18/08/2026
আদর্শ শিক্ষক: ছাত্র/ছাত্রীর ভুলে সদা কঠোরতা নয়, চাই সংশোধনের মমত্ববোধ
ছাত্র/ছাত্রী ভুল করবে—এটাই স্বাভাবিক। ভুল করতে করতে সে শিখবে, হোঁচট খেতে খেতে পথ চলতে শিখবে, আর কখনো কখনো বেআদবিও করবে। কিন্তু একজন আদর্শ শিক্ষকের মাহাত্ম্য এখানেই—ছাত্রের ভুল ও বেআদবির কারণে তিনি নিজের শিক্ষকসুলভ চরিত্র হারাবেন না। বরং ছাত্রের আচরণ যতই অপরিণত হোক, শিক্ষকের আচরণ ততই পরিণত হওয়া উচিত।
একজন শিক্ষক ছাত্রের সঙ্গে ছাত্রের মতো আচরণ করবেন না; তিনি থাকবেন শিক্ষকের আসনে—মমতা, প্রজ্ঞা, ধৈর্য ও দায়িত্ববোধ নিয়ে।
* মালী যেমন গাছকে দেখে
একজন মালী বাগানের সব গাছকে সমান যত্নে পানি দেয়। কোনো গাছ বেঁকে গেলে সে গাছটিকে ভেঙে ফেলে না; বরং খুঁটি দিয়ে সোজা করে। কোনো গাছের ডাল শুকিয়ে গেলে কেটে দেয়, কিন্তু শিকড় উপড়ে ফেলে না।
ছাত্রও তেমনই। কারো স্বভাব ভালো, কারো একটু চঞ্চল; কেউ দ্রুত শেখে, কেউ ধীরে; কেউ ভদ্র, কেউ কখনো সীমা অতিক্রম করে ফেলে। শিক্ষক যদি দুর্বল ছাত্রকে পরিত্যাগ করেন, তাহলে তিনি মালী নন—তিনি কেবল ফলের অপেক্ষায় থাকা একজন দর্শক।
আদর্শ শিক্ষক ফলবান গাছের ছায়ায় বসেন না শুধু; তিনি দুর্বল গাছটিকেও ফলবান করার চেষ্টা করেন।
*নদী যেমন ময়লা পানি পেলেও তার পথ হারায় না
নদীতে স্বচ্ছ পানি যেমন আসে, তেমনি ময়লাও এসে পড়ে। কিন্তু নদী ময়লা পেয়ে ময়লা হয়ে যাওয়াকে নিজের পরিচয় বানায় না। সে নিজের গতিতে চলতে থাকে এবং একসময় সেই ময়লাকেও দূরে নিয়ে যায়।
একজন শিক্ষকও তেমন। ছাত্র রাগ করল, কথা শুনল না, বেআদবি করল—তাই বলে শিক্ষকও রাগ, অপমান ও প্রতিশোধের ভাষায় নেমে যাবেন না।
ছাত্রের চরিত্র যেন শিক্ষকের চরিত্র নির্ধারণ না করে।
* আয়না নয়, শিক্ষক হবেন প্রদীপ
আয়নার সামনে যে যেমন দাঁড়ায়, আয়না তাকে তেমনই ফিরিয়ে দেয়। কিন্তু শিক্ষক আয়না নন যে ছাত্র যেমন আচরণ করবে, তিনিও তেমন আচরণ করবেন।
শিক্ষক হলেন প্রদীপ। অন্ধকার ঘর তাকে অন্ধকার করে না; বরং সে অন্ধকারের মধ্যেই আলো ছড়ায়।
ছাত্র যদি রাগ দেখায়, শিক্ষক ধৈর্য দেখাবেন।
ছাত্র যদি কটু কথা বলে, শিক্ষক সুন্দর ভাষায় উত্তর দেবেন।
ছাত্র যদি ভুল করে, শিক্ষক সংশোধনের পথ দেখাবেন।
কারণ শিক্ষকের কাজ ছাত্রের আচরণের প্রতিচ্ছবি হওয়া নয়; বরং ছাত্রের আচরণকে সুন্দর করে তোলা।
* ধানগাছের মতো নত হওয়া
ধান যখন শীষে পূর্ণ হয়, তখন সে নুয়ে পড়ে। খালি শীষই বেশি উঁচু হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।
একজন জ্ঞানী শিক্ষক যত বড় হন, তত বেশি বিনয়ী হন। ছাত্রের ছোটখাটো ভুলে তাঁর ব্যক্তিত্বে আঘাত লাগে না। তিনি জানেন—একজন ছাত্রের অপরিপক্বতা তার নিজের জ্ঞানের পরিপক্বতার পরীক্ষা।
ছাত্র বেআদবি করলে শিক্ষক যদি নিজের মর্যাদা ভুলে যান, তাহলে ছাত্রের ভুলের সঙ্গে শিক্ষকেরও আরেকটি ভুল যুক্ত হয়।
* চিকিৎসক যেমন রোগীকে ঘৃণা করেন না
একজন চিকিৎসকের কাছে রোগী আসে অসুস্থ শরীর নিয়ে। রোগীর শরীরে দুর্গন্ধ থাকতে পারে, ক্ষত থাকতে পারে, নানা অস্বস্তিকর সমস্যা থাকতে পারে। কিন্তু চিকিৎসক তাকে ঘৃণা করে দূরে সরিয়ে দেন না। কারণ তিনি জানেন—এটাই তো তার চিকিৎসার ক্ষেত্র।
