব বিশ্বের অন্যতম আলেম ড. মুহাম্মাদ আল আরিফি। তাঁর একটা বয়ানে শুনেছি। তিনি বলেন, এক যুবক তাঁর কাছে খুব লজ্জিত হয়ে আসলো এবং কান্নাকাটি শুরু করে দিলো। শায়েখকে সে জানালো, শায়েখ! আমি খুব বিপদে আছি। আমার বন্ধু মারা গেছে। আমার বন্ধু কবরে চলে গেছে। সে তো কবরে চলে গেছে কিন্তু তার ইমেইল আইডি থেকে আমার ইমেইলে এখনো প্রতিনিয়ত পর্ণ মুভি আসে। বন্ধুতো কবরে চলে গেছে কিন্তু আমার কাছে পর্ণ মুভি পাঠানো বন্ধ হয় নাই। এইজন্য আমি খুব টেনশনে আছি।

শায়েখ বললেন, খুলে বল কী ঘটনা?

যুবক বলা শুরু করল, আমরা কয়েকজন বন্ধু ছিলাম। সবাই এক সময় নামাজ-কালাম পড়তাম। ভালো ছিলাম। কিন্তু কোথা থেকে আমাদের সাথে একজন খারাপ বন্ধু জুটে গেলো টের পাই নাই। সে বিভিন্ন সময় আমাদেরকে স্মার্টফোনে বিভিন্ন জিনিস দেখাতো। বন্ধুবান্ধব অকৃত্তিম সম্পর্কের হয়। তখন আমরাও বন্ধুর পাল্লায় পড়ে মাঝে মাঝে এগুলো দেখা শুরু করে দিলাম। একটা সময় সে আর সাধারণ জিনিস দেখায় না। আমাদেরকে একেবারেই খারাপ অশ্লীল মুভিগুলো দেখানো শুরু করল। সরাসরি ব্যভিচার টাইপের জিনিসগুলো দেখানো শুরু করল। প্রথম প্রথম আমরা তাকে বকাঝকা করতাম। কিছু ওয়াজ নসিহতও করতাম, কিছু উপদেশও দিতাম। বলতাম, এগুলো ভালো না ভাই, ঠিক হয়ে যাও। কিন্তু মনে মনে আবার চাইতাম যে, একটুখানি আরো দেখি। একদিন দুইদিন এরকম হতে হতে একটা পর্যায়ে এসে আমরাও অভ্যস্ত হয়ে গেছি। একটা সময়ে সব বন্ধুবান্ধব মিলে একেবারে গ্রুপিংভাবে এই নোংরা জিনিসগুলো দেখা শুরু করলাম। তো একদিন আমাদের ওই বন্ধুকে বললাম, বন্ধু! তুমি দেখি প্রতিদিন নতুন নতুন জিনিস আনো, ঘটনা কী! কোথায় পাও এগুলো!? আমরা ইন্টারনেটে ঘাটাঘাটি করে তো এগুলো পাই না। তো বন্ধু আমাদেরকে বলল, আমি একটা ওয়েবসাইটের সাবস্ক্রাইবার। যখনই কোন নতুন ভিডিও আপলোড হয় আমার কাছে নোটিফিকেশন আসে আর আমি সেটা পেয়ে যাই। আমরা আগ্রহ প্রকাশ করলাম এবং বললাম, আমাদেরকেও ওটার সাবস্ক্রাইবার বানিয়ে দাও। সে উত্তর দিল, ডলার খরচ হবে। এরপরেই বন্ধু আমাদেরকে যুক্তি দিলো, ডলার খরচের দরকার নাই। তোমরা নিজেদের মেইল আইডি আমার কাছে দিয়ে দাও। আমি এমন একটা সিস্টেম করে দিবো যে, যখন আমার কাছে নতুন ভিডিওর নোটিফিকেশন আসবে তখন তোমাদের কাছেও অটোমেটিক নোটিফিকেশন চলে যাবে, ফরওয়ার্ড করে দিবো আমি। তোমরা আমার মতো দেখতে পারবা। আল্লাহর কী হুকুম! এরপরে হল কী! আমাদের ওই বন্ধু হঠাৎ করে এক্সিডেন্টে মারা গেলো। একেবারে বাসের তলায় পিষ্ট হয়ে অন দ্যা স্পট মারা গেলো। বন্ধুতো কবরে চলে গেল কিন্তু সে কী করে গেছে জানি না; হয়ত কোন অটো সিস্টেম করে গেছে যে, তার আইডি থেকে নটিফিকেশন আসা এখনও বন্ধ হয় নাই। এখনও ওই ওয়েবসাইটে যখনই কোনো ভিডিও আপলোড হয় সঙ্গে সঙ্গে আমাদের আইডিতে নোটিফিকেশন চলে আসে। এভাবে আমাদের বন্ধু এখনও কবর থেকেও আমাদের কাছে পর্ণ মুভির নোটিফিকেশন পাঠাচ্ছে! আমার তো ভয় হয়, এর কারণে আমার কী হয়! তাই আমি তওবা করতে এসেছি।

শায়েখ আরেফি বললেন, ব্যাপারটাতো কঠিন কিছু নয়। ওয়েবসাইট কতৃপক্ষের কাছে তোমরা মেইল করে বল, আমরা আর এটা চাই না। এটা পাঠানো বন্ধ করে দাও।

তখন যুবক বলল, এই চেষ্টাও আমরা করেছি। কিন্তু কতৃপক্ষ আমাদেরকে জানালো, তোমার আইডি দিয়ে আমাদের ওয়েবসাইটে কোন সাবস্ক্রাইবার নাই। কাজেই আমরা এটা অফ করতে পারবো না। যার আইডি তার মেইল থেকে যদি আমাদের অফ করার জন্য বলা হয় তাহলে আমরা অফ করবো। এর আগে নয়। এখন সমস্যা হল, আমাদের ওই বন্ধুর আইডির পাসওয়ার্ড তো আমাদের জানা নাই। পাসওয়ার্ড আমরা উদ্ধার করার চেষ্টাও করেছি, কিন্তু হয় নাই। যার কারণে বন্ধুর কাছে যতবার নোটিফিকেশন আসে আমাদের কাছেও ততবার নোটিফিকেশন আসে।

চিন্তা করে দেখুন, এই যে এতগুলো বন্ধু পর্ণমুভিতে এডিক্টেড হল কার কারণে? একটা খারাপ বন্ধুর কারণে। আসলে একটি সুন্দর পরিবেশকে নষ্ট করার জন্য একজন এডিক্টেডই যথেষ্ট। একজন আসক্ত রোগীই যথেষ্ট।
আল্লাহ আমাদেরকে বুঝার তাওফিক দান করুন (আমিন)।

Want your school to be the top-listed School/college in Sirajganj?

Click here to claim your Sponsored Listing.

Location

Culinary Team

Attire

Telephone

Website

Address

Sirajganj