10/05/2025
বুয়েট ৩৮৩-
২৬ ফেব্রুয়ারি, বুধবার। রাত ৯টা।
জাকারিয়া খেয়েদেয়ে শুয়ে পড়েছেন ঠিকই, কিন্তু চোখে ঘুম নেই। মাথায় ঝড়। ক্লান্ত মনটা ফেসবুক স্ক্রলে ব্যস্ত। হঠাৎ চোখে পড়ে এক পোস্ট—বুয়েটের রেজাল্ট বেরিয়েছে।
হৃদপিণ্ড যেন এক লাফে উঠে আসে গলায়।
দৌড়ে ফোন হাতে নেন। কিন্ত গ্রামের এই বাড়িতে নেট খুবই দূর্বল।
আবার চেষ্টা, বারবার, বারবার।
শেষমেশ ফাইলটা খুলে—চোখ বুলান রেজাল্টের পিডিএফ ফাইলে একবার, দুবার, তিনবার…নেই! নিজের নামটা নেই!
মাথায় যেন বাজ পড়ে। চারপাশ অন্ধকার হয়ে আসে।
ভেতরটা ভেঙে চুরমার—“সব শেষ! এত কষ্ট—সব জলে গেল!”
চোখ বেয়ে নেমে আসে জলের ধারা। বিছানায় মুখ লুকিয়ে কাঁদতে থাকেন জাকারিয়া।
কতক্ষণ কাদছেন জানা নেই, ঠিক তখনই বেজে ওঠে ফোন। অপর প্রান্ত থেকে চেনা কণ্ঠ
“অভিনন্দন, তুমি মেধাতালিকায় ৩৮৩তম হয়েছো। ট্রিপল ই পেয়েছো!”
জাকারিয়ার শরীরটা কাঁপে। মাথা ঘোরে।
এই কান কি ভুল শুনছে? না কি এ এক দুঃস্বপ্ন থেকে উঠে আসা অলৌকিক মুহূর্ত?
বন্ধুকে ফোন দেন, বন্ধুর মাধ্যমেই নিশ্চিত হন—হ্যাঁ, তিনি চান্স পেয়েছেন! বুয়েটের দরজা খুলে গেছে তাঁর জন্য।
দৌড়ে মায়ের পায়ে হাত দিয়ে ডুকরে কেদে ওঠেন, "মা, আমি বুয়েটে চান্স পেয়েছি।”
আশেপাশের তিন গ্রামের মধ্যে কেউই কখনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পায়নি, দ্রুতই নাম ছড়িয়ে পড়ে, পরদিন সকাল তিন গ্রামের মানুষের মুখে তখন একটিই নাম—জাকারিয়া। অনেকে দেখতে আসেন। গল্প করেন।
অথচ এর পিছনে রয়েছে লম্বা আরেক গল্প-
সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরের প্রত্যন্ত চরকাদাই গ্রামে জাকারিয়ার জন্ম। পাঁচ ভাইবোন, বড় পরিবার, ভাঙা ঘর। বাবা নাছির উদ্দীন, অন্যের জমিতে কাজ করেন। কখনো ফরিদপুর, কখনো মানিকগঞ্জ। তাঁর ঘামেই চলে এই বড় সংসার। দুই বোনের পড়ালেখা বন্ধ হয়ে গেছে আগেই। মা ‘রোজা রেখেছেন’ বলে দিনের পর দিন না খেয়ে থাকেন—আসলে খাবারই থাকত না ঘরে, সন্তানদের খাওয়ানোর পরে তিনি রোজা রাখা ছাড়া উপায়ও নাই।
একদিন স্কুল ড্রেস না থাকায় পরীক্ষার হলে ঢুকতে দেয়া হয়নি জাকারিয়াকে। এই অভাবের মধ্যেও ফাইভে ও এইটে বৃত্তি পান জাকারিয়া, বড় ভাই ও বাবা সিদ্ধান্ত নেন, কষ্ট যতই হোক, মেধাবী এই সন্তানকে পড়াশুনা করাবেন।
এইচএসসির সময়ে গ্রামে থেকে আর পড়াশুনা হচ্ছিলো না। কারণ, ভাঙা ঘর। এমনই ভাঙা ঘর যে, রাতের জোছনা দেখা যায়, বৃষ্টিতে পানি পড়ে বই খাতা, আসবাবপত্র ভিজে যায়। তাই সিদ্ধান্ত নিলেন কলেজের পাশে একটা মেসে থাকবেন, তবে বাধা হয়ে দাড়ায় খরচ।
মাসে লাগে ৪ হাজার টাকা, টিউশনি করে আয় ৩ হাজার, এক হাজার থাকে ঘাটতি।
ঘাটতি পূরণে মাঝেমধ্যেই মেসের মিল বন্ধ রাখতেন ।
যেদিন টিউশন থাকে টিউশনের নাস্তার পরে একদম রাতে খেতেন দুইটা বিস্কুট, এক গ্লাস পানি। ক্ষুধা নিয়েই ঘুম। এতে করে বেচে যেত মিলের টাকা।
কখনো বই কেনার টাকা হতোও না, কিনতেন ও না। লাইব্রেরিতে গিয়ে পড়তেন। পরিত্যক্ত কাগজ কিনে লিখতেন।
প্রাইভেটের সাধ থাকলেও সাধ্য ছিল না—নিজেই বুঝে নিতেন গণিত-ভৌতবিজ্ঞান।
আর সম্বল একমাত্র পুরোনো এন্ড্রয়েড ফোন। তাও নিয়েছিলেন করোনাকালে দশম শ্রেণিতে থাকার সময়।
অনলাইন ক্লাসে যোগ দিতে পারছিলেন না, স্মার্টফোন নেই। বড় ভাই মামুন বোর্ড বৃত্তির টাকা আর এক চাচার সাহায্যে ৮ হাজার টাকায় ফোন কিনে দিয়েছিলেন ফোন। এই ৮ হাজার টাকার এন্ড্রয়েড ফোনেই ভরসা, প্রাইভেটের সাধ মেটানো এখান থেকেই।
ইউটিউবে দেখতেন গণিত, রসায়ন, পদার্থের ক্লাস আর অভাব জয় করে বুয়েটে ,কুয়েট ঢাবি, রাবিতে পড়ার অনুপ্রেরণার ভিডিও।
এইচএসসির পর সব বন্ধুরা ঢাকা, রাজশাহী, খুলনায় কোচিংয়ে। কোচিং ছাড়া বুয়েটে পড়ার স্বপ্ন দেখাও দু:সাহসিক কাজ। হতাশাগ্রস্ত হয়ে স্বপ্ন দেখাই ভুলে গেলেন জাকারিয়া, খাবার টাকাই জোটে না, কোচিং করবেন কীভাবে? এদিকে বোনের বিয়ের সময় হয়ে আসছে, বিয়ের টাকাও জোগার হয় না। বাবা ভাইয়ের কাছে এ সময় টাকার কথা বলার ও সাহস হয় না। সব ছেড়ে চলে গেলেন গ্রামে।
এমন সময় এগিয়ে আসেন ফুপু, ভাইয়ের কষ্ট আর ভাইয়ের ছেলের মেধা দেখে আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েন। বাস্তবতাত মুখোমুখি হয়ে কঠিন সিদ্ধান্ত নেন। এই ফুপু জমি বিক্রি করে দেন, বড় বোনের বিয়ের টাকা জোগান। সেখান থেকে কিছু টাকা নিয়ে ভাতিজাকে অনলাইন কোচিংয়ে ভর্তি হতে বলেন। বোন ও দুলাভাই পাঠাতেন কোচিংয়ের খরচ। এর মাঝে বাবার যক্ষ্মা ধরা পড়ে। চিকিৎসা চলছিল না ঠিকভাবে—টাকার অভাব।
এভাবেই ৩-৪ মাসের এডমিশন সেশন শেষ হয়।
ঢাকা বা খুলনায় কোনো আত্মীয় নেই। থাকার জায়গা নেই, যাতায়াতেরও টাকা নেই। বাসে চড়া দূরের স্বপ্ন। যাতায়াত করেন ট্রেনে স্টান্ডিং টিকেট কেটে, দাঁড়িয়ে।
কখনো কখনো টিকিট চেকারদের নিজের বাস্তবতা জানালে তারা বিনা টিকিটে যেতে দিতেন।
এভাবেই গিয়ে গিয়ে, মসজিদে থেকে থেকে বুয়েট, কুয়েট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়—তিন জায়গাতেই ভর্তি পরীক্ষা দেন।
পরিক্ষা মোটামুটি ভালো হওয়ায় গ্রামে ফিরে যান। শুধু অপেক্ষার পালা, এছাড়া কিই বা করবেন।
এরপরে একদিন রাতে আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ।
নিজের পুরাতন ফোনে ইন্টারনেট চলে না, ফোন আটকে যায়, বন্ধুর ফোনে চান্স পাওয়ার খবর পান, আম্মার পায়ে হাত দিয়ে কেদে ওঠেন,
পাশেই রোগে শয্যাশায়ী বাবার কপালে চুমু খান।
এক ভাঙা ঘরে জ্বলে ওঠে আনন্দের অশ্রুবিন্দু। দূরে দাড়ানো বড় ভাই চুপে চুপে দেখতে থাকেন ছোট ভাইয়ের হাউমাউ করে কান্না, আস্তে করে তিনি ঘর থেকে বেড়িয়ে যান, ছোট ভাইয়ের সামনে তিনি কাদতে পারেন না।
বুয়েটে ৩৮৩তম, কুয়েটে ৯১০তম, ঢাবিতে ১৮৭৬তম হয়ে চান্স পেয়েছেন।
বাবা মা, ভাই, ফুপুর স্বপ্ন জয় করে এখন ভর্তি হয়েছেন বুয়েটের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে।
এইতো গত মাসের ১২ এপ্রিল থেকে নতুন জীবন শুরু হয়েছে— আপাতত চার বছরের স্থায়ী ঠিকানা কাজী নজরুল ইসলাম হল, বুয়েট।
পুরো কাহিনী শুনে চোখে জল আসে,
জাকারিয়ার কণ্ঠে তখনও হাসি মুখে কষ্টের কথা বলে যান, আব্বা অসুস্থ, জানি না কীভাবে চিকিৎসা করাবো,
“দারিদ্র্যকে খুব কাছ থেকে দেখেছি। এক টাকার মূল্য কত, আমি জানি।
চাই বাবাকে বিশ্রাম দিতে। চাই মায়ের মুখে হাসি ফোটাতে, নিজে বড় হয়ে, ফুপুদের ছেলেমেয়েদের পাশে দাড়াতে চাই, আল্লাহ বুয়েট দিয়েছেন, আশা করি বাকীগুলোও দেবেন। মোবাইলে আব্বার ছবি দেখি, অসুস্থ হয়ে পড়ে আছেন দেড় বছর, জানি না কবে ডাক্তার দেখাতে পারব, আব্বাকে কবে সুস্থ পাবো। জাকারিয়ার কন্ঠ আটকে আসে, কথা আটকে যায়। হাতের তালুতে চোখ ঢাকেন।
এজন্যই হয়তো হুমায়ুন লিখে গিয়েছিলেন,
আমার ভাঙা ঘরের ভাঙা চালা/ভাঙা বেড়ার ফাঁকে/অবাক জোছনা ঢুইকা পড়ে/হাত বাড়াইয়া ডাকে।’
ভাঙা ঘর থেকেই জাকারিয়াকে বুয়েট ডেকে নিয়েছে। সৃষ্টিকর্তা তাকে বাকীটা দেবেন কী না, তিনিই ভালো জানেন।
লিখেছেন: Abu Musa