তেমনি একজন শিক্ষকের কাছে যে ছাত্র সবচেয়ে বেশি ভুল করে, অনেক সময় তারই সবচেয়ে বেশি শিক্ষকের প্রয়োজন।
ভালো ছাত্রকে পড়ানো দক্ষতার পরিচয় হতে পারে; কিন্তু খারাপ আচরণকারী ছাত্রকে ভালো করে তোলা শিক্ষকের মহত্ত্বের পরিচয়।
* বেআদব ছাত্রের জন্যও দোআ
আদর্শ শিক্ষক শুধু ছাত্রকে শাসন করবেন না; তার জন্য দোআও করবেন।
তিনি মনে মনে বলবেন—
“হে আল্লাহ! এই ছাত্র/ছাত্রী টি যেন বুঝতে পারে। তার অন্তরকে নরম করে দিন। তাকে ইলমের সঙ্গে আদব দান করুন। তাকে নেক ও উপকারী মানুষ হিসেবে কবুল করুন।”
কারণ একজন শিক্ষক শুধু আজকের ছাত্রকে দেখেন না; তিনি তার আগামী দিনের মানুষটিকেও দেখেন।
আজ যে ছাত্র কথা শোনে না, কাল সে হয়তো একজন আলেম,জ্ঞানীগুণী, হবে। ভালো মানুষ হবে।
আজ যে ছাত্র অমনোযোগী, কাল সে হয়তো সমাজের নেতৃত্ব দেবে।
আজ যে ছাত্র বেআদবি করছে, কাল সে হয়তো নিজের সন্তানকে আদব শেখাবে।
তাই কোনো ছাত্রের বর্তমান ভুল দেখে তার ভবিষ্যৎকে চূড়ান্তভাবে বিচার করা উচিত নয়।
* সবার জন্য একই দৃষ্টিভঙ্গি
শিক্ষকের দৃষ্টিতে ছাত্রদের মধ্যে ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের কারণে বৈষম্য থাকা উচিত নয়। যে ছাত্র প্রিয়, তার ভুল ক্ষমা করে দেওয়া আর যে ছাত্র অপছন্দের, তার ছোট ভুলও বড় করে দেখা—এটি শিক্ষকের ন্যায়পরায়ণতার পরিপন্থী।
শিক্ষকের চোখে সবাই ছাত্র; কারো প্রতি অতিরিক্ত পক্ষপাত নয়, কারো প্রতি অতিরিক্ত বিরাগও নয়।
কেউ বেশি মেধাবী বলে সে বেশি প্রিয় হবে না, আর কেউ দুর্বল বলে সে কম গুরুত্বপূর্ণ হবে না। বরং দুর্বল ছাত্রের প্রতি শিক্ষকের অতিরিক্ত মনোযোগই অনেক সময় তাকে সফল করে তুলতে পারে।
*ছায়াদানকারী বৃক্ষের মতো হোন
বৃক্ষের ছায়ায় দাঁড়ানো মানুষ ভালো হোক বা খারাপ—বৃক্ষ তার ছায়া বন্ধ করে দেয় না।
শিক্ষকও তেমন। তার জ্ঞান, আদব, মমতা ও দিকনির্দেশনা ছাত্রের আচরণের ওপর নির্ভর করবে না।
ছাত্র ভালো হলে তাকে ভালোবাসবেন—এটা সহজ।
কিন্তু ছাত্র ভুল করলে, বেআদবি করলে, তখনও তাকে সংশোধনের ভালোবাসা দিতে পারাই হলো আদর্শ শিক্ষকের পরীক্ষা।
*শেষ কথা
শিক্ষক হওয়া শুধু বই পড়ানো নয়; মানুষ গড়া। আর মানুষ গড়তে হলে ধৈর্য লাগে, মমতা লাগে, ক্ষমাশীলতা লাগে এবং নিজের চরিত্রকে ছাত্রের আচরণের ঊর্ধ্বে রাখতে হয়।
ছাত্রের ভুল শিক্ষককে রাগী করে তুলবে না; বরং আরও দায়িত্বশীল করবে।
তাই ছাত্র বেআদবি করলে শিক্ষক যেন মনে রাখেন—
“সে এখনো ছাত্র; কিন্তু আমি শিক্ষক।”
তার আচরণ তার পরিচয় বহন করবে; আর আমার আচরণ বহন করবে আমার শিক্ষকতার পরিচয়।
হয়তো আজকের একটি কোমল কথা, একটি ক্ষমা, একটি সুন্দর উপদেশ কিংবা একটি নিভৃত দোআ—একজন ভুল পথে চলা ছাত্রের পুরো জীবন বদলে দিতে পারে।
আদর্শ শিক্ষক ছাত্রের ভুলে প্রতিশোধ নেন না; তিনি সেই ভুলকে সংশোধনের সুযোগে পরিণত করেন।
আর যে শিক্ষক নিজের ছাত্রের ভুলের পরও তার জন্য দোআ করতে পারেন—তিনি শুধু একজন শিক্ষক নন; তিনি একজন মানুষ গড়ার কারিগর।
কলমে...
মুফতি আরিফ মাহমুদ হাবিবী